আবারও গুজব ছড়িয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার অপচেষ্টা

প্রতিটি ধর্মই মানুষের মধ্যে সাম্য, একতা, মানবতা এবং সহমর্মিতা প্রকাশের মাধ্যমে সহাবস্থানে বসবাসের শিক্ষা দেয়। এক ধর্মাবলম্বী অন্য ধর্মাবলম্বীকে সম্মান করার আদেশ বিদ্যমান। প্রত্যেক ব্যক্তির ধর্মীয় স্বাধীনতা আছে। ধর্মপালন কিংবা বর্জন ব্যক্তির নিজস্ব অধিকার।

ইসলাম ধর্মের মাহাত্ম্য ও শ্রেষ্ঠত্ব হলো, এটা প্রত্যেক মানুষকে ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রদান করে। এই স্বাধীনতা শুধু ধর্ম-বিশ্বাস লালন-পালন করার স্বাধীনতা নয় বরং ধর্ম না করার বা ধর্ম বর্জন করার স্বাধীনতাও এই ধর্মীয় স্বাধীনতার অন্তর্ভুক্ত। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘তুমি বল, তোমার প্রতিপালক-প্রভুর পক্ষ থেকে পূর্ণ সত্য সমাগত, অতএব যার ইচছা সে ঈমান আনুক আর যার ইচ্ছা সে অস্বীকার করুক’ (সুরা কাহাফ : ২৮)। সত্য ও সুন্দর নিজ সত্তায় এত আকর্ষণীয় হয়ে থাকে যার কারণে মানুষ নিজে নিজেই এর দিকে আকৃষ্ট হয়। বলপ্রয়োগ বা রাষ্ট্রশক্তি নিয়োগ করে সত্যকে সত্য আর সুন্দরকে সুন্দর ঘোষণা করানো অজ্ঞতার পরিচায়ক। যেমন সূর্যোদয়ই সূর্যের অস্তিত্বের প্রমাণ। এই নিয়ে গায়ের জোর খাটানোর বা বিত-ার অবকাশ নেই। সূর্যোদয় সত্ত্বেও কেউ যদি সূর্যের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে তাকে বোকা বলা যেতে পারে কিন্তু তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার কিছুই নেই। ঠিক তেমনি কে আল্লাহকে মানলো বা মানলো না, কে ধর্ম করল বা করল না এটা নিয়ে এ জগতে বিচার বসানোর কোন শিক্ষা ইসলাম ধর্মে নেই। বরং এর বিচার পরকালে আল্লাহ নিজে করবেন বলে তার শেষ শরিয়ত গ্রন্থ আল কোরআনে বারবার জানিয়েছেন। এ স্বাধীনতা কাজে লাগিয়ে সমাজে আস্তিকও থাকবে, নাস্তিকও থাকবে। মুসলমানও থাকবে হিন্দুও থাকবে এবং অন্যান্য মতাবলম্বীরাও থাকবে।

গত ১৪ জানুয়ারি ২০২০ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে আহমদিয়া মসজিদে হামলার ঘটনা ঘটে। এ বিষয়ে বিবিসি বাংলাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকার ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আহমদিয়া মুসলিম জামাতের নায়েব আমির মো. মনজুর হোসেন বলেছেন, ‘অনুষ্ঠান চলার মধ্যে হঠাৎই শুনতে পেলাম স্লোগান দিয়ে একটি মিছিল নিয়ে অনেক মানুষ একেবারে আমাদের মসজিদের গেটের ভেতর ঢুকে পড়েছে। আমাদের ছেলেরা গেট আটকে দিলে তারা একদিকে গেট ভাঙার চেষ্টা করতে থাকে, অন্যদিকে বৃষ্টির মতো ঢিল ছুড়তে থাকে। আমাদের তিনতলা মসজিদটির সব কাঁচ ভেঙে গেছে, একটি মাইক্রোবাস এবং একটি এয়ারকন্ডিশনার চুরমার হয়ে গেছে।’ ঘটনার পর দেখা যারা এ আক্রমণ চালিয়েছে তারাই আবার মিথ্যা গুজব ছড়িয়ে দেশে অশান্তকর পরিবেশ সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে। আক্রমণকারীদের দাবি আহমদিরা নাকি তাদের মাদরাসায় আক্রমণ চালিয়েছে। স্থানীয় সূত্র এবং বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আহমদীরা নিজেদের মসজিদের ভেতরে ধর্মীয় আলোচনা অনুষ্ঠান করছিল।

পবিত্র কোরআন এবং মহানবী (সা.) সব ধর্মের অনুসারীদের নিজ নিজ রীতি অনুযায়ী ধর্মকর্ম পালনের শিক্ষা দিয়েছেন। মহানবী (সা.) বলেন- জেনে রাখ, যে ব্যক্তি কোন অঙ্গীকারাবদ্ধ অমুসলমানের ওপর জুলুম করবে, তার অধিকার খর্ব করবে, তার ওপর সাধ্যাতীত কোন কিছু চাপিয়ে দেবে বা তার অনুমতি ব্যতীত তার কোন বস্তু নিয়ে নিবে আমি পরকালে বিচার দিবসে তার বিপক্ষে অবস্থান করব (আবু দাউদ)।

অমুসলমানদের উপাসনালয়েও হামলা ইসলাম কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। শুধু তা-ই নয় অমুসলমানরা যেগুলোর উপাসনা করে সেগুলিকেও গালমন্দ করতেও বারণ করা হয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেন- তোমরা তাদের গালি দিও না, যাদের তারা আল্লাহকে ছেড়ে উপাস্য রূপে ডাকে, নতুবা তারা অজ্ঞতার কারণে শত্রুতাবশত: আল্লাহকে গালি দেবে (সুরা আনআম: ১০৯)। ফলে ইসলাম সব ধর্মাবলম্বীদের মাঝে এক সামাজিক সম্প্রীতি সৃষ্টির ব্যবস্থাপত্র দিয়েছে। কাজেই ধর্মীয় উন্মদনায় সন্ত্রাসী কার্যকলাপে মসজিদ, মন্দির, গির্জা বা অন্য কোন স্থাপনা ভাঙা ও জ্বালিয়ে দেয়া এবং নিরীহ মানুষকে হত্যা করা কোন ধর্মীয় কাজ নয়। বল প্রয়োগে কোন ধর্ম মত চাপিয়ে দেয়া কোন ধর্মই স্বীকৃতি দেয় না। অনেক ধর্মান্ধ জঙ্গিবাদী জেহাদের ঘোষণা করে হত্যাযজ্ঞ চালায়। কিন্তু ইসলামে জেহাদের বড় তাৎপর্য হলো নিজের আত্মশুদ্ধিকল্পে প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা। নিজের মাঝে মনুষ্যত্বের গুণাবলির উৎকর্ষতা বিকশিত করা। আদর্শ ও ভালোবাসা সৃষ্টি এবং যুক্তির মাধ্যমে অপরকে দীক্ষিত করার প্রচেষ্টা করা। ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার শিক্ষা নেই। আল্লাহতায়ালা বলেন- তুমি মন্দকে সর্বোৎকৃষ্ট আচরণ দ্বারা প্রতিহত কর। তাহলে দেখবে যার সঙ্গে আজ তোমার শত্রুতা রয়েছে সে তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধু হয়ে যাবে। (সুরা হামীম আস সাজদা : ৩৫)

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উক্ত ঘটনার পরপরই আহমদীয়া মুসলিম জামাতের পক্ষ থেকে আহমদ তবশীর চৌধুরী স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে মূল বিষয়টি দেশবাসীকে অবগত করা হয়। প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়- “১৪ জানুয়ারি ২০২০ মাগরিবের নামাযের পর একদল উগ্র-ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক শক্তি ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরস্থ কান্দিপাড়ায় অবস্থিত আহমদিয়া মুসলিম জামাতের মসজিদ ‘মসজিদ বায়তুল ওয়াহেদ’-এ হামলা চালায়। ‘কাদিয়ানিরা মাদরাসার ছাত্রদের পিটিয়েছে’ এমন মিথ্যা গুজব ছড়িয়ে আক্রমণকারীরা লোকজনকে উত্তেজিত করে এবং আক্রমণ চালায়। তাদের ইটপাটকেলের আঘাতে তিনতলা মসজিদের কাঁচের জানালাগুলো ভেঙে চুরমার হয়ে যায় এবং লোহার গেট ভেঙে মসজিদ প্রাঙ্গণে ঢোকার চেষ্টা করে। তারা পার্শ্ববর্তী বাড়িতে রাখা আহমদিয়া মুসলিম জামাতের মাইক্রোবাস (ঢাকা মেট্রো-চ-১৬-১৮৭৭) ভাঙচুর করে। আক্রমণকারীরা আশেপাশে আহমদিদের বাড়িঘরেও হামলা চালায়।

আক্রমণের সংবাদ পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত পরিস্থিতি উত্তপ্ত রয়েছে এবং ওরা আবারও মিথ্যা গুজব ছড়িয়ে সংঘবদ্ধ আক্রমণের পরিকল্পনা করছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। এরা বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় এখনও গুজব ছড়াচ্ছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, উগ্র-ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক শক্তি ইতিপূর্বে গুজব ছড়িয়ে খুলনায় আহমদিয়া মসজিদে, রামুর বৌদ্ধ মন্দিরে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরপুরে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ওপর এবং কিছুদিন আগে ভোলোার বোরহানুদ্দিনে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সৃষ্টি করে। এখানে এও উল্লেখ্য যে, ১৯৮৭ সালে এভাবে মিথ্যা গুজব ছড়িয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের পুরনো আহমদিয়া মসজিদটি সাম্প্রদায়িক শক্তি বলপূর্বক দখল করে নেয় এবং এখন পর্যন্ত তারা সেটি অবৈধভাবে দখল করে রেখেছে। আজকের এই আক্রমণ সেখান থেকেই পরিচালনা করা হয়েছে। আমরা আহমদিয়া মুসলিম জামাতের সদস্যগণ শান্তিপ্রিয় এবং দেশের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নাগরিক। আমরা কখনোই আইন নিজের হাতে তুলে নেই না। আমরা এ ধরনের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করছি এবং গুজব-সৃষ্টিকারী দুর্বৃত্তদের আইনের আওতায় এনে আমাদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সরকার ও প্রশাসনের কাছে আবেদন জানাচ্ছি।”

যারা ধর্মের নামে এসব গর্হিত কাজে লিপ্ত তারা কখনো শান্তির ধর্ম ইসলামের অনুসারী হতে পারে না। এর পূর্বে আমরা দেখেছি ধর্ম অবমাননার কথা বলে বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা। ধর্মের নামে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ কখনও ইসলাম সমর্থন করে না। আজ যারা বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠনের নামে দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করছে এবং বড় ধরনের নাশকতার চিন্তা-ভাবনা করছে তাদের বলতে চাই, মহানবী (সা.)-এর মর্যাদা কি জ্বালাও-পোড়াও করে অর্জিত হবে, নাকি মহানবী (সা.)-এর উত্তম আদর্শ স্থাপন করার মাধ্যমে অর্জিত হবে?

একটি মিথ্যা অপপ্রচার বা গুজব কত সহজেই যে জনগণের কোন কোন অংশকে উত্তেজিত করে ভয়ংকর কা- তথা লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ ঘটিয়ে দেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগাতে পারে তার অসংখ্য দৃষ্টান্ত আমাদের দেশেই রয়েছে। যেমন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্ম অবমাননার গুজব ছড়িয়ে ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে কক্সবাজার জেলার রামুতে হামলা চালিয়ে লুটপাটসহ ১২টি বৌদ্ধমন্দির ও ৩০টি বাড়িতে আগুন দেয়া হয়। ২০১৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে রসরাজ নামে এক মৎস্যজীবীর বিরুদ্ধে একই অভিযোগ এনে লোকজনকে খেপিয়ে তুলে ঘরবাড়ি ও মন্দিরে হামলা চালানো হয়। গত ২০ অক্টোবর ভোলোর বোরহানউদ্দিনে ঘটে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে সেখানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এক যুবকের বিচারের দাবিতে ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে বিক্ষোভ থেকে পুলিশের সঙ্গে এলাকাবাসীর ব্যাপক সংঘর্ষ বাধে।

আমাদের আবেদন, সরকার-প্রশাসন দৃঢ়ভাবে এদের সব ধরণের অপচেষ্টার মূল উৎপাটন করবেন, দেশের সচেতন ও বিবেকবান জনগণ এদের মিথ্যা ফাঁদে পা দিবেন না। আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন লাখো শহীদের রক্তস্নাত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশকে পাকিস্তানের মতো একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র বানানোর দুরভিসন্ধি থেকে রক্ষা করুন।

[লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট]

abu.afia2016@gmail.com

শুক্রবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২০ , ১০ মাঘ ১৪২৬, ২৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১

আবারও গুজব ছড়িয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার অপচেষ্টা

আবু আফিয়া আহমদ

প্রতিটি ধর্মই মানুষের মধ্যে সাম্য, একতা, মানবতা এবং সহমর্মিতা প্রকাশের মাধ্যমে সহাবস্থানে বসবাসের শিক্ষা দেয়। এক ধর্মাবলম্বী অন্য ধর্মাবলম্বীকে সম্মান করার আদেশ বিদ্যমান। প্রত্যেক ব্যক্তির ধর্মীয় স্বাধীনতা আছে। ধর্মপালন কিংবা বর্জন ব্যক্তির নিজস্ব অধিকার।

ইসলাম ধর্মের মাহাত্ম্য ও শ্রেষ্ঠত্ব হলো, এটা প্রত্যেক মানুষকে ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রদান করে। এই স্বাধীনতা শুধু ধর্ম-বিশ্বাস লালন-পালন করার স্বাধীনতা নয় বরং ধর্ম না করার বা ধর্ম বর্জন করার স্বাধীনতাও এই ধর্মীয় স্বাধীনতার অন্তর্ভুক্ত। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘তুমি বল, তোমার প্রতিপালক-প্রভুর পক্ষ থেকে পূর্ণ সত্য সমাগত, অতএব যার ইচছা সে ঈমান আনুক আর যার ইচ্ছা সে অস্বীকার করুক’ (সুরা কাহাফ : ২৮)। সত্য ও সুন্দর নিজ সত্তায় এত আকর্ষণীয় হয়ে থাকে যার কারণে মানুষ নিজে নিজেই এর দিকে আকৃষ্ট হয়। বলপ্রয়োগ বা রাষ্ট্রশক্তি নিয়োগ করে সত্যকে সত্য আর সুন্দরকে সুন্দর ঘোষণা করানো অজ্ঞতার পরিচায়ক। যেমন সূর্যোদয়ই সূর্যের অস্তিত্বের প্রমাণ। এই নিয়ে গায়ের জোর খাটানোর বা বিত-ার অবকাশ নেই। সূর্যোদয় সত্ত্বেও কেউ যদি সূর্যের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে তাকে বোকা বলা যেতে পারে কিন্তু তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার কিছুই নেই। ঠিক তেমনি কে আল্লাহকে মানলো বা মানলো না, কে ধর্ম করল বা করল না এটা নিয়ে এ জগতে বিচার বসানোর কোন শিক্ষা ইসলাম ধর্মে নেই। বরং এর বিচার পরকালে আল্লাহ নিজে করবেন বলে তার শেষ শরিয়ত গ্রন্থ আল কোরআনে বারবার জানিয়েছেন। এ স্বাধীনতা কাজে লাগিয়ে সমাজে আস্তিকও থাকবে, নাস্তিকও থাকবে। মুসলমানও থাকবে হিন্দুও থাকবে এবং অন্যান্য মতাবলম্বীরাও থাকবে।

গত ১৪ জানুয়ারি ২০২০ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে আহমদিয়া মসজিদে হামলার ঘটনা ঘটে। এ বিষয়ে বিবিসি বাংলাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকার ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আহমদিয়া মুসলিম জামাতের নায়েব আমির মো. মনজুর হোসেন বলেছেন, ‘অনুষ্ঠান চলার মধ্যে হঠাৎই শুনতে পেলাম স্লোগান দিয়ে একটি মিছিল নিয়ে অনেক মানুষ একেবারে আমাদের মসজিদের গেটের ভেতর ঢুকে পড়েছে। আমাদের ছেলেরা গেট আটকে দিলে তারা একদিকে গেট ভাঙার চেষ্টা করতে থাকে, অন্যদিকে বৃষ্টির মতো ঢিল ছুড়তে থাকে। আমাদের তিনতলা মসজিদটির সব কাঁচ ভেঙে গেছে, একটি মাইক্রোবাস এবং একটি এয়ারকন্ডিশনার চুরমার হয়ে গেছে।’ ঘটনার পর দেখা যারা এ আক্রমণ চালিয়েছে তারাই আবার মিথ্যা গুজব ছড়িয়ে দেশে অশান্তকর পরিবেশ সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে। আক্রমণকারীদের দাবি আহমদিরা নাকি তাদের মাদরাসায় আক্রমণ চালিয়েছে। স্থানীয় সূত্র এবং বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আহমদীরা নিজেদের মসজিদের ভেতরে ধর্মীয় আলোচনা অনুষ্ঠান করছিল।

পবিত্র কোরআন এবং মহানবী (সা.) সব ধর্মের অনুসারীদের নিজ নিজ রীতি অনুযায়ী ধর্মকর্ম পালনের শিক্ষা দিয়েছেন। মহানবী (সা.) বলেন- জেনে রাখ, যে ব্যক্তি কোন অঙ্গীকারাবদ্ধ অমুসলমানের ওপর জুলুম করবে, তার অধিকার খর্ব করবে, তার ওপর সাধ্যাতীত কোন কিছু চাপিয়ে দেবে বা তার অনুমতি ব্যতীত তার কোন বস্তু নিয়ে নিবে আমি পরকালে বিচার দিবসে তার বিপক্ষে অবস্থান করব (আবু দাউদ)।

অমুসলমানদের উপাসনালয়েও হামলা ইসলাম কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। শুধু তা-ই নয় অমুসলমানরা যেগুলোর উপাসনা করে সেগুলিকেও গালমন্দ করতেও বারণ করা হয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেন- তোমরা তাদের গালি দিও না, যাদের তারা আল্লাহকে ছেড়ে উপাস্য রূপে ডাকে, নতুবা তারা অজ্ঞতার কারণে শত্রুতাবশত: আল্লাহকে গালি দেবে (সুরা আনআম: ১০৯)। ফলে ইসলাম সব ধর্মাবলম্বীদের মাঝে এক সামাজিক সম্প্রীতি সৃষ্টির ব্যবস্থাপত্র দিয়েছে। কাজেই ধর্মীয় উন্মদনায় সন্ত্রাসী কার্যকলাপে মসজিদ, মন্দির, গির্জা বা অন্য কোন স্থাপনা ভাঙা ও জ্বালিয়ে দেয়া এবং নিরীহ মানুষকে হত্যা করা কোন ধর্মীয় কাজ নয়। বল প্রয়োগে কোন ধর্ম মত চাপিয়ে দেয়া কোন ধর্মই স্বীকৃতি দেয় না। অনেক ধর্মান্ধ জঙ্গিবাদী জেহাদের ঘোষণা করে হত্যাযজ্ঞ চালায়। কিন্তু ইসলামে জেহাদের বড় তাৎপর্য হলো নিজের আত্মশুদ্ধিকল্পে প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা। নিজের মাঝে মনুষ্যত্বের গুণাবলির উৎকর্ষতা বিকশিত করা। আদর্শ ও ভালোবাসা সৃষ্টি এবং যুক্তির মাধ্যমে অপরকে দীক্ষিত করার প্রচেষ্টা করা। ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার শিক্ষা নেই। আল্লাহতায়ালা বলেন- তুমি মন্দকে সর্বোৎকৃষ্ট আচরণ দ্বারা প্রতিহত কর। তাহলে দেখবে যার সঙ্গে আজ তোমার শত্রুতা রয়েছে সে তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধু হয়ে যাবে। (সুরা হামীম আস সাজদা : ৩৫)

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার উক্ত ঘটনার পরপরই আহমদীয়া মুসলিম জামাতের পক্ষ থেকে আহমদ তবশীর চৌধুরী স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে মূল বিষয়টি দেশবাসীকে অবগত করা হয়। প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়- “১৪ জানুয়ারি ২০২০ মাগরিবের নামাযের পর একদল উগ্র-ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক শক্তি ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরস্থ কান্দিপাড়ায় অবস্থিত আহমদিয়া মুসলিম জামাতের মসজিদ ‘মসজিদ বায়তুল ওয়াহেদ’-এ হামলা চালায়। ‘কাদিয়ানিরা মাদরাসার ছাত্রদের পিটিয়েছে’ এমন মিথ্যা গুজব ছড়িয়ে আক্রমণকারীরা লোকজনকে উত্তেজিত করে এবং আক্রমণ চালায়। তাদের ইটপাটকেলের আঘাতে তিনতলা মসজিদের কাঁচের জানালাগুলো ভেঙে চুরমার হয়ে যায় এবং লোহার গেট ভেঙে মসজিদ প্রাঙ্গণে ঢোকার চেষ্টা করে। তারা পার্শ্ববর্তী বাড়িতে রাখা আহমদিয়া মুসলিম জামাতের মাইক্রোবাস (ঢাকা মেট্রো-চ-১৬-১৮৭৭) ভাঙচুর করে। আক্রমণকারীরা আশেপাশে আহমদিদের বাড়িঘরেও হামলা চালায়।

আক্রমণের সংবাদ পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত পরিস্থিতি উত্তপ্ত রয়েছে এবং ওরা আবারও মিথ্যা গুজব ছড়িয়ে সংঘবদ্ধ আক্রমণের পরিকল্পনা করছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। এরা বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় এখনও গুজব ছড়াচ্ছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, উগ্র-ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক শক্তি ইতিপূর্বে গুজব ছড়িয়ে খুলনায় আহমদিয়া মসজিদে, রামুর বৌদ্ধ মন্দিরে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরপুরে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ওপর এবং কিছুদিন আগে ভোলোার বোরহানুদ্দিনে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সৃষ্টি করে। এখানে এও উল্লেখ্য যে, ১৯৮৭ সালে এভাবে মিথ্যা গুজব ছড়িয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের পুরনো আহমদিয়া মসজিদটি সাম্প্রদায়িক শক্তি বলপূর্বক দখল করে নেয় এবং এখন পর্যন্ত তারা সেটি অবৈধভাবে দখল করে রেখেছে। আজকের এই আক্রমণ সেখান থেকেই পরিচালনা করা হয়েছে। আমরা আহমদিয়া মুসলিম জামাতের সদস্যগণ শান্তিপ্রিয় এবং দেশের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নাগরিক। আমরা কখনোই আইন নিজের হাতে তুলে নেই না। আমরা এ ধরনের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করছি এবং গুজব-সৃষ্টিকারী দুর্বৃত্তদের আইনের আওতায় এনে আমাদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সরকার ও প্রশাসনের কাছে আবেদন জানাচ্ছি।”

যারা ধর্মের নামে এসব গর্হিত কাজে লিপ্ত তারা কখনো শান্তির ধর্ম ইসলামের অনুসারী হতে পারে না। এর পূর্বে আমরা দেখেছি ধর্ম অবমাননার কথা বলে বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা। ধর্মের নামে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ কখনও ইসলাম সমর্থন করে না। আজ যারা বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠনের নামে দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করছে এবং বড় ধরনের নাশকতার চিন্তা-ভাবনা করছে তাদের বলতে চাই, মহানবী (সা.)-এর মর্যাদা কি জ্বালাও-পোড়াও করে অর্জিত হবে, নাকি মহানবী (সা.)-এর উত্তম আদর্শ স্থাপন করার মাধ্যমে অর্জিত হবে?

একটি মিথ্যা অপপ্রচার বা গুজব কত সহজেই যে জনগণের কোন কোন অংশকে উত্তেজিত করে ভয়ংকর কা- তথা লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ ঘটিয়ে দেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগাতে পারে তার অসংখ্য দৃষ্টান্ত আমাদের দেশেই রয়েছে। যেমন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্ম অবমাননার গুজব ছড়িয়ে ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে কক্সবাজার জেলার রামুতে হামলা চালিয়ে লুটপাটসহ ১২টি বৌদ্ধমন্দির ও ৩০টি বাড়িতে আগুন দেয়া হয়। ২০১৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে রসরাজ নামে এক মৎস্যজীবীর বিরুদ্ধে একই অভিযোগ এনে লোকজনকে খেপিয়ে তুলে ঘরবাড়ি ও মন্দিরে হামলা চালানো হয়। গত ২০ অক্টোবর ভোলোর বোরহানউদ্দিনে ঘটে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে সেখানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এক যুবকের বিচারের দাবিতে ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে বিক্ষোভ থেকে পুলিশের সঙ্গে এলাকাবাসীর ব্যাপক সংঘর্ষ বাধে।

আমাদের আবেদন, সরকার-প্রশাসন দৃঢ়ভাবে এদের সব ধরণের অপচেষ্টার মূল উৎপাটন করবেন, দেশের সচেতন ও বিবেকবান জনগণ এদের মিথ্যা ফাঁদে পা দিবেন না। আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন লাখো শহীদের রক্তস্নাত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশকে পাকিস্তানের মতো একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র বানানোর দুরভিসন্ধি থেকে রক্ষা করুন।

[লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট]

abu.afia2016@gmail.com