গণতন্ত্র ও মানবাধিকার : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরস্পরে ঘনিষ্ঠ ও একে অপরের পরিপূরক। এটি বিশ^জনীন রাজনৈতিক একটি পরিভাষা যেটি জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত। মূলত গণতন্ত্রের প্রধানতম লক্ষ্যই হচ্ছে মানবাধিকার। তাই মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ব্যতিত প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাও অসম্ভব। সভ্যতার আদিলগ্ন থেকেই প্রতিটি মানুষের নৈমত্তিক অধিকার ও উন্নয়নের কথা চিন্তা করা হয়েছে। ক্রমান্বয়ে মানুষ বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার মাধ্যমে অধিকার সম্পর্কে অধিক সচেতন হয়ে উঠেছে। এ জন্য মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে মানুষ সর্বদা সোচ্চার থেকেছেন। যার অন্যতম বিরল দৃষ্টান্ত হলো মদিনা সনদ। দার্শনিক রুশো, ভিক্টর হুগো, কার্ল মার্কস, জন লক প্রমুখ মনীষীদের রচনাতেও বারবার মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার ধারণা প্রতিফলিত হয়েছে। পৃথিবীতে যখনই মানবাধিকারের প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করা হয়েছে; তখনই সংগঠিত হয়েছে নানা ধরনের বিপ্লব ও যুদ্ধ-বিগ্রহ। যার উৎকৃষ্ট উদাহরণ ইংল্যান্ডের মহাসনদ ও বিপ্লব, ফরাসি বিপ্লব, রুশ বিপ্লব এবং দু-দুটি বিশ্বযুদ্ধ। বর্তমান বিশ্বপরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠার নেপথ্যেও রয়েছে এই মানবাধিকার ও গণতন্ত্র সমুন্নত না থাকা। ফিলিস্তিন সংকট থেকে শুরু করে, মধ্যপ্রাচ্যের বিশাল ভূখণ্ডে নানা অসঙ্গতি ও অশুভ রাজনীতির দাবানলে মানবাধিকারহীন অগণতান্ত্রিক সমাজ কায়েম হয়েছে।

হ্যারিংটন বলেছেন, যাদের কর্তৃত্বে রয়েছে সম্পত্তি তারাই আজ শাসন করছে। আজ সর্বক্ষেত্রে গরিবের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে পুঁজিবাদীদের সব সুবিধা দেয়া হচ্ছে। ফলে বৈষম্যপূর্ণ সমাজ গড়ে উঠার পাশাপাশি সৃষ্টি হচ্ছে অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। অথচ গ্রিক, রোমান ও ইসলামী সভ্যতায় গণতন্ত্র হয়ে উঠেছিল বিশ্বমানবতার অমূল্য সম্পদ। গ্রিক সভ্যতায় জনগণকে গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট করে ব্যক্তি স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছিল। রোমানদের রাজনৈতিক মতাদর্শ থেকে এসেছে আইনের প্রাধান্য, জনগণের স্বাতন্ত্র্য এবং অধিকার সংরক্ষণের প্রত্যয়। ইসলামী সভ্যতার অন্যতম কৃতিত্ব ছিল জনগণের প্রতি শাসকদের দায়িত্ববোধ এবং ন্যায়পরায়ণতা। কিন্তু ক্রমান্বয়ে ব্যক্তির সহজাত অধিকার ক্ষুণ্ণ করে গড়ে উঠছে মানবাধিকারহীন বিশ্ব।

জনকল্যাণমূলক একটি আধুনিক রাষ্ট্রের প্রাণশক্তি হচ্ছে মানবাধিকার ও গণতন্ত্র। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের ৪৯ বছর অতিক্রম হয়ে গেলেও গণতন্ত্র ও মানবাধিকারকে প্রতিষ্ঠিত হতে দেখা যায়নি। অথচ এদেশে স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয়েছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন থেকে। এদেশের মানুষ বিভিন্ন ধরনের গণতন্ত্রের সঙ্গে পরিচিত। রাজা গোপালের নির্বাচন, ব্রিটিশ পদ্ধতির গণতন্ত্র, আইয়ুব খানের বুনিয়াদি গণতন্ত্র, একদলীয় গণতন্ত্র, এরশাদের সামরিক অংশীদারিত্বের গণতন্ত্র এবং সর্বশেষ সামন্ততান্ত্রিক গণতন্ত্র। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হলো আমরা কখনই কাক্সিক্ষত গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের স্বাদ গ্রহণ করতে পারিনি। আমাদের জাতীয় সংবিধানের ১১ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চিয়তা থাকিবে, মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হইবে এবং প্রশাসনের সব পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হইবে।’ কিন্তু সংবিধানটির কার্যকারিতা শুধু কাগজেই রয়ে গেল কিনা সেটিই এখন বিবেচনার বিষয়।

রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে প্রত্যেকের রয়েছে স্বাধীনভাবে চিন্তার ও মতপ্রকাশের অধিকার, স্বাধীনভাবে ধর্মচর্চা ও ভোট প্রদানের অধিকার। প্রতিটি মানুষই চাই তার মৌলিক অধিকার ও সামাজিক নিরাপত্তা। তারা চাই নিরপেক্ষভাবে বিচারকার্য ও প্রকৃতই আইনের শাসন। কিন্তু এসব গণতান্ত্রিক চেতনা নির্ভর করে একশ্রেণীর রাজনীতিকদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার উপরে। তারা জনগণের অধিকার নিশ্চিত ও জাতীয় স্বার্থে কাজ করার থেকে বিরোধী দল দমনে ব্যস্ত থাকেন। শাসনতান্ত্রিক উপায়ে বিরোধিতা করার চেয়ে হিংসাত্মক পন্থাকে পছন্দ করেন। অপর পক্ষের কথা শুনে বিবেচনা করে তা গ্রহণ বর্জন গণতন্ত্রের রীতি। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যে দলই আসুক না কেন, অপরের পরামর্শ তাদের পছন্দ হয় না। আমরা অপর পক্ষের সমালোচনা ও মতামতকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের সর্বেসর্বা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই। এদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সরকার এবং বিরোধী দলের মধ্যকার দ্বন্দ্ব সর্বদা বিরাজমান। এভাবে কোন সভ্য ও গণতান্ত্রিক সমাজ চলতে পারে না।

রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের দ্বারা সৃষ্ট প্রতিহিংসামূলক রাজনৈতিক বিভাজন সাধারণ জনতাকে করেছে ক্ষুব্ধ ও বীতশ্রদ্ধ। আমরা মানুষকে মানুষ হিসেবে গণ্য করার পূর্বে কয়েকটি ভাগে বিভাজিত করে ফেলি। তিনি কোন সম্প্রদায়ের ও মতাদর্শে বিশ^াসী, কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ইত্যাদি। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে জাতিকে এভাবে বিভাজিত করে কাক্সিক্ষত জাতীয় স্বার্থ অর্জন করা অসম্ভব। অমর্ত্য সেন দেখিয়েছেন যে, মানবজাতিকে ধর্ম, সম্প্রদায়, সংস্কৃতি, জাতীয়তা এবং সভ্যতার ভিত্তিতে চিহ্নিত করে নির্মমভাবে বিভাজিত করার যে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা, তা একাবিংশ শতাব্দীতে বিশ^ মানবতার জন্য অন্যতম হুমকি। বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত সৌহার্দ্য বজায় থাকলেও জাতীয়তা ও ধর্মীয় বৈসাদৃশ্য উপস্থিত রয়েছে।

অ্যারিস্টটলের মতে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সার্বভৌম ক্ষমতা সমগ্র জনগণের ওপর ন্যস্ত থাকে। কিন্তু এদেশের জাতীয় রাজনীতিতে জনগণের অংশগ্রহণ অত্যন্ত সীমিত। দ্য ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) সর্বশেষ গণতন্ত্র সূচকে (২০১৯ সালের) ‘নির্বাচন ব্যবস্থা ও বহুদলীয় পরিস্থিতি, সরকারে সক্রিয়তা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং নাগরিক অধিকার- এ পাঁচটি মানদণ্ডে তৈরি বিশ^ গণতন্ত্র সূচকে ১৬৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮০তম। তবে এ সূচকে গতবারের চেয়ে আট ধাপ উন্নতি ঘটেছে। কিন্তু জনস্বার্থ ও জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতাকে যেভাবে পণ্যে পরিণত করা হয়েছে, তাতে কতিপয় স্বার্থান্বেষীদের কাছে বন্দী হয়ে পড়ছে সাধারণ জনগণ।

উন্নত রাষ্ট্রে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নেতৃবৃন্দরা সর্বদা সোচ্চার থাকেন। তাদের নেতৃত্বে পরিবর্তন আসলেও জাতীয় স্বার্থে সবাই এক ও অভিন্ন। কিন্তু অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের অনেক নেতৃবৃন্দ চাতুর্যতার আশ্রয় নিয়ে ক্ষমতার মসনদে থাকার জন্য গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে চরমভাবে অবজ্ঞা করে বসেন। এমনকি অনেকের কার্যক্রমে স্বৈরাচারী আচরণ ফুটে উঠে। অথচ ক্ষমতা আঁকড়ে ধরার সঙ্গে গণতন্ত্রের কোন সম্পর্ক নেই। যতক্ষণ পর্যন্ত ‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড় এবং দলের চেয়ে জাতি বড়’ মনোভাব লালন করা সম্ভব না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব। কিন্তু এদেশে ‘জাতির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে ব্যক্তি বড় এবং ব্যক্তির চেয়ে অর্থ বড়’ মতাদর্শের মানুষই সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। এমনকি আমরা রাজনীতিতে অসৎ ও দুর্নীতিবাজদের আশ্রয় দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব অর্পণ করেছি। এজন্য এখানে আইনের শাসন ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা দ্য ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্ট (ডাব্লিউজেপি) ‘আইনের শাসন সূচক ২০২০’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুসারে, বৈশি^ক আইনের সূচকে ১২৮টি দেশের মধ্যে এবার ১১৫তম অবস্থান পেয়েছে বাংলাদেশ। গত বছর ১২৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ছিল ১১২তম। তাই রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকে সন্ত্রাসীদের বিতাড়িত করতে হবে নতুবা তাসের ঘরের মতো গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকারের স্বপ্ন ভেঙে পড়বে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দলিলসমূহে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের যে বহুবিধ ধরন চিহ্নিত হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো হত্যা, নির্যাতন এবং প্রকাশ্যে ও নিরপেক্ষ বিচার প্রক্রিয়ায় অস্বীকৃতি এবং গুপ্ত হত্যা। সুশাসনের অভাবে অনিয়ম-দুর্নীতি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিষবাষ্পের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। সারা দেশে প্রতিনিয়ত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, সন্ত্রাস, গুম, ধর্ষণ ও গুপ্তহত্যা যেন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। বন্দুকযুদ্ধে হতাহত হওয়া আর নারী নির্যাতন নিত্যনৈমিত্তিক খবরের শিরোনাম হয়ে আসছে। এতে সর্বমহলে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজমান। নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন সাধারণ মানুষ। এদেশের রাজনীতি এক সর্বগ্রাসী দখলদারিত্বের কবলে পড়েছে। কল্যাণমুখী রাজনীতির থেকে ক্ষমতা দখলের রাজনীতিতে মনযোগী তারা। ক্ষমতায় যিনি যেতে পারলেন না, তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। আমরা কেউ পরাজয় মেনে নিতে পারি না। অন্যের প্রতি আস্থা গ্রহণ তো দূরের কথা নিজের প্রতিও আস্থাবান নয় আমরা। এ দেশের পিঠ দেয়ালে ঠেকেছে, মোড় ঘোরানো এখন সময়ের দাবি। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, মানুষের জন্য রাষ্ট্র ও রাজনীতি, রাষ্ট্র আর রাজনীতির জন্য মানুষ নয়। গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যই লক্ষাধিক প্রাণোৎসর্গের বিনিময়ে আজকের বাংলাদেশ।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকে আমাদের যেমন ঊর্ধ্বমুখী অবস্থান, তার ধারাবাহিকতা গণতন্ত্র ও মানবাধিকারেও বজায় রাখতে হবে। জাতীয় জীবনে কাক্সিক্ষত উন্নয়ন ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে সত্যিকারের রাজনীতিক ও দেশপ্রেমিকদের হাতে জনগণের দায়িত্ব অর্পণ করতে হবে। যারা মানবিক অধিকার রক্ষা ও গণতন্ত্রের স্বপ্নে বিভোর থাকবেন। রাজনীতিকরা যদি জনগণের স্বপ্নের সহযোদ্ধা হন, তাহলে গণতন্ত্রের মূলধারায় ফিরে আসা কঠিন হলেও অসম্ভব নয়।

[লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়]

ashikuriu22@gmail.com

বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ , ১৩ মহররম ১৪৪২, ১৭ ভাদ্র ১৪২৭

গণতন্ত্র ও মানবাধিকার : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

মো. আশিকুর রহমান

গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরস্পরে ঘনিষ্ঠ ও একে অপরের পরিপূরক। এটি বিশ^জনীন রাজনৈতিক একটি পরিভাষা যেটি জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত। মূলত গণতন্ত্রের প্রধানতম লক্ষ্যই হচ্ছে মানবাধিকার। তাই মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ব্যতিত প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাও অসম্ভব। সভ্যতার আদিলগ্ন থেকেই প্রতিটি মানুষের নৈমত্তিক অধিকার ও উন্নয়নের কথা চিন্তা করা হয়েছে। ক্রমান্বয়ে মানুষ বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার মাধ্যমে অধিকার সম্পর্কে অধিক সচেতন হয়ে উঠেছে। এ জন্য মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে মানুষ সর্বদা সোচ্চার থেকেছেন। যার অন্যতম বিরল দৃষ্টান্ত হলো মদিনা সনদ। দার্শনিক রুশো, ভিক্টর হুগো, কার্ল মার্কস, জন লক প্রমুখ মনীষীদের রচনাতেও বারবার মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার ধারণা প্রতিফলিত হয়েছে। পৃথিবীতে যখনই মানবাধিকারের প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করা হয়েছে; তখনই সংগঠিত হয়েছে নানা ধরনের বিপ্লব ও যুদ্ধ-বিগ্রহ। যার উৎকৃষ্ট উদাহরণ ইংল্যান্ডের মহাসনদ ও বিপ্লব, ফরাসি বিপ্লব, রুশ বিপ্লব এবং দু-দুটি বিশ্বযুদ্ধ। বর্তমান বিশ্বপরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠার নেপথ্যেও রয়েছে এই মানবাধিকার ও গণতন্ত্র সমুন্নত না থাকা। ফিলিস্তিন সংকট থেকে শুরু করে, মধ্যপ্রাচ্যের বিশাল ভূখণ্ডে নানা অসঙ্গতি ও অশুভ রাজনীতির দাবানলে মানবাধিকারহীন অগণতান্ত্রিক সমাজ কায়েম হয়েছে।

হ্যারিংটন বলেছেন, যাদের কর্তৃত্বে রয়েছে সম্পত্তি তারাই আজ শাসন করছে। আজ সর্বক্ষেত্রে গরিবের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে পুঁজিবাদীদের সব সুবিধা দেয়া হচ্ছে। ফলে বৈষম্যপূর্ণ সমাজ গড়ে উঠার পাশাপাশি সৃষ্টি হচ্ছে অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। অথচ গ্রিক, রোমান ও ইসলামী সভ্যতায় গণতন্ত্র হয়ে উঠেছিল বিশ্বমানবতার অমূল্য সম্পদ। গ্রিক সভ্যতায় জনগণকে গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট করে ব্যক্তি স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছিল। রোমানদের রাজনৈতিক মতাদর্শ থেকে এসেছে আইনের প্রাধান্য, জনগণের স্বাতন্ত্র্য এবং অধিকার সংরক্ষণের প্রত্যয়। ইসলামী সভ্যতার অন্যতম কৃতিত্ব ছিল জনগণের প্রতি শাসকদের দায়িত্ববোধ এবং ন্যায়পরায়ণতা। কিন্তু ক্রমান্বয়ে ব্যক্তির সহজাত অধিকার ক্ষুণ্ণ করে গড়ে উঠছে মানবাধিকারহীন বিশ্ব।

জনকল্যাণমূলক একটি আধুনিক রাষ্ট্রের প্রাণশক্তি হচ্ছে মানবাধিকার ও গণতন্ত্র। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের ৪৯ বছর অতিক্রম হয়ে গেলেও গণতন্ত্র ও মানবাধিকারকে প্রতিষ্ঠিত হতে দেখা যায়নি। অথচ এদেশে স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয়েছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন থেকে। এদেশের মানুষ বিভিন্ন ধরনের গণতন্ত্রের সঙ্গে পরিচিত। রাজা গোপালের নির্বাচন, ব্রিটিশ পদ্ধতির গণতন্ত্র, আইয়ুব খানের বুনিয়াদি গণতন্ত্র, একদলীয় গণতন্ত্র, এরশাদের সামরিক অংশীদারিত্বের গণতন্ত্র এবং সর্বশেষ সামন্ততান্ত্রিক গণতন্ত্র। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হলো আমরা কখনই কাক্সিক্ষত গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের স্বাদ গ্রহণ করতে পারিনি। আমাদের জাতীয় সংবিধানের ১১ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র, যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চিয়তা থাকিবে, মানবসত্তার মর্যাদা ও মূল্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিশ্চিত হইবে এবং প্রশাসনের সব পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হইবে।’ কিন্তু সংবিধানটির কার্যকারিতা শুধু কাগজেই রয়ে গেল কিনা সেটিই এখন বিবেচনার বিষয়।

রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে প্রত্যেকের রয়েছে স্বাধীনভাবে চিন্তার ও মতপ্রকাশের অধিকার, স্বাধীনভাবে ধর্মচর্চা ও ভোট প্রদানের অধিকার। প্রতিটি মানুষই চাই তার মৌলিক অধিকার ও সামাজিক নিরাপত্তা। তারা চাই নিরপেক্ষভাবে বিচারকার্য ও প্রকৃতই আইনের শাসন। কিন্তু এসব গণতান্ত্রিক চেতনা নির্ভর করে একশ্রেণীর রাজনীতিকদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার উপরে। তারা জনগণের অধিকার নিশ্চিত ও জাতীয় স্বার্থে কাজ করার থেকে বিরোধী দল দমনে ব্যস্ত থাকেন। শাসনতান্ত্রিক উপায়ে বিরোধিতা করার চেয়ে হিংসাত্মক পন্থাকে পছন্দ করেন। অপর পক্ষের কথা শুনে বিবেচনা করে তা গ্রহণ বর্জন গণতন্ত্রের রীতি। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যে দলই আসুক না কেন, অপরের পরামর্শ তাদের পছন্দ হয় না। আমরা অপর পক্ষের সমালোচনা ও মতামতকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে নিজেদের সর্বেসর্বা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই। এদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সরকার এবং বিরোধী দলের মধ্যকার দ্বন্দ্ব সর্বদা বিরাজমান। এভাবে কোন সভ্য ও গণতান্ত্রিক সমাজ চলতে পারে না।

রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের দ্বারা সৃষ্ট প্রতিহিংসামূলক রাজনৈতিক বিভাজন সাধারণ জনতাকে করেছে ক্ষুব্ধ ও বীতশ্রদ্ধ। আমরা মানুষকে মানুষ হিসেবে গণ্য করার পূর্বে কয়েকটি ভাগে বিভাজিত করে ফেলি। তিনি কোন সম্প্রদায়ের ও মতাদর্শে বিশ^াসী, কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ইত্যাদি। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে জাতিকে এভাবে বিভাজিত করে কাক্সিক্ষত জাতীয় স্বার্থ অর্জন করা অসম্ভব। অমর্ত্য সেন দেখিয়েছেন যে, মানবজাতিকে ধর্ম, সম্প্রদায়, সংস্কৃতি, জাতীয়তা এবং সভ্যতার ভিত্তিতে চিহ্নিত করে নির্মমভাবে বিভাজিত করার যে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা, তা একাবিংশ শতাব্দীতে বিশ^ মানবতার জন্য অন্যতম হুমকি। বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক ও জাতিগত সৌহার্দ্য বজায় থাকলেও জাতীয়তা ও ধর্মীয় বৈসাদৃশ্য উপস্থিত রয়েছে।

অ্যারিস্টটলের মতে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সার্বভৌম ক্ষমতা সমগ্র জনগণের ওপর ন্যস্ত থাকে। কিন্তু এদেশের জাতীয় রাজনীতিতে জনগণের অংশগ্রহণ অত্যন্ত সীমিত। দ্য ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) সর্বশেষ গণতন্ত্র সূচকে (২০১৯ সালের) ‘নির্বাচন ব্যবস্থা ও বহুদলীয় পরিস্থিতি, সরকারে সক্রিয়তা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং নাগরিক অধিকার- এ পাঁচটি মানদণ্ডে তৈরি বিশ^ গণতন্ত্র সূচকে ১৬৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮০তম। তবে এ সূচকে গতবারের চেয়ে আট ধাপ উন্নতি ঘটেছে। কিন্তু জনস্বার্থ ও জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতাকে যেভাবে পণ্যে পরিণত করা হয়েছে, তাতে কতিপয় স্বার্থান্বেষীদের কাছে বন্দী হয়ে পড়ছে সাধারণ জনগণ।

উন্নত রাষ্ট্রে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নেতৃবৃন্দরা সর্বদা সোচ্চার থাকেন। তাদের নেতৃত্বে পরিবর্তন আসলেও জাতীয় স্বার্থে সবাই এক ও অভিন্ন। কিন্তু অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের অনেক নেতৃবৃন্দ চাতুর্যতার আশ্রয় নিয়ে ক্ষমতার মসনদে থাকার জন্য গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে চরমভাবে অবজ্ঞা করে বসেন। এমনকি অনেকের কার্যক্রমে স্বৈরাচারী আচরণ ফুটে উঠে। অথচ ক্ষমতা আঁকড়ে ধরার সঙ্গে গণতন্ত্রের কোন সম্পর্ক নেই। যতক্ষণ পর্যন্ত ‘ব্যক্তির চেয়ে দল বড় এবং দলের চেয়ে জাতি বড়’ মনোভাব লালন করা সম্ভব না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব। কিন্তু এদেশে ‘জাতির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে ব্যক্তি বড় এবং ব্যক্তির চেয়ে অর্থ বড়’ মতাদর্শের মানুষই সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। এমনকি আমরা রাজনীতিতে অসৎ ও দুর্নীতিবাজদের আশ্রয় দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব অর্পণ করেছি। এজন্য এখানে আইনের শাসন ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা দ্য ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্ট (ডাব্লিউজেপি) ‘আইনের শাসন সূচক ২০২০’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুসারে, বৈশি^ক আইনের সূচকে ১২৮টি দেশের মধ্যে এবার ১১৫তম অবস্থান পেয়েছে বাংলাদেশ। গত বছর ১২৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ছিল ১১২তম। তাই রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকে সন্ত্রাসীদের বিতাড়িত করতে হবে নতুবা তাসের ঘরের মতো গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকারের স্বপ্ন ভেঙে পড়বে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দলিলসমূহে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের যে বহুবিধ ধরন চিহ্নিত হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো হত্যা, নির্যাতন এবং প্রকাশ্যে ও নিরপেক্ষ বিচার প্রক্রিয়ায় অস্বীকৃতি এবং গুপ্ত হত্যা। সুশাসনের অভাবে অনিয়ম-দুর্নীতি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিষবাষ্পের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। সারা দেশে প্রতিনিয়ত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, সন্ত্রাস, গুম, ধর্ষণ ও গুপ্তহত্যা যেন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। বন্দুকযুদ্ধে হতাহত হওয়া আর নারী নির্যাতন নিত্যনৈমিত্তিক খবরের শিরোনাম হয়ে আসছে। এতে সর্বমহলে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজমান। নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন সাধারণ মানুষ। এদেশের রাজনীতি এক সর্বগ্রাসী দখলদারিত্বের কবলে পড়েছে। কল্যাণমুখী রাজনীতির থেকে ক্ষমতা দখলের রাজনীতিতে মনযোগী তারা। ক্ষমতায় যিনি যেতে পারলেন না, তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। আমরা কেউ পরাজয় মেনে নিতে পারি না। অন্যের প্রতি আস্থা গ্রহণ তো দূরের কথা নিজের প্রতিও আস্থাবান নয় আমরা। এ দেশের পিঠ দেয়ালে ঠেকেছে, মোড় ঘোরানো এখন সময়ের দাবি। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, মানুষের জন্য রাষ্ট্র ও রাজনীতি, রাষ্ট্র আর রাজনীতির জন্য মানুষ নয়। গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যই লক্ষাধিক প্রাণোৎসর্গের বিনিময়ে আজকের বাংলাদেশ।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকে আমাদের যেমন ঊর্ধ্বমুখী অবস্থান, তার ধারাবাহিকতা গণতন্ত্র ও মানবাধিকারেও বজায় রাখতে হবে। জাতীয় জীবনে কাক্সিক্ষত উন্নয়ন ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে সত্যিকারের রাজনীতিক ও দেশপ্রেমিকদের হাতে জনগণের দায়িত্ব অর্পণ করতে হবে। যারা মানবিক অধিকার রক্ষা ও গণতন্ত্রের স্বপ্নে বিভোর থাকবেন। রাজনীতিকরা যদি জনগণের স্বপ্নের সহযোদ্ধা হন, তাহলে গণতন্ত্রের মূলধারায় ফিরে আসা কঠিন হলেও অসম্ভব নয়।

[লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়]

ashikuriu22@gmail.com