বাঙালির ভাষা রাষ্ট্রের পিতা : শেখ মুজিব ও বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয় ১৯৫২ সালের জানুয়ারি মাস থেকে। ২৬ জানুয়ারি মুসলিম লীগের কাউন্সিল অধিবেশন উপলক্ষে পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত জনসভায় খাজা নাজিমুদ্দিন বক্তৃতা করেন। উক্ত জনসভায় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মতো তিনিও ঘোষণা করেন, ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’। তার এ ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় ১৯৪৮ সালের চাইতেও ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয়। খাজা নাজিমুদ্দিনের ঘোষণায় জেলের অভ্যন্তরে তরুণ রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়। উল্লেখ্য যে, শেখ মুজিবুর রহমান এবং মহিউদ্দিন আহমদ তখন ঢাকা জেলে বন্দী ছিলেন।

১৯৪৯ সালের মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্থ শ্রেণী কর্মচারীদের ধর্মঘটকে সমর্থন করায় শেখ মুজিবসহ ২৭ শিক্ষার্থীর ওপর বহিষ্কারাদেশসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়। শেখ মুজিব তখন আইনের ছাত্র। তার শাস্তি হয় মুচলেকা এবং ১৫ টাকা জরিমানা, না হয় চূড়ান্ত বহিষ্কার। শেখ মুজিব মুচলেকা দেননি, তাই বহিষ্কার এবং ছাত্রজীবন শেষ। এ সময়ের উল্লেখযোগ্য ঘটনার মধ্যে ছিল ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম। ১৯৪৯ সালের ১৫ অক্টোবর খাদ্যের দাবিতে ভুখা মিছিলে নেতৃত্ব দানের সময় শেখ মুজিব বন্দী হন এবং মুক্ত হন ২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সালে। তবে এ সময় তার মুক্তির দাবিতে পোস্টার, স্লোগান, লিফলেট, স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। ১৯৫২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি সাপ্তাহিক ইত্তেফাকে (তখনও দৈনিক হয়নি) ‘কারাগারে আটক শেখ মুজিবুর রহমান’ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন রয়েছে।

সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনায় এটি স্পষ্টতই বোঝা যায় যে, ৪৯ থেকে ৫২ সাল পর্যন্ত সময়টিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কারাবন্দী থাকায় গণতান্ত্রিক বা স্বাভাবিক রাজনীতি করার কোন সুযোগ ছিল না। তিনি যদি মুক্ত থাকতেন তবে শুধু ছাত্রলীগ-আওয়ামী লীগের সম্প্রসারণই নয় পুরো পূর্ব বাংলার রাজনীতি ভিন্ন মাত্রা পেতো। তবুও সেই সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে বঙ্গবন্ধু রাজনীতির একটি বিকল্প ধারা গড়ে তুলেন।

মহিউদ্দিন আহমেদ এর ভাষ্যমতে তারা উভয়ে যুক্তি করে ঠিক করলেন ‘মুজিব অসুস্থতার ভান করে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হবেন। সেভাবেই মুজিবকে ডাক্তারের সাহায্যে মেডিকেল কলেজে ভর্তি করাতে সক্ষম হলাম। ভাষা আন্দোলনকে তীব্র গতিশীল করার উদ্দেশ্যেই এই পন্থা অবলম্বন করেছিলেন। এবং পরবর্তীতে আন্দোলনে তার প্রতিফলন লক্ষণীয়। ঢাকা জেলে ৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ ‘বন্দি অবস্থা থেকে শামসুল হক চৌধুরী, আবদুস সামাদ আজাদ ও ড. গোলাম মাওলার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু ২১ ফেব্রুয়ারি হরতাল ডেকে অ্যাসেম্বলি ঘেরাও কর্মসূচি গ্রহণের পরামর্শ দান করেন। পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়। ‘সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ছাত্রছাত্রীরা মিছিল করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সমবেত হওয়ার পর এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে প্রায় ৫ হাজার ছাত্রছাত্রীর এক সুদীর্ঘ মিছিল বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে করতে সারা শহর প্রদক্ষিণ করে। সভায় জননেতা মাওলানা ভাসানী, আবুল হাশিম ও অন্যান্য রাজনৈতিক ও ছাত্রনেতারা লীগ সরকারের জঘণ্য বিশ্বাসঘাতকতার তীব্র নিন্দা করেন এবং বাংলা ভাষার দাবি প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত অবিরাম সংগ্রাম চালাবার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। সে দিনই ২১ ফেব্রুয়ারি অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সারা প্রদেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘটের আহ্বান দেয়া হয়।’ একুশে ফেব্রুয়ারি প্রদেশব্যাপী আহূত ধর্মঘট সফল করার জন্য তখন রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের যার যার অবস্থান থেকে কর্মসূচি প্রণয়ন ও গ্রহণ করতে হয়েছিল। ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন শেখ মুজিবকে আবার জেলে পাঠানো হলো। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা’ ও ‘বন্দি মুক্তি’র দাবিতে ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে শেখ মুজিবুর রহমান এবং মহিউদ্দিন আহমদ কারাগারের অভ্যন্তরে আমরণ অনশন ধর্মঘট শুরু করেন। চারদিকে বিষয়টি জানাজানি হতে থাকে। বাইরে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে থাকে থাকে। ১৮ ফেব্রুয়ারি তাদের ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ফরিদপুর জেলে পাঠানো হয়। নারায়ণগঞ্জ স্টিমার ঘাটে তাদের সঙ্গে দেখা হয়েছিল শামসুদ্দোহাসহ কয়েকজন ছাত্রনেতার। শেখ মুজিব ‘অনুরোধ করে গেলেন যেন একুশে ফেব্রুয়ারিতে হরতাল মিছিল শেষে আইনসভা ঘেরাও করে বাংলা ভাষার সমর্থনে সদস্যদের স্বাক্ষর আদায় করা হয়।’ এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, শেখ মুজিবের অনশন শুরু এবং ভঙ্গের তারিখ নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। বিভ্রান্তির কারণগুলো, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের প্রচারপত্রে এবং সংবাদপত্রে প্রচার করা হয় যে, শেখ মুজিব এবং মহিউদ্দিন আহমদ ১৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২ থেকে অনশনে গেছেন। প্রচারিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম এবং শেখ মুজিবের ওপর এ পর্যন্ত প্রকাশিত গ্রন্থ ও প্রবন্ধে অনশন শুরুর তারিখ ১৬ ফেব্রুয়ারি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ শ্রেণীভুক্ত সরকারি গোপন দলিল থেকে জানা যায়, শেখ মুজিব ও মহিউদ্দিন আহমেদকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে (১৫ ফেব্রুয়াারি ১৯৫২) ফরিদপুর জেলে (১৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২) স্থানান্তরিত করা হয়। ফলে ১৬ ফেব্রুয়ারি পরিবর্তে ১৮ ফেব্রুয়ারি সেখানে তারা অনশন শুরু করেন। ২৫ ফেব্রুয়ারি বিকেল বেলা তারা অনশন ভঙ্গ করেন। ২৭ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিব মুক্তি পান। মহিউদ্দিন আহমদ মুক্তি পান ১ মার্চ, ১৯৫২।

ভাষাসৈনিক, প্রখ্যাত সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ‘একুশকে নিয়ে কিছু স্মৃতি, কিছু কথা’ প্রবন্ধে বলেছেন : শেখ মুজিব ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ১৬ তারিখ ফরিদপুর জেলে যাওয়ার আগে ও পরে ছাত্রলীগের একাধিক নেতার কাছে চিরকুট পাঠিয়েছেন।’ (তথ্যসূত্র : ভালোবাসি মাতৃভাষা- পৃষ্ঠা: ৬২)

জাতীয় নেতা শহীদ সোহরাওয়ার্দী ১৯৫২ সালের ভাষা-আন্দোলনে বিপক্ষে অবদান নিয়েছিলেন। তিনি উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে বিবৃতি দেন। সোহরাওয়ার্দী এই অবস্থানে দৃঢ় থাকলে ভাষা আন্দোলনে অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারত (সূত্র : একুশে ফেব্রুয়ারি থেকে আন্তর্জাতিক- ড মোহাম্মদ হান্নান, পৃ. ৫৩)। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান সোহরাওয়ার্দীর এই মত পরিবর্তনে সহায়ক ভূমিকা পালন করেন এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে তার সমর্থন আদায় করেন। এই প্রসঙ্গে তিনি নিজেই বলেন, ‘সে সময় শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ভাষা সংক্রান্ত বিবৃতি প্রকাশিত হওয়ার পর আমরা বেশ অসুবিধায় পড়ি। তাই ওই বছর জুন মাসে আমি তার সঙ্গে দেখা করার জন্য করাচি যাই এবং তার কাছে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বাংলার দাবির সমর্থনে তাকে একটি বিবৃতি দিতে বলি।’ (তথ্যসূত্র : পূর্ববাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি- ৩য় খণ্ড, বদরুদ্দীন উমর, পৃষ্ঠা-৩৯৬)।

১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন ঢাকা সফরকালে পল্টন ময়দানে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিলে পূর্ববঙ্গে প্রতিরোধের ঝড় ওঠে। বন্দি অবস্থাতেই শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ছাত্রনেতাদের আলোচনা হয় পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন : (খাজা নাজিমুদ্দীনের ঘোষণার পর) দেশের মধ্যে ভীষণ ক্ষোভের সৃষ্টি হলো। তখন একমাত্র রাজনৈতিক দল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ, ছাত্র প্রতিষ্ঠান ছাত্রলীগ এবং যুবাদের প্রতিষ্ঠান যুবলীগ সবাই এর তীব্র প্রতিবাদ করে। আমি হাসপাতালে আছি। সন্ধ্যায় মোহাম্মদ তোয়াহা ও অলি আহাদ দেখা করতে আসে। আমার কেবিনের একটা জানালা ছিল ওয়ার্ডের দিকে। আমি ওদের রাত ১টার পরে আসতে বললাম। আরও বললাম, খালেক নেওয়াজ, কাজী গোলাম মাহাবুব আরও কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতাকে খবর দিতে। দরজার বাইরে আইবিরা পাহারা দিত। রাতে অনেকে ঘুমিয়ে পড়েছে। তখন পেছনের বারান্দায় ওরা পাঁচ-সাতজন এসেছে। আমি অনেক রাতে একা হাঁটাচলা করতাম। রাতে কেউ আসে না বলে কেউ কিছু বলত না। পুলিশরা চুপচাপ পড়ে থাকে, কারণ জানে আমি ভাগব না। গোয়েন্দা কর্মচারী একপাশে বসে ঝিমায়। বারান্দায় বসে আলাপ হলো এবং আমি বললাম, সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন করতে। আওয়ামী লীগ নেতাদেরও খবর দিয়েছি। ছাত্রলীগই তখন ছাত্রদের মধ্যে একমাত্র জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠান। ছাত্রলীগ নেতারা রাজি হলো। অলি আহাদ ও তোয়াহা বলল, যুবলীগও রাজি হবে। আবার ষড়যন্ত্র চলছে বাংলা ভাষার দাবিকে নস্যাৎ করার। এখন প্রতিবাদ না করলে কেন্দ্রীয় আইনসভায় মুসলিম লীগ উর্দুর পক্ষে প্রস্তাব পাস করে নেবে। নাজিমুদ্দীন সাহেব উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার কথাই বলেন নাই, অনেক নতুন নতুন যুক্তিতর্ক দেখিয়েছেন। অলি আহাদ যদিও আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সদস্য হয় নাই, তবুও আমাকে ব্যক্তিগতভাবে খুবই শ্রদ্ধা করত ও ভালোবাসত। আরও বললাম, খবর পেয়েছি, আমাকে শিগগিরই আবার জেলে পাঠিয়ে দিবে, কারণ আমি নাকি হাসপাতালে বসে রাজনীতি করছি। তোমরা আগামীকাল রাতেও আবার এসো। আরও দু’একজন ছাত্রলীগ নেতাকে আসতে বললাম। শওকত মিয়া ও কয়েকজন আওয়ামী লীগ কর্মীকেও দেখা করতে বললাম। পরের দিন রাতে এক এক করে অনেকেই আসল। সেখানেই ঠিক হলো আগামী ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা দিবস পালন করা হবে এবং সভা করে সংগ্রাম পরিষদ গঠন করতে হবে। ছাত্রলীগের পক্ষ থেকেই রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের কনভেনর করতে হবে। ফেব্রুয়ারি থেকেই জনমত সৃষ্টি করা শুরু হবে। [পৃ. ১৯৬-৯৭]

ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জেল থেকে মুক্তি এবং অন্যান্য কর্মকাণ্ডের বেশ কিছু বিবরণ জানা যায় গোয়েন্দা পুলিশের রিপোর্টে। তেমন একটি সরকারি গোপন রিপোর্টে লেখা হয় Security prisoner Sk.Mujibur Rahman and Mahiuddin Ahmed Who were received on transfer from the Dacca central Jail on 17.2.52 commenced hunger strike from the morning of 18.2.52 to fast unto death or till they are released unconditionally.The civil surgeon, Faridpur, opined on 19.2.52 it was no longer safe for them to continue the fast. অনুবাদ: কারাবন্দী শেখ মুজিবুর রহমান এবং মহিউদ্দীন আহমদকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ১৭-০২-৫২ তারিখে স্থানান্তর করা হয়েছে। নিঃশর্তভাবে মুক্তি না দেয়া পর্যন্ত ১৮-০২-৫২ তারিখ সকাল থেকে তারা অনশন শুরু করেন। ফরিদপুরের সিভিল সার্জন ১৯-০২-৫২ তারিখে মতামত ব্যক্ত করে বলেন এ অনশন চালিয়ে যাওয়া তাদের জন্য নিরাপদ না।

এদিকে শেখ মুজিবুর রহমানের অনশনের বিষয়টি ২০ ফেব্রুয়ারি তদানীন্তন বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য আনোয়ারা খাতুন মুলতবি প্রস্তাব হিসেবে উত্থাপন করেন। অনশনের বিষয়টি মুখ্যভাবে পরিস্ফুটিত হয় বঙ্গীয় আইন পরিষদে। আনোয়ারা খাতুন মুলতবি প্রস্তাবে বলেন :I beg to move that the Assembly be adjourned its business of today to discuss a definite matter of urgent public importance and of recent occurance, namely the situation created by the failure of the Govt. of East Bengal to prevent hunger strike resorted to by Mr. Sheikh Mujibur Rahman, a security Prisoner from 16th February 1952.(42)

অনুবাদ : আমি অনুরোধ করছি যে আজকের সভাটি স্থগিত করা হোক। জনগণের গুরুত্ব এবং সাম্প্রতিক পরিস্থিতির সুনির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হোক ১৯৫২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে সুরক্ষা বন্দী শেখ মুজিবুর রহমানের অনশন প্রতিরোধের জন্য যেটি পূর্ববঙ্গ সরকারের ব্যর্থতার ফলে তৈরি পরিস্থিতি।

সবচাইতে নির্লজ্জ বক্তব্য দিয়েছিলেন তৎকালীন পূর্ববাংলার সরকারের মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিন। তিনি আনোয়ারা খাতুনের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে বলেন:Sir, If Mr. Mujibur Rahman has taken such a decision, I am sorry for it, because he must have been ill advised to do that firstly, it will neither do good to Mr. Mujibur Rahman nor to his supporters outside. Secondly, sir, this is not a matter of an adjournment motion. this is a self- imposed infliction for which nobodz is responsible. with these words, I oppose the adjournment motion.(43)

অনুবাদ : স্যার, শেখ মুজিবুর রহমান যদি এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে আমি তার জন্য দুঃখিত, কারণ প্রথমত তাকে অবিবেচক পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এটি শেখ মুজিবুর রহমান বা তার সমর্থকদের জন্য ভালো হবে না। দ্বিতীয়ত স্যার এটি স্থগিতাদেশের বিষয় নয়। এটি স্বেচ্ছায় প্রয়োগ যার জন্য কেউ দায়ী নয়। এই অর্থে আমি স্থগিতাদেশের বিরোধিতা করছি। (৪৩)

আনোয়ারা খাতুনের আনীত প্রস্তাবটি পূর্ববাংলা সরকার গুরুত্ব না দিতে চাইলেও আইন পরিষদে এর উত্থাপন শেখ মুজিবুর রহমানের অনশনকে গুরুত্বপূর্ণ করেছিল, একই সঙ্গে নুরুল আমিনের পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক সরকারের প্রতিক্রিয়াশীল, সংকীর্ণ, বাঙালি স্বার্থবিরোধী মানসিকতাও স্পষ্ট হয়ে উঠে।

[লেখক : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, কলামিস্ট, দেশের প্রথম ডিজিটাল নিউজ সার্ভিস আবাসের চেয়ারম্যান- সাংবাদিক, বিজয় কীবোর্ড ও সফটওয়্যারের জনক] mustafajabbar@gmail.com

মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ , ১৮ মহররম ১৪৪২, ২২ ভাদ্র ১৪২৭

বাঙালির ভাষা রাষ্ট্রের পিতা : শেখ মুজিব ও বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন

মোস্তাফা জব্বার

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয় ১৯৫২ সালের জানুয়ারি মাস থেকে। ২৬ জানুয়ারি মুসলিম লীগের কাউন্সিল অধিবেশন উপলক্ষে পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত জনসভায় খাজা নাজিমুদ্দিন বক্তৃতা করেন। উক্ত জনসভায় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মতো তিনিও ঘোষণা করেন, ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’। তার এ ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় ১৯৪৮ সালের চাইতেও ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয়। খাজা নাজিমুদ্দিনের ঘোষণায় জেলের অভ্যন্তরে তরুণ রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়। উল্লেখ্য যে, শেখ মুজিবুর রহমান এবং মহিউদ্দিন আহমদ তখন ঢাকা জেলে বন্দী ছিলেন।

১৯৪৯ সালের মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্থ শ্রেণী কর্মচারীদের ধর্মঘটকে সমর্থন করায় শেখ মুজিবসহ ২৭ শিক্ষার্থীর ওপর বহিষ্কারাদেশসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়। শেখ মুজিব তখন আইনের ছাত্র। তার শাস্তি হয় মুচলেকা এবং ১৫ টাকা জরিমানা, না হয় চূড়ান্ত বহিষ্কার। শেখ মুজিব মুচলেকা দেননি, তাই বহিষ্কার এবং ছাত্রজীবন শেষ। এ সময়ের উল্লেখযোগ্য ঘটনার মধ্যে ছিল ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম। ১৯৪৯ সালের ১৫ অক্টোবর খাদ্যের দাবিতে ভুখা মিছিলে নেতৃত্ব দানের সময় শেখ মুজিব বন্দী হন এবং মুক্ত হন ২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সালে। তবে এ সময় তার মুক্তির দাবিতে পোস্টার, স্লোগান, লিফলেট, স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। ১৯৫২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি সাপ্তাহিক ইত্তেফাকে (তখনও দৈনিক হয়নি) ‘কারাগারে আটক শেখ মুজিবুর রহমান’ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন রয়েছে।

সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনায় এটি স্পষ্টতই বোঝা যায় যে, ৪৯ থেকে ৫২ সাল পর্যন্ত সময়টিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কারাবন্দী থাকায় গণতান্ত্রিক বা স্বাভাবিক রাজনীতি করার কোন সুযোগ ছিল না। তিনি যদি মুক্ত থাকতেন তবে শুধু ছাত্রলীগ-আওয়ামী লীগের সম্প্রসারণই নয় পুরো পূর্ব বাংলার রাজনীতি ভিন্ন মাত্রা পেতো। তবুও সেই সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে বঙ্গবন্ধু রাজনীতির একটি বিকল্প ধারা গড়ে তুলেন।

মহিউদ্দিন আহমেদ এর ভাষ্যমতে তারা উভয়ে যুক্তি করে ঠিক করলেন ‘মুজিব অসুস্থতার ভান করে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হবেন। সেভাবেই মুজিবকে ডাক্তারের সাহায্যে মেডিকেল কলেজে ভর্তি করাতে সক্ষম হলাম। ভাষা আন্দোলনকে তীব্র গতিশীল করার উদ্দেশ্যেই এই পন্থা অবলম্বন করেছিলেন। এবং পরবর্তীতে আন্দোলনে তার প্রতিফলন লক্ষণীয়। ঢাকা জেলে ৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ ‘বন্দি অবস্থা থেকে শামসুল হক চৌধুরী, আবদুস সামাদ আজাদ ও ড. গোলাম মাওলার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু ২১ ফেব্রুয়ারি হরতাল ডেকে অ্যাসেম্বলি ঘেরাও কর্মসূচি গ্রহণের পরামর্শ দান করেন। পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়। ‘সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ছাত্রছাত্রীরা মিছিল করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সমবেত হওয়ার পর এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে প্রায় ৫ হাজার ছাত্রছাত্রীর এক সুদীর্ঘ মিছিল বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে করতে সারা শহর প্রদক্ষিণ করে। সভায় জননেতা মাওলানা ভাসানী, আবুল হাশিম ও অন্যান্য রাজনৈতিক ও ছাত্রনেতারা লীগ সরকারের জঘণ্য বিশ্বাসঘাতকতার তীব্র নিন্দা করেন এবং বাংলা ভাষার দাবি প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত অবিরাম সংগ্রাম চালাবার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। সে দিনই ২১ ফেব্রুয়ারি অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সারা প্রদেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘটের আহ্বান দেয়া হয়।’ একুশে ফেব্রুয়ারি প্রদেশব্যাপী আহূত ধর্মঘট সফল করার জন্য তখন রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের যার যার অবস্থান থেকে কর্মসূচি প্রণয়ন ও গ্রহণ করতে হয়েছিল। ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন শেখ মুজিবকে আবার জেলে পাঠানো হলো। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা’ ও ‘বন্দি মুক্তি’র দাবিতে ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে শেখ মুজিবুর রহমান এবং মহিউদ্দিন আহমদ কারাগারের অভ্যন্তরে আমরণ অনশন ধর্মঘট শুরু করেন। চারদিকে বিষয়টি জানাজানি হতে থাকে। বাইরে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে থাকে থাকে। ১৮ ফেব্রুয়ারি তাদের ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ফরিদপুর জেলে পাঠানো হয়। নারায়ণগঞ্জ স্টিমার ঘাটে তাদের সঙ্গে দেখা হয়েছিল শামসুদ্দোহাসহ কয়েকজন ছাত্রনেতার। শেখ মুজিব ‘অনুরোধ করে গেলেন যেন একুশে ফেব্রুয়ারিতে হরতাল মিছিল শেষে আইনসভা ঘেরাও করে বাংলা ভাষার সমর্থনে সদস্যদের স্বাক্ষর আদায় করা হয়।’ এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, শেখ মুজিবের অনশন শুরু এবং ভঙ্গের তারিখ নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। বিভ্রান্তির কারণগুলো, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের প্রচারপত্রে এবং সংবাদপত্রে প্রচার করা হয় যে, শেখ মুজিব এবং মহিউদ্দিন আহমদ ১৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২ থেকে অনশনে গেছেন। প্রচারিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম এবং শেখ মুজিবের ওপর এ পর্যন্ত প্রকাশিত গ্রন্থ ও প্রবন্ধে অনশন শুরুর তারিখ ১৬ ফেব্রুয়ারি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ শ্রেণীভুক্ত সরকারি গোপন দলিল থেকে জানা যায়, শেখ মুজিব ও মহিউদ্দিন আহমেদকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে (১৫ ফেব্রুয়াারি ১৯৫২) ফরিদপুর জেলে (১৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২) স্থানান্তরিত করা হয়। ফলে ১৬ ফেব্রুয়ারি পরিবর্তে ১৮ ফেব্রুয়ারি সেখানে তারা অনশন শুরু করেন। ২৫ ফেব্রুয়ারি বিকেল বেলা তারা অনশন ভঙ্গ করেন। ২৭ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিব মুক্তি পান। মহিউদ্দিন আহমদ মুক্তি পান ১ মার্চ, ১৯৫২।

ভাষাসৈনিক, প্রখ্যাত সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ‘একুশকে নিয়ে কিছু স্মৃতি, কিছু কথা’ প্রবন্ধে বলেছেন : শেখ মুজিব ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ১৬ তারিখ ফরিদপুর জেলে যাওয়ার আগে ও পরে ছাত্রলীগের একাধিক নেতার কাছে চিরকুট পাঠিয়েছেন।’ (তথ্যসূত্র : ভালোবাসি মাতৃভাষা- পৃষ্ঠা: ৬২)

জাতীয় নেতা শহীদ সোহরাওয়ার্দী ১৯৫২ সালের ভাষা-আন্দোলনে বিপক্ষে অবদান নিয়েছিলেন। তিনি উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে বিবৃতি দেন। সোহরাওয়ার্দী এই অবস্থানে দৃঢ় থাকলে ভাষা আন্দোলনে অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারত (সূত্র : একুশে ফেব্রুয়ারি থেকে আন্তর্জাতিক- ড মোহাম্মদ হান্নান, পৃ. ৫৩)। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান সোহরাওয়ার্দীর এই মত পরিবর্তনে সহায়ক ভূমিকা পালন করেন এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে তার সমর্থন আদায় করেন। এই প্রসঙ্গে তিনি নিজেই বলেন, ‘সে সময় শহীদ সোহরাওয়ার্দীর ভাষা সংক্রান্ত বিবৃতি প্রকাশিত হওয়ার পর আমরা বেশ অসুবিধায় পড়ি। তাই ওই বছর জুন মাসে আমি তার সঙ্গে দেখা করার জন্য করাচি যাই এবং তার কাছে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বাংলার দাবির সমর্থনে তাকে একটি বিবৃতি দিতে বলি।’ (তথ্যসূত্র : পূর্ববাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি- ৩য় খণ্ড, বদরুদ্দীন উমর, পৃষ্ঠা-৩৯৬)।

১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন ঢাকা সফরকালে পল্টন ময়দানে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিলে পূর্ববঙ্গে প্রতিরোধের ঝড় ওঠে। বন্দি অবস্থাতেই শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ছাত্রনেতাদের আলোচনা হয় পরবর্তী কর্মসূচি নিয়ে। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন : (খাজা নাজিমুদ্দীনের ঘোষণার পর) দেশের মধ্যে ভীষণ ক্ষোভের সৃষ্টি হলো। তখন একমাত্র রাজনৈতিক দল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ, ছাত্র প্রতিষ্ঠান ছাত্রলীগ এবং যুবাদের প্রতিষ্ঠান যুবলীগ সবাই এর তীব্র প্রতিবাদ করে। আমি হাসপাতালে আছি। সন্ধ্যায় মোহাম্মদ তোয়াহা ও অলি আহাদ দেখা করতে আসে। আমার কেবিনের একটা জানালা ছিল ওয়ার্ডের দিকে। আমি ওদের রাত ১টার পরে আসতে বললাম। আরও বললাম, খালেক নেওয়াজ, কাজী গোলাম মাহাবুব আরও কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতাকে খবর দিতে। দরজার বাইরে আইবিরা পাহারা দিত। রাতে অনেকে ঘুমিয়ে পড়েছে। তখন পেছনের বারান্দায় ওরা পাঁচ-সাতজন এসেছে। আমি অনেক রাতে একা হাঁটাচলা করতাম। রাতে কেউ আসে না বলে কেউ কিছু বলত না। পুলিশরা চুপচাপ পড়ে থাকে, কারণ জানে আমি ভাগব না। গোয়েন্দা কর্মচারী একপাশে বসে ঝিমায়। বারান্দায় বসে আলাপ হলো এবং আমি বললাম, সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন করতে। আওয়ামী লীগ নেতাদেরও খবর দিয়েছি। ছাত্রলীগই তখন ছাত্রদের মধ্যে একমাত্র জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠান। ছাত্রলীগ নেতারা রাজি হলো। অলি আহাদ ও তোয়াহা বলল, যুবলীগও রাজি হবে। আবার ষড়যন্ত্র চলছে বাংলা ভাষার দাবিকে নস্যাৎ করার। এখন প্রতিবাদ না করলে কেন্দ্রীয় আইনসভায় মুসলিম লীগ উর্দুর পক্ষে প্রস্তাব পাস করে নেবে। নাজিমুদ্দীন সাহেব উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার কথাই বলেন নাই, অনেক নতুন নতুন যুক্তিতর্ক দেখিয়েছেন। অলি আহাদ যদিও আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সদস্য হয় নাই, তবুও আমাকে ব্যক্তিগতভাবে খুবই শ্রদ্ধা করত ও ভালোবাসত। আরও বললাম, খবর পেয়েছি, আমাকে শিগগিরই আবার জেলে পাঠিয়ে দিবে, কারণ আমি নাকি হাসপাতালে বসে রাজনীতি করছি। তোমরা আগামীকাল রাতেও আবার এসো। আরও দু’একজন ছাত্রলীগ নেতাকে আসতে বললাম। শওকত মিয়া ও কয়েকজন আওয়ামী লীগ কর্মীকেও দেখা করতে বললাম। পরের দিন রাতে এক এক করে অনেকেই আসল। সেখানেই ঠিক হলো আগামী ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা দিবস পালন করা হবে এবং সভা করে সংগ্রাম পরিষদ গঠন করতে হবে। ছাত্রলীগের পক্ষ থেকেই রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের কনভেনর করতে হবে। ফেব্রুয়ারি থেকেই জনমত সৃষ্টি করা শুরু হবে। [পৃ. ১৯৬-৯৭]

ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জেল থেকে মুক্তি এবং অন্যান্য কর্মকাণ্ডের বেশ কিছু বিবরণ জানা যায় গোয়েন্দা পুলিশের রিপোর্টে। তেমন একটি সরকারি গোপন রিপোর্টে লেখা হয় Security prisoner Sk.Mujibur Rahman and Mahiuddin Ahmed Who were received on transfer from the Dacca central Jail on 17.2.52 commenced hunger strike from the morning of 18.2.52 to fast unto death or till they are released unconditionally.The civil surgeon, Faridpur, opined on 19.2.52 it was no longer safe for them to continue the fast. অনুবাদ: কারাবন্দী শেখ মুজিবুর রহমান এবং মহিউদ্দীন আহমদকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ১৭-০২-৫২ তারিখে স্থানান্তর করা হয়েছে। নিঃশর্তভাবে মুক্তি না দেয়া পর্যন্ত ১৮-০২-৫২ তারিখ সকাল থেকে তারা অনশন শুরু করেন। ফরিদপুরের সিভিল সার্জন ১৯-০২-৫২ তারিখে মতামত ব্যক্ত করে বলেন এ অনশন চালিয়ে যাওয়া তাদের জন্য নিরাপদ না।

এদিকে শেখ মুজিবুর রহমানের অনশনের বিষয়টি ২০ ফেব্রুয়ারি তদানীন্তন বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য আনোয়ারা খাতুন মুলতবি প্রস্তাব হিসেবে উত্থাপন করেন। অনশনের বিষয়টি মুখ্যভাবে পরিস্ফুটিত হয় বঙ্গীয় আইন পরিষদে। আনোয়ারা খাতুন মুলতবি প্রস্তাবে বলেন :I beg to move that the Assembly be adjourned its business of today to discuss a definite matter of urgent public importance and of recent occurance, namely the situation created by the failure of the Govt. of East Bengal to prevent hunger strike resorted to by Mr. Sheikh Mujibur Rahman, a security Prisoner from 16th February 1952.(42)

অনুবাদ : আমি অনুরোধ করছি যে আজকের সভাটি স্থগিত করা হোক। জনগণের গুরুত্ব এবং সাম্প্রতিক পরিস্থিতির সুনির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হোক ১৯৫২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে সুরক্ষা বন্দী শেখ মুজিবুর রহমানের অনশন প্রতিরোধের জন্য যেটি পূর্ববঙ্গ সরকারের ব্যর্থতার ফলে তৈরি পরিস্থিতি।

সবচাইতে নির্লজ্জ বক্তব্য দিয়েছিলেন তৎকালীন পূর্ববাংলার সরকারের মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিন। তিনি আনোয়ারা খাতুনের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে বলেন:Sir, If Mr. Mujibur Rahman has taken such a decision, I am sorry for it, because he must have been ill advised to do that firstly, it will neither do good to Mr. Mujibur Rahman nor to his supporters outside. Secondly, sir, this is not a matter of an adjournment motion. this is a self- imposed infliction for which nobodz is responsible. with these words, I oppose the adjournment motion.(43)

অনুবাদ : স্যার, শেখ মুজিবুর রহমান যদি এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে আমি তার জন্য দুঃখিত, কারণ প্রথমত তাকে অবিবেচক পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এটি শেখ মুজিবুর রহমান বা তার সমর্থকদের জন্য ভালো হবে না। দ্বিতীয়ত স্যার এটি স্থগিতাদেশের বিষয় নয়। এটি স্বেচ্ছায় প্রয়োগ যার জন্য কেউ দায়ী নয়। এই অর্থে আমি স্থগিতাদেশের বিরোধিতা করছি। (৪৩)

আনোয়ারা খাতুনের আনীত প্রস্তাবটি পূর্ববাংলা সরকার গুরুত্ব না দিতে চাইলেও আইন পরিষদে এর উত্থাপন শেখ মুজিবুর রহমানের অনশনকে গুরুত্বপূর্ণ করেছিল, একই সঙ্গে নুরুল আমিনের পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক সরকারের প্রতিক্রিয়াশীল, সংকীর্ণ, বাঙালি স্বার্থবিরোধী মানসিকতাও স্পষ্ট হয়ে উঠে।

[লেখক : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, কলামিস্ট, দেশের প্রথম ডিজিটাল নিউজ সার্ভিস আবাসের চেয়ারম্যান- সাংবাদিক, বিজয় কীবোর্ড ও সফটওয়্যারের জনক] mustafajabbar@gmail.com