আমাদের দেশের প্রবীণরা কেমন আছেন

আমরা এখন এক কঠিন পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। এমন মহাদুর্যোগ আমাদের জীবনে নেমে এসে আমাদের জীবনের সাজানো বাগানকে তছনছ করে দেবে, তা কখনও আমরা ভাবিনি। আমাদের চিরচেনা জগৎ হঠাৎ করেই যেন অচেনা হয়ে গেল। আমাদের স্বাভাবিক জীবন আর স্বাভাবিক রইল না। আমাদের ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হতে হচ্ছে কৃত্রিম এক জীবনে।

গত মার্চে আমাদের দেশে প্রথম যখন করোনার আবির্ভাব ঘটল এবং ছুটি ঘোষণা করা হলো। তখন স্বাভাবিক ভাবেই সবাই ধরে নিল হয়তো ৫-৬ মাসের মধ্যেই সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে। মনে আছে, ছুটির ঘোষণার পর সবার মধ্যেই বেশ একটা আনন্দের আমেজ দেখা দিয়েছিল। অফিস করতে হবে না। বাড়িতে বসেই অফিস করতে হবে। বেশ একটা উৎসব উৎসব ভাব ছিল সবার ভেতর। বাড়িতে বসে সময় কাটানোর উপলক্ষ হিসেবে অনেকেই বিভিন্ন ধরনের রান্নায় মেতে উঠলেন। গান শুনে, সিনেমা দেখে সময় কাটাতে অভ্যস্ত হলেন। কিন্তু এ ছুটি যখন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে শুরু করল এবং করোনার কারণে জীবন থমকে দাঁড়াল। তখনই হতাশা দেখা দিতে শুরু করল সবার মধ্যে। কেউ কারও বাড়ি যেতে পারছে না। ছেলে মায়ের কাছে আসতে পারে না। ভাই-বোন, আত্মীয়স্বজন কারও সঙ্গে কারও দেখা নেই দীর্ঘ ছয় মাস। এক দুর্বিষহ জীবন কাটাতে কাটাতে অনেকেই মানসিক ভাবে অসুস্থ হতে শুরু করলেন।

বিশেষ করে যারা প্রবীণ, বয়স্ক নারী-পুরুষ, তাদের অবস্থা আরও শোচনীয়। ঘরে বসে ফোনে ফোনে খবর নেয়া ছাড়া আর কোন উপায় রইল না। কিছু দিন আগে এভাবে আমরা এক আত্মীয়ের খবর নিতে গিয়ে জানতে পারলাম করোনা শুরু হওয়ার পর থেকেই উনার ডিপ্রেশন দেখা দিয়েছে। শেষে তা চরম আকার ধারণ করে তাকে শয্যাশায়ী করে ফেলে।

বস্তুত বয়স্কদের ভেতরেই চরম হতাশা দেখা দিয়েছে। নেতিবাচক চিন্তা অনেকের ভেতর কাজ করতে শুরু করেছে। প্রবীণরা করোনার আগে অনেকেই বিভিন্ন পার্কে গেছেন, নানা রকম আড্ডায় মেতে উঠেছেন। কেউ ব্যায়াম করতেন, গান গাইতেন, লাফিং ক্লাবে হো হো করে হেসে মেতে উঠতেন। করোনার কারণে তারা এখন ঘরবন্দী। তাদের সময় কিভাবে কাটছে আমরা কেউ জানি না। আরও কতদিন করোনার স্থায়িত্ব বাড়বে আমরা কেউ জানি না। যত দীর্ঘস্থায়ী হবে এ সময় অনেকেই হয়তো ধীরে ধীরে এভাবে ডিপ্রেশনে চলে যাবেন।

শুধু করোনার সময়ই বলব কেন, এ প্রবীণরা সাধারণ সময়ই কীভাবে তাদের সময় কাটান, তা আমাদের দেশে কখনও গবেষণা হয়েছে কিনা আমার জানা নেই। যুক্তরাষ্ট্রের সেনসাস ব্যুরো বলছে, বাংলাদেশে ৬৫ বা এর চেয়ে বেশি বয়সী মানুষের হার মোট জনসংখ্যার ৫ দশমিক ১ শতাংশ। এ বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীর বিনোদন, চিকিৎসার কোন ব্যবস্থা সরকারি উদ্যোগে হয় বলে আমি শুনিনি। ব্যক্তিগত উদ্যোগে বা কোন (NGO) এর দেখভালের ব্যবস্থা করে কিনা জানা নেই আমার। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের জীবন ধারা পাল্টে যাচ্ছে। যৌথ পরিবার ভেঙে গেছে। একক পরিবারের সদস্য সংখ্যাও কমে গেছে। এখনকার ছেলেমেয়েরা উন্নত জীবনের আশায় পাড়ি দিচ্ছে বিদেশে। দেশে পড়ে থাকছেন বৃদ্ধ বাবা-মা। শেষ জীবনে অনেককে একা থাকতে হয়। এ অবস্থায় তাদের আগামী ১৫ দিন কেমন কাটবে সে ভাবনা তো দূরের কথা- আগামীকাল কেমন কাটবে সেটাও জানা নেই। শারীরিক এবং মানসিকভাবে তারা খুবই নাজুক অবস্থায় দিন কাটান। আমি একজন ভদ্রমহিলাকে জানি, যার ছেলেমেয়েরা সব বিদেশ থাকে। মাঝে মাঝে এসে পালা করে মার কাছে থেকে যায়। মায়ের সুবিধার জন্য সব ঘরে টিভি-এসির ব্যবস্থা করে দিয়েছে। ড্রাইভার আছে, রান্নার লোক এসে রান্না করে দিয়ে যায়। ভদ্রমহিলার বয়স যখন প্রায় ৮৫-৮৬, শারীরিকভাবে যখন খুব দুর্বল হয়ে পড়েন, তখন এক প্রতিবেশীকে বাইরের দরজার চাবি দিয়ে বলে রেখেছিলেন, যদি দেখেন আমি বের হইনি কোন দিন, তাহলে বুঝবেন আমি মারা গেছি। এ চাবি দিয়ে দরজা খুলে আমার লাশ বের করবেন।

আমার মনে হয়, আমরা যদি খোঁজ করি এমন দৃশ্য অনেক বাড়িতেই দেখতে পাব।

এ প্রসঙ্গে আমার গত বছরে দেখা একটা ঘটনার কথা উল্লেখ করতে ইচ্ছা করছে। গত বছর কানাডায় বেড়াতে গিয়েছিলাম। একদিন রাত ১১টায় বাসায় ফিরছি, হঠাৎ দেখি সুন্দর একটা বাস এসে থামল। বাস থেকে যারা নামছেন, সবার বয়স প্রায় ৮০-৮৫ হবে। সবাই বেশ হাসিখুশি, কেউ গান গাইতে গাইতে, কেউবা হাততালি দিতে দিতে বাস থেকে নামছেন, আমার বোনের ছেলেকে জিজ্ঞাসা করলাম, এরা কারা? ও বলল, এখানে সরকার থেকেই প্রতি মাসে এসব প্রবীণদের, যে যেখানে বেড়াতে যেতে চান নিয়ে যায়। তারপর যার যার বাসায় পৌঁছে দেয়।

সেদিন খুবই বিস্মিত হয়েছিলাম, আমাদের দেশের প্রবীণদের সঙ্গে এ দেশের বয়োজ্যেষ্ঠদের তুলনা করে। কই আমাদের দেশে তো এ রকম কোন ব্যবস্থা নেই। পাশ্চাত্য দেশের অনেক কিছুই আমরা নেগেটিভভাবে দেখে থাকি। ওই সব দেশের ছেলেমেয়েরা বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকে না। একা একা ঘরে মরে পড়ে থাকে মা-বাবা ইত্যাদি কথা শোনা যায়। তারপরও আমি যতটুকু শুনেছি, প্রবীণদের স্বাস্থ্য এবং বিনোদনের ব্যাপারটা সরকার খুব গুরুত্ব-সহকারে দেখে থাকে। যেটা আমাদের দেশে কল্পনাও করা যায় না। কাজ থেকে অবসর নেয়া মানে, জীবন থেকেও অবসর নেয়া- এরকম একটা ধারণা সামাজিক এবং পারিবারিকভাবেই তাদের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। অথচ আমাদের অনেকেই শুধু শেষ দিনটির জন্য অপেক্ষা করেন। কোন ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠানে তাদের ডাকা হয় না। কোন ক্লাবও প্রবীণদের জন্য নেই। অনেকেই সেজন্য মসজিদটাকেই তাদের বিনোদনের জায়গা মনে করেন। প্রবীণ মহিলাদেরও এখন মসজিদে যাতায়াত বেড়েছে। আগে এমন দেখা যায়নি। নামাজের ফাঁকে সবাই মিলে একটু গল্প করা, অনেকেই এর মধ্যেই একটু আনন্দ খুঁজে নেয়ার চেষ্টা করেন।

অথচ প্রতিটি মানুষের অধিকার আছে জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত একটু সুন্দর ভাবে, আনন্দের সঙ্গে বেঁচে থাকার। মানুষের এখন আয়ু বেড়েছে। এ দীর্ঘ জীবন প্রবীণরা কীভাবে উপভোগ করবেন, তা নিয়ে ভাববার সময় এসেছে। প্রবীণদের সংখ্যা দিন দিন বাড়লেও এ জনগোষ্ঠীর সেবা, চিকিৎসা বা বিনোদনের বিষয়টি এখন অবধি উপেক্ষিতই রয়ে গেছে। বাংলাদেশের মতো একটি দরিদ্র দেশে প্রবীণদের মৌলিক চাহিদা পূরণের যেখানে সামর্থ্য নেই, সেখানে অন্য সেবা পাওয়া যে কতটা চ্যালেঞ্জিং তা বলাই বাহুল্য, পারিবারিকভাবেও দারিদ্রের কারণে অনেক সময় পরিবারের অন্য সদস্যের তুলনায় প্রবীণদের চাহিদা অগ্রাধিকার পায় না।

আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতা আছে হয়তো সত্যি, তবুও এ বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীর দেখভালের দায় দায়িত্ব আমাদের ওপর বর্তায় বৈকি। এখনও যদি রাষ্ট্রীয়ভাবে কোন উদ্যোগ না নেয়া হয় তবে হয়তো আমরা আরও বড় ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে পারি। এ বিপুলসংখ্যক প্রবীণদের অনেকেই হয়তো মানসিক রোগীতে পরিণত হবেন।

মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ , ১৮ মহররম ১৪৪২, ২২ ভাদ্র ১৪২৭

আমাদের দেশের প্রবীণরা কেমন আছেন

সুফিয়া বকুল

আমরা এখন এক কঠিন পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যাচ্ছি। এমন মহাদুর্যোগ আমাদের জীবনে নেমে এসে আমাদের জীবনের সাজানো বাগানকে তছনছ করে দেবে, তা কখনও আমরা ভাবিনি। আমাদের চিরচেনা জগৎ হঠাৎ করেই যেন অচেনা হয়ে গেল। আমাদের স্বাভাবিক জীবন আর স্বাভাবিক রইল না। আমাদের ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হতে হচ্ছে কৃত্রিম এক জীবনে।

গত মার্চে আমাদের দেশে প্রথম যখন করোনার আবির্ভাব ঘটল এবং ছুটি ঘোষণা করা হলো। তখন স্বাভাবিক ভাবেই সবাই ধরে নিল হয়তো ৫-৬ মাসের মধ্যেই সব স্বাভাবিক হয়ে যাবে। মনে আছে, ছুটির ঘোষণার পর সবার মধ্যেই বেশ একটা আনন্দের আমেজ দেখা দিয়েছিল। অফিস করতে হবে না। বাড়িতে বসেই অফিস করতে হবে। বেশ একটা উৎসব উৎসব ভাব ছিল সবার ভেতর। বাড়িতে বসে সময় কাটানোর উপলক্ষ হিসেবে অনেকেই বিভিন্ন ধরনের রান্নায় মেতে উঠলেন। গান শুনে, সিনেমা দেখে সময় কাটাতে অভ্যস্ত হলেন। কিন্তু এ ছুটি যখন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে শুরু করল এবং করোনার কারণে জীবন থমকে দাঁড়াল। তখনই হতাশা দেখা দিতে শুরু করল সবার মধ্যে। কেউ কারও বাড়ি যেতে পারছে না। ছেলে মায়ের কাছে আসতে পারে না। ভাই-বোন, আত্মীয়স্বজন কারও সঙ্গে কারও দেখা নেই দীর্ঘ ছয় মাস। এক দুর্বিষহ জীবন কাটাতে কাটাতে অনেকেই মানসিক ভাবে অসুস্থ হতে শুরু করলেন।

বিশেষ করে যারা প্রবীণ, বয়স্ক নারী-পুরুষ, তাদের অবস্থা আরও শোচনীয়। ঘরে বসে ফোনে ফোনে খবর নেয়া ছাড়া আর কোন উপায় রইল না। কিছু দিন আগে এভাবে আমরা এক আত্মীয়ের খবর নিতে গিয়ে জানতে পারলাম করোনা শুরু হওয়ার পর থেকেই উনার ডিপ্রেশন দেখা দিয়েছে। শেষে তা চরম আকার ধারণ করে তাকে শয্যাশায়ী করে ফেলে।

বস্তুত বয়স্কদের ভেতরেই চরম হতাশা দেখা দিয়েছে। নেতিবাচক চিন্তা অনেকের ভেতর কাজ করতে শুরু করেছে। প্রবীণরা করোনার আগে অনেকেই বিভিন্ন পার্কে গেছেন, নানা রকম আড্ডায় মেতে উঠেছেন। কেউ ব্যায়াম করতেন, গান গাইতেন, লাফিং ক্লাবে হো হো করে হেসে মেতে উঠতেন। করোনার কারণে তারা এখন ঘরবন্দী। তাদের সময় কিভাবে কাটছে আমরা কেউ জানি না। আরও কতদিন করোনার স্থায়িত্ব বাড়বে আমরা কেউ জানি না। যত দীর্ঘস্থায়ী হবে এ সময় অনেকেই হয়তো ধীরে ধীরে এভাবে ডিপ্রেশনে চলে যাবেন।

শুধু করোনার সময়ই বলব কেন, এ প্রবীণরা সাধারণ সময়ই কীভাবে তাদের সময় কাটান, তা আমাদের দেশে কখনও গবেষণা হয়েছে কিনা আমার জানা নেই। যুক্তরাষ্ট্রের সেনসাস ব্যুরো বলছে, বাংলাদেশে ৬৫ বা এর চেয়ে বেশি বয়সী মানুষের হার মোট জনসংখ্যার ৫ দশমিক ১ শতাংশ। এ বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীর বিনোদন, চিকিৎসার কোন ব্যবস্থা সরকারি উদ্যোগে হয় বলে আমি শুনিনি। ব্যক্তিগত উদ্যোগে বা কোন (NGO) এর দেখভালের ব্যবস্থা করে কিনা জানা নেই আমার। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের জীবন ধারা পাল্টে যাচ্ছে। যৌথ পরিবার ভেঙে গেছে। একক পরিবারের সদস্য সংখ্যাও কমে গেছে। এখনকার ছেলেমেয়েরা উন্নত জীবনের আশায় পাড়ি দিচ্ছে বিদেশে। দেশে পড়ে থাকছেন বৃদ্ধ বাবা-মা। শেষ জীবনে অনেককে একা থাকতে হয়। এ অবস্থায় তাদের আগামী ১৫ দিন কেমন কাটবে সে ভাবনা তো দূরের কথা- আগামীকাল কেমন কাটবে সেটাও জানা নেই। শারীরিক এবং মানসিকভাবে তারা খুবই নাজুক অবস্থায় দিন কাটান। আমি একজন ভদ্রমহিলাকে জানি, যার ছেলেমেয়েরা সব বিদেশ থাকে। মাঝে মাঝে এসে পালা করে মার কাছে থেকে যায়। মায়ের সুবিধার জন্য সব ঘরে টিভি-এসির ব্যবস্থা করে দিয়েছে। ড্রাইভার আছে, রান্নার লোক এসে রান্না করে দিয়ে যায়। ভদ্রমহিলার বয়স যখন প্রায় ৮৫-৮৬, শারীরিকভাবে যখন খুব দুর্বল হয়ে পড়েন, তখন এক প্রতিবেশীকে বাইরের দরজার চাবি দিয়ে বলে রেখেছিলেন, যদি দেখেন আমি বের হইনি কোন দিন, তাহলে বুঝবেন আমি মারা গেছি। এ চাবি দিয়ে দরজা খুলে আমার লাশ বের করবেন।

আমার মনে হয়, আমরা যদি খোঁজ করি এমন দৃশ্য অনেক বাড়িতেই দেখতে পাব।

এ প্রসঙ্গে আমার গত বছরে দেখা একটা ঘটনার কথা উল্লেখ করতে ইচ্ছা করছে। গত বছর কানাডায় বেড়াতে গিয়েছিলাম। একদিন রাত ১১টায় বাসায় ফিরছি, হঠাৎ দেখি সুন্দর একটা বাস এসে থামল। বাস থেকে যারা নামছেন, সবার বয়স প্রায় ৮০-৮৫ হবে। সবাই বেশ হাসিখুশি, কেউ গান গাইতে গাইতে, কেউবা হাততালি দিতে দিতে বাস থেকে নামছেন, আমার বোনের ছেলেকে জিজ্ঞাসা করলাম, এরা কারা? ও বলল, এখানে সরকার থেকেই প্রতি মাসে এসব প্রবীণদের, যে যেখানে বেড়াতে যেতে চান নিয়ে যায়। তারপর যার যার বাসায় পৌঁছে দেয়।

সেদিন খুবই বিস্মিত হয়েছিলাম, আমাদের দেশের প্রবীণদের সঙ্গে এ দেশের বয়োজ্যেষ্ঠদের তুলনা করে। কই আমাদের দেশে তো এ রকম কোন ব্যবস্থা নেই। পাশ্চাত্য দেশের অনেক কিছুই আমরা নেগেটিভভাবে দেখে থাকি। ওই সব দেশের ছেলেমেয়েরা বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকে না। একা একা ঘরে মরে পড়ে থাকে মা-বাবা ইত্যাদি কথা শোনা যায়। তারপরও আমি যতটুকু শুনেছি, প্রবীণদের স্বাস্থ্য এবং বিনোদনের ব্যাপারটা সরকার খুব গুরুত্ব-সহকারে দেখে থাকে। যেটা আমাদের দেশে কল্পনাও করা যায় না। কাজ থেকে অবসর নেয়া মানে, জীবন থেকেও অবসর নেয়া- এরকম একটা ধারণা সামাজিক এবং পারিবারিকভাবেই তাদের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। অথচ আমাদের অনেকেই শুধু শেষ দিনটির জন্য অপেক্ষা করেন। কোন ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠানে তাদের ডাকা হয় না। কোন ক্লাবও প্রবীণদের জন্য নেই। অনেকেই সেজন্য মসজিদটাকেই তাদের বিনোদনের জায়গা মনে করেন। প্রবীণ মহিলাদেরও এখন মসজিদে যাতায়াত বেড়েছে। আগে এমন দেখা যায়নি। নামাজের ফাঁকে সবাই মিলে একটু গল্প করা, অনেকেই এর মধ্যেই একটু আনন্দ খুঁজে নেয়ার চেষ্টা করেন।

অথচ প্রতিটি মানুষের অধিকার আছে জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত একটু সুন্দর ভাবে, আনন্দের সঙ্গে বেঁচে থাকার। মানুষের এখন আয়ু বেড়েছে। এ দীর্ঘ জীবন প্রবীণরা কীভাবে উপভোগ করবেন, তা নিয়ে ভাববার সময় এসেছে। প্রবীণদের সংখ্যা দিন দিন বাড়লেও এ জনগোষ্ঠীর সেবা, চিকিৎসা বা বিনোদনের বিষয়টি এখন অবধি উপেক্ষিতই রয়ে গেছে। বাংলাদেশের মতো একটি দরিদ্র দেশে প্রবীণদের মৌলিক চাহিদা পূরণের যেখানে সামর্থ্য নেই, সেখানে অন্য সেবা পাওয়া যে কতটা চ্যালেঞ্জিং তা বলাই বাহুল্য, পারিবারিকভাবেও দারিদ্রের কারণে অনেক সময় পরিবারের অন্য সদস্যের তুলনায় প্রবীণদের চাহিদা অগ্রাধিকার পায় না।

আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতা আছে হয়তো সত্যি, তবুও এ বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীর দেখভালের দায় দায়িত্ব আমাদের ওপর বর্তায় বৈকি। এখনও যদি রাষ্ট্রীয়ভাবে কোন উদ্যোগ না নেয়া হয় তবে হয়তো আমরা আরও বড় ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে পারি। এ বিপুলসংখ্যক প্রবীণদের অনেকেই হয়তো মানসিক রোগীতে পরিণত হবেন।