দ্রুত সময়ে টিকা সংগ্রহের পরিকল্পনা বাংলাদেশের

বাংলাদেশ খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যে ‘করোনাভাইরাস’র ভ্যাকসিন সংগ্রহের পরিকল্পনা নিয়েছে। বাংলাদেশ অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন পেতে আর বিশ^স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) অনুমোদনের জন্য অপেক্ষা করবে না। যুক্তরাজ্যের পর ভারত সরকারের অনুমোদন পাওয়ায় বাংলাদেশ ‘সেরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া’ থেকে ভ্যাকসিন সংগ্রহের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে। আজ ‘সেরাম ইনস্টিটিউট’কে অগ্রিম অর্থ পরিশোধ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ সরকার।

ডব্লিউএইচও’র বিকল্প হিসেবে সাতটি উন্নত দেশের মধ্যে ‘যুক্তরাজ্য’ অনুমোদন দেয়ায় সেটিকে মডেল ধরেই সরকার ভ্যাকসিন (টিকা) সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে। তবে দেশে গণপ্রয়োগ শুরুর আগে অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিনের প্রথম চালানের কয়েকটি লট পরীক্ষা নিরীক্ষা করবেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ আশা করছে, খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যেই অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা ডব্লিউএইচও’র অনুমোদন পেয়ে যাবে। এটি আগামী ১০/১২ দিনের মধ্যেও হতে পারে বলে ধারণা করছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তারা। এর মধ্যে ভারত সরকার ১ জানুয়ারি ‘অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা’র ভ্যাকসিন অনুমোদন নেয়ায় বাংলাদেশের জন্য আরও সুবিধা হলো-বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ এখন কিভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় ভ্যাকসিন সংগ্রহ করবে- জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে গতকাল সংবাদকে বলেন, ‘এখন ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর সেরাম থেকে ভ্যাকসিন আমদানির অনুমোদন দেবে, এরপর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ভারতে সাবমিট করবে (বেক্সিমকো), এগুলো পেয়ে ভারত ভ্যাকসিন শিপমেন্ট করবে... আমরা পেয়ে যাব। এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে কতদিন লাগতে পারে সেটি নির্ভর করছে সরকারের ওপর।’

স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন কিনতে আজ ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটকে অগ্রিম টাকা দেবে সরকার। প্রতিষ্ঠানটির ব্যাংক হিসাবে প্রায় ছয়শ’ কোটি টাকা জমা দেয়া হবে। আর সেরাম ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ সরকারকে একটি ব্যাংক গ্যারান্টিপত্র দেবে। বাকি টাকা ভ্যাকসিন সরবরাহ শুরু করার পর দিতে হবে। টিকা ক্রয় সংক্রান্ত চুক্তি অনুযায়ী সেরাম কর্তৃপক্ষ আগামী জুনের মধ্যে ভ্যাকসিন দিতে না পারলে বাংলাদেশকে এই অগ্রিম টাকা ফেরত দেবে।

‘কোভিড-১৯ টিকা বিতরণ ও প্রস্তুতি কমিটি’র সদস্য ডা. মুশতাক হোসেন সংবাদকে বলেন, ‘ভারতে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন ‘কোভিশিল্ড’ অনুমোদন পেয়েছে বলে শুনেছি। কিন্তু, বাংলাদেশের নীতিমালা হলো, ডব্লিউএইচও’র অনুমোদন বা সাতটি উন্নত দেশ আছে, তাদের যেকোন দুটি দেশ অনুমোদন দিলে আমরা সেটার কাগজপত্র নিয়ে এক সপ্তাহের মধ্যে আমাদের এখানেও অনুমোদন দিতে পারি।’

ডব্লিউএইচও’র বিকল্প হিসেবে সাত দেশের বিষয়টি ‘ভ্যাকসিন ডেপ্লয়মেন্টে প্ল্যানে’ও উল্লেখ করা হয়েছে জানিয়ে ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘এর ফলে আমাদের এখানে ভ্যাকসিনের ট্রায়ালের প্রয়োজন হবে না। তবে প্রথম চালানের কয়েকটি ‘লট’র ভ্যাকসিন পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখা হবে।’

বাংলাদেশ করোনা ভ্যাকসিন পেতে ‘ডব্লিউএইচও’র অনুমোদন পর্যন্ত অপেক্ষা করবে কিনা জানতে চাইলে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এসএম আলমগীর সংবাদকে বলেন, ‘আমাদের এখানে অনেকগুলো ক্রাইটেরিয়া আছে, এর মধ্যে বিশ^স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদন দিলে হয়, অথবা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাতটি দেশ আছে তাদের অনুমোদন হলেই হয়। ইতোমধ্যে সাত দেশের অন্যতম যুক্তরাজ্য সরকার ‘অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা’র ভ্যাকসিন ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে।’

ডব্লিউএইচও’র অনুমোদন পেতে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা’র পক্ষ্য থেকে আবেদন করা হয়েছে কিনা- জানতে চাইলে আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বলেন, ‘সবকিছুই খুব দ্রুত বেগে হচ্ছে। আমরা কন্টিনিউ সবার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। আমাদের কাছে যা তথ্য রয়েছে, তাতে আশা করছি, খুব দ্রুতই ডব্লিউএইচও’র অনুমোদন পেয়ে যাব।’ অক্সফোর্ড- অ্যাস্ট্রাজেনেকা’র ভ্যাকসিন ডব্লিউএইচ’র অনুমোদন পেতে কতদিন লাগতে পারে- জানতে চাইলে ডা. আলমগীর বলেন, ‘ফাইজারের-বায়োএনটেকের ভ্যাকসিন ডব্লিউএইচও’র অনুমোদন পেতে ২০/২১ দিন লেগেছে। কিন্তু অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন অনুমোদন পেতে এতো সময় লাগবে না, আরও কম সময়েই হয়ে যাবে। কারণ এটি গ্যাভি’র ভ্যাকসিন, বেশ পরিচিত।’

ডব্লিউএইচও’র আওতায় অপেক্ষাকৃত গরিব দেশগুলোতে গ্যাভি (গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনস অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন) এবং ইউরোপিয়ান কমিশনের সহযোগিতায় গঠিত ‘কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনস গ্লোবাল অ্যাকসেস ফ্যাসিলিটি’র (কোভ্যাক্স) আওতায় আট কোটি ৮০ লাখ ডোজ টিকা পাওয়ার আশা করছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন অন্যতম।

বাংলাদেশ অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার (ভ্যাকসিন) তিন কোটি ডোজ কিনেছে। এই টিকা পেতে সেরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া এবং দেশের বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করেছে বাংলাদেশ সরকার। চুক্তির আওতায় প্রতিমাসে ৫০ লাখ ডোজ ভ্যাকসিন সরবরাহ করা হবে বাংলাদেশকে। জানুয়ারির শেষের দিকে অথবা ফেব্রুয়ারির মধ্যেই ওই টিকার প্রথম চালান দেশে পৌঁছে যাবে বলে এর আগে আশা প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক।

ভ্যাকসিন আমদানির প্রক্রিয়া কেমন হবে- জানতে চাইলে আইইডিসিআরের উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশে যারা ভ্যাকসিন আনবে, তাদের আবেদন করতে হবে। এখন পর্যন্ত যুক্তরাজ্য, আর্জেন্টিনা ও ভারত অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিনটির অনুমোদন দিয়েছে। যে সাতটি দেশের কথা বলা হলো, সেই তালিকায় শুধু যুক্তরাজ্য আছে। আর্জেন্টিনা ও ভারত নেই। আমাদের নীতিমালা অনুযায়ী দুই দেশের অনুমোদন দরকার। যেহেতু একটি দেশ (যুক্তরাজ্য) অনুমোদন দিয়েছে, তাই আমাদের এখানে যারা আনবে তারা আবেদন করতে পারে। তখন বিশেষজ্ঞরা বসে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।’

দ্রুত টিকা সংগ্রহের চেষ্টা

সরকার অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার পাশাপাশি অন্যান্য উৎস থেকেও করোনার টিকা সংগ্রহের চেষ্টা করছে। প্রয়োজনে টিকা ব্যবহারে জরুরি অনুমোদন দেয়া হতে পারে। টিকা সংগ্রহের জন্য বহুমুখী যোগাযোগ ও পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম সাংবাদিকদের বলেন, সম্ভাব্য সব উৎস থেকে দ্রুততম সময়ে টিকা আনার জন্য যা যা করা দরকার, তা করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এ জন্য আইন বা নিয়মকানুন মানা হবে ঠিকই, তবে তার জন্য কালক্ষেপণ করা হবে না।

অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, যে কোন টিকার দুটি দিক রয়েছে। একটা হলো- টিকা দেশে আনা এবং দ্বিতীয়টি হলো ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছে দেয়া। এক্ষেত্রে আইনি অনেক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ কারণে জটিলতা এড়াতে সরাসরি ক্রয়ের অনুমোদন দেন প্রধানমন্ত্রী।

টিকা আনার পর সরবরাহ ও সংরক্ষণের জন্য কোল্ডচেইন মেইনটেন করতে হবে জানিয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক বলেন, ‘সেজন্য ইতোমধ্যে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের সঙ্গে চুক্তি করেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। টিকা দেয়ার জন্য সারাদেশে ২৬ হাজার স্বাস্থ্য সহকারী এবং সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক কাজ করবে। এছাড়াও টিকা আমদানি ও সরবরাহের ক্ষেত্রে যেসব অফিসিয়াল কার্যক্রম রয়েছে। এক্ষেত্রে ওষুধ প্রশাসনের অনুমতি এবং অনুমোদন অবশ্যই লাগবে। ইতোমধ্যে এ ধরনের কাগজপত্র আদান-প্রদান শুরু হয়েছে।’

স্বাস্থ্য অধিদফতরের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, করোনার টিকা দেশে আসার পর তা দ্রুত সময়ের মধ্যে মানুষকে দেয়ার যাবতীয় কার্যক্রমের প্রস্তুতি চলছে। ইতোমধ্যে টিকা প্রয়োগের জন্য সুই-সিরিঞ্জসহ আনুষঙ্গিক জিনিস কেনার কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কোন শ্রেণীপেশার মানুষ টিকা পাবেন, তার তালিকা তৈরির পদ্ধতি প্রায় চূড়ান্ত হয়েছে। টিকা প্রয়োগের সময় কোন ধরনের জটিলতা বা সমস্যা কিংবা পাশর্^প্রতিক্রিয়া হতে পারে, তা জানার জন্য সীমিত সংখ্যক জায়গায় মহড়া চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

ভারতে টিকাকরণের মহড়ায়

ভারতের গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন বছরের প্রথমদিন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের তৈরি করোনা ভ্যাকসিন ‘কোভিশিল্ড’কে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োগের ছাড়পত্র দিয়েছে ভারতের ড্রাগ কন্ট্রোলার জেনারেল (ডিসিজিআই)। দেশটিতে গতকাল করোনাভাইরাসের টিকাকরণের ‘ড্রাই রান’ (মহড়া) শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে টিকাকরণের নির্দিষ্ট পরিকল্পনা সাজিয়েছে দেশটির কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এই কাজ চালাতে গিয়ে কোন অসুবিধার মধ্যে পড়তে হচ্ছে কিনা, টিকাকরণের গতি বাড়াতে গেলে আরও কী কী পদক্ষেপ করা প্রয়োজন, সে সম্পর্কে সম্যক ধারণা গড়ে তুলতেই ড্রাই রানের আয়োজন করেছে ভারত।

কিভাবে টিকার ইকজেকশন দেয়া হবে। টিকা দেবেন যারা তাদের সে বিষয়ে জ্ঞান কতটা, যদি কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয় বা কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ে, তা হলে তাৎক্ষণিক কি ব্যবস্থা নিতে হবে ইত্যাদির মহড়া চালানো হবে। পেশা-বয়স ইত্যাদির ভিত্তিতে গুরুত্ব বুঝে চারটি ক্যাটেগরি করা হয়েছে।

মার্কিন ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ফাইজার ও জার্মানির প্রতিষ্ঠান বায়োএনটেকের তথ্যমতে, তাদের উদ্ভাবিত করোনার টিকা ৯৫ শতাংশ কার্যকর। বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে যুক্তরাজ্য গত ২ ডিসেম্বর ফাইজার-বায়োএনটেকের করোনার টিকা ব্যবহারের অনুমোদন দেয়। ৮ ডিসেম্বর দেশটিতে এই টিকার প্রয়োগ শুরু হয়। পরে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, বাহরাইন, সৌদি আরব, ইউরোপীয় দেশগুলোসহ বিশ্বের আরও কয়েকটি দেশ ফাইজার-বায়োএনটেকের টিকার অনুমোদন দিয়ে তার প্রয়োগ শুরু করে। ডব্লিউএইচও ৩১ ডিসেম্বর শর্তসাপেক্ষে ফাইজারের টিকা ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে।

রবিবার, ০৩ জানুয়ারী ২০২১ , ১৯ পৌষ ১৪২৭, ১৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪২

দ্রুত সময়ে টিকা সংগ্রহের পরিকল্পনা বাংলাদেশের

আজ অগ্রিম অর্থ পরিশোধ করা হবে

বাংলাদেশ খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যে ‘করোনাভাইরাস’র ভ্যাকসিন সংগ্রহের পরিকল্পনা নিয়েছে। বাংলাদেশ অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন পেতে আর বিশ^স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) অনুমোদনের জন্য অপেক্ষা করবে না। যুক্তরাজ্যের পর ভারত সরকারের অনুমোদন পাওয়ায় বাংলাদেশ ‘সেরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া’ থেকে ভ্যাকসিন সংগ্রহের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে। আজ ‘সেরাম ইনস্টিটিউট’কে অগ্রিম অর্থ পরিশোধ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ সরকার।

ডব্লিউএইচও’র বিকল্প হিসেবে সাতটি উন্নত দেশের মধ্যে ‘যুক্তরাজ্য’ অনুমোদন দেয়ায় সেটিকে মডেল ধরেই সরকার ভ্যাকসিন (টিকা) সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে। তবে দেশে গণপ্রয়োগ শুরুর আগে অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিনের প্রথম চালানের কয়েকটি লট পরীক্ষা নিরীক্ষা করবেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ আশা করছে, খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যেই অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা ডব্লিউএইচও’র অনুমোদন পেয়ে যাবে। এটি আগামী ১০/১২ দিনের মধ্যেও হতে পারে বলে ধারণা করছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তারা। এর মধ্যে ভারত সরকার ১ জানুয়ারি ‘অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা’র ভ্যাকসিন অনুমোদন নেয়ায় বাংলাদেশের জন্য আরও সুবিধা হলো-বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ এখন কিভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় ভ্যাকসিন সংগ্রহ করবে- জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে গতকাল সংবাদকে বলেন, ‘এখন ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর সেরাম থেকে ভ্যাকসিন আমদানির অনুমোদন দেবে, এরপর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ভারতে সাবমিট করবে (বেক্সিমকো), এগুলো পেয়ে ভারত ভ্যাকসিন শিপমেন্ট করবে... আমরা পেয়ে যাব। এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে কতদিন লাগতে পারে সেটি নির্ভর করছে সরকারের ওপর।’

স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন কিনতে আজ ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটকে অগ্রিম টাকা দেবে সরকার। প্রতিষ্ঠানটির ব্যাংক হিসাবে প্রায় ছয়শ’ কোটি টাকা জমা দেয়া হবে। আর সেরাম ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ সরকারকে একটি ব্যাংক গ্যারান্টিপত্র দেবে। বাকি টাকা ভ্যাকসিন সরবরাহ শুরু করার পর দিতে হবে। টিকা ক্রয় সংক্রান্ত চুক্তি অনুযায়ী সেরাম কর্তৃপক্ষ আগামী জুনের মধ্যে ভ্যাকসিন দিতে না পারলে বাংলাদেশকে এই অগ্রিম টাকা ফেরত দেবে।

‘কোভিড-১৯ টিকা বিতরণ ও প্রস্তুতি কমিটি’র সদস্য ডা. মুশতাক হোসেন সংবাদকে বলেন, ‘ভারতে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন ‘কোভিশিল্ড’ অনুমোদন পেয়েছে বলে শুনেছি। কিন্তু, বাংলাদেশের নীতিমালা হলো, ডব্লিউএইচও’র অনুমোদন বা সাতটি উন্নত দেশ আছে, তাদের যেকোন দুটি দেশ অনুমোদন দিলে আমরা সেটার কাগজপত্র নিয়ে এক সপ্তাহের মধ্যে আমাদের এখানেও অনুমোদন দিতে পারি।’

ডব্লিউএইচও’র বিকল্প হিসেবে সাত দেশের বিষয়টি ‘ভ্যাকসিন ডেপ্লয়মেন্টে প্ল্যানে’ও উল্লেখ করা হয়েছে জানিয়ে ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘এর ফলে আমাদের এখানে ভ্যাকসিনের ট্রায়ালের প্রয়োজন হবে না। তবে প্রথম চালানের কয়েকটি ‘লট’র ভ্যাকসিন পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখা হবে।’

বাংলাদেশ করোনা ভ্যাকসিন পেতে ‘ডব্লিউএইচও’র অনুমোদন পর্যন্ত অপেক্ষা করবে কিনা জানতে চাইলে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এসএম আলমগীর সংবাদকে বলেন, ‘আমাদের এখানে অনেকগুলো ক্রাইটেরিয়া আছে, এর মধ্যে বিশ^স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদন দিলে হয়, অথবা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাতটি দেশ আছে তাদের অনুমোদন হলেই হয়। ইতোমধ্যে সাত দেশের অন্যতম যুক্তরাজ্য সরকার ‘অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা’র ভ্যাকসিন ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে।’

ডব্লিউএইচও’র অনুমোদন পেতে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা’র পক্ষ্য থেকে আবেদন করা হয়েছে কিনা- জানতে চাইলে আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বলেন, ‘সবকিছুই খুব দ্রুত বেগে হচ্ছে। আমরা কন্টিনিউ সবার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। আমাদের কাছে যা তথ্য রয়েছে, তাতে আশা করছি, খুব দ্রুতই ডব্লিউএইচও’র অনুমোদন পেয়ে যাব।’ অক্সফোর্ড- অ্যাস্ট্রাজেনেকা’র ভ্যাকসিন ডব্লিউএইচ’র অনুমোদন পেতে কতদিন লাগতে পারে- জানতে চাইলে ডা. আলমগীর বলেন, ‘ফাইজারের-বায়োএনটেকের ভ্যাকসিন ডব্লিউএইচও’র অনুমোদন পেতে ২০/২১ দিন লেগেছে। কিন্তু অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন অনুমোদন পেতে এতো সময় লাগবে না, আরও কম সময়েই হয়ে যাবে। কারণ এটি গ্যাভি’র ভ্যাকসিন, বেশ পরিচিত।’

ডব্লিউএইচও’র আওতায় অপেক্ষাকৃত গরিব দেশগুলোতে গ্যাভি (গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনস অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন) এবং ইউরোপিয়ান কমিশনের সহযোগিতায় গঠিত ‘কোভিড-১৯ ভ্যাকসিনস গ্লোবাল অ্যাকসেস ফ্যাসিলিটি’র (কোভ্যাক্স) আওতায় আট কোটি ৮০ লাখ ডোজ টিকা পাওয়ার আশা করছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন অন্যতম।

বাংলাদেশ অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার (ভ্যাকসিন) তিন কোটি ডোজ কিনেছে। এই টিকা পেতে সেরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া এবং দেশের বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করেছে বাংলাদেশ সরকার। চুক্তির আওতায় প্রতিমাসে ৫০ লাখ ডোজ ভ্যাকসিন সরবরাহ করা হবে বাংলাদেশকে। জানুয়ারির শেষের দিকে অথবা ফেব্রুয়ারির মধ্যেই ওই টিকার প্রথম চালান দেশে পৌঁছে যাবে বলে এর আগে আশা প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক।

ভ্যাকসিন আমদানির প্রক্রিয়া কেমন হবে- জানতে চাইলে আইইডিসিআরের উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশে যারা ভ্যাকসিন আনবে, তাদের আবেদন করতে হবে। এখন পর্যন্ত যুক্তরাজ্য, আর্জেন্টিনা ও ভারত অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিনটির অনুমোদন দিয়েছে। যে সাতটি দেশের কথা বলা হলো, সেই তালিকায় শুধু যুক্তরাজ্য আছে। আর্জেন্টিনা ও ভারত নেই। আমাদের নীতিমালা অনুযায়ী দুই দেশের অনুমোদন দরকার। যেহেতু একটি দেশ (যুক্তরাজ্য) অনুমোদন দিয়েছে, তাই আমাদের এখানে যারা আনবে তারা আবেদন করতে পারে। তখন বিশেষজ্ঞরা বসে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।’

দ্রুত টিকা সংগ্রহের চেষ্টা

সরকার অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার পাশাপাশি অন্যান্য উৎস থেকেও করোনার টিকা সংগ্রহের চেষ্টা করছে। প্রয়োজনে টিকা ব্যবহারে জরুরি অনুমোদন দেয়া হতে পারে। টিকা সংগ্রহের জন্য বহুমুখী যোগাযোগ ও পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম সাংবাদিকদের বলেন, সম্ভাব্য সব উৎস থেকে দ্রুততম সময়ে টিকা আনার জন্য যা যা করা দরকার, তা করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এ জন্য আইন বা নিয়মকানুন মানা হবে ঠিকই, তবে তার জন্য কালক্ষেপণ করা হবে না।

অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, যে কোন টিকার দুটি দিক রয়েছে। একটা হলো- টিকা দেশে আনা এবং দ্বিতীয়টি হলো ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছে দেয়া। এক্ষেত্রে আইনি অনেক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ কারণে জটিলতা এড়াতে সরাসরি ক্রয়ের অনুমোদন দেন প্রধানমন্ত্রী।

টিকা আনার পর সরবরাহ ও সংরক্ষণের জন্য কোল্ডচেইন মেইনটেন করতে হবে জানিয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক বলেন, ‘সেজন্য ইতোমধ্যে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের সঙ্গে চুক্তি করেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। টিকা দেয়ার জন্য সারাদেশে ২৬ হাজার স্বাস্থ্য সহকারী এবং সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক কাজ করবে। এছাড়াও টিকা আমদানি ও সরবরাহের ক্ষেত্রে যেসব অফিসিয়াল কার্যক্রম রয়েছে। এক্ষেত্রে ওষুধ প্রশাসনের অনুমতি এবং অনুমোদন অবশ্যই লাগবে। ইতোমধ্যে এ ধরনের কাগজপত্র আদান-প্রদান শুরু হয়েছে।’

স্বাস্থ্য অধিদফতরের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, করোনার টিকা দেশে আসার পর তা দ্রুত সময়ের মধ্যে মানুষকে দেয়ার যাবতীয় কার্যক্রমের প্রস্তুতি চলছে। ইতোমধ্যে টিকা প্রয়োগের জন্য সুই-সিরিঞ্জসহ আনুষঙ্গিক জিনিস কেনার কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কোন শ্রেণীপেশার মানুষ টিকা পাবেন, তার তালিকা তৈরির পদ্ধতি প্রায় চূড়ান্ত হয়েছে। টিকা প্রয়োগের সময় কোন ধরনের জটিলতা বা সমস্যা কিংবা পাশর্^প্রতিক্রিয়া হতে পারে, তা জানার জন্য সীমিত সংখ্যক জায়গায় মহড়া চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

ভারতে টিকাকরণের মহড়ায়

ভারতের গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন বছরের প্রথমদিন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের তৈরি করোনা ভ্যাকসিন ‘কোভিশিল্ড’কে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োগের ছাড়পত্র দিয়েছে ভারতের ড্রাগ কন্ট্রোলার জেনারেল (ডিসিজিআই)। দেশটিতে গতকাল করোনাভাইরাসের টিকাকরণের ‘ড্রাই রান’ (মহড়া) শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে টিকাকরণের নির্দিষ্ট পরিকল্পনা সাজিয়েছে দেশটির কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। এই কাজ চালাতে গিয়ে কোন অসুবিধার মধ্যে পড়তে হচ্ছে কিনা, টিকাকরণের গতি বাড়াতে গেলে আরও কী কী পদক্ষেপ করা প্রয়োজন, সে সম্পর্কে সম্যক ধারণা গড়ে তুলতেই ড্রাই রানের আয়োজন করেছে ভারত।

কিভাবে টিকার ইকজেকশন দেয়া হবে। টিকা দেবেন যারা তাদের সে বিষয়ে জ্ঞান কতটা, যদি কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয় বা কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ে, তা হলে তাৎক্ষণিক কি ব্যবস্থা নিতে হবে ইত্যাদির মহড়া চালানো হবে। পেশা-বয়স ইত্যাদির ভিত্তিতে গুরুত্ব বুঝে চারটি ক্যাটেগরি করা হয়েছে।

মার্কিন ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ফাইজার ও জার্মানির প্রতিষ্ঠান বায়োএনটেকের তথ্যমতে, তাদের উদ্ভাবিত করোনার টিকা ৯৫ শতাংশ কার্যকর। বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে যুক্তরাজ্য গত ২ ডিসেম্বর ফাইজার-বায়োএনটেকের করোনার টিকা ব্যবহারের অনুমোদন দেয়। ৮ ডিসেম্বর দেশটিতে এই টিকার প্রয়োগ শুরু হয়। পরে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, বাহরাইন, সৌদি আরব, ইউরোপীয় দেশগুলোসহ বিশ্বের আরও কয়েকটি দেশ ফাইজার-বায়োএনটেকের টিকার অনুমোদন দিয়ে তার প্রয়োগ শুরু করে। ডব্লিউএইচও ৩১ ডিসেম্বর শর্তসাপেক্ষে ফাইজারের টিকা ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছে।