গান-বাজনা করলে জানাজা ও বিয়ে না পড়ানোর ঘোষণা

নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার একটি এলাকায় সামাজিক অনুষ্ঠানে গানবাজনা করলে তাদের পরিবারের সদস্যদের জানাজা ও বিয়ে না পড়ানোর ঘোষণায় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে উপজেলা প্রশাসন। গতকাল উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকে প্রধান করে তিন সদস্যের এই কমিটিকে আগামী দুই কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বন্দর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শুক্লা সরকার।

তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকে প্রধান এবং উপজেলা শিক্ষা অফিসার ও পল্লী উন্নয়ন অফিসারকে সদস্য করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী দুই কার্যদিবস পরে তারা প্রতিবেদন জমা দেবেন। তদন্তের পর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

গত ১ জানুয়ারি জুমার নামাজের সময় বন্দর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের কলাবাগ এলাকায় বিয়ে, সুন্নতে খাৎনা, গায়ে হলুদের মতো অনুষ্ঠানগুলোতে গান-বাজনার আয়োজন করা যাবে না বলে নির্দেশনা দেয়া হয়। ইসলাম ধর্মাবলম্বী কোন পরিবার এই নির্দেশনা অমান্য করলে তাদের বিয়ে পড়াতে বা দোয়ায় কোন আলেম অংশগ্রহণ করবে না। এমনকি ওই পরিবারের কোন ব্যক্তি মারা গেলে তার জানাজা পড়াতেও মসজিদের ইমাম বা অন্য কেউ অংশগ্রহণ করবে না বলেও ঘোষণা দেয়া হয়। এই নির্দেশনা মসজিদের মাইকেও এলাকাবাসীদের জানানো হয়। গানবাজনা করলে বিয়েতে এবং জানাজায় মসজিদের ইমামের অংশগ্রহণ না করার বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হলে তা নিয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। একাধিক স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমে এ নিয়ে সংবাদও প্রকাশিত হয়। স্থানীয় এলাকাবাসীর অনেকেই বিষয়টিকে বাড়াবাড়ি পর্যায়ে দেখছেন।

স্থানীয় পঞ্চায়েত ও মসজিদ কমিটির লোকজন এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে গণমাধ্যমকে জানান বন্দর ইউনিয়ন পরিষদের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য সাব্বির আহম্মেদ ইমন। তিনি বলেন, ‘গত শুক্রবার জুমার নামাজের খুতবার আগে বিয়ে ও অন্যান্য অনুষ্ঠানে গানবাজনার প্রসঙ্গটি তোলা হয়। পরে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এই নির্দেশ কেউ অমান্য করলে তার জানাজা ও বিয়েতে কোন ইমাম বা আলেমের না যাওয়ার ঘোষণাও দেয়া হয়।’

গতকাল দুপুরে কলাবাগ এলাকার বাগে জান্নাত জামে মসজিদের ভেতরে কথা হয় মসজিদের ইমাম আবু বকরের সঙ্গে। তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘গত বৃহস্পতিবারও এই এলাকার দুটি বাড়িতে বিকট আওয়াজে রাত দুইটা পর্যন্ত গান চলেছে। উচ্চস্বরের গান বাজানো বন্ধ করার জন্য এই সিদ্ধান্ত নেয়া হইছে। মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও বন্দর থানা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হুমায়ূন কবির এলিন, মসজিদ কমিটির সহসভাপতি মজিবুর রহমান, কোষাধ্যক্ষ তাওলাত হোসেনও সে সময় উপস্থিত ছিলেন। তারাই উপস্থিত মুসুল্লিদের সামনে এই ঘোষণা দিছেন।’

ওই সময় মসজিদে উপস্থিত মসজিদ কমিটির সহসভাপতি মজিবুর রহমানও বিষয়টি অস্বীকার করেননি। তিনি বলেন, ‘জানাজা ও বিয়ে না পড়ানোর ঘোষণা ছিল কেবল ভয় দেখানোর জন্য। এগুলা বইলা যাতে তাদের গান-বাজনা থামানো যায়।’

এ বিষয়ে ওই এলাকার অন্তত দশজনের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় দোকানি বলেন, এলাকায় শব্দ দূষণ অসহনীয় হয়ে ওঠেছে। শব্দ দূষণের বিপক্ষেই অবস্থান নেয়া উচিত। তবে গানবাজনা করলে জানাজা কিংবা বিয়ে পড়ানো হবে না, এমন ঘোষণা বাড়াবাড়ি পর্যায়ের। গান বাজনা, ওয়াজ মাহফিল, পূজা-অর্চনা, রাজনৈতিক সভা সমাবেশসহ সব কিছুতেই ভয়ঙ্কর রকম শব্দ দূষণ হচ্ছে। তা রাজনৈতিক, সামাজিক কিংবা ধর্মীয়, যে নামেই হোক। শুধু মাত্র গানবাজনায় নিষেধাজ্ঞা দিয়ে কোনভাবেই শব্দ দূষণ বন্ধ করা সম্ভব নয়। সব ধরনের শব্দ দূষণের বিপক্ষেই অবস্থান নেয়া উচিত।

বিষয়টি বাড়াবাড়ি পর্যায়ে বলে মন্তব্য করেছেন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এমএ রশীদ ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এহসান উদ্দিনও। তারা বলেন, ‘উচ্চৈঃস্বরে কেউ গান বাজিয়ে অন্যকে বিরক্ত করলে সেটা নিয়মতান্ত্রিকভাবে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। কিন্তু এই জানাজা ও বিয়ে না পড়ানোর বিষয়টা বাড়াবাড়ি।’

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের উপদেষ্টা রফিউর রাব্বি বলেন, ‘এই দেশ তো শরীয়া আইনে চলে না, নিজস্ব একটি সংবিধান আছে। আমরা রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানও শুরু করি জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে। সেখানে গান-বাজনা করলে জানাজা পড়ানো হবে না, এইটা তো কোনো কথা হতে পারে না। শব্দ দূষণ ভিন্ন জিনিস। জানাজা না পড়ানোর ঘোষণা হচ্ছে সামাজিক বিদ্বেষ ও সহিসংতা ছড়ানোর অপচেষ্টা। যারা এই ঘোষণা দিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে সাংবিধানিকভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।’

সোমবার, ০৪ জানুয়ারী ২০২১ , ২০ পৌষ ১৪২৭, ১৯ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪২

না’গঞ্জ বন্দরে

গান-বাজনা করলে জানাজা ও বিয়ে না পড়ানোর ঘোষণা

তদন্ত কমিটি গঠন

নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার একটি এলাকায় সামাজিক অনুষ্ঠানে গানবাজনা করলে তাদের পরিবারের সদস্যদের জানাজা ও বিয়ে না পড়ানোর ঘোষণায় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে উপজেলা প্রশাসন। গতকাল উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকে প্রধান করে তিন সদস্যের এই কমিটিকে আগামী দুই কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বন্দর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শুক্লা সরকার।

তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তাকে প্রধান এবং উপজেলা শিক্ষা অফিসার ও পল্লী উন্নয়ন অফিসারকে সদস্য করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী দুই কার্যদিবস পরে তারা প্রতিবেদন জমা দেবেন। তদন্তের পর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

গত ১ জানুয়ারি জুমার নামাজের সময় বন্দর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের কলাবাগ এলাকায় বিয়ে, সুন্নতে খাৎনা, গায়ে হলুদের মতো অনুষ্ঠানগুলোতে গান-বাজনার আয়োজন করা যাবে না বলে নির্দেশনা দেয়া হয়। ইসলাম ধর্মাবলম্বী কোন পরিবার এই নির্দেশনা অমান্য করলে তাদের বিয়ে পড়াতে বা দোয়ায় কোন আলেম অংশগ্রহণ করবে না। এমনকি ওই পরিবারের কোন ব্যক্তি মারা গেলে তার জানাজা পড়াতেও মসজিদের ইমাম বা অন্য কেউ অংশগ্রহণ করবে না বলেও ঘোষণা দেয়া হয়। এই নির্দেশনা মসজিদের মাইকেও এলাকাবাসীদের জানানো হয়। গানবাজনা করলে বিয়েতে এবং জানাজায় মসজিদের ইমামের অংশগ্রহণ না করার বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হলে তা নিয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। একাধিক স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমে এ নিয়ে সংবাদও প্রকাশিত হয়। স্থানীয় এলাকাবাসীর অনেকেই বিষয়টিকে বাড়াবাড়ি পর্যায়ে দেখছেন।

স্থানীয় পঞ্চায়েত ও মসজিদ কমিটির লোকজন এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে গণমাধ্যমকে জানান বন্দর ইউনিয়ন পরিষদের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য সাব্বির আহম্মেদ ইমন। তিনি বলেন, ‘গত শুক্রবার জুমার নামাজের খুতবার আগে বিয়ে ও অন্যান্য অনুষ্ঠানে গানবাজনার প্রসঙ্গটি তোলা হয়। পরে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এই নির্দেশ কেউ অমান্য করলে তার জানাজা ও বিয়েতে কোন ইমাম বা আলেমের না যাওয়ার ঘোষণাও দেয়া হয়।’

গতকাল দুপুরে কলাবাগ এলাকার বাগে জান্নাত জামে মসজিদের ভেতরে কথা হয় মসজিদের ইমাম আবু বকরের সঙ্গে। তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘গত বৃহস্পতিবারও এই এলাকার দুটি বাড়িতে বিকট আওয়াজে রাত দুইটা পর্যন্ত গান চলেছে। উচ্চস্বরের গান বাজানো বন্ধ করার জন্য এই সিদ্ধান্ত নেয়া হইছে। মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও বন্দর থানা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হুমায়ূন কবির এলিন, মসজিদ কমিটির সহসভাপতি মজিবুর রহমান, কোষাধ্যক্ষ তাওলাত হোসেনও সে সময় উপস্থিত ছিলেন। তারাই উপস্থিত মুসুল্লিদের সামনে এই ঘোষণা দিছেন।’

ওই সময় মসজিদে উপস্থিত মসজিদ কমিটির সহসভাপতি মজিবুর রহমানও বিষয়টি অস্বীকার করেননি। তিনি বলেন, ‘জানাজা ও বিয়ে না পড়ানোর ঘোষণা ছিল কেবল ভয় দেখানোর জন্য। এগুলা বইলা যাতে তাদের গান-বাজনা থামানো যায়।’

এ বিষয়ে ওই এলাকার অন্তত দশজনের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তাদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় দোকানি বলেন, এলাকায় শব্দ দূষণ অসহনীয় হয়ে ওঠেছে। শব্দ দূষণের বিপক্ষেই অবস্থান নেয়া উচিত। তবে গানবাজনা করলে জানাজা কিংবা বিয়ে পড়ানো হবে না, এমন ঘোষণা বাড়াবাড়ি পর্যায়ের। গান বাজনা, ওয়াজ মাহফিল, পূজা-অর্চনা, রাজনৈতিক সভা সমাবেশসহ সব কিছুতেই ভয়ঙ্কর রকম শব্দ দূষণ হচ্ছে। তা রাজনৈতিক, সামাজিক কিংবা ধর্মীয়, যে নামেই হোক। শুধু মাত্র গানবাজনায় নিষেধাজ্ঞা দিয়ে কোনভাবেই শব্দ দূষণ বন্ধ করা সম্ভব নয়। সব ধরনের শব্দ দূষণের বিপক্ষেই অবস্থান নেয়া উচিত।

বিষয়টি বাড়াবাড়ি পর্যায়ে বলে মন্তব্য করেছেন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এমএ রশীদ ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এহসান উদ্দিনও। তারা বলেন, ‘উচ্চৈঃস্বরে কেউ গান বাজিয়ে অন্যকে বিরক্ত করলে সেটা নিয়মতান্ত্রিকভাবে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। কিন্তু এই জানাজা ও বিয়ে না পড়ানোর বিষয়টা বাড়াবাড়ি।’

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ সাংস্কৃতিক জোটের উপদেষ্টা রফিউর রাব্বি বলেন, ‘এই দেশ তো শরীয়া আইনে চলে না, নিজস্ব একটি সংবিধান আছে। আমরা রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানও শুরু করি জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে। সেখানে গান-বাজনা করলে জানাজা পড়ানো হবে না, এইটা তো কোনো কথা হতে পারে না। শব্দ দূষণ ভিন্ন জিনিস। জানাজা না পড়ানোর ঘোষণা হচ্ছে সামাজিক বিদ্বেষ ও সহিসংতা ছড়ানোর অপচেষ্টা। যারা এই ঘোষণা দিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে সাংবিধানিকভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।’