লাল-সবুজের পতাকা সব মাদ্রাসায় ওড়ে না, গাওয়া হয় না জাতীয় সংগীত

আওয়ামী লীগের মাননীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেছেন, প্রতিটি মাদরাসায় জাতীয় সংগীত গাইতে হবে ও জাতীয় পতাকা উত্তোলন করতে হবে। কারণ সংবিধানে আছে, এই দেশে বাস করতে হলে সংবিধান মেনে চলতে হবে। সংবিধানের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই’ (দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১১ ডিসেম্বর ২০২০)। তিনি মসজিদের ইমামদের উদ্দেশে ভাস্কর্য নিয়ে কথা বলতে এ কথা বলেন। প্রতিটি মাদরাসায় জাতীয় সংগীত গাইতে হবে ও জাতীয় পতাকা উত্তোলন করতে হবে এর অর্থ এ মহান কাজ দুটো সব মাদরাসায় করা হয় না। কোনটাতে হয় আবার কোনটাতে হয় না। বুঝলাম না এটা মামাবাড়ির আবদার কি না। ইচ্ছা হলো করলাম ইচ্ছা হলো না করলাম না! কথাটা শুনে অবধি অস্বস্তি লাগছে বিশ্বাস করতে পারছি না। কারণ এ তো কারও ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভর করে না। এ কাজের তো কোন মাঝামাঝি অবস্থান নেই। করতেই হবে। যে মাদরাসাগুলোতে করা হয় না তার একটা তালিকা তৈরি করে ব্যবস্থা নেয়া কি খুব কঠিন কাজ, মোটেই তা নয়। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সম্ভব। আমরা আশা করতে পারি এর একটা বিহিত হানিফ সাহেব করে দেখাবেন। এটা বলে তিনি চুপ করে থাকতে পারেন না।

দেশে ধর্মের নামে মৌলবাদী-সন্ত্রাসীগোষ্ঠী যা ঘটিয়ে চলেছে এবং সম্প্রতি বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নিয়ে যা বলেছেন যা করেছেন তার বিচার হবে এবং উপযুক্ত শাস্তি জড়িতরা পাবে এতে কোন সংশয় রাখতে চাই না। তবে তাদের শাস্তি যেটাই হোক বলতে চাচ্ছি সেটা হবে সাময়িক, দীর্ঘ মেয়াদে কোন ফল বয়ে আনতে পারবে না। কাজেই এর সঙ্গে নিতে হবে দীর্ঘমেয়াদি কিছু পদক্ষেপ। যেমন স্কুল পর্যায়ে সব শ্রেণীর শিক্ষার কারিকুলাম ঢেলে সাজিয়ে ফেলতে হবে যাকে বলে একেবারে খোলনলচে সমেত পাল্টে ফেলতে হবে। সেখানে সব শিশু-কিশোরের লেখাপড়ার জন্য অভিন্ন কারিকুলাম তৈরি করে দিতে হবে। যে কোন শিক্ষার্থী এ পর্যায়ের কোন প্রতিষ্ঠানে যে শ্রেণীতে যেখানেই লেখাপড়া করুক না কেন তাকে ওই কারিককুলামের ভেতরে থেকেই লেখাপড়া করতে হবে। হতে পারে এটা পঞ্চম, অষ্টম বা মাধ্যমিক শ্রেণী এর কোন একটা ধাপে যেটা টেকসই বলে বিবেচিত হবে।

আমরা জানি এ কাজ করার সুযোগ একবার এসেছিল স্বাধীনতা উত্তরকালে। বঙ্গবন্ধু শুরুও করেছিলেন। দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়কে তিনি জাতীয়করণ করে নিয়েছিলেন দেশ স্বাধীনের পরপরই। তখন দেশের অর্থনীতিসহ সার্বিক অবস্থার মধ্যে এমন যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করা শুধু বঙ্গবন্ধুর পক্ষেই সম্ভব ছিল। ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার ফলে সবকিছু ওলটপালট না হয়ে গেলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি এতদিনে অবশ্যই আমরা দেখতে পেতাম দেশের স্কুল পর্যায়ের শিক্ষা একটা অভিন্ন কারিকুলামের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। একই ধারায় চলছে দেশের সব প্রাথমিক-মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের লেখাপড়া। একই ধারার মন-মানসিকতা নিয়ে গড়ে উঠছে দেশের সব শিশু-কিশোর এবং তারা প্রথমেই শিখছে আমরা বাঙালি, বাঙলা আমাদের ভাষা। পদ্মা মেঘনা যমুনা আমাদের ঠিকানা। কিন্তু বঙ্গবন্ধু নিহতের পর সে পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। দেখা গেল সেদিকে তো কেউ গেলই না বরং মাদরাসা শিক্ষা আরও জোরদার হয়ে উঠতে লাগল দেশে। সত্তর দশকের শেষ দিকে এবং আশির দশকের মাঝামাঝি সময়টাতে চাকরির সুবাদে দেশের বিভিন্ন জায়গায় গ্রামের প্রাইমারি স্কুল দেখতে গেলে অনেক সময় বিভ্রান্তিতে পড়তে হয়েছে যখন দেখেছি জরাজীর্ণ স্কুলঘরটার দিকে কেউ খেয়াল করছে না অথচ মাদরাসা-মসজিদ দৃষ্টি নন্দন হয়ে উঠছে পাশেই।

আমরা বাঙালি। আমরা বাংলায় কথা বলি। আমরা বাংলায় গান গাই। মাতৃভাষা রক্ষায় আমরা জীবন দিয়েছি। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। মুক্তিযুদ্ধ করে এক সাগর রক্ত ঝরিয়ে আমরা দেশ স্বাধীন করেছি। বৈশাখী উৎসব আপামর বাঙালির উৎসব। প্রাণের উৎসব। আমরা ঘটা করে পালন করি। সাজি নানা সাজে। গাই ঐতিহ্যের গান। হালখাতা খুলি। চৈত্রসংক্রান্তির দিন মেলা বসে। কার্তিকে আমরা নবান্নের উৎসব পালন করি। পিঠাপুলি খাই। আমরা পলিমাটির দেশের নরম মনের মানুষ। বর্ষা শরৎ হেমন্ত শীত গ্রীষ্ম বসন্ত আমাদের ভেতরে কাজ করে ষড়ঋতুর প্রভাব ফেলে মনে। আমরা ঢাকের বাড়ি শুনে উদ্বেলিত হই। আমরা রাধাকৃষ্ণের প্রেমকাহিনী পড়ি-শুনি। দুর্গাপূজার সময় আমরা দলে দলে প্রতিমা দেখতে যাই। গান-বাজনার অনুষ্ঠানে গিয়ে ভিড় করি। বড়দিন আর বুদ্ধ পূর্ণিমায় আমরা ছুটি ভোগ করি। আমরা হিন্দু-মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান সবাই মিলে বসবাস করি। ধর্মীয় সম্প্রীতির এক দেশ বাংলাদেশ। দরজা খুললেই আমরা দেখি অন্য ধর্মের মানুষের মুখ এতে আমাদের কিছুই যায়-আসে না। আমরা যার যার ধর্ম সেই সেই পালন করি।

আরেক সত্য হলো, আমরা মুসলমান। ইসলাম আমাদের ধর্ম। পবিত্র কোরআন শরিফ আমাদের ধর্মগ্রন্থ। আমরা দিনে ইসলামের বিধান মতো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি। সপ্তাহে একদিন শুক্রবার মসজিদে গিয়ে জুমার নামাজ পড়ি। রমজানে রোজা রাখি। রোজার শেষে ঈদুল ফিতর আমাদের প্রধান উৎসব। নতুন জামা-কাপড় পরি। ঈদগাহে গিয়ে নামাজ পড়ি। একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কোলাকুলি করি। পরস্পরের সহিত সৌহার্দ্য বিনিময় করি। তারপর ঈদুল আজহা দ্বিতীয় প্রধান উৎসব। এ উৎসবে আমরা পশু কোরবানি দিই। কোরবানির মাংসের একটা অংশ গরিবদের মাঝে দান করে দিই। মহরমের দিন কারবালা ট্র্র্যাজেডি স্মরণ করে আমরা শোকে কাতর হই। শবেবরাতের দিন আমরা সামর্থ্য মতো ভালো খাবার খাই। হালুয়া-রুটি বিলাই। বিশেষ নামাজসহ এবাদত বন্দেগি করি।

দেশটা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বলে আমাদের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, এটা আমরা মানতে পারি না। তবুও এটা পবিত্র সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত হয়ে আছে। আমরা মনে করি রাষ্ট্রের ধর্ম হলো তার টেরিটরির মধ্যের সব নাগরিকের সর্বপরি মানুষের মঙ্গলের জন্য কাজ করে যাওয়া, তাদের সুরক্ষা দেয়া।

কোরআন শরিফের ভাষা আরবি। নামাজের ভাষা আরবি। বিশ্বব্যাপী মুসলমানরা নামাজ পড়েন আরবি ভাষায়। আমরা বাঙালিরা সুরা কালাম আয়াত নিয়ত মুখস্ত করে নামাজ-রোজা করি। আরবি আমাদের ভাষা নয়। পবিত্র কোন শরিফ বাংলায় অনুদিত হয়েছে। সহজলভ্য হয়েছে। আমরা পড়ছি। কিছু না বুঝেও আমরা মনোযোগ সহকারে মসজিদে বসে খুতবা শুনি। রাতজেগে আলেম-ওলামাদের বয়ান শুনি ধর্মসভায়। সামর্থ্য থাকলে আমরা পবিত্র হজব্রত পালন করি। নবীজীর রওজায় পৌঁছে গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহর দরবারে হাত তুলে কাঁদি। আমরা ধনসম্পদের জাকাত দেই। এসবই আমরা বাঙালি এবং বাঙালি মুসলমান হিসেবে আমাদের ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা থেকে করে থাকি। সুতরাং আমরা এ দুটো সত্যকেই আমাদের জাতীয় সত্তা বিবেচনা করি।

এখন এমন কোন গ্রাম দেশে পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ যে গ্রামে এক বা একাধিক মাদরাসা কওমি নূরানি হাফেজি বা কোন না কোন নামে নেই। কৃষকের মাঠের ফসল ঘরে ওঠার আগেই ওরা হাজির হয় ভাগিদার হিসেবে। এসব কারও অজানা নয়। ইসলাম ধর্ম প্রচার প্রসারের জন্য কি না করা হয়ে থাকে দেশে। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এই শিক্ষাকে আধুনিকায়ন করার জন্য প্রচার প্রসারের জন্য অনেক বড় বড় কাজ করা হয়েছে এবং হচ্ছে। যেমনটি সেদিন মহান বিজয় দিবসের ভাষণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘আমরা ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেছি। ৮০টি মডেল মাদরাসায় অনার্স কোর্স চালু করা হয়েছে। কওমি মাদরাসাকে স্বীকৃতি দিয়েছি এবং দাওয়ারে হাদিস পর্যায়কে মাস্টার্স মান দেয়া হয়েছে। মাদরাসার শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের জন্য বিশেষ বরাদ্ধ দিয়েছি। প্রতিটি জেলা উপজেলায় দৃষ্টিনন্দন মসজিদ নির্মাণ করা হচ্ছে। ইমাম-মোজ্জিনদের সহায়তার জন্য কল্যাণ ট্রাস্ট গঠন করে দিয়েছি। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের আওতায় সারা দেশে মসজিদভিত্তিক পাঠাগার স্থাপন করা হয়েছে। লক্ষাধিক আলেম-ওলামায়ে কেরামের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে’। মাদরাসা শিক্ষাকে শিক্ষার মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনার এ উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই। আমরা আশা করতে পারি এর প্রসার প্রচার আরও বাড়বে। তবে এর সঙ্গে যে আশাটুকু করতে চাই তা হলো, ওরা যেন বাঙালি মনমানসিকতায় ফিরে আসে।

দেশি-বিদেশি সাহায্য সহযোগিতা দান অনুদান গৃহস্তের ফসল ঝাড়ের বাঁশ সবকিছু মিলে দেশের মাদরাসা শিক্ষা যখন ব্যাপক বিস্তার ঘটতেছিল তখন একজন বিশিষ্টজনকে বলতে শুনেছিলাম, তবু তো ওরা কিছু শিখছে, রাস্তায় ঘুরে বেড়ানোর থেকে সেটা খারাপ কী’। এটা ঠিক, তিনি শিক্ষাবঞ্চিত গরিব বাবা-মায়ের সন্তানদের কথায় বলেছিলেন। না, মোটেই খারাপ ছিল না কিন্তু ওই যে বললাম, ওদের সেই সিলেবাসের আওতায় এনে পড়ান হয়নি যে সিলেবাসের বইপত্র হাতে নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গেলে ওরা বাঙালি মনমানসিকতা নিয়ে বেড়ে উঠতে পারত। বরং উল্টা তাদের অনেকেই এগিয়ে এসেছে আগের পথ ধরে। রাজাকার আলবদর আলশামস মনোভাবের কোন পরিবর্তন হয়নি। মনেপ্রাণে তারা এখনও মেনে নিতে পারেনি যে, তারা বাঙালি, বাংলা তাদের মাতৃভাষা। পদ্মা মেঘনা যমুনা তাদের ঠিকানা-এটা তারা মানতে পারেনি। শাহ আবদুল করিম, হাছনরাজা, লালন, জীবনানন্দ, নজরুল, রবীন্দ্রনাথকে তারা উপলব্ধি বা ধারণ করা তো দূরের কথা তাদের সৃষ্টিকেই তারা মানতে পারেনি। এবং পারেনি বলেই তারা এখন পাঠ্যপুস্তকের পরিবর্তন আনতে হাত বাড়িয়েছে। নানারকম হুঙ্কার ছাড়তে সাহস পাচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভেঙে ফেলার মতো দৌরাত্ম্য দেখাতে পারছে। সে দায় কার। আসলে সে শিক্ষা তাদের দেয়া হয়নি যেটা শুরুতে দেয়ার প্রয়োজন ছিল। সবার জন্য শিক্ষাকে সেই ছাঁচে ফেলা হয়নি যে কথা আগে বলেছি।

শেষ করতে চাই ওপরের তৃতীয় প্যারাতে যা বলেছি তার কিছু কথা আবার বলে। যেমন দীর্ঘমেয়াদি কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে যাতে এ ভূখণ্ড থেকে জঙ্গিসন্ত্রাস, সাম্প্রদায়িক, জিহাদি মনোভাব চিরতরে বিদায় হয়। অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে ওঠে। এর জন্য স্কুল পর্যায়ে সব শিশু-কিশোরের লেখাপড়ার জন্য অভিন্ন কারিকুলাম তৈরি করে দিতে হবে। যে কোন শিক্ষার্থী কোন প্রতিষ্ঠানে যে শ্রেণীতে যেখানেই লেখাপড়া করুক না কেন তাকে ওই কারিককুলামের ভেতরে থেকেই লেখাপড়া করতে হবে। সেটা হতে পারে পঞ্চম, অষ্টম বা মাধ্যমিক শ্রেণীÑএর কোন একটি ধাপ যেটা টেকসই বলে বিবেচিত হবে। তারপর যার যেদিকে ঝোঁক খুশি অভিভাবকের ইচ্ছা যেটায় বলা হোক সেদিকে লেখাপড়া করবে। আমাদের দেশের মতো এমন একটা ভাষারাষ্ট্রের পক্ষে কাজটা করা তেমন কোন কঠিন কাজ হবে না। অন্যথায় আগায় জল ঢালা সার হবে কাজ কিছুই হবে না।

[লেখক : অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষা কর্মকর্তা, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর]

শনিবার, ০৯ জানুয়ারী ২০২১ , ২৫ পৌষ ১৪২৭, ২৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪২

সবাই যা দেখে

লাল-সবুজের পতাকা সব মাদ্রাসায় ওড়ে না, গাওয়া হয় না জাতীয় সংগীত

আব্দুল মান্নান খান

আওয়ামী লীগের মাননীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেছেন, প্রতিটি মাদরাসায় জাতীয় সংগীত গাইতে হবে ও জাতীয় পতাকা উত্তোলন করতে হবে। কারণ সংবিধানে আছে, এই দেশে বাস করতে হলে সংবিধান মেনে চলতে হবে। সংবিধানের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই’ (দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১১ ডিসেম্বর ২০২০)। তিনি মসজিদের ইমামদের উদ্দেশে ভাস্কর্য নিয়ে কথা বলতে এ কথা বলেন। প্রতিটি মাদরাসায় জাতীয় সংগীত গাইতে হবে ও জাতীয় পতাকা উত্তোলন করতে হবে এর অর্থ এ মহান কাজ দুটো সব মাদরাসায় করা হয় না। কোনটাতে হয় আবার কোনটাতে হয় না। বুঝলাম না এটা মামাবাড়ির আবদার কি না। ইচ্ছা হলো করলাম ইচ্ছা হলো না করলাম না! কথাটা শুনে অবধি অস্বস্তি লাগছে বিশ্বাস করতে পারছি না। কারণ এ তো কারও ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর নির্ভর করে না। এ কাজের তো কোন মাঝামাঝি অবস্থান নেই। করতেই হবে। যে মাদরাসাগুলোতে করা হয় না তার একটা তালিকা তৈরি করে ব্যবস্থা নেয়া কি খুব কঠিন কাজ, মোটেই তা নয়। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সম্ভব। আমরা আশা করতে পারি এর একটা বিহিত হানিফ সাহেব করে দেখাবেন। এটা বলে তিনি চুপ করে থাকতে পারেন না।

দেশে ধর্মের নামে মৌলবাদী-সন্ত্রাসীগোষ্ঠী যা ঘটিয়ে চলেছে এবং সম্প্রতি বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নিয়ে যা বলেছেন যা করেছেন তার বিচার হবে এবং উপযুক্ত শাস্তি জড়িতরা পাবে এতে কোন সংশয় রাখতে চাই না। তবে তাদের শাস্তি যেটাই হোক বলতে চাচ্ছি সেটা হবে সাময়িক, দীর্ঘ মেয়াদে কোন ফল বয়ে আনতে পারবে না। কাজেই এর সঙ্গে নিতে হবে দীর্ঘমেয়াদি কিছু পদক্ষেপ। যেমন স্কুল পর্যায়ে সব শ্রেণীর শিক্ষার কারিকুলাম ঢেলে সাজিয়ে ফেলতে হবে যাকে বলে একেবারে খোলনলচে সমেত পাল্টে ফেলতে হবে। সেখানে সব শিশু-কিশোরের লেখাপড়ার জন্য অভিন্ন কারিকুলাম তৈরি করে দিতে হবে। যে কোন শিক্ষার্থী এ পর্যায়ের কোন প্রতিষ্ঠানে যে শ্রেণীতে যেখানেই লেখাপড়া করুক না কেন তাকে ওই কারিককুলামের ভেতরে থেকেই লেখাপড়া করতে হবে। হতে পারে এটা পঞ্চম, অষ্টম বা মাধ্যমিক শ্রেণী এর কোন একটা ধাপে যেটা টেকসই বলে বিবেচিত হবে।

আমরা জানি এ কাজ করার সুযোগ একবার এসেছিল স্বাধীনতা উত্তরকালে। বঙ্গবন্ধু শুরুও করেছিলেন। দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়কে তিনি জাতীয়করণ করে নিয়েছিলেন দেশ স্বাধীনের পরপরই। তখন দেশের অর্থনীতিসহ সার্বিক অবস্থার মধ্যে এমন যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করা শুধু বঙ্গবন্ধুর পক্ষেই সম্ভব ছিল। ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার ফলে সবকিছু ওলটপালট না হয়ে গেলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি এতদিনে অবশ্যই আমরা দেখতে পেতাম দেশের স্কুল পর্যায়ের শিক্ষা একটা অভিন্ন কারিকুলামের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। একই ধারায় চলছে দেশের সব প্রাথমিক-মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের লেখাপড়া। একই ধারার মন-মানসিকতা নিয়ে গড়ে উঠছে দেশের সব শিশু-কিশোর এবং তারা প্রথমেই শিখছে আমরা বাঙালি, বাঙলা আমাদের ভাষা। পদ্মা মেঘনা যমুনা আমাদের ঠিকানা। কিন্তু বঙ্গবন্ধু নিহতের পর সে পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। দেখা গেল সেদিকে তো কেউ গেলই না বরং মাদরাসা শিক্ষা আরও জোরদার হয়ে উঠতে লাগল দেশে। সত্তর দশকের শেষ দিকে এবং আশির দশকের মাঝামাঝি সময়টাতে চাকরির সুবাদে দেশের বিভিন্ন জায়গায় গ্রামের প্রাইমারি স্কুল দেখতে গেলে অনেক সময় বিভ্রান্তিতে পড়তে হয়েছে যখন দেখেছি জরাজীর্ণ স্কুলঘরটার দিকে কেউ খেয়াল করছে না অথচ মাদরাসা-মসজিদ দৃষ্টি নন্দন হয়ে উঠছে পাশেই।

আমরা বাঙালি। আমরা বাংলায় কথা বলি। আমরা বাংলায় গান গাই। মাতৃভাষা রক্ষায় আমরা জীবন দিয়েছি। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা। মুক্তিযুদ্ধ করে এক সাগর রক্ত ঝরিয়ে আমরা দেশ স্বাধীন করেছি। বৈশাখী উৎসব আপামর বাঙালির উৎসব। প্রাণের উৎসব। আমরা ঘটা করে পালন করি। সাজি নানা সাজে। গাই ঐতিহ্যের গান। হালখাতা খুলি। চৈত্রসংক্রান্তির দিন মেলা বসে। কার্তিকে আমরা নবান্নের উৎসব পালন করি। পিঠাপুলি খাই। আমরা পলিমাটির দেশের নরম মনের মানুষ। বর্ষা শরৎ হেমন্ত শীত গ্রীষ্ম বসন্ত আমাদের ভেতরে কাজ করে ষড়ঋতুর প্রভাব ফেলে মনে। আমরা ঢাকের বাড়ি শুনে উদ্বেলিত হই। আমরা রাধাকৃষ্ণের প্রেমকাহিনী পড়ি-শুনি। দুর্গাপূজার সময় আমরা দলে দলে প্রতিমা দেখতে যাই। গান-বাজনার অনুষ্ঠানে গিয়ে ভিড় করি। বড়দিন আর বুদ্ধ পূর্ণিমায় আমরা ছুটি ভোগ করি। আমরা হিন্দু-মুসলমান বৌদ্ধ খ্রিস্টান সবাই মিলে বসবাস করি। ধর্মীয় সম্প্রীতির এক দেশ বাংলাদেশ। দরজা খুললেই আমরা দেখি অন্য ধর্মের মানুষের মুখ এতে আমাদের কিছুই যায়-আসে না। আমরা যার যার ধর্ম সেই সেই পালন করি।

আরেক সত্য হলো, আমরা মুসলমান। ইসলাম আমাদের ধর্ম। পবিত্র কোরআন শরিফ আমাদের ধর্মগ্রন্থ। আমরা দিনে ইসলামের বিধান মতো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি। সপ্তাহে একদিন শুক্রবার মসজিদে গিয়ে জুমার নামাজ পড়ি। রমজানে রোজা রাখি। রোজার শেষে ঈদুল ফিতর আমাদের প্রধান উৎসব। নতুন জামা-কাপড় পরি। ঈদগাহে গিয়ে নামাজ পড়ি। একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কোলাকুলি করি। পরস্পরের সহিত সৌহার্দ্য বিনিময় করি। তারপর ঈদুল আজহা দ্বিতীয় প্রধান উৎসব। এ উৎসবে আমরা পশু কোরবানি দিই। কোরবানির মাংসের একটা অংশ গরিবদের মাঝে দান করে দিই। মহরমের দিন কারবালা ট্র্র্যাজেডি স্মরণ করে আমরা শোকে কাতর হই। শবেবরাতের দিন আমরা সামর্থ্য মতো ভালো খাবার খাই। হালুয়া-রুটি বিলাই। বিশেষ নামাজসহ এবাদত বন্দেগি করি।

দেশটা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বলে আমাদের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, এটা আমরা মানতে পারি না। তবুও এটা পবিত্র সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত হয়ে আছে। আমরা মনে করি রাষ্ট্রের ধর্ম হলো তার টেরিটরির মধ্যের সব নাগরিকের সর্বপরি মানুষের মঙ্গলের জন্য কাজ করে যাওয়া, তাদের সুরক্ষা দেয়া।

কোরআন শরিফের ভাষা আরবি। নামাজের ভাষা আরবি। বিশ্বব্যাপী মুসলমানরা নামাজ পড়েন আরবি ভাষায়। আমরা বাঙালিরা সুরা কালাম আয়াত নিয়ত মুখস্ত করে নামাজ-রোজা করি। আরবি আমাদের ভাষা নয়। পবিত্র কোন শরিফ বাংলায় অনুদিত হয়েছে। সহজলভ্য হয়েছে। আমরা পড়ছি। কিছু না বুঝেও আমরা মনোযোগ সহকারে মসজিদে বসে খুতবা শুনি। রাতজেগে আলেম-ওলামাদের বয়ান শুনি ধর্মসভায়। সামর্থ্য থাকলে আমরা পবিত্র হজব্রত পালন করি। নবীজীর রওজায় পৌঁছে গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহর দরবারে হাত তুলে কাঁদি। আমরা ধনসম্পদের জাকাত দেই। এসবই আমরা বাঙালি এবং বাঙালি মুসলমান হিসেবে আমাদের ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা থেকে করে থাকি। সুতরাং আমরা এ দুটো সত্যকেই আমাদের জাতীয় সত্তা বিবেচনা করি।

এখন এমন কোন গ্রাম দেশে পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ যে গ্রামে এক বা একাধিক মাদরাসা কওমি নূরানি হাফেজি বা কোন না কোন নামে নেই। কৃষকের মাঠের ফসল ঘরে ওঠার আগেই ওরা হাজির হয় ভাগিদার হিসেবে। এসব কারও অজানা নয়। ইসলাম ধর্ম প্রচার প্রসারের জন্য কি না করা হয়ে থাকে দেশে। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এই শিক্ষাকে আধুনিকায়ন করার জন্য প্রচার প্রসারের জন্য অনেক বড় বড় কাজ করা হয়েছে এবং হচ্ছে। যেমনটি সেদিন মহান বিজয় দিবসের ভাষণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘আমরা ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেছি। ৮০টি মডেল মাদরাসায় অনার্স কোর্স চালু করা হয়েছে। কওমি মাদরাসাকে স্বীকৃতি দিয়েছি এবং দাওয়ারে হাদিস পর্যায়কে মাস্টার্স মান দেয়া হয়েছে। মাদরাসার শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের জন্য বিশেষ বরাদ্ধ দিয়েছি। প্রতিটি জেলা উপজেলায় দৃষ্টিনন্দন মসজিদ নির্মাণ করা হচ্ছে। ইমাম-মোজ্জিনদের সহায়তার জন্য কল্যাণ ট্রাস্ট গঠন করে দিয়েছি। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের আওতায় সারা দেশে মসজিদভিত্তিক পাঠাগার স্থাপন করা হয়েছে। লক্ষাধিক আলেম-ওলামায়ে কেরামের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে’। মাদরাসা শিক্ষাকে শিক্ষার মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনার এ উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই। আমরা আশা করতে পারি এর প্রসার প্রচার আরও বাড়বে। তবে এর সঙ্গে যে আশাটুকু করতে চাই তা হলো, ওরা যেন বাঙালি মনমানসিকতায় ফিরে আসে।

দেশি-বিদেশি সাহায্য সহযোগিতা দান অনুদান গৃহস্তের ফসল ঝাড়ের বাঁশ সবকিছু মিলে দেশের মাদরাসা শিক্ষা যখন ব্যাপক বিস্তার ঘটতেছিল তখন একজন বিশিষ্টজনকে বলতে শুনেছিলাম, তবু তো ওরা কিছু শিখছে, রাস্তায় ঘুরে বেড়ানোর থেকে সেটা খারাপ কী’। এটা ঠিক, তিনি শিক্ষাবঞ্চিত গরিব বাবা-মায়ের সন্তানদের কথায় বলেছিলেন। না, মোটেই খারাপ ছিল না কিন্তু ওই যে বললাম, ওদের সেই সিলেবাসের আওতায় এনে পড়ান হয়নি যে সিলেবাসের বইপত্র হাতে নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গেলে ওরা বাঙালি মনমানসিকতা নিয়ে বেড়ে উঠতে পারত। বরং উল্টা তাদের অনেকেই এগিয়ে এসেছে আগের পথ ধরে। রাজাকার আলবদর আলশামস মনোভাবের কোন পরিবর্তন হয়নি। মনেপ্রাণে তারা এখনও মেনে নিতে পারেনি যে, তারা বাঙালি, বাংলা তাদের মাতৃভাষা। পদ্মা মেঘনা যমুনা তাদের ঠিকানা-এটা তারা মানতে পারেনি। শাহ আবদুল করিম, হাছনরাজা, লালন, জীবনানন্দ, নজরুল, রবীন্দ্রনাথকে তারা উপলব্ধি বা ধারণ করা তো দূরের কথা তাদের সৃষ্টিকেই তারা মানতে পারেনি। এবং পারেনি বলেই তারা এখন পাঠ্যপুস্তকের পরিবর্তন আনতে হাত বাড়িয়েছে। নানারকম হুঙ্কার ছাড়তে সাহস পাচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভেঙে ফেলার মতো দৌরাত্ম্য দেখাতে পারছে। সে দায় কার। আসলে সে শিক্ষা তাদের দেয়া হয়নি যেটা শুরুতে দেয়ার প্রয়োজন ছিল। সবার জন্য শিক্ষাকে সেই ছাঁচে ফেলা হয়নি যে কথা আগে বলেছি।

শেষ করতে চাই ওপরের তৃতীয় প্যারাতে যা বলেছি তার কিছু কথা আবার বলে। যেমন দীর্ঘমেয়াদি কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে যাতে এ ভূখণ্ড থেকে জঙ্গিসন্ত্রাস, সাম্প্রদায়িক, জিহাদি মনোভাব চিরতরে বিদায় হয়। অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে ওঠে। এর জন্য স্কুল পর্যায়ে সব শিশু-কিশোরের লেখাপড়ার জন্য অভিন্ন কারিকুলাম তৈরি করে দিতে হবে। যে কোন শিক্ষার্থী কোন প্রতিষ্ঠানে যে শ্রেণীতে যেখানেই লেখাপড়া করুক না কেন তাকে ওই কারিককুলামের ভেতরে থেকেই লেখাপড়া করতে হবে। সেটা হতে পারে পঞ্চম, অষ্টম বা মাধ্যমিক শ্রেণীÑএর কোন একটি ধাপ যেটা টেকসই বলে বিবেচিত হবে। তারপর যার যেদিকে ঝোঁক খুশি অভিভাবকের ইচ্ছা যেটায় বলা হোক সেদিকে লেখাপড়া করবে। আমাদের দেশের মতো এমন একটা ভাষারাষ্ট্রের পক্ষে কাজটা করা তেমন কোন কঠিন কাজ হবে না। অন্যথায় আগায় জল ঢালা সার হবে কাজ কিছুই হবে না।

[লেখক : অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষা কর্মকর্তা, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর]