ম্রো জাতিগোষ্ঠীর মতোই আদিবাসী কোলও সংকটাপন্ন

১.

পার্বত্য চট্টগ্রামের ম্রো জনগোষ্ঠীর কোন একজনকে প্রশ্ন করলে- কেমন আছে আদিবাসী ম্রোরা! নিঃসন্দেহে এবং নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, ভালো নেই; তাদের উত্তরও সন্দেহাতীত। স্বাধীন বাংলাদেশের স্বাধীন নাগরিকরা উন্নয়নের নামে, পর্যটকদের আকৃষ্ট ও সুব্যবস্থায় ম্রো জাতিগোষ্ঠীকে উচ্ছেদান্তে পাঁচ তারকা হোস্টেল নির্মাণের উদ্যোগ সচেতন নাগরিকদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। দেশের অন্যতম ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান সিকদার গ্রুপ বান্দরবানের চিম্বুক পাহাড়ে হোটেল নির্মাণে ম্রোরা কী দেশান্তরিতের অশনিসংকেত দেখতে পাচ্ছেন। আদিবাসী নেতারা বলছেন, ‘বাংলাদেশে আবার পাকিস্তানি কায়দায় জনগোষ্ঠীদের তাড়ানো হোক, এটি আমরা চাই না। বান্দরবানে উন্নয়ন নয়, মুনাফার জন্য এটি করা হচ্ছে। এটি প্রকৃতিবহির্ভূত, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যবিরোধী। বান্দরবানে ওই হোটেল প্রকল্প তৈরি হলে, সেখানে ছয়টি গ্রামের ১১৬টি পাড়ায় প্রায় ১০ হাজার ম্রো বাসিন্দা উচ্ছেদের মুখে পড়বে। তাদের জীবিকা স্থায়ী ক্ষতিতে পড়বে। সেখানকার ঐতিহ্যবাহী জীবনাচার, পরিবেশ, প্রকৃতি নষ্ট করে মুনাফা, আয়েশি বিনোদন ও ভোগ বিলাসের জন্য এই প্রকল্প নেয়া হয়েছে।’

ক্ষুব্ধতায় তারা আরও বলেছেন, চিম্বুকের-বান্দরবান-চিম্বুক-থানচি সড়কের ৪৮ কিলোমিটারে নাইতংপাহাড়কে চন্দ্রপাহাড় নাম দিয়ে বিতর্কিত সিকদার গ্রুপ প্রায় ৮০০ থেকে ১ হাজার একর জমি অবৈধভাবে দখল করেছে। ওই জমিতে কাপ্রুপাড়া, দোলাপাড়া, ইরাপাড়া ও কলাইপাড়ার শতাধিক ¤্রাে পরিবার জুমচাষ ও বাগান করে আসছে। শত শত বছরের জীবন-জীবিকার জমিতে সিকদার গ্রুপের (আর অ্যা- আর হোল্ডিংস) বিলাসবহুল হোটেল ও পর্যটন স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ জাতিগত নিধনচেষ্টার শামিল। এ জমি দখলের বন্ধ না হলে চারটি পাড়া সরাসরি উচ্ছেদ হবে। আরও ৭০ থেকে ৮০টি পাড়ার প্রায় ১০ হাজার ম্রো উচ্ছেদের মুখে পড়বে। স্থানীয় কার্বারি লঙনাং ম্রো বলছেন, তাদের পাড়ার শ্মশানভূমি ও পানির উৎস দখল করে বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। বাধা দিলে ভালো বেতনের চাকরির প্রলোভন অথবা মামলার হুমকি দেয়া হয়। দেশের বুদ্ধিজীবীরা অভিমত পোষণ করেছেন, ‘এ ধরনের পদক্ষেপ সম্পূর্ণ অবৈধ, অন্যায় ও অমানবিক। অবিলম্বে এটি বন্ধ করতে হবে।’

আদিবাসী ম্র্রোদের বিষয়ে সবচেয়ে শঙ্কাজনক তথ্যাদি উপস্থাপন করেছেন চাকমা সার্কেল প্রধান রাজা দেবাশীষ রায়। তিনি বলেছেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে ম্রোদের সংখ্যা কমছে দিন দিন। তাদের অনেকেই মায়ানমারে চলে গেছে। প্রাকৃতিক সম্পদ ভোগদখল করে ম্রো জনগোষ্ঠীকে উচ্ছেদ করার এই ঘটনা লজ্জাজনক।’ হয়তো এভাবেই যুগের পর যুগ আদিবাসীরা নিগৃহীত হতে হতে সীমান্ত অতিক্রম করেছে। চিম্বুকের পাদদেশ শিখরে থাকায় সহজেই দেশবাসীর দৃষ্টি আকর্ষিত হয়েছে। দেশের জন্ম-মৃত্যুর হার ঊর্ধ্বগতি হলেও আদিবাসীদের ক্ষেত্রে কেন স্থবির হয়ে পড়ে! কেন-ই-বা আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলকে ট্যুরিজম স্পষ্ট হিসেবে মনোনীত করা হয়! আদিবাসী নারী-পুরুষ, পোশাক-পরিচ্ছেদ, সংস্কৃতিতে চোখের পিপাসা মিটিয়ে আমরা হাত বাড়িয়ে থাকি ঘরের অন্দরমহল পর্যন্ত। পার্বত্য অঞ্চলের আদিবাসীদের সঙ্গে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে বাঙালিরা আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখলেও হৃদয়ে ক্ষত দাগ অমলিন হয়ে রয়েছে। পাহাড়ি পরিচিতজনেরা জানায়, পার্বত্য অঞ্চলে অপরিচিত জনগণের আনাগোনা তাদের শঙ্কাকে বাড়িয়ে তোলে। বিশ^াসের জায়গাটি ক্রমশই ক্ষীণ হয়ে আসছে। চিম্বুক পাহাড়ের ম্রোদের দৃষ্টান্তটি অবিশ^াসের তালিকায় নবতর সংযোজন।

২.

আমার পৈতৃকভিটা থেকে আদিবাসী কোল জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকাটি অনতিদূরে। এবার সুযোগ হলো ৩টি আদিবাসী কোল জনগোষ্ঠীর গ্রাম পরিদর্শনের। রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী থানার বাবুডাইং, চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদরের বিলবৈলঠা ও শান্তিপাড়া। জেলা সদর থেকে ৭/৮ কিলোমিটার দূরত্বের গ্রামগুলোতে এখনও উন্নয়নের ছোঁয়া পড়েনি। কয়েক বছর হলো বৈদ্যুতিক সংযোগ দেয়া হয়েছে এবং পিচ ঢালা রাস্তাও তাদের খুঁজে পেয়েছে কিন্তু জীবনযাত্রার কোন পরিবর্তন আসেনি। গ্রামে পৌঁছাতেই খবর পেলাম বাবুডাইং গ্রামের কয়েকটি পরিবার দিনাজপুরের কোন একদিক দিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করার সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে এবং দিনাজপুর কোর্টে মামলা ও জেলহাজতে অবস্থান করছেন। দু’একজনের সঙ্গে কথা বলে জানার চেষ্টা করেছি, কেন তারা দেশত্যাগে উদ্যত হয়েছেন! নির্ভয়তার সঙ্গে একজন কোল নারী জানালেন, বৃহত্তর সম্প্রদায়ের অবাধ আনাগোনাতে আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ চিন্তায় শঙ্কিত হয়ে উঠি; নেশাগ্রস্তদের উল্লম্ফনে বাধ্য হই নেশা জাতীয় দ্রব্য উৎপাদনে এবং ক্রেতা হয়ে চব্বিশ ঘণ্টা আমাদের নিজেদের অভ্যন্তরীণ সামাজিকতাকে ভঙ্গুর করে তুলেছে। আমাদের ঘরবাড়িগুলো সরকারি জায়গায় অবস্থিত, ক্ষমতাবান ও দলীয় লোকজনের মুহুর্মুহু হুমকি দিয়ে বাপ-দাদার ভিটেকে রাতের অন্ধকারেই বিদায় দিতে হচ্ছে। ডান হাত দিয়ে দেখিয়ে বললেন, ওই ঘরের লোকেরা যে ভারতে যাবে আমরা পার্শ্বে আছি, আমরাও থোড়াই খবর পেয়েছি! অত্যন্ত গোপনে নিজেদের সবকিছু বিক্রি করে হঠাৎ করেই পরের দিন সকালে জানলাম, প্রতিবেশী পরিবারটি আর নেই, সপরিবারে ভারতে চলে গেছেন। বিলবৈলঠা প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক মনোরঞ্জন টুডু জানান, কোল আদিবাসীরা শিক্ষাদীক্ষায় খুবই পিছিয়ে পড়া জাতিগোষ্ঠী। দেশত্যাগের কোন কারণই তারা শেয়ার করেন না; তবে দীর্ঘদিন তাদের সঙ্গে ওঠা-বসা এবং সাদা চোখে যেটি দেখেছি, তা হলো রাতের অন্ধকারে হঠাৎ উধাও হয়ে যায়। পড়াশোনা পাশাপাশি জীবনধারণের লক্ষ্যে পেশাগত দক্ষতা বাড়াতে প্রশিক্ষণের প্রয়োজন। বসতভিটা থেকে উচ্ছেদে স্থানীয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ এবং এগিয়ে আসা খুবই জরুরি; নইলে দেশত্যাগের মিছিলকে কোনভাবেই থামানো যাবে না। বেসরকারি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান ‘তাবিথা ফাউন্ডেশন’ ১টি প্রাইমারি ও ২টি প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা করে আসছে। গ্রামগুলো থেকে দেড় ডজন মেয়েকে হোস্টেলে রেখে পড়াশোনার ব্যবস্থা করে দিয়েছে; ছেলেদের জন্য রাজশাহী শহরে আরেকটি হোস্টেলের ব্যবস্থা করেছে। অভিভাবক ও উদ্যোগীদের সচেতনমূলক কার্যক্রমে যুক্ত করে কোল আদিবাসীদের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে। তারপরও নীরবে-নিভৃতে চলে যাওয়াকে ঠেকাতে ব্যর্থ হলে উবে যাবে সব কার্যসূচি।

আদিবাসী কোলদের ঘর দুয়ারগুলো ছোট ছোট মাটি দিয়ে তৈরি, বরেন্দ্রভূমির এঁটেল মাটিতে নির্মিত ঘরগুলো খুবই প্রকৃতি সহনীয়। আদিবাসী সাঁওতালদের সঙ্গে ভাষার মিল থাকায় খুব সহজেই বন্ধুত্ব ও মনের ভাব লেনদেন করা যায়। মতবিনিময় সভার আয়োজন করেছিল তাবিথা ফাউন্ডেশনের পরিচালক মি. স্টেফান সরেন। স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েরা আমাদের বরণ করে নেয়ার পরই চলে মাদলের তালে তালে গান আর নাচ। মতবিনিময় সভায় গোল করে বসলামÑ আমাদের দলে ছিলেন সাঁওতালি কবি প্রকৌশলী সামিয়েল কিস্কু, তিনি ছেলেমেয়েদের উদ্বুদ্ধকরণে দু’একটি কবিতা আওড়ালেন; সত্যিই ভাষার সৌন্দর্য ও ক্ষমতা যে রয়েছে, সেটি পুনর্বার উপলব্ধি করলাম। বিদ্যার্থী ছেলেমেয়েরা স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে, প্রত্যেকেই স্বপ্নের আকাশে পাখা মেলে ধরতে শিখেছে; প্রয়োজন শুধু তাদের পাশে দাঁড়ানো, সহযোগিতা এবং পথ দেখানো। এই ছেলেমেয়েরা নিজেদের ভালো, সমাজ ও জাতির ভবিষ্যৎ চিন্তা করতে সক্ষম; এই আশ্বাস নিয়ে প্রত্যাবর্তন করেছি। অভিভাবকদের ভাষা রক্ষার আবেদনও সত্যিই হৃদয়-মনকে ছুঁয়ে গেছে। এই প্রান্তিক জাতিগোষ্ঠীর ভাষা রক্ষার উদ্যোগ এখনই নেয়া দরকার।

খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের বড়দিনে প্রদত্ত বাণীতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উল্লেখ করেছেন, ‘...আমাদের সংবিধানে সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষের সমান অধিকার সুনিশ্চিত করা হয়েছে। সবাই মিলে যুদ্ধ করে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছি। তাই এই দেশে আমাদের সবার। বাংলাদেশ ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সব মানুষের নিরাপদ আবাসভূমি।’ ‘নিরাপদ আবাসভূমি’ হিসেবে বাংলাদেশকে নিশ্চিত করতে সরকারকে প্রতিটি স্তরে ব্যাপক কাজ করতে হবে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীকে রক্ষার দায়িত্ব শুধু সরকারই নয় সর্বস্তরের জনসাধারণকেও অংশগ্রহণ করতে হবে। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায় নিশ্চয়ই অসাম্প্রদায়িক, সম্প্রীতি ও ধর্মনিরপেক্ষতার ঝাণ্ডা সগৌরবে উড়তে থাকবে।

শনিবার, ০৯ জানুয়ারী ২০২১ , ২৫ পৌষ ১৪২৭, ২৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪২

ম্রো জাতিগোষ্ঠীর মতোই আদিবাসী কোলও সংকটাপন্ন

মিথুশিলাক মুরমু

১.

পার্বত্য চট্টগ্রামের ম্রো জনগোষ্ঠীর কোন একজনকে প্রশ্ন করলে- কেমন আছে আদিবাসী ম্রোরা! নিঃসন্দেহে এবং নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, ভালো নেই; তাদের উত্তরও সন্দেহাতীত। স্বাধীন বাংলাদেশের স্বাধীন নাগরিকরা উন্নয়নের নামে, পর্যটকদের আকৃষ্ট ও সুব্যবস্থায় ম্রো জাতিগোষ্ঠীকে উচ্ছেদান্তে পাঁচ তারকা হোস্টেল নির্মাণের উদ্যোগ সচেতন নাগরিকদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। দেশের অন্যতম ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান সিকদার গ্রুপ বান্দরবানের চিম্বুক পাহাড়ে হোটেল নির্মাণে ম্রোরা কী দেশান্তরিতের অশনিসংকেত দেখতে পাচ্ছেন। আদিবাসী নেতারা বলছেন, ‘বাংলাদেশে আবার পাকিস্তানি কায়দায় জনগোষ্ঠীদের তাড়ানো হোক, এটি আমরা চাই না। বান্দরবানে উন্নয়ন নয়, মুনাফার জন্য এটি করা হচ্ছে। এটি প্রকৃতিবহির্ভূত, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যবিরোধী। বান্দরবানে ওই হোটেল প্রকল্প তৈরি হলে, সেখানে ছয়টি গ্রামের ১১৬টি পাড়ায় প্রায় ১০ হাজার ম্রো বাসিন্দা উচ্ছেদের মুখে পড়বে। তাদের জীবিকা স্থায়ী ক্ষতিতে পড়বে। সেখানকার ঐতিহ্যবাহী জীবনাচার, পরিবেশ, প্রকৃতি নষ্ট করে মুনাফা, আয়েশি বিনোদন ও ভোগ বিলাসের জন্য এই প্রকল্প নেয়া হয়েছে।’

ক্ষুব্ধতায় তারা আরও বলেছেন, চিম্বুকের-বান্দরবান-চিম্বুক-থানচি সড়কের ৪৮ কিলোমিটারে নাইতংপাহাড়কে চন্দ্রপাহাড় নাম দিয়ে বিতর্কিত সিকদার গ্রুপ প্রায় ৮০০ থেকে ১ হাজার একর জমি অবৈধভাবে দখল করেছে। ওই জমিতে কাপ্রুপাড়া, দোলাপাড়া, ইরাপাড়া ও কলাইপাড়ার শতাধিক ¤্রাে পরিবার জুমচাষ ও বাগান করে আসছে। শত শত বছরের জীবন-জীবিকার জমিতে সিকদার গ্রুপের (আর অ্যা- আর হোল্ডিংস) বিলাসবহুল হোটেল ও পর্যটন স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ জাতিগত নিধনচেষ্টার শামিল। এ জমি দখলের বন্ধ না হলে চারটি পাড়া সরাসরি উচ্ছেদ হবে। আরও ৭০ থেকে ৮০টি পাড়ার প্রায় ১০ হাজার ম্রো উচ্ছেদের মুখে পড়বে। স্থানীয় কার্বারি লঙনাং ম্রো বলছেন, তাদের পাড়ার শ্মশানভূমি ও পানির উৎস দখল করে বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। বাধা দিলে ভালো বেতনের চাকরির প্রলোভন অথবা মামলার হুমকি দেয়া হয়। দেশের বুদ্ধিজীবীরা অভিমত পোষণ করেছেন, ‘এ ধরনের পদক্ষেপ সম্পূর্ণ অবৈধ, অন্যায় ও অমানবিক। অবিলম্বে এটি বন্ধ করতে হবে।’

আদিবাসী ম্র্রোদের বিষয়ে সবচেয়ে শঙ্কাজনক তথ্যাদি উপস্থাপন করেছেন চাকমা সার্কেল প্রধান রাজা দেবাশীষ রায়। তিনি বলেছেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে ম্রোদের সংখ্যা কমছে দিন দিন। তাদের অনেকেই মায়ানমারে চলে গেছে। প্রাকৃতিক সম্পদ ভোগদখল করে ম্রো জনগোষ্ঠীকে উচ্ছেদ করার এই ঘটনা লজ্জাজনক।’ হয়তো এভাবেই যুগের পর যুগ আদিবাসীরা নিগৃহীত হতে হতে সীমান্ত অতিক্রম করেছে। চিম্বুকের পাদদেশ শিখরে থাকায় সহজেই দেশবাসীর দৃষ্টি আকর্ষিত হয়েছে। দেশের জন্ম-মৃত্যুর হার ঊর্ধ্বগতি হলেও আদিবাসীদের ক্ষেত্রে কেন স্থবির হয়ে পড়ে! কেন-ই-বা আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলকে ট্যুরিজম স্পষ্ট হিসেবে মনোনীত করা হয়! আদিবাসী নারী-পুরুষ, পোশাক-পরিচ্ছেদ, সংস্কৃতিতে চোখের পিপাসা মিটিয়ে আমরা হাত বাড়িয়ে থাকি ঘরের অন্দরমহল পর্যন্ত। পার্বত্য অঞ্চলের আদিবাসীদের সঙ্গে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে বাঙালিরা আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখলেও হৃদয়ে ক্ষত দাগ অমলিন হয়ে রয়েছে। পাহাড়ি পরিচিতজনেরা জানায়, পার্বত্য অঞ্চলে অপরিচিত জনগণের আনাগোনা তাদের শঙ্কাকে বাড়িয়ে তোলে। বিশ^াসের জায়গাটি ক্রমশই ক্ষীণ হয়ে আসছে। চিম্বুক পাহাড়ের ম্রোদের দৃষ্টান্তটি অবিশ^াসের তালিকায় নবতর সংযোজন।

২.

আমার পৈতৃকভিটা থেকে আদিবাসী কোল জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকাটি অনতিদূরে। এবার সুযোগ হলো ৩টি আদিবাসী কোল জনগোষ্ঠীর গ্রাম পরিদর্শনের। রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী থানার বাবুডাইং, চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদরের বিলবৈলঠা ও শান্তিপাড়া। জেলা সদর থেকে ৭/৮ কিলোমিটার দূরত্বের গ্রামগুলোতে এখনও উন্নয়নের ছোঁয়া পড়েনি। কয়েক বছর হলো বৈদ্যুতিক সংযোগ দেয়া হয়েছে এবং পিচ ঢালা রাস্তাও তাদের খুঁজে পেয়েছে কিন্তু জীবনযাত্রার কোন পরিবর্তন আসেনি। গ্রামে পৌঁছাতেই খবর পেলাম বাবুডাইং গ্রামের কয়েকটি পরিবার দিনাজপুরের কোন একদিক দিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করার সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে এবং দিনাজপুর কোর্টে মামলা ও জেলহাজতে অবস্থান করছেন। দু’একজনের সঙ্গে কথা বলে জানার চেষ্টা করেছি, কেন তারা দেশত্যাগে উদ্যত হয়েছেন! নির্ভয়তার সঙ্গে একজন কোল নারী জানালেন, বৃহত্তর সম্প্রদায়ের অবাধ আনাগোনাতে আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ চিন্তায় শঙ্কিত হয়ে উঠি; নেশাগ্রস্তদের উল্লম্ফনে বাধ্য হই নেশা জাতীয় দ্রব্য উৎপাদনে এবং ক্রেতা হয়ে চব্বিশ ঘণ্টা আমাদের নিজেদের অভ্যন্তরীণ সামাজিকতাকে ভঙ্গুর করে তুলেছে। আমাদের ঘরবাড়িগুলো সরকারি জায়গায় অবস্থিত, ক্ষমতাবান ও দলীয় লোকজনের মুহুর্মুহু হুমকি দিয়ে বাপ-দাদার ভিটেকে রাতের অন্ধকারেই বিদায় দিতে হচ্ছে। ডান হাত দিয়ে দেখিয়ে বললেন, ওই ঘরের লোকেরা যে ভারতে যাবে আমরা পার্শ্বে আছি, আমরাও থোড়াই খবর পেয়েছি! অত্যন্ত গোপনে নিজেদের সবকিছু বিক্রি করে হঠাৎ করেই পরের দিন সকালে জানলাম, প্রতিবেশী পরিবারটি আর নেই, সপরিবারে ভারতে চলে গেছেন। বিলবৈলঠা প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক মনোরঞ্জন টুডু জানান, কোল আদিবাসীরা শিক্ষাদীক্ষায় খুবই পিছিয়ে পড়া জাতিগোষ্ঠী। দেশত্যাগের কোন কারণই তারা শেয়ার করেন না; তবে দীর্ঘদিন তাদের সঙ্গে ওঠা-বসা এবং সাদা চোখে যেটি দেখেছি, তা হলো রাতের অন্ধকারে হঠাৎ উধাও হয়ে যায়। পড়াশোনা পাশাপাশি জীবনধারণের লক্ষ্যে পেশাগত দক্ষতা বাড়াতে প্রশিক্ষণের প্রয়োজন। বসতভিটা থেকে উচ্ছেদে স্থানীয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ এবং এগিয়ে আসা খুবই জরুরি; নইলে দেশত্যাগের মিছিলকে কোনভাবেই থামানো যাবে না। বেসরকারি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান ‘তাবিথা ফাউন্ডেশন’ ১টি প্রাইমারি ও ২টি প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা করে আসছে। গ্রামগুলো থেকে দেড় ডজন মেয়েকে হোস্টেলে রেখে পড়াশোনার ব্যবস্থা করে দিয়েছে; ছেলেদের জন্য রাজশাহী শহরে আরেকটি হোস্টেলের ব্যবস্থা করেছে। অভিভাবক ও উদ্যোগীদের সচেতনমূলক কার্যক্রমে যুক্ত করে কোল আদিবাসীদের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে। তারপরও নীরবে-নিভৃতে চলে যাওয়াকে ঠেকাতে ব্যর্থ হলে উবে যাবে সব কার্যসূচি।

আদিবাসী কোলদের ঘর দুয়ারগুলো ছোট ছোট মাটি দিয়ে তৈরি, বরেন্দ্রভূমির এঁটেল মাটিতে নির্মিত ঘরগুলো খুবই প্রকৃতি সহনীয়। আদিবাসী সাঁওতালদের সঙ্গে ভাষার মিল থাকায় খুব সহজেই বন্ধুত্ব ও মনের ভাব লেনদেন করা যায়। মতবিনিময় সভার আয়োজন করেছিল তাবিথা ফাউন্ডেশনের পরিচালক মি. স্টেফান সরেন। স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েরা আমাদের বরণ করে নেয়ার পরই চলে মাদলের তালে তালে গান আর নাচ। মতবিনিময় সভায় গোল করে বসলামÑ আমাদের দলে ছিলেন সাঁওতালি কবি প্রকৌশলী সামিয়েল কিস্কু, তিনি ছেলেমেয়েদের উদ্বুদ্ধকরণে দু’একটি কবিতা আওড়ালেন; সত্যিই ভাষার সৌন্দর্য ও ক্ষমতা যে রয়েছে, সেটি পুনর্বার উপলব্ধি করলাম। বিদ্যার্থী ছেলেমেয়েরা স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে, প্রত্যেকেই স্বপ্নের আকাশে পাখা মেলে ধরতে শিখেছে; প্রয়োজন শুধু তাদের পাশে দাঁড়ানো, সহযোগিতা এবং পথ দেখানো। এই ছেলেমেয়েরা নিজেদের ভালো, সমাজ ও জাতির ভবিষ্যৎ চিন্তা করতে সক্ষম; এই আশ্বাস নিয়ে প্রত্যাবর্তন করেছি। অভিভাবকদের ভাষা রক্ষার আবেদনও সত্যিই হৃদয়-মনকে ছুঁয়ে গেছে। এই প্রান্তিক জাতিগোষ্ঠীর ভাষা রক্ষার উদ্যোগ এখনই নেয়া দরকার।

খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের বড়দিনে প্রদত্ত বাণীতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উল্লেখ করেছেন, ‘...আমাদের সংবিধানে সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষের সমান অধিকার সুনিশ্চিত করা হয়েছে। সবাই মিলে যুদ্ধ করে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছি। তাই এই দেশে আমাদের সবার। বাংলাদেশ ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সব মানুষের নিরাপদ আবাসভূমি।’ ‘নিরাপদ আবাসভূমি’ হিসেবে বাংলাদেশকে নিশ্চিত করতে সরকারকে প্রতিটি স্তরে ব্যাপক কাজ করতে হবে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীকে রক্ষার দায়িত্ব শুধু সরকারই নয় সর্বস্তরের জনসাধারণকেও অংশগ্রহণ করতে হবে। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায় নিশ্চয়ই অসাম্প্রদায়িক, সম্প্রীতি ও ধর্মনিরপেক্ষতার ঝাণ্ডা সগৌরবে উড়তে থাকবে।