বঙ্গবন্ধু যদি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন না করতেন

ড. আনু মাহ্মুদ

১০ জানুয়ারি ১৯৭২; বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনে ঢাকা শহর লোকে-লোকারণ্য। কণ্ঠে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’। অবশেষে অপেক্ষার পালা শেষ। ওই দিন দুপুর ২টায় দিল্লি থেকে বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী বিমান বাংলার মাটি স্পর্শ করলে সৃষ্টি হয় এক আবেগঘন পরিবেশ। তিনি প্রত্যাবর্তনের পরে আবেগতাড়িত কণ্ঠে বলেছিলেন- ‘হে কবিগুরু এসে দেখে যান, আমার সাত কোটি বাঙালি আজ মানুষ হয়েছে।’

সেদিন বিকাল ৫টায় রেসকোর্স ময়দানে প্রায় ১০ লাখ লোকের উপস্থিতিতে ভাষণ দিতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু আবেগাপ্লুত হয়ে বলেছিলেন- ‘নেতা হিসেবে নয়, ভাই হিসেবে আমি আমার দেশবাসীকে বলছি- আমাদের সাধারণ মানুষ যদি আশ্রয় না পায়, খাবার না পায়, যুবকেরা যদি চাকরি বা কাজ না পায়, তাহলে আমাদের এ স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়ে যাবে, পূর্ণ হবে না। আমাদের এখন তাই অনেক কাজ করতে হবে। আমাদের রাস্তা-ঘাট ভেঙে গেছে, সেগুলো মেরামত করতে হবে।’

বক্তৃতাদানকালে বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠ বারবার বাকরুদ্ধ হয়ে আসছিল। রুমাল দিয়ে তিনি চোখ মুছে নিচ্ছিলেন। জাতির উদ্দেশে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন, যা ছিল জাতির জন্য দিক-নির্দেশনা। বাংলাদেশের আদর্শ ভিত্তি কী হবে, কাঠামো কী ধরনের হবে, পাকস্তানি বাহিনীর সাথে যারা দালালি ও সহযোগিতা করেছে তাদের কী হবে, বাংলাদেশকে বহির্বিশ^ স্বীকৃতি দেয়ার জন্য অনুরোধ, মুক্তিবাহিনী, ছাত্রসমাজ, কৃষক, শ্রমিকদের কাজ কী হবে, এসব বিষয়সহ বিভিন্ন দিক নিয়ে যে নির্দেশনামূলক ভাষণ দিয়েছিলেন সেই ভাষণকে একজন প্রাজ্ঞ রাষ্ট্রনায়কের নীতিনির্ধারণী ভাষণ বলে উল্লেখ করা যায়।

বঙ্গবন্ধু ডাক দিলেন দেশ গড়ার সংগ্রামের। রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত জনতা দু’হাত তুলে সেই সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিলেন।

যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি ভয়াবহ অস্থিতিশীল অবস্থা বঙ্গবন্ধুকে জেঁকে ধরল। ছিল হাজারো সমস্যা ও সংকটের নানা মাত্রিকতা। প্রধানত যেসব ভয়াবহ সমস্যা সামনে দাঁড়িয়েছিল তার মধ্যে-

(১) প্রায় তিন লাখ অস্ত্র বিভিন্ন ব্যক্তি, গ্রুপ, মুক্তিবাহিনী ও গেরিলা বাহিনী এমনকি জনগণের মাঝে ছড়ানো-ছিটানো ছিল;

(২) স্বাধীনতাবিরোধী চক্র আলবদর, আলশামস ও রাজাকার বাহিনীর হাতে ছিল প্রায় লক্ষাধিক অস্ত্র;

(৩) উগ্র চীনপন্থিদের হাতে ছিল কয়েক হাজার অস্ত্র;

(৪) মুজিব বাহিনীর অন্যতম নেতৃত্ব শেখ ফজলুল হক মণি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছিলেন- শেখ মুজিব দেশে ফিরে না এলে মুজিব বাহিনীর কেউই অস্ত্র জমা দেবে না;

(৫) জেনারেল উবানের ভাষ্যমতে, মুজিব বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল দশ সহস্রাধিক। তাদের কাছে ছিল অপেক্ষাকৃত উন্নত ধরনের অস্ত্র। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের অস্ত্র জমা দেয়ার আহ্বানে সবাই ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন এমন বলা যাবে না। কিছুদিনের মধ্যে সরকার কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মিলিশিয়া ক্যাম্পে বিশৃঙ্খলা শুরু হয়;

(৬) সেনাবাহিনীর মধ্যেও বিভিন্ন উপদলীয় কোন্দল মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল, চেন অব কমান্ডের ভিত্তি ছিল নড়বড়ে;

(৭) বাংলাদেশে ভারতের মিত্রবাহিনী অবস্থান করার পরও বিভিন্ন জায়গা থেকে সংবাদ পাওয়া যাচ্ছিল যে, ওই বাহিনীর সঙ্গে বাংলাদেশের কিছু কিছু সেনা কর্মকর্তার কথাকাটাকাটি এবং মৃদু সংঘর্ষ হচ্ছে। খুলনায় মেজর জলিলের সঙ্গে ভারতীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয় এবং শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে মেজর জলিলকে গ্রেপ্তার করা হয়;

(৮) স্বাধীনতাবিরোধী চক্র ‘মুসলিম বাংলা’ সেøাগান দিয়ে বিভিন্ন স্থানে প্রচার-প্রোপাগাণ্ডা, এমনকি পাকিস্তান হাইফ্রিকোয়েন্সি বেতারযন্ত্র থেকে ‘মুসলিম বাংলার’ সপক্ষে প্রচারণা শুরু করে। তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে লাগাতার অপপ্রচার করে। আলবদর, আলশামস-রাজাকার ও অন্যান্য বাহিনী যাদের অধিকাংশ ছিল নন-বেঙ্গলি, তারা বলতে গেলে মিরপুর-সৈয়দপুর এলাকা দখল করে রেখেছিল। বহু বাঙালিকে হত্যা করে;

(৯) এমতাবস্থায় ভারতীয় মিত্রবাহিনী বাংলাদেশ থেকে প্রত্যাহারের বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে দাঁড়ায়। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিতে এটা হতো বিরাট প্রতিবন্ধকতা। মার্কিন নথিপত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ফিরে না এলে বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা সহসা আসত না এবং পর্যায়ক্রমিকভাবে সংঘর্ষ ও সশস্ত্র আন্তঃকোন্দলে স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বকে বিপন্ন করে তুলত। অন্যদিকে উপমহাদেশে যুদ্ধাবস্থা ও ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো;

(১১) আরও একটি মৌলিক বিষয় ছিল- মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ৩০ লাখ টন খাদ্য ঘাটতি ছিল। বিবিসি ও পশ্চিমা মিডিয়ার সূত্রমতে, এক কোটি লোক অনাহারে মারা যেত। তিন কোটি ছিন্নমূল মানুষ যাদের ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছিল। জামির ফসল বিনষ্ট হয়েছিল, অগ্নিদগ্ধ হয়েছিল ৫০ লাখ ঘরবাড়ি, জল-নৌ-বন্দরসহ অবকাঠামো বলতে গেলে সবকিছু ছিল ধ্বংসপ্রাপ্ত। রেল, নৌযান ও সড়ক পরিবহন ছিল অচল;

(১১) সশস্ত্র যুদ্ধে অর্জিত স্বাধীন দেশের উপযোগী রাষ্ট্রীয় কাঠামো গড়ে তোলা এবং স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা ছিল বিরাট চ্যালেঞ্জ। সে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার মতো শক্তি ও সামর্থ্য সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের নেতৃত্বের পক্ষে মোকাবিলা করা ছিল বিরাট অনিশ্চিত চ্যালেঞ্জ;

(১২) বঙ্গবন্ধু ফিরে আসা পর্যন্ত অর্থাৎ ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছিলো মাত্র দুটি দেশ- ভুটান ও ভারত।

(১৩) উগ্র চীনপন্থিরা বিভিন্ন এলাকায় সশস্ত্রভাবে খুন, লুট ও রাষ্ট্রদ্রোহ কার্যকলাপে লিপ্ত হয় এবং কোথাও তারা লাল পতাকা উড়িয়ে মুক্তাঞ্চল ঘোষণা করে। উগ্র চীনপন্থিদের একটি গ্রুপের নেতা আবদুল হক পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলি ভুট্টোর কাছে পত্র পাঠিয়ে অস্ত্র ও অর্থ সাহায্য চেয়েছিল;

(১৪) এর পাশাপাশি পাকিস্তানের সরাসরি মদদে স্বাধীনতাবিরোধী চক্র তাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বাংলাদেশ-বার্মার বর্ডারে উপস্থিত পাকিস্তানি সৈন্যদের সঙ্গে একত্র হয়ে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়;

(১৫) এর সঙ্গে উগ্র চীনপন্থিরা যশোর, নোয়াখালী, পাবনা, আত্রাই এলাকায় ‘খতমের রাজনীতি’ শুরু করে এবং এ লক্ষ্যে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশের জন্য এগুলো ছিল রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও অস্তিত্বের জন্য হুমকি। এগুলো কোনটাই উপেক্ষার মতো ছিল না,

(১৬) মার্কিন গোপন দলিলপত্রে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, শেখ মুজিব যদি বাংলাদেশে ফিরতে না পারেন অথবা যদি তাকে ফাঁসি দেয়া হয়, তাহলে শুধু বাংলাদেশ নয়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো হয়ে পড়বে অস্থিতিশীল;

(১৭) হেনরি কিসিঞ্জার বলেন- শেখ মুজিব স্বদেশে প্রত্যাবর্তন না করলে পশ্চিমবঙ্গের বাকশালপন্থিরা বাংলাদেশকে উর্বরক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করবে এবং ভারতেও তা ছড়িয়ে দেবে; অন্যদিকে বাংলদেশে আটক ৯৩ হাজার সৈন্যের জীবন সংকটাপন্ন হয়ে উঠবে। তেমনি পশ্চিম পাকিস্তান বন্দিশিবিরে চার লাখ সামরিক-বেসামরিক বাঙালির জীবন হয়ে পড়বে দুঃসহ;

(১৮) এমন অবস্থায় বাংলাদেশ বিশ্বস্বীকৃতির প্রশ্নে জটিল আবর্তে পড়ে যেত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন নথিতে লক্ষণীয়- রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার ক্ষেত্রে তারা পাকিস্তানের মতামতকে গুরুত্ব দিয়েছিল;

(১৯) জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বদেশে ফিরে না এলে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব সুসংহত, রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, মৃত্যুমুখে পতিত লাখ লাখ মানুষের জীবনমান রক্ষা, জনজীবনের নিরাপত্তা বিধান, অস্ত্র উদ্ধার ও দ্রুত সময়ে রক্তের মূল্যে লেখা সংবিধান উপহার পেত কী?

সেই বিচারে ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস শুধু একটি দিবস নয়, নানা মাত্রিকতায়ও তাৎপর্যপূর্ণ।

[লেখক : অর্থনীতির বিশ্লেষক, কলামিস্ট]

anumahmud@yahoo.com

সোমবার, ১১ জানুয়ারী ২০২১ , ২৭ পৌষ ১৪২৭, ২৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪২

বঙ্গবন্ধু যদি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন না করতেন

ড. আনু মাহ্মুদ
image

১০ জানুয়ারি ১৯৭২; বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনে ঢাকা শহর লোকে-লোকারণ্য। কণ্ঠে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’। অবশেষে অপেক্ষার পালা শেষ। ওই দিন দুপুর ২টায় দিল্লি থেকে বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী বিমান বাংলার মাটি স্পর্শ করলে সৃষ্টি হয় এক আবেগঘন পরিবেশ। তিনি প্রত্যাবর্তনের পরে আবেগতাড়িত কণ্ঠে বলেছিলেন- ‘হে কবিগুরু এসে দেখে যান, আমার সাত কোটি বাঙালি আজ মানুষ হয়েছে।’

সেদিন বিকাল ৫টায় রেসকোর্স ময়দানে প্রায় ১০ লাখ লোকের উপস্থিতিতে ভাষণ দিতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু আবেগাপ্লুত হয়ে বলেছিলেন- ‘নেতা হিসেবে নয়, ভাই হিসেবে আমি আমার দেশবাসীকে বলছি- আমাদের সাধারণ মানুষ যদি আশ্রয় না পায়, খাবার না পায়, যুবকেরা যদি চাকরি বা কাজ না পায়, তাহলে আমাদের এ স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়ে যাবে, পূর্ণ হবে না। আমাদের এখন তাই অনেক কাজ করতে হবে। আমাদের রাস্তা-ঘাট ভেঙে গেছে, সেগুলো মেরামত করতে হবে।’

বক্তৃতাদানকালে বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠ বারবার বাকরুদ্ধ হয়ে আসছিল। রুমাল দিয়ে তিনি চোখ মুছে নিচ্ছিলেন। জাতির উদ্দেশে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন, যা ছিল জাতির জন্য দিক-নির্দেশনা। বাংলাদেশের আদর্শ ভিত্তি কী হবে, কাঠামো কী ধরনের হবে, পাকস্তানি বাহিনীর সাথে যারা দালালি ও সহযোগিতা করেছে তাদের কী হবে, বাংলাদেশকে বহির্বিশ^ স্বীকৃতি দেয়ার জন্য অনুরোধ, মুক্তিবাহিনী, ছাত্রসমাজ, কৃষক, শ্রমিকদের কাজ কী হবে, এসব বিষয়সহ বিভিন্ন দিক নিয়ে যে নির্দেশনামূলক ভাষণ দিয়েছিলেন সেই ভাষণকে একজন প্রাজ্ঞ রাষ্ট্রনায়কের নীতিনির্ধারণী ভাষণ বলে উল্লেখ করা যায়।

বঙ্গবন্ধু ডাক দিলেন দেশ গড়ার সংগ্রামের। রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত জনতা দু’হাত তুলে সেই সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিলেন।

যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি ভয়াবহ অস্থিতিশীল অবস্থা বঙ্গবন্ধুকে জেঁকে ধরল। ছিল হাজারো সমস্যা ও সংকটের নানা মাত্রিকতা। প্রধানত যেসব ভয়াবহ সমস্যা সামনে দাঁড়িয়েছিল তার মধ্যে-

(১) প্রায় তিন লাখ অস্ত্র বিভিন্ন ব্যক্তি, গ্রুপ, মুক্তিবাহিনী ও গেরিলা বাহিনী এমনকি জনগণের মাঝে ছড়ানো-ছিটানো ছিল;

(২) স্বাধীনতাবিরোধী চক্র আলবদর, আলশামস ও রাজাকার বাহিনীর হাতে ছিল প্রায় লক্ষাধিক অস্ত্র;

(৩) উগ্র চীনপন্থিদের হাতে ছিল কয়েক হাজার অস্ত্র;

(৪) মুজিব বাহিনীর অন্যতম নেতৃত্ব শেখ ফজলুল হক মণি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছিলেন- শেখ মুজিব দেশে ফিরে না এলে মুজিব বাহিনীর কেউই অস্ত্র জমা দেবে না;

(৫) জেনারেল উবানের ভাষ্যমতে, মুজিব বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল দশ সহস্রাধিক। তাদের কাছে ছিল অপেক্ষাকৃত উন্নত ধরনের অস্ত্র। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের অস্ত্র জমা দেয়ার আহ্বানে সবাই ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন এমন বলা যাবে না। কিছুদিনের মধ্যে সরকার কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মিলিশিয়া ক্যাম্পে বিশৃঙ্খলা শুরু হয়;

(৬) সেনাবাহিনীর মধ্যেও বিভিন্ন উপদলীয় কোন্দল মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল, চেন অব কমান্ডের ভিত্তি ছিল নড়বড়ে;

(৭) বাংলাদেশে ভারতের মিত্রবাহিনী অবস্থান করার পরও বিভিন্ন জায়গা থেকে সংবাদ পাওয়া যাচ্ছিল যে, ওই বাহিনীর সঙ্গে বাংলাদেশের কিছু কিছু সেনা কর্মকর্তার কথাকাটাকাটি এবং মৃদু সংঘর্ষ হচ্ছে। খুলনায় মেজর জলিলের সঙ্গে ভারতীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয় এবং শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে মেজর জলিলকে গ্রেপ্তার করা হয়;

(৮) স্বাধীনতাবিরোধী চক্র ‘মুসলিম বাংলা’ সেøাগান দিয়ে বিভিন্ন স্থানে প্রচার-প্রোপাগাণ্ডা, এমনকি পাকিস্তান হাইফ্রিকোয়েন্সি বেতারযন্ত্র থেকে ‘মুসলিম বাংলার’ সপক্ষে প্রচারণা শুরু করে। তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে লাগাতার অপপ্রচার করে। আলবদর, আলশামস-রাজাকার ও অন্যান্য বাহিনী যাদের অধিকাংশ ছিল নন-বেঙ্গলি, তারা বলতে গেলে মিরপুর-সৈয়দপুর এলাকা দখল করে রেখেছিল। বহু বাঙালিকে হত্যা করে;

(৯) এমতাবস্থায় ভারতীয় মিত্রবাহিনী বাংলাদেশ থেকে প্রত্যাহারের বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে দাঁড়ায়। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিতে এটা হতো বিরাট প্রতিবন্ধকতা। মার্কিন নথিপত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ফিরে না এলে বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা সহসা আসত না এবং পর্যায়ক্রমিকভাবে সংঘর্ষ ও সশস্ত্র আন্তঃকোন্দলে স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বকে বিপন্ন করে তুলত। অন্যদিকে উপমহাদেশে যুদ্ধাবস্থা ও ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো;

(১১) আরও একটি মৌলিক বিষয় ছিল- মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ৩০ লাখ টন খাদ্য ঘাটতি ছিল। বিবিসি ও পশ্চিমা মিডিয়ার সূত্রমতে, এক কোটি লোক অনাহারে মারা যেত। তিন কোটি ছিন্নমূল মানুষ যাদের ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছিল। জামির ফসল বিনষ্ট হয়েছিল, অগ্নিদগ্ধ হয়েছিল ৫০ লাখ ঘরবাড়ি, জল-নৌ-বন্দরসহ অবকাঠামো বলতে গেলে সবকিছু ছিল ধ্বংসপ্রাপ্ত। রেল, নৌযান ও সড়ক পরিবহন ছিল অচল;

(১১) সশস্ত্র যুদ্ধে অর্জিত স্বাধীন দেশের উপযোগী রাষ্ট্রীয় কাঠামো গড়ে তোলা এবং স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা ছিল বিরাট চ্যালেঞ্জ। সে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার মতো শক্তি ও সামর্থ্য সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের নেতৃত্বের পক্ষে মোকাবিলা করা ছিল বিরাট অনিশ্চিত চ্যালেঞ্জ;

(১২) বঙ্গবন্ধু ফিরে আসা পর্যন্ত অর্থাৎ ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছিলো মাত্র দুটি দেশ- ভুটান ও ভারত।

(১৩) উগ্র চীনপন্থিরা বিভিন্ন এলাকায় সশস্ত্রভাবে খুন, লুট ও রাষ্ট্রদ্রোহ কার্যকলাপে লিপ্ত হয় এবং কোথাও তারা লাল পতাকা উড়িয়ে মুক্তাঞ্চল ঘোষণা করে। উগ্র চীনপন্থিদের একটি গ্রুপের নেতা আবদুল হক পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলি ভুট্টোর কাছে পত্র পাঠিয়ে অস্ত্র ও অর্থ সাহায্য চেয়েছিল;

(১৪) এর পাশাপাশি পাকিস্তানের সরাসরি মদদে স্বাধীনতাবিরোধী চক্র তাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বাংলাদেশ-বার্মার বর্ডারে উপস্থিত পাকিস্তানি সৈন্যদের সঙ্গে একত্র হয়ে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়;

(১৫) এর সঙ্গে উগ্র চীনপন্থিরা যশোর, নোয়াখালী, পাবনা, আত্রাই এলাকায় ‘খতমের রাজনীতি’ শুরু করে এবং এ লক্ষ্যে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশের জন্য এগুলো ছিল রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও অস্তিত্বের জন্য হুমকি। এগুলো কোনটাই উপেক্ষার মতো ছিল না,

(১৬) মার্কিন গোপন দলিলপত্রে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, শেখ মুজিব যদি বাংলাদেশে ফিরতে না পারেন অথবা যদি তাকে ফাঁসি দেয়া হয়, তাহলে শুধু বাংলাদেশ নয়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো হয়ে পড়বে অস্থিতিশীল;

(১৭) হেনরি কিসিঞ্জার বলেন- শেখ মুজিব স্বদেশে প্রত্যাবর্তন না করলে পশ্চিমবঙ্গের বাকশালপন্থিরা বাংলাদেশকে উর্বরক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করবে এবং ভারতেও তা ছড়িয়ে দেবে; অন্যদিকে বাংলদেশে আটক ৯৩ হাজার সৈন্যের জীবন সংকটাপন্ন হয়ে উঠবে। তেমনি পশ্চিম পাকিস্তান বন্দিশিবিরে চার লাখ সামরিক-বেসামরিক বাঙালির জীবন হয়ে পড়বে দুঃসহ;

(১৮) এমন অবস্থায় বাংলাদেশ বিশ্বস্বীকৃতির প্রশ্নে জটিল আবর্তে পড়ে যেত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন নথিতে লক্ষণীয়- রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার ক্ষেত্রে তারা পাকিস্তানের মতামতকে গুরুত্ব দিয়েছিল;

(১৯) জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বদেশে ফিরে না এলে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব সুসংহত, রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, মৃত্যুমুখে পতিত লাখ লাখ মানুষের জীবনমান রক্ষা, জনজীবনের নিরাপত্তা বিধান, অস্ত্র উদ্ধার ও দ্রুত সময়ে রক্তের মূল্যে লেখা সংবিধান উপহার পেত কী?

সেই বিচারে ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস শুধু একটি দিবস নয়, নানা মাত্রিকতায়ও তাৎপর্যপূর্ণ।

[লেখক : অর্থনীতির বিশ্লেষক, কলামিস্ট]

anumahmud@yahoo.com