অপরাধ বাড়ছে রোহিঙ্গা শিবিরে

কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের অপরাধের মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলেছে। বলপ্রয়োগে বাস্তুচ্যুত মায়ানমারের এসব নাগরিক বিভিন্ন ক্যাম্পে অর্থ লেনদেন ও ব্যবসা-বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। আবার অনেকেই জড়িয়েছে অস্ত্র ও মাদক কারবারে। পাশাপাশি পুরো ক্যাম্পজুড়ে চলছে গ্রুপভিত্তিক চাঁদাবাজি। প্রশাসনের অগোচরে এসব ক্যাম্পে বিভিন্ন ধরনের কমিটি গঠন করছে রোহিঙ্গারা। অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে নতুন আর পুরাতন রোহিঙ্গাদের মধ্যে সংঘর্ষ। তাদের বেপরোয়া কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে সাধারণ রোহিঙ্গারা। যার কারণে ক্যাম্পে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। শুধু তাই নয়, রাতে ক্যাম্পে কি ঘটছে তার খবর পাচ্ছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ৩ বছরে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বিরুদ্ধে ১২ ধরনের অপরাধে ৭৩১টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এতে আসামি করা হয়েছে ১ হাজার ৬৭১ জন রোহিঙ্গাকে। এসব অপরাধের মধ্যে আছে অস্ত্র, মাদক, ধর্ষণ, অপহরণ, বিশেষ ক্ষমতা আইন, পুলিশ আক্রান্ত, ডাকাতি বা ডাকাতির প্রস্তুতি, হত্যা, মানবপাচার ইত্যাদি। এরমধ্যে ৫৩টি খুন, ৪১০টি মাদক, ২৮টি মানব পাচার, ৫৯টি অস্ত্র, ৩৫টি ধর্ষণ ও ১০টি ডাকাতি এবং ১৬টি অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের মামলা উল্লেখযোগ্য।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রোহিঙ্গারা দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে। ক্যাম্পে কয়েকটি গ্রুপ মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত। তারা মায়ানমার থেকে সরাসরি ইয়াবার চালান এনে ক্যাম্পে মজুদ রাখে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়াকড়ির মধ্যেও ক্যাম্পে ইয়াবার চালান, মজুদ এবং লেনদেন করছে। কয়েকজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘিঞ্জি এলাকা হওয়ায় অপরাধীরা সেখানে অবস্থানের সুযোগ পাচ্ছে। সেখানে যখন-তখন অভিযান চালানো সম্ভব হয় না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে। এ সুযোগে ক্যাম্পে ঘটছে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। অধিকাংশ ক্যাম্প পাহাড় সংলগ্ন হওয়ায় সম্প্রতি কয়েকটি ডাকাত দলের অপরাধ কর্মকাণ্ড বেড়েছে। ফলে ক্যাম্পে অপরাধীদের জন্য নিরাপদ স্থানে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ইয়াবা মজুদ ও লেনদেনের জন্য ক্যাম্পগুলো ব্যবহার করছে রোহিঙ্গা অপরাধীরা।

জানা গেছে, স্বাধীনতার আগে থেকে রোহিঙ্গাদের অনেকে এদেশে ব্যবসায়িক সূত্রে আসা-যাওয়া ছিল। সামরিক নিপীড়ন শুরু হওয়ায় আশির দশক থেকে হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পাড়ি জমাতে থাকে। বর্তমানে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায় ৩৪টি স্বীকৃত ক্যাম্পে ১১ লাখ ১৮ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী আশ্রয় কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে কক্সবাজার। যা বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক এবং রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছে বিশেষজ্ঞ মহল। মানবিক কারণে তাদের আশ্রয় দেয়া হলেও তারা এখন হয়ে উঠেছে সরকারের মাথাব্যথার কারণ। এরা নষ্ট করছে উখিয়া-টেকনাফের শান্তিময় পরিবেশ। গোলাগুলি ও হামলায় প্রায় মাসেই রক্তাক্ত হয়ে উঠছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর পরিবেশ।

তারই ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ ১০ জানুয়ারি ভোরে কক্সবাজারের টেকনাফে রোহিঙ্গা শিবিরে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে আবারও দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে নুর হাকিম নামে এক রোহিঙ্গা যুবক নিহত হয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছে অন্তত ১২ জন। নিহত নুর হাকিম টেকনাফের চাকমারকুল রোহিঙ্গা শিবিরের ২১ নম্বর ক্যাম্পের সি-ব্লকের হোসেন আলীর ছেলে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন টেকনাফের হোয়াইক্যং পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ নুরে আলম।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উখিয়ার হাকিমপাড়া ও জামতলী রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে একদল রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী টেকনাফের চাকমারকুল রোহিঙ্গা শিবিরের সি ব্লকে যায়। সেখানে তাদের সঙ্গে তোহা বাহিনীর ৬০-৭০ রাউন্ড গুলি বিনিময় হয়।

এদিকে পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, নিহত ব্যক্তি ক্যাম্পের একজন বাসিন্দা। তার নাম নুর হাকিম, বয়স ২৭। নিহতের শরীরের কোথাও গুলির কোন চিহ্ন পাওয়া যায়নি। গোলাগুলির শব্দে আতঙ্কিত হয়ে দৌড়াদৌড়ির সময় তিনি পড়ে গিয়ে মারা যেতে পারেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তাই মৃত্যুর সঠিক কারণ জানতে লাশটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার মর্গে পাঠানো হয়েছে।

এ বিষয়ে কক্সবাজারস্থ ১৬ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অধিনায়ক এসপি তারিকুল ইসলাম জানান, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। এছাড়া এপিবিএন-এর বিভিন্ন চেকপোস্টে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে।

কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের প্রতিনিধি এবং টেকনাফ চাকমারকুল রোহিঙ্গা শিবিরের ইনচার্জ (সিআইসি) সাধনা ত্রিপুরা জানান, শিবিরে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। কী বিষয়ে এবং কী কারণে ঘটেছে তা জানার চেষ্টা চলছে। তবে ক্যাম্পের আইনশৃঙ্খলা বিষয়ে তিনি এড়িয়ে যান।

মঙ্গলবার, ১২ জানুয়ারী ২০২১ , ২৮ পৌষ ১৪২৭, ২৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪২

অপরাধ বাড়ছে রোহিঙ্গা শিবিরে

তিন বছরে ১২ ধরনের অপরাধে ৭৩১টি মামলা

কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের অপরাধের মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলেছে। বলপ্রয়োগে বাস্তুচ্যুত মায়ানমারের এসব নাগরিক বিভিন্ন ক্যাম্পে অর্থ লেনদেন ও ব্যবসা-বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। আবার অনেকেই জড়িয়েছে অস্ত্র ও মাদক কারবারে। পাশাপাশি পুরো ক্যাম্পজুড়ে চলছে গ্রুপভিত্তিক চাঁদাবাজি। প্রশাসনের অগোচরে এসব ক্যাম্পে বিভিন্ন ধরনের কমিটি গঠন করছে রোহিঙ্গারা। অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে নতুন আর পুরাতন রোহিঙ্গাদের মধ্যে সংঘর্ষ। তাদের বেপরোয়া কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে সাধারণ রোহিঙ্গারা। যার কারণে ক্যাম্পে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। শুধু তাই নয়, রাতে ক্যাম্পে কি ঘটছে তার খবর পাচ্ছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ৩ বছরে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বিরুদ্ধে ১২ ধরনের অপরাধে ৭৩১টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এতে আসামি করা হয়েছে ১ হাজার ৬৭১ জন রোহিঙ্গাকে। এসব অপরাধের মধ্যে আছে অস্ত্র, মাদক, ধর্ষণ, অপহরণ, বিশেষ ক্ষমতা আইন, পুলিশ আক্রান্ত, ডাকাতি বা ডাকাতির প্রস্তুতি, হত্যা, মানবপাচার ইত্যাদি। এরমধ্যে ৫৩টি খুন, ৪১০টি মাদক, ২৮টি মানব পাচার, ৫৯টি অস্ত্র, ৩৫টি ধর্ষণ ও ১০টি ডাকাতি এবং ১৬টি অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের মামলা উল্লেখযোগ্য।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রোহিঙ্গারা দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে। ক্যাম্পে কয়েকটি গ্রুপ মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত। তারা মায়ানমার থেকে সরাসরি ইয়াবার চালান এনে ক্যাম্পে মজুদ রাখে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়াকড়ির মধ্যেও ক্যাম্পে ইয়াবার চালান, মজুদ এবং লেনদেন করছে। কয়েকজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘিঞ্জি এলাকা হওয়ায় অপরাধীরা সেখানে অবস্থানের সুযোগ পাচ্ছে। সেখানে যখন-তখন অভিযান চালানো সম্ভব হয় না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে। এ সুযোগে ক্যাম্পে ঘটছে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। অধিকাংশ ক্যাম্প পাহাড় সংলগ্ন হওয়ায় সম্প্রতি কয়েকটি ডাকাত দলের অপরাধ কর্মকাণ্ড বেড়েছে। ফলে ক্যাম্পে অপরাধীদের জন্য নিরাপদ স্থানে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ইয়াবা মজুদ ও লেনদেনের জন্য ক্যাম্পগুলো ব্যবহার করছে রোহিঙ্গা অপরাধীরা।

জানা গেছে, স্বাধীনতার আগে থেকে রোহিঙ্গাদের অনেকে এদেশে ব্যবসায়িক সূত্রে আসা-যাওয়া ছিল। সামরিক নিপীড়ন শুরু হওয়ায় আশির দশক থেকে হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পাড়ি জমাতে থাকে। বর্তমানে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায় ৩৪টি স্বীকৃত ক্যাম্পে ১১ লাখ ১৮ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী আশ্রয় কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে কক্সবাজার। যা বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক এবং রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছে বিশেষজ্ঞ মহল। মানবিক কারণে তাদের আশ্রয় দেয়া হলেও তারা এখন হয়ে উঠেছে সরকারের মাথাব্যথার কারণ। এরা নষ্ট করছে উখিয়া-টেকনাফের শান্তিময় পরিবেশ। গোলাগুলি ও হামলায় প্রায় মাসেই রক্তাক্ত হয়ে উঠছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর পরিবেশ।

তারই ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ ১০ জানুয়ারি ভোরে কক্সবাজারের টেকনাফে রোহিঙ্গা শিবিরে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে আবারও দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে নুর হাকিম নামে এক রোহিঙ্গা যুবক নিহত হয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছে অন্তত ১২ জন। নিহত নুর হাকিম টেকনাফের চাকমারকুল রোহিঙ্গা শিবিরের ২১ নম্বর ক্যাম্পের সি-ব্লকের হোসেন আলীর ছেলে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন টেকনাফের হোয়াইক্যং পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ নুরে আলম।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উখিয়ার হাকিমপাড়া ও জামতলী রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে একদল রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী টেকনাফের চাকমারকুল রোহিঙ্গা শিবিরের সি ব্লকে যায়। সেখানে তাদের সঙ্গে তোহা বাহিনীর ৬০-৭০ রাউন্ড গুলি বিনিময় হয়।

এদিকে পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, নিহত ব্যক্তি ক্যাম্পের একজন বাসিন্দা। তার নাম নুর হাকিম, বয়স ২৭। নিহতের শরীরের কোথাও গুলির কোন চিহ্ন পাওয়া যায়নি। গোলাগুলির শব্দে আতঙ্কিত হয়ে দৌড়াদৌড়ির সময় তিনি পড়ে গিয়ে মারা যেতে পারেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তাই মৃত্যুর সঠিক কারণ জানতে লাশটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার মর্গে পাঠানো হয়েছে।

এ বিষয়ে কক্সবাজারস্থ ১৬ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অধিনায়ক এসপি তারিকুল ইসলাম জানান, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। এছাড়া এপিবিএন-এর বিভিন্ন চেকপোস্টে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে।

কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের প্রতিনিধি এবং টেকনাফ চাকমারকুল রোহিঙ্গা শিবিরের ইনচার্জ (সিআইসি) সাধনা ত্রিপুরা জানান, শিবিরে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। কী বিষয়ে এবং কী কারণে ঘটেছে তা জানার চেষ্টা চলছে। তবে ক্যাম্পের আইনশৃঙ্খলা বিষয়ে তিনি এড়িয়ে যান।