৪৯ বছর পর শহীদ মুক্তিযোদ্ধার কবর খুঁজে পেয়েছেন স্বজনরা

কিশোরগঞ্জ থেকে মৌলভীবাজার গিয়ে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন

স্বাধীনতার ৪৯ বছর পর এক শহীদ মুক্তিযোদ্ধার কবর খুঁজে পেয়েছেন স্বজনরা। কিশোরগঞ্জ জেলার ওই মুক্তিযোদ্ধা ১৯৭১ সালে সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজারে গিয়ে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। ভারতের লোহারবন্দে ট্রেনিং শেষে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন যুদ্ধে। দেশ স্বাধীন হলেও তিনি আর বাড়ি ফেরেননি। অবশেষে বীর মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার হোসেনের কবরের খোঁজ মিলেছে বড়লেখা উপজেলায়। কিন্তু সন্তানের কবর শনাক্ত হওয়ার কথা আর কখনওই জানতে পারবেন না তার বাবা-মা। তারা দু’জনই মারা গেছেন অনেক আগে।

মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণভাগ দক্ষিণ ইউনিয়নের চানপুর-হাশিমপুর দরিয়ার পীরের মোকামে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার হোসেনের কবর শনাক্ত হয়েছে। তার কবরের খোঁজ পেয়ে কিশোরগঞ্জ থেকে সেখানে ছুটে যান ছোট ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা একেএম সামছুদ্দিন। ভাইয়ের কবরে নিজ উদ্যোগে সংরক্ষণ করে তিনি স্থাপন করেছেন নামফলক। গত শুক্রবার সেই নামফলক উন্মোচন করা হয়েছে। এ সময় বড়লেখা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মুহাম্মদ সিরাজ উদ্দিন ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার হোসেনের ভাই মুক্তিযোদ্ধা একেএম সামছুদ্দিন এবং মুক্তিযোদ্ধা সন্তান গণমাধ্যমকর্মী এজে লাভলু উপস্থিত ছিলেন।

শহীদ আনোয়ার হোসেন কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী উপজেলার প্রেমারচর গ্রামের মৃত আবদুল মজিদের ছেলে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বয়স ছিল ২১ বছর। সাত ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানে ডাকে যুদ্ধে যান আনোয়ার ও তার ছোট ভাই একেএম সামছুদ্দিন। ভারতের লোহারবন্দে ট্রেনিং শেষে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন তারা। ছোটভাই সামছুদ্দিন নিজ এলাকায় যুদ্ধে অংশ নেন। আর আনোয়ার কুকিরথল ক্যাম্পে সাব-সেক্টর কমান্ডার ফ্লাইট ল্যাফটেন্যান্ট আবদুল কাদিরের অধীনে বিভিন্ন জায়গায় যুদ্ধ করেন। যুদ্ধ চলাকালে বাবা-মায়ের সঙ্গে তাদের আর কোনদিন দেখা হয়নি।

১৯৭১ সালের ৩ অক্টোবর প্লাটুন কামান্ডার তজমুল আলীর নেতৃত্বে আনোয়ারসহ কয়েকজন বড়লেখা থানার হরিপুর-বড়খলা গ্রামের ‘বড়বন্দ’ হয়ে ফেঞ্চুগঞ্জ থানায় পাকিস্তানিদের একটি ক্যাম্প দখল করার উদ্দেশে রওনা দেন। বড়লেখা থানার ‘বাজনি ছড়া’ রেললাইনের কাছে পৌঁছামাত্র সেখানে থাকা সশস্ত্র রাজাকার বাহিনী তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে গুলি করে। তখন পেছনে পড়ে যান আনোয়ার। তার অপেক্ষা না করেই অন্যরা রওনা দেন। এরপর পথ হারিয়ে ফেলেন আনোয়ার। একাই ফেঞ্চুগঞ্জ থানার উদ্দেশে রওনা হন। গাংকুল হয়ে চানপুর এলাকায় পৌঁছান। ৪ অক্টোবর ভোরে তাকে চানপুর এলাকায় একা পেয়ে রাজাকারবাহিনী ঘিরে ফেলে। একপর্যায়ে সেখানেই তাকে গুলি করে হত্যা করে ঘাতকরা। পরে স্থানীয় লোকজন তাকে দরিয়ার পীরের মোকামে দাফন করেন।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হয়। যুদ্ধ শেষে আনোয়ার হোসেনের ছোট ভাই মুক্তিযোদ্ধা একেএম সামছুদ্দিন বাড়ি ফিরে এলেও তিনি আর ফেরেননি। বাবা-মা তার অপেক্ষায় পথ চেয়ে থাকতেন আর কাঁদতেন। কিছুদিন পর তারা এক পুলিশ কর্মকর্তার মাধ্যমে জানতে পারেন আনোয়ার মৌলভীবাজারের বড়লেখায় যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। কিন্তু কোন এলাকায় তিনি শহীদ হয়েছেন, তা জানতে পারেননি। ছেলেকে হারানোর ব্যথা নিয়ে ১৯৭৯ সালে তার বাবা মারা যান আর ২০০১ সালে মারা যান মা।

এদিকে সম্প্রতি শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ারের ছোট ভাই একেএম সামছুদ্দিনের মেয়ে এনজিওকর্মী রেহানা আক্তার মনি দাপ্তরিক কাজে মৌলভীবাজারের যান। এরপর তিনি তার চাচা শহীদ আনোয়ারের কবরের খোঁজে বড়লেখায় যান। পরে তিনি বড়লেখা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মুহাম্মদ সিরাজ উদ্দিনসহ স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগ করে চাচার কবরের খোঁজ পান। বিষয়টি তিনি বাবা মুক্তিযোদ্ধা একেএম সামছুদ্দিনকে জানান। পরে তিনি উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মুহাম্মদ সিরাজ উদ্দিন এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীম আল ইমরানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। আনোয়ারের কবরের খোঁজ পেয়ে কিশোরগঞ্জ থেকে ছুটে আসেন তার ছোট ভাই সামছুদ্দিন। এরপর নিজ উদ্যোগে তিনি ভাইয়ের কবরে স্থাপন করেন নামফলক।

শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার হোসেনের ছোট ভাই মুক্তিযোদ্ধা একেএম সামছুদ্দিন বলেন, ‘আমার ভাইয়ের শেষ স্মৃতিটুকু রক্ষায় এখানে আমি আমার ব্যক্তিগত উদ্যোগে নামফলক নির্মাণ করেছি। এতে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, পিআইও এবং সমাজসেবা কর্মকর্তাসহ স্থানীয় এলাকাবাসী যথেষ্ট সহযোগিতা করেছেন।’

আবেগাপ্লুত একেএম সামছুদ্দিন বলেন, ‘জীবনে অনেক কিছু পেয়েছি। আশা ছিল ভাইয়ের কবর খুঁজে পাওয়ার। সেটাও পেয়ে গেছি। ভাইয়ের স্মৃতিটুকু রক্ষায় তার কবরে নামফলক নির্মাণ করতে পেরেছি। এজন্য আমি ভীষণ খুশি।

বড়লেখা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মুহাম্মদ সিরাজ উদ্দিন বলেন, ‘রাজাকার বাহিনীর হাতে চানপুর এলাকায় মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার হোসেন শহীদ হন। পরে স্থানীয় লোকজন তাকে দরিয়ার পীরের মোকামে দাফন করেন। স্বাধীনতার ৪৯ বছর পর হলেও স্বজনরা আনোয়ারের কবর খুঁজে পেয়েছেন। এর চেয়ে বড় আনন্দের খবর কী হতে পারে!

রবিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২১ , ৩ মাঘ ১৪২৭, ৩ জমাদিউস সানি ১৪৪২

৪৯ বছর পর শহীদ মুক্তিযোদ্ধার কবর খুঁজে পেয়েছেন স্বজনরা

কিশোরগঞ্জ থেকে মৌলভীবাজার গিয়ে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন
image

স্বাধীনতার ৪৯ বছর পর এক শহীদ মুক্তিযোদ্ধার কবর খুঁজে পেয়েছেন স্বজনরা। কিশোরগঞ্জ জেলার ওই মুক্তিযোদ্ধা ১৯৭১ সালে সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজারে গিয়ে যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। ভারতের লোহারবন্দে ট্রেনিং শেষে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন যুদ্ধে। দেশ স্বাধীন হলেও তিনি আর বাড়ি ফেরেননি। অবশেষে বীর মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার হোসেনের কবরের খোঁজ মিলেছে বড়লেখা উপজেলায়। কিন্তু সন্তানের কবর শনাক্ত হওয়ার কথা আর কখনওই জানতে পারবেন না তার বাবা-মা। তারা দু’জনই মারা গেছেন অনেক আগে।

মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণভাগ দক্ষিণ ইউনিয়নের চানপুর-হাশিমপুর দরিয়ার পীরের মোকামে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার হোসেনের কবর শনাক্ত হয়েছে। তার কবরের খোঁজ পেয়ে কিশোরগঞ্জ থেকে সেখানে ছুটে যান ছোট ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা একেএম সামছুদ্দিন। ভাইয়ের কবরে নিজ উদ্যোগে সংরক্ষণ করে তিনি স্থাপন করেছেন নামফলক। গত শুক্রবার সেই নামফলক উন্মোচন করা হয়েছে। এ সময় বড়লেখা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মুহাম্মদ সিরাজ উদ্দিন ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার হোসেনের ভাই মুক্তিযোদ্ধা একেএম সামছুদ্দিন এবং মুক্তিযোদ্ধা সন্তান গণমাধ্যমকর্মী এজে লাভলু উপস্থিত ছিলেন।

শহীদ আনোয়ার হোসেন কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী উপজেলার প্রেমারচর গ্রামের মৃত আবদুল মজিদের ছেলে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বয়স ছিল ২১ বছর। সাত ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানে ডাকে যুদ্ধে যান আনোয়ার ও তার ছোট ভাই একেএম সামছুদ্দিন। ভারতের লোহারবন্দে ট্রেনিং শেষে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন তারা। ছোটভাই সামছুদ্দিন নিজ এলাকায় যুদ্ধে অংশ নেন। আর আনোয়ার কুকিরথল ক্যাম্পে সাব-সেক্টর কমান্ডার ফ্লাইট ল্যাফটেন্যান্ট আবদুল কাদিরের অধীনে বিভিন্ন জায়গায় যুদ্ধ করেন। যুদ্ধ চলাকালে বাবা-মায়ের সঙ্গে তাদের আর কোনদিন দেখা হয়নি।

১৯৭১ সালের ৩ অক্টোবর প্লাটুন কামান্ডার তজমুল আলীর নেতৃত্বে আনোয়ারসহ কয়েকজন বড়লেখা থানার হরিপুর-বড়খলা গ্রামের ‘বড়বন্দ’ হয়ে ফেঞ্চুগঞ্জ থানায় পাকিস্তানিদের একটি ক্যাম্প দখল করার উদ্দেশে রওনা দেন। বড়লেখা থানার ‘বাজনি ছড়া’ রেললাইনের কাছে পৌঁছামাত্র সেখানে থাকা সশস্ত্র রাজাকার বাহিনী তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে গুলি করে। তখন পেছনে পড়ে যান আনোয়ার। তার অপেক্ষা না করেই অন্যরা রওনা দেন। এরপর পথ হারিয়ে ফেলেন আনোয়ার। একাই ফেঞ্চুগঞ্জ থানার উদ্দেশে রওনা হন। গাংকুল হয়ে চানপুর এলাকায় পৌঁছান। ৪ অক্টোবর ভোরে তাকে চানপুর এলাকায় একা পেয়ে রাজাকারবাহিনী ঘিরে ফেলে। একপর্যায়ে সেখানেই তাকে গুলি করে হত্যা করে ঘাতকরা। পরে স্থানীয় লোকজন তাকে দরিয়ার পীরের মোকামে দাফন করেন।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হয়। যুদ্ধ শেষে আনোয়ার হোসেনের ছোট ভাই মুক্তিযোদ্ধা একেএম সামছুদ্দিন বাড়ি ফিরে এলেও তিনি আর ফেরেননি। বাবা-মা তার অপেক্ষায় পথ চেয়ে থাকতেন আর কাঁদতেন। কিছুদিন পর তারা এক পুলিশ কর্মকর্তার মাধ্যমে জানতে পারেন আনোয়ার মৌলভীবাজারের বড়লেখায় যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। কিন্তু কোন এলাকায় তিনি শহীদ হয়েছেন, তা জানতে পারেননি। ছেলেকে হারানোর ব্যথা নিয়ে ১৯৭৯ সালে তার বাবা মারা যান আর ২০০১ সালে মারা যান মা।

এদিকে সম্প্রতি শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ারের ছোট ভাই একেএম সামছুদ্দিনের মেয়ে এনজিওকর্মী রেহানা আক্তার মনি দাপ্তরিক কাজে মৌলভীবাজারের যান। এরপর তিনি তার চাচা শহীদ আনোয়ারের কবরের খোঁজে বড়লেখায় যান। পরে তিনি বড়লেখা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মুহাম্মদ সিরাজ উদ্দিনসহ স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগ করে চাচার কবরের খোঁজ পান। বিষয়টি তিনি বাবা মুক্তিযোদ্ধা একেএম সামছুদ্দিনকে জানান। পরে তিনি উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মুহাম্মদ সিরাজ উদ্দিন এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীম আল ইমরানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। আনোয়ারের কবরের খোঁজ পেয়ে কিশোরগঞ্জ থেকে ছুটে আসেন তার ছোট ভাই সামছুদ্দিন। এরপর নিজ উদ্যোগে তিনি ভাইয়ের কবরে স্থাপন করেন নামফলক।

শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার হোসেনের ছোট ভাই মুক্তিযোদ্ধা একেএম সামছুদ্দিন বলেন, ‘আমার ভাইয়ের শেষ স্মৃতিটুকু রক্ষায় এখানে আমি আমার ব্যক্তিগত উদ্যোগে নামফলক নির্মাণ করেছি। এতে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, পিআইও এবং সমাজসেবা কর্মকর্তাসহ স্থানীয় এলাকাবাসী যথেষ্ট সহযোগিতা করেছেন।’

আবেগাপ্লুত একেএম সামছুদ্দিন বলেন, ‘জীবনে অনেক কিছু পেয়েছি। আশা ছিল ভাইয়ের কবর খুঁজে পাওয়ার। সেটাও পেয়ে গেছি। ভাইয়ের স্মৃতিটুকু রক্ষায় তার কবরে নামফলক নির্মাণ করতে পেরেছি। এজন্য আমি ভীষণ খুশি।

বড়লেখা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মুহাম্মদ সিরাজ উদ্দিন বলেন, ‘রাজাকার বাহিনীর হাতে চানপুর এলাকায় মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার হোসেন শহীদ হন। পরে স্থানীয় লোকজন তাকে দরিয়ার পীরের মোকামে দাফন করেন। স্বাধীনতার ৪৯ বছর পর হলেও স্বজনরা আনোয়ারের কবর খুঁজে পেয়েছেন। এর চেয়ে বড় আনন্দের খবর কী হতে পারে!