শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলতে হবে ভেবেচিন্তে

ড. মো. শফিকুর রহমান

বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাসের মহামারি শুরু হওয়ার পর বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ১৭ মার্চ ২০১৯ থেকে বন্ধ রয়েছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের করোনা সংক্রমণ থেকে রক্ষা ও সংক্রমণ যাতে না ছড়ায় সেসব দিক বিবেচনা করে এখনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার সরকারি সিদ্ধান্ত কতটুকু যৌক্তিক? দীর্ঘ প্রায় ৯ মাস ধরে এ অস্বাভাবিক বিরতিতে শিক্ষার্থীদের পড়াশুনা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি তারা মানসিকভাবে ভালো নেই।

এটা ঠিক যে, দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের মনে বিরূপ প্রভাব পড়ছে, টিভি দেখে ও মোবাইল-ইন্টারনেট ব্যবহার করে সময় ব্যয় করছে এবং লেখাপড়ার অভ্যাস থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস জীবনের অভাব নিছক অনলাইন ক্লাসে পূরণ করা সম্ভব নয়। সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে প্রাথমিক পর্যায়ের শিশু শিক্ষার্থীদের উপর এবং করোনার এ দুঃসময়ে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত খাত হচ্ছে শিক্ষা। আবার দীর্ঘ বিরতির পর নতুন করে লেখাপড়ায় মনোনিবেশ করা ছাত্রছাত্রীদের পক্ষে কঠিন হবে। গত ৯ মাসে দুই হাজারেরও বেশি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে, বহু শিক্ষক সম্পূর্ণ বেকার হয়েছেন, অনেকেরই বেতনভাতা কমে গেছে এবং পরিবার নিয়ে আর্থিক কষ্টে জীবন কাটাচ্ছেন।

শিক্ষা খাতের খরচ জাতির জন্য একটি সঠিক বিনিয়োগ হলেও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রন্ত এসব শিক্ষক কর্মকর্তাদের জন্য তেমন কোন সরকারি অনুদান নেই, যদিও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের জন্য সরকারি প্রণোদনার প্যাকেজ রয়েছে। গত ৯ মাস ধরে শিক্ষার্থীদের ক্লাসরুমভিত্তিক পাঠদান বন্ধ থাকায় অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের নিয়ে দুশ্চিন্তার মাত্রাটা বেড়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। কাজেই এসব কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেয়ার জন্য সরকারের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার জন্য সরকারকে লিগ্যাল নোটিশও দেয়া হয়েছে।

বাংলাদেশে সব প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার পরও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগাটা স্বাভাবিক। পশ্চিমা বিশ্বসহ উন্নত দেশগুলো এখনই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার কথা ভাবছে না। কোন কোন দেশ সীমিত আকারে শুধু মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার পর স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের মধ্যে করোনা সংক্রমণ দেখা দেয়ায় আবার বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে কানাডার কথা বলা যায়, সেখানে করোনা সংক্রমণ অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় কিছুটা কম থাকায় শুধুমাত্র মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত সব স্কুল গত সেপ্টেম্বরে খুলে দেয়ার পর কিছুসংখ্যক শিক্ষার্থী করোনা আক্রান্ত হওয়ায় টরন্টো  শহরের কয়েকটি স্কুলে করোনা টেস্টের মাধ্যমে জরিপ চালানো হয়। এতে করোনা সংক্রমণের একটি ভয়ঙ্কর চিত্র ফুটে উঠে এবং দেখা যায়, প্রতি ৫ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ১ জন করোনা পজিটিভ। এসব পশ্চিমা উন্নত দেশগুলোতে মা-বাবা দুজনকেই কাজ করে উপার্জন করতে হয় বিধায় ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা স্কুলে না গিয়ে ঘরে থাকলে তাদের দেখাশোনার জন্য মা আথবা বাবাকে চাকরি ছেড়ে দিতে হয়। এ কারণে এসব দেশে অন্তত প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত স্কুলগুলো খুলে দেয়ার জন্য সরকারের ওপর প্রচণ্ড চাপ রয়েছে। কানাডা সরকার ১২ বছর পর্যন্ত বয়সের শিশুদের স্কুলে না পাঠিয়ে বাসায় রেখে অনলাইন ক্লাসে সহায়তার জন্য অভিভাবককে সপ্তাহে ৪৫০ ডলার পর্যন্ত ভাতা দিচ্ছে।

পশ্চিমা দেশগুলোতে আমাদের বাংলাদেশের মতো স্কুল ছাত্রছাত্রীদের অভিভাবকরা কখনই তাদের ছেলেমেয়েদের স্কুলে আনা-নেয়ার জন্য বা পরীক্ষার সময় স্কুল প্রাঙ্গণে জমায়েত হয় না। শিক্ষার্থীদের তুলনায় প্রতিটি ক্লাসরুমের আকার অনেক বড় থাকায় সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে ক্লাস নেয়া সম্ভব হলেও এসব পশ্চিমা দেশগুলো স্কুল খুলে দেয়ার জন্য সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। পক্ষান্তরে, বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুমের ধারণক্ষমতার চেয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি। এখানে ক্লাসরুমের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে ও সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করে ক্লাস নেয়া সম্ভব নয়। তাছাড়া স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের সাথে বিপুলসংখ্যক অভিভাবকের উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন, বিধায় করোনার সংক্রমণ যে দ্রুতই বাড়বে তাতে সন্দেহ নেই।

করোনাভাইরাস কখনও ছোট-বড়, ধনী-গরিব, ধার্মিক-অধার্মিক ও শহর-গ্রামাঞ্চল চিনে সংক্রমণ করে না, বরং সংক্রমণ ও সংক্রমণের তীব্রতা শুধুমাত্র দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশের শহরাঞ্চলের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে করোনা সংক্রমণ একেবারেই নেই বলে গ্রামাঞ্চলের স্কুলগুলো খুলে দেয়ার জন্য অনেকেই মতপ্রকাশ করছেন। গ্রামাঞ্চলে লোকসংখ্যার ঘনত্ব কম বলে করোনা সংক্রমণও কম হওয়ার কথা। পৃথিবীর সবচেয়ে জনবসতির দেশ চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রে করোনা সংক্রমণের হার কম জনবসতির দেশের তুলনায় অনেক বেশি। এমনকি নিউইয়র্ক যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহর হওয়ায় অন্যান্য শহরের তুলনায় সংক্রমণের হারও বেশি। তেমনি বাংলাদেশের ঢাকাসহ অন্যান্য সিটিতে জেলা শহরের চেয়ে করোনা সংক্রমণের হার অনেক বেশি। করোনা শুধুমাত্র আক্রান্ত বা করোনার বাহক এমন ব্যক্তির সংস্পর্শ থেকে সুস্থ ব্যক্তিতে স্থানান্তরিত হয়। একসাথে যত বেশি লোকের সমাগম হবে সংক্রমণের হারও বাড়বে। তাছাড়া শিশু তথা কমবয়সী ছেলেমেয়েদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বয়স্কদের তুলনায় অনেক বেশি, আবার গ্রামাঞ্চল ও মফস্বল শহরের লোকেদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বড় শহরের চেয়ে বেশি।

কমবয়সী ছেলেমেয়ে ও গ্রামাঞ্চলের লোকদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি হওয়ার কারণ হচ্ছে রোদ-বৃষ্টিতে দৈনিক হাঁটাচলা, খেলাধুলাসহ অন্যান্য শারীরিক ক্রিয়াকলাপ (এক্সারসাইজ) এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদান গ্রহণ। প্রতিনিয়ত শারীরিক ক্রিয়াকলাপের কারণে গ্রামাঞ্চলের মানুষ ও কমবয়সী ছেলেমেয়েরা এমনিতেই শারীরিকভাবে অনেক বেশি শক্তিশালী ও তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বেশি হওয়ায় কারণে করোনার সংক্রমণ ও সংক্রমণের গুরুতর লক্ষণগুলো হয়ত তেমন দেখা যাচ্ছে না।

তবে গ্রামাঞ্চলে করোনা নেই এটা বলা যাবে না, বরং স্বাভাবিক সর্দি-কাশিসহ মৃদু লক্ষণযুক্ত সংক্রমণ ও করোনার বাহক সমানতালেই রয়েছে। তাই গ্রামাঞ্চলের স্কুল-কলেজসহ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনই খুলে দেয়া কি উচিত হবে? বাংলাদেশে করোনা নিয়ন্ত্রণে এসেছে এটা বলার সময় এখনও আসেনি, কারণ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ পশ্চিমা দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে করোনা সংক্রমণ দিন দিন বেড়েই চলেছে। যুক্তরাজ্যে করোনার কারণে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে একদিনে ১২৮০ জনে পৌঁছেছে। স্কুলগামী ছেলেমেয়েদের জীবন রক্ষাসহ করোনার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে তাদের সুরক্ষা দেয়া আমাদের জন্য জরুরি, না লেখাপড়ার সাময়িক ক্ষতি থেকে উত্তরণ জরুরি? মহামারির সময়ে লেখাপড়ার ক্ষতিতে ত্যাগ স্বীকার না করে জেনেশুনে আমরা নিশ্চয়ই আমাদের ছেলেমেয়েদের ও তাদের পরিবারের সদস্যদের মৃত্যুর ঝুঁকিতে ঠেলে দিতে পারি না। করোনার কারণে একটি জীবনও বিপন্ন হোক তা আমাদের কাম্য নয় নিশ্চয়ই। বিপন্ন মানুষটি হয়ত আমাদের আপনজনও হতে পারে। করোনাকালীন দুঃসময়ে মানুষের জীবন ও জীবিকা দুটিই রক্ষা করা সরকারের দায়িত্ব। করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো ব্যাবসা-বাণিজ্যসহ সব খাত দীর্ঘদিন বন্ধ রাখলে দেশে গুরুতর অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টির কারণে শ্রমজীবী মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য জীবিকার অভাবেও মৃত্যুর ঘটনা হয়ত ঘটে থাকত। ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষা খাতকে উদ্ধার করার দায়-দায়িত্ব যেমন সরকারের, তেমনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের করোনার মহামারি থেকে রক্ষা করাও সরকারের দায়িত্ব।

করোনা পরিস্থিতি নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণসহ সব তথ্যই সরকারের কাছে রয়েছেÑ এটা না ভাবার কারণ নেই। কাজেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার জন্য আমরা সরকারকে এ মুহূর্তে চাপ দিতে চাই না। পরিস্থিতি অনুকূলে এলে নিশ্চয়ই সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখবে না। ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে তখন ছুটিগুলোও কিছুটা কমিয়ে এবং অতিরিক্ত ক্লাসের ব্যবস্থা করে পাঠদানের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। শিক্ষকরা তাদের ছাত্রছাত্রীদের পাঠদান ও গবেষণার ক্ষতি পুষিয়ে দিতে যেসব উদ্যোগ নেয়া দরকার তার সবই তারা করবেন নিশ্চয়ই। করোনা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকাকালীন ছাত্রছাত্রীদের জন্য অনলাইনভিত্তিক ক্লাস আরো জোরদার করাসহ বাসায় বা ঘরে লেখাপড়া ও অন্যান্য সৃজনশীল কার্যক্রমের মাধ্যমে তাদের ব্যস্ত রাখতে হবে; যাতে তারা লেখাপড়ার অভ্যাস থেকে বিচ্যুত না হয় এবং অভিভাবকদেরও শিক্ষকের ভূমিকা পালন করতে হবে। যাই হোক, বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখনই না খুলে করোনা পরিস্থিতি বেড়ে যায় কিনা বা নিয়ন্ত্রণে আসে কিনা- সেজন্য অপেক্ষা করা দরকার।

[লেখক : অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়]

সোমবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২১ , ৪ মাঘ ১৪২৭, ৪ জমাদিউস সানি ১৪৪২

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলতে হবে ভেবেচিন্তে

ড. মো. শফিকুর রহমান
image

বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাসের মহামারি শুরু হওয়ার পর বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ১৭ মার্চ ২০১৯ থেকে বন্ধ রয়েছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের করোনা সংক্রমণ থেকে রক্ষা ও সংক্রমণ যাতে না ছড়ায় সেসব দিক বিবেচনা করে এখনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার সরকারি সিদ্ধান্ত কতটুকু যৌক্তিক? দীর্ঘ প্রায় ৯ মাস ধরে এ অস্বাভাবিক বিরতিতে শিক্ষার্থীদের পড়াশুনা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি তারা মানসিকভাবে ভালো নেই।

এটা ঠিক যে, দীর্ঘ সময় ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের মনে বিরূপ প্রভাব পড়ছে, টিভি দেখে ও মোবাইল-ইন্টারনেট ব্যবহার করে সময় ব্যয় করছে এবং লেখাপড়ার অভ্যাস থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস জীবনের অভাব নিছক অনলাইন ক্লাসে পূরণ করা সম্ভব নয়। সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে প্রাথমিক পর্যায়ের শিশু শিক্ষার্থীদের উপর এবং করোনার এ দুঃসময়ে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত খাত হচ্ছে শিক্ষা। আবার দীর্ঘ বিরতির পর নতুন করে লেখাপড়ায় মনোনিবেশ করা ছাত্রছাত্রীদের পক্ষে কঠিন হবে। গত ৯ মাসে দুই হাজারেরও বেশি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে, বহু শিক্ষক সম্পূর্ণ বেকার হয়েছেন, অনেকেরই বেতনভাতা কমে গেছে এবং পরিবার নিয়ে আর্থিক কষ্টে জীবন কাটাচ্ছেন।

শিক্ষা খাতের খরচ জাতির জন্য একটি সঠিক বিনিয়োগ হলেও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রন্ত এসব শিক্ষক কর্মকর্তাদের জন্য তেমন কোন সরকারি অনুদান নেই, যদিও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের জন্য সরকারি প্রণোদনার প্যাকেজ রয়েছে। গত ৯ মাস ধরে শিক্ষার্থীদের ক্লাসরুমভিত্তিক পাঠদান বন্ধ থাকায় অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের নিয়ে দুশ্চিন্তার মাত্রাটা বেড়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। কাজেই এসব কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেয়ার জন্য সরকারের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার জন্য সরকারকে লিগ্যাল নোটিশও দেয়া হয়েছে।

বাংলাদেশে সব প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার পরও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগাটা স্বাভাবিক। পশ্চিমা বিশ্বসহ উন্নত দেশগুলো এখনই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার কথা ভাবছে না। কোন কোন দেশ সীমিত আকারে শুধু মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার পর স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের মধ্যে করোনা সংক্রমণ দেখা দেয়ায় আবার বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে কানাডার কথা বলা যায়, সেখানে করোনা সংক্রমণ অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় কিছুটা কম থাকায় শুধুমাত্র মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত সব স্কুল গত সেপ্টেম্বরে খুলে দেয়ার পর কিছুসংখ্যক শিক্ষার্থী করোনা আক্রান্ত হওয়ায় টরন্টো  শহরের কয়েকটি স্কুলে করোনা টেস্টের মাধ্যমে জরিপ চালানো হয়। এতে করোনা সংক্রমণের একটি ভয়ঙ্কর চিত্র ফুটে উঠে এবং দেখা যায়, প্রতি ৫ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ১ জন করোনা পজিটিভ। এসব পশ্চিমা উন্নত দেশগুলোতে মা-বাবা দুজনকেই কাজ করে উপার্জন করতে হয় বিধায় ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা স্কুলে না গিয়ে ঘরে থাকলে তাদের দেখাশোনার জন্য মা আথবা বাবাকে চাকরি ছেড়ে দিতে হয়। এ কারণে এসব দেশে অন্তত প্রাথমিক স্তর পর্যন্ত স্কুলগুলো খুলে দেয়ার জন্য সরকারের ওপর প্রচণ্ড চাপ রয়েছে। কানাডা সরকার ১২ বছর পর্যন্ত বয়সের শিশুদের স্কুলে না পাঠিয়ে বাসায় রেখে অনলাইন ক্লাসে সহায়তার জন্য অভিভাবককে সপ্তাহে ৪৫০ ডলার পর্যন্ত ভাতা দিচ্ছে।

পশ্চিমা দেশগুলোতে আমাদের বাংলাদেশের মতো স্কুল ছাত্রছাত্রীদের অভিভাবকরা কখনই তাদের ছেলেমেয়েদের স্কুলে আনা-নেয়ার জন্য বা পরীক্ষার সময় স্কুল প্রাঙ্গণে জমায়েত হয় না। শিক্ষার্থীদের তুলনায় প্রতিটি ক্লাসরুমের আকার অনেক বড় থাকায় সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে ক্লাস নেয়া সম্ভব হলেও এসব পশ্চিমা দেশগুলো স্কুল খুলে দেয়ার জন্য সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। পক্ষান্তরে, বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুমের ধারণক্ষমতার চেয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি। এখানে ক্লাসরুমের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে ও সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করে ক্লাস নেয়া সম্ভব নয়। তাছাড়া স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের সাথে বিপুলসংখ্যক অভিভাবকের উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন, বিধায় করোনার সংক্রমণ যে দ্রুতই বাড়বে তাতে সন্দেহ নেই।

করোনাভাইরাস কখনও ছোট-বড়, ধনী-গরিব, ধার্মিক-অধার্মিক ও শহর-গ্রামাঞ্চল চিনে সংক্রমণ করে না, বরং সংক্রমণ ও সংক্রমণের তীব্রতা শুধুমাত্র দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশের শহরাঞ্চলের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে করোনা সংক্রমণ একেবারেই নেই বলে গ্রামাঞ্চলের স্কুলগুলো খুলে দেয়ার জন্য অনেকেই মতপ্রকাশ করছেন। গ্রামাঞ্চলে লোকসংখ্যার ঘনত্ব কম বলে করোনা সংক্রমণও কম হওয়ার কথা। পৃথিবীর সবচেয়ে জনবসতির দেশ চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রে করোনা সংক্রমণের হার কম জনবসতির দেশের তুলনায় অনেক বেশি। এমনকি নিউইয়র্ক যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহর হওয়ায় অন্যান্য শহরের তুলনায় সংক্রমণের হারও বেশি। তেমনি বাংলাদেশের ঢাকাসহ অন্যান্য সিটিতে জেলা শহরের চেয়ে করোনা সংক্রমণের হার অনেক বেশি। করোনা শুধুমাত্র আক্রান্ত বা করোনার বাহক এমন ব্যক্তির সংস্পর্শ থেকে সুস্থ ব্যক্তিতে স্থানান্তরিত হয়। একসাথে যত বেশি লোকের সমাগম হবে সংক্রমণের হারও বাড়বে। তাছাড়া শিশু তথা কমবয়সী ছেলেমেয়েদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বয়স্কদের তুলনায় অনেক বেশি, আবার গ্রামাঞ্চল ও মফস্বল শহরের লোকেদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বড় শহরের চেয়ে বেশি।

কমবয়সী ছেলেমেয়ে ও গ্রামাঞ্চলের লোকদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি হওয়ার কারণ হচ্ছে রোদ-বৃষ্টিতে দৈনিক হাঁটাচলা, খেলাধুলাসহ অন্যান্য শারীরিক ক্রিয়াকলাপ (এক্সারসাইজ) এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদান গ্রহণ। প্রতিনিয়ত শারীরিক ক্রিয়াকলাপের কারণে গ্রামাঞ্চলের মানুষ ও কমবয়সী ছেলেমেয়েরা এমনিতেই শারীরিকভাবে অনেক বেশি শক্তিশালী ও তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বেশি হওয়ায় কারণে করোনার সংক্রমণ ও সংক্রমণের গুরুতর লক্ষণগুলো হয়ত তেমন দেখা যাচ্ছে না।

তবে গ্রামাঞ্চলে করোনা নেই এটা বলা যাবে না, বরং স্বাভাবিক সর্দি-কাশিসহ মৃদু লক্ষণযুক্ত সংক্রমণ ও করোনার বাহক সমানতালেই রয়েছে। তাই গ্রামাঞ্চলের স্কুল-কলেজসহ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনই খুলে দেয়া কি উচিত হবে? বাংলাদেশে করোনা নিয়ন্ত্রণে এসেছে এটা বলার সময় এখনও আসেনি, কারণ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ পশ্চিমা দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে করোনা সংক্রমণ দিন দিন বেড়েই চলেছে। যুক্তরাজ্যে করোনার কারণে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে একদিনে ১২৮০ জনে পৌঁছেছে। স্কুলগামী ছেলেমেয়েদের জীবন রক্ষাসহ করোনার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে তাদের সুরক্ষা দেয়া আমাদের জন্য জরুরি, না লেখাপড়ার সাময়িক ক্ষতি থেকে উত্তরণ জরুরি? মহামারির সময়ে লেখাপড়ার ক্ষতিতে ত্যাগ স্বীকার না করে জেনেশুনে আমরা নিশ্চয়ই আমাদের ছেলেমেয়েদের ও তাদের পরিবারের সদস্যদের মৃত্যুর ঝুঁকিতে ঠেলে দিতে পারি না। করোনার কারণে একটি জীবনও বিপন্ন হোক তা আমাদের কাম্য নয় নিশ্চয়ই। বিপন্ন মানুষটি হয়ত আমাদের আপনজনও হতে পারে। করোনাকালীন দুঃসময়ে মানুষের জীবন ও জীবিকা দুটিই রক্ষা করা সরকারের দায়িত্ব। করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো ব্যাবসা-বাণিজ্যসহ সব খাত দীর্ঘদিন বন্ধ রাখলে দেশে গুরুতর অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টির কারণে শ্রমজীবী মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য জীবিকার অভাবেও মৃত্যুর ঘটনা হয়ত ঘটে থাকত। ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষা খাতকে উদ্ধার করার দায়-দায়িত্ব যেমন সরকারের, তেমনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের করোনার মহামারি থেকে রক্ষা করাও সরকারের দায়িত্ব।

করোনা পরিস্থিতি নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণসহ সব তথ্যই সরকারের কাছে রয়েছেÑ এটা না ভাবার কারণ নেই। কাজেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার জন্য আমরা সরকারকে এ মুহূর্তে চাপ দিতে চাই না। পরিস্থিতি অনুকূলে এলে নিশ্চয়ই সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখবে না। ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে তখন ছুটিগুলোও কিছুটা কমিয়ে এবং অতিরিক্ত ক্লাসের ব্যবস্থা করে পাঠদানের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। শিক্ষকরা তাদের ছাত্রছাত্রীদের পাঠদান ও গবেষণার ক্ষতি পুষিয়ে দিতে যেসব উদ্যোগ নেয়া দরকার তার সবই তারা করবেন নিশ্চয়ই। করোনা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকাকালীন ছাত্রছাত্রীদের জন্য অনলাইনভিত্তিক ক্লাস আরো জোরদার করাসহ বাসায় বা ঘরে লেখাপড়া ও অন্যান্য সৃজনশীল কার্যক্রমের মাধ্যমে তাদের ব্যস্ত রাখতে হবে; যাতে তারা লেখাপড়ার অভ্যাস থেকে বিচ্যুত না হয় এবং অভিভাবকদেরও শিক্ষকের ভূমিকা পালন করতে হবে। যাই হোক, বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখনই না খুলে করোনা পরিস্থিতি বেড়ে যায় কিনা বা নিয়ন্ত্রণে আসে কিনা- সেজন্য অপেক্ষা করা দরকার।

[লেখক : অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়]