উষ্ণতার আকুতি

শীতকাল দরিদ্র-গরিব মানুষের জন্য যেন এক অভিশাপের নাম! শীতের সময় দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করা মানুষের দুর্ভোগের অন্ত থাকে না। বিশেষ করে প্রান্তিক এলাকার গরিব মানুষদের সবচেয়ে বেশি কষ্ট পোহাতে হয়।

তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে প্রায় ২ কোটিরও বেশি মানুষ। এর মধ্যে আবার অতি দারিদ্র্যের নিচে বাস করে প্রায় এক কোটির মতো মানুষ। করোনাকালে দরিদ্র জনগোষ্ঠী আরও বেশি দরিদ্র হয়ে পড়েছে! মূলত গ্রামীণ এলাকায় দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেশি। করোনাকালে এমনিতেই দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাজের সুযোগ কমে গেছে। এত বিপুলসংখ্যক গরিব মানুষের বিরাট একটা অংশের বিভিন্ন কারণে শীতকালে আবার কাজের সুযোগ কমে যায়। চরম মানবেতর জীবনযাপন করে থাকে এসব কর্মহীন শীতার্ত মানুষ। এছাড়া রাজধানীসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে লাখ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে থাকে। মূলত বস্তিতে ও ভাসমানভাবে বিভিন্ন এলাকায় শীতার্ত এসব মানুষের বাস। বাস্তবতা হলোÑ শীতের কবলে পড়ে ছিন্নমূল গরিব মানুষদের অনেকে এ সময় মারা যায়।

হাড়কাঁপানো শীতে জনজীবন জবুথবু হয়ে পড়েছে। শীতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গরিব তথা খেটেখাওয়া মানুষেরা ‘যম’ বনে যাওয়া শীত মোকাবিলা করে অনেক সময় ঘরের বাইরে যেতে সাহস পায় না। উত্তরবঙ্গে তো বটেই, খোদ রাজধানী ও দেশের অন্যান্য বিভাগীয় শহরগুলোতে গৃহহীন মানুষেরা শীতের রাতে কোনোরকমে পরস্পরের উত্তাপ নিয়ে জড়াজড়ি করে নিশিযাপন করে থাকে। শহরের ফুটপাতে, উড়াল সড়কের নিচে, অলিতে-গলিতে, পার্ক-উদ্যানে অনেক মানুষ কোনো রকমে রাতযাপন করে। শীত সচ্ছল মানুষের কাছে পছন্দের ঋতু হলেও গরিব মানুষের কাছে যমদূতের সমান। কষ্ট ও ভোগান্তি ছাড়া শীত ঋতু গরিব মানুষদের আর কিছুই দিতে পারে না! তাপমাত্রার পারদ যতই নিচের দিকে নামতে থাকে ততই শ্রমজীবী মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ বাড়তে থাকে।

অতিদারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করা মানুষদের একটা বিরাট অংশ শিশু ও বৃদ্ধ। তাদের কাছে শীতকাল মানে এক আতঙ্কের নাম। এমনিতেই শীতের সময় অতিদরিদ্র এসব পরিবারে ঠাণ্ডাজনিত রোগবালাই নতুন এক সমস্যা। শীতের কারণে ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া, সর্দি-কাশিসহ হৃদরোগের প্রকোপ বেড়ে যায়। তীব্র শীতের আগমুহূর্তে কমবেশি প্রতিদিনই হাসপাতালে শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার খবর পাওয়া যায়। বিশেষ করে শিশুরা আক্রান্ত হয় সবচেয়ে বেশি। আবার শীতের প্রকোপ থেকে রেহাই পেতে আগুন পোহাতে গিয়ে অনেকে অসাবধানতাবশত দগ্ধ হওয়ার খবর আসে!

শীতার্তদের সহায়তায় সরকার, বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি উদ্যোগ, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে এগিয়ে আসতে দেখা গেলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম।

নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্র, কমিউনিটি হাসপাতালের মাধ্যমে শীতজনিত রোগের ওষুধ বিতরণের ব্যবস্থা থাকা উচিত। গরিব ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো প্রত্যেক বিত্তবান ও সামর্থ্যবান মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। আসুন সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে যার যার অবস্থান থেকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেই শীতার্ত মানুষগুলোর প্রতি। এতে শীতার্তরা একটু হলেও উষ্ণতা পাবে, ভালো থাকবে।

[লেখক : সদস্য, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)]

sadonsarker2005@gmail.com

সোমবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২১ , ৪ মাঘ ১৪২৭, ৪ জমাদিউস সানি ১৪৪২

উষ্ণতার আকুতি

সাধন সরকার

শীতকাল দরিদ্র-গরিব মানুষের জন্য যেন এক অভিশাপের নাম! শীতের সময় দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করা মানুষের দুর্ভোগের অন্ত থাকে না। বিশেষ করে প্রান্তিক এলাকার গরিব মানুষদের সবচেয়ে বেশি কষ্ট পোহাতে হয়।

তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে প্রায় ২ কোটিরও বেশি মানুষ। এর মধ্যে আবার অতি দারিদ্র্যের নিচে বাস করে প্রায় এক কোটির মতো মানুষ। করোনাকালে দরিদ্র জনগোষ্ঠী আরও বেশি দরিদ্র হয়ে পড়েছে! মূলত গ্রামীণ এলাকায় দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেশি। করোনাকালে এমনিতেই দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কাজের সুযোগ কমে গেছে। এত বিপুলসংখ্যক গরিব মানুষের বিরাট একটা অংশের বিভিন্ন কারণে শীতকালে আবার কাজের সুযোগ কমে যায়। চরম মানবেতর জীবনযাপন করে থাকে এসব কর্মহীন শীতার্ত মানুষ। এছাড়া রাজধানীসহ বিভাগীয় শহরগুলোতে লাখ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে থাকে। মূলত বস্তিতে ও ভাসমানভাবে বিভিন্ন এলাকায় শীতার্ত এসব মানুষের বাস। বাস্তবতা হলোÑ শীতের কবলে পড়ে ছিন্নমূল গরিব মানুষদের অনেকে এ সময় মারা যায়।

হাড়কাঁপানো শীতে জনজীবন জবুথবু হয়ে পড়েছে। শীতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গরিব তথা খেটেখাওয়া মানুষেরা ‘যম’ বনে যাওয়া শীত মোকাবিলা করে অনেক সময় ঘরের বাইরে যেতে সাহস পায় না। উত্তরবঙ্গে তো বটেই, খোদ রাজধানী ও দেশের অন্যান্য বিভাগীয় শহরগুলোতে গৃহহীন মানুষেরা শীতের রাতে কোনোরকমে পরস্পরের উত্তাপ নিয়ে জড়াজড়ি করে নিশিযাপন করে থাকে। শহরের ফুটপাতে, উড়াল সড়কের নিচে, অলিতে-গলিতে, পার্ক-উদ্যানে অনেক মানুষ কোনো রকমে রাতযাপন করে। শীত সচ্ছল মানুষের কাছে পছন্দের ঋতু হলেও গরিব মানুষের কাছে যমদূতের সমান। কষ্ট ও ভোগান্তি ছাড়া শীত ঋতু গরিব মানুষদের আর কিছুই দিতে পারে না! তাপমাত্রার পারদ যতই নিচের দিকে নামতে থাকে ততই শ্রমজীবী মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ বাড়তে থাকে।

অতিদারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করা মানুষদের একটা বিরাট অংশ শিশু ও বৃদ্ধ। তাদের কাছে শীতকাল মানে এক আতঙ্কের নাম। এমনিতেই শীতের সময় অতিদরিদ্র এসব পরিবারে ঠাণ্ডাজনিত রোগবালাই নতুন এক সমস্যা। শীতের কারণে ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া, সর্দি-কাশিসহ হৃদরোগের প্রকোপ বেড়ে যায়। তীব্র শীতের আগমুহূর্তে কমবেশি প্রতিদিনই হাসপাতালে শীতজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার খবর পাওয়া যায়। বিশেষ করে শিশুরা আক্রান্ত হয় সবচেয়ে বেশি। আবার শীতের প্রকোপ থেকে রেহাই পেতে আগুন পোহাতে গিয়ে অনেকে অসাবধানতাবশত দগ্ধ হওয়ার খবর আসে!

শীতার্তদের সহায়তায় সরকার, বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি উদ্যোগ, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে এগিয়ে আসতে দেখা গেলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম।

নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্র, কমিউনিটি হাসপাতালের মাধ্যমে শীতজনিত রোগের ওষুধ বিতরণের ব্যবস্থা থাকা উচিত। গরিব ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো প্রত্যেক বিত্তবান ও সামর্থ্যবান মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। আসুন সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে যার যার অবস্থান থেকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেই শীতার্ত মানুষগুলোর প্রতি। এতে শীতার্তরা একটু হলেও উষ্ণতা পাবে, ভালো থাকবে।

[লেখক : সদস্য, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)]

sadonsarker2005@gmail.com