ছয় দফা : স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা

মোস্তাফা জব্বার

তিন :

ছয় দফা ও মুজিব নির্যাতন :

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা ঘোষণা করার পর যখন দেশব্যাপী এর পক্ষে তীব্র জনমত গড়ে তোলেন এবং তার রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলেন তখনই মাওলানা ভাসানী-মশিউর রহমানরা এর বিরোধিতা শুরু করেন। এটি ছিল বাঙালির স্বাধিকার তথা স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা। বঙ্গবন্ধু অনুভব করেন পূর্ব বাংলার আর কোন নেতা-এমনকি যারা আওয়ামী লীগের সংগঠনে যারা যোগ দিয়েছিল তারাও ছয় দফাকে নিয়ে সামনে যেতে চায় না। তাই তিনি পুরো দেশ সফর শুরু করেন। পাকিস্তান সরকার যথার্থভাবে বিপদ টের পায় এবং ১৮ এপ্রিল ভোররাতে যশোর থেকে ঢাকা আসার পথে পুলিশ বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তান প্রতিরক্ষা আইনে গ্রেপ্তার করে। পরদিন বঙ্গবন্ধুকে যশোর এসডিও কোর্টে হাজির করা হলে যশোর এসডিও কোর্ট ঢাকার এসডিও কোর্টে হাজির হওয়ার শর্তে তাকে জামিনে মুক্তি দেয়। ঢাকার এসডিও কোর্ট ২১ এপ্রিল তার জামিন বাতিল করলেও আইনজীবীদের তাৎক্ষণিক আবেদনের প্রেক্ষিতে দায়রা জজ তার জামিন মঞ্জুর করেন। এর আগে ১৮ এপ্রিল যশোর থেকে মুক্তি লাভ করে বিমানযোগে শেখ মুজিব এবং তাজউদ্দীন আহমদ ঢাকায় ফিরে এলে ঢাকা এয়ারপোর্টে বিপুলসংখ্যক জনতা তাদের সংবর্ধনা জ্ঞাপন করে। (সিরাজ উদদীন আহমেদ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ঢাকা : ভাস্কর প্রকাশনী, ২০০১, পৃ. ২০৫) তাকে সংবর্ধনা জ্ঞাপন সম্পর্কে খবর ঢাকার দৈনিকগুলোতে ছাপা হয়। ১৯ এপ্রিল ১৯৬৬ দৈনিক আজাদে প্রকাশিত প্রতিবেদনের কিছু নমুনা নিচে উদ্বৃত করা হলো:

“তাঁহাকেই বিপুলভাবে মাল্যভূষিত করা হয় এবং বিমানবন্দরে সমবেত জনতা দৃপ্তকণ্ঠে... ছয় দফা মানতে হবে” প্রভৃতি ধ্বনি প্রদান করে। ঢাকা বিমানবন্দরেও যে সব আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবকে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করেন, তাদের মধ্যে ছিলেন পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জহিরুদ্দিন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ নুরুল ইসলাম চৌধুরী, আওয়ামী লীগ নেতা খন্দকার মোশতাক আহমদ, ঢাকা শহর আওয়ামী লীগ সম্পাদক গাজী গোলাম মোস্তফা প্রমুখ। নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের সভাপতি মোস্তফা সারোয়ার, ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রহমান এবং আরও কয়েকজন আওয়ামী লীগ কর্মীর নারায়ণগঞ্জে বিমানবন্দরে আসিয়া শেখ মুজিবকে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করেন। (সিরাজ উদদীন আহমেদ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ঢাকা : ভাস্কর প্রকাশনী, ২০০১, পৃ. ২০৫, ১৯-৪-১৯৬৬) ২২ এপ্রিল ১৯৬৬ দৈনিক আজাদে ছাপা হয় ‘শেখ মুজিবকে হয়রানি ও গ্রেপ্তারের বিরুদ্ধে নিন্দা জানিয়ে করাচি প্রাদেশিক আওয়ামী লীগের সম্পাদক খলিল আহমদ তিরমিজি বিবৃতি প্রদান করেন।’ তিরমিজি রাজনৈতিক কর্মীদের গ্রেপ্তারের তীব্র নিন্দা করেন। তিনি পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমানের গ্রেপ্তারের তীব্র সমালোচনা করেন। এই সমস্ত দমনমূলক ব্যবস্থা অবলম্বন করিয়া সরকার পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করিয়া তুলিতেছেন বলিয়া তিনি উল্লেখ করেন।’ (সিরাজ উদদীন আহমেদ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ঢাকা : ভাস্কর প্রকাশনী, ২০০১, পৃ. ২০৫, ২২-৪-১৯৬৬) আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, যশোর থেকে ১৮ এপ্রিল ঢাকায় ফিরে শেখ মুজিব ২১ এপ্রিল দক্ষিণ মহকুমা হাকিমের আদালতে উপস্থিত হলে তার জামিন নাকচ করা হয়। এ প্রেক্ষিতে জেলা সেজন জজ কোর্ট থেকে জামিন নিতে হয়। পরের দিন পত্র-পত্রিকায় তার জামিন সম্পর্কিত খবর প্রকাশিত হয়। খবর ছিল নিম্নরূপ :

Seikh Mujibur Rahman, the Awami Leauge President of East Pakistan Awami League Was granted bail on Thursday by S.J.H Sikander, the district and session judge, Dacca.

Earliar the bail petition of Seikh Mujibur Rahman was rejected by the sub divisional officer, Dacca south to whom the awami legue leader surrendered as directed. The sub divisional officer had directed that Sheikh Mujib be taken into custody till the 25th April 1966.

A case was started against Sheikh Mujib by the Ramna Police under Section 47 of defence of Pakistan rules referring to his last Paltan Maidan speech as prejudicial to the security of Pakistan.He was arrested at jessore on April 18 and was produced in the court of the sub divisional officer, Jessore sadar and bailed out. (The Pakistan Observer, 22-4-66)

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে স্বাধীনতা চেয়েছেন ছয় দফার মাধ্যমে তাও প্রতিফলিত হয়েছে প্রতিবেদনে। এ ধরনের প্রতিবেদন বিদেশি পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার সমর্থিত ঢাকার দৈনিক পত্রিকা ‘পয়গাম’ ৩০ এপ্রিল তারিখ “যুক্তরাষ্ট্রের সরকার ঘেঁষা পত্রিকা নিউইয়র্কস টাইমসে প্রকাশিত রিপোর্টে দেশের স্বার্থবিরোধী কার্যকলাপে লিপ্ত রাজনীতিকদের মুখোশ উন্মোচন” শিরোনামে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। গভর্নর মোনায়েম খানের আত্মীয়ের মালিকানাধীন ‘পয়গাম’ পত্রিকায় লেখা হয়, পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক মঞ্চে শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার সাঙ্গপাঙ্গরা যখন’ ছয় দফা ফতোয়া নিয়ে জনসম্মুখে ‘অবতরণ’ করলেন, তখনই এ দেশের ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি সম্পর্কিত অভিজ্ঞতা সম্পন্ন কোন কোন রাজনীতিবিদ এই মর্মে সাবধানবাণী উচ্চারণ করেন যে, এই ছয় দফার দাবিদারদের পেছনে অদৃশ্য হাতের কারসাজি রয়েছে, তারা নিজেরা নাচছেন, না তাদের নাচানো হচ্ছে।

দূরদৃষ্টি সম্পন্ন রাজনৈতিক মহলে এরূপ ধারণার যথেষ্ট কারণ ছিল- প্রমাণও ছিল। যিনি আজ ৬-দফার পয়গম্বরি দাবি করে পূর্ব পাকিস্তানিদের আত্মার আত্মীয় দাবি করেছেন তিনি গত সেপ্টেম্বরে... বর্বর হামলাকালে ভারতের ... শব্দটি ব্যবহার করেননি। (দৈনিক পয়গাম, ২০-৪-১৯৬৬)

দৈনিক পয়গামে প্রকাশিত দীর্ঘ এই প্রতিবেদনে শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে তথ্য-প্রমাণবিহীনভাবে অনেক অভিযোগই তুলে ধরা হয়। ঢাকা এসবি অফিসার শেখ মুজিবুর রহমানকে ২১ এপ্রিল (১৯৬৬) গ্রেপ্তার করে ওই রাতেই সিলেট মেইল ট্রেনে তাকে তুলে দেয়া হয়। গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টে উল্লেখ করা হয় মানুষ ঢাকা রেলস্টেশনে জড়ো হয় এবং নেতার মুক্তির দাবিতে স্লোগান দেয়। এর জন্য স্টেশন ছেড়ে যেতে ট্রেনের এক ঘণ্টা ৫ মিনিট বিলম্ব হয়। (গোয়েন্দা নথি, F/N 606-48,PF-Part-25)

সিলেট মহকুমা হাকিম তার জামিন নামঞ্জুর করে তাকে ২৩ তারিখ পুনরায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে জেলখানায় প্রেরণ করেন। শেখ মুজিবকে ময়মনসিংহ জেলা জজ ২৫ তারিখ জামিনে মুক্তি প্রধান করেন। (The Pakistan Times, Mujib Released on Bail”, 26-4-66, F/N 606-48 PF-Part-25 SB East Pakistan Note on Sk. Mujibur Raman,dated 25-4-66) এদিকে শেখ মুজিবকে অযথা হয়রানির প্রতিবাদে কুমিল্লায় পথসভা শুরু হয়, বিক্ষোভ মিছিলও চলে। (দৈনিক ইত্তেফাক, ২৭-৪-১৯৬৬) ৬ দফা আন্দোলন ইতোমধ্যে মানুষের দৃষ্টি কাড়তে শুরু করে। শেখ মুজিবও প্রায় প্রতিটি জনসভায় ৬ দফার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলতে থাকেন যে, ছয় দফা বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত তিনি ক্ষান্ত হবেন না, পূর্ব পাকিস্তানিদের মঙ্গল ৬ দফাতেই নিহিত রয়েছে। জনগণের মধ্যে শেখ মুজিবের প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা বৃদ্ধির ইঙ্গিত পাওয়া যায় ডিআইবির গোপন এক প্রতিবেদনে। সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা জানতে পারে যে ২৫ এপ্রিল “…An unknown person from Chittagong conveyed his congratulation to Sk. Mujibur Rahman and also informed Sk. Mujibur Rahman that the nation is behind him. Chittagong people would help him in every respect.” (গোয়েন্দা নথি, F/N 606-48 PF-Part-25)

সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা যথেষ্ট উদ্যোগ নিয়েও চিহ্নিত করতে পারেননি উক্ত অপরিচিত মানুষটি কে, যিনি ২৭ এপ্রিল শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে পুনরায় সাক্ষাৎ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েও অফিসে ওইদিন আসেননি। (শেখ মুজিব ২৫ এপ্রিল ময়মনসিংহ জেলা আদালত থেকে মুক্তি লাভ করে ২৯ তারিখ কুমিল্লা শহরে জনসভা করেন। ইতোমধ্যে দেশে খাদ্যাভাব দেখা দেয়ায় শেখ মুজিব পত্রপত্রিকায় সংকট মোকাবিলার জন্য পূর্ণাঙ্গ রেশন চালু করার দাবি করেন। বিবৃতিতে তিনি জোর দাবি জানিয়ে বলেন, প্রদেশে প্রায় দুর্ভিক্ষাবস্থা মোকাবিলার জন্য অভিলম্বে পূর্ণ রেশনিং প্রবর্তন, টেস্ট রিলিফের ব্যবস্থা গ্রহণ এবং লেভী মূল্যে গুদামজাত সরকারি খাদ্যশস্য ছেড়ে দিতে হবে। তিনি বলেন, খাদ্য পরিস্থিতির এতই অবনতি সাধিত হয়েছে যে, এমনকি ঢাকাতেও চালের মূল্য মণপ্রতি ৪০ টাকা ঊর্ধ্বে।

সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয় যে, আওয়ামী লীগ সভাপতি সম্প্রতি প্রদেশের অভ্যন্তরে ব্যাপক সফর শেষ করেছেন। তিনি বলেন যে, কোন কোন স্থানে বাজারে চাল পাওয়া যাচ্ছে না, এটা লেভী ব্যবস্থাধীনে ধান সংগ্রহেরই পরিণতি। লেভী ব্যবস্থায় জনসাধারণের নিকট থেকে উদ্বৃত্ত ধান সংগ্রহের ফলে বর্তমানে স্থানীয় বাজার প্রায় ধান-চাল শূন্য হয়ে গেছে। বিবৃতিতে তিনি আরও বলেন, বাধ্যতামূলক লেভীর পরিপ্রেক্ষিতে প্রদেশে অবশ্যই বাধ্যতামূলক রেশনিং ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে হবে। জনসাধারণ তাদের ক্রয়ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। কারণ পাটনীতির ব্যর্থতার দরুন চাষিরা পাটের ন্যায্য মূল্য পায়নি। তদুপরি উন্নয়ন কাজ স্থগিত রাখার ফলে গুরুতর বেকার সমস্যা দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে সাত লাখ শ্রমিক বিড়ি পাতা অর্ডিন্যান্সের দরুন কর্মসংস্থান থেকে বিচ্যুত হয়েছে। তার বিবৃতির পরিপ্রেক্ষিতে দৈনিকগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয় যে, পূর্ব-পাকিস্তান একের পর এক প্রতিবছরই প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকারে পরিণত হচ্ছে। এ অবস্থাতেও সরকার সার্টিফিকেট জারির মাধ্যমে ভূমি রাজস্বসহ অন্যান্য বকেয়া প্রাপ্য উসুল করছেন। অনাবৃষ্টির দরুন বর্তমান বৎসরে বোরো ফসল নষ্ট হয়ে গেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

পত্রিকার রিপোর্টে শেখ মুজিবের বিবৃতি প্রসঙ্গে বলা হয় যে, সরকার এ পর্যন্ত পরিকল্পিত পদ্ধতিতে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় অগ্রসর হননি। (দৈনিক ইত্তেফাক, খাদ্য পরিস্থিতি সম্পর্ক শেখ মজিব, ২৯-৪-১৯৬৬, দৈনিক সংবাদ, ২৯-৪-১৯৬৬, The Pakistan Observer, 29-4-66, Morning News, 29-4-1966. The mujib urges Compulsory rationing,) সিলেটের এসডিওর আদালতে ৬ মে শেখ মুজিবের মামলার হাজিরা থাকায় তিনি ৫ মে রাতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ, প্রচার সম্পাদক আবদুল মোমেন, কোষাধ্যক্ষ নুরুল ইসলাম চৌধুরী, সাংগঠনিক সম্পাদক মিজানুর রহমান চৌধুরী সমভিব্যহারে সুরমা মেলযোগে সিলেট যান। ঐদিন আদালতে হাজিরা শেষে সিলেটে একটি জনসভা করেন। এবং রাতে সুরমা মেইলযোগে ঢাকা প্রত্যাবর্তন করেন। নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়াতে মে দিবসের এক শ্রমিক জনসভা ৮ মে অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশ শেষে বাসায় ফেরার পর ৯ মে এর প্রথম প্রহরে পাকিস্তান দেশরক্ষা আইন ৩২(১) ধারা বলে শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তার করা হয়। বোঝা যায় ছয় দফার পর পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে জেলের বাইরে রাখা তাদের জন্য মোটেই নিরাপদ মনে করেনি।

ঢাকা। প্রথম লেখা : ১৬ অক্টোবর, ২০২০। সর্বশেষ সম্পাদনা : ১৭ জানুয়ারি, ২০২০।

মতামত লেখকের নিজস্ব।

(লেখাটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। এর আগে দুই কিস্তি ছাপা হয়েছে। আজ ছাপা হলো তৃতীয় কিস্তি।)

[লেখক : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, কলামিস্ট, দেশের প্রথম ডিজিটাল নিউজ সার্ভিস আবাসের চেয়ারম্যান-

বিজয় কীবোর্ড ও সফটওয়্যারের জনক]

mustafajabbar@gmail.com

মঙ্গলবার, ১৯ জানুয়ারী ২০২১ , ৫ মাঘ ১৪২৭, ৫ জমাদিউস সানি ১৪৪২

ছয় দফা : স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা

মোস্তাফা জব্বার
image

তিন :

ছয় দফা ও মুজিব নির্যাতন :

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা ঘোষণা করার পর যখন দেশব্যাপী এর পক্ষে তীব্র জনমত গড়ে তোলেন এবং তার রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলেন তখনই মাওলানা ভাসানী-মশিউর রহমানরা এর বিরোধিতা শুরু করেন। এটি ছিল বাঙালির স্বাধিকার তথা স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা। বঙ্গবন্ধু অনুভব করেন পূর্ব বাংলার আর কোন নেতা-এমনকি যারা আওয়ামী লীগের সংগঠনে যারা যোগ দিয়েছিল তারাও ছয় দফাকে নিয়ে সামনে যেতে চায় না। তাই তিনি পুরো দেশ সফর শুরু করেন। পাকিস্তান সরকার যথার্থভাবে বিপদ টের পায় এবং ১৮ এপ্রিল ভোররাতে যশোর থেকে ঢাকা আসার পথে পুলিশ বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তান প্রতিরক্ষা আইনে গ্রেপ্তার করে। পরদিন বঙ্গবন্ধুকে যশোর এসডিও কোর্টে হাজির করা হলে যশোর এসডিও কোর্ট ঢাকার এসডিও কোর্টে হাজির হওয়ার শর্তে তাকে জামিনে মুক্তি দেয়। ঢাকার এসডিও কোর্ট ২১ এপ্রিল তার জামিন বাতিল করলেও আইনজীবীদের তাৎক্ষণিক আবেদনের প্রেক্ষিতে দায়রা জজ তার জামিন মঞ্জুর করেন। এর আগে ১৮ এপ্রিল যশোর থেকে মুক্তি লাভ করে বিমানযোগে শেখ মুজিব এবং তাজউদ্দীন আহমদ ঢাকায় ফিরে এলে ঢাকা এয়ারপোর্টে বিপুলসংখ্যক জনতা তাদের সংবর্ধনা জ্ঞাপন করে। (সিরাজ উদদীন আহমেদ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ঢাকা : ভাস্কর প্রকাশনী, ২০০১, পৃ. ২০৫) তাকে সংবর্ধনা জ্ঞাপন সম্পর্কে খবর ঢাকার দৈনিকগুলোতে ছাপা হয়। ১৯ এপ্রিল ১৯৬৬ দৈনিক আজাদে প্রকাশিত প্রতিবেদনের কিছু নমুনা নিচে উদ্বৃত করা হলো:

“তাঁহাকেই বিপুলভাবে মাল্যভূষিত করা হয় এবং বিমানবন্দরে সমবেত জনতা দৃপ্তকণ্ঠে... ছয় দফা মানতে হবে” প্রভৃতি ধ্বনি প্রদান করে। ঢাকা বিমানবন্দরেও যে সব আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবকে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করেন, তাদের মধ্যে ছিলেন পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জহিরুদ্দিন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ নুরুল ইসলাম চৌধুরী, আওয়ামী লীগ নেতা খন্দকার মোশতাক আহমদ, ঢাকা শহর আওয়ামী লীগ সম্পাদক গাজী গোলাম মোস্তফা প্রমুখ। নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের সভাপতি মোস্তফা সারোয়ার, ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রহমান এবং আরও কয়েকজন আওয়ামী লীগ কর্মীর নারায়ণগঞ্জে বিমানবন্দরে আসিয়া শেখ মুজিবকে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করেন। (সিরাজ উদদীন আহমেদ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ঢাকা : ভাস্কর প্রকাশনী, ২০০১, পৃ. ২০৫, ১৯-৪-১৯৬৬) ২২ এপ্রিল ১৯৬৬ দৈনিক আজাদে ছাপা হয় ‘শেখ মুজিবকে হয়রানি ও গ্রেপ্তারের বিরুদ্ধে নিন্দা জানিয়ে করাচি প্রাদেশিক আওয়ামী লীগের সম্পাদক খলিল আহমদ তিরমিজি বিবৃতি প্রদান করেন।’ তিরমিজি রাজনৈতিক কর্মীদের গ্রেপ্তারের তীব্র নিন্দা করেন। তিনি পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমানের গ্রেপ্তারের তীব্র সমালোচনা করেন। এই সমস্ত দমনমূলক ব্যবস্থা অবলম্বন করিয়া সরকার পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করিয়া তুলিতেছেন বলিয়া তিনি উল্লেখ করেন।’ (সিরাজ উদদীন আহমেদ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ঢাকা : ভাস্কর প্রকাশনী, ২০০১, পৃ. ২০৫, ২২-৪-১৯৬৬) আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, যশোর থেকে ১৮ এপ্রিল ঢাকায় ফিরে শেখ মুজিব ২১ এপ্রিল দক্ষিণ মহকুমা হাকিমের আদালতে উপস্থিত হলে তার জামিন নাকচ করা হয়। এ প্রেক্ষিতে জেলা সেজন জজ কোর্ট থেকে জামিন নিতে হয়। পরের দিন পত্র-পত্রিকায় তার জামিন সম্পর্কিত খবর প্রকাশিত হয়। খবর ছিল নিম্নরূপ :

Seikh Mujibur Rahman, the Awami Leauge President of East Pakistan Awami League Was granted bail on Thursday by S.J.H Sikander, the district and session judge, Dacca.

Earliar the bail petition of Seikh Mujibur Rahman was rejected by the sub divisional officer, Dacca south to whom the awami legue leader surrendered as directed. The sub divisional officer had directed that Sheikh Mujib be taken into custody till the 25th April 1966.

A case was started against Sheikh Mujib by the Ramna Police under Section 47 of defence of Pakistan rules referring to his last Paltan Maidan speech as prejudicial to the security of Pakistan.He was arrested at jessore on April 18 and was produced in the court of the sub divisional officer, Jessore sadar and bailed out. (The Pakistan Observer, 22-4-66)

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে স্বাধীনতা চেয়েছেন ছয় দফার মাধ্যমে তাও প্রতিফলিত হয়েছে প্রতিবেদনে। এ ধরনের প্রতিবেদন বিদেশি পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার সমর্থিত ঢাকার দৈনিক পত্রিকা ‘পয়গাম’ ৩০ এপ্রিল তারিখ “যুক্তরাষ্ট্রের সরকার ঘেঁষা পত্রিকা নিউইয়র্কস টাইমসে প্রকাশিত রিপোর্টে দেশের স্বার্থবিরোধী কার্যকলাপে লিপ্ত রাজনীতিকদের মুখোশ উন্মোচন” শিরোনামে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। গভর্নর মোনায়েম খানের আত্মীয়ের মালিকানাধীন ‘পয়গাম’ পত্রিকায় লেখা হয়, পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক মঞ্চে শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার সাঙ্গপাঙ্গরা যখন’ ছয় দফা ফতোয়া নিয়ে জনসম্মুখে ‘অবতরণ’ করলেন, তখনই এ দেশের ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি সম্পর্কিত অভিজ্ঞতা সম্পন্ন কোন কোন রাজনীতিবিদ এই মর্মে সাবধানবাণী উচ্চারণ করেন যে, এই ছয় দফার দাবিদারদের পেছনে অদৃশ্য হাতের কারসাজি রয়েছে, তারা নিজেরা নাচছেন, না তাদের নাচানো হচ্ছে।

দূরদৃষ্টি সম্পন্ন রাজনৈতিক মহলে এরূপ ধারণার যথেষ্ট কারণ ছিল- প্রমাণও ছিল। যিনি আজ ৬-দফার পয়গম্বরি দাবি করে পূর্ব পাকিস্তানিদের আত্মার আত্মীয় দাবি করেছেন তিনি গত সেপ্টেম্বরে... বর্বর হামলাকালে ভারতের ... শব্দটি ব্যবহার করেননি। (দৈনিক পয়গাম, ২০-৪-১৯৬৬)

দৈনিক পয়গামে প্রকাশিত দীর্ঘ এই প্রতিবেদনে শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে তথ্য-প্রমাণবিহীনভাবে অনেক অভিযোগই তুলে ধরা হয়। ঢাকা এসবি অফিসার শেখ মুজিবুর রহমানকে ২১ এপ্রিল (১৯৬৬) গ্রেপ্তার করে ওই রাতেই সিলেট মেইল ট্রেনে তাকে তুলে দেয়া হয়। গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টে উল্লেখ করা হয় মানুষ ঢাকা রেলস্টেশনে জড়ো হয় এবং নেতার মুক্তির দাবিতে স্লোগান দেয়। এর জন্য স্টেশন ছেড়ে যেতে ট্রেনের এক ঘণ্টা ৫ মিনিট বিলম্ব হয়। (গোয়েন্দা নথি, F/N 606-48,PF-Part-25)

সিলেট মহকুমা হাকিম তার জামিন নামঞ্জুর করে তাকে ২৩ তারিখ পুনরায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে জেলখানায় প্রেরণ করেন। শেখ মুজিবকে ময়মনসিংহ জেলা জজ ২৫ তারিখ জামিনে মুক্তি প্রধান করেন। (The Pakistan Times, Mujib Released on Bail”, 26-4-66, F/N 606-48 PF-Part-25 SB East Pakistan Note on Sk. Mujibur Raman,dated 25-4-66) এদিকে শেখ মুজিবকে অযথা হয়রানির প্রতিবাদে কুমিল্লায় পথসভা শুরু হয়, বিক্ষোভ মিছিলও চলে। (দৈনিক ইত্তেফাক, ২৭-৪-১৯৬৬) ৬ দফা আন্দোলন ইতোমধ্যে মানুষের দৃষ্টি কাড়তে শুরু করে। শেখ মুজিবও প্রায় প্রতিটি জনসভায় ৬ দফার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলতে থাকেন যে, ছয় দফা বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত তিনি ক্ষান্ত হবেন না, পূর্ব পাকিস্তানিদের মঙ্গল ৬ দফাতেই নিহিত রয়েছে। জনগণের মধ্যে শেখ মুজিবের প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা বৃদ্ধির ইঙ্গিত পাওয়া যায় ডিআইবির গোপন এক প্রতিবেদনে। সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা জানতে পারে যে ২৫ এপ্রিল “…An unknown person from Chittagong conveyed his congratulation to Sk. Mujibur Rahman and also informed Sk. Mujibur Rahman that the nation is behind him. Chittagong people would help him in every respect.” (গোয়েন্দা নথি, F/N 606-48 PF-Part-25)

সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা যথেষ্ট উদ্যোগ নিয়েও চিহ্নিত করতে পারেননি উক্ত অপরিচিত মানুষটি কে, যিনি ২৭ এপ্রিল শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে পুনরায় সাক্ষাৎ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েও অফিসে ওইদিন আসেননি। (শেখ মুজিব ২৫ এপ্রিল ময়মনসিংহ জেলা আদালত থেকে মুক্তি লাভ করে ২৯ তারিখ কুমিল্লা শহরে জনসভা করেন। ইতোমধ্যে দেশে খাদ্যাভাব দেখা দেয়ায় শেখ মুজিব পত্রপত্রিকায় সংকট মোকাবিলার জন্য পূর্ণাঙ্গ রেশন চালু করার দাবি করেন। বিবৃতিতে তিনি জোর দাবি জানিয়ে বলেন, প্রদেশে প্রায় দুর্ভিক্ষাবস্থা মোকাবিলার জন্য অভিলম্বে পূর্ণ রেশনিং প্রবর্তন, টেস্ট রিলিফের ব্যবস্থা গ্রহণ এবং লেভী মূল্যে গুদামজাত সরকারি খাদ্যশস্য ছেড়ে দিতে হবে। তিনি বলেন, খাদ্য পরিস্থিতির এতই অবনতি সাধিত হয়েছে যে, এমনকি ঢাকাতেও চালের মূল্য মণপ্রতি ৪০ টাকা ঊর্ধ্বে।

সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয় যে, আওয়ামী লীগ সভাপতি সম্প্রতি প্রদেশের অভ্যন্তরে ব্যাপক সফর শেষ করেছেন। তিনি বলেন যে, কোন কোন স্থানে বাজারে চাল পাওয়া যাচ্ছে না, এটা লেভী ব্যবস্থাধীনে ধান সংগ্রহেরই পরিণতি। লেভী ব্যবস্থায় জনসাধারণের নিকট থেকে উদ্বৃত্ত ধান সংগ্রহের ফলে বর্তমানে স্থানীয় বাজার প্রায় ধান-চাল শূন্য হয়ে গেছে। বিবৃতিতে তিনি আরও বলেন, বাধ্যতামূলক লেভীর পরিপ্রেক্ষিতে প্রদেশে অবশ্যই বাধ্যতামূলক রেশনিং ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে হবে। জনসাধারণ তাদের ক্রয়ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। কারণ পাটনীতির ব্যর্থতার দরুন চাষিরা পাটের ন্যায্য মূল্য পায়নি। তদুপরি উন্নয়ন কাজ স্থগিত রাখার ফলে গুরুতর বেকার সমস্যা দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে সাত লাখ শ্রমিক বিড়ি পাতা অর্ডিন্যান্সের দরুন কর্মসংস্থান থেকে বিচ্যুত হয়েছে। তার বিবৃতির পরিপ্রেক্ষিতে দৈনিকগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয় যে, পূর্ব-পাকিস্তান একের পর এক প্রতিবছরই প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকারে পরিণত হচ্ছে। এ অবস্থাতেও সরকার সার্টিফিকেট জারির মাধ্যমে ভূমি রাজস্বসহ অন্যান্য বকেয়া প্রাপ্য উসুল করছেন। অনাবৃষ্টির দরুন বর্তমান বৎসরে বোরো ফসল নষ্ট হয়ে গেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

পত্রিকার রিপোর্টে শেখ মুজিবের বিবৃতি প্রসঙ্গে বলা হয় যে, সরকার এ পর্যন্ত পরিকল্পিত পদ্ধতিতে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় অগ্রসর হননি। (দৈনিক ইত্তেফাক, খাদ্য পরিস্থিতি সম্পর্ক শেখ মজিব, ২৯-৪-১৯৬৬, দৈনিক সংবাদ, ২৯-৪-১৯৬৬, The Pakistan Observer, 29-4-66, Morning News, 29-4-1966. The mujib urges Compulsory rationing,) সিলেটের এসডিওর আদালতে ৬ মে শেখ মুজিবের মামলার হাজিরা থাকায় তিনি ৫ মে রাতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ, প্রচার সম্পাদক আবদুল মোমেন, কোষাধ্যক্ষ নুরুল ইসলাম চৌধুরী, সাংগঠনিক সম্পাদক মিজানুর রহমান চৌধুরী সমভিব্যহারে সুরমা মেলযোগে সিলেট যান। ঐদিন আদালতে হাজিরা শেষে সিলেটে একটি জনসভা করেন। এবং রাতে সুরমা মেইলযোগে ঢাকা প্রত্যাবর্তন করেন। নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়াতে মে দিবসের এক শ্রমিক জনসভা ৮ মে অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশ শেষে বাসায় ফেরার পর ৯ মে এর প্রথম প্রহরে পাকিস্তান দেশরক্ষা আইন ৩২(১) ধারা বলে শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তার করা হয়। বোঝা যায় ছয় দফার পর পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে জেলের বাইরে রাখা তাদের জন্য মোটেই নিরাপদ মনে করেনি।

ঢাকা। প্রথম লেখা : ১৬ অক্টোবর, ২০২০। সর্বশেষ সম্পাদনা : ১৭ জানুয়ারি, ২০২০।

মতামত লেখকের নিজস্ব।

(লেখাটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। এর আগে দুই কিস্তি ছাপা হয়েছে। আজ ছাপা হলো তৃতীয় কিস্তি।)

[লেখক : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, কলামিস্ট, দেশের প্রথম ডিজিটাল নিউজ সার্ভিস আবাসের চেয়ারম্যান-

বিজয় কীবোর্ড ও সফটওয়্যারের জনক]

mustafajabbar@gmail.com