৭৫ শতাংশ শিক্ষার্থী দ্রুত স্কুলে ফিরতে চায়

করোনা সংক্রমণে দীর্ঘ বন্ধের প্রেক্ষাপটে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের ৭৫ শতাংশ শিক্ষার্থী দ্রুত স্কুলে ফিরতে চায়। ৭৬ শতাংশ অভিভাবক, ৭৩ শতাংশ জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও ৮০ শতাংশ এনজিও কর্মকর্তা স্কুল খুলে দেয়ার পক্ষে। তারা স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রেখে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে কার্যক্রম চালানোর পক্ষে। ৮২ শতাংশ শিক্ষক স্কুল খোলার জন্য স্বাস্থ্যবিধি-মাস্ক ব্যবহার, স্যানিটাইজার ও সামাজিক দূরুত্ব মানা নিশ্চিত করতে বলেছেন।

শিক্ষা নিয়ে কাজ করা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার জোট ‘গণসক্ষরতা অভিযান’ পরিচালিত ‘এডুকেশন ওয়াচ’-এর গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদন প্রকাশ করেন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা।

তারা শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার গাইডলাইন তৈরি করে ধাপে ধাপে প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার সুপারিশ করে বলেছেন, নির্দিষ্ট কোন দিনক্ষণ নয়। ফেব্রুয়ারি কিংবা মার্চে নয়, করোনার সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় খুলে দেয়া যেতে পারে। প্রথমে মাধ্যমিক, তারপর চতুর্থ-পঞ্চম, পরে আরও নিচের স্তুরের ক্লাসে খুলে দেয়া যেতে পারে। প্রথমে যেসব জেলা বা উপজেলায় করোনার সংক্রমণ কম সেসব এলাকাকে প্রাধান্য দেয়া।

অনুষ্ঠানে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী, প্রধান গবেষক ড. মনজুর আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান গবেষণা ও শিক্ষণ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ শাহাদৎ হোসেন, গণসাক্ষরতা অভিযানের সদস্য অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ ও আহ্বায়ক ড. আহমদ মোশতাক রাজা চৌধুরী গবেষণার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। সমীক্ষা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন এডুকেশন ওয়াচের গবেষক ও গণসাক্ষরতা অভিযানের প্রোগ্রাম ম্যানেজার ড. মোস্তাফিজুর রহমান।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গণসাক্ষরতা অভিযান প্রতিবছর মাঠ থেকে সরাসরি তথ্য সংগ্রহ করলেও এবার করোনার পরিস্থিতির কারণে এবার তা সম্ভব হয়নি। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ৮ বিভাগের ৮ জেলা থেকে ২১টি উপজেলা নির্বাচন করা হয়। প্রতিটি উপজেলা থেকে তিনটি করে এলাকা ক্লাস্টার (শহর, শহরতলী ও গ্রাম) নির্বাচন করে মোট দুই হাজার ৯৯২ জনের কাছ থেকে উত্তর সংগ্রহ করা হয়। এরমধ্যে এক হাজার ৭০৯ জন শিক্ষার্থী, ৫৭৮ জন শিক্ষক, ৫৭৬ জন অভিভাবক, ৪৮ জন উপজেলা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক কর্মকর্তা ও ১৬ জন জেলা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক কর্মকর্তা ছিলেন।

গত বছরের ৭ থেকে ২২ নভেম্বর এই দুই সপ্তাহের সমীক্ষা তথ্যে দেখা গেছে, শিক্ষার্থীরা দৈনিক গড়ে ৫০ মিনিট দূরশিক্ষণের মাধ্যমে পড়ালেখায় ব্যয় করে। মাধ্যমিক পর্যায়ে তা ৫৫ মিনিটি ও বস্তি এলাকায় গড়ে ৪০ মিনিট। বস্তি এলাকায় মাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়ে শিক্ষার্থীদের দূরশিক্ষণে অংশগ্রহণের গড় সময় মাত্র ২৫ মিনিট। শিক্ষার্থীরা দিনে গড়ে ১৮৮ মিনিট বাড়িতে পড়ালেখার কাজে ব্যয় করে। তারা পরিবারের আয়মূলক কাজে গড়ে ব্যয় করে দৈনিক ১৭১ মিনিট।

রাশেদা কে. চৌধুরী অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার বিষয়ে আমরা নির্দিষ্ট কোন সময়সীমা বেধে দিচ্ছি না। সরকারকে ধাপে ধাপে সক্ষমতা অর্জন করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলতে হবে। যাতে পরবর্তী ধাপে ভুলগুলো শুধরে নিতে পারে। সবার সুরক্ষা নিশ্চিত এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তৈরি করে স্কুলগুলোকে পুনরায় সচল করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কবে কখন খোলা হবে সে বিষয়ে সরকারের স্পষ্টভাবে ঘোষণা দেয়া উচিত। এতে শিক্ষার্র্থীরা প্রস্তুতি নিতে পারবে।’

৭৫ শতাংশ শিক্ষার্থী ক্লাশে ফিরতে চায়

গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষা কর্মকর্তা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। এরমধ্যে ৭৫ শতাংশ শিক্ষার্থী দ্রুত ক্লাসে ফিরে আসতে চায়। ৭৬ শতাংশ অভিভাবক, ৭৩ শতাংশ জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, ৮০% এনজিও কর্মকর্তা স্কুলে খুলে দেয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। তবে প্রাথমিক স্কুল খোলার ক্ষেত্রে ৫৮ শতাংশ শিক্ষক ও ৫২ শতাংশ উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা সর্তকতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন।

৭৯.৭ শতাংশ শিক্ষক বিদ্যালয় খুলে দেয়ার আগে স্কুল কর্তৃপক্ষ কর্তৃক শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টির ওপর অধিকতর গুরুত্বারোপ করেছেন। ৯০.৭ শতাংশ শিক্ষক মনে করেন শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার অভ্যাস তৈরিতে অভিভাবকরা তাদের সচেতন করবেন। ৬২ শতাংশ শিক্ষক সিলেবাস সংক্ষিপ্ত করা এবং ২০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী পরীক্ষা ছাড়া পরবর্তী শ্রেণীতে প্রমোশন চেয়েছেন। করোনার কারণে স্থগিত হওয়া পরীক্ষা দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে ১৪ শতাংশ শিক্ষার্থী।

৬৯% শিক্ষার্থী অনলাইন পাঠদানে অংশগ্রহণ করেনি

করোনাকালে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকায় দূরশিক্ষণের (সংসদ টিভি, অনলাইন, রেডিও ও মোবাইল ফোন) মাধ্যমে পাঠদানের ব্যবস্থা করেছে সরকার। এর সফলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে অনেকেই। বেসরকারি বিভিন্ন গবেষণায়ও বিষয়টি উঠে এসেছে।

সমীক্ষার প্রাপ্ত ফলাফল তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, দূরশিক্ষণে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মাত্র ৩১.৫ শতাংশ শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে, আর ৬৯.৫ শতাংশ অংশগ্রহণ করেনি। করোনাকালে ৩৭.৮ শতাংশ শিক্ষার্থী পরিবার বা অন্যদের কাছ থেকে সহায়তা পেয়েছে।

যেসব শিক্ষার্থী দূরশিক্ষণ প্রক্রিয়ার বাইরে রয়েছে তাদের মধ্যে ৫৭.৯ শতাংশ ডিভাইসের অভাবে অংশগ্রহণ করতে পারছে না উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রামীণ এলাকায় এই হার ৬৮.৯ শতাংশ। অনলাইন ক্লাস আকষর্ণীয় না হওয়ায় ১৬.৫ শতাংশ শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে না। ৯৯.৩ শতাংশ বাড়িতে নিজে নিজে পড়ালেখা করেছে।

ধাপে ধাপে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার সুপারিশ

ধাপে ধাপে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার বিষয়ে গবেষকরা বলেন, মহানগরের বাইরে গ্রামীণ এলাকার স্কুলগুলো খুলে দেয়া যেতে পারে। মার্চ মাসে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও বিভাগীয় পর্যায়ে মহানগরের স্কুলগুলো ধাপে ধাপে খুলে দেয়া যেতে পারে। সেক্ষেত্রে প্রথমে নিম্নমাধ্যমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক স্কুলগুলো খুলে দেয়ার পর প্রাথমিকের চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণী খোলা যেতে পারে। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে নিচের ক্লাসগুলো খুলে দেয়ার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পর স্বাস্থ্য সুরক্ষার শর্তগুলো যেমন- স্কুলে শিক্ষার্থী, শিক্ষকদের মাস্ক পরা, স্যানিটাইজার, হ্যান্ডওয়াস, টয়লেট, ক্লাসরুম, বেঞ্চ স্যানিটাইজ ও পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। ক্লাসরুমে শিক্ষার্থীদের সামাজিক দূরুত্ব বজায় রাখতে প্রতিটি ক্লাসে একাধিক শিফট করা বা বিকল্প দিনে ক্লাসে উপস্থিতি বা উভয়েই বিবেচনা করা যেতে পারে বলে গবেষকরা মনে করেন।

শিক্ষার ক্ষতি পুরুদ্ধারের জন্য অন্তত ২ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে তা প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের পর্যায়ের জন্য নমনীয় ও পর্যায়ক্রমিকভাবে দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া, শিক্ষকদের মানসিক চাপ কমানো ও তাদের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য সরকারি-বেসরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক সব স্তরের শিক্ষকদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পুনরায় খোলা এবং শিক্ষা পুনরুদ্ধার বাস্তবায়নের সবাইকে নিয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে দুই বছর মেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং প্রতিটি উপজেলার শিক্ষার্থী সংখ্যা বিবেচনা করে আনুপাতিক হারে অর্থ বরাদ্দ দেয়া প্রয়োজন বলেও মনে করেন গবেষকরা।

করোনায় শিক্ষায় ক্ষতি পুনরুদ্ধারে ১২ সুপারিশ

করোনায় প্রায় এক বছর শিক্ষায় যে ক্ষতি হয়েছে তা পুররুদ্ধারের জন্য ৫ দফা সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। এগুলো হলো- শিক্ষার ক্ষতি পুনরুদ্ধারের জন্য আগামী দুই বছরের পাঠ্যক্রম সংক্ষিপ্ত করে মূল দক্ষতার বিষয়গুলোর ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়া, প্রাথমিকে বাংলা ও গণিত এবং মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান বিষয়ের ওপর জোর দেয়া।

পরীক্ষার জন্য সময় কমিয়ে ক্লাসরুমে বেশি সময় দেয়া, পিইসি ও জেএসসি পরীক্ষা বাদ দিয়ে সংক্ষিপ্তভাবে মূল বিষয়গুলোর ওপর এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা নেয়া। স্কুল পর্যায়ে পরীক্ষার সংখ্যা কমিয়ে আনা, স্কুলে ছুটি কমিয়ে আনা, পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত ক্লাসের ব্যবস্থা করা এবং শনিবার বিশেষ ক্লাসের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। অনলাইন/অফলাইন ডিজিটাল/দূরশিক্ষণের একটি কমন প্লাটফর্ম তৈরি করা যেতে পারে। যাতে শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের ক্লাসরুম, পাঠ ও দূরশিক্ষণের পাঠের লিংক প্রদান করে সহায়তা করা যেতে পারে এবং শিক্ষকদের সহায়তা করার জন্য শিক্ষাসহায়ক নিয়োগ দেয়া যেতে পারে শিক্ষা এনজিওগুলোর সহায়তায়। এজন্য অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে।

বুধবার, ২০ জানুয়ারী ২০২১ , ৬ মাঘ ১৪২৭, ৬ জমাদিউস সানি ১৪৪২

গণসাক্ষরতা অভিযান’র গবেষণা

৭৫ শতাংশ শিক্ষার্থী দ্রুত স্কুলে ফিরতে চায়

অনলাইনে শিক্ষায় ৬৯% শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ নেই

করোনা সংক্রমণে দীর্ঘ বন্ধের প্রেক্ষাপটে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের ৭৫ শতাংশ শিক্ষার্থী দ্রুত স্কুলে ফিরতে চায়। ৭৬ শতাংশ অভিভাবক, ৭৩ শতাংশ জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও ৮০ শতাংশ এনজিও কর্মকর্তা স্কুল খুলে দেয়ার পক্ষে। তারা স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রেখে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে কার্যক্রম চালানোর পক্ষে। ৮২ শতাংশ শিক্ষক স্কুল খোলার জন্য স্বাস্থ্যবিধি-মাস্ক ব্যবহার, স্যানিটাইজার ও সামাজিক দূরুত্ব মানা নিশ্চিত করতে বলেছেন।

শিক্ষা নিয়ে কাজ করা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার জোট ‘গণসক্ষরতা অভিযান’ পরিচালিত ‘এডুকেশন ওয়াচ’-এর গবেষণা প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদন প্রকাশ করেন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা।

তারা শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার গাইডলাইন তৈরি করে ধাপে ধাপে প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার সুপারিশ করে বলেছেন, নির্দিষ্ট কোন দিনক্ষণ নয়। ফেব্রুয়ারি কিংবা মার্চে নয়, করোনার সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় খুলে দেয়া যেতে পারে। প্রথমে মাধ্যমিক, তারপর চতুর্থ-পঞ্চম, পরে আরও নিচের স্তুরের ক্লাসে খুলে দেয়া যেতে পারে। প্রথমে যেসব জেলা বা উপজেলায় করোনার সংক্রমণ কম সেসব এলাকাকে প্রাধান্য দেয়া।

অনুষ্ঠানে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী, প্রধান গবেষক ড. মনজুর আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান গবেষণা ও শিক্ষণ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ শাহাদৎ হোসেন, গণসাক্ষরতা অভিযানের সদস্য অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ ও আহ্বায়ক ড. আহমদ মোশতাক রাজা চৌধুরী গবেষণার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। সমীক্ষা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন এডুকেশন ওয়াচের গবেষক ও গণসাক্ষরতা অভিযানের প্রোগ্রাম ম্যানেজার ড. মোস্তাফিজুর রহমান।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গণসাক্ষরতা অভিযান প্রতিবছর মাঠ থেকে সরাসরি তথ্য সংগ্রহ করলেও এবার করোনার পরিস্থিতির কারণে এবার তা সম্ভব হয়নি। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ৮ বিভাগের ৮ জেলা থেকে ২১টি উপজেলা নির্বাচন করা হয়। প্রতিটি উপজেলা থেকে তিনটি করে এলাকা ক্লাস্টার (শহর, শহরতলী ও গ্রাম) নির্বাচন করে মোট দুই হাজার ৯৯২ জনের কাছ থেকে উত্তর সংগ্রহ করা হয়। এরমধ্যে এক হাজার ৭০৯ জন শিক্ষার্থী, ৫৭৮ জন শিক্ষক, ৫৭৬ জন অভিভাবক, ৪৮ জন উপজেলা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক কর্মকর্তা ও ১৬ জন জেলা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক কর্মকর্তা ছিলেন।

গত বছরের ৭ থেকে ২২ নভেম্বর এই দুই সপ্তাহের সমীক্ষা তথ্যে দেখা গেছে, শিক্ষার্থীরা দৈনিক গড়ে ৫০ মিনিট দূরশিক্ষণের মাধ্যমে পড়ালেখায় ব্যয় করে। মাধ্যমিক পর্যায়ে তা ৫৫ মিনিটি ও বস্তি এলাকায় গড়ে ৪০ মিনিট। বস্তি এলাকায় মাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়ে শিক্ষার্থীদের দূরশিক্ষণে অংশগ্রহণের গড় সময় মাত্র ২৫ মিনিট। শিক্ষার্থীরা দিনে গড়ে ১৮৮ মিনিট বাড়িতে পড়ালেখার কাজে ব্যয় করে। তারা পরিবারের আয়মূলক কাজে গড়ে ব্যয় করে দৈনিক ১৭১ মিনিট।

রাশেদা কে. চৌধুরী অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার বিষয়ে আমরা নির্দিষ্ট কোন সময়সীমা বেধে দিচ্ছি না। সরকারকে ধাপে ধাপে সক্ষমতা অর্জন করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলতে হবে। যাতে পরবর্তী ধাপে ভুলগুলো শুধরে নিতে পারে। সবার সুরক্ষা নিশ্চিত এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তৈরি করে স্কুলগুলোকে পুনরায় সচল করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কবে কখন খোলা হবে সে বিষয়ে সরকারের স্পষ্টভাবে ঘোষণা দেয়া উচিত। এতে শিক্ষার্র্থীরা প্রস্তুতি নিতে পারবে।’

৭৫ শতাংশ শিক্ষার্থী ক্লাশে ফিরতে চায়

গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষা কর্মকর্তা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বেশিরভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। এরমধ্যে ৭৫ শতাংশ শিক্ষার্থী দ্রুত ক্লাসে ফিরে আসতে চায়। ৭৬ শতাংশ অভিভাবক, ৭৩ শতাংশ জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা, ৮০% এনজিও কর্মকর্তা স্কুলে খুলে দেয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। তবে প্রাথমিক স্কুল খোলার ক্ষেত্রে ৫৮ শতাংশ শিক্ষক ও ৫২ শতাংশ উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা সর্তকতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন।

৭৯.৭ শতাংশ শিক্ষক বিদ্যালয় খুলে দেয়ার আগে স্কুল কর্তৃপক্ষ কর্তৃক শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টির ওপর অধিকতর গুরুত্বারোপ করেছেন। ৯০.৭ শতাংশ শিক্ষক মনে করেন শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার অভ্যাস তৈরিতে অভিভাবকরা তাদের সচেতন করবেন। ৬২ শতাংশ শিক্ষক সিলেবাস সংক্ষিপ্ত করা এবং ২০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী পরীক্ষা ছাড়া পরবর্তী শ্রেণীতে প্রমোশন চেয়েছেন। করোনার কারণে স্থগিত হওয়া পরীক্ষা দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে ১৪ শতাংশ শিক্ষার্থী।

৬৯% শিক্ষার্থী অনলাইন পাঠদানে অংশগ্রহণ করেনি

করোনাকালে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকায় দূরশিক্ষণের (সংসদ টিভি, অনলাইন, রেডিও ও মোবাইল ফোন) মাধ্যমে পাঠদানের ব্যবস্থা করেছে সরকার। এর সফলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে অনেকেই। বেসরকারি বিভিন্ন গবেষণায়ও বিষয়টি উঠে এসেছে।

সমীক্ষার প্রাপ্ত ফলাফল তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, দূরশিক্ষণে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মাত্র ৩১.৫ শতাংশ শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে, আর ৬৯.৫ শতাংশ অংশগ্রহণ করেনি। করোনাকালে ৩৭.৮ শতাংশ শিক্ষার্থী পরিবার বা অন্যদের কাছ থেকে সহায়তা পেয়েছে।

যেসব শিক্ষার্থী দূরশিক্ষণ প্রক্রিয়ার বাইরে রয়েছে তাদের মধ্যে ৫৭.৯ শতাংশ ডিভাইসের অভাবে অংশগ্রহণ করতে পারছে না উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রামীণ এলাকায় এই হার ৬৮.৯ শতাংশ। অনলাইন ক্লাস আকষর্ণীয় না হওয়ায় ১৬.৫ শতাংশ শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে না। ৯৯.৩ শতাংশ বাড়িতে নিজে নিজে পড়ালেখা করেছে।

ধাপে ধাপে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার সুপারিশ

ধাপে ধাপে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার বিষয়ে গবেষকরা বলেন, মহানগরের বাইরে গ্রামীণ এলাকার স্কুলগুলো খুলে দেয়া যেতে পারে। মার্চ মাসে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও বিভাগীয় পর্যায়ে মহানগরের স্কুলগুলো ধাপে ধাপে খুলে দেয়া যেতে পারে। সেক্ষেত্রে প্রথমে নিম্নমাধ্যমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক স্কুলগুলো খুলে দেয়ার পর প্রাথমিকের চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণী খোলা যেতে পারে। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে নিচের ক্লাসগুলো খুলে দেয়ার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পর স্বাস্থ্য সুরক্ষার শর্তগুলো যেমন- স্কুলে শিক্ষার্থী, শিক্ষকদের মাস্ক পরা, স্যানিটাইজার, হ্যান্ডওয়াস, টয়লেট, ক্লাসরুম, বেঞ্চ স্যানিটাইজ ও পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। ক্লাসরুমে শিক্ষার্থীদের সামাজিক দূরুত্ব বজায় রাখতে প্রতিটি ক্লাসে একাধিক শিফট করা বা বিকল্প দিনে ক্লাসে উপস্থিতি বা উভয়েই বিবেচনা করা যেতে পারে বলে গবেষকরা মনে করেন।

শিক্ষার ক্ষতি পুরুদ্ধারের জন্য অন্তত ২ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে তা প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের পর্যায়ের জন্য নমনীয় ও পর্যায়ক্রমিকভাবে দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া, শিক্ষকদের মানসিক চাপ কমানো ও তাদের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য সরকারি-বেসরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক সব স্তরের শিক্ষকদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পুনরায় খোলা এবং শিক্ষা পুনরুদ্ধার বাস্তবায়নের সবাইকে নিয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে দুই বছর মেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং প্রতিটি উপজেলার শিক্ষার্থী সংখ্যা বিবেচনা করে আনুপাতিক হারে অর্থ বরাদ্দ দেয়া প্রয়োজন বলেও মনে করেন গবেষকরা।

করোনায় শিক্ষায় ক্ষতি পুনরুদ্ধারে ১২ সুপারিশ

করোনায় প্রায় এক বছর শিক্ষায় যে ক্ষতি হয়েছে তা পুররুদ্ধারের জন্য ৫ দফা সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। এগুলো হলো- শিক্ষার ক্ষতি পুনরুদ্ধারের জন্য আগামী দুই বছরের পাঠ্যক্রম সংক্ষিপ্ত করে মূল দক্ষতার বিষয়গুলোর ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়া, প্রাথমিকে বাংলা ও গণিত এবং মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান বিষয়ের ওপর জোর দেয়া।

পরীক্ষার জন্য সময় কমিয়ে ক্লাসরুমে বেশি সময় দেয়া, পিইসি ও জেএসসি পরীক্ষা বাদ দিয়ে সংক্ষিপ্তভাবে মূল বিষয়গুলোর ওপর এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা নেয়া। স্কুল পর্যায়ে পরীক্ষার সংখ্যা কমিয়ে আনা, স্কুলে ছুটি কমিয়ে আনা, পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত ক্লাসের ব্যবস্থা করা এবং শনিবার বিশেষ ক্লাসের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। অনলাইন/অফলাইন ডিজিটাল/দূরশিক্ষণের একটি কমন প্লাটফর্ম তৈরি করা যেতে পারে। যাতে শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের ক্লাসরুম, পাঠ ও দূরশিক্ষণের পাঠের লিংক প্রদান করে সহায়তা করা যেতে পারে এবং শিক্ষকদের সহায়তা করার জন্য শিক্ষাসহায়ক নিয়োগ দেয়া যেতে পারে শিক্ষা এনজিওগুলোর সহায়তায়। এজন্য অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে।