পর্তুগালে বসে দেশীয় চক্রের সহযোগিতায় মানব পাচার

টাঙ্গাইলের একটি কলেজের শিক্ষার্থী জাবেদ। লেখাপড়া অবস্থায় সংসারে সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে ইউরোপীয় অঞ্চলে পাড়ি দেয়ার স্বপ্ন দেখে। ইতালি প্রবাসী ভগ্নিপতি মতিয়ারের ভাই পর্তুগাল প্রবাসী সহিদুল ইসলামের সঙ্গে কথা হয়। ১১ লাখ টাকা খরচে সহিদুল চেক রিপাবলিকানে ভালো বেতনে চাকরি পাইয়ে দেয়ার আশ্বাস দেন জাবেদকে। এজন্য বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক মো. আবদুল আলিম এবং কবির আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করে টাকা পরিশোধের জন্য বলেন। সহিদের কথায় সরল বিশ্বাসে ৯ লাখ টাকা পরিশোধ করেন জাবেদ। চুক্তি অনুযায়ী জাবেদসহ ৭ জনকে ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে গিয়েই বিপত্তি বাধে। দালালচক্র সবার কাছ থেকে পাসপোর্ট ও ভিসা নিতে চায়। কিন্তু চেক রিপাবালিকান গমনেচ্ছুরা জেনে যায় সেখানে এ মুহূর্তে সব ভিসা বন্ধ। এরপর দেশে ফিরে এসে রিক্রুটিং এজেন্সির সন্ধান করতে থাকে। কারর নাগাল না পেয়ে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডিতে অভিযোগ করে। সিআইডি অনুসন্ধান করে জানতে পারে যারা চেক রিপাবলিকান পাঠানোর কথা বলেছে তাদের বৈধ কোন লাইসেন্স নেই। অবৈধভাবে রিক্রুটিং এজেন্সি খুলে জাবেদসহ বহুজনকে ভারতে পাচার করেছে। অভিযান চালিয়ে চক্রের দুই সদস্য আবদুল আলিম ও কবির আহমেদকে গ্রেপ্তারের পর মানব পাচারের বেশ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলে।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, মানব পাচারের মামলায় গ্রেপ্তার আবদুল আলিম ও কবির মিলে জাবেদসহ ৭ জনকে ভারতে পাচার করেছিল। যাদের পাচার করা হয়েছে তাদের মধ্যে টাঙ্গাইলের একটি কলেজেরছাত্র জাবেদ। সোহেল রানা, রফিক, মামুন পাটোয়ারী বিভিন্ন পেশায় যুক্ত। জুবায়ের বিভিন্ন পেশায় যুক্ত ছিল। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রাজিব এবং মাহবুব শাহ’র আগে দেশের বাইরে ছিল। এ ৭ জনের কাছ থেকে চক্রটি ৩২ লাখ ৩০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। পাচারের শিকার হয়ে ওই ৭ জন গত ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরে এসেছে পাচারকারীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে। এ চক্রের মূল হোতা সহিদ পর্তুগালে আছে। দেশে মোস্তফাসহ বেশ কয়েকজন আছে যারা পলাতক আছে। তাদের ধরার জন্য চেষ্টা চলছে।

সংবাদ সম্মেলনে সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি শেখ ওমর ফারুক বলেন, একটি আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্রের সদস্যরা দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে বিদেশে যেতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের ইউরোপীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে পাঠানোর কথা বলে লোক সংগ্রহ করত। এই চক্রের মূল হোতা সহিদ পর্তুগালে অবস্থান করে বিভিন্ন লোকজনকে ইউরোপের ভুয়া কাগজপত্র পাঠাত। জনশক্তি কর্মসংস্থানের অনুমোদন ছাড়াই কাজ করত চক্রটি। তাদের কোন রিক্রুটিং এজেন্সি বা লাইসেন্স নেই। তিনি বলেন, তারা চাকরির জাল ভিসায় চেক রিপাবলিকানসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নেয়ার কথা বলে প্রথমে ভারত নিয়ে যেত। পরে ভারতে নেয়ার পর লোকজনদের কাছ থেকে পাসপোর্ট, ডলার ও রুপি কেড়ে নিত। এরপর এদের ভারতীয় চক্রের সদস্যরা ভিসা ইন্টারভিউয়ের বিভিন্ন তারিখের কথা বলে ঘোরাতে থাকে। পরে এসব ভুক্তভোগীরা প্রতারিত হচ্ছে বুঝতে পেরে চেক রিপাবলিক অ্যাম্বাসিতে যোগাযোগ করে জানতে পারেন, তারা কোন ভিসা দিচ্ছে না।

সিআইডির এএসপি রতন কুমার কৃষ্ণ জানান, গত বছরের অক্টোবর মাসের দিকে বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে চেক রিপাবলিকানে পাঠানোর কথা বলে বাংলাদেশ থেকে ৭ জনকে নিয়ে যায় দালাল চক্র। চক্রের মূল হোতা পর্তুগাল প্রবাসী সহিদের নির্দেশে ওই ৭ জনকে ভারতে নিয়ে যায় বাংলাদেশি দালাল আলিম। আলিম ভারতের কলকাতায় নিয়ে যাওয়ার পর ৭ জনকে ভারতীয় একটি চক্রের কাছে তুলে নেয়। ভারতীয় ওই চক্রটি বাংলাদেশি ৭ জনকে পাসপোর্টসহ টাকা পয়সা জমা দেয়ার জন্য চাপ দেয়। তাদের মারধর করেন। এক পর্যায়ে ওই ৭ জন দালাল চক্রের হাত থেকে বাঁচতে পরদিন পাসপোর্ট ও টাকা-পয়সা জমা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। পরদিন তারা দালাল চক্রের কাছে দেখা না করে সরাসরি চেক রিপাবলিকান অ্যাম্বাসিতে যান। সেখানে গিয়ে তারা জানতে পারেন, তাদের যে ওয়ার্কপারমিট দেয়া হয়েছে ওইসব জাল। আর এ মুহূতে চেক রিপাবলিানে কোন ভিসা দেয়া হচ্ছে না।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মিরাজ আলী মাহমুদ জানান, পাচারের শিকার জাবেদ ছাত্র হলেও সোহেল রানা, রফিক, মামুন পাটোয়ারী, জুবায়ের, রাজিব এবং মাহবুব শাহ’র মধ্যে অনেকেই আগে বিভিন্ন দেশে ছিল। এরমধ্যে রাজিব ও মাহবুব শাহ দুবাই থাকতে মূল হোতা সহিদের সঙ্গে পরিচয় হয়। এক পর্যায়ে দুবাইয়ের ভিসার মেয়াদ শেষ হলে তারা দেশে ফিরে আসে। তখন সহিদও দেশে বেড়াতে এসেছিল। এরপর রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক মোস্তফার মাধ্যমে সহিদের সঙ্গে কথা হয় চেক রিপাবলিকানে নিয়ে যাওয়ার জন্য। এজন্য টাকা পয়সা দেয়ার জন্য আবদুল আলিম ও সহিদের সঙ্গে তাদের পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়। আবদুল আলিম ও কবির আরও কিছু লোকজন ঠিক করে। মোস্তফার অফিসে বসে জাল ওয়ার্কপারমিট তৈরি করে ৭ জনকে বসে কাজগপত্র ও ভিসা এসে গেছে বলে এজন্য ভারতে যেতে হবে। তখন ৭ জনকে ভারতে নিয়ে যাওয়ার পর দিল্লীতে একটি হোটেলে তোলা হয়। সেখানে ভারতীয় দু’জন দালাল চক্র ওই ৭ জনের কাছে এসে পাসপোর্ট ও তাদের সঙ্গে থাকা টাকা পয়সা দিতে বলে। না দেয়ায় মারধর করে। এ চক্রের আরও বেশ কিছু নাম পাওয়া গেছে। যাদের ধরতে পারলে পুরো চক্রের মানব পাচারের বিস্তারিত তথ্য বেরিয়ে আসবে। বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র পাওয়া গেছে অভিযানে। এসব নিয়ে কাজ চলছে।

বুধবার, ২০ জানুয়ারী ২০২১ , ৬ মাঘ ১৪২৭, ৬ জমাদিউস সানি ১৪৪২

পর্তুগালে বসে দেশীয় চক্রের সহযোগিতায় মানব পাচার

দু’জনকে গ্রেপ্তারের পর নানা তথ্য

টাঙ্গাইলের একটি কলেজের শিক্ষার্থী জাবেদ। লেখাপড়া অবস্থায় সংসারে সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে ইউরোপীয় অঞ্চলে পাড়ি দেয়ার স্বপ্ন দেখে। ইতালি প্রবাসী ভগ্নিপতি মতিয়ারের ভাই পর্তুগাল প্রবাসী সহিদুল ইসলামের সঙ্গে কথা হয়। ১১ লাখ টাকা খরচে সহিদুল চেক রিপাবলিকানে ভালো বেতনে চাকরি পাইয়ে দেয়ার আশ্বাস দেন জাবেদকে। এজন্য বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক মো. আবদুল আলিম এবং কবির আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করে টাকা পরিশোধের জন্য বলেন। সহিদের কথায় সরল বিশ্বাসে ৯ লাখ টাকা পরিশোধ করেন জাবেদ। চুক্তি অনুযায়ী জাবেদসহ ৭ জনকে ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে গিয়েই বিপত্তি বাধে। দালালচক্র সবার কাছ থেকে পাসপোর্ট ও ভিসা নিতে চায়। কিন্তু চেক রিপাবালিকান গমনেচ্ছুরা জেনে যায় সেখানে এ মুহূর্তে সব ভিসা বন্ধ। এরপর দেশে ফিরে এসে রিক্রুটিং এজেন্সির সন্ধান করতে থাকে। কারর নাগাল না পেয়ে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডিতে অভিযোগ করে। সিআইডি অনুসন্ধান করে জানতে পারে যারা চেক রিপাবলিকান পাঠানোর কথা বলেছে তাদের বৈধ কোন লাইসেন্স নেই। অবৈধভাবে রিক্রুটিং এজেন্সি খুলে জাবেদসহ বহুজনকে ভারতে পাচার করেছে। অভিযান চালিয়ে চক্রের দুই সদস্য আবদুল আলিম ও কবির আহমেদকে গ্রেপ্তারের পর মানব পাচারের বেশ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলে।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, মানব পাচারের মামলায় গ্রেপ্তার আবদুল আলিম ও কবির মিলে জাবেদসহ ৭ জনকে ভারতে পাচার করেছিল। যাদের পাচার করা হয়েছে তাদের মধ্যে টাঙ্গাইলের একটি কলেজেরছাত্র জাবেদ। সোহেল রানা, রফিক, মামুন পাটোয়ারী বিভিন্ন পেশায় যুক্ত। জুবায়ের বিভিন্ন পেশায় যুক্ত ছিল। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রাজিব এবং মাহবুব শাহ’র আগে দেশের বাইরে ছিল। এ ৭ জনের কাছ থেকে চক্রটি ৩২ লাখ ৩০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। পাচারের শিকার হয়ে ওই ৭ জন গত ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরে এসেছে পাচারকারীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে। এ চক্রের মূল হোতা সহিদ পর্তুগালে আছে। দেশে মোস্তফাসহ বেশ কয়েকজন আছে যারা পলাতক আছে। তাদের ধরার জন্য চেষ্টা চলছে।

সংবাদ সম্মেলনে সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি শেখ ওমর ফারুক বলেন, একটি আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্রের সদস্যরা দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে বিদেশে যেতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের ইউরোপীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে পাঠানোর কথা বলে লোক সংগ্রহ করত। এই চক্রের মূল হোতা সহিদ পর্তুগালে অবস্থান করে বিভিন্ন লোকজনকে ইউরোপের ভুয়া কাগজপত্র পাঠাত। জনশক্তি কর্মসংস্থানের অনুমোদন ছাড়াই কাজ করত চক্রটি। তাদের কোন রিক্রুটিং এজেন্সি বা লাইসেন্স নেই। তিনি বলেন, তারা চাকরির জাল ভিসায় চেক রিপাবলিকানসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নেয়ার কথা বলে প্রথমে ভারত নিয়ে যেত। পরে ভারতে নেয়ার পর লোকজনদের কাছ থেকে পাসপোর্ট, ডলার ও রুপি কেড়ে নিত। এরপর এদের ভারতীয় চক্রের সদস্যরা ভিসা ইন্টারভিউয়ের বিভিন্ন তারিখের কথা বলে ঘোরাতে থাকে। পরে এসব ভুক্তভোগীরা প্রতারিত হচ্ছে বুঝতে পেরে চেক রিপাবলিক অ্যাম্বাসিতে যোগাযোগ করে জানতে পারেন, তারা কোন ভিসা দিচ্ছে না।

সিআইডির এএসপি রতন কুমার কৃষ্ণ জানান, গত বছরের অক্টোবর মাসের দিকে বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে চেক রিপাবলিকানে পাঠানোর কথা বলে বাংলাদেশ থেকে ৭ জনকে নিয়ে যায় দালাল চক্র। চক্রের মূল হোতা পর্তুগাল প্রবাসী সহিদের নির্দেশে ওই ৭ জনকে ভারতে নিয়ে যায় বাংলাদেশি দালাল আলিম। আলিম ভারতের কলকাতায় নিয়ে যাওয়ার পর ৭ জনকে ভারতীয় একটি চক্রের কাছে তুলে নেয়। ভারতীয় ওই চক্রটি বাংলাদেশি ৭ জনকে পাসপোর্টসহ টাকা পয়সা জমা দেয়ার জন্য চাপ দেয়। তাদের মারধর করেন। এক পর্যায়ে ওই ৭ জন দালাল চক্রের হাত থেকে বাঁচতে পরদিন পাসপোর্ট ও টাকা-পয়সা জমা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। পরদিন তারা দালাল চক্রের কাছে দেখা না করে সরাসরি চেক রিপাবলিকান অ্যাম্বাসিতে যান। সেখানে গিয়ে তারা জানতে পারেন, তাদের যে ওয়ার্কপারমিট দেয়া হয়েছে ওইসব জাল। আর এ মুহূতে চেক রিপাবলিানে কোন ভিসা দেয়া হচ্ছে না।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মিরাজ আলী মাহমুদ জানান, পাচারের শিকার জাবেদ ছাত্র হলেও সোহেল রানা, রফিক, মামুন পাটোয়ারী, জুবায়ের, রাজিব এবং মাহবুব শাহ’র মধ্যে অনেকেই আগে বিভিন্ন দেশে ছিল। এরমধ্যে রাজিব ও মাহবুব শাহ দুবাই থাকতে মূল হোতা সহিদের সঙ্গে পরিচয় হয়। এক পর্যায়ে দুবাইয়ের ভিসার মেয়াদ শেষ হলে তারা দেশে ফিরে আসে। তখন সহিদও দেশে বেড়াতে এসেছিল। এরপর রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক মোস্তফার মাধ্যমে সহিদের সঙ্গে কথা হয় চেক রিপাবলিকানে নিয়ে যাওয়ার জন্য। এজন্য টাকা পয়সা দেয়ার জন্য আবদুল আলিম ও সহিদের সঙ্গে তাদের পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়। আবদুল আলিম ও কবির আরও কিছু লোকজন ঠিক করে। মোস্তফার অফিসে বসে জাল ওয়ার্কপারমিট তৈরি করে ৭ জনকে বসে কাজগপত্র ও ভিসা এসে গেছে বলে এজন্য ভারতে যেতে হবে। তখন ৭ জনকে ভারতে নিয়ে যাওয়ার পর দিল্লীতে একটি হোটেলে তোলা হয়। সেখানে ভারতীয় দু’জন দালাল চক্র ওই ৭ জনের কাছে এসে পাসপোর্ট ও তাদের সঙ্গে থাকা টাকা পয়সা দিতে বলে। না দেয়ায় মারধর করে। এ চক্রের আরও বেশ কিছু নাম পাওয়া গেছে। যাদের ধরতে পারলে পুরো চক্রের মানব পাচারের বিস্তারিত তথ্য বেরিয়ে আসবে। বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র পাওয়া গেছে অভিযানে। এসব নিয়ে কাজ চলছে।