অরক্ষিত রেকর্ড রুম, গায়েব হচ্ছে ভলিউম বইয়ের পাতা

যশোর জেলা রেজিস্ট্রি অফিসের রেকর্ড রুম অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। নতুন করে সক্রিয় হয়ে ওঠেছে ভলিউম থেকে পাতা ছেড়া চক্রটি। মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ভলিউমের পাতা লাগাতারভাবে গায়েব করছে তারা। এ কারণে নানা ধরনের জটিলতায় পড়ছেন জমির মালিকরা। ভলিউমের পাতা গায়েবের মূলহোতা সাইফুল ইসলাম ও শামছুজ্জামান মিলন। এই হোতাদের বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

দীর্ঘদিন ধরে যশোর জেলা রেজিস্ট্রি অফিসের রেকর্ড রুমে যাতায়াত সাইফুল-মিলন চক্রের। এই চক্র অর্থের বিনিময়ে একটি সরকারি অফিসের রেকর্ডপত্র বিক্রি করে দিচ্ছে। যা রীতিমতো শিউরে ওঠার মতো। এদের লাগাম টানার কেউ নেই! যারা এটি দেখবেন তারাই নাকি অর্থের কাছে ‘অন্ধ’ হয়ে গেছেন। কোনকিছুই দেখতে পাচ্ছেন না। বছরের পর বছর ধরে এই অপকর্ম চলে আসছে। আর তার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষের।

অনুসন্ধানে বের হয়েছে, নকলনবিশ সাইফুল ইসলাম ৫৮৬৮ নম্বর দলিলের পাতা ভলিউম থেকে ছিঁড়ে নিয়েছেন। ১৯৯৩ সালে কেশবপুর উপজেলা সাবরেজিস্ট্রি অফিসে এই দলিল সম্পাদন হয়। জমির মালিক নকল তুলতে গিয়ে জানতে পারেন ভলিউমে এ সংক্রান্ত রেকর্ডপত্র নেই।

যশোর সদর উপজেলা সাবরেজিস্ট্রি অফিসের দলিল নম্বর ১৬২৮৬। ভলিউম নম্বর ২০৩। পাতা নম্বর ১১৫, ১১৬ ও ১১৭। এই জমির মালিক মাগুরার শালিখা উপজেলার শতখালি গ্রামের নুরুল হুদা মিয়ার ছেলে দুলু মিয়া। ভলিউম থেকে ১১৫, ১১৬ ও ১১৭ নম্বর পাতা গায়েব হয়ে গেছে। কেবল গায়েবই হয়নি, এই জায়গায় সেঁটে দেয়া হয়েছে ঢাকার একব্যক্তির জমির কাগজপত্র।

দুলু মিয়া এক বছর ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন দলিলের নকল তোলার জন্য। কিন্তু পারছেন না। এমনকি ভলিউম দেখতে চাইলেও তা দেখানো হচ্ছে না। জেলা রেজিস্ট্রারের কাছে অভিযোগ করেও কোন প্রতিকার পাচ্ছেন না দুলু মিয়া।

১৯৮০ সালে রেজিস্ট্রি হয় ৫৮৫ নম্বর দলিল। যার ভলিউম নম্বর ৪। পাতা নম্বর ২২৭, ২২৮, ২২৯ ও ২৩০। এই ভলিউম থেকে উল্লিখিত চারটি পাতা ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। রেকর্ড রুম থেকে বলা হচ্ছে চার নম্বর ভলিউম বইটি দীর্ঘদিন ধরে পাওয়া যাচ্ছে না।

ভলিউম থেকে পাতা গায়েব হওয়ায় বিভিন্ন স্থানে জমির মালিকরা বিপাকে পড়ছেন। অনেক জায়গায় দ্বন্দ্ব তৈরি হচ্ছে ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে। যা কখনও কখনও সহিংস রূপও নিচ্ছে।

শামছুজ্জামান মিলন সম্প্রতি মোহরার পদে মণিরামপুর উপজেলা সাবরেজিস্ট্রি অফিসে বদলি হয়েছেন। তিনি সেখানে নিয়মিত অফিস না করে সপ্তাহের তিনদিন যশোরের রেকর্ড রুমে পড়ে থাকেন। মঙ্গল, বুধ ও বৃহস্পতিবার তাকে রেকর্ড রুমে দেখা যায় বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

ভলিউমের পাতা ছেঁড়া এই চক্রের বিরুদ্ধে আগে একবার তদন্ত হয়েছে। সেখানে তাদের এই অপকর্ম প্রমাণিত হয়। কিন্তু তাতে কী! অর্থের জোরে পার পেয়ে গেছে। এই চক্রের হোতাদের একটিই বক্তব্য, ‘টাকা থাকলে সবকিছুই ম্যানেজ করা সম্ভব।’ বাস্তবে হচ্ছেও তাই। তা না হলে যাদের অপকর্ম প্রমাণিত হয়েছে তারা স্পর্শকাতর রেকর্ডরুমে প্রবেশ করে কীভাবে? এই প্রশ্ন রেজিস্ট্রি অফিস সংশ্লিষ্টদের।

সূত্র বলছে, রেকর্ড রুম অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি জায়গা। এখানকার সবকিছুর দায়ভার রেকর্ডকিপারের। এ কারণে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও তার সম্মতি নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করতে হয়। অথচ এই রেকর্ডকিপার বর্তমানে সাইফুল-মিলন চক্রের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন। তাকে নানা ধরনের হুমকি-ধমকি দিয়ে রেকর্ডরুমে প্রবেশ করছে চক্রের সদস্যরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ভলিউমের পাতা চুরির অভিযোগে ২০১৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি নকলনবিশ সাইফুল ইসলামকে সাময়িকভাবে অব্যাহতি দেন তৎকালীন জেলা রেজিস্ট্রার। এর প্রায় এক বছর পর চুরি হওয়া পাতাটি ভলিউমের মধ্যে পাওয়া যায়। তখন নকলনবিশদের একটি গ্রুপ সাইফুলের অব্যাহতি আদেশ প্রত্যাহারের জন্য জেলা রেজিস্ট্রারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। ভুক্তভোগী ও অফিসে কর্মরতরা বলছেন, এখনই চক্রের লাগাম টানতে না পারলে সরকারি এই অফিস থেকে মানুষ মুখ ফিরিয়ে নেবে। আবার কোন এক সময় জমির মালিকদের ক্ষোভের আগুনে পুড়তে পারেন এই অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও। এসব কারণে সময় থাকতে সতর্ক হওয়া দরকার বলে মনে করছেন কর্মরতরা।

এসব বিষয়ে সাইফুল ইসলাম ও শামছুজ্জামান মিলন বলেন, ‘যা মন চায় লিখে দেন। আমরা মাসচুক্তিতে আইজিআর, ডিএসবি, দুদক, এনএস আই ও সাংবাদিকদের নিয়মিত টাকা দিয়ে থাকি। বহুতো লিখলেন কিছু হয়েছে কি, লিখলে আমাদের ঘুষের রেট বেড়ে যায়। লিখে আর রেট বাড়াবেন না।’

রেকর্ডকিপার বলেন, আমি অসহায়, শুধু দেখা ছাড়া কিছুই করার নেই। তারা শক্তিশালী, হাত অনেক লম্বা।

জেলা রেজিস্ট্রি অফিসের সার্বিক বিষয় নিয়ে আলাপের জন্য জেলা রেজিস্ট্রারকে বিভিন্ন সময় ১১ বার ফোন দিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। সবশেষ গতকাল তিনবার ফোন (০১৮১৯৬৬৬০৯৪) করা হয়। পরিচয় দিয়ে ক্ষুদেবার্তা পাঠানোর পরও জেলা রেজিস্ট্রার ফোন ধরেননি। যে কারণে তার বক্তর‌্য নেয়া সম্ভব হয়নি।

বৃহস্পতিবার, ২১ জানুয়ারী ২০২১ , ৭ মাঘ ১৪২৭, ৭ জমাদিউস সানি ১৪৪২

যশোর রেজিস্ট্রি অফিস

অরক্ষিত রেকর্ড রুম, গায়েব হচ্ছে ভলিউম বইয়ের পাতা

যশোর জেলা রেজিস্ট্রি অফিসের রেকর্ড রুম অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। নতুন করে সক্রিয় হয়ে ওঠেছে ভলিউম থেকে পাতা ছেড়া চক্রটি। মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ভলিউমের পাতা লাগাতারভাবে গায়েব করছে তারা। এ কারণে নানা ধরনের জটিলতায় পড়ছেন জমির মালিকরা। ভলিউমের পাতা গায়েবের মূলহোতা সাইফুল ইসলাম ও শামছুজ্জামান মিলন। এই হোতাদের বিরুদ্ধে তদন্তপূর্বক আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

দীর্ঘদিন ধরে যশোর জেলা রেজিস্ট্রি অফিসের রেকর্ড রুমে যাতায়াত সাইফুল-মিলন চক্রের। এই চক্র অর্থের বিনিময়ে একটি সরকারি অফিসের রেকর্ডপত্র বিক্রি করে দিচ্ছে। যা রীতিমতো শিউরে ওঠার মতো। এদের লাগাম টানার কেউ নেই! যারা এটি দেখবেন তারাই নাকি অর্থের কাছে ‘অন্ধ’ হয়ে গেছেন। কোনকিছুই দেখতে পাচ্ছেন না। বছরের পর বছর ধরে এই অপকর্ম চলে আসছে। আর তার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষের।

অনুসন্ধানে বের হয়েছে, নকলনবিশ সাইফুল ইসলাম ৫৮৬৮ নম্বর দলিলের পাতা ভলিউম থেকে ছিঁড়ে নিয়েছেন। ১৯৯৩ সালে কেশবপুর উপজেলা সাবরেজিস্ট্রি অফিসে এই দলিল সম্পাদন হয়। জমির মালিক নকল তুলতে গিয়ে জানতে পারেন ভলিউমে এ সংক্রান্ত রেকর্ডপত্র নেই।

যশোর সদর উপজেলা সাবরেজিস্ট্রি অফিসের দলিল নম্বর ১৬২৮৬। ভলিউম নম্বর ২০৩। পাতা নম্বর ১১৫, ১১৬ ও ১১৭। এই জমির মালিক মাগুরার শালিখা উপজেলার শতখালি গ্রামের নুরুল হুদা মিয়ার ছেলে দুলু মিয়া। ভলিউম থেকে ১১৫, ১১৬ ও ১১৭ নম্বর পাতা গায়েব হয়ে গেছে। কেবল গায়েবই হয়নি, এই জায়গায় সেঁটে দেয়া হয়েছে ঢাকার একব্যক্তির জমির কাগজপত্র।

দুলু মিয়া এক বছর ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন দলিলের নকল তোলার জন্য। কিন্তু পারছেন না। এমনকি ভলিউম দেখতে চাইলেও তা দেখানো হচ্ছে না। জেলা রেজিস্ট্রারের কাছে অভিযোগ করেও কোন প্রতিকার পাচ্ছেন না দুলু মিয়া।

১৯৮০ সালে রেজিস্ট্রি হয় ৫৮৫ নম্বর দলিল। যার ভলিউম নম্বর ৪। পাতা নম্বর ২২৭, ২২৮, ২২৯ ও ২৩০। এই ভলিউম থেকে উল্লিখিত চারটি পাতা ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। রেকর্ড রুম থেকে বলা হচ্ছে চার নম্বর ভলিউম বইটি দীর্ঘদিন ধরে পাওয়া যাচ্ছে না।

ভলিউম থেকে পাতা গায়েব হওয়ায় বিভিন্ন স্থানে জমির মালিকরা বিপাকে পড়ছেন। অনেক জায়গায় দ্বন্দ্ব তৈরি হচ্ছে ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে। যা কখনও কখনও সহিংস রূপও নিচ্ছে।

শামছুজ্জামান মিলন সম্প্রতি মোহরার পদে মণিরামপুর উপজেলা সাবরেজিস্ট্রি অফিসে বদলি হয়েছেন। তিনি সেখানে নিয়মিত অফিস না করে সপ্তাহের তিনদিন যশোরের রেকর্ড রুমে পড়ে থাকেন। মঙ্গল, বুধ ও বৃহস্পতিবার তাকে রেকর্ড রুমে দেখা যায় বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

ভলিউমের পাতা ছেঁড়া এই চক্রের বিরুদ্ধে আগে একবার তদন্ত হয়েছে। সেখানে তাদের এই অপকর্ম প্রমাণিত হয়। কিন্তু তাতে কী! অর্থের জোরে পার পেয়ে গেছে। এই চক্রের হোতাদের একটিই বক্তব্য, ‘টাকা থাকলে সবকিছুই ম্যানেজ করা সম্ভব।’ বাস্তবে হচ্ছেও তাই। তা না হলে যাদের অপকর্ম প্রমাণিত হয়েছে তারা স্পর্শকাতর রেকর্ডরুমে প্রবেশ করে কীভাবে? এই প্রশ্ন রেজিস্ট্রি অফিস সংশ্লিষ্টদের।

সূত্র বলছে, রেকর্ড রুম অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি জায়গা। এখানকার সবকিছুর দায়ভার রেকর্ডকিপারের। এ কারণে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও তার সম্মতি নিয়ে ভিতরে প্রবেশ করতে হয়। অথচ এই রেকর্ডকিপার বর্তমানে সাইফুল-মিলন চক্রের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন। তাকে নানা ধরনের হুমকি-ধমকি দিয়ে রেকর্ডরুমে প্রবেশ করছে চক্রের সদস্যরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ভলিউমের পাতা চুরির অভিযোগে ২০১৪ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি নকলনবিশ সাইফুল ইসলামকে সাময়িকভাবে অব্যাহতি দেন তৎকালীন জেলা রেজিস্ট্রার। এর প্রায় এক বছর পর চুরি হওয়া পাতাটি ভলিউমের মধ্যে পাওয়া যায়। তখন নকলনবিশদের একটি গ্রুপ সাইফুলের অব্যাহতি আদেশ প্রত্যাহারের জন্য জেলা রেজিস্ট্রারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। ভুক্তভোগী ও অফিসে কর্মরতরা বলছেন, এখনই চক্রের লাগাম টানতে না পারলে সরকারি এই অফিস থেকে মানুষ মুখ ফিরিয়ে নেবে। আবার কোন এক সময় জমির মালিকদের ক্ষোভের আগুনে পুড়তে পারেন এই অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও। এসব কারণে সময় থাকতে সতর্ক হওয়া দরকার বলে মনে করছেন কর্মরতরা।

এসব বিষয়ে সাইফুল ইসলাম ও শামছুজ্জামান মিলন বলেন, ‘যা মন চায় লিখে দেন। আমরা মাসচুক্তিতে আইজিআর, ডিএসবি, দুদক, এনএস আই ও সাংবাদিকদের নিয়মিত টাকা দিয়ে থাকি। বহুতো লিখলেন কিছু হয়েছে কি, লিখলে আমাদের ঘুষের রেট বেড়ে যায়। লিখে আর রেট বাড়াবেন না।’

রেকর্ডকিপার বলেন, আমি অসহায়, শুধু দেখা ছাড়া কিছুই করার নেই। তারা শক্তিশালী, হাত অনেক লম্বা।

জেলা রেজিস্ট্রি অফিসের সার্বিক বিষয় নিয়ে আলাপের জন্য জেলা রেজিস্ট্রারকে বিভিন্ন সময় ১১ বার ফোন দিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। সবশেষ গতকাল তিনবার ফোন (০১৮১৯৬৬৬০৯৪) করা হয়। পরিচয় দিয়ে ক্ষুদেবার্তা পাঠানোর পরও জেলা রেজিস্ট্রার ফোন ধরেননি। যে কারণে তার বক্তর‌্য নেয়া সম্ভব হয়নি।