যানজটমুক্ত রাজধানী চাইলে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে

ড. সামছুল হক প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক। ঢাকার যানজট নিরসন ও সমন্বিত যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ে তিনি গবেষণা করছেন দীর্ঘদিন ধরে। সংবাদকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি ঢাকার যানজট নিরসনে স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম গ্রহণের পাশাপাশি গণপরিবহনের সংশোধিত কৌশলগত পরিকল্পনা (আরএসটিপি) বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ইবরাহীম মাহমুদ আকাশ

সংবাদ : ঢাকার যানজট দূর করার উপায় কি?

সামছুল হক : ঢাকাকে যানজটমুক্ত করতে হলে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নিতে হবে। গণপরিবহনের উন্নয়ন, অবকাঠামোর উন্নয়ন ও প্রতিষ্ঠানিক উন্নয়নের মাধ্যমে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার আলোকে কাজ করা গেলে যানজট দূর করা সম্ভব হবে। এসব বিষয় গবেষণা করেই তৈরি হয়েছে গণপরিবহনের কৌশলগত পরিকল্পনা (এসটিপি)। এসটিপির আলোকে সমন্বিতভাবে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলেই শুধু যানজট মুক্ত হবে রাজধানী ঢাকা।

সংবাদ : এসটিপি থেকে আরএসটিপি করা হলো কিন্তু ঢাকা যানজট মুক্ত হলো না। এর কারণ কি?

সামছুল হক : রাজধানী ও আশেপাশের জেলাকে যানজটমুক্ত করতে ২০০৪ সালে প্রণয়ন করা হয় ২০ বছরমেয়াদি এসটিপি। তবে যথাযথ বাস্তবায়নের অভাবে ১০ বছরেই প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে এটি। সমন্বয়ের অভাবে ১০ বছর এর কাক্সিক্ষত বাস্তবায়ন হয়নি। উল্টো এর বাইরে বিভিন্ন প্রকল্প নেয়া হয়েছে। ফলে এটি কার্যকারিতা হারিয়েছে। সংশোধিত এসটিপির ক্ষেত্রে এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে। তা না হলে পরিকল্পনার কোন সুফল পাওয়া যাবে না। আর ঢাকা ক্রমশ বাসযোগ্যতা হারাবে। এসটিপি সংশোধন করে আরএসটিপি তৈরি করা হয় ২০১৬ সালে। সেখানে রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ঢাকা বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি করার কথা ছিল। সেটা এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। তারপর বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছে। বিআরটি বাস্তবায়ন করতে আমরা হোঁচট খাচ্ছি। দেশের প্রথম বিআরটি-৩ পুরোপুরি বাস্তবায়ন না হলে একটি বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে। কারণ ঢাকার দক্ষিণ দিকের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নে তেমন কোন প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়নি। তাই ঢাকা দক্ষিণের উন্নয়নের কথা চিন্তু করে বিআরটি-৩ নির্মাণের পরামর্শ দেয়া হয় আরএসটিপিতে। সেটা এখন বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। বিআরটি বাস্তবায়নের পর ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) নির্মাণের কথাছিল। বিআরটি ও এমআরটি দুটি আলাদা ব্যবস্থা। একটি দিয়ে অপরটি কার্যকারিতা নিশ্চিত করা যাবে না। সমন্বয়হীনতার কারণে এসটিপির মতো মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পরিকল্পনা প্রণয়নের পাশাপাশি তা বাস্তবায়নে জোড় দেয়া জরুরি। আরএসটিপি বাস্তবায়নে সরকারের অন্য সংস্থারে সঙ্গে সমন্বয়নের পাশাপাশি স্বাধীনভাবে ঢাকা যানবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষকে (ডিটিসিএ) কাজ করতে হবে।

সংবাদ : মহাপকিল্পনা বাস্তবায়নের সমস্যা কোথায়?

সামছুল হক : ঢাকায় এসটিপি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সমন্বয়হীনতার চেয়ে ওনারশিপের (কর্তৃপক্ষের) অভাব বেশি ছিল। কারণ এসটিপিতে এত পরামর্শ ছিল এগুলো কোন না কোন কর্তৃপক্ষকে গ্রহণ করে তা ধাপে ধাপে সমন্বিতভাবে বাস্তবায়নের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু ওনারশিপ না থাকার কারণে ২০০৫ সালের এসটিপি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। এ ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে প্রকল্প আগে হওয়ার দরকার ছিল সেটা না করে, সংস্থাগুলো নিজেদের পছন্দ মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। যেমন রাজধানীতে কিছু ফ্লাইওভার তৈরি করা হয়েছে। যেগুলো একদম দরকার ছিল না। ঢাকায় অপরিকল্পিতভাবে ফ্লাইওভার নির্মাণ করার কারণে মূল এসটিপি বাস্তবায়নে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। পরবর্তীতে এই ফ্লাইওভারের সঙ্গে সমন্বয় করেই আরএসটিপি প্রণয়ন করা হয়েছে। এক্ষেত্রে কম বিনিয়োগে বেশি সুফল পাওয়া প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন না করে। বেশি বিনিয়োগে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দিকে বেশি নজর দেয়া হয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় নামে মাত্র পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়। কাজের কাজ কিছুই নেই। যে কোন প্রকল্প পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবায়ন হচ্ছে কি নাÑএ বিষয়টি দেখার জন্য এখানে কোন বিশেষজ্ঞ পরিকল্পনাবিদ নেই। এরা শুধু বাজেটের বিষয়টি দেখে। কাজের কোন অগ্রগতি ও পর্যালোচনা করে না।

যানজট নিরসনের জন্য অনেক স্টাডি আছে। কিন্তু সেই পরিকল্পনার আলোকে ধাপে ধাপে প্রকল্প বাস্তবায়নের কোন অর্গানাইজেশন নেই যারা দায়ভার নিতে পারে। বরং যে আগে এসেছে তাকে প্রকল্পটি দেয়া হয়েছে। সে ক্ষেত্রে উপরের প্রজেক্ট আগে বাস্তবায়ন হয়ে গেছে। নিচের প্রজেক্ট বাস্তবায়ন হয়নি। এছাড়া নিচের প্রজেক্টের বাস্তবায়নের অবস্থা নেই। সে কারণে এসটিপি আবার রিভাইজ করে আরএসটিপি করা হয়েছে। বর্তমানেও একই অবস্থা। দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প আগে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, স্বল্প ও মধ্যমেয়াদির প্রকল্পের খবর নেই। শুধু ফিতা কাটার জন্য বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কিন্তু যানজট নিরসেনর জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হচ্ছে না। এক্ষেত্রে সর্বপ্রথম যে কাজটি দরকার ছিলÑগণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনা। এছাড়া রিকশা ও ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ, পার্কিংগুলো নিয়ন্ত্রণ করা। এক্ষেত্রে সরকারের কিছু ঘাটতি ও দায়বদ্ধতার অভাব আছে। তাই এত বিনিয়োগ করার পরও যানজট নিরসন করা যাচ্ছে না।

সংবাদ : কি আছে গণপরিবহনের মহাপরিকল্পনায়?

সামছুল হক : রাজধানী ও আশপাশের জেলার যানজটমুক্ত করতে ২০০৪ সালে প্রণয়ন করা হয় ২০ বছরমেয়াদি মহাপরিকল্পনা এসটিপি। ২০৩৫ সাল নাগাদ রাজধানীর যানবাহন চাহিদার প্রায় ৬৪ শতাংশ পূরণ করতে পাঁচটি মেট্রোরেল ও দুটি বিআরটি করার সুপারিশ করা হয়েছে। এটি মূলত রাজধানী ও আশাপাশের জনগণের দৈনন্দিন চাহিদা পূরণ করবে। তবে রাজধানীর বাকি ৩৬ শতাংশ যানবাহনের চাহিদা মেটানো ও অন্যান্য জেলার সঙ্গে দ্রুত সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে বেশকিছু সড়ক উন্নয়ন ও এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করতে হবে। এছাড়া ঢাকার চারপাশে তিনটি বৃত্তাকার সড়ক নির্মাণ করতে হবে। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ বৃত্তাকার সড়কের দৈর্ঘ্য হবে ৭৩ কিলোমিটার, মধ্যবর্তী ১০৮ কিলোমিটার ও রাজধানীর বাইরের বৃত্তাকার সড়কের দৈর্ঘ্য ১২৯ কিলোমিটার। এছাড়া ঢাকার সঙ্গে অন্যান্য জেলার সংযোগ উন্নয়নে ২৯০ কিলোমিটার প্রাইমারি সড়ক ও ৪৭১ কিলোমিটার সেকেন্ডারি সড়ক উন্নয়ন করতে হবে। এর বাইরে ছয়টি এক্সপ্রেসওয়ে পূর্ণ বা আংশিকভাবে থাকবে ঢাকায়। ২০ কিলোমিটার ঢাকা এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ বর্তমানে চলছে। আর ঢাকা-আশুলিয়া এক্সপ্রেসওয়ে, ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের একাংশ, ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ের একাংশ, ঢাকা-সিলেট এক্সপ্রেসওয়ের একাংশ ও ঢাকা-ময়মনসিংহ এক্সপ্রেসওয়ের একাংশ নির্মাণ করতে হবে। সব মিলিয়ে দৈর্ঘ্য হবে ১২৬ কিলোমিটার।

সংবাদ : ঢাকার যানজট নিরসনে সড়ক, রেল ও নৌ-পথের সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থার গুরুত্ব কতটুকু?

সামছুল হক : সড়ক, রেল ও নৌ-পথের সমন্বয়ে বহুমাত্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ছাড়া একটি শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থা বিলি বণ্টন করা যায় না। পুরো বিশে^ ভারসাম্যপূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরির জন্য বহুমাত্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থাকেই গুরুত্ব দেয়া হয়। নাগরিকদের ডোর টু ডোরে সুবিধা দেয়ার জন্যই এই বহুমাত্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যকর। যে কোন দেশে পরিবহন সেক্টরে সড়ক, রেল ও নৌ-পথের জন্য আলাদা প্রকল্প নেয়া হলেও তিন সংস্থার সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হয়। কিন্তু আমাদের দেশে সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব একটি অপসংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। রাজধানীর বৃত্তকার নৌ-পথের উপরে কম উচ্চতার সেতুগুলো ভেঙে পুনর্নির্মাণ করেও নৌ-পথটি চালু করা সম্ভব। কিন্তু সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের অভাবে এটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে পরিকল্পনা কমিশনের ব্যর্থতা রয়েছে বলে আমি মনে করি। কমিশন ডিপিপি পাশ করে তাদের কাজ শেষ করে। কিন্তু পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না-সে ব্যাপারে কোন খোঁজখবর রাখে না। তাই পরিকল্পনা কমিশনকেও আরও আধুনিক করতে হবে।

সংবাদ : আপনাকে ধন্যবাদ।

সামছুল হক : সংবাদকেও ধন্যবাদ।

বৃহস্পতিবার, ২১ জানুয়ারী ২০২১ , ৭ মাঘ ১৪২৭, ৭ জমাদিউস সানি ১৪৪২

সাক্ষাৎকার

যানজটমুক্ত রাজধানী চাইলে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে

অধ্যাপক ড. সামছুল হক

ড. সামছুল হক প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক। ঢাকার যানজট নিরসন ও সমন্বিত যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ে তিনি গবেষণা করছেন দীর্ঘদিন ধরে। সংবাদকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি ঢাকার যানজট নিরসনে স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম গ্রহণের পাশাপাশি গণপরিবহনের সংশোধিত কৌশলগত পরিকল্পনা (আরএসটিপি) বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ইবরাহীম মাহমুদ আকাশ

সংবাদ : ঢাকার যানজট দূর করার উপায় কি?

সামছুল হক : ঢাকাকে যানজটমুক্ত করতে হলে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নিতে হবে। গণপরিবহনের উন্নয়ন, অবকাঠামোর উন্নয়ন ও প্রতিষ্ঠানিক উন্নয়নের মাধ্যমে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার আলোকে কাজ করা গেলে যানজট দূর করা সম্ভব হবে। এসব বিষয় গবেষণা করেই তৈরি হয়েছে গণপরিবহনের কৌশলগত পরিকল্পনা (এসটিপি)। এসটিপির আলোকে সমন্বিতভাবে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলেই শুধু যানজট মুক্ত হবে রাজধানী ঢাকা।

সংবাদ : এসটিপি থেকে আরএসটিপি করা হলো কিন্তু ঢাকা যানজট মুক্ত হলো না। এর কারণ কি?

সামছুল হক : রাজধানী ও আশেপাশের জেলাকে যানজটমুক্ত করতে ২০০৪ সালে প্রণয়ন করা হয় ২০ বছরমেয়াদি এসটিপি। তবে যথাযথ বাস্তবায়নের অভাবে ১০ বছরেই প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে এটি। সমন্বয়ের অভাবে ১০ বছর এর কাক্সিক্ষত বাস্তবায়ন হয়নি। উল্টো এর বাইরে বিভিন্ন প্রকল্প নেয়া হয়েছে। ফলে এটি কার্যকারিতা হারিয়েছে। সংশোধিত এসটিপির ক্ষেত্রে এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে। তা না হলে পরিকল্পনার কোন সুফল পাওয়া যাবে না। আর ঢাকা ক্রমশ বাসযোগ্যতা হারাবে। এসটিপি সংশোধন করে আরএসটিপি তৈরি করা হয় ২০১৬ সালে। সেখানে রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ঢাকা বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি করার কথা ছিল। সেটা এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। তারপর বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছে। বিআরটি বাস্তবায়ন করতে আমরা হোঁচট খাচ্ছি। দেশের প্রথম বিআরটি-৩ পুরোপুরি বাস্তবায়ন না হলে একটি বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে। কারণ ঢাকার দক্ষিণ দিকের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নে তেমন কোন প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়নি। তাই ঢাকা দক্ষিণের উন্নয়নের কথা চিন্তু করে বিআরটি-৩ নির্মাণের পরামর্শ দেয়া হয় আরএসটিপিতে। সেটা এখন বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। বিআরটি বাস্তবায়নের পর ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) নির্মাণের কথাছিল। বিআরটি ও এমআরটি দুটি আলাদা ব্যবস্থা। একটি দিয়ে অপরটি কার্যকারিতা নিশ্চিত করা যাবে না। সমন্বয়হীনতার কারণে এসটিপির মতো মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পরিকল্পনা প্রণয়নের পাশাপাশি তা বাস্তবায়নে জোড় দেয়া জরুরি। আরএসটিপি বাস্তবায়নে সরকারের অন্য সংস্থারে সঙ্গে সমন্বয়নের পাশাপাশি স্বাধীনভাবে ঢাকা যানবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষকে (ডিটিসিএ) কাজ করতে হবে।

সংবাদ : মহাপকিল্পনা বাস্তবায়নের সমস্যা কোথায়?

সামছুল হক : ঢাকায় এসটিপি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সমন্বয়হীনতার চেয়ে ওনারশিপের (কর্তৃপক্ষের) অভাব বেশি ছিল। কারণ এসটিপিতে এত পরামর্শ ছিল এগুলো কোন না কোন কর্তৃপক্ষকে গ্রহণ করে তা ধাপে ধাপে সমন্বিতভাবে বাস্তবায়নের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু ওনারশিপ না থাকার কারণে ২০০৫ সালের এসটিপি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। এ ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে প্রকল্প আগে হওয়ার দরকার ছিল সেটা না করে, সংস্থাগুলো নিজেদের পছন্দ মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। যেমন রাজধানীতে কিছু ফ্লাইওভার তৈরি করা হয়েছে। যেগুলো একদম দরকার ছিল না। ঢাকায় অপরিকল্পিতভাবে ফ্লাইওভার নির্মাণ করার কারণে মূল এসটিপি বাস্তবায়নে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। পরবর্তীতে এই ফ্লাইওভারের সঙ্গে সমন্বয় করেই আরএসটিপি প্রণয়ন করা হয়েছে। এক্ষেত্রে কম বিনিয়োগে বেশি সুফল পাওয়া প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন না করে। বেশি বিনিয়োগে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দিকে বেশি নজর দেয়া হয়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় নামে মাত্র পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়। কাজের কাজ কিছুই নেই। যে কোন প্রকল্প পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবায়ন হচ্ছে কি নাÑএ বিষয়টি দেখার জন্য এখানে কোন বিশেষজ্ঞ পরিকল্পনাবিদ নেই। এরা শুধু বাজেটের বিষয়টি দেখে। কাজের কোন অগ্রগতি ও পর্যালোচনা করে না।

যানজট নিরসনের জন্য অনেক স্টাডি আছে। কিন্তু সেই পরিকল্পনার আলোকে ধাপে ধাপে প্রকল্প বাস্তবায়নের কোন অর্গানাইজেশন নেই যারা দায়ভার নিতে পারে। বরং যে আগে এসেছে তাকে প্রকল্পটি দেয়া হয়েছে। সে ক্ষেত্রে উপরের প্রজেক্ট আগে বাস্তবায়ন হয়ে গেছে। নিচের প্রজেক্ট বাস্তবায়ন হয়নি। এছাড়া নিচের প্রজেক্টের বাস্তবায়নের অবস্থা নেই। সে কারণে এসটিপি আবার রিভাইজ করে আরএসটিপি করা হয়েছে। বর্তমানেও একই অবস্থা। দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প আগে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, স্বল্প ও মধ্যমেয়াদির প্রকল্পের খবর নেই। শুধু ফিতা কাটার জন্য বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কিন্তু যানজট নিরসেনর জন্য সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হচ্ছে না। এক্ষেত্রে সর্বপ্রথম যে কাজটি দরকার ছিলÑগণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনা। এছাড়া রিকশা ও ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ, পার্কিংগুলো নিয়ন্ত্রণ করা। এক্ষেত্রে সরকারের কিছু ঘাটতি ও দায়বদ্ধতার অভাব আছে। তাই এত বিনিয়োগ করার পরও যানজট নিরসন করা যাচ্ছে না।

সংবাদ : কি আছে গণপরিবহনের মহাপরিকল্পনায়?

সামছুল হক : রাজধানী ও আশপাশের জেলার যানজটমুক্ত করতে ২০০৪ সালে প্রণয়ন করা হয় ২০ বছরমেয়াদি মহাপরিকল্পনা এসটিপি। ২০৩৫ সাল নাগাদ রাজধানীর যানবাহন চাহিদার প্রায় ৬৪ শতাংশ পূরণ করতে পাঁচটি মেট্রোরেল ও দুটি বিআরটি করার সুপারিশ করা হয়েছে। এটি মূলত রাজধানী ও আশাপাশের জনগণের দৈনন্দিন চাহিদা পূরণ করবে। তবে রাজধানীর বাকি ৩৬ শতাংশ যানবাহনের চাহিদা মেটানো ও অন্যান্য জেলার সঙ্গে দ্রুত সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে বেশকিছু সড়ক উন্নয়ন ও এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করতে হবে। এছাড়া ঢাকার চারপাশে তিনটি বৃত্তাকার সড়ক নির্মাণ করতে হবে। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ বৃত্তাকার সড়কের দৈর্ঘ্য হবে ৭৩ কিলোমিটার, মধ্যবর্তী ১০৮ কিলোমিটার ও রাজধানীর বাইরের বৃত্তাকার সড়কের দৈর্ঘ্য ১২৯ কিলোমিটার। এছাড়া ঢাকার সঙ্গে অন্যান্য জেলার সংযোগ উন্নয়নে ২৯০ কিলোমিটার প্রাইমারি সড়ক ও ৪৭১ কিলোমিটার সেকেন্ডারি সড়ক উন্নয়ন করতে হবে। এর বাইরে ছয়টি এক্সপ্রেসওয়ে পূর্ণ বা আংশিকভাবে থাকবে ঢাকায়। ২০ কিলোমিটার ঢাকা এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ বর্তমানে চলছে। আর ঢাকা-আশুলিয়া এক্সপ্রেসওয়ে, ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের একাংশ, ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ের একাংশ, ঢাকা-সিলেট এক্সপ্রেসওয়ের একাংশ ও ঢাকা-ময়মনসিংহ এক্সপ্রেসওয়ের একাংশ নির্মাণ করতে হবে। সব মিলিয়ে দৈর্ঘ্য হবে ১২৬ কিলোমিটার।

সংবাদ : ঢাকার যানজট নিরসনে সড়ক, রেল ও নৌ-পথের সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থার গুরুত্ব কতটুকু?

সামছুল হক : সড়ক, রেল ও নৌ-পথের সমন্বয়ে বহুমাত্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ছাড়া একটি শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থা বিলি বণ্টন করা যায় না। পুরো বিশে^ ভারসাম্যপূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরির জন্য বহুমাত্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থাকেই গুরুত্ব দেয়া হয়। নাগরিকদের ডোর টু ডোরে সুবিধা দেয়ার জন্যই এই বহুমাত্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যকর। যে কোন দেশে পরিবহন সেক্টরে সড়ক, রেল ও নৌ-পথের জন্য আলাদা প্রকল্প নেয়া হলেও তিন সংস্থার সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হয়। কিন্তু আমাদের দেশে সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব একটি অপসংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। রাজধানীর বৃত্তকার নৌ-পথের উপরে কম উচ্চতার সেতুগুলো ভেঙে পুনর্নির্মাণ করেও নৌ-পথটি চালু করা সম্ভব। কিন্তু সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের অভাবে এটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে পরিকল্পনা কমিশনের ব্যর্থতা রয়েছে বলে আমি মনে করি। কমিশন ডিপিপি পাশ করে তাদের কাজ শেষ করে। কিন্তু পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না-সে ব্যাপারে কোন খোঁজখবর রাখে না। তাই পরিকল্পনা কমিশনকেও আরও আধুনিক করতে হবে।

সংবাদ : আপনাকে ধন্যবাদ।

সামছুল হক : সংবাদকেও ধন্যবাদ।