জেলা শিল্পকলা একাডেমি গঠনতন্ত্রের অগণতান্ত্রিক সংশোধনী কেন?

বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারীর কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত। অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও গত ৯ মাস ধরে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে বিঘিœত হচ্ছে। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়েছে। এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যাদের জীবিকার সম্পর্ক তারা অর্থনৈতিকভাবে গভীর সংকটে নিপতিত হয়েছে। ভার্চুয়াল মাধ্যমে যে অনুষ্ঠানগুলো হচ্ছে তা শিল্পী ও শ্রোতার সংখ্যায় স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় খুবই নগণ্য তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু সংস্কৃতি জগতের নিয়ন্ত্রকরা এর মধ্যেও থেমে নেই। তারা নিজেদের অবস্থা ও অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে এই দুঃসময়েও কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। এ রকমই একটি কাজ হচ্ছে জেলা শিল্পকলা একাডেমি গঠনতন্ত্রের অগণতান্ত্রিক ও অসঙ্গত কতিপয় সংশোধনী। গত ৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পারিষদের ১১৯তম সভায় এসব সংশোধনী অনুমোদন করে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। গঠনতন্ত্রটি চূড়ান্ত করতে মন্ত্রণালয়-পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ শুরু করেছে।

১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আইন-অনুমোদনের মাধ্যমে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হয়। জাতীয় সংস্কৃতির উন্নতি ও বিকাশের লক্ষ্যে এই আইনের ৪(২) ধারা বলে দেশের প্রতিটি জেলা ও মহকুমা সদরে শিল্পকলা একাডেমির শাখা গঠিত হয়। ১৯৭৬ সালে ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পরিষদের সভায় শিল্পকলা পরিষদ গঠনতন্ত্র অনুমোদিত হয়। ১৯৮৯ সালে জাতীয় সংসদে কতিপয় সংশোধনীসহ বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আইন-১৯৮৯ প্রণীত হয়। ২০১৩ সালের ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পরিষদের ১০৩তম সভায় শিল্পকলা পরিষদ গঠনতন্ত্র সংশোধনপূর্বক জেলা শিল্পকলা একাডেমি গঠনতন্ত্র অনুমোদিত হয়। পরে একাডেমি পরিষদের ১০৬তম ও ১০৮তম সভায় উক্ত গঠনতন্ত্রের আংশিক সংশোধন করে বর্তমান ‘জেলা শিল্পকলা একাডেমি গঠনতন্ত্র অনুমোদন করা হয়’। এখন সেই গঠনতন্ত্রে গণতান্ত্রিক ধারাগুলোকে সঙ্কুচিত করে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বাড়ানোর প্রয়াস নেয়া হচ্ছে, যা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিচর্চার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

বর্তমান গঠনতন্ত্রের সঙ্গে সংশোধিত গঠনতন্ত্রের কিছু ধারার তুলনামূলক আলোচনা করলেই গণতন্ত্রকে সঙ্কুচিত করার পাশাপাশি কেন্দ্র নির্ভরতা বৃদ্ধি করে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা সৃষ্টির অপপ্রয়াস স্পষ্ট হবে। গঠনতন্ত্রটি যুগোপযোগী ও হালনাগাদ করার কথা বলে এ ধরনের সংশোধনীর উদ্দেশ্য নিয়ে সংস্কৃতিকর্মীদের মনে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।

গঠনতন্ত্রের ধারা-২! সদস্যভুক্তি (ক)-তে সদস্য হওয়ার বয়স নির্ধারিত না থাকলেও সংশোধন করে ২৫ বছর করা হয়েছে। ১৮ বছরে জাতীয় পর্যায়ে কেউ ভোটার হতে পারলেও শিল্পকলার সদস্য হতে ২৫ বছর লাগবে কেন তা বোধগম্য নয়। একই ধারা-(গ) তে সদস্যভুক্তি ফি ৫০০/- টাকা এবং বার্ষিক চাঁদা ২০০/-পরিবর্তন করে যথাক্রমে ১০০০/- টাকা ও ৫০০/- টাকা করা হয়েছে। ধারা-৫ পরিচালনা ক্ষেত্রে শেষে যোগ করা হয়েছে- ‘কেন্দ্রীয় অনুদান ও প্রশিক্ষণ তহবিল সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম জেলা কালচারাল অফিসার বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির প্রবিধানমালা অনুযায়ী পরিচালনা করবেন। ধারা-৬ : কার্যনির্বাহী কমিটির মোট সদস্য সংখ্যা ১৫ জনেই আছে। এরমধ্যে পদাধিকার বলে জেলা প্রশাসক সভাপতি এবং জেলা কালচারাল অফিসার কোষাধ্যক্ষ হবেন। দু’জন সহ-সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক এবং দুজন যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হবেন। কিন্তু বর্তমান গঠনতন্ত্রে নির্বাচিত পাঁচজন সদস্যের স্থলে দুজন কমিয়ে করা হয়েছে তিনজন, সভাপতি কর্তৃক মনোনীত তিনজন কমিয়ে করা হয়েছে একজন। কমিয়ে আনা এই চারজনের মনোনয়ন দেবে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পরিষদ। জেলা প্রশাসক স্থানীয়ভাবে বিবেচনা করে যে তিনজন মনোনয়ন দিতেন সেক্ষেত্রে মাত্র একজনের মনোনয়নের ক্ষমতা প্রদান কতটুকু বাস্তবসম্মত তা প্রশ্নসাপেক্ষ! আবার সব জেলার চারজন করে মনোনয়ন প্রদানে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পাশাপশি দেনদরবার বাড়বে তাতে কোন সন্দেহ নেই। এই মনোনয়নে জেলা কালচারাল অফিসার ও মহাপরিচালকের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হবে সেই শঙ্কাও রয়েছে। আর ১৫ সদস্যের কমিটিতে সাতজনই অনির্বাচিত হলে গণতন্ত্র সঙ্কুচিত ও ভারসাম্য নষ্ট হবে। এ্যাডহক কমিটি ধারা-(৬-চ) ৫ জন থেকে বাড়িয়ে সাতজন করা হয়েছে। কিন্তু সেখানেও চারজন মনোনয়ন দেবে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পরিষদ। কেন্দ্রীয় মনোনয়নগুলো নিয়ে দলবাজি ও তদবির বেড়ে যাবে। বর্তমান গঠনতন্ত্রের (৬-ঘ) ধারায় বলা হয়েছে ‘জেলা শিল্পকলা একাডেমির তহবিল ও সম্পদ কার্যনির্বাহী কমিটির ওপর ন্যস্ত থাকবে এবং জেলা কালচারাল অফিসার দাপ্তরিক সব কার্যক্রম পরিচালনা করবেন’। আর প্রস্তাবিত গঠনতন্ত্রে জেলা কালচারাল অফিসারকে সর্বেসর্বা করতে (৬-থ) ধারায় বলা হয়েছে 1.জেলা কালচারাল অফিসার একাডেমির সকল দাফতরিক কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। 11. কার্যনির্বাহী কমিটিতে কোষাধ্যক্ষ ও অ্যাডহক কমিটিতে সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করবেন। 111. সকল সভার কার্র্যবিবরণী লিপিবদ্ধ করিবেন এবং যাবতীয় যোগাযোগের দায়িত্ব পালন করবেন। আবার ধারা-৭(ঙ) 111.এর সংশোধনীতে বলা হয়েছে তিনি কার্যনির্বাহী কমিটির পক্ষে যাবতীয় যোগাযোগের দায়িত্ব পালন করবেন। একই ধারায় বর্তমান গঠনতন্ত্রে রয়েছে জেলা কালচারাল অফিসার কোষাধ্যক্ষ হিসেবে সুষ্ঠুভাবে কার্য সম্পাদনের জন্য কার্যনির্বাহী কমিটির নিকট দায়ী থাকবেন। কিন্তু সংশোধনীতে ৭(ঙ) 1. তাকে কমিটির কাছ থেকে দায়মুক্ত করে বলা হয়েছে-‘সুষ্ঠুভাবে প্রশাসনিক ও আর্থিক বিষয়ে কর্তব্য সম্পাদনের জন্য তিনি মহাপরিচালক, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির নিকট দায়বদ্ধ থাকবেন’। অথচ তিনি কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য।

ধারা-৭(গ) এর সংশোধনীতে নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব হিসেবে বলা হয়েছে ‘কার্যনির্বাহী কমিটির সভা আহ্বানের নোটিস প্রদান, আলোচ্য বিষয় সূচি উপস্থাপন, কার্যবিবরণী অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন, বার্ষিক সাধারণ সভার কর্মপত্র তৈরি করে উপস্থাপন, সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা কমিটির সভায় পেশ করা’। একজন নির্বাচিত প্রতিনিধিকে এর মাধ্যমে কতটা অবহেলা এবং অবমূল্যায়ন করা হয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কালচারাল অফিসারকে নানাভাবে ক্ষমতায়িত করার পরও সংশোধনী শেষ হয়নি। ধারা ৮-(খ) তহবিল-সংক্রান্ত সংশোধনীতে কালচারাল অফিসারকে নীতিবহির্ভূত ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। বর্তমান গঠনতন্ত্রে ব্যাংক হিসাব পরিচালনায় কোষাধ্যক্ষ ও সাধারণ সম্পাদক এবং অ্যাডহক কমিটির সভাপতি ও সদস্য সচিবের যৌথ স্বাক্ষরের বিধান রয়েছে। আর সংশোধনী ৮-(খ)তে বলা হয়েছে ‘কেন্দ্রীয় অনুদান ও প্রশিক্ষণ তহবিল হিসাবটি কোষাধ্যক্ষ/সদস্য সচিবের একক স্বাক্ষরে এবং সাধারণ তহবিল হিসাবটি সভাপতি/আহ্বায়ক ও সাধারণ সম্পাদকের যে কোন একজন এবং কোষাধ্যক্ষ/সদস্য সচিব এর যৌথ স্বাক্ষরে পরিচালিত হইবে’। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে একক স্বাক্ষরে ব্যাংক হিসাব পারিচালনার বিধান কতটা যৌক্তিক ও নৈতিক তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। এর মাধ্যমে স্বচ্ছতার বদলে অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি হবে নিঃসন্দেহে।

জেলা শিল্পকলা একাডেমি গঠনতন্ত্র সংশোধনের সময় বেছে নেয়া হয়েছে করোনাকালকে। আগে কারও এটা মনে হয়নি। সংকটের সময় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পরিষদের ভার্চুয়াল সভায় হয়তো এটা করা হয়েছে। সংস্কৃতিকর্মীদের একটা বিশাল অংশকে অন্ধকারে রেখে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এই সংশোধনীর বিষয়ে শুধু জেলা প্রশাসকদের মতামত চেয়েছেন, দায়সারাভাবে। ১৫ দিনের মধ্যে তাদের মতামত না পাওয়া গেলে ইতিবাচক ধরে নেয়া হবে। যেন মৌনতা সম্মতির লক্ষণ। একটি গঠনতন্ত্র যুগোপযোগী ও হালনাগাদ করার প্রয়োজন হতেই পারে। কিন্তু সেই পরিবর্তনের নামে সেটার গণতান্ত্রিক চেতনা ও প্রক্রিয়া সঙ্কুুচিত করে শুধু কেন্দ্র এবং একজন কর্মকর্তানির্ভর করা জেলার সংস্কৃতি বিকাশ ও উন্নয়নে বিরূপ প্রভাব ফেলবে এটা নিশ্চিত। সরকারি অন্যান্য দপ্তরের সঙ্গে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনার যে স্পষ্ট ভিন্নতা রয়েছে সেটা সবার জানা। সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সংস্কৃতি ক্ষেত্রে যারা নেতৃত্বের ভূমিকায় ছিলেন তাদের অনেকেই বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পরিষদের সদস্য হিসেবে গঠনতন্ত্রের এই পরিবর্তন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছেন। তারা নিশ্চয়ই এই বিষয়গুলো আরেকবার ভেবে দেখবেন। আলোচ্য গঠনতন্ত্র সংশোধনের মাধ্যমে যে অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সূচনা হবে ভবিষ্যতে তা বিস্তারের মাধ্যমে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হলে ইতিহাস নিশ্চয়ই সংশোধনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদেরই দায়ী করবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাদের সম্পর্কে প্রশ্ন তুলতে দ্বিধা করবে না।

[লেখক : শিক্ষক ও সংস্কৃতিকর্মী, গাইবান্ধা]

শুক্রবার, ২২ জানুয়ারী ২০২১ , ৮ মাঘ ১৪২৭, ৮ জমাদিউস সানি ১৪৪২

জেলা শিল্পকলা একাডেমি গঠনতন্ত্রের অগণতান্ত্রিক সংশোধনী কেন?

জহুরুল কাইয়ুম

বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারীর কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত। অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও গত ৯ মাস ধরে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে বিঘিœত হচ্ছে। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়েছে। এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যাদের জীবিকার সম্পর্ক তারা অর্থনৈতিকভাবে গভীর সংকটে নিপতিত হয়েছে। ভার্চুয়াল মাধ্যমে যে অনুষ্ঠানগুলো হচ্ছে তা শিল্পী ও শ্রোতার সংখ্যায় স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় খুবই নগণ্য তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু সংস্কৃতি জগতের নিয়ন্ত্রকরা এর মধ্যেও থেমে নেই। তারা নিজেদের অবস্থা ও অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে এই দুঃসময়েও কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। এ রকমই একটি কাজ হচ্ছে জেলা শিল্পকলা একাডেমি গঠনতন্ত্রের অগণতান্ত্রিক ও অসঙ্গত কতিপয় সংশোধনী। গত ৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পারিষদের ১১৯তম সভায় এসব সংশোধনী অনুমোদন করে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। গঠনতন্ত্রটি চূড়ান্ত করতে মন্ত্রণালয়-পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ শুরু করেছে।

১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আইন-অনুমোদনের মাধ্যমে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হয়। জাতীয় সংস্কৃতির উন্নতি ও বিকাশের লক্ষ্যে এই আইনের ৪(২) ধারা বলে দেশের প্রতিটি জেলা ও মহকুমা সদরে শিল্পকলা একাডেমির শাখা গঠিত হয়। ১৯৭৬ সালে ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পরিষদের সভায় শিল্পকলা পরিষদ গঠনতন্ত্র অনুমোদিত হয়। ১৯৮৯ সালে জাতীয় সংসদে কতিপয় সংশোধনীসহ বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আইন-১৯৮৯ প্রণীত হয়। ২০১৩ সালের ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পরিষদের ১০৩তম সভায় শিল্পকলা পরিষদ গঠনতন্ত্র সংশোধনপূর্বক জেলা শিল্পকলা একাডেমি গঠনতন্ত্র অনুমোদিত হয়। পরে একাডেমি পরিষদের ১০৬তম ও ১০৮তম সভায় উক্ত গঠনতন্ত্রের আংশিক সংশোধন করে বর্তমান ‘জেলা শিল্পকলা একাডেমি গঠনতন্ত্র অনুমোদন করা হয়’। এখন সেই গঠনতন্ত্রে গণতান্ত্রিক ধারাগুলোকে সঙ্কুচিত করে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বাড়ানোর প্রয়াস নেয়া হচ্ছে, যা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিচর্চার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

বর্তমান গঠনতন্ত্রের সঙ্গে সংশোধিত গঠনতন্ত্রের কিছু ধারার তুলনামূলক আলোচনা করলেই গণতন্ত্রকে সঙ্কুচিত করার পাশাপাশি কেন্দ্র নির্ভরতা বৃদ্ধি করে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা সৃষ্টির অপপ্রয়াস স্পষ্ট হবে। গঠনতন্ত্রটি যুগোপযোগী ও হালনাগাদ করার কথা বলে এ ধরনের সংশোধনীর উদ্দেশ্য নিয়ে সংস্কৃতিকর্মীদের মনে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।

গঠনতন্ত্রের ধারা-২! সদস্যভুক্তি (ক)-তে সদস্য হওয়ার বয়স নির্ধারিত না থাকলেও সংশোধন করে ২৫ বছর করা হয়েছে। ১৮ বছরে জাতীয় পর্যায়ে কেউ ভোটার হতে পারলেও শিল্পকলার সদস্য হতে ২৫ বছর লাগবে কেন তা বোধগম্য নয়। একই ধারা-(গ) তে সদস্যভুক্তি ফি ৫০০/- টাকা এবং বার্ষিক চাঁদা ২০০/-পরিবর্তন করে যথাক্রমে ১০০০/- টাকা ও ৫০০/- টাকা করা হয়েছে। ধারা-৫ পরিচালনা ক্ষেত্রে শেষে যোগ করা হয়েছে- ‘কেন্দ্রীয় অনুদান ও প্রশিক্ষণ তহবিল সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম জেলা কালচারাল অফিসার বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির প্রবিধানমালা অনুযায়ী পরিচালনা করবেন। ধারা-৬ : কার্যনির্বাহী কমিটির মোট সদস্য সংখ্যা ১৫ জনেই আছে। এরমধ্যে পদাধিকার বলে জেলা প্রশাসক সভাপতি এবং জেলা কালচারাল অফিসার কোষাধ্যক্ষ হবেন। দু’জন সহ-সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক এবং দুজন যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হবেন। কিন্তু বর্তমান গঠনতন্ত্রে নির্বাচিত পাঁচজন সদস্যের স্থলে দুজন কমিয়ে করা হয়েছে তিনজন, সভাপতি কর্তৃক মনোনীত তিনজন কমিয়ে করা হয়েছে একজন। কমিয়ে আনা এই চারজনের মনোনয়ন দেবে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পরিষদ। জেলা প্রশাসক স্থানীয়ভাবে বিবেচনা করে যে তিনজন মনোনয়ন দিতেন সেক্ষেত্রে মাত্র একজনের মনোনয়নের ক্ষমতা প্রদান কতটুকু বাস্তবসম্মত তা প্রশ্নসাপেক্ষ! আবার সব জেলার চারজন করে মনোনয়ন প্রদানে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পাশাপশি দেনদরবার বাড়বে তাতে কোন সন্দেহ নেই। এই মনোনয়নে জেলা কালচারাল অফিসার ও মহাপরিচালকের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হবে সেই শঙ্কাও রয়েছে। আর ১৫ সদস্যের কমিটিতে সাতজনই অনির্বাচিত হলে গণতন্ত্র সঙ্কুচিত ও ভারসাম্য নষ্ট হবে। এ্যাডহক কমিটি ধারা-(৬-চ) ৫ জন থেকে বাড়িয়ে সাতজন করা হয়েছে। কিন্তু সেখানেও চারজন মনোনয়ন দেবে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পরিষদ। কেন্দ্রীয় মনোনয়নগুলো নিয়ে দলবাজি ও তদবির বেড়ে যাবে। বর্তমান গঠনতন্ত্রের (৬-ঘ) ধারায় বলা হয়েছে ‘জেলা শিল্পকলা একাডেমির তহবিল ও সম্পদ কার্যনির্বাহী কমিটির ওপর ন্যস্ত থাকবে এবং জেলা কালচারাল অফিসার দাপ্তরিক সব কার্যক্রম পরিচালনা করবেন’। আর প্রস্তাবিত গঠনতন্ত্রে জেলা কালচারাল অফিসারকে সর্বেসর্বা করতে (৬-থ) ধারায় বলা হয়েছে 1.জেলা কালচারাল অফিসার একাডেমির সকল দাফতরিক কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। 11. কার্যনির্বাহী কমিটিতে কোষাধ্যক্ষ ও অ্যাডহক কমিটিতে সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করবেন। 111. সকল সভার কার্র্যবিবরণী লিপিবদ্ধ করিবেন এবং যাবতীয় যোগাযোগের দায়িত্ব পালন করবেন। আবার ধারা-৭(ঙ) 111.এর সংশোধনীতে বলা হয়েছে তিনি কার্যনির্বাহী কমিটির পক্ষে যাবতীয় যোগাযোগের দায়িত্ব পালন করবেন। একই ধারায় বর্তমান গঠনতন্ত্রে রয়েছে জেলা কালচারাল অফিসার কোষাধ্যক্ষ হিসেবে সুষ্ঠুভাবে কার্য সম্পাদনের জন্য কার্যনির্বাহী কমিটির নিকট দায়ী থাকবেন। কিন্তু সংশোধনীতে ৭(ঙ) 1. তাকে কমিটির কাছ থেকে দায়মুক্ত করে বলা হয়েছে-‘সুষ্ঠুভাবে প্রশাসনিক ও আর্থিক বিষয়ে কর্তব্য সম্পাদনের জন্য তিনি মহাপরিচালক, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির নিকট দায়বদ্ধ থাকবেন’। অথচ তিনি কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য।

ধারা-৭(গ) এর সংশোধনীতে নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব হিসেবে বলা হয়েছে ‘কার্যনির্বাহী কমিটির সভা আহ্বানের নোটিস প্রদান, আলোচ্য বিষয় সূচি উপস্থাপন, কার্যবিবরণী অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন, বার্ষিক সাধারণ সভার কর্মপত্র তৈরি করে উপস্থাপন, সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা কমিটির সভায় পেশ করা’। একজন নির্বাচিত প্রতিনিধিকে এর মাধ্যমে কতটা অবহেলা এবং অবমূল্যায়ন করা হয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কালচারাল অফিসারকে নানাভাবে ক্ষমতায়িত করার পরও সংশোধনী শেষ হয়নি। ধারা ৮-(খ) তহবিল-সংক্রান্ত সংশোধনীতে কালচারাল অফিসারকে নীতিবহির্ভূত ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। বর্তমান গঠনতন্ত্রে ব্যাংক হিসাব পরিচালনায় কোষাধ্যক্ষ ও সাধারণ সম্পাদক এবং অ্যাডহক কমিটির সভাপতি ও সদস্য সচিবের যৌথ স্বাক্ষরের বিধান রয়েছে। আর সংশোধনী ৮-(খ)তে বলা হয়েছে ‘কেন্দ্রীয় অনুদান ও প্রশিক্ষণ তহবিল হিসাবটি কোষাধ্যক্ষ/সদস্য সচিবের একক স্বাক্ষরে এবং সাধারণ তহবিল হিসাবটি সভাপতি/আহ্বায়ক ও সাধারণ সম্পাদকের যে কোন একজন এবং কোষাধ্যক্ষ/সদস্য সচিব এর যৌথ স্বাক্ষরে পরিচালিত হইবে’। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে একক স্বাক্ষরে ব্যাংক হিসাব পারিচালনার বিধান কতটা যৌক্তিক ও নৈতিক তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। এর মাধ্যমে স্বচ্ছতার বদলে অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি হবে নিঃসন্দেহে।

জেলা শিল্পকলা একাডেমি গঠনতন্ত্র সংশোধনের সময় বেছে নেয়া হয়েছে করোনাকালকে। আগে কারও এটা মনে হয়নি। সংকটের সময় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পরিষদের ভার্চুয়াল সভায় হয়তো এটা করা হয়েছে। সংস্কৃতিকর্মীদের একটা বিশাল অংশকে অন্ধকারে রেখে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এই সংশোধনীর বিষয়ে শুধু জেলা প্রশাসকদের মতামত চেয়েছেন, দায়সারাভাবে। ১৫ দিনের মধ্যে তাদের মতামত না পাওয়া গেলে ইতিবাচক ধরে নেয়া হবে। যেন মৌনতা সম্মতির লক্ষণ। একটি গঠনতন্ত্র যুগোপযোগী ও হালনাগাদ করার প্রয়োজন হতেই পারে। কিন্তু সেই পরিবর্তনের নামে সেটার গণতান্ত্রিক চেতনা ও প্রক্রিয়া সঙ্কুুচিত করে শুধু কেন্দ্র এবং একজন কর্মকর্তানির্ভর করা জেলার সংস্কৃতি বিকাশ ও উন্নয়নে বিরূপ প্রভাব ফেলবে এটা নিশ্চিত। সরকারি অন্যান্য দপ্তরের সঙ্গে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনার যে স্পষ্ট ভিন্নতা রয়েছে সেটা সবার জানা। সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সংস্কৃতি ক্ষেত্রে যারা নেতৃত্বের ভূমিকায় ছিলেন তাদের অনেকেই বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি পরিষদের সদস্য হিসেবে গঠনতন্ত্রের এই পরিবর্তন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত রয়েছেন। তারা নিশ্চয়ই এই বিষয়গুলো আরেকবার ভেবে দেখবেন। আলোচ্য গঠনতন্ত্র সংশোধনের মাধ্যমে যে অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সূচনা হবে ভবিষ্যতে তা বিস্তারের মাধ্যমে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হলে ইতিহাস নিশ্চয়ই সংশোধনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদেরই দায়ী করবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাদের সম্পর্কে প্রশ্ন তুলতে দ্বিধা করবে না।

[লেখক : শিক্ষক ও সংস্কৃতিকর্মী, গাইবান্ধা]