তেভাগা আন্দোলনের পুরোধা

উপমহাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ কমরেড অমল সেনের ১৮তম মৃত্যুবার্ষিকী ছিল গত রোববার। তেভাগা আন্দোলনের অন্যতম বিপ্লবী এ নেতা ২০০৩ সালের ১৭ জানুয়ারি তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন।

কমরেড অমল সেন যৌবনের প্রারম্ভেই ১১ খানের বাকড়ী গ্রামে সংগঠনের কাজ শুরু করেন। জীবনের বেশি সময়কাল তিনি বাকড়ীতেই ব্যয় করেছেন। এ কারণে এ গ্রামেই তিনি সমাধিস্থ হন। কমরেড অমল সেন রাজনীতির পাশাপাশি বাকড়ী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষাকতা করতেন। রাজনীতিতে তিনি যেমন জনপ্রিয় ছিলেন তেমনি শিক্ষক হিসেবে তার সুনামও ছিল ঈর্ষণীয়। কমরেড অমল সেনের ছাত্র ছিলেন ঘোড়ানাছ গ্রামের কিরণ চন্দ্র ভৌমিক। তিনি বাকড়ী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শেষ করে অবসর নিয়েছেন। তিনি বলেন, জমিদার বাড়ির সন্তান হয়েও আজীবন শাসক শ্রেণীর বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন কমরেড অমল সেন। কোন প্রলোভনেই আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। তিনি একাধারে ছিলেন কমিউনিস্ট আন্দোলনের সংগঠক, সাহিত্যিক, শিক্ষক, নাট্যাভিনেতা ও ফুটবল খেলোয়াড়।

গোবরা পার্বতী বিদ্যাপিঠের প্রাক্তন শিক্ষক ও বাকড়ী গ্রামের প্রয়াত সন্তোষ মজুমদারের পাণ্ডলিপি থেকে জানা যায়, ১৯১৪ সালের ১৯ জুলাই নড়াইল জেলার অন্তর্গত আফরা গ্রামে জমিদার সামন্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন কমরেড অমল কান্তি সেন। পিতা জিতেন্দ্রলাল সেনের ৭ ছেলেমেয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। শিক্ষা জীবন শুরু করেন গ্রামের পাঠশালায়। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্তের পর ১৯২৫ সালে পার্শ্ববর্তী বসুন্দিয়া জুনিয়র হাইস্কুলে প্রথম ব্যচে ভর্তি হন। পরিবারের স্বপ্ন ছিল বাসু (অমল সেনের ডাক নাম) জার্মানি ফেরত ইঞ্জিনিয়ার হবে। তাই তাকে খুলনা জেলা স্কুলে ৯ম শ্রেণীতে ভর্তি করান। সেখান থেকে মেট্রিকুলেশন পাস করে নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজে আইএ ক্লাসে ভর্তি হন। আইএ পাস করার পর দৌলতপুর বিএল (ব্রজলাল) কলেজে গণিতে বিএসসিতে (সম্মান) ভর্তি হন। সেখানে অধ্যয়নরত অবস্থায় দুই বছর পর তিনি যোগ দেন অনুশীলন নামের একটি সংগঠনে। সংগঠনে নিজেকে ব্যস্ত রাখায় একাডেমিক লেখাপড়ার পাঠ শেষ করেন।

কমরেড অমল সেন ৯ম শ্রেণীতে অধ্যয়নকালেই মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, জমিদার-গাতীদার, ব্রাহ্মণ-কায়স্থরা গরিব হিন্দু, মুসলমান ও নিচু জাতের লোকদের ঘৃনার চোখে দেখে। উঁচু শ্রেণীর লোকেরা কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যয্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করছে। হাটবাজারে তোলা আদায়ের নামে কৃষকদের ঠকানো হচ্ছে। তাদের শ্রমের ন্যয্য পাওনাটুকুও দেয়া হচ্ছে না। শাসক শ্রেণীর লোকেরা গরিবদের শোষণ করে সম্পদের পাহাড় বানাচ্ছে। এই সব বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা দেখে তিনি ব্যথিত ও উৎকণ্ঠিত হতেন। এ সব কারণে বিলাসিতাপূর্ণ জীবন পরিহার করে পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করে অধঃপতিত, নিগৃহীত, শোষিত হতভাগ্য কৃষকদের পাশে দাড়ান। তাদের দুঃখ কষ্টের শরিক হওয়ার সংকল্প গ্রহণ করেন। কমরেড অমল সেনের উদার মানবিক মূল্যবোধের কারণে স্থানীয় জমিদার, গাতীদার ও নিজের পরিবারসহ শাসকশ্রেণীর রোষানলের স্বীকার হন। এবং নানাভাবে হয়রানির স্বীকার হতে থাকেন।

কমরেড অমল সেন এর এক সময়ের সহযোদ্ধা বাকড়ী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক প্রয়াত গোকুল চন্দ্র বিশ্বাসের সংগৃহীত তথ্য ও পাণ্ডুলিপি থেকে জানা যায়, কমরেড অমল সেন ১৯৩৭ সালে (যখন তার বয়স ২০/২১) যশোর জেলার বাঘারপাড়া উপজেলার ১১ খানের বাকড়ী গ্রামে প্রথম আসেন। তিনি ওঠেন বাকড়ী গ্রামের পূর্বপাড়ার কৃষক নেতা রশিক লাল ঘোষের বাড়িতে। এখানে ওঠার কারণ ছিল রসিকলাল ঘোষের বড় ভাই নীলমনি ঘোষ অশিক্ষিত কৃষক। কিন্তু এলাকার একজন বিশিষ্ট সমাজপতি। ধীরে ধীরে অমল সেন ওই পরিবারের সদস্য হয়ে গেলেন। প্রতিদিন এ বাড়ি সে বাড়ি করতে করতে এক সময় বাকড়ী গ্রামের পরিচিত মুখ হয়ে উঠলেন অমল সেন। এক নাগাড়ে ২/৩ দিন থেকে আবার আফরা গ্রামে যেতেন। এক দিন বা এক বেলা থেকে আবার বাকড়ীতে ফিরে আসতেন। ১১ খানে তখন তার বেশি চলাচল ছিল বাকড়ী, হাতিয়াড়া ও গুয়াখোলা গ্রামে। ১১ খানের শতভাগ মানুষই নমঃশূদ্র। ওই সময় ১১ খানের আবাসিক অবকাঠামো, যোগাযোগ ব্যবস্থা, পয়ঃনিষ্কাষণ ব্যবস্থা একেবারেই নাজুক অবস্থা ছিলো।

তার প্রথম লক্ষ্য ছিল নিজে নমঃশূদ্র বনে যাওয়া। তার অগাধ জ্ঞান ও ব্যবহার গুণে তিনি বাকড়ীসহ অন্য গ্রামের জনগণকে তথা কৃষকদের আপন করে তুলেছিলেন। প্রতি রাতেই তিনি কোন না কোন গ্রামে যেতেন এবং কৃষকদের নিয়ে আসর জমাতেন। উদ্দেশ্য কৃষকদের উদ্বুদ্ধ ও একত্রিত করা। তিনি কৃষকদের বোঝাতেন, কীভাবে তারা শোষিত ও নিষ্পেষিত হচ্ছে। ব্রাহ্মণ-কায়স্থ, জমিদার-গাতীদার কীভাবে তাদের ঠকাচ্ছে, কি রকম ঘৃনার চোখে তাদের দেখছে ইত্যাদি বিষয় অমল সেন কৃষকদের বুঝিয়ে বিদ্রোহী মনোভাব তৈরি করতেন। কৃষকদের বোঝাতেন কি উপায়ে শোষণ-নিপীড়নের হাত থেকে রেহাই পাওয়া যায়।

এমনি করে ধৈর্যের সঙ্গে তিনি কৃষকদের মধ্যে বেশ সাড়া জাগান। তৈরি করেন একটি মজবুত সংগঠন। সৃষ্টি হয় কৃষকদের চেতনা। এসব ব্যাপারে তার সাথী হিসেবে ছিলেন হাতিয়াড়া গ্রামের রাজেন্দ্রনাথ শিকদার ও মনোহর বৈরাগী। বাকড়ী গ্রামের রসিক ঘোষ, প্রসন্ন রায় এবং গুয়াখোলা গ্রামের চিন্তারাম বিশ্বাস। অত্র এলাকায় এসে খাওয়া-দাওয়া, বাহ্যিক কাজ-কর্ম করা ও ঘুমানোর বেশ সমস্যা হতো। সে সময় কারও বাড়িতে খাটও ছিল না। সেখানকার রান্না করা করা খাবারও অমল সেনের জন্য উপযুক্ত ছিল না। তথাপি শুধু সংগঠনের স্বার্থে বর্ষা মৌসুমের প্রচণ্ড কাদা উপেক্ষা করে অবহেলিত সমাজের সঙ্গে মিশে তাদের হৃদয় জয় করেছিলেন। ১৯৪১/৪২ সালের দিকে “তোলাবন্দ” আন্দোলন জোরদার করেন, যা ১১ খান থেকেই শুরু হয়। কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ধান, কলাই, সরিষা, মাছ, তরকারি ইত্যাদি বিক্রি করতে হাটে গেলে ইজারাদারেরা ইচ্ছামতো তোলা নিত। বাধা দিলে ইজারাদারদের লাঠিয়াল বাহিনী কৃষকদের মারধোর করতো।

এই “তোলাবন্দ” আন্দোলোন করতে গিয়ে ডুমুরতলার মোদাচ্ছের মুনসি, নূরজালাল, বামাচরন, হেমন্ত সরকার প্রমুখ নেতাদের সহযোগিতায় গ্রামে গ্রামে কৃষক সমিতি গড়ে তোলেন। এই সমিতির সদস্যরা লাল পতাকা হাতে নিয়ে সাপ্তহিক হাটের দিন ইজাদারদের লাঠিয়াল বাহিনীর মোকাবিলা করতেন। যার ফলে সরসপুরহাট, রতডাঙ্গা, মাইজপাড়া, ধলগ্রাম, বসুন্দিয়া, তুলারামপুর, গোবরা, আগদিয়া, মিরেপাড়াসহ আশেপাশের হাটের তোলা আদায় বন্ধ হয়।

বাকড়ী গ্রামের সন্তোস মজুমদারের পাণ্ডুলিপি থেকে আরও জানা যায়, তেভাগা আন্দোলনেও কমরেড অমল সেন ছিলেন অগ্রগণ্য। যার গোড়াপত্তন হয় ১১ খানেই। তখনকার দিনে জমিদার-গাতীদার ও ভূস্বামীরা ভূমিহীনদের কাছে জমি বর্গা দিত অর্ধেক ফসলের দবি নিয়ে। কৃষক চাষের সব ব্যয় করে অর্ধেক ফসল জমির মালিকের বাড়িতে পৌঁছে দিতে হতো। এতে কৃষকরা লোকসানে পড়তো। এভাবে যুগ যুগ চলে আসায় কৃষকের অর্থনৈতিক অবস্থা একেবারেই ভেঙে পড়ে। এর থেকে পরিত্রাণের জন্য কৃষক সমিতি সংগ্রাম শুরু করলেন। তারা সিদ্ধান্ত নিলেন উৎপাদিত ফসলের দুই ভাগ পাবে কৃষক আর এক ভাগ পাবে জমির মালিক। সিদ্ধান্তকে কার্যকরী করতে অমল সেন কৃষক সমিতির মাধ্যমে সংগ্রাম শুরু করেন। তারা নড়াইল ও যশোরের বিভিন্ন এলাকায় মজবুত কৃষক সমিতি গড়ে তোলেন। আস্তে আস্তে এই তেভাগা আন্দোলন তীব্র হতে লাগলো, যা ১৯৪৫/৪৬ সাল নাগাদ সফল হয়।

অভিনয় শিল্পী হিসাবেও অমল সেনের বেশ সুনাম ছিল। ১৯৪৫ সালে দুর্গাপূজায় সিদ্ধান্ত হয় বাকড়ী স্কুল প্রাঙ্গণে শরৎ চন্দ্রের রম্য নটক মঞ্চস্থ হয়। এ নাটকের পরিচালনায় ছিলেন শিক্ষক সুধীর মজুমদার, বনচারি মজুমদার ও প্রফুল্ল রায়। নির্ধারিত দিনে কাস্টিং শিল্পী নিরেন দাশ না থাকায় অমল সেনের ডাক পড়ে। শুধু প্রোমটারের প্রোমোট কুনে অভিনয় করে ব্যাপক দর্শক প্রশংসা অর্জন করেন।

শিক্ষক হিসেবেও অমল সেনের যথেষ্ট খ্যাতি ছিল। ১৯৫৬ সালে জেল থেকে ফিরে বাকড়ীর স্কুলে শিক্ষকতায় যোগ দেন। ১৯৫৮ সালে জেলে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তিনি সেখানে শিক্ষকতা করেন। অমল সেনের সে সময়কার অত্যন্ত প্রিয় ছাত্র ঘোড়ানাছ গ্রামের অবসর প্রাপ্ত শিক্ষক কিরণ চন্দ্র ভৌমিক বলেন, আমরা তখন ৮ম শ্রণীর ছাত্র। অমল স্যার ইংরেজি খুব সুন্দর পড়াতেন। তার সম্মোহনী ক্ষমতা ছিল। ছাত্ররা নিঃশব্দে মনোযোগ দিয়ে স্যারের কথা শুনতো। সে সময় বাকড়ীর স্কুলের অবস্থা তেমন ভালো ছিল না। অমল স্যার আসার পর স্কুলের গতিই পাল্টে যায়। তিনি ৭ম ও ৮ম শ্রেণীর গণিত ক্লাসও নিতেন। খুব সুন্দর ও সাবলীলভাবে গণিতের জটিল বিষয়গুলো বোঝাতেন। খেলোয়াড় হিসেবেও তার ভালো সুনাম ছিল। তিনি আরও বলেন, বাকড়ীতে থাকার সময় প্রতিদিনই তিনি গোচর মাঠে তরুণ ছেলেদের নিয়ে খেলতেন। আশেপাশের গ্রাম থেকে আসা খেলোয়ড়দের সঙ্গে ছোটখাটো প্রতিযেগিতায় তিনি অংশ নিতেন। তিনি ১১ খান ফুটবল টিমের নিয়োমিত খেলোয়াড় ছিলেন। খেলোয়াড় হিসেবে তিনি যেমন কৌশলী ছিলেন তেমনি ছিলেন সুদর্শনও।

শনিবার, ২৩ জানুয়ারী ২০২১ , ৯ মাঘ ১৪২৭, ৯ জমাদিউস সানি ১৪৪২

কমরেড অমল সেন

তেভাগা আন্দোলনের পুরোধা

লক্ষ্মণ চন্দ্র মণ্ডল

উপমহাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ কমরেড অমল সেনের ১৮তম মৃত্যুবার্ষিকী ছিল গত রোববার। তেভাগা আন্দোলনের অন্যতম বিপ্লবী এ নেতা ২০০৩ সালের ১৭ জানুয়ারি তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন।

কমরেড অমল সেন যৌবনের প্রারম্ভেই ১১ খানের বাকড়ী গ্রামে সংগঠনের কাজ শুরু করেন। জীবনের বেশি সময়কাল তিনি বাকড়ীতেই ব্যয় করেছেন। এ কারণে এ গ্রামেই তিনি সমাধিস্থ হন। কমরেড অমল সেন রাজনীতির পাশাপাশি বাকড়ী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষাকতা করতেন। রাজনীতিতে তিনি যেমন জনপ্রিয় ছিলেন তেমনি শিক্ষক হিসেবে তার সুনামও ছিল ঈর্ষণীয়। কমরেড অমল সেনের ছাত্র ছিলেন ঘোড়ানাছ গ্রামের কিরণ চন্দ্র ভৌমিক। তিনি বাকড়ী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শেষ করে অবসর নিয়েছেন। তিনি বলেন, জমিদার বাড়ির সন্তান হয়েও আজীবন শাসক শ্রেণীর বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন কমরেড অমল সেন। কোন প্রলোভনেই আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। তিনি একাধারে ছিলেন কমিউনিস্ট আন্দোলনের সংগঠক, সাহিত্যিক, শিক্ষক, নাট্যাভিনেতা ও ফুটবল খেলোয়াড়।

গোবরা পার্বতী বিদ্যাপিঠের প্রাক্তন শিক্ষক ও বাকড়ী গ্রামের প্রয়াত সন্তোষ মজুমদারের পাণ্ডলিপি থেকে জানা যায়, ১৯১৪ সালের ১৯ জুলাই নড়াইল জেলার অন্তর্গত আফরা গ্রামে জমিদার সামন্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন কমরেড অমল কান্তি সেন। পিতা জিতেন্দ্রলাল সেনের ৭ ছেলেমেয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। শিক্ষা জীবন শুরু করেন গ্রামের পাঠশালায়। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্তের পর ১৯২৫ সালে পার্শ্ববর্তী বসুন্দিয়া জুনিয়র হাইস্কুলে প্রথম ব্যচে ভর্তি হন। পরিবারের স্বপ্ন ছিল বাসু (অমল সেনের ডাক নাম) জার্মানি ফেরত ইঞ্জিনিয়ার হবে। তাই তাকে খুলনা জেলা স্কুলে ৯ম শ্রেণীতে ভর্তি করান। সেখান থেকে মেট্রিকুলেশন পাস করে নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজে আইএ ক্লাসে ভর্তি হন। আইএ পাস করার পর দৌলতপুর বিএল (ব্রজলাল) কলেজে গণিতে বিএসসিতে (সম্মান) ভর্তি হন। সেখানে অধ্যয়নরত অবস্থায় দুই বছর পর তিনি যোগ দেন অনুশীলন নামের একটি সংগঠনে। সংগঠনে নিজেকে ব্যস্ত রাখায় একাডেমিক লেখাপড়ার পাঠ শেষ করেন।

কমরেড অমল সেন ৯ম শ্রেণীতে অধ্যয়নকালেই মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, জমিদার-গাতীদার, ব্রাহ্মণ-কায়স্থরা গরিব হিন্দু, মুসলমান ও নিচু জাতের লোকদের ঘৃনার চোখে দেখে। উঁচু শ্রেণীর লোকেরা কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যয্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করছে। হাটবাজারে তোলা আদায়ের নামে কৃষকদের ঠকানো হচ্ছে। তাদের শ্রমের ন্যয্য পাওনাটুকুও দেয়া হচ্ছে না। শাসক শ্রেণীর লোকেরা গরিবদের শোষণ করে সম্পদের পাহাড় বানাচ্ছে। এই সব বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা দেখে তিনি ব্যথিত ও উৎকণ্ঠিত হতেন। এ সব কারণে বিলাসিতাপূর্ণ জীবন পরিহার করে পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করে অধঃপতিত, নিগৃহীত, শোষিত হতভাগ্য কৃষকদের পাশে দাড়ান। তাদের দুঃখ কষ্টের শরিক হওয়ার সংকল্প গ্রহণ করেন। কমরেড অমল সেনের উদার মানবিক মূল্যবোধের কারণে স্থানীয় জমিদার, গাতীদার ও নিজের পরিবারসহ শাসকশ্রেণীর রোষানলের স্বীকার হন। এবং নানাভাবে হয়রানির স্বীকার হতে থাকেন।

কমরেড অমল সেন এর এক সময়ের সহযোদ্ধা বাকড়ী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক প্রয়াত গোকুল চন্দ্র বিশ্বাসের সংগৃহীত তথ্য ও পাণ্ডুলিপি থেকে জানা যায়, কমরেড অমল সেন ১৯৩৭ সালে (যখন তার বয়স ২০/২১) যশোর জেলার বাঘারপাড়া উপজেলার ১১ খানের বাকড়ী গ্রামে প্রথম আসেন। তিনি ওঠেন বাকড়ী গ্রামের পূর্বপাড়ার কৃষক নেতা রশিক লাল ঘোষের বাড়িতে। এখানে ওঠার কারণ ছিল রসিকলাল ঘোষের বড় ভাই নীলমনি ঘোষ অশিক্ষিত কৃষক। কিন্তু এলাকার একজন বিশিষ্ট সমাজপতি। ধীরে ধীরে অমল সেন ওই পরিবারের সদস্য হয়ে গেলেন। প্রতিদিন এ বাড়ি সে বাড়ি করতে করতে এক সময় বাকড়ী গ্রামের পরিচিত মুখ হয়ে উঠলেন অমল সেন। এক নাগাড়ে ২/৩ দিন থেকে আবার আফরা গ্রামে যেতেন। এক দিন বা এক বেলা থেকে আবার বাকড়ীতে ফিরে আসতেন। ১১ খানে তখন তার বেশি চলাচল ছিল বাকড়ী, হাতিয়াড়া ও গুয়াখোলা গ্রামে। ১১ খানের শতভাগ মানুষই নমঃশূদ্র। ওই সময় ১১ খানের আবাসিক অবকাঠামো, যোগাযোগ ব্যবস্থা, পয়ঃনিষ্কাষণ ব্যবস্থা একেবারেই নাজুক অবস্থা ছিলো।

তার প্রথম লক্ষ্য ছিল নিজে নমঃশূদ্র বনে যাওয়া। তার অগাধ জ্ঞান ও ব্যবহার গুণে তিনি বাকড়ীসহ অন্য গ্রামের জনগণকে তথা কৃষকদের আপন করে তুলেছিলেন। প্রতি রাতেই তিনি কোন না কোন গ্রামে যেতেন এবং কৃষকদের নিয়ে আসর জমাতেন। উদ্দেশ্য কৃষকদের উদ্বুদ্ধ ও একত্রিত করা। তিনি কৃষকদের বোঝাতেন, কীভাবে তারা শোষিত ও নিষ্পেষিত হচ্ছে। ব্রাহ্মণ-কায়স্থ, জমিদার-গাতীদার কীভাবে তাদের ঠকাচ্ছে, কি রকম ঘৃনার চোখে তাদের দেখছে ইত্যাদি বিষয় অমল সেন কৃষকদের বুঝিয়ে বিদ্রোহী মনোভাব তৈরি করতেন। কৃষকদের বোঝাতেন কি উপায়ে শোষণ-নিপীড়নের হাত থেকে রেহাই পাওয়া যায়।

এমনি করে ধৈর্যের সঙ্গে তিনি কৃষকদের মধ্যে বেশ সাড়া জাগান। তৈরি করেন একটি মজবুত সংগঠন। সৃষ্টি হয় কৃষকদের চেতনা। এসব ব্যাপারে তার সাথী হিসেবে ছিলেন হাতিয়াড়া গ্রামের রাজেন্দ্রনাথ শিকদার ও মনোহর বৈরাগী। বাকড়ী গ্রামের রসিক ঘোষ, প্রসন্ন রায় এবং গুয়াখোলা গ্রামের চিন্তারাম বিশ্বাস। অত্র এলাকায় এসে খাওয়া-দাওয়া, বাহ্যিক কাজ-কর্ম করা ও ঘুমানোর বেশ সমস্যা হতো। সে সময় কারও বাড়িতে খাটও ছিল না। সেখানকার রান্না করা করা খাবারও অমল সেনের জন্য উপযুক্ত ছিল না। তথাপি শুধু সংগঠনের স্বার্থে বর্ষা মৌসুমের প্রচণ্ড কাদা উপেক্ষা করে অবহেলিত সমাজের সঙ্গে মিশে তাদের হৃদয় জয় করেছিলেন। ১৯৪১/৪২ সালের দিকে “তোলাবন্দ” আন্দোলন জোরদার করেন, যা ১১ খান থেকেই শুরু হয়। কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ধান, কলাই, সরিষা, মাছ, তরকারি ইত্যাদি বিক্রি করতে হাটে গেলে ইজারাদারেরা ইচ্ছামতো তোলা নিত। বাধা দিলে ইজারাদারদের লাঠিয়াল বাহিনী কৃষকদের মারধোর করতো।

এই “তোলাবন্দ” আন্দোলোন করতে গিয়ে ডুমুরতলার মোদাচ্ছের মুনসি, নূরজালাল, বামাচরন, হেমন্ত সরকার প্রমুখ নেতাদের সহযোগিতায় গ্রামে গ্রামে কৃষক সমিতি গড়ে তোলেন। এই সমিতির সদস্যরা লাল পতাকা হাতে নিয়ে সাপ্তহিক হাটের দিন ইজাদারদের লাঠিয়াল বাহিনীর মোকাবিলা করতেন। যার ফলে সরসপুরহাট, রতডাঙ্গা, মাইজপাড়া, ধলগ্রাম, বসুন্দিয়া, তুলারামপুর, গোবরা, আগদিয়া, মিরেপাড়াসহ আশেপাশের হাটের তোলা আদায় বন্ধ হয়।

বাকড়ী গ্রামের সন্তোস মজুমদারের পাণ্ডুলিপি থেকে আরও জানা যায়, তেভাগা আন্দোলনেও কমরেড অমল সেন ছিলেন অগ্রগণ্য। যার গোড়াপত্তন হয় ১১ খানেই। তখনকার দিনে জমিদার-গাতীদার ও ভূস্বামীরা ভূমিহীনদের কাছে জমি বর্গা দিত অর্ধেক ফসলের দবি নিয়ে। কৃষক চাষের সব ব্যয় করে অর্ধেক ফসল জমির মালিকের বাড়িতে পৌঁছে দিতে হতো। এতে কৃষকরা লোকসানে পড়তো। এভাবে যুগ যুগ চলে আসায় কৃষকের অর্থনৈতিক অবস্থা একেবারেই ভেঙে পড়ে। এর থেকে পরিত্রাণের জন্য কৃষক সমিতি সংগ্রাম শুরু করলেন। তারা সিদ্ধান্ত নিলেন উৎপাদিত ফসলের দুই ভাগ পাবে কৃষক আর এক ভাগ পাবে জমির মালিক। সিদ্ধান্তকে কার্যকরী করতে অমল সেন কৃষক সমিতির মাধ্যমে সংগ্রাম শুরু করেন। তারা নড়াইল ও যশোরের বিভিন্ন এলাকায় মজবুত কৃষক সমিতি গড়ে তোলেন। আস্তে আস্তে এই তেভাগা আন্দোলন তীব্র হতে লাগলো, যা ১৯৪৫/৪৬ সাল নাগাদ সফল হয়।

অভিনয় শিল্পী হিসাবেও অমল সেনের বেশ সুনাম ছিল। ১৯৪৫ সালে দুর্গাপূজায় সিদ্ধান্ত হয় বাকড়ী স্কুল প্রাঙ্গণে শরৎ চন্দ্রের রম্য নটক মঞ্চস্থ হয়। এ নাটকের পরিচালনায় ছিলেন শিক্ষক সুধীর মজুমদার, বনচারি মজুমদার ও প্রফুল্ল রায়। নির্ধারিত দিনে কাস্টিং শিল্পী নিরেন দাশ না থাকায় অমল সেনের ডাক পড়ে। শুধু প্রোমটারের প্রোমোট কুনে অভিনয় করে ব্যাপক দর্শক প্রশংসা অর্জন করেন।

শিক্ষক হিসেবেও অমল সেনের যথেষ্ট খ্যাতি ছিল। ১৯৫৬ সালে জেল থেকে ফিরে বাকড়ীর স্কুলে শিক্ষকতায় যোগ দেন। ১৯৫৮ সালে জেলে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তিনি সেখানে শিক্ষকতা করেন। অমল সেনের সে সময়কার অত্যন্ত প্রিয় ছাত্র ঘোড়ানাছ গ্রামের অবসর প্রাপ্ত শিক্ষক কিরণ চন্দ্র ভৌমিক বলেন, আমরা তখন ৮ম শ্রণীর ছাত্র। অমল স্যার ইংরেজি খুব সুন্দর পড়াতেন। তার সম্মোহনী ক্ষমতা ছিল। ছাত্ররা নিঃশব্দে মনোযোগ দিয়ে স্যারের কথা শুনতো। সে সময় বাকড়ীর স্কুলের অবস্থা তেমন ভালো ছিল না। অমল স্যার আসার পর স্কুলের গতিই পাল্টে যায়। তিনি ৭ম ও ৮ম শ্রেণীর গণিত ক্লাসও নিতেন। খুব সুন্দর ও সাবলীলভাবে গণিতের জটিল বিষয়গুলো বোঝাতেন। খেলোয়াড় হিসেবেও তার ভালো সুনাম ছিল। তিনি আরও বলেন, বাকড়ীতে থাকার সময় প্রতিদিনই তিনি গোচর মাঠে তরুণ ছেলেদের নিয়ে খেলতেন। আশেপাশের গ্রাম থেকে আসা খেলোয়ড়দের সঙ্গে ছোটখাটো প্রতিযেগিতায় তিনি অংশ নিতেন। তিনি ১১ খান ফুটবল টিমের নিয়োমিত খেলোয়াড় ছিলেন। খেলোয়াড় হিসেবে তিনি যেমন কৌশলী ছিলেন তেমনি ছিলেন সুদর্শনও।