প্রাণের স্পন্দন ফেরাবে করোনার টিকা

ড. মো. শফিকুর রহমান

ভাইরাস রোগ নিয়ন্ত্রণে কেবলমাত্র সুস্থ দেহে অ্যান্টিবডি সৃষ্টির মাধ্যমে ইমিউনিটি (রোগ প্রতিরোধ) বৃদ্ধি করেই সংক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করা হয়। কাজেই কোভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণের জন্য রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি (ইমিউনাইজেশন) কেবল হার্ড ইমিউনিটির মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব। হার্ড ইমিউনিটি অর্জন করা হয় টিকার মাধ্যমে সুস্থ মানবদেহে অ্যান্টিবডি (রোগ প্রতিরোধ) তৈরি করে বা ঐ ভাইরাস সংক্রমণ থেকে সুস্থ হয়ে ওঠা মানবদেহে সৃষ্ট প্রাকৃতিক ইমিউনিটি থেকে, যা ঐ ভাইরাসের পুনরায় আক্রমণকে প্রতিহত করে। কোন ভাইরাস জীবাণু দ্বারা রোগ সৃষ্টির পর শরীর নিজের ভিতরে ঐ রোগের একটা স্মৃতি রেখে দেয়, যা ঐ ভাইরাসকে শনাক্ত করে এবং পুনরায় আক্রমণকে প্রতিহত করতে সহায়তা করে। এভাবে কোন একটি কমিউনিটির ৭০-৮০ শতাংশ জনগণের হার্ড ইমিউনিটি অর্জনপূর্বক ভাইরাস সংক্রমণ রোধ করা সম্ভব, কাজেই বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে কোভিড-১৯ এর টিকাদান কর্মসূচির সফল বাস্তবায়ন ছাড়া কোনভাবেই করোনা মহামারিতে নিস্তব্ধ হওয়া পৃথিবীতে আবার প্রাণের স্পন্দন ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। এপর্যন্ত সারাবিশ্বে প্রায় দশ কোটি করোনা আক্রান্ত মানুষের মধ্যে বিশ লক্ষের বেশি মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। সরকারি হিসাবমতে, বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে পাঁচ লক্ষ লোক করোনা আক্রান্ত হয়েছেন ও প্রায় আট হাজার মানুষ করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। করোনা আক্রান্ত হয়ে বেশিরভাগ মৃত্যুর ঘটনা হার্টঅ্যাটাকের মাধ্যমেই ঘটে থাকে। করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাসনালী বা শ্বাসতন্ত্রে ইনফ্লামেশনের ফলে অত্যধিক রক্ত সঞ্চালনের দরুন হার্টের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে, বিধায় হার্টের সমস্যাজনিত ব্যক্তির হার্টের কার্যকারিতা বন্ধ হয়ে যায়।

করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের জন্য বর্তমানে ফাইজার, মডার্না ও অক্সফোর্ডের টিকাগুলো ফ্রন্টলাইনে রয়েছে। বিশ্ব সাস্থ্য সংস্থা কেবল ফাইজার-বায়োএনটেকের করোনা টিকাটি জরুরি ব্যবহারের জন্য অনুমোদন দিয়েছে। বিভিন্ন দেশের ভিন্ন ভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে করোনা টিকা সম্পর্কে বিভিন্ন ধরণের নেতিবাচক ধারণাসহ অবিশ্বাস রয়েছে কেন? সম্প্রতি ফাইজারের করোনা টিকা নেওয়ার পর নরওয়ের বিভিন্ন নার্সিংহোমে তেইশ জনসহ মোট ঊনত্রিশ জনের মৃত্যুর খবরে টিকা নেওয়ার ব্যাপারে মানুষের মনে ভীতির সঞ্চার আরও বেড়েছে এবং নরওয়ের মেডিসিন এজেন্সি এদের মধ্যে আশি বছরের বেশি বয়স্ক তের জনের মৃত্যুর বিষয়ে তদন্ত করে দেখেছে যে তাদের এমআরএনএ টিকাগুলোর সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মধ্যে জ্বর এবং ডায়রিয়ার লক্ষণ ছিল। নরওয়েতে প্রথমে বয়স্ক লোকদেরই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা দেওয়া হচ্ছে এবং এসব নার্সিংহোমে বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত বয়স্ক রোগীদের চিকিৎসা সেবা দেওয়ার জন্য রাখা হয়েছিল। এসব মৃত্যুর ঘটনাগুলো হয়ত করোনা টিকার করণে ঘটেনি; বরং অত্যন্ত মারাত্মক রোগে ভুগছিল এমন বয়স্ক রোগীদের মধ্যে ঘটেছে বলেও নরওয়ের মেডিক্যাল এজেন্সির পরিচালক স্বীকার করেছেন। ইতিমধ্যে নেদারল্যান্ডসের রাজধানী আমস্টারডামেও করোনা টিকার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে দুই হাজারের মতো বিক্ষোভকারী জমায়েত হয়েছিল।

সম্প্রতি ভারতে টিকার ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া নিয়ে টিকা গ্রহণে এক তৃতীয়াংশ মানুষের মধ্যে নেতিবাচক মনোভাবসহ ভয়ের সঞ্চার হয়েছে। ভারত বায়োটেকের তৈরি কোভ্যাক্সিন টিকার তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়াল শেষ না হওয়া সত্ত্বেও জরুরিভিত্তিতে প্রয়োগের ছাড়পত্র দেওয়াকে কেন্দ্র করে এসব বিতর্ক ও সংশয়ের সূত্রপাত হয়েছে এবং বহু সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীরা টিকা নিতে চাইছেন না। এছাড়াও ভারতে প্রথম তিন দিনে প্রায় চার লাখ মানুষকে করোনাভাইরাসের টিকা দেওয়ার পর পাঁচশত আশিজনের শরীরে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে, সাতজনকে হাসপাতালে চিকিৎসা দিতে হয়েছে এবং দুটি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। যদিও দেশটির সরকার বলেছে, ওই দুজনের মৃত্যুর সঙ্গে করোনার টিকার কোনো যোগসূত্র নেই। তাছাড়া, ভারত একইসাথে অক্সফোর্ড ও কোভ্যাক্সিন টিকা গণহারে প্রয়োগ করছে এবং কোনটির কারণে এসব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিল তাও ভারত সরকার নিশ্চিত করেনি। কোভ্যাক্সিন টিকার কারণেও হয়ত এসব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিয়ে থাকতে পারে, কারণ এটি করোনার স্পাইক প্রোটিন বহনকারী অন্য একটি দুর্বল প্রকৃতির অ্যাডেনোভাইরাস দিয়ে তৈরি যার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার বিষয়টির ট্রায়াল এখনও শেষ হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাতে বয়স্ক লোকদের অগ্রাধিকার দিয়ে ইতিমধ্যে যথাক্রমে প্রায় ১৮৫ লাখ ও ৭.৩ লাখ ডোজ করোনা টিকা দেয়া হয়েছে এবং টিকাটি নেওয়া কারো মধ্যে এখন পর্যন্ত কোনো তীব্র, মৃদু বা মাঝারি কোনো ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার খবর পাওয়া যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল ফাইজার টিকাটির প্রায় আঠারো লাখ ডোজ পর্যালোচনা করে এর সুরক্ষা এবং কার্যকারিতা উভয় ক্ষেত্রেই খুব ইতিবাচক ফলাফল পেয়েছে বলেও জানিয়েছে।

ফাইজার, মডার্না ও অক্সফোর্ড টিকাগুলোর ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের সময় কোন গুরুতর অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি এবং যাদের তীব্র অ্যালার্জি সমস্যা ছিল তাদের কাউকেই পরীক্ষার কোনটিতেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। যুক্তরাজ্যে ফাইজার টিকাটি চালু হওয়ার পর, মারাত্মক অ্যালার্জির জরুরি চিকিৎসার জন্য অ্যাড্রেনালাইন পেন বহনকারী দুজনের শরীরে টিকার একটি উপাদান দ্বারা তীব্র অ্যালার্জি প্রতিক্রিয়া (অ্যানাফিল্যাক্সিস) দেখা দিয়েছিল। কাজেই যাদের শরীরে তীব্র অ্যালার্জির লক্ষণ রয়েছে তাদের ফাইজারসহ যেকোন টিকা নেওয়া উচিৎ নয়। ফাইজার টিকাটির করোনার স্পাইক প্রোটিন অতি নিম্ন তাপমাত্রায় নষ্ট না হওয়ার জন্য পলিইথিলিন গ্লাইকল (পিইজি) ব্যবহার করা হয়েছে, যা সাধারণত ওষুধে ব্যবহৃত অ্যালার্জেনের (অ্যালার্জি সৃষ্টিকারী) একটি গ্রুপ হিসাবে পরিচিত। অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা টিকাতে পিইজি থাকে না, সুতরাং এ উপাদানটি দ্বারা অ্যালার্জি সমস্যা হয় এমন ব্যক্তিরা বিকল্প হিসেবে অক্সফোর্ড টিকা গ্রহণ করতে পারেন।

সুখবর হলো- বাংলাদেশ করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের জন্য অতিশীঘ্রই অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার মাধ্যমে টিকাদান কর্মসূচি শুরু করতে যাচ্ছে। করোনার টিকা নেওয়ার পর অন্য সব টিকার মতোই কারো কারো শরীরে হয়ত হালকা কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া যেমন, টিকা প্রয়োগের স্থানের চারদিকে লাল হয়ে ফোলাভাব, বাহুতে ব্যথা, সামান্য সর্দি বা জ্বর, জয়েন্ট বা পেশি ব্যথা, ক্লান্তিভাব ও মাথা ব্যথার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে এবং এ লক্ষণগুলো সাধারণত টিকাটি যে কাজ করছে তা ইঙ্গিত করে।

অক্সফোর্ড টিকাতে আদৌ কোন ক্ষতিকর উপাদান রয়েছে কিনা যা আমাদের জন্য ভীতির কারণ হতে পারে? অক্সফোর্ড টিকাতে অন্যসব সাধারণ টিকার মতোই সুক্রোজ, অ্যাসিডিটি নিয়ন্ত্রক হিস্টিডিন, সোডিয়াম ও পটাসিয়াম লবণ ছাড়াও পলিসরবেট-৮০, সামান্য পরিমাণ ম্যাগনেসিয়াম (এক মিলিয়নের ৩-২০ অংশ) এবং খুব অল্প পরিমাণে অ্যালকোহল (০.০০৩ মিলিগ্রাম/ডোজ) রয়েছে। অক্সফোর্ড টিকাতে এসব উপাদানগুলো খুবই অল্প পরিমাণে রয়েছে এবং এমন কোন ক্ষতিকর উপাদান নেই; যা অমাদের শরীরে ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।

আরেকটি সুখবর হচ্ছে, যুক্তরাজ্য ও ব্রাজিলে শনাক্ত করোনার নতুন ধরনের মতো খুবই মারাত্মক ও আগ্রাসী মিউট্যান্ট স্ট্রেইন আগামী দিনগুলোতে আগের ধরনটির জায়গা দখল করার আগেই আমাদের বহু লোক টিকা নেবে। ফলে জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশের মধ্যে একটা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি থাকবে। অক্সফোর্ড টিকাতে অন্যান্য টিকার মতোই সামান্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া (ক্ষতিকর নয়) কারো শরীরে দেখা দিতে পারে এমনটি মেনে নিয়েই টিকার নেতিবাচক প্রচারে কর্ণপাত না করে বরং টিকা গ্রহণে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সাথে সাথে আমরা সবাইকে টিকা গ্রহণে আগ্রহী করে সরকারের টিকাদান কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে নিজেকে, নিজের পরিবারকে ও পাড়া-প্রতিবেশীসহ সমগ্র বাংলাদেশের জনগণকে করোনার বিরুদ্ধে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলে করোনার মহামারি থেকে সুরক্ষা দিতে হবে। একমাত্র টিকাই পারবে আমাদের বাবা-মা ও ছেলেমেয়েসহ সবাইকে করোনার কারণে মৃত্যুর ঝুঁকিপূর্ণ জীবন থেকে রক্ষা করে আবার কোলাহলময় স্বাভাবিক জীবন ফিরে দিতে।

[লেখক : অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়]

mrahman7@lakeheadu.ca

সোমবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২১ , ১১ মাঘ ১৪২৭, ১১ জমাদিউস সানি ১৪৪২

প্রাণের স্পন্দন ফেরাবে করোনার টিকা

ড. মো. শফিকুর রহমান
image

ভাইরাস রোগ নিয়ন্ত্রণে কেবলমাত্র সুস্থ দেহে অ্যান্টিবডি সৃষ্টির মাধ্যমে ইমিউনিটি (রোগ প্রতিরোধ) বৃদ্ধি করেই সংক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করা হয়। কাজেই কোভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণের জন্য রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি (ইমিউনাইজেশন) কেবল হার্ড ইমিউনিটির মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব। হার্ড ইমিউনিটি অর্জন করা হয় টিকার মাধ্যমে সুস্থ মানবদেহে অ্যান্টিবডি (রোগ প্রতিরোধ) তৈরি করে বা ঐ ভাইরাস সংক্রমণ থেকে সুস্থ হয়ে ওঠা মানবদেহে সৃষ্ট প্রাকৃতিক ইমিউনিটি থেকে, যা ঐ ভাইরাসের পুনরায় আক্রমণকে প্রতিহত করে। কোন ভাইরাস জীবাণু দ্বারা রোগ সৃষ্টির পর শরীর নিজের ভিতরে ঐ রোগের একটা স্মৃতি রেখে দেয়, যা ঐ ভাইরাসকে শনাক্ত করে এবং পুনরায় আক্রমণকে প্রতিহত করতে সহায়তা করে। এভাবে কোন একটি কমিউনিটির ৭০-৮০ শতাংশ জনগণের হার্ড ইমিউনিটি অর্জনপূর্বক ভাইরাস সংক্রমণ রোধ করা সম্ভব, কাজেই বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে কোভিড-১৯ এর টিকাদান কর্মসূচির সফল বাস্তবায়ন ছাড়া কোনভাবেই করোনা মহামারিতে নিস্তব্ধ হওয়া পৃথিবীতে আবার প্রাণের স্পন্দন ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। এপর্যন্ত সারাবিশ্বে প্রায় দশ কোটি করোনা আক্রান্ত মানুষের মধ্যে বিশ লক্ষের বেশি মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। সরকারি হিসাবমতে, বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে পাঁচ লক্ষ লোক করোনা আক্রান্ত হয়েছেন ও প্রায় আট হাজার মানুষ করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। করোনা আক্রান্ত হয়ে বেশিরভাগ মৃত্যুর ঘটনা হার্টঅ্যাটাকের মাধ্যমেই ঘটে থাকে। করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাসনালী বা শ্বাসতন্ত্রে ইনফ্লামেশনের ফলে অত্যধিক রক্ত সঞ্চালনের দরুন হার্টের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে, বিধায় হার্টের সমস্যাজনিত ব্যক্তির হার্টের কার্যকারিতা বন্ধ হয়ে যায়।

করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের জন্য বর্তমানে ফাইজার, মডার্না ও অক্সফোর্ডের টিকাগুলো ফ্রন্টলাইনে রয়েছে। বিশ্ব সাস্থ্য সংস্থা কেবল ফাইজার-বায়োএনটেকের করোনা টিকাটি জরুরি ব্যবহারের জন্য অনুমোদন দিয়েছে। বিভিন্ন দেশের ভিন্ন ভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে করোনা টিকা সম্পর্কে বিভিন্ন ধরণের নেতিবাচক ধারণাসহ অবিশ্বাস রয়েছে কেন? সম্প্রতি ফাইজারের করোনা টিকা নেওয়ার পর নরওয়ের বিভিন্ন নার্সিংহোমে তেইশ জনসহ মোট ঊনত্রিশ জনের মৃত্যুর খবরে টিকা নেওয়ার ব্যাপারে মানুষের মনে ভীতির সঞ্চার আরও বেড়েছে এবং নরওয়ের মেডিসিন এজেন্সি এদের মধ্যে আশি বছরের বেশি বয়স্ক তের জনের মৃত্যুর বিষয়ে তদন্ত করে দেখেছে যে তাদের এমআরএনএ টিকাগুলোর সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মধ্যে জ্বর এবং ডায়রিয়ার লক্ষণ ছিল। নরওয়েতে প্রথমে বয়স্ক লোকদেরই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা দেওয়া হচ্ছে এবং এসব নার্সিংহোমে বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত বয়স্ক রোগীদের চিকিৎসা সেবা দেওয়ার জন্য রাখা হয়েছিল। এসব মৃত্যুর ঘটনাগুলো হয়ত করোনা টিকার করণে ঘটেনি; বরং অত্যন্ত মারাত্মক রোগে ভুগছিল এমন বয়স্ক রোগীদের মধ্যে ঘটেছে বলেও নরওয়ের মেডিক্যাল এজেন্সির পরিচালক স্বীকার করেছেন। ইতিমধ্যে নেদারল্যান্ডসের রাজধানী আমস্টারডামেও করোনা টিকার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে দুই হাজারের মতো বিক্ষোভকারী জমায়েত হয়েছিল।

সম্প্রতি ভারতে টিকার ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া নিয়ে টিকা গ্রহণে এক তৃতীয়াংশ মানুষের মধ্যে নেতিবাচক মনোভাবসহ ভয়ের সঞ্চার হয়েছে। ভারত বায়োটেকের তৈরি কোভ্যাক্সিন টিকার তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়াল শেষ না হওয়া সত্ত্বেও জরুরিভিত্তিতে প্রয়োগের ছাড়পত্র দেওয়াকে কেন্দ্র করে এসব বিতর্ক ও সংশয়ের সূত্রপাত হয়েছে এবং বহু সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীরা টিকা নিতে চাইছেন না। এছাড়াও ভারতে প্রথম তিন দিনে প্রায় চার লাখ মানুষকে করোনাভাইরাসের টিকা দেওয়ার পর পাঁচশত আশিজনের শরীরে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে, সাতজনকে হাসপাতালে চিকিৎসা দিতে হয়েছে এবং দুটি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। যদিও দেশটির সরকার বলেছে, ওই দুজনের মৃত্যুর সঙ্গে করোনার টিকার কোনো যোগসূত্র নেই। তাছাড়া, ভারত একইসাথে অক্সফোর্ড ও কোভ্যাক্সিন টিকা গণহারে প্রয়োগ করছে এবং কোনটির কারণে এসব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিল তাও ভারত সরকার নিশ্চিত করেনি। কোভ্যাক্সিন টিকার কারণেও হয়ত এসব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিয়ে থাকতে পারে, কারণ এটি করোনার স্পাইক প্রোটিন বহনকারী অন্য একটি দুর্বল প্রকৃতির অ্যাডেনোভাইরাস দিয়ে তৈরি যার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার বিষয়টির ট্রায়াল এখনও শেষ হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাতে বয়স্ক লোকদের অগ্রাধিকার দিয়ে ইতিমধ্যে যথাক্রমে প্রায় ১৮৫ লাখ ও ৭.৩ লাখ ডোজ করোনা টিকা দেয়া হয়েছে এবং টিকাটি নেওয়া কারো মধ্যে এখন পর্যন্ত কোনো তীব্র, মৃদু বা মাঝারি কোনো ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার খবর পাওয়া যায়নি। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল ফাইজার টিকাটির প্রায় আঠারো লাখ ডোজ পর্যালোচনা করে এর সুরক্ষা এবং কার্যকারিতা উভয় ক্ষেত্রেই খুব ইতিবাচক ফলাফল পেয়েছে বলেও জানিয়েছে।

ফাইজার, মডার্না ও অক্সফোর্ড টিকাগুলোর ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের সময় কোন গুরুতর অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি এবং যাদের তীব্র অ্যালার্জি সমস্যা ছিল তাদের কাউকেই পরীক্ষার কোনটিতেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। যুক্তরাজ্যে ফাইজার টিকাটি চালু হওয়ার পর, মারাত্মক অ্যালার্জির জরুরি চিকিৎসার জন্য অ্যাড্রেনালাইন পেন বহনকারী দুজনের শরীরে টিকার একটি উপাদান দ্বারা তীব্র অ্যালার্জি প্রতিক্রিয়া (অ্যানাফিল্যাক্সিস) দেখা দিয়েছিল। কাজেই যাদের শরীরে তীব্র অ্যালার্জির লক্ষণ রয়েছে তাদের ফাইজারসহ যেকোন টিকা নেওয়া উচিৎ নয়। ফাইজার টিকাটির করোনার স্পাইক প্রোটিন অতি নিম্ন তাপমাত্রায় নষ্ট না হওয়ার জন্য পলিইথিলিন গ্লাইকল (পিইজি) ব্যবহার করা হয়েছে, যা সাধারণত ওষুধে ব্যবহৃত অ্যালার্জেনের (অ্যালার্জি সৃষ্টিকারী) একটি গ্রুপ হিসাবে পরিচিত। অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা টিকাতে পিইজি থাকে না, সুতরাং এ উপাদানটি দ্বারা অ্যালার্জি সমস্যা হয় এমন ব্যক্তিরা বিকল্প হিসেবে অক্সফোর্ড টিকা গ্রহণ করতে পারেন।

সুখবর হলো- বাংলাদেশ করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের জন্য অতিশীঘ্রই অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার মাধ্যমে টিকাদান কর্মসূচি শুরু করতে যাচ্ছে। করোনার টিকা নেওয়ার পর অন্য সব টিকার মতোই কারো কারো শরীরে হয়ত হালকা কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া যেমন, টিকা প্রয়োগের স্থানের চারদিকে লাল হয়ে ফোলাভাব, বাহুতে ব্যথা, সামান্য সর্দি বা জ্বর, জয়েন্ট বা পেশি ব্যথা, ক্লান্তিভাব ও মাথা ব্যথার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে এবং এ লক্ষণগুলো সাধারণত টিকাটি যে কাজ করছে তা ইঙ্গিত করে।

অক্সফোর্ড টিকাতে আদৌ কোন ক্ষতিকর উপাদান রয়েছে কিনা যা আমাদের জন্য ভীতির কারণ হতে পারে? অক্সফোর্ড টিকাতে অন্যসব সাধারণ টিকার মতোই সুক্রোজ, অ্যাসিডিটি নিয়ন্ত্রক হিস্টিডিন, সোডিয়াম ও পটাসিয়াম লবণ ছাড়াও পলিসরবেট-৮০, সামান্য পরিমাণ ম্যাগনেসিয়াম (এক মিলিয়নের ৩-২০ অংশ) এবং খুব অল্প পরিমাণে অ্যালকোহল (০.০০৩ মিলিগ্রাম/ডোজ) রয়েছে। অক্সফোর্ড টিকাতে এসব উপাদানগুলো খুবই অল্প পরিমাণে রয়েছে এবং এমন কোন ক্ষতিকর উপাদান নেই; যা অমাদের শরীরে ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।

আরেকটি সুখবর হচ্ছে, যুক্তরাজ্য ও ব্রাজিলে শনাক্ত করোনার নতুন ধরনের মতো খুবই মারাত্মক ও আগ্রাসী মিউট্যান্ট স্ট্রেইন আগামী দিনগুলোতে আগের ধরনটির জায়গা দখল করার আগেই আমাদের বহু লোক টিকা নেবে। ফলে জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশের মধ্যে একটা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি থাকবে। অক্সফোর্ড টিকাতে অন্যান্য টিকার মতোই সামান্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া (ক্ষতিকর নয়) কারো শরীরে দেখা দিতে পারে এমনটি মেনে নিয়েই টিকার নেতিবাচক প্রচারে কর্ণপাত না করে বরং টিকা গ্রহণে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সাথে সাথে আমরা সবাইকে টিকা গ্রহণে আগ্রহী করে সরকারের টিকাদান কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে নিজেকে, নিজের পরিবারকে ও পাড়া-প্রতিবেশীসহ সমগ্র বাংলাদেশের জনগণকে করোনার বিরুদ্ধে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলে করোনার মহামারি থেকে সুরক্ষা দিতে হবে। একমাত্র টিকাই পারবে আমাদের বাবা-মা ও ছেলেমেয়েসহ সবাইকে করোনার কারণে মৃত্যুর ঝুঁকিপূর্ণ জীবন থেকে রক্ষা করে আবার কোলাহলময় স্বাভাবিক জীবন ফিরে দিতে।

[লেখক : অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়]

mrahman7@lakeheadu.ca