একজোড়া ফিলিস্তিনি গল্প

মূল: আলম জেদান ভাষান্তর : ফজল হাসান

সে তার পা হাতে

বহন করেছে

সেদিন ছিল ২০০৯ সালের ১৪ জানুয়ারি। টেলিফোনে যখন রিং হয়, তখন সে কাজে ছিল। ইজরায়েলি সৈন্যরা গাজা শহরের আল-মাক্কুসি উঁচু ভবনের বাসিন্দাদের ঘেরাও করেছিল এবং কেউ তাদের উদ্ধার করবে, সেই জন্য পুরো ভবনের বাসিন্দারা মরিয়া হয়ে উঠেছিল। তখন আমার ভাই জাবালইয়ার অগ্নি নির্বাপক অফিসের দায়িত্বে ছিল, কিন্তু তার কাছে অনুরোধ এসেছিল অন্য জায়গা থেকে। তাকে একটা সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল; হয় ভবনের বাসিন্দাদের জীবন বাঁচাবে, নতুবা অফিসে তার টেবিলের পিছনে বসে নিহতদের সংবাদের জন্য অপেক্ষা করবে। সে জীবন বাঁচাতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

আমার ভাই মোহাম্মদ মা ছাড়া বড় হয়েছে। তার বয়স যখন নয় বছর, তখন মা মারা যান। এখন মোহাম্মদের বয়স আটাশ বছর। একসময় সে ছিল হাস্যরসাত্মক, ভবঘুরে... মাঝে মাঝে ভীষণ বিরক্তিকরও ছিল। কিন্তু সে অবশ্যই একজন মানুষ ছিল। তার একটা মাথা, দুই পা, দুই হাত এবং একজন স্ত্রী ছিল। মোহাম্মদের জীবনের একমাত্র ভালোবাসা ছিল তার স্ত্রী। বিয়ে করার আগে আমার ভাই মধ্যরাতে (যখন কেউ দেখবে না) হবু স্ত্রীকে ফোন করতো। তার জন্য মাসের শেষে অনেক বেশি ফোনের বিল পরিশোধ করতে রীতিমতো আমার বাবাকে বাধ্য করা হতো।

কুড়ি বছর বয়সে মোহাম্মদ বিয়ে করে, তখন ভাবির বয়স পনের। কিন্তু তাদের কোনো সন্তানাদি নেই। সবচেয়ে খারাপ বিষয় যা মোহাম্মদের হৃদয়কে ভেঙেচুরে তছনছ করে দেয়, তাহলো সে

যখন দেখে একই সময়ে যারা বিয়ে করেছিল, তাদের ছেলেমেয়ে আছে। সিভিল ডিফেন্স টিমে যোগদান করার আগে সে একজন দর্জি ছিল। তার আয় সে কাপড়চোপড় কিনে এবং সিগারেটের পেছনে ব্যয় করতো। স্ত্রীকে অথবা বা ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের নিয়ে সারা রাত বাইরে কাটাতো। বাবা প্রায়ই আমার ভাইয়ের ওপর নিষ্ঠুর হতেন। অথচ একসময় বাবা নিজেও খুব দুষ্টু ছিলেন। বাবার সঙ্গে মোহাম্মদের কখনই ভালো সম্পর্ক ছিল না।

তারপর একদিন মোহাম্মদ সিভিল ডিফেন্সে চাকরি লাভ করে এবং তখন থেকেই তার জীবনে অনেক কিছু বদলে যায়।

যে রাতে ইজরায়েলি কর্তৃপক্ষ ‘অপারেশন কাস্ট লীড’ আগ্রাসন চালিয়েছিল, সেই দুর্ভাগ্যজনক রাতে মোহাম্মদ ফোন কল পেয়ে দলবল নিয়ে উদ্ধার কাজে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে সময়ের স্বল্পতার জন্য সে অগ্নি নির্বাপক অফিসের নিকটতম সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি। গাজা স্ট্রিপের বেশিরভাগ এলাকায় যোগাযোগের কোনো লাইন সচল ছিল না। গাজা প্রদেশের উত্তর-পশ্চিম এলাকায় অবস্থিত চৌদ্দ তলা ভবনে ইজরায়েলিরা বোমা বর্ষণ করেছে। মোহাম্মদ অগ্নি নির্বাপক গাড়ি চালিয়েছিল এবং তার রুপালি রঙের নতুন পোশাক পরে রীতিমতো তড়িঘড়ি করে ভবনে পৌঁছে। দলের লোকজন ভবনের সপ্তম তলার আগুন নেভায় এবং তারপর তারা জলদি করে এগারোতম তলার বাসিন্দাদের উদ্ধার করতে যায়। একজন পুরুষ এবং একজন মহিলা সিমেন্টের মেঝের ওপর পড়েছিল, কিন্তু যে সময় সেখানে উদ্ধার কর্মীরা পৌঁছেছে, তার আগেই সেই দু’জন মারা যায়। মোহাম্মদ এবং তার দু’জন সহকর্মী, হোশাম এবং বাহা, মৃতদেহ ঢেকে দেয় এবং সেখান থেকে সরিয়ে নেয়।

‘আচমকা বিদ্যুৎ চলে যায়’, মোহাম্মদ স্মরণ করতে পারে। ‘আমি বুঝতে পারিনি কী ঘটেছে। কিছু সময়ের জন্য ভেবেছিলাম আমি বেঁচে আছি, নাকি মরে গেছি। তখন বাবাকে মনে পড়েছিল। আমি চাইনি আমার জীবন এভাবে শেষ হোক। বাবাকে খুশি করার জন্য আমি আরও একটা দিন বাঁচতে চেয়েছি। আমি দাঁড়াতে চেষ্টা করি, কিন্তু পারিনি। আমি বুঝতে পেরেছি যে, আমার পা জখম হয়েছে। কিছুক্ষণ পরে আমি শুনতে পেয়েছি একজন প্যারামেডিক চিৎকার করছে এবং জানতে চেয়েছে কেউ জীবিত ছিল কি না। আমি তাকে জোর দিয়ে অনুরোধ করেছি যে, সে যেন একটা খাটিয়া নিয়ে আসে, কিন্তু সে আমার কথা শোনেনি। আমি খুব রেগে গিয়েছিলাম। আমার পা দেওয়ালে আঘাত করছিল, তাই আমি নিচে গিয়ে সেটা ধরে রেখেছি। ভবনের দুই তলা নিচে প্যারামেডিক আমার জন্য খাটিয়া নিয়ে এসেছিল। তারপর প্যারামেডিকের আরো লোকজন আসে এবং আমাকে খাঁটিয়ায় তুলে অ্যাম্বুলেন্সে নিয়ে যায়।

শুভ্র বসনে দেবদূতরা। মোহাম্মদ ভুলে গেছে যে, সে আহত। সে ভেবেছিল স্বর্গে আছে, কিন্তু তার সেই ভাবনা ছিল ভুল। বরং সে আল-শিফা হাসপাতালের জরুরি বিভাগে শুয়েছিল। তার কাছে ডাক্তাররাই দেবদূত। সে কল্পনায় যে লাল ফল এবং তরল পর্দাথ দেখেছিল, আসলে তা ছিল তার নিজের এবং বন্ধুদের রক্ত।

মোহাম্মদ অল্প সময়ের মধ্যেই উপলব্ধি করেছে যে, তার আহত পা কেটে ফেলা হয়েছে। তার কাছে মনে হয়েছে সেখানেই জীবনের সমাপ্তি। আগে সে যেই মানুষ ছিল, এখন থেকে তা থাকবে না। ইজরায়েলি সৈন্যদের বোমা হামলায় তিনজন সহকর্মী এবং একজন ক্যামেরাম্যান আহত হয়েছে। একটা বাচ্চা ছেলে ও একটা বাচ্চা মেয়ের বাবা হোশাম আল-খোলি তার ডান পা হারিয়েছে। অন্যদিকে বাহা আল-তৌলি তার উভয় পা হারিয়েছে। মোহাম্মদের স্বীকার করতেই হবে যে, সে এখন থেকে একজন প্রতিবন্ধি ছাড়া আর কিছুই নয়। লোকজন করুণার দৃষ্টিতে দেখবে এবং তারপর সহানুভূতির সঙ্গে মিষ্টি কথা বলবে। এটা সে পছন্দ করেনি। সে এই জীবন চায়নি।

আমার মনে আছে, আমাদের বড় বোন হাসপাতালে মোহাম্মদের বিছানার পাশে বসেছিলেন। তিনি মোহাম্মদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন আর দোয়া করছিলেন যেন সে তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠে। একমাত্র মোহাম্মদের বিড়াল তার মুখে হাসি ফোটাতে পেরেছিল। আমার ভাই বিড়াল অত্যন্ত ভালোবাসে এবং সে তার বিড়ালকে হাসপাতালে নিয়ে আসার জন্য বলেছিল। টমটম তাকে কয়েক বার দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিল।

হাসপাতালে ঔষধপত্রের স্বল্পতা এবং আহত অনেক লোকের আগমনের জন্য মোহাম্মদের যে ধরনের চিকিৎসার প্রয়োজন ছিল, তা সে পায়নি। তাই তাকে অন্যত্র মিশরীয় এক হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল। ‘অপারেশন কাস্ট লীড’-এর সময়ে ফিলিস্তিনি আহতদের জন্য রাফাহর সীমান্ত খোলা ছিল। সেখানে সে চার মাস কাটিয়েছে। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার সময় কর্তৃপক্ষ উপহার হিসেবে তাকে একটা কৃত্রিম পা দিয়েছে। আমি কখনই তাকে সেই কৃত্রিম পা ব্যবহার করতে দেখিনি। বরং সে ক্রাচ ব্যবহার করেছে।

মোহাম্মদ যখন বাড়ি ফিরে আসে, তখন সে বারবার নিজেকে জিজ্ঞেস করেছে কেন ইজরায়েলিরা তাকে হত্যা করেনি এবং কেন সবকিছু শেষ করে দেয়নি। কিন্তু তারপর তার মনে পড়ে সেই মুহূর্তের কথা, যখন সে তার পা হাতে বহন করেছে। মানুষের জীবন বাঁচানোর চেষ্টার জন্য সে মোটেও অনুতপ্ত নয়।

আমার ভাই সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, ইজরায়েলিরা তার সঙ্গে যাই করুক না কেন, সে মোহাম্মদ হিসেবে বেঁচে থাকবে। সে সিভিল ডিফেন্স ডিপার্টমেন্টে যোগ দিতে চায়, কিন্তু কর্তৃপক্ষ তাকে যোগ্য হিসেবে গণনা করেনি। তার মনের জোর নিয়ে কোনো অসুবিধা নেই, তারপরও কর্তৃপক্ষ তাকে আগের চাকরিতে ফিরে যেতে দেয়নি।

মোহাম্মদ অল্প সময়ের মধ্যে সোফা বানানোর কাজ শেখার জন্য ছয় মাসের কোর্সে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়। সে সুযোগটা হাতছাড়া করেনি, বরং রীতিমতো লুফে নিয়েছে। সে তার জীবন থেকে ‘প্রতিবন্ধি’ শব্দটি মুছে ফেলতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল। দর্জির কাজে সে তার দক্ষতা ব্যবহার করে এবং সে তার ছোট বাড়িতে সোফা তৈরি করতে শুরু করেছিল। সবাই তার কাজ পছন্দ করতো। জীবনে প্রথমবারের মতো আমার বাবা মোহাম্মদের জন্য গর্ব অনুভব করেন। মনে হচ্ছে যে, আমার বাবা সত্যিই তার ছেলের কাছ থেকে একটা জিনিসই চেয়েছিলেন এবং তা ছিল স্বপ্নদ্রষ্টা, বিশ্বাসী আর একজন অর্জনকারী। মোহাম্মদ এখন গাজার একটি বড় আসবাবপত্র কোম্পানিতে কাজ করে। অবশ্যই নিজে একটি কোম্পানি স্থাপন করা মোহাম্মদের আরেকটি স্বপ্ন।

এত বড় আঘাত সত্ত্বেও এবং মোহাম্মদ যেই বিপদের পর বেঁচে আছে, সে এখনো একজন মানুষ।

এবং হ্যাঁ, তার এক মাথা, এক পা আর দুই হাত আছে।

তার মুখে হাসি ফুটে ওঠে

লোকটি এদিক-ওদিক ইতস্তত ঘুরে বেডাচ্ছিল। হঠাৎ সে এক বয়স্কা মহিলার সামনে থামে। খুব সকাল থেকে মহিলাটি বিক্রি করার উদ্দেশ্য কিছু স্ট্রবেরি নিয়ে রাস্তার পাশে বসে ছিলেন। লোকটি তাকে অভিবাদন জানায় এবং তারপর জিজ্ঞেস করে যে, বৃদ্ধা যেখানে বসে বিক্রি করছেন, আগে সেখানে এক যুবক বিক্রি করতো, তাকে তিনি চেনেন কিনা। বয়স্কা মহিলা লোকটির কাছে যুবকের বর্ণনা চেয়েছেন। সে দ্বিধা করেনি এবং যুবকের বর্ণনা দেওয়ার চেষ্টা করে। লোকটি বলেছে, কয়েক মাস আগে সে একজন সাধারণ মানুষকে চিনতো। মার্জিত যুবকের কথা বলতে গিয়ে লোকটি আরো বলেছে যে, জেরুজালেমে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইজরায়েলি হয়রানি নিয়ে গবেষণার সময় যুবকটি তাকে সাহায্য করেছিল। বৃদ্ধাকে সে যুবকের উজ্জ্বল চোখের কথা বলেছে, যা সে ভুলতে পারবে না এবং যুবকটির হাসি একবারের জন্যও তার মন থেকে চলে যায়নি। লোকটির উল্টোপাল্টা আরবি ভাষায় কথা বলা বয়স্কা মহিলাকে একটা ধারণা দেয়।

বয়স্কা মহিলা লোকটির কথা থামিয়ে দেয়। তারপর তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনি কী আবু সামেদের কথা বলছেন?’

‘আবু সামেদ, হ্যাঁ, তা ছিল তার ডাকনাম’, জবাবে লোকটি বললো।

বৃদ্ধা মহিলার মুখে হাসি ফুটে ওঠে। তিনি বললেন, ‘দখলকারীরা তাকে হত্যা করেছে।’

***

[পাদটীকা: মূল গল্পে ‘অপারেশন কাস্ট লীড’-এর ব্যাখ্যা নেই, কিন্তু পাঠক/পাঠিকাদের সুবিধার্থে দেওয়া হলো- অনুবাদক।

‘অপারেশন কাস্ট লীড’, যা ‘গাজা গণহত্যা’ নামে পরিচিত, গাজা ভূখণ্ডে (স্ট্রিপে) ফিলিস্তিনি আধা-সামরিক বাহিনী এবং ইজরায়েল প্রতিরক্ষা বাহিনীর মধ্যে তিন সপ্তাহ (২৭ ডিসেম্বর ২০০৮ থেকে ১৮ জানুয়ারি ২০০৯) সশস্ত্র যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। ইজরায়েলি এবং ফিলিস্তিনিদের মধ্যে সেই সামরিক হামলার হিং¯্রতা নজিরবিহীন এবং প্রায় ১৪০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছ, যাদের বেশিরভাগই ছিল বেসামরিক নাগরিক।]

লেখক পরিচিতি: ফিলিস্তিনের নতুন প্রজন্মের প্রতিভাবান ছোটগল্প লেখক, সম্পাদক এবং ফ্রিল্যান্স অনুবাদক আলম জেদানের জন্ম গাজার জাবালইয়া শরণার্থী শিবিরে, ১৯৯০ সালে। তাঁর আসল নিবাস আল-মাসমিয়া আল-কাবিরাহ গ্রামে। তিনি ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব গাজা থেকে পেশাদারী অনুবাদে উচ্চতর ডিপ্লোমা এবং আরবী ভাষায় ব্যাচেলার ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি আরবি, ইংরেজি এবং হিব্রু ভাষায় পারদর্শী। তাঁর একাধিক গল্প ‘We Are Not Numbers’ ওয়েবসাইটে (https://wearenotnumbers.org) প্রকাশিত হয়েছে।

গল্পসূত্র: ‘সে তার পা হাতে বহন করেছে’ গল্পটি আলম জেদানের ইংরেজিতে ‘হি ক্যারিড হিজ লেগ ইন হিজ হ্যান্ড’ এবং ‘তার মুখে হাসি ফুটে ওঠে’ ইংরেজিতে ‘স্মাইল অন’ গল্পের অনুবাদ। গল্প দুটি ‘We Are Not Numbers’ ওয়েবসাইটে (https://wearenotnumbers.org) (৭ জুন ২০১৫ এবং ২৬ জুন ২০১৪) প্রকাশিত হয় এবং সেখান থেকে নেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২১ , ১৪ মাঘ ১৪২৭, ১৪ জমাদিউস সানি ১৪৪২

একজোড়া ফিলিস্তিনি গল্প

মূল: আলম জেদান ভাষান্তর : ফজল হাসান
image

সে তার পা হাতে

বহন করেছে

সেদিন ছিল ২০০৯ সালের ১৪ জানুয়ারি। টেলিফোনে যখন রিং হয়, তখন সে কাজে ছিল। ইজরায়েলি সৈন্যরা গাজা শহরের আল-মাক্কুসি উঁচু ভবনের বাসিন্দাদের ঘেরাও করেছিল এবং কেউ তাদের উদ্ধার করবে, সেই জন্য পুরো ভবনের বাসিন্দারা মরিয়া হয়ে উঠেছিল। তখন আমার ভাই জাবালইয়ার অগ্নি নির্বাপক অফিসের দায়িত্বে ছিল, কিন্তু তার কাছে অনুরোধ এসেছিল অন্য জায়গা থেকে। তাকে একটা সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল; হয় ভবনের বাসিন্দাদের জীবন বাঁচাবে, নতুবা অফিসে তার টেবিলের পিছনে বসে নিহতদের সংবাদের জন্য অপেক্ষা করবে। সে জীবন বাঁচাতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

আমার ভাই মোহাম্মদ মা ছাড়া বড় হয়েছে। তার বয়স যখন নয় বছর, তখন মা মারা যান। এখন মোহাম্মদের বয়স আটাশ বছর। একসময় সে ছিল হাস্যরসাত্মক, ভবঘুরে... মাঝে মাঝে ভীষণ বিরক্তিকরও ছিল। কিন্তু সে অবশ্যই একজন মানুষ ছিল। তার একটা মাথা, দুই পা, দুই হাত এবং একজন স্ত্রী ছিল। মোহাম্মদের জীবনের একমাত্র ভালোবাসা ছিল তার স্ত্রী। বিয়ে করার আগে আমার ভাই মধ্যরাতে (যখন কেউ দেখবে না) হবু স্ত্রীকে ফোন করতো। তার জন্য মাসের শেষে অনেক বেশি ফোনের বিল পরিশোধ করতে রীতিমতো আমার বাবাকে বাধ্য করা হতো।

কুড়ি বছর বয়সে মোহাম্মদ বিয়ে করে, তখন ভাবির বয়স পনের। কিন্তু তাদের কোনো সন্তানাদি নেই। সবচেয়ে খারাপ বিষয় যা মোহাম্মদের হৃদয়কে ভেঙেচুরে তছনছ করে দেয়, তাহলো সে

যখন দেখে একই সময়ে যারা বিয়ে করেছিল, তাদের ছেলেমেয়ে আছে। সিভিল ডিফেন্স টিমে যোগদান করার আগে সে একজন দর্জি ছিল। তার আয় সে কাপড়চোপড় কিনে এবং সিগারেটের পেছনে ব্যয় করতো। স্ত্রীকে অথবা বা ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের নিয়ে সারা রাত বাইরে কাটাতো। বাবা প্রায়ই আমার ভাইয়ের ওপর নিষ্ঠুর হতেন। অথচ একসময় বাবা নিজেও খুব দুষ্টু ছিলেন। বাবার সঙ্গে মোহাম্মদের কখনই ভালো সম্পর্ক ছিল না।

তারপর একদিন মোহাম্মদ সিভিল ডিফেন্সে চাকরি লাভ করে এবং তখন থেকেই তার জীবনে অনেক কিছু বদলে যায়।

যে রাতে ইজরায়েলি কর্তৃপক্ষ ‘অপারেশন কাস্ট লীড’ আগ্রাসন চালিয়েছিল, সেই দুর্ভাগ্যজনক রাতে মোহাম্মদ ফোন কল পেয়ে দলবল নিয়ে উদ্ধার কাজে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে সময়ের স্বল্পতার জন্য সে অগ্নি নির্বাপক অফিসের নিকটতম সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি। গাজা স্ট্রিপের বেশিরভাগ এলাকায় যোগাযোগের কোনো লাইন সচল ছিল না। গাজা প্রদেশের উত্তর-পশ্চিম এলাকায় অবস্থিত চৌদ্দ তলা ভবনে ইজরায়েলিরা বোমা বর্ষণ করেছে। মোহাম্মদ অগ্নি নির্বাপক গাড়ি চালিয়েছিল এবং তার রুপালি রঙের নতুন পোশাক পরে রীতিমতো তড়িঘড়ি করে ভবনে পৌঁছে। দলের লোকজন ভবনের সপ্তম তলার আগুন নেভায় এবং তারপর তারা জলদি করে এগারোতম তলার বাসিন্দাদের উদ্ধার করতে যায়। একজন পুরুষ এবং একজন মহিলা সিমেন্টের মেঝের ওপর পড়েছিল, কিন্তু যে সময় সেখানে উদ্ধার কর্মীরা পৌঁছেছে, তার আগেই সেই দু’জন মারা যায়। মোহাম্মদ এবং তার দু’জন সহকর্মী, হোশাম এবং বাহা, মৃতদেহ ঢেকে দেয় এবং সেখান থেকে সরিয়ে নেয়।

‘আচমকা বিদ্যুৎ চলে যায়’, মোহাম্মদ স্মরণ করতে পারে। ‘আমি বুঝতে পারিনি কী ঘটেছে। কিছু সময়ের জন্য ভেবেছিলাম আমি বেঁচে আছি, নাকি মরে গেছি। তখন বাবাকে মনে পড়েছিল। আমি চাইনি আমার জীবন এভাবে শেষ হোক। বাবাকে খুশি করার জন্য আমি আরও একটা দিন বাঁচতে চেয়েছি। আমি দাঁড়াতে চেষ্টা করি, কিন্তু পারিনি। আমি বুঝতে পেরেছি যে, আমার পা জখম হয়েছে। কিছুক্ষণ পরে আমি শুনতে পেয়েছি একজন প্যারামেডিক চিৎকার করছে এবং জানতে চেয়েছে কেউ জীবিত ছিল কি না। আমি তাকে জোর দিয়ে অনুরোধ করেছি যে, সে যেন একটা খাটিয়া নিয়ে আসে, কিন্তু সে আমার কথা শোনেনি। আমি খুব রেগে গিয়েছিলাম। আমার পা দেওয়ালে আঘাত করছিল, তাই আমি নিচে গিয়ে সেটা ধরে রেখেছি। ভবনের দুই তলা নিচে প্যারামেডিক আমার জন্য খাটিয়া নিয়ে এসেছিল। তারপর প্যারামেডিকের আরো লোকজন আসে এবং আমাকে খাঁটিয়ায় তুলে অ্যাম্বুলেন্সে নিয়ে যায়।

শুভ্র বসনে দেবদূতরা। মোহাম্মদ ভুলে গেছে যে, সে আহত। সে ভেবেছিল স্বর্গে আছে, কিন্তু তার সেই ভাবনা ছিল ভুল। বরং সে আল-শিফা হাসপাতালের জরুরি বিভাগে শুয়েছিল। তার কাছে ডাক্তাররাই দেবদূত। সে কল্পনায় যে লাল ফল এবং তরল পর্দাথ দেখেছিল, আসলে তা ছিল তার নিজের এবং বন্ধুদের রক্ত।

মোহাম্মদ অল্প সময়ের মধ্যেই উপলব্ধি করেছে যে, তার আহত পা কেটে ফেলা হয়েছে। তার কাছে মনে হয়েছে সেখানেই জীবনের সমাপ্তি। আগে সে যেই মানুষ ছিল, এখন থেকে তা থাকবে না। ইজরায়েলি সৈন্যদের বোমা হামলায় তিনজন সহকর্মী এবং একজন ক্যামেরাম্যান আহত হয়েছে। একটা বাচ্চা ছেলে ও একটা বাচ্চা মেয়ের বাবা হোশাম আল-খোলি তার ডান পা হারিয়েছে। অন্যদিকে বাহা আল-তৌলি তার উভয় পা হারিয়েছে। মোহাম্মদের স্বীকার করতেই হবে যে, সে এখন থেকে একজন প্রতিবন্ধি ছাড়া আর কিছুই নয়। লোকজন করুণার দৃষ্টিতে দেখবে এবং তারপর সহানুভূতির সঙ্গে মিষ্টি কথা বলবে। এটা সে পছন্দ করেনি। সে এই জীবন চায়নি।

আমার মনে আছে, আমাদের বড় বোন হাসপাতালে মোহাম্মদের বিছানার পাশে বসেছিলেন। তিনি মোহাম্মদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলেন আর দোয়া করছিলেন যেন সে তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠে। একমাত্র মোহাম্মদের বিড়াল তার মুখে হাসি ফোটাতে পেরেছিল। আমার ভাই বিড়াল অত্যন্ত ভালোবাসে এবং সে তার বিড়ালকে হাসপাতালে নিয়ে আসার জন্য বলেছিল। টমটম তাকে কয়েক বার দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিল।

হাসপাতালে ঔষধপত্রের স্বল্পতা এবং আহত অনেক লোকের আগমনের জন্য মোহাম্মদের যে ধরনের চিকিৎসার প্রয়োজন ছিল, তা সে পায়নি। তাই তাকে অন্যত্র মিশরীয় এক হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল। ‘অপারেশন কাস্ট লীড’-এর সময়ে ফিলিস্তিনি আহতদের জন্য রাফাহর সীমান্ত খোলা ছিল। সেখানে সে চার মাস কাটিয়েছে। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার সময় কর্তৃপক্ষ উপহার হিসেবে তাকে একটা কৃত্রিম পা দিয়েছে। আমি কখনই তাকে সেই কৃত্রিম পা ব্যবহার করতে দেখিনি। বরং সে ক্রাচ ব্যবহার করেছে।

মোহাম্মদ যখন বাড়ি ফিরে আসে, তখন সে বারবার নিজেকে জিজ্ঞেস করেছে কেন ইজরায়েলিরা তাকে হত্যা করেনি এবং কেন সবকিছু শেষ করে দেয়নি। কিন্তু তারপর তার মনে পড়ে সেই মুহূর্তের কথা, যখন সে তার পা হাতে বহন করেছে। মানুষের জীবন বাঁচানোর চেষ্টার জন্য সে মোটেও অনুতপ্ত নয়।

আমার ভাই সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, ইজরায়েলিরা তার সঙ্গে যাই করুক না কেন, সে মোহাম্মদ হিসেবে বেঁচে থাকবে। সে সিভিল ডিফেন্স ডিপার্টমেন্টে যোগ দিতে চায়, কিন্তু কর্তৃপক্ষ তাকে যোগ্য হিসেবে গণনা করেনি। তার মনের জোর নিয়ে কোনো অসুবিধা নেই, তারপরও কর্তৃপক্ষ তাকে আগের চাকরিতে ফিরে যেতে দেয়নি।

মোহাম্মদ অল্প সময়ের মধ্যে সোফা বানানোর কাজ শেখার জন্য ছয় মাসের কোর্সে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়। সে সুযোগটা হাতছাড়া করেনি, বরং রীতিমতো লুফে নিয়েছে। সে তার জীবন থেকে ‘প্রতিবন্ধি’ শব্দটি মুছে ফেলতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল। দর্জির কাজে সে তার দক্ষতা ব্যবহার করে এবং সে তার ছোট বাড়িতে সোফা তৈরি করতে শুরু করেছিল। সবাই তার কাজ পছন্দ করতো। জীবনে প্রথমবারের মতো আমার বাবা মোহাম্মদের জন্য গর্ব অনুভব করেন। মনে হচ্ছে যে, আমার বাবা সত্যিই তার ছেলের কাছ থেকে একটা জিনিসই চেয়েছিলেন এবং তা ছিল স্বপ্নদ্রষ্টা, বিশ্বাসী আর একজন অর্জনকারী। মোহাম্মদ এখন গাজার একটি বড় আসবাবপত্র কোম্পানিতে কাজ করে। অবশ্যই নিজে একটি কোম্পানি স্থাপন করা মোহাম্মদের আরেকটি স্বপ্ন।

এত বড় আঘাত সত্ত্বেও এবং মোহাম্মদ যেই বিপদের পর বেঁচে আছে, সে এখনো একজন মানুষ।

এবং হ্যাঁ, তার এক মাথা, এক পা আর দুই হাত আছে।

তার মুখে হাসি ফুটে ওঠে

লোকটি এদিক-ওদিক ইতস্তত ঘুরে বেডাচ্ছিল। হঠাৎ সে এক বয়স্কা মহিলার সামনে থামে। খুব সকাল থেকে মহিলাটি বিক্রি করার উদ্দেশ্য কিছু স্ট্রবেরি নিয়ে রাস্তার পাশে বসে ছিলেন। লোকটি তাকে অভিবাদন জানায় এবং তারপর জিজ্ঞেস করে যে, বৃদ্ধা যেখানে বসে বিক্রি করছেন, আগে সেখানে এক যুবক বিক্রি করতো, তাকে তিনি চেনেন কিনা। বয়স্কা মহিলা লোকটির কাছে যুবকের বর্ণনা চেয়েছেন। সে দ্বিধা করেনি এবং যুবকের বর্ণনা দেওয়ার চেষ্টা করে। লোকটি বলেছে, কয়েক মাস আগে সে একজন সাধারণ মানুষকে চিনতো। মার্জিত যুবকের কথা বলতে গিয়ে লোকটি আরো বলেছে যে, জেরুজালেমে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইজরায়েলি হয়রানি নিয়ে গবেষণার সময় যুবকটি তাকে সাহায্য করেছিল। বৃদ্ধাকে সে যুবকের উজ্জ্বল চোখের কথা বলেছে, যা সে ভুলতে পারবে না এবং যুবকটির হাসি একবারের জন্যও তার মন থেকে চলে যায়নি। লোকটির উল্টোপাল্টা আরবি ভাষায় কথা বলা বয়স্কা মহিলাকে একটা ধারণা দেয়।

বয়স্কা মহিলা লোকটির কথা থামিয়ে দেয়। তারপর তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনি কী আবু সামেদের কথা বলছেন?’

‘আবু সামেদ, হ্যাঁ, তা ছিল তার ডাকনাম’, জবাবে লোকটি বললো।

বৃদ্ধা মহিলার মুখে হাসি ফুটে ওঠে। তিনি বললেন, ‘দখলকারীরা তাকে হত্যা করেছে।’

***

[পাদটীকা: মূল গল্পে ‘অপারেশন কাস্ট লীড’-এর ব্যাখ্যা নেই, কিন্তু পাঠক/পাঠিকাদের সুবিধার্থে দেওয়া হলো- অনুবাদক।

‘অপারেশন কাস্ট লীড’, যা ‘গাজা গণহত্যা’ নামে পরিচিত, গাজা ভূখণ্ডে (স্ট্রিপে) ফিলিস্তিনি আধা-সামরিক বাহিনী এবং ইজরায়েল প্রতিরক্ষা বাহিনীর মধ্যে তিন সপ্তাহ (২৭ ডিসেম্বর ২০০৮ থেকে ১৮ জানুয়ারি ২০০৯) সশস্ত্র যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। ইজরায়েলি এবং ফিলিস্তিনিদের মধ্যে সেই সামরিক হামলার হিং¯্রতা নজিরবিহীন এবং প্রায় ১৪০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছ, যাদের বেশিরভাগই ছিল বেসামরিক নাগরিক।]

লেখক পরিচিতি: ফিলিস্তিনের নতুন প্রজন্মের প্রতিভাবান ছোটগল্প লেখক, সম্পাদক এবং ফ্রিল্যান্স অনুবাদক আলম জেদানের জন্ম গাজার জাবালইয়া শরণার্থী শিবিরে, ১৯৯০ সালে। তাঁর আসল নিবাস আল-মাসমিয়া আল-কাবিরাহ গ্রামে। তিনি ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব গাজা থেকে পেশাদারী অনুবাদে উচ্চতর ডিপ্লোমা এবং আরবী ভাষায় ব্যাচেলার ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি আরবি, ইংরেজি এবং হিব্রু ভাষায় পারদর্শী। তাঁর একাধিক গল্প ‘We Are Not Numbers’ ওয়েবসাইটে (https://wearenotnumbers.org) প্রকাশিত হয়েছে।

গল্পসূত্র: ‘সে তার পা হাতে বহন করেছে’ গল্পটি আলম জেদানের ইংরেজিতে ‘হি ক্যারিড হিজ লেগ ইন হিজ হ্যান্ড’ এবং ‘তার মুখে হাসি ফুটে ওঠে’ ইংরেজিতে ‘স্মাইল অন’ গল্পের অনুবাদ। গল্প দুটি ‘We Are Not Numbers’ ওয়েবসাইটে (https://wearenotnumbers.org) (৭ জুন ২০১৫ এবং ২৬ জুন ২০১৪) প্রকাশিত হয় এবং সেখান থেকে নেওয়া হয়েছে।