একজন ইংরেজ সাংবাদিকের বর্ণনায় গান্ধী হত্যার ঘটনা

ভারত বিভক্তি বা ভারত স্বাধীন হওয়ার মাত্র সাড়ে ৫ মাস পর মহাত্মা গান্ধীকে জীবন দিতে হয়েছিল একজন উগ্র ধর্মান্ধের হাতে।

ভারত বিভক্তির পর ভারতের কাছে পাকিস্তানের প্রাপ্য ছিল ৫৫ কোটি টাকা। এই টাকা প্রদানে গড়িমসি করায় মহাত্মা গান্ধী ক্ষুব্ধ হন ভারতের নতুন সরকারের ওপর। এছাড়া পাকিস্তান থেকে যেসব শরণার্থী ভারতে চলে আসে তারা দিল্লির শতাধিক মসজিদে আশ্রয় নেয়। গান্ধীজী মসজিদগুলো থেকে শরণার্থীদের অন্যত্র স্থানান্তর করে মসজিদ খালি করার দাবিও করেন। এসব দাবি পূরণ না হওয়ায় তিনি অনশন শুরু করেন। তার এই অনশনের বিপক্ষে দিল্লিতে উগ্র হিন্দুদের একটি দল এবং শিখরা মিছিলও করে। রাজেন্দ্র প্রসাদ এবং মাওলানা আবুল কালাম আজাদের মধ্যস্থতায় সরকার একটি কমিটি করে দেওয়ার পর গান্ধীজী অনশন ভঙ্গ করেন। ১২২ ঘণ্টার অনশনে গান্ধীর দুর্বল শরীর ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছিল। ২০ জানুয়ারি অনশনের পর গান্ধীর প্রার্থনাসভায় একটি বোমা বিস্ফোরিত হয়। তবে বোমায় কেউ হতাহত হননি।

এ ঘটনার ১০ দিন পর ৩০ জানুয়ারি গান্ধী আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। তখন ভারতের গভর্নর জেনারেল মাউন্টব্যাটেন। লর্ড মাউন্টব্যাটেনের প্রেস সেক্রেটারি অ্যালান ক্যাম্বেল জনসন এ ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে (সূত্র : Mission with Mountbatten) : ৬টা বাজতে তখন মাত্র ১০ মিনিট বাকি, এ কী সংবাদ শুনতে পেলাম। এক দৌড়ে গিয়ে মাউন্টব্যাটেনের ডেপুটি প্রাইভেট সেক্রেটারি জর্জ নিকলসের ঘরে ঢুকলাম। নিকলস বললেন, গান্ধীকে হত্যা করার জন্য একটা চেষ্টা হয়েছে। গান্ধীর শরীরের তিন স্থানে গুলির আঘাত লেগেছে।

আধ ঘণ্টা পরে মাউন্টব্যাটেনের গাড়ির ড্রাইভার পিয়ার্স বললেন- গান্ধী আর নেই, গান্ধী মারা গেছেন।

পিয়ার্স তার গাড়িতে রেডিও থেকে এই সংবাদ শুনতে পেয়েছেন। পিয়ার্স বললেন, হিজ এক্সেলেন্সি এক্ষুণি বিড়লা হাউসে যাবেন।

মাউন্টব্যাটেনের গাড়ির কাছে গিয়ে আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। ঘরের ভিতর থেকে মাউন্টব্যাটেন বের হয়েই আমাকে দেখতে পেয়ে ইশারায় জানালেন আপনিও চলুন। মাউন্টব্যাটেনের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, মুখের ভাব অত্যন্ত গম্ভীর ও কঠিন। বেশি কথা বলছিলেন না মাউন্টব্যাটেন এবং যা বলছিলেন তার ভাষাও কেমন যেন কাটা কাটা ও খাপছাড়া।

মাউন্টব্যাটেন বললেন, এইমাত্র কলকাতা থেকে রাজগোপালাচারী টেলিফোন করেছিলেন। নেহরুর নিরাপত্তার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা অবলম্বনের প্রয়োজনীয়তা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন রাজগোপালাচারী। মাত্র দু’দিন আগে অমৃতসরে এক জনসভায় নেহরু যখন বক্তৃতা করছিলেন তখন দুটো লোককে সভার মধ্যেই গ্রেফতার করা হয়। লোক দুটোর সঙ্গে হাতবোমা ছিল।

বিড়লা ভবনে পৌঁছলাম। ভবনের সম্মুখে ভিড় জমে রয়েছে। জনতা আমাদের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছিলকে এরা? জনতার ভিতর দু’একজন ছাড়া এ অন্ধকারে মাউন্টব্যাটেনকে কেউ চিনতে পারল না। জনতার মধ্যে ভয়ানক একটা উতলা ভাব ও অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। জনতার পর জনতা স্রোতের মতো এসে বিড়লা ভবনের উপর যেন আছড়ে পড়ছে। বিড়লা ভবনের দেয়ালের গায়ে কয়েকটি জানালার দিকেই সমগ্র জনতার সমগ্র দৃষ্টি নিবন্ধ।

বিড়লা ভবনের নিচের তলায় একটি কক্ষের অভ্যন্তরে ভারতের সকল মন্ত্রী এবং বিশিষ্ট কংগ্রেস নেতারা সবাই দাঁড়িয়ে রয়েছেন। নিষ্পলক তাদের চোখের দৃষ্টি। বেদনার আঘাতে যেন স্তব্ধ হয়ে গেছেন তারা।

আমরা এগিয়ে গিয়ে গান্ধীর শয়নকক্ষের ভিতরে ধীরে ধীরে প্রবেশ করলাম। দেখলাম জনা চল্লিশ ব্যক্তি এই ঘরের ভিতর রয়েছেন। তার মধ্যে রয়েছেন নেহরু ও প্যাটেল। প্রত্যেকের চোখে জল। ঘরে ধূপের গন্ধ।

ঘরের এককোণে গান্ধীর দেহ পড়ে রয়েছে। দশ-বারোজন মহিলা গান্ধীর মৃতদেহের কাছে বসে রয়েছেন। এদের মধ্যে একজন মহিলা গান্ধীর মাথার নিচে হাত দিয়ে গান্ধীর মুখ একটু উঁচু করে তুলে ধরে রেখেছেন। বড় একটা কম্বলে গান্ধীর দেহ আবৃত। মহিলাদের মধ্যে কয়েকজন আস্তে আস্তে স্তোত্র আবৃত্তি করছিলেন এবং কেউ কেউ ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন।

যেন পরম শান্তির মধ্যে ডুবে রয়েছে গান্ধীর মুখ। ওই মুখের উপর এখন আর সেই সাদা ইস্পাতের ফ্রেমের চশমাটি নেই, যে বহু ব্যবহৃত পুরনো চশমাটি গান্ধীর চোখ মুখের প্রায় অঙ্গীভূত হয়েই গিয়েছিল। বাতাসে ধূপের গন্ধ, মেয়েদের করুণ কন্ঠস্বরের কান্না ও প্রার্থনা, বৃদ্ধ মহাত্মার ক্ষুদ্র শীর্ণ ও নিষ্প্রাণ দেহ অথচ ঘুমন্ত মানুষের মুখের মতো শান্ত একটি মুখ এবং এতগুলি নীরব নরনারীর নিষ্পন্ন দৃষ্টি মনের সব অনুভূতি মুহ্যমান করে দেওয়ার মতো এমন বেদনাভিভূত মুহূর্ত আমার জীবনে আর কখনো দেখা যায়নি। মনের এমন আবেগ-ব্যাকুল অবস্থাও আমার জীবনে খুব কমই ঘটেছে।

গান্ধীর দেহের নিকট দাঁড়িয়ে থেকে আমরা আমাদের নীরব শ্রদ্ধা নিবেদন করলাম। তারপর এ ঘর থেকে চলে গিয়ে বড় হলঘরের ভিতরে ঢুকলাম। সন্ধ্যা যত গভীর হচ্ছে ভিড় ততই বেড়ে উঠছে। জানালার উপর শত শত মুখ এসে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। বন্ধ জানালাগুলোর শার্শি অনবরত ঝনঝন করে বাজছিল জনতার ব্যাকুল করাঘাতে। ভারত গভর্নমেন্টের মন্ত্রীরা অন্য একটি কক্ষে বসে রয়েছেন। মন্ত্রীদের সঙ্গে আলোচনার জন্য হলঘর থেকে মাউন্টব্যাটেন এবার সেই কক্ষে গিয়ে প্রবেশ করলেন।

আমি চুপ করে শুনছি। মাউন্টব্যাটেন বলছেন- ‘গান্ধীর সঙ্গে আমার শেষ সাক্ষাতের সময় গান্ধী আমাকে বলেছিলেন যে, নেহরু এবং প্যাটেলের মধ্যে সম্পূর্ণ মিল করিয়ে দেওয়াই এখন তার মনের সবচেয়ে বড় সাধের ইচ্ছা।’

মাউন্টব্যাটেনের কথা শেষ হওয়া মাত্র নেহরু ও প্যাটেল দুজনেই হঠাৎ উঠে পরস্পরের দিকে এগিয়ে গেলেন এবং দুজনেই পরস্পরকে নিবিড়ভাবে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।

বিড়লা ভবনের কক্ষে সমবেত মন্ত্রীদের সঙ্গে কয়েক মিনিট আলোচনা করেই বের হয়ে এলেন মাউন্টব্যাটেন। মাউন্টব্যাটেন বললেন, প্যাটেলকেও রাজি করিয়েছি। আজ রাত্রে নেহরু ও প্যাটেল উভয়ে একই সময়ে বেতারে দেশবাসীর উদ্দেশে বলবেন। মাউন্টব্যাটেনের মতে, এই ব্যবস্থা করতে পেরে তিনি খুব বড় একটা সাফল্য লাভ করতে পেরেছেন। বর্তমান অবস্থায় রাজনৈতিক প্রয়োজনের দিক দিয়ে নেহরু ও প্যাটেলের এভাবে একসঙ্গে উদ্যোগী হওয়ার প্রমাণ দেশবাসীর সমক্ষে প্রচারিত করা জাতীয় ঐক্যের পক্ষে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মাউন্টব্যাটেন আবার বললেন, বর্তমান অবস্থার সব ঘটনা ও প্রতিক্রিয়াকে নেহরু যদি অবিলম্বে আয়ত্তের মধ্যে আনতে পারেন তবেই মঙ্গল। এ বিষয়ে নেহরুর সাফল্যের উপরেই ভবিষ্যতের সব কিছু নির্ভর করছে।

সর্বত্র লোকের মনের ভাব এই শোকের আঘাত সত্ত্বেও এমন এক উত্তেজনায় কম্পিত হচ্ছে যে, সামান্য একটি কথার ভুলে অথবা একটি গুজবে এ উত্তেজনা দাবাগ্নির মতো জ্বলে উঠে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। কিছুক্ষণ আগে বিড়লা ভবনের সম্মুখে যখন আমরা ছিলাম তখনই ভিড়ের ভেতর থেকে একটা গুজববাজ লোক মাউন্টব্যাটেনের কাছে এসে বলে উঠল- একটা মুসলমান এ কাণ্ড করেছে। মাউন্টব্যাটেন এবং আমাদের মধ্যে কেউই তখনো জানতেন না যে কে হত্যা করেছে গান্ধীকে। হত্যাকারীর নাম কি? কোন ধর্মের লোক? এসব তখনো কিছুই আমরা শুনিনি। কিন্তু মাউন্টব্যাটেন এটা ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন যে, হত্যাকারী যদি মুসলমান হয় তবে এ ঘটনার ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া রোধ করার আশা আর নেই। সর্বনাশা গৃহযুদ্ধ নিরোধ করাও কিছুতেই সম্ভবপর হবে না। গুজববাজ লোকটার কথা শুনে মাউন্টব্যাটেন একটা বেপরোয়া আন্দাজের জোরে তৎক্ষণাৎ ধমক দিলেন- বেকুব কোথাকার। হত্যাকারী যে একজন হিন্দু এটুকুও এখনও শোননি?

কয়েক মিনিট পরে ভিপি মেননের কাছ থেকে আমি জানতে পারলাম যে, হত্যাকারী হলো জনৈক মারাঠা হিন্দু। গান্ধী যখন তার প্রার্থনা সভার দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন, তখনই খুব নিকটবর্তী স্থান থেকে হত্যাকারী তার ওপর তিনবার গুলি নিক্ষেপ করেছে। ডাক্তার ভদ্রলোকের সঙ্গেও আমি আলাপ করলাম। গান্ধীর অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত এ ডাক্তার গান্ধীকে ওষুধ দিয়ে রক্ষা করার চেষ্টা করেছেন। ডাক্তার অভিযোগ করলেন, বিড়লা ভবনে প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র কিছুই ছিল না। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর মাত্র কয়েক মুহূর্ত গান্ধী বেঁচে ছিলেন। সামান্য একটু জল পান করতে পেরেছিলেন গান্ধী এবং তার পরেই চেতনা হারিয়ে ফেলেন। সে চেতনা আর ফিরে এলো না।

গান্ধীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার কথা নিয়ে অনেক কথা উঠল এবং আলোচনা হলো। প্যারেলাল বললেন- ‘গান্ধীর মরদেহ কোন রকম রাসায়নিক ব্যবস্থার দ্বারা দর্শনীয় বস্তুর মতো রক্ষা করা উচিত হবে না কারণ স্বয়ং গান্ধীই এ কাজ করতে ¯পষ্টভাবে নিষেধ করে গেছেন। গান্ধী পূর্বেই তার এ ইচ্ছা ঘোষণা করে দিয়েছিলেন যে, মৃত্যুর পর তার দেহ যেন বিশুদ্ধ হিন্দু প্রথা অনুযায়ী দাহ করা হয়।’

মাউন্টব্যাটেন ও নেহরু পরামর্শ করে এ সিদ্ধান্ত করলেন যে, আগামীকাল গান্ধীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হবে। কিন্তু এ অনুষ্ঠানে কল্পনাতীত জনসমাগম হবে, তার মধ্যে শৃঙ্খলা ও সুব্যবস্থা অক্ষুণœ রাখা একা দিল্লির বেসামরিক কর্তৃপক্ষের শক্তিতে সম্ভবপর হবে না। দেশরক্ষা বিভাগের ওপরেই কাজের ভার দেয়া হলো। দিল্লির এরিয়া কম্যান্ডার সব বিভাগের সৈন্য নিয়ে অন্ত্যেষ্টির শোভাযাত্রা নিয়ন্ত্রণ করবেন।

মহাত্মাকে শেষবারের মতো দেখার জন্য বিড়লা ভবনের ওপর এ সন্ধ্যাতেই জনতার অভিযান প্রবল হয়ে উঠতে দেখে আমি চিন্তিত হয়ে পড়লাম। জানালাগুলো জনতার চাপ সহ্য করতে না পেরে ভেঙে পড়বে বলেই মনে হচ্ছে। নেহরুকে এ আশঙ্কার কথাও বললাম।

নেহেরুর সে বিষণ্ণ ও বেদনাপীড়িত মূর্তির করুণতা বর্ণনা করা যায় না। অবসন্ন ও ক্লান্ত স্বরে তিনি আমার সঙ্গে কথা বললেন। কিন্তু বিস্মিত হয়ে দেখলাম, এ অবস্থার মধ্যেও তিনি কিভাবে নিজেকে সংযত করে রেখেছেন। নেহরু বললেন- সব ব্যবস্থা করা হচ্ছে। গান্ধীর দেহ আজ রাত্রের মতো ঘরের বাইরে নিয়ে এসে একটা উঁচু স্থানে রাখা হবে, যার ফলে জনতা একটা লাইন ধরে শৃঙ্খলার সঙ্গে এগিয়ে এসে মহাত্মার শেষ দর্শন লাভ করে চলে যেতে পারবে।

বাইরের জনতা অস্থির হয়ে উঠছিল। মহাত্মার দর্শন লাভের জন্য জনতার চিৎকারও বাড়ছিল। নেহরু ঘরের ভেতর থেকে বের হয়ে সোজা সেই জনতার মধ্যে গিয়ে দাঁড়ালেন। নেহরুর সঙ্গে যে কোন দেহরক্ষী নেই, একথা ভুলেও একবার মনে হলো না নেহরুর। জনতার সঙ্গে কথা বলে নেহরু আবার ফিরে এলেন।

রাত্রি ৮টার সময় আমরা বিড়লা ভবন ছেড়ে গভর্নমেন্ট হাউজে ফিরে এলাম। দেবদাস গান্ধী এবং মৌলানা আজাদকেও সঙ্গে নিয়ে এলেন মাউন্টব্যাটেন।

দেবদাস বললেন-পাগলের কা-। পাগল ছাড়া এমন কাজ কেউ করতে পারে না।

মাউন্টব্যাটেন বললেন- এটা যদি সত্যই পাগলের কা- হতো তবে আমি অন্তত বিন্দুমাত্র দুশ্চিন্তা করতাম না। কিন্তু এটা মোটেই পাগলের কা- নয়। যথেষ্ট পরিকল্পনা করে ষড়যন্ত্র করে এবং ব্যবস্থা করেই যে এ কা- করা হয়েছে তার প্রমাণ ও লক্ষণ খুব বেশি করেই দেখতে পাচ্ছি।

মৌলানা আজাদ ইংরেজিতে কথা বলেন না, যদিও তিনি ইংরেজি বলতে পারেন। মৌলানা নিঃশব্দে মাথা নেড়ে মাউন্টব্যাটেনের মন্তব্যই সমর্থন করলেন। গভর্নমেন্ট হাউজের এডিসি কক্ষে ফিরে এসে দেখতে পেলাম ভিপি মেনন কিংসলি মার্টিন এবং গর্ডন ওয়াকার বসে রয়েছেন। মাত্র গতকাল দিল্লি পৌঁছেছেন গর্ডন ওয়াকার। ভাবতে আরও কষ্ট হচ্ছে যে, আমি আজই সকালে প্যারেলালের সঙ্গে কথাবার্তা বলে গান্ধীর সঙ্গে গর্ডন ওয়াকারের একটা সাক্ষাতের ব্যবস্থা করেছি। আগামীকাল সন্ধ্যায় গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন বলে গর্ডন ওয়াকার প্রস্তুত হয়েছিলেন। হঠাৎ জামসাহেব ঘরে ঢুকলেন। জামসাহেব বললেন, আজ সন্ধ্যা ৬টার সময় গান্ধীর সঙ্গে তার সাক্ষাৎ করার কথা ছিল এবং শুধু এই উদ্দেশ্যেই তিনি আজ বিমানে দিল্লিতে এসে পৌঁছেছেন।

পরদিন শনিবার ৩১ জানুয়ারি বিড়লা ভবন থেকে যমুনার রাজঘাট-ছয় মাইল দীর্ঘ পথ। জল, স্থল ও বিমানবাহিনীর সৈনিকরা পথের স্থানে স্থানে ডিউটি নিয়ে দাঁড়িয়েছে।

একটি উদ্বেগের ভার আমাদের চিন্তা থেকে নেমে গেছে কারণ হত্যাকারীর নাম ও পরিচয় জানতে পেরেছি। হত্যাকা-ের পর অল্পক্ষণের মধ্যেই এ তথ্য অতি দ্রুত ঘোষণা করে দেওয়া হয়েছে যে, হত্যাকারী হলো হিন্দু মহাসভার জনৈক মারাঠা সদস্য, নাম নাথুরাম গডেস।

আজ আবার বিড়লা ভবনের সম্মুখে আমরা উপস্থিত হলাম। গত রাত্রের জনতার তুলনায় অনেক বড় এক জনতার চাপে আমাদের পথ পাওয়া দুরূহ হয়ে উঠল। দেখলাম, মহাত্মার শবাধার পুষ্প ও কংগ্রেস পতাকায় আবৃত করা হয়েছে। একটি গাড়ির ওপর শবাধার রাখা হয়েছে। একদল ভারতীয় নৌ সৈনিক গাড়ি ঠেলে নিয়ে চলল। গভর্নর জেনারেলের বডিগার্ড দল চলল আগে আগে। সঙ্গে সঙ্গে শাবানুগামী জনতা যার মধ্যে মন্ত্রী ও সেনাপতির দল ভারতের দীনতম সাধারণ মানুষের সঙ্গে ঠেলাঠেলি করে জায়গা নেয়ার চেষ্টা করছেন যাতে মহাত্মার মুখ আর একবার ভালো করে দেখে নেওয়া যায়। ভারতীয় মহাত্মার শবাধারের সঙ্গে, সম্মুখে ও পেছনে চলেছে সৈনিকের দল। তা ছাড়া গান্ধীরই বহু সংগ্রামে যে সৈন্যদল তার সঙ্গে চিরকাল কাজ করেছে, সেই ‘চার-আনা’ কংগ্রেসীও হাজারে হাজারে চলেছেন।

গান্ধীর মৃত্যুতে প্যাটেলের যে ব্যক্তিগত ক্ষতি হয়ে গেল, সে কথা ছেড়ে দেই। এই ঘটনা প্যাটেলের মনের ওপর যে বিশেষ আঘাত এবং খুবই কঠোর আঘাত দিয়েছে সেই কথাই ভাবছি। এরকম হওয়ার বিশেষ কতকগুলো কারণও রয়েছে। প্রথমত, গান্ধীর সঙ্গে প্যাটেলের বনিবনা যে হচ্ছে না, এ খবর কিছুদিন থেকে প্রায়ই শোনা যাচ্ছিল। দ্বিতীয়ত, প্যাটেলই হলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থার কর্তৃত্ব তারই হাতে। সুতরাং গান্ধীর নিরাপত্তার জন্য তিনিই সরকারিভাবে দায়ী। এটা অবশ্য সত্য যে, দশ দিন আগে প্রার্থনা সভায় বোমা বিস্ফোরিত হওয়ার পরেও গান্ধী নিজেই বিশেষভাবে এবং সুস্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, তাকে রক্ষা করার জন্য কোন পুলিশ নিযুক্ত করতে হবে না। কিন্তু এটাও স্পষ্ট করেই বোঝা যাচ্ছে যে, দশ দিন আগের বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা লক্ষ্য করেও পুলিশ এ দশ দিনের মধ্যে অপরাধীদের সন্ধান করে ধরে ফেলতে পারেনি। নেতাদের মধ্যে প্যাটেলের সঙ্গেই গান্ধীর শেষ দেখা ও আলাপ হয়েছে। সেদিন অপরাহ্ণে প্যাটেলেরই সঙ্গে কথা বলতে বলতে কয়েক মিনিট দেরি হয়ে গিয়েছিল গান্ধীর। প্যাটেলকে বিদায় দিয়ে তাড়াতাড়ি প্রার্থণাসভার কাছে যেই মাত্র এগিয়ে এলেন গান্ধী তখনি হত্যাকারী তার পথরোধ করে দাঁড়াল। সুতরাং এটা খুবই স্বাভাবিক যে এ ঘটনায় প্যাটেলেরই মন সব চেয়ে বেশি যন্ত্রণায় পরে যাচ্ছে। গান্ধীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য নানারকম উদ্যোগে, ব্যবস্থায় ও আয়োজনে মাউন্টব্যাটেন এবং নেহরু তবুও ঘুরেফিরে কাজ করতে পারছেন কিন্তু প্যাটেল যেন একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেছেন। বিড়লা ভবন থেকে রাজঘাট পর্যন্ত দীর্ঘ ছয় মাইল পথ শবাধারের সঙ্গে সঙ্গে চললেন প্যাটেল। প্যাটেলের বয়সও বাহাত্তর বছর পার হতে চলেছে এবং সেই বয়সের এক বৃদ্ধের পক্ষে এতটা শারীরিক ক্লেশ ও কষ্ট আজ গ্রহণ করতে চাইছেন।

১১টা বেজে গিয়েছে, ধীরে ধীরে গান্ধীর শবাধার এগিয়ে চলেছে। জনতার শেষ নেই। গভর্নমেন্ট হাউজের কাছে এসে আমরা এ দৃশ্য ভালো করে দেখবার জন্য দরবার হলের গম্বুজের ওপর উঠে দাঁড়ালাম। দেখলাম এখান থেকে প্রায় দু’মাইল দূরে গান্ধীর শবাধার জনসমুদ্রের তরঙ্গে ধীরে ধীরে ভেসে চলেছে। আমাদের সম্মুখের এ সুদীর্ঘ ও সুপ্রশস্ত সড়কের নাম কিংসওয়ে। এই ‘রাজার সড়ক’ ধরে চলে যাচ্ছেন সেই গান্ধী, যিনি সত্যিই রাজা ছিলেন না। যাচ্ছেন সেই গান্ধী, যিনি এই পথ থেকে ব্রিটিশরাজকে সরিয়ে দিয়েছেন। ব্রিটিশরাজকে অপসারিত করে স্বরাজ প্রতিষ্ঠার জন্য যিনি সবচেয়ে বেশি চেষ্টা করেছেন, সেই মানুষটাই এ রাজার সড়কে শেষ দর্শন দিয়ে চলে যাচ্ছেন। সেই মানুষটিই আজ তার মৃত্যুতে যে বিরাট শ্রদ্ধার ঐশ্বর্য তার সঙ্গে নিয়ে চলেছেন সে শ্রদ্ধা এ রাজার সড়কে ভ্রমণকারী কোন ভাইসরয়ের স্বপ্নেরও অগোচর ছিল।

যমুনার ঘাটে পৌঁছলাম। গভর্নর-জেনারেলের সঙ্গে সব সমেত আমরা বিশজন এগিয়ে চললাম। আমাদের পেছনে পাঁচ লাখ লোকের ভিড়। সম্মুখে ও পার্শ্বে ভিড় যেন আকাশপ্রান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে। একটি ক্ষুদ্র ইটনির্মিত বেদিকার ওপর কাষ্ঠখ-ে সজ্জিত চিতার কাছাকাছি গিয়ে আমরা দাঁড়ালাম। পেছন থেকে পাঁচ লাখ লোকের ভিড় আমাদের ওপর প্রপাতের মতো এসে পড়ছে।

তবুও চিতা লক্ষ্য করে চারদিক থেকে জনতার পর জনতা এগিয়ে আসতে আরম্ভ করল। এখন এ জায়গায় কম করেও সাত লাখ লোক হবে। রাজনীতিক নেতা ও মেথর, গভর্নর ও চাষি নারী- প্রত্যেকেই ফুল দেয়ার জন্য ঠেলাঠেলি করে এগিয়ে আসার চেষ্টা করছে।

চিতামে অগ্নিশিখা দেখা দিল। সঙ্গে সঙ্গে বাতাস কাঁপিয়ে লাখো কণ্ঠে একটি বিরাট ও গম্ভীর বাণী ধ্বনিত হলো- ‘গান্ধী অমর’।

মাউন্টব্যাটেনের নির্দেশে আমরা সেখানেই ধুলোর ওপর বসে পড়লাম। মাউন্টব্যাটেনও বসে পড়লেন। পেছনের বিরাট জনতাকে থামিয়ে রাখার অথবা বসিয়ে দেয়ার জন্যই মাউন্টব্যাটেন এ কাজটি করলেন। আর একটা কারণও ছিল। যদি মাউন্টব্যাটেন এবং আমরা বসে না পড়তাম তবে পিছনের জনতার সম্মুখে এগিয়ে আসার প্রবল উৎসাহের একটি ধাক্কায় আমরা জ্বলন্ত চিতার অগ্নিশিখার মধ্যে অবশ্যই নিক্ষিপ্ত হতাম।

[ লেখক : সাংবাদিক কলামিস্ট ]

hrahman.swapon@gmail.com

শনিবার, ৩০ জানুয়ারী ২০২১ , ১৬ মাঘ ১৪২৭, ১৬ জমাদিউস সানি ১৪৪২

একজন ইংরেজ সাংবাদিকের বর্ণনায় গান্ধী হত্যার ঘটনা

হাবিবুর রহমান স্বপন

ভারত বিভক্তি বা ভারত স্বাধীন হওয়ার মাত্র সাড়ে ৫ মাস পর মহাত্মা গান্ধীকে জীবন দিতে হয়েছিল একজন উগ্র ধর্মান্ধের হাতে।

ভারত বিভক্তির পর ভারতের কাছে পাকিস্তানের প্রাপ্য ছিল ৫৫ কোটি টাকা। এই টাকা প্রদানে গড়িমসি করায় মহাত্মা গান্ধী ক্ষুব্ধ হন ভারতের নতুন সরকারের ওপর। এছাড়া পাকিস্তান থেকে যেসব শরণার্থী ভারতে চলে আসে তারা দিল্লির শতাধিক মসজিদে আশ্রয় নেয়। গান্ধীজী মসজিদগুলো থেকে শরণার্থীদের অন্যত্র স্থানান্তর করে মসজিদ খালি করার দাবিও করেন। এসব দাবি পূরণ না হওয়ায় তিনি অনশন শুরু করেন। তার এই অনশনের বিপক্ষে দিল্লিতে উগ্র হিন্দুদের একটি দল এবং শিখরা মিছিলও করে। রাজেন্দ্র প্রসাদ এবং মাওলানা আবুল কালাম আজাদের মধ্যস্থতায় সরকার একটি কমিটি করে দেওয়ার পর গান্ধীজী অনশন ভঙ্গ করেন। ১২২ ঘণ্টার অনশনে গান্ধীর দুর্বল শরীর ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছিল। ২০ জানুয়ারি অনশনের পর গান্ধীর প্রার্থনাসভায় একটি বোমা বিস্ফোরিত হয়। তবে বোমায় কেউ হতাহত হননি।

এ ঘটনার ১০ দিন পর ৩০ জানুয়ারি গান্ধী আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। তখন ভারতের গভর্নর জেনারেল মাউন্টব্যাটেন। লর্ড মাউন্টব্যাটেনের প্রেস সেক্রেটারি অ্যালান ক্যাম্বেল জনসন এ ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে (সূত্র : Mission with Mountbatten) : ৬টা বাজতে তখন মাত্র ১০ মিনিট বাকি, এ কী সংবাদ শুনতে পেলাম। এক দৌড়ে গিয়ে মাউন্টব্যাটেনের ডেপুটি প্রাইভেট সেক্রেটারি জর্জ নিকলসের ঘরে ঢুকলাম। নিকলস বললেন, গান্ধীকে হত্যা করার জন্য একটা চেষ্টা হয়েছে। গান্ধীর শরীরের তিন স্থানে গুলির আঘাত লেগেছে।

আধ ঘণ্টা পরে মাউন্টব্যাটেনের গাড়ির ড্রাইভার পিয়ার্স বললেন- গান্ধী আর নেই, গান্ধী মারা গেছেন।

পিয়ার্স তার গাড়িতে রেডিও থেকে এই সংবাদ শুনতে পেয়েছেন। পিয়ার্স বললেন, হিজ এক্সেলেন্সি এক্ষুণি বিড়লা হাউসে যাবেন।

মাউন্টব্যাটেনের গাড়ির কাছে গিয়ে আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। ঘরের ভিতর থেকে মাউন্টব্যাটেন বের হয়েই আমাকে দেখতে পেয়ে ইশারায় জানালেন আপনিও চলুন। মাউন্টব্যাটেনের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, মুখের ভাব অত্যন্ত গম্ভীর ও কঠিন। বেশি কথা বলছিলেন না মাউন্টব্যাটেন এবং যা বলছিলেন তার ভাষাও কেমন যেন কাটা কাটা ও খাপছাড়া।

মাউন্টব্যাটেন বললেন, এইমাত্র কলকাতা থেকে রাজগোপালাচারী টেলিফোন করেছিলেন। নেহরুর নিরাপত্তার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা অবলম্বনের প্রয়োজনীয়তা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন রাজগোপালাচারী। মাত্র দু’দিন আগে অমৃতসরে এক জনসভায় নেহরু যখন বক্তৃতা করছিলেন তখন দুটো লোককে সভার মধ্যেই গ্রেফতার করা হয়। লোক দুটোর সঙ্গে হাতবোমা ছিল।

বিড়লা ভবনে পৌঁছলাম। ভবনের সম্মুখে ভিড় জমে রয়েছে। জনতা আমাদের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছিলকে এরা? জনতার ভিতর দু’একজন ছাড়া এ অন্ধকারে মাউন্টব্যাটেনকে কেউ চিনতে পারল না। জনতার মধ্যে ভয়ানক একটা উতলা ভাব ও অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। জনতার পর জনতা স্রোতের মতো এসে বিড়লা ভবনের উপর যেন আছড়ে পড়ছে। বিড়লা ভবনের দেয়ালের গায়ে কয়েকটি জানালার দিকেই সমগ্র জনতার সমগ্র দৃষ্টি নিবন্ধ।

বিড়লা ভবনের নিচের তলায় একটি কক্ষের অভ্যন্তরে ভারতের সকল মন্ত্রী এবং বিশিষ্ট কংগ্রেস নেতারা সবাই দাঁড়িয়ে রয়েছেন। নিষ্পলক তাদের চোখের দৃষ্টি। বেদনার আঘাতে যেন স্তব্ধ হয়ে গেছেন তারা।

আমরা এগিয়ে গিয়ে গান্ধীর শয়নকক্ষের ভিতরে ধীরে ধীরে প্রবেশ করলাম। দেখলাম জনা চল্লিশ ব্যক্তি এই ঘরের ভিতর রয়েছেন। তার মধ্যে রয়েছেন নেহরু ও প্যাটেল। প্রত্যেকের চোখে জল। ঘরে ধূপের গন্ধ।

ঘরের এককোণে গান্ধীর দেহ পড়ে রয়েছে। দশ-বারোজন মহিলা গান্ধীর মৃতদেহের কাছে বসে রয়েছেন। এদের মধ্যে একজন মহিলা গান্ধীর মাথার নিচে হাত দিয়ে গান্ধীর মুখ একটু উঁচু করে তুলে ধরে রেখেছেন। বড় একটা কম্বলে গান্ধীর দেহ আবৃত। মহিলাদের মধ্যে কয়েকজন আস্তে আস্তে স্তোত্র আবৃত্তি করছিলেন এবং কেউ কেউ ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন।

যেন পরম শান্তির মধ্যে ডুবে রয়েছে গান্ধীর মুখ। ওই মুখের উপর এখন আর সেই সাদা ইস্পাতের ফ্রেমের চশমাটি নেই, যে বহু ব্যবহৃত পুরনো চশমাটি গান্ধীর চোখ মুখের প্রায় অঙ্গীভূত হয়েই গিয়েছিল। বাতাসে ধূপের গন্ধ, মেয়েদের করুণ কন্ঠস্বরের কান্না ও প্রার্থনা, বৃদ্ধ মহাত্মার ক্ষুদ্র শীর্ণ ও নিষ্প্রাণ দেহ অথচ ঘুমন্ত মানুষের মুখের মতো শান্ত একটি মুখ এবং এতগুলি নীরব নরনারীর নিষ্পন্ন দৃষ্টি মনের সব অনুভূতি মুহ্যমান করে দেওয়ার মতো এমন বেদনাভিভূত মুহূর্ত আমার জীবনে আর কখনো দেখা যায়নি। মনের এমন আবেগ-ব্যাকুল অবস্থাও আমার জীবনে খুব কমই ঘটেছে।

গান্ধীর দেহের নিকট দাঁড়িয়ে থেকে আমরা আমাদের নীরব শ্রদ্ধা নিবেদন করলাম। তারপর এ ঘর থেকে চলে গিয়ে বড় হলঘরের ভিতরে ঢুকলাম। সন্ধ্যা যত গভীর হচ্ছে ভিড় ততই বেড়ে উঠছে। জানালার উপর শত শত মুখ এসে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। বন্ধ জানালাগুলোর শার্শি অনবরত ঝনঝন করে বাজছিল জনতার ব্যাকুল করাঘাতে। ভারত গভর্নমেন্টের মন্ত্রীরা অন্য একটি কক্ষে বসে রয়েছেন। মন্ত্রীদের সঙ্গে আলোচনার জন্য হলঘর থেকে মাউন্টব্যাটেন এবার সেই কক্ষে গিয়ে প্রবেশ করলেন।

আমি চুপ করে শুনছি। মাউন্টব্যাটেন বলছেন- ‘গান্ধীর সঙ্গে আমার শেষ সাক্ষাতের সময় গান্ধী আমাকে বলেছিলেন যে, নেহরু এবং প্যাটেলের মধ্যে সম্পূর্ণ মিল করিয়ে দেওয়াই এখন তার মনের সবচেয়ে বড় সাধের ইচ্ছা।’

মাউন্টব্যাটেনের কথা শেষ হওয়া মাত্র নেহরু ও প্যাটেল দুজনেই হঠাৎ উঠে পরস্পরের দিকে এগিয়ে গেলেন এবং দুজনেই পরস্পরকে নিবিড়ভাবে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।

বিড়লা ভবনের কক্ষে সমবেত মন্ত্রীদের সঙ্গে কয়েক মিনিট আলোচনা করেই বের হয়ে এলেন মাউন্টব্যাটেন। মাউন্টব্যাটেন বললেন, প্যাটেলকেও রাজি করিয়েছি। আজ রাত্রে নেহরু ও প্যাটেল উভয়ে একই সময়ে বেতারে দেশবাসীর উদ্দেশে বলবেন। মাউন্টব্যাটেনের মতে, এই ব্যবস্থা করতে পেরে তিনি খুব বড় একটা সাফল্য লাভ করতে পেরেছেন। বর্তমান অবস্থায় রাজনৈতিক প্রয়োজনের দিক দিয়ে নেহরু ও প্যাটেলের এভাবে একসঙ্গে উদ্যোগী হওয়ার প্রমাণ দেশবাসীর সমক্ষে প্রচারিত করা জাতীয় ঐক্যের পক্ষে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মাউন্টব্যাটেন আবার বললেন, বর্তমান অবস্থার সব ঘটনা ও প্রতিক্রিয়াকে নেহরু যদি অবিলম্বে আয়ত্তের মধ্যে আনতে পারেন তবেই মঙ্গল। এ বিষয়ে নেহরুর সাফল্যের উপরেই ভবিষ্যতের সব কিছু নির্ভর করছে।

সর্বত্র লোকের মনের ভাব এই শোকের আঘাত সত্ত্বেও এমন এক উত্তেজনায় কম্পিত হচ্ছে যে, সামান্য একটি কথার ভুলে অথবা একটি গুজবে এ উত্তেজনা দাবাগ্নির মতো জ্বলে উঠে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। কিছুক্ষণ আগে বিড়লা ভবনের সম্মুখে যখন আমরা ছিলাম তখনই ভিড়ের ভেতর থেকে একটা গুজববাজ লোক মাউন্টব্যাটেনের কাছে এসে বলে উঠল- একটা মুসলমান এ কাণ্ড করেছে। মাউন্টব্যাটেন এবং আমাদের মধ্যে কেউই তখনো জানতেন না যে কে হত্যা করেছে গান্ধীকে। হত্যাকারীর নাম কি? কোন ধর্মের লোক? এসব তখনো কিছুই আমরা শুনিনি। কিন্তু মাউন্টব্যাটেন এটা ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন যে, হত্যাকারী যদি মুসলমান হয় তবে এ ঘটনার ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া রোধ করার আশা আর নেই। সর্বনাশা গৃহযুদ্ধ নিরোধ করাও কিছুতেই সম্ভবপর হবে না। গুজববাজ লোকটার কথা শুনে মাউন্টব্যাটেন একটা বেপরোয়া আন্দাজের জোরে তৎক্ষণাৎ ধমক দিলেন- বেকুব কোথাকার। হত্যাকারী যে একজন হিন্দু এটুকুও এখনও শোননি?

কয়েক মিনিট পরে ভিপি মেননের কাছ থেকে আমি জানতে পারলাম যে, হত্যাকারী হলো জনৈক মারাঠা হিন্দু। গান্ধী যখন তার প্রার্থনা সভার দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন, তখনই খুব নিকটবর্তী স্থান থেকে হত্যাকারী তার ওপর তিনবার গুলি নিক্ষেপ করেছে। ডাক্তার ভদ্রলোকের সঙ্গেও আমি আলাপ করলাম। গান্ধীর অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত এ ডাক্তার গান্ধীকে ওষুধ দিয়ে রক্ষা করার চেষ্টা করেছেন। ডাক্তার অভিযোগ করলেন, বিড়লা ভবনে প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র কিছুই ছিল না। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর মাত্র কয়েক মুহূর্ত গান্ধী বেঁচে ছিলেন। সামান্য একটু জল পান করতে পেরেছিলেন গান্ধী এবং তার পরেই চেতনা হারিয়ে ফেলেন। সে চেতনা আর ফিরে এলো না।

গান্ধীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার কথা নিয়ে অনেক কথা উঠল এবং আলোচনা হলো। প্যারেলাল বললেন- ‘গান্ধীর মরদেহ কোন রকম রাসায়নিক ব্যবস্থার দ্বারা দর্শনীয় বস্তুর মতো রক্ষা করা উচিত হবে না কারণ স্বয়ং গান্ধীই এ কাজ করতে ¯পষ্টভাবে নিষেধ করে গেছেন। গান্ধী পূর্বেই তার এ ইচ্ছা ঘোষণা করে দিয়েছিলেন যে, মৃত্যুর পর তার দেহ যেন বিশুদ্ধ হিন্দু প্রথা অনুযায়ী দাহ করা হয়।’

মাউন্টব্যাটেন ও নেহরু পরামর্শ করে এ সিদ্ধান্ত করলেন যে, আগামীকাল গান্ধীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হবে। কিন্তু এ অনুষ্ঠানে কল্পনাতীত জনসমাগম হবে, তার মধ্যে শৃঙ্খলা ও সুব্যবস্থা অক্ষুণœ রাখা একা দিল্লির বেসামরিক কর্তৃপক্ষের শক্তিতে সম্ভবপর হবে না। দেশরক্ষা বিভাগের ওপরেই কাজের ভার দেয়া হলো। দিল্লির এরিয়া কম্যান্ডার সব বিভাগের সৈন্য নিয়ে অন্ত্যেষ্টির শোভাযাত্রা নিয়ন্ত্রণ করবেন।

মহাত্মাকে শেষবারের মতো দেখার জন্য বিড়লা ভবনের ওপর এ সন্ধ্যাতেই জনতার অভিযান প্রবল হয়ে উঠতে দেখে আমি চিন্তিত হয়ে পড়লাম। জানালাগুলো জনতার চাপ সহ্য করতে না পেরে ভেঙে পড়বে বলেই মনে হচ্ছে। নেহরুকে এ আশঙ্কার কথাও বললাম।

নেহেরুর সে বিষণ্ণ ও বেদনাপীড়িত মূর্তির করুণতা বর্ণনা করা যায় না। অবসন্ন ও ক্লান্ত স্বরে তিনি আমার সঙ্গে কথা বললেন। কিন্তু বিস্মিত হয়ে দেখলাম, এ অবস্থার মধ্যেও তিনি কিভাবে নিজেকে সংযত করে রেখেছেন। নেহরু বললেন- সব ব্যবস্থা করা হচ্ছে। গান্ধীর দেহ আজ রাত্রের মতো ঘরের বাইরে নিয়ে এসে একটা উঁচু স্থানে রাখা হবে, যার ফলে জনতা একটা লাইন ধরে শৃঙ্খলার সঙ্গে এগিয়ে এসে মহাত্মার শেষ দর্শন লাভ করে চলে যেতে পারবে।

বাইরের জনতা অস্থির হয়ে উঠছিল। মহাত্মার দর্শন লাভের জন্য জনতার চিৎকারও বাড়ছিল। নেহরু ঘরের ভেতর থেকে বের হয়ে সোজা সেই জনতার মধ্যে গিয়ে দাঁড়ালেন। নেহরুর সঙ্গে যে কোন দেহরক্ষী নেই, একথা ভুলেও একবার মনে হলো না নেহরুর। জনতার সঙ্গে কথা বলে নেহরু আবার ফিরে এলেন।

রাত্রি ৮টার সময় আমরা বিড়লা ভবন ছেড়ে গভর্নমেন্ট হাউজে ফিরে এলাম। দেবদাস গান্ধী এবং মৌলানা আজাদকেও সঙ্গে নিয়ে এলেন মাউন্টব্যাটেন।

দেবদাস বললেন-পাগলের কা-। পাগল ছাড়া এমন কাজ কেউ করতে পারে না।

মাউন্টব্যাটেন বললেন- এটা যদি সত্যই পাগলের কা- হতো তবে আমি অন্তত বিন্দুমাত্র দুশ্চিন্তা করতাম না। কিন্তু এটা মোটেই পাগলের কা- নয়। যথেষ্ট পরিকল্পনা করে ষড়যন্ত্র করে এবং ব্যবস্থা করেই যে এ কা- করা হয়েছে তার প্রমাণ ও লক্ষণ খুব বেশি করেই দেখতে পাচ্ছি।

মৌলানা আজাদ ইংরেজিতে কথা বলেন না, যদিও তিনি ইংরেজি বলতে পারেন। মৌলানা নিঃশব্দে মাথা নেড়ে মাউন্টব্যাটেনের মন্তব্যই সমর্থন করলেন। গভর্নমেন্ট হাউজের এডিসি কক্ষে ফিরে এসে দেখতে পেলাম ভিপি মেনন কিংসলি মার্টিন এবং গর্ডন ওয়াকার বসে রয়েছেন। মাত্র গতকাল দিল্লি পৌঁছেছেন গর্ডন ওয়াকার। ভাবতে আরও কষ্ট হচ্ছে যে, আমি আজই সকালে প্যারেলালের সঙ্গে কথাবার্তা বলে গান্ধীর সঙ্গে গর্ডন ওয়াকারের একটা সাক্ষাতের ব্যবস্থা করেছি। আগামীকাল সন্ধ্যায় গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন বলে গর্ডন ওয়াকার প্রস্তুত হয়েছিলেন। হঠাৎ জামসাহেব ঘরে ঢুকলেন। জামসাহেব বললেন, আজ সন্ধ্যা ৬টার সময় গান্ধীর সঙ্গে তার সাক্ষাৎ করার কথা ছিল এবং শুধু এই উদ্দেশ্যেই তিনি আজ বিমানে দিল্লিতে এসে পৌঁছেছেন।

পরদিন শনিবার ৩১ জানুয়ারি বিড়লা ভবন থেকে যমুনার রাজঘাট-ছয় মাইল দীর্ঘ পথ। জল, স্থল ও বিমানবাহিনীর সৈনিকরা পথের স্থানে স্থানে ডিউটি নিয়ে দাঁড়িয়েছে।

একটি উদ্বেগের ভার আমাদের চিন্তা থেকে নেমে গেছে কারণ হত্যাকারীর নাম ও পরিচয় জানতে পেরেছি। হত্যাকা-ের পর অল্পক্ষণের মধ্যেই এ তথ্য অতি দ্রুত ঘোষণা করে দেওয়া হয়েছে যে, হত্যাকারী হলো হিন্দু মহাসভার জনৈক মারাঠা সদস্য, নাম নাথুরাম গডেস।

আজ আবার বিড়লা ভবনের সম্মুখে আমরা উপস্থিত হলাম। গত রাত্রের জনতার তুলনায় অনেক বড় এক জনতার চাপে আমাদের পথ পাওয়া দুরূহ হয়ে উঠল। দেখলাম, মহাত্মার শবাধার পুষ্প ও কংগ্রেস পতাকায় আবৃত করা হয়েছে। একটি গাড়ির ওপর শবাধার রাখা হয়েছে। একদল ভারতীয় নৌ সৈনিক গাড়ি ঠেলে নিয়ে চলল। গভর্নর জেনারেলের বডিগার্ড দল চলল আগে আগে। সঙ্গে সঙ্গে শাবানুগামী জনতা যার মধ্যে মন্ত্রী ও সেনাপতির দল ভারতের দীনতম সাধারণ মানুষের সঙ্গে ঠেলাঠেলি করে জায়গা নেয়ার চেষ্টা করছেন যাতে মহাত্মার মুখ আর একবার ভালো করে দেখে নেওয়া যায়। ভারতীয় মহাত্মার শবাধারের সঙ্গে, সম্মুখে ও পেছনে চলেছে সৈনিকের দল। তা ছাড়া গান্ধীরই বহু সংগ্রামে যে সৈন্যদল তার সঙ্গে চিরকাল কাজ করেছে, সেই ‘চার-আনা’ কংগ্রেসীও হাজারে হাজারে চলেছেন।

গান্ধীর মৃত্যুতে প্যাটেলের যে ব্যক্তিগত ক্ষতি হয়ে গেল, সে কথা ছেড়ে দেই। এই ঘটনা প্যাটেলের মনের ওপর যে বিশেষ আঘাত এবং খুবই কঠোর আঘাত দিয়েছে সেই কথাই ভাবছি। এরকম হওয়ার বিশেষ কতকগুলো কারণও রয়েছে। প্রথমত, গান্ধীর সঙ্গে প্যাটেলের বনিবনা যে হচ্ছে না, এ খবর কিছুদিন থেকে প্রায়ই শোনা যাচ্ছিল। দ্বিতীয়ত, প্যাটেলই হলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থার কর্তৃত্ব তারই হাতে। সুতরাং গান্ধীর নিরাপত্তার জন্য তিনিই সরকারিভাবে দায়ী। এটা অবশ্য সত্য যে, দশ দিন আগে প্রার্থনা সভায় বোমা বিস্ফোরিত হওয়ার পরেও গান্ধী নিজেই বিশেষভাবে এবং সুস্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, তাকে রক্ষা করার জন্য কোন পুলিশ নিযুক্ত করতে হবে না। কিন্তু এটাও স্পষ্ট করেই বোঝা যাচ্ছে যে, দশ দিন আগের বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা লক্ষ্য করেও পুলিশ এ দশ দিনের মধ্যে অপরাধীদের সন্ধান করে ধরে ফেলতে পারেনি। নেতাদের মধ্যে প্যাটেলের সঙ্গেই গান্ধীর শেষ দেখা ও আলাপ হয়েছে। সেদিন অপরাহ্ণে প্যাটেলেরই সঙ্গে কথা বলতে বলতে কয়েক মিনিট দেরি হয়ে গিয়েছিল গান্ধীর। প্যাটেলকে বিদায় দিয়ে তাড়াতাড়ি প্রার্থণাসভার কাছে যেই মাত্র এগিয়ে এলেন গান্ধী তখনি হত্যাকারী তার পথরোধ করে দাঁড়াল। সুতরাং এটা খুবই স্বাভাবিক যে এ ঘটনায় প্যাটেলেরই মন সব চেয়ে বেশি যন্ত্রণায় পরে যাচ্ছে। গান্ধীর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য নানারকম উদ্যোগে, ব্যবস্থায় ও আয়োজনে মাউন্টব্যাটেন এবং নেহরু তবুও ঘুরেফিরে কাজ করতে পারছেন কিন্তু প্যাটেল যেন একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেছেন। বিড়লা ভবন থেকে রাজঘাট পর্যন্ত দীর্ঘ ছয় মাইল পথ শবাধারের সঙ্গে সঙ্গে চললেন প্যাটেল। প্যাটেলের বয়সও বাহাত্তর বছর পার হতে চলেছে এবং সেই বয়সের এক বৃদ্ধের পক্ষে এতটা শারীরিক ক্লেশ ও কষ্ট আজ গ্রহণ করতে চাইছেন।

১১টা বেজে গিয়েছে, ধীরে ধীরে গান্ধীর শবাধার এগিয়ে চলেছে। জনতার শেষ নেই। গভর্নমেন্ট হাউজের কাছে এসে আমরা এ দৃশ্য ভালো করে দেখবার জন্য দরবার হলের গম্বুজের ওপর উঠে দাঁড়ালাম। দেখলাম এখান থেকে প্রায় দু’মাইল দূরে গান্ধীর শবাধার জনসমুদ্রের তরঙ্গে ধীরে ধীরে ভেসে চলেছে। আমাদের সম্মুখের এ সুদীর্ঘ ও সুপ্রশস্ত সড়কের নাম কিংসওয়ে। এই ‘রাজার সড়ক’ ধরে চলে যাচ্ছেন সেই গান্ধী, যিনি সত্যিই রাজা ছিলেন না। যাচ্ছেন সেই গান্ধী, যিনি এই পথ থেকে ব্রিটিশরাজকে সরিয়ে দিয়েছেন। ব্রিটিশরাজকে অপসারিত করে স্বরাজ প্রতিষ্ঠার জন্য যিনি সবচেয়ে বেশি চেষ্টা করেছেন, সেই মানুষটাই এ রাজার সড়কে শেষ দর্শন দিয়ে চলে যাচ্ছেন। সেই মানুষটিই আজ তার মৃত্যুতে যে বিরাট শ্রদ্ধার ঐশ্বর্য তার সঙ্গে নিয়ে চলেছেন সে শ্রদ্ধা এ রাজার সড়কে ভ্রমণকারী কোন ভাইসরয়ের স্বপ্নেরও অগোচর ছিল।

যমুনার ঘাটে পৌঁছলাম। গভর্নর-জেনারেলের সঙ্গে সব সমেত আমরা বিশজন এগিয়ে চললাম। আমাদের পেছনে পাঁচ লাখ লোকের ভিড়। সম্মুখে ও পার্শ্বে ভিড় যেন আকাশপ্রান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে। একটি ক্ষুদ্র ইটনির্মিত বেদিকার ওপর কাষ্ঠখ-ে সজ্জিত চিতার কাছাকাছি গিয়ে আমরা দাঁড়ালাম। পেছন থেকে পাঁচ লাখ লোকের ভিড় আমাদের ওপর প্রপাতের মতো এসে পড়ছে।

তবুও চিতা লক্ষ্য করে চারদিক থেকে জনতার পর জনতা এগিয়ে আসতে আরম্ভ করল। এখন এ জায়গায় কম করেও সাত লাখ লোক হবে। রাজনীতিক নেতা ও মেথর, গভর্নর ও চাষি নারী- প্রত্যেকেই ফুল দেয়ার জন্য ঠেলাঠেলি করে এগিয়ে আসার চেষ্টা করছে।

চিতামে অগ্নিশিখা দেখা দিল। সঙ্গে সঙ্গে বাতাস কাঁপিয়ে লাখো কণ্ঠে একটি বিরাট ও গম্ভীর বাণী ধ্বনিত হলো- ‘গান্ধী অমর’।

মাউন্টব্যাটেনের নির্দেশে আমরা সেখানেই ধুলোর ওপর বসে পড়লাম। মাউন্টব্যাটেনও বসে পড়লেন। পেছনের বিরাট জনতাকে থামিয়ে রাখার অথবা বসিয়ে দেয়ার জন্যই মাউন্টব্যাটেন এ কাজটি করলেন। আর একটা কারণও ছিল। যদি মাউন্টব্যাটেন এবং আমরা বসে না পড়তাম তবে পিছনের জনতার সম্মুখে এগিয়ে আসার প্রবল উৎসাহের একটি ধাক্কায় আমরা জ্বলন্ত চিতার অগ্নিশিখার মধ্যে অবশ্যই নিক্ষিপ্ত হতাম।

[ লেখক : সাংবাদিক কলামিস্ট ]

hrahman.swapon@gmail.com