সাংবাদিকদের ব্যাংক হিসাব তলব দুরভিসন্ধিমূলক

কোন অঘটন-অনিয়ম সংঘটিত হওয়ার পরে প্রথম প্রতিবাদটা করেন সাংবাদিকেরা, তাদের কলমে। আবার রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন ইতিবাচক ঘটনাপ্রবাহ ফুটিয়ে তুলেন সাংবাদিকেরাই। টেলিভিশন কিংবা সংবাদপত্রের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ কেবল তখনই জানতে পারেন যখন সংবাদকর্মীরা বিস্তারিত তুলে আনেন। রাজনীতিবিদেরাও নিয়মিত সংবাদপত্র খুঁটিনাটি পড়ে, বিচার-বিশ্লেষণ করে নির্ধারণ করেন তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ হচ্ছে গণমাধ্যম। অথচ গণমাধ্যমের ওপর একের পর এক আঘাত আসছেই। কখনো ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে, কখনো ভয়ভীতি দেখিয়ে, আবার কখনো ব্যক্তি সম্মানহানির নামে। নতুন করে যোগ হয়েছে ব্যাংক হিসাব তলবের মহড়া।

বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) কোন অভিযোগের ভিত্তিতে বা শুধুমাত্র ব্যাংকে ১০ লাখের বেশি টাকা থাকলে এবং মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে অর্থায়নের সন্দেহ থাকলে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে নাগরিকদের ব্যাংক হিসাব তলব করতে পারেন। বিশেষ করে জঙ্গি অর্থায়ন এবং অর্থপাচার রোধে রাষ্ট্রের এ সুরক্ষা ব্যবস্থা। অভিযোগ ব্যতীত উন্নয়নশীল দেশে নির্দিষ্ট সময়ান্তে রাষ্ট্রের কর্মচারীদের বা সেবকদের রাষ্ট্র তলব করবেন এটা স্বাভাবিক। কারণ দুর্নীতি সেখানে রন্ধ্রে রন্ধ্রে। অনেক ক্ষেত্রেই তাদের আয়-ব্যয় এবং সম্পদের হিসাবের গরমিল পরিলক্ষিত হয়। বিদেশে অর্থপাচারের ঘটনাও উল্লেখযোগ্য। জনগণের অর্থের যথাযথ ব্যবহারে- সেই হিসাবে এমপিদের ব্যাংক হিসাব তলব বা সরকারি কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব চাওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এমনকি ঝুঁকিপূর্ণ কোন বিষয়ে অর্থায়ন হচ্ছে কিনা খতিয়ে দেখতে ইতোপূর্বে ব্যবসায়ী নেতাদের ব্যাংক হিসাবও তলব হয়েছে। তবে সম্পদ বা অর্থের এই হিসাব চাওয়া হয় কেবলমাত্র ব্যক্তির কাছে, সাংগঠনিক পরিচয়ে নয়।

বরিশালে ইউএনও এবং মেয়রের সাথে দ্বন্দ্বের চরম আকার দেখা গেল মাত্র কিছুদিন আগে। তুচ্ছ ঘটনা কেন্দ্র করে মধ্যরাতে করা হলো লাঠিচার্জ। গুলি করা হলো রাজনীতিবিদদের ওপর। এরপর সামনে আসলো আমলাতান্ত্রিক পুলিশি অ্যাকশন, গ্রেফতার আতঙ্ক। সরকারদলীয় দলের মেয়র এবং তার লোকজনের ওপর এরকম ঘটনা নজিরবিহীন, উৎকণ্ঠার। পরিষ্কার হয়ে উঠলো আমলাদের দোর্দ- দাপট। রাজনীতি যেন আর রাজনৈতিকদের হাতে নেই। রাজনীতি-গণতন্ত্র কোণঠাসা হয়েছে দুর্নীতিবাজ মুষ্টিমেয় কিছুসংখ্যক প্রতাপশালীর হাতে। এ প্রতাপশালীদের আমেরিকা-কানাডার বেগমপাড়ায় বিলাসবহুল ঘরবাড়ি করা প্রায়ই নিয়ে জনগণের ভিতরে গুঞ্জন উঠে। গণমাধ্যমেও বেগমপাড়া সম্পর্কে উঠে এসেছে বেশ কয়েকবার। শেষ পর্যন্ত যা আদালতের বারান্দায় গড়িয়েছে। জনগণের অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিতে কিছুদিন আগে রাষ্ট্রীয় আমলাদের সম্পদের হিসাব চাওয়া হলো। কিন্তু তারা তাদের অর্জিত সম্পদের হিসাব দিতে অপারগ।

করোনা মহামারীকালীন স্বাস্থ্য খাতের অস্বাস্থ্যকর রূপ গণমাধ্যমে উঠে এসেছিল। উঠে এসেছিল জনগণের টাকার ছেরাদ্দ-ফর্দ। পাবনার রূপপুরে বালিশ-কেটলি কিনতে এবং ওপরতলায় উঠাতে অস্বাভাবিক টাকা খরচের খবর সাংবাদিকদের মাধ্যমেই জনগণ জানতে পেরেছে। জানতে পেরেছে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে অবিস্মরণীয় অবদান রাখা নাগরিকদের দেওয়া সম্মাননা স্বর্ণপদকে স্বর্ণ খাদের ঘটনা। বারবারই উঠে এসেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং বনবিভাগ কর্মচারীদের দুর্নীতি। একজন অফিস সহকারী হয়েও কীভাবে কোটিপতি বনে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হলেন সেটাও জনগণের সামনে এসেছে একমাত্র গণমাধ্যমের বদৌলতে। আমরা দেখলাম স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি-অনিয়মের খবর প্রকাশের জেরে প্রথম আলোর সংবাদকর্মী রোজিনা ইসলামের ওপর কীভাবে রাষ্ট্রের কর্মচারীরা ঝাঁপিয়ে পড়ল। এর পূর্বে সাংবাদিক কাজলকে হেনস্তা করা হয়েছিল। খবর প্রকাশের জন্য নির্যাতনের মুখে চট্টগ্রামের এক সাংবাদিককে আমরা বলতে শুনেছি- আমাকে ছেড়ে দেন ভাই, আমি আর সাংবাদিকতা করবো না, খবর লিখবো না।

সংবাদমাধ্যম এবং সাংবাদিকদের ওপর যে আঘাত এসেছে, এটা নতুন নয়। বারবারই আঘাত এসেছে। সব সরকারের আমলেই চেষ্টা ছিল সাংবাদিকদের নিয়ন্ত্রণ করার। নীতিমালা করে সংবাদ প্রকাশের কৃত্রিম সীমাবদ্ধতা তৈরি করা হলো, তারপর চাপিয়ে দেওয়া হলো সংবাদপত্রের নিবন্ধন জাল। অন্যদিকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রয়োগ তো আছেই। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলা পরিসংখ্যানে দেখা যায়- এ মামলায় ভুক্তভোগী অধিকাংশই পেশায় সাংবাদিক। এমনকি করোনা মহামারী শুরুর পর থেকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে কমপক্ষে ৮০ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে- এমনটাই প্রকাশ করা হয়েছে মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর গত মে মাসের প্রতিবেদনে। অর্থাৎ সাংবাদিকদের কলম যখন থামানো যাচ্ছিলো না, তখন মাথার উপরে চাপলো ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খড়গ। সন্ত্রাসীদের বন্দুকের নল বারবারই মফস্বল সাংবাদিকতার সামনে উঁচিয়ে উঠেছে। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে গুমের শিকার হয়েছেন কেউ কেউ। আমলারা তাদের সম্পদের হিসাব দেবেন না, সংবাদমাধ্যমেও একের পর এক নানান অনিয়ম আসছিলো- এরকম সময়েই জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও সম্পাদকসহ ৪ সংগঠনের ১১ সাংবাদিক নেতার ব্যাংক হিসাব তলব করা হয়েছে। সরকারের একটি সংস্থার চাহিদার প্রেক্ষিতে ব্যাংকগুলোকে এ বিষয়ে চিঠি পাঠিয়েছে বিএফআইইউ। অথচ এ বিষয়ে কিছুই জানেন না খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাহলে এই চিঠি আসলো কার কথায়! দায়িত্বরত আমলাদের কথায়?

বাংলাদেশে সাংবাদিক সংগঠন রাজনৈতিকসহ নানা কারণে বিভক্ত। তারপরও তারা সাধারণ মানুষের সাথে সম্পৃক্ত ছিল এবং এখন পর্যন্ত আছে। তাদের খবরের ওপরই সাধারণ মানুষকে ভরসা করতে হয়। কিন্তু সাংবাদিকদের নৈতিকতা নিয়ে যদি প্রশ্ন তোলা যায় তাহলে তাদের জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব। তাদের সরবরাহ সংবাদের তখন গুরুত্ব কমানো যায়। গ্রাম্য মারামারির সময়ে লুঙ্গির কোণা ধরে টানার কূটকৌশল। কেননা অভিযোগ থাকলেই কেবল বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণীর নাগরিকদের কাছে এ ধরনের তলব হওয়ার কথা। সবচেয়ে বড় কথা ব্যাংক হিসাব তলব হওয়ার পরবর্তী কী ধরনের ফলাফল আসে সেটা আর সাধারণ মানুষ জানতে পারেন না। সুতরাং সাধারণ মানুষের কাছে সাংবাদিকদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে একটা ভুল বার্তা পৌঁছাল, তাদের সুনাম-মর্যাদা কিছুটা হলেও ক্ষুণ্ন করা গেল।

প্রচলিত আইনে কোন ব্যক্তিবিশেষের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত হতে পারে। এ উদ্যোগকে স্বাগত, কিন্তু ঢালাওভাবে সাংবাদিকতা পেশার নাগরিকদের ব্যাংক হিসাব তলব উদ্দেশ্যমূলক। রাষ্ট্র ও সরকারের মুখোমুখি সাংবাদিকদের দাঁড় করিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা। বাকস্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যম এবং সাংবাদিকদের ওপর চাপ ও হুমকি সৃষ্টির কৌশলপত্র। সুতরাং সংবাদমাধ্যমগুলোর উচিত বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ভবিষ্যতকে শঙ্কায় ফেলে যারা এ ধরনের হীন কাজের জোগান দিল সেই সব কলকাঠিদের বেগমপাড়ার হিসাব বের করে আনা। যেহেতু জনগণের মুখোমুখি সাংবাদিক-সংগঠনগুলোকে নৈতিকতার কাঠগড়ায় দাঁড় করানো সম্পন্ন হয়েছে; এমতাবস্থায় গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখতে জনসম্মুখে সাংগঠনিকভাবে সমস্ত হিসাব প্রকাশ করা প্রয়োজনীয়। তলব প্রত্যাহার না করে, বিভ্রান্তি দূরীকরণে সরকারের উচিত হবে তলবের পরিপ্রেক্ষিতে তারা কি বিবরণী পেলেন তার বিস্তারিত তুলে ধরা। এর ব্যত্যয় ঘটলে কুচক্রী মহলের বিজয় ঘটবে, জনগণের মধ্যে জন্ম নিবে অবিশ্বাসের; আস্থার সংকটে পড়বে গণতান্ত্রিক অন্যতম স্তম্ভ। যে সম্মান হারায় দ্বিতীয়বার তা ফিরে পাওয়া কষ্টসাধ্য। জনতার আরো গভীরে মিশে কাজ করা জরুরি। সত্যের জয় অনিবার্য।

[লেখক : প্রাবন্ধিক]

শুক্রবার, ০৮ অক্টোবর ২০২১ , ২৩ আশ্বিন ১৪২৮ ৩০ সফর ১৪৪৩

সাংবাদিকদের ব্যাংক হিসাব তলব দুরভিসন্ধিমূলক

সজীব ওয়াফি

কোন অঘটন-অনিয়ম সংঘটিত হওয়ার পরে প্রথম প্রতিবাদটা করেন সাংবাদিকেরা, তাদের কলমে। আবার রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন ইতিবাচক ঘটনাপ্রবাহ ফুটিয়ে তুলেন সাংবাদিকেরাই। টেলিভিশন কিংবা সংবাদপত্রের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ কেবল তখনই জানতে পারেন যখন সংবাদকর্মীরা বিস্তারিত তুলে আনেন। রাজনীতিবিদেরাও নিয়মিত সংবাদপত্র খুঁটিনাটি পড়ে, বিচার-বিশ্লেষণ করে নির্ধারণ করেন তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ হচ্ছে গণমাধ্যম। অথচ গণমাধ্যমের ওপর একের পর এক আঘাত আসছেই। কখনো ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে, কখনো ভয়ভীতি দেখিয়ে, আবার কখনো ব্যক্তি সম্মানহানির নামে। নতুন করে যোগ হয়েছে ব্যাংক হিসাব তলবের মহড়া।

বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) কোন অভিযোগের ভিত্তিতে বা শুধুমাত্র ব্যাংকে ১০ লাখের বেশি টাকা থাকলে এবং মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে অর্থায়নের সন্দেহ থাকলে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে নাগরিকদের ব্যাংক হিসাব তলব করতে পারেন। বিশেষ করে জঙ্গি অর্থায়ন এবং অর্থপাচার রোধে রাষ্ট্রের এ সুরক্ষা ব্যবস্থা। অভিযোগ ব্যতীত উন্নয়নশীল দেশে নির্দিষ্ট সময়ান্তে রাষ্ট্রের কর্মচারীদের বা সেবকদের রাষ্ট্র তলব করবেন এটা স্বাভাবিক। কারণ দুর্নীতি সেখানে রন্ধ্রে রন্ধ্রে। অনেক ক্ষেত্রেই তাদের আয়-ব্যয় এবং সম্পদের হিসাবের গরমিল পরিলক্ষিত হয়। বিদেশে অর্থপাচারের ঘটনাও উল্লেখযোগ্য। জনগণের অর্থের যথাযথ ব্যবহারে- সেই হিসাবে এমপিদের ব্যাংক হিসাব তলব বা সরকারি কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব চাওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এমনকি ঝুঁকিপূর্ণ কোন বিষয়ে অর্থায়ন হচ্ছে কিনা খতিয়ে দেখতে ইতোপূর্বে ব্যবসায়ী নেতাদের ব্যাংক হিসাবও তলব হয়েছে। তবে সম্পদ বা অর্থের এই হিসাব চাওয়া হয় কেবলমাত্র ব্যক্তির কাছে, সাংগঠনিক পরিচয়ে নয়।

বরিশালে ইউএনও এবং মেয়রের সাথে দ্বন্দ্বের চরম আকার দেখা গেল মাত্র কিছুদিন আগে। তুচ্ছ ঘটনা কেন্দ্র করে মধ্যরাতে করা হলো লাঠিচার্জ। গুলি করা হলো রাজনীতিবিদদের ওপর। এরপর সামনে আসলো আমলাতান্ত্রিক পুলিশি অ্যাকশন, গ্রেফতার আতঙ্ক। সরকারদলীয় দলের মেয়র এবং তার লোকজনের ওপর এরকম ঘটনা নজিরবিহীন, উৎকণ্ঠার। পরিষ্কার হয়ে উঠলো আমলাদের দোর্দ- দাপট। রাজনীতি যেন আর রাজনৈতিকদের হাতে নেই। রাজনীতি-গণতন্ত্র কোণঠাসা হয়েছে দুর্নীতিবাজ মুষ্টিমেয় কিছুসংখ্যক প্রতাপশালীর হাতে। এ প্রতাপশালীদের আমেরিকা-কানাডার বেগমপাড়ায় বিলাসবহুল ঘরবাড়ি করা প্রায়ই নিয়ে জনগণের ভিতরে গুঞ্জন উঠে। গণমাধ্যমেও বেগমপাড়া সম্পর্কে উঠে এসেছে বেশ কয়েকবার। শেষ পর্যন্ত যা আদালতের বারান্দায় গড়িয়েছে। জনগণের অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিতে কিছুদিন আগে রাষ্ট্রীয় আমলাদের সম্পদের হিসাব চাওয়া হলো। কিন্তু তারা তাদের অর্জিত সম্পদের হিসাব দিতে অপারগ।

করোনা মহামারীকালীন স্বাস্থ্য খাতের অস্বাস্থ্যকর রূপ গণমাধ্যমে উঠে এসেছিল। উঠে এসেছিল জনগণের টাকার ছেরাদ্দ-ফর্দ। পাবনার রূপপুরে বালিশ-কেটলি কিনতে এবং ওপরতলায় উঠাতে অস্বাভাবিক টাকা খরচের খবর সাংবাদিকদের মাধ্যমেই জনগণ জানতে পেরেছে। জানতে পেরেছে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে অবিস্মরণীয় অবদান রাখা নাগরিকদের দেওয়া সম্মাননা স্বর্ণপদকে স্বর্ণ খাদের ঘটনা। বারবারই উঠে এসেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং বনবিভাগ কর্মচারীদের দুর্নীতি। একজন অফিস সহকারী হয়েও কীভাবে কোটিপতি বনে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হলেন সেটাও জনগণের সামনে এসেছে একমাত্র গণমাধ্যমের বদৌলতে। আমরা দেখলাম স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি-অনিয়মের খবর প্রকাশের জেরে প্রথম আলোর সংবাদকর্মী রোজিনা ইসলামের ওপর কীভাবে রাষ্ট্রের কর্মচারীরা ঝাঁপিয়ে পড়ল। এর পূর্বে সাংবাদিক কাজলকে হেনস্তা করা হয়েছিল। খবর প্রকাশের জন্য নির্যাতনের মুখে চট্টগ্রামের এক সাংবাদিককে আমরা বলতে শুনেছি- আমাকে ছেড়ে দেন ভাই, আমি আর সাংবাদিকতা করবো না, খবর লিখবো না।

সংবাদমাধ্যম এবং সাংবাদিকদের ওপর যে আঘাত এসেছে, এটা নতুন নয়। বারবারই আঘাত এসেছে। সব সরকারের আমলেই চেষ্টা ছিল সাংবাদিকদের নিয়ন্ত্রণ করার। নীতিমালা করে সংবাদ প্রকাশের কৃত্রিম সীমাবদ্ধতা তৈরি করা হলো, তারপর চাপিয়ে দেওয়া হলো সংবাদপত্রের নিবন্ধন জাল। অন্যদিকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রয়োগ তো আছেই। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলা পরিসংখ্যানে দেখা যায়- এ মামলায় ভুক্তভোগী অধিকাংশই পেশায় সাংবাদিক। এমনকি করোনা মহামারী শুরুর পর থেকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে কমপক্ষে ৮০ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে- এমনটাই প্রকাশ করা হয়েছে মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর গত মে মাসের প্রতিবেদনে। অর্থাৎ সাংবাদিকদের কলম যখন থামানো যাচ্ছিলো না, তখন মাথার উপরে চাপলো ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খড়গ। সন্ত্রাসীদের বন্দুকের নল বারবারই মফস্বল সাংবাদিকতার সামনে উঁচিয়ে উঠেছে। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে গুমের শিকার হয়েছেন কেউ কেউ। আমলারা তাদের সম্পদের হিসাব দেবেন না, সংবাদমাধ্যমেও একের পর এক নানান অনিয়ম আসছিলো- এরকম সময়েই জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও সম্পাদকসহ ৪ সংগঠনের ১১ সাংবাদিক নেতার ব্যাংক হিসাব তলব করা হয়েছে। সরকারের একটি সংস্থার চাহিদার প্রেক্ষিতে ব্যাংকগুলোকে এ বিষয়ে চিঠি পাঠিয়েছে বিএফআইইউ। অথচ এ বিষয়ে কিছুই জানেন না খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাহলে এই চিঠি আসলো কার কথায়! দায়িত্বরত আমলাদের কথায়?

বাংলাদেশে সাংবাদিক সংগঠন রাজনৈতিকসহ নানা কারণে বিভক্ত। তারপরও তারা সাধারণ মানুষের সাথে সম্পৃক্ত ছিল এবং এখন পর্যন্ত আছে। তাদের খবরের ওপরই সাধারণ মানুষকে ভরসা করতে হয়। কিন্তু সাংবাদিকদের নৈতিকতা নিয়ে যদি প্রশ্ন তোলা যায় তাহলে তাদের জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব। তাদের সরবরাহ সংবাদের তখন গুরুত্ব কমানো যায়। গ্রাম্য মারামারির সময়ে লুঙ্গির কোণা ধরে টানার কূটকৌশল। কেননা অভিযোগ থাকলেই কেবল বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণীর নাগরিকদের কাছে এ ধরনের তলব হওয়ার কথা। সবচেয়ে বড় কথা ব্যাংক হিসাব তলব হওয়ার পরবর্তী কী ধরনের ফলাফল আসে সেটা আর সাধারণ মানুষ জানতে পারেন না। সুতরাং সাধারণ মানুষের কাছে সাংবাদিকদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে একটা ভুল বার্তা পৌঁছাল, তাদের সুনাম-মর্যাদা কিছুটা হলেও ক্ষুণ্ন করা গেল।

প্রচলিত আইনে কোন ব্যক্তিবিশেষের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত হতে পারে। এ উদ্যোগকে স্বাগত, কিন্তু ঢালাওভাবে সাংবাদিকতা পেশার নাগরিকদের ব্যাংক হিসাব তলব উদ্দেশ্যমূলক। রাষ্ট্র ও সরকারের মুখোমুখি সাংবাদিকদের দাঁড় করিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা। বাকস্বাধীনতা, সংবাদমাধ্যম এবং সাংবাদিকদের ওপর চাপ ও হুমকি সৃষ্টির কৌশলপত্র। সুতরাং সংবাদমাধ্যমগুলোর উচিত বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ভবিষ্যতকে শঙ্কায় ফেলে যারা এ ধরনের হীন কাজের জোগান দিল সেই সব কলকাঠিদের বেগমপাড়ার হিসাব বের করে আনা। যেহেতু জনগণের মুখোমুখি সাংবাদিক-সংগঠনগুলোকে নৈতিকতার কাঠগড়ায় দাঁড় করানো সম্পন্ন হয়েছে; এমতাবস্থায় গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখতে জনসম্মুখে সাংগঠনিকভাবে সমস্ত হিসাব প্রকাশ করা প্রয়োজনীয়। তলব প্রত্যাহার না করে, বিভ্রান্তি দূরীকরণে সরকারের উচিত হবে তলবের পরিপ্রেক্ষিতে তারা কি বিবরণী পেলেন তার বিস্তারিত তুলে ধরা। এর ব্যত্যয় ঘটলে কুচক্রী মহলের বিজয় ঘটবে, জনগণের মধ্যে জন্ম নিবে অবিশ্বাসের; আস্থার সংকটে পড়বে গণতান্ত্রিক অন্যতম স্তম্ভ। যে সম্মান হারায় দ্বিতীয়বার তা ফিরে পাওয়া কষ্টসাধ্য। জনতার আরো গভীরে মিশে কাজ করা জরুরি। সত্যের জয় অনিবার্য।

[লেখক : প্রাবন্ধিক]