প্রাথমিক বিদ্যালয় রি-ওপেনিংকে ফলপ্রসূ করার পথ

করোনার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে দেশব্যাপী সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন সকল পর্যায়ের কর্মকর্তারা পরিদর্শন কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। এ সময়টা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর মাত্র ৪ (চার) মাসে ১ (এক) বছরের পড়ালেখা শেষ করতে হবে। বিষয়টি বড়দের পাশাপাশি শিশুশিক্ষার্থীরাও গুরুত্বের সাথে নিয়েছে। তাই তারা ভুলে যায় কোনদিন কারা বিদ্যালয়ে আসবে, কারা আসবে না। যদিও রুটিন দেওয়ালে টানানো রয়েছে। শিক্ষকরাও কোন শ্রেণীর ক্লাস কবে তা বলে দিয়েছেন। তথাপি প্রতিদিনই শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে উঁকি দিচ্ছে। যাদের ক্লাস নাই তাদের বাড়ি ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কোনোভাবেই যেন বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের অনাহক সমাগম না ঘটে এজন্য শিক্ষকবৃন্দ সর্তক আছেন। বিদ্যালয়ের টয়লেট থেকে শুরু করে প্রতিটি স্থান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা হচ্ছে। শুধু কি কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ! আছে ডেঙ্গুজ্বর, সর্দি-কাশি, অপুষ্টি, স্বাস্থ্য-অসচেতনতা ইত্যাদি।

বিদ্যালয়গুলোও সেভাবে প্রস্তুত। কোথাও কোনো প্রকার আর্বজনা দেখা গেলে সাথে সাথে তা পরিষ্কার করা হচ্ছে। এমন পরিচ্ছন্ন পরিবেশ কোভিড-১৯ পূর্ববর্তীকালে আমরা কমই দেখেছি। প্রতিটি বিদ্যালয়ে জ্বর মাপার জন্য ইনফ্রারেড থার্মোমিটার কেনা হয়েছে। পালস-অক্সিমিটিার, সাবান, হ্যান্ড-স্যানিটাইজার, হাত ধোয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। শিশুদের জন্য মাস্ক সরবারহ, স্যাভলন দিয়ে বিদ্যালয়ের মেঝে ধৌতকরণ অর্থাৎ কোভিড-১৯ প্রতিরোধে বিদ্যালয়সমূহে চলছে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন অভিযানের এক এলাহিকাণ্ড; যা দেখে বোঝা যায় করোনাভাইরাস আমাদের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতাকে একটা স্থায়ীরূপ দান করতে চলেছে।

হ্যাঁ, বাঁচতে হলে এসব স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। আবার সামাজিক-শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। হ্যান্ডসেক, কোলাকুলি, মারামারি, ধরাধরি, মোরগ লড়াই, কাবাডি, দাড়িয়াবান্ধা খেলা ইত্যাদি আপাতত বন্ধ। শুধু লেখাপড়াই চলবে। সূতরাং আনন্দঘন পরিবেশে শিখন-শেখানো কার্যাবলী পরিচালনা করতে হবে। শারীরিক কিংবা মানসিক শাস্তি, শিক্ষকের অবহেলা, অসুস্থতা, পড়তে না পারাÑ এসব কারণে শিশু যেন ঝরে না যায়। রি-ওপেনিংয়ের এ পরিস্থিতিতে তাই শুধু শিক্ষক নয় প্রাথমিক শিক্ষায় নিয়োজিত সবাইকে একযোগে সতর্কতার সাথে কাজ করতে হবে।

একজন শিক্ষার্থী ক্লাসে অনিয়মিত হলেও শিক্ষকের শ্রেণী পরিচালনায় সমস্যা হয়। অনুপস্থিত এই এক দুইজনের জন্য শিক্ষককে নতুন করে চিন্তা করতে হয়। তাই শিশু যেন প্রতি ক্লাসে উপস্থিত থাকে এজন্য শ্রেণীর সব শিক্ষার্থীর সাথে শিক্ষকের বন্ধুত্বপূর্ণ সর্ম্পকের খুবই প্রয়োজন। শিক্ষক তার সম্মোহনী ক্ষমতাবলে শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে পারেন। মা সমাবেশ, অভিভাবক সমাবেশ, ম্যানেজমেন্ট কমিটির সভা, হাতে কলমে-কাজের মাধ্যমে শিক্ষাদান, মাল্টিমিডিয়ার ব্যবহার, মাঝে মাঝে প্রাকৃতিক পরিবেশে নিয়ে যাওয়া, গল্পকথায় শিক্ষাদান; নানাভাবে শিক্ষক চেষ্টা করতে পারেন। শ্রেণীকক্ষে শিক্ষকের অবস্থানটিও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষক শুধুমাত্র দেওয়ালে টানানো বোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে বা চেয়ারে বসে শ্রেণীকাজ পরিচালনা করবেন না। তিনি সকল শিক্ষার্থীর নিকটে তার ছান্দসিক বিচরণে পারদর্শী হবেন। শিক্ষার্থীদের বসার ব্যবস্থায় শিক্ষক সবসময় পরিবর্তন আনয়ন করবেন। শ্রেণীতে বড় দলে কাজ, ছোট দলে কাজ, একাকী চিন্তা, জোড়ায়-জোড়ায় কাজ ইত্যাদি পরিচালনাকালে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আসনব্যবস্থা fixed না হয়ে পরিবর্তনশীল হতে হবে। এতে শ্রেণীকাজে একঘেয়েমি, ক্লান্তিভাব, ঝিমুনি এসব বোধ না করে শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়েই এক সচেতনতাময় শিখন-পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারবেন; যা এই রি-ওপেনিংকালে স্বল্প সময়কে অর্থবহভাবে ব্যবহারের উপায় হতে পারে। এ ক্ষেত্রে শ্রেণিকাজ পরিচালনার পূর্বে শিক্ষক কলেজ বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণের মতো অবশ্যই একটি সক্ষম, উন্নত এবং সমৃদ্ধ পাঠ পরিকল্পনা/পূর্ব প্রস্তুতি প্রণয়ন করে সে মোতবেক শ্রেণীকাজ পরিচালনা করবেন। Teachership শুধু শিক্ষক নিজের মধ্যে রাখবেন না। পর্যায়ক্রমে সব শিক্ষার্থীকেই তিনি ভাবিশিক্ষকে পরিণত করবেন। এই শিশুরা শ্রেণীতে যেমন অপারগ শিক্ষার্থীদের সহায়তা করতে পারে তেমনি তারা বাড়িতে গিয়েও ছোট ভাইবোন কিংবা প্রতিবেশীদের সহায়তা করতে পারে। এই রি-ওপেনিংকালের পূর্বে প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধের মধ্যে আমরা দেখেছি শিশু তার ওয়ার্কসিট এবং অ্যাকাটিভিটি সিট হাতে করে বাড়ির বাইরে এসেছে বড়দের কাছে পাঠ বিষয়ে জিজ্ঞেস করতে।

অনুপস্থিতির সংখ্যা শূন্যে নিয়ে আসা, ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনা কার্যকর শিখন-শেখানো পদ্ধতির উদ্ভাবন ও পরিচালনা, পরিদর্শকের নিকট জবাবদিহিতা এবং পরামর্শ গ্রহণ ইত্যাদির মাধ্যমে কীভাবে বিদ্যালয়ে উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবর্তন করা যায় সেজন্য শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে শুধু পেশাদার হিসেবে নয়, একজন প্রকৃত দেশ প্রেমিকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া চাই। সুশিক্ষা ছাড়া করোনা পরবর্তী বিশে^ আমাদের আজকের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে না। আমরা জানি অষ্টাদশ এবং ঊনবিংশ শতাব্দিতে ইউরোপ এবং আমেরিকায় সংঘটিত শিল্পবিপ্লবের ফলে সেখানকার সমাজ ব্যবস্থায় এক নবজাগরণের সৃষ্টি হয়েছিল। এই রি-ওপেনিংকালে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার অগ্রগতিকে কেন্দ্র করে অনুরূপ নব জাগরণের সৃষ্টি করতে হবে। শ্রেণীকক্ষের বুক-কর্নার এবং বিদ্যালয়ের লাইব্রেরি (একটি আলমারিতে রাখা পুস্তাকাদি) পুনরায় চালু করতে হবে। বইগুলোকে supplimentary reading material হিসেবে শিক্ষার্থীদের পড়তে দিতে হবে। যে সব দিনে বিদ্যালয়ে আসতে হবে না সে সব দিনে শিক্ষার্থীরা তা পড়ে জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাবে।

এই রি-ওপেনিংকালে আমাদের শিশুদের যেমন শিক্ষাদান করতে হবে তেমনি তাদেরকে বাঁচিয়েও রাখতে হবে। আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘ক্ষুদে ডাক্তার’ নামক একটি কর্মসূচি ২০১০ সাল থেকে চলমান রয়েছে। এই ক্ষুদে ডাক্তারদের এমনভাবে প্রশিক্ষণ দিতে হবে যেন তারা নিজেদের পড়ালেখা চালিয়ে যাওবার পাশাপাশি বিদ্যালয়ে একটি health culture প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। শ্রেণীকক্ষে বা যেখানে সেখানে কফ থুথু না ফেলা, নিয়মিত মাস্ক পরিধান করে বিদ্যালয়ে আসা, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া, অপরের তৈরি খোলা খাবার রাস্তা থেকে কিনে না খাওয়া, junk food এড়িয়ে চলা, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পোশাক পরিধান করা, সাঁতার শেখা, বিদ্যালয়ে সংরক্ষিত সততা স্টোরের দ্রবাদি নিয়মমাফিক ক্রয় করা, বিদ্যালয়ে সহপাঠী এবং অন্যদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করা, বড়দের সম্মান করা, ছোটদের স্নেহ করা, টয়লেট শ্রেণিকক্ষ, আঙ্গিনা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, বাগান করা, ব্যায়াম করা, মোবাইল ফোনে আসক্ত না হওয়া, স্বাস্থ্যবিধি এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সর্তকর্তা অবলম্বন, হাতের নখ কাটা, কৃমিনিধন, কুসংস্কারমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি বিষয়ে কাজ করবে ক্ষুদে ডাক্তার দল।

বিদ্যালয়ের ‘ম্যানেজমেন্ট কমিটি’ বিদ্যালয় উন্নয়নের একটি প্রধান উপাদান হলেও করোনাকালে তা নিষ্ক্রিয় রয়েছে বলা যায়। নিয়মিত সভা আহবান করে সদস্যদের সক্রিয়তা বৃদ্ধি করতে হবে। সাধারণত দেখা যায় যে কমিটি গঠনকালে লোকদের যে প্রতিযোগিতার ভাব থাকে কমিটি গঠিত হবার পর কাজের বেলায় তা অনেকটা কমে আসে। কাজেই বিদ্যালয়ের শিক্ষক সদস্যদের এ বিষয়ে তৎপর হতে হবে। কারণ বিদ্যালয় পরিচালনা তথা উন্নয়নের সব বিষয়ে ম্যানেজমেন্ট কমিটির সহযোগিতা করার এখতিয়ার রয়েছে। অনুরূপভাবে শিক্ষক-অভিভাবক সমিতি, মাদার্স ক্লাব, অভিভাবক সমাবেশ ইত্যাদি সংগঠনের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করতে হবে। জন প্রতিনিধিদের সুদৃষ্টি আকর্ষণ করতে হবে। বিদ্যালয়ের বিভিন্ন কাজে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা এবং অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় একটি গ্রামের ঐক্যের প্রতীক, ধনী-নির্ধন, সবল-দুর্বল, শিক্ষিত-নিরক্ষর নির্বিশেষে সবার সন্তান নিরাপদে শিক্ষা গ্রহণ শুরু করে এখান থেকেই। কাজেই বর্তমানে বিদ্যালয় রি-ওপেনিংকে ফলপ্রসূভাবে পরিচালনার জন্য সকলের সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন।

করোনাকালে এই রি-ওপেনিংকে ফলপ্রসু করতে শিক্ষক এবং কর্মকর্তা কর্মচারীদের যাবতীয় প্রশিক্ষণ ছুটির দিনে কিংবা রাতে অনলাইনে পরিচালনা করা যেতে পারে। এতে করে বিদ্যালয়ের শ্রেণীকাজ, শৃংখলা রক্ষা এবং স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালন এর মত গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর কোন ব্যত্যয় ঘটবে না। শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সহজ হবে। করোনার এই জরুরি পরিস্থিতিতে বিদ্যালয় চলাকালীন সশরীরে অন্যত্র গমন করে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ গ্রহণ বিদ্যালয়ের নিত্যদিনের চলমান কাজের ছন্দপতন ঘটাতে পারে। এ সময়ে তা মোটেও কাম্য নয়। দীর্ঘকাল বিদ্যালয় বন্ধের মধ্যে আমরা দেখলাম পিতা, মাতা এবং অন্যান্য অভিভাবকদের নিরন্তর সান্নিধ্য সত্বেও শিশু-শিক্ষার্থীদের যথাযথ সমাজিকীকরণ (proper socialization) হচ্ছে না। তাদের আচরণগত প্রতিক্রিয়াগুলো আমাদের ভাবিয়ে তুলেছিল। বাড়িতে শিশুকে তার মৌলিক চাহিদাগুলির সবই পূরণ করা হয়েছে। তথাপি শিক্ষক এবং সহপাঠীদের সাথে মিথস্ক্রিয়াবিহীন (interactiveless) জীবন তাদের কাছে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। ইতোপূর্বে কোনো কারণে এত দীর্ঘ সময় ধরে বিশে^র কোথাও বিদ্যালয় বন্ধ রাখতে হয়নি। এমতাবস্থায় আমরা সকলেই উপলব্ধি করছি যে করোনাকে প্রতিরোধ আমাদের সবার জন্য একটি বাস্তবতা। এই বাস্তবতাকে নিয়েই আমাদের বাঁচতে হবে। বিশে^ এ নতুন জীবনধারার নাম দেওয়া হয়েছে NEO NORMAL জীবনধারা। এই NEO NORMAL জীবনধারায় শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং এলাকাবাসীদের অভ্যস্থ করতে বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ প্রতিদিন বিদ্যালয়ে অবস্থান করে শিখন-শেখানো কার্যাদির সাথে সাথে নানাবিধ সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করবেন। সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসাররা উপজেলা শিক্ষা অফিসারের নেতৃত্বে বিদ্যালয়সমূহে সশরীরে গমন করে শিক্ষকদের এসব বিষয়ে প্রশিক্ষিত করবেন। তারা সকল শিক্ষার্থীর সুশিক্ষা নিশ্চিত করতে সুযোগ্য সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করবেন। যেন কোনো কারণেই বিদ্যালয়সমূহ পূনরায় বন্ধ করতে না হয়। তাই এই করোনাকালে আমরা আমাদের উন্নততর নৈতিক জীবন-যাপন, দক্ষ জবাবদিহিতা এবং পেশাগত সামাজিকীকরণ তথা সমন্বয়ের মাধ্যমে (কাউকে শাস্তি দিয়ে বা ছোট করে নয়) বিদ্যালয় রি-ওপেনিংকে ফলপ্রসূ ও চলমান করে রাখবো। শুধুমাত্র এটাই হোক আমাদের এখনকার প্রত্যাশা।

[লেখক : উপজেলা শিক্ষা অফিসার,

কামারখন্দ, সিরাজগঞ্জ]

শনিবার, ০৯ অক্টোবর ২০২১ , ২৪ আশ্বিন ১৪২৮ ০১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

প্রাথমিক বিদ্যালয় রি-ওপেনিংকে ফলপ্রসূ করার পথ

সন্ধ্যা রানী সাহা

করোনার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে দেশব্যাপী সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন সকল পর্যায়ের কর্মকর্তারা পরিদর্শন কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। এ সময়টা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর মাত্র ৪ (চার) মাসে ১ (এক) বছরের পড়ালেখা শেষ করতে হবে। বিষয়টি বড়দের পাশাপাশি শিশুশিক্ষার্থীরাও গুরুত্বের সাথে নিয়েছে। তাই তারা ভুলে যায় কোনদিন কারা বিদ্যালয়ে আসবে, কারা আসবে না। যদিও রুটিন দেওয়ালে টানানো রয়েছে। শিক্ষকরাও কোন শ্রেণীর ক্লাস কবে তা বলে দিয়েছেন। তথাপি প্রতিদিনই শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে উঁকি দিচ্ছে। যাদের ক্লাস নাই তাদের বাড়ি ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কোনোভাবেই যেন বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের অনাহক সমাগম না ঘটে এজন্য শিক্ষকবৃন্দ সর্তক আছেন। বিদ্যালয়ের টয়লেট থেকে শুরু করে প্রতিটি স্থান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা হচ্ছে। শুধু কি কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ! আছে ডেঙ্গুজ্বর, সর্দি-কাশি, অপুষ্টি, স্বাস্থ্য-অসচেতনতা ইত্যাদি।

বিদ্যালয়গুলোও সেভাবে প্রস্তুত। কোথাও কোনো প্রকার আর্বজনা দেখা গেলে সাথে সাথে তা পরিষ্কার করা হচ্ছে। এমন পরিচ্ছন্ন পরিবেশ কোভিড-১৯ পূর্ববর্তীকালে আমরা কমই দেখেছি। প্রতিটি বিদ্যালয়ে জ্বর মাপার জন্য ইনফ্রারেড থার্মোমিটার কেনা হয়েছে। পালস-অক্সিমিটিার, সাবান, হ্যান্ড-স্যানিটাইজার, হাত ধোয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। শিশুদের জন্য মাস্ক সরবারহ, স্যাভলন দিয়ে বিদ্যালয়ের মেঝে ধৌতকরণ অর্থাৎ কোভিড-১৯ প্রতিরোধে বিদ্যালয়সমূহে চলছে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন অভিযানের এক এলাহিকাণ্ড; যা দেখে বোঝা যায় করোনাভাইরাস আমাদের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতাকে একটা স্থায়ীরূপ দান করতে চলেছে।

হ্যাঁ, বাঁচতে হলে এসব স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। আবার সামাজিক-শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। হ্যান্ডসেক, কোলাকুলি, মারামারি, ধরাধরি, মোরগ লড়াই, কাবাডি, দাড়িয়াবান্ধা খেলা ইত্যাদি আপাতত বন্ধ। শুধু লেখাপড়াই চলবে। সূতরাং আনন্দঘন পরিবেশে শিখন-শেখানো কার্যাবলী পরিচালনা করতে হবে। শারীরিক কিংবা মানসিক শাস্তি, শিক্ষকের অবহেলা, অসুস্থতা, পড়তে না পারাÑ এসব কারণে শিশু যেন ঝরে না যায়। রি-ওপেনিংয়ের এ পরিস্থিতিতে তাই শুধু শিক্ষক নয় প্রাথমিক শিক্ষায় নিয়োজিত সবাইকে একযোগে সতর্কতার সাথে কাজ করতে হবে।

একজন শিক্ষার্থী ক্লাসে অনিয়মিত হলেও শিক্ষকের শ্রেণী পরিচালনায় সমস্যা হয়। অনুপস্থিত এই এক দুইজনের জন্য শিক্ষককে নতুন করে চিন্তা করতে হয়। তাই শিশু যেন প্রতি ক্লাসে উপস্থিত থাকে এজন্য শ্রেণীর সব শিক্ষার্থীর সাথে শিক্ষকের বন্ধুত্বপূর্ণ সর্ম্পকের খুবই প্রয়োজন। শিক্ষক তার সম্মোহনী ক্ষমতাবলে শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে পারেন। মা সমাবেশ, অভিভাবক সমাবেশ, ম্যানেজমেন্ট কমিটির সভা, হাতে কলমে-কাজের মাধ্যমে শিক্ষাদান, মাল্টিমিডিয়ার ব্যবহার, মাঝে মাঝে প্রাকৃতিক পরিবেশে নিয়ে যাওয়া, গল্পকথায় শিক্ষাদান; নানাভাবে শিক্ষক চেষ্টা করতে পারেন। শ্রেণীকক্ষে শিক্ষকের অবস্থানটিও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষক শুধুমাত্র দেওয়ালে টানানো বোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে বা চেয়ারে বসে শ্রেণীকাজ পরিচালনা করবেন না। তিনি সকল শিক্ষার্থীর নিকটে তার ছান্দসিক বিচরণে পারদর্শী হবেন। শিক্ষার্থীদের বসার ব্যবস্থায় শিক্ষক সবসময় পরিবর্তন আনয়ন করবেন। শ্রেণীতে বড় দলে কাজ, ছোট দলে কাজ, একাকী চিন্তা, জোড়ায়-জোড়ায় কাজ ইত্যাদি পরিচালনাকালে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আসনব্যবস্থা fixed না হয়ে পরিবর্তনশীল হতে হবে। এতে শ্রেণীকাজে একঘেয়েমি, ক্লান্তিভাব, ঝিমুনি এসব বোধ না করে শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়েই এক সচেতনতাময় শিখন-পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারবেন; যা এই রি-ওপেনিংকালে স্বল্প সময়কে অর্থবহভাবে ব্যবহারের উপায় হতে পারে। এ ক্ষেত্রে শ্রেণিকাজ পরিচালনার পূর্বে শিক্ষক কলেজ বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণের মতো অবশ্যই একটি সক্ষম, উন্নত এবং সমৃদ্ধ পাঠ পরিকল্পনা/পূর্ব প্রস্তুতি প্রণয়ন করে সে মোতবেক শ্রেণীকাজ পরিচালনা করবেন। Teachership শুধু শিক্ষক নিজের মধ্যে রাখবেন না। পর্যায়ক্রমে সব শিক্ষার্থীকেই তিনি ভাবিশিক্ষকে পরিণত করবেন। এই শিশুরা শ্রেণীতে যেমন অপারগ শিক্ষার্থীদের সহায়তা করতে পারে তেমনি তারা বাড়িতে গিয়েও ছোট ভাইবোন কিংবা প্রতিবেশীদের সহায়তা করতে পারে। এই রি-ওপেনিংকালের পূর্বে প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধের মধ্যে আমরা দেখেছি শিশু তার ওয়ার্কসিট এবং অ্যাকাটিভিটি সিট হাতে করে বাড়ির বাইরে এসেছে বড়দের কাছে পাঠ বিষয়ে জিজ্ঞেস করতে।

অনুপস্থিতির সংখ্যা শূন্যে নিয়ে আসা, ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনা কার্যকর শিখন-শেখানো পদ্ধতির উদ্ভাবন ও পরিচালনা, পরিদর্শকের নিকট জবাবদিহিতা এবং পরামর্শ গ্রহণ ইত্যাদির মাধ্যমে কীভাবে বিদ্যালয়ে উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবর্তন করা যায় সেজন্য শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে শুধু পেশাদার হিসেবে নয়, একজন প্রকৃত দেশ প্রেমিকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া চাই। সুশিক্ষা ছাড়া করোনা পরবর্তী বিশে^ আমাদের আজকের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে না। আমরা জানি অষ্টাদশ এবং ঊনবিংশ শতাব্দিতে ইউরোপ এবং আমেরিকায় সংঘটিত শিল্পবিপ্লবের ফলে সেখানকার সমাজ ব্যবস্থায় এক নবজাগরণের সৃষ্টি হয়েছিল। এই রি-ওপেনিংকালে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার অগ্রগতিকে কেন্দ্র করে অনুরূপ নব জাগরণের সৃষ্টি করতে হবে। শ্রেণীকক্ষের বুক-কর্নার এবং বিদ্যালয়ের লাইব্রেরি (একটি আলমারিতে রাখা পুস্তাকাদি) পুনরায় চালু করতে হবে। বইগুলোকে supplimentary reading material হিসেবে শিক্ষার্থীদের পড়তে দিতে হবে। যে সব দিনে বিদ্যালয়ে আসতে হবে না সে সব দিনে শিক্ষার্থীরা তা পড়ে জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাবে।

এই রি-ওপেনিংকালে আমাদের শিশুদের যেমন শিক্ষাদান করতে হবে তেমনি তাদেরকে বাঁচিয়েও রাখতে হবে। আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘ক্ষুদে ডাক্তার’ নামক একটি কর্মসূচি ২০১০ সাল থেকে চলমান রয়েছে। এই ক্ষুদে ডাক্তারদের এমনভাবে প্রশিক্ষণ দিতে হবে যেন তারা নিজেদের পড়ালেখা চালিয়ে যাওবার পাশাপাশি বিদ্যালয়ে একটি health culture প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। শ্রেণীকক্ষে বা যেখানে সেখানে কফ থুথু না ফেলা, নিয়মিত মাস্ক পরিধান করে বিদ্যালয়ে আসা, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া, অপরের তৈরি খোলা খাবার রাস্তা থেকে কিনে না খাওয়া, junk food এড়িয়ে চলা, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পোশাক পরিধান করা, সাঁতার শেখা, বিদ্যালয়ে সংরক্ষিত সততা স্টোরের দ্রবাদি নিয়মমাফিক ক্রয় করা, বিদ্যালয়ে সহপাঠী এবং অন্যদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করা, বড়দের সম্মান করা, ছোটদের স্নেহ করা, টয়লেট শ্রেণিকক্ষ, আঙ্গিনা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, বাগান করা, ব্যায়াম করা, মোবাইল ফোনে আসক্ত না হওয়া, স্বাস্থ্যবিধি এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সর্তকর্তা অবলম্বন, হাতের নখ কাটা, কৃমিনিধন, কুসংস্কারমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি বিষয়ে কাজ করবে ক্ষুদে ডাক্তার দল।

বিদ্যালয়ের ‘ম্যানেজমেন্ট কমিটি’ বিদ্যালয় উন্নয়নের একটি প্রধান উপাদান হলেও করোনাকালে তা নিষ্ক্রিয় রয়েছে বলা যায়। নিয়মিত সভা আহবান করে সদস্যদের সক্রিয়তা বৃদ্ধি করতে হবে। সাধারণত দেখা যায় যে কমিটি গঠনকালে লোকদের যে প্রতিযোগিতার ভাব থাকে কমিটি গঠিত হবার পর কাজের বেলায় তা অনেকটা কমে আসে। কাজেই বিদ্যালয়ের শিক্ষক সদস্যদের এ বিষয়ে তৎপর হতে হবে। কারণ বিদ্যালয় পরিচালনা তথা উন্নয়নের সব বিষয়ে ম্যানেজমেন্ট কমিটির সহযোগিতা করার এখতিয়ার রয়েছে। অনুরূপভাবে শিক্ষক-অভিভাবক সমিতি, মাদার্স ক্লাব, অভিভাবক সমাবেশ ইত্যাদি সংগঠনের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করতে হবে। জন প্রতিনিধিদের সুদৃষ্টি আকর্ষণ করতে হবে। বিদ্যালয়ের বিভিন্ন কাজে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা এবং অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় একটি গ্রামের ঐক্যের প্রতীক, ধনী-নির্ধন, সবল-দুর্বল, শিক্ষিত-নিরক্ষর নির্বিশেষে সবার সন্তান নিরাপদে শিক্ষা গ্রহণ শুরু করে এখান থেকেই। কাজেই বর্তমানে বিদ্যালয় রি-ওপেনিংকে ফলপ্রসূভাবে পরিচালনার জন্য সকলের সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন।

করোনাকালে এই রি-ওপেনিংকে ফলপ্রসু করতে শিক্ষক এবং কর্মকর্তা কর্মচারীদের যাবতীয় প্রশিক্ষণ ছুটির দিনে কিংবা রাতে অনলাইনে পরিচালনা করা যেতে পারে। এতে করে বিদ্যালয়ের শ্রেণীকাজ, শৃংখলা রক্ষা এবং স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালন এর মত গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর কোন ব্যত্যয় ঘটবে না। শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সহজ হবে। করোনার এই জরুরি পরিস্থিতিতে বিদ্যালয় চলাকালীন সশরীরে অন্যত্র গমন করে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ গ্রহণ বিদ্যালয়ের নিত্যদিনের চলমান কাজের ছন্দপতন ঘটাতে পারে। এ সময়ে তা মোটেও কাম্য নয়। দীর্ঘকাল বিদ্যালয় বন্ধের মধ্যে আমরা দেখলাম পিতা, মাতা এবং অন্যান্য অভিভাবকদের নিরন্তর সান্নিধ্য সত্বেও শিশু-শিক্ষার্থীদের যথাযথ সমাজিকীকরণ (proper socialization) হচ্ছে না। তাদের আচরণগত প্রতিক্রিয়াগুলো আমাদের ভাবিয়ে তুলেছিল। বাড়িতে শিশুকে তার মৌলিক চাহিদাগুলির সবই পূরণ করা হয়েছে। তথাপি শিক্ষক এবং সহপাঠীদের সাথে মিথস্ক্রিয়াবিহীন (interactiveless) জীবন তাদের কাছে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। ইতোপূর্বে কোনো কারণে এত দীর্ঘ সময় ধরে বিশে^র কোথাও বিদ্যালয় বন্ধ রাখতে হয়নি। এমতাবস্থায় আমরা সকলেই উপলব্ধি করছি যে করোনাকে প্রতিরোধ আমাদের সবার জন্য একটি বাস্তবতা। এই বাস্তবতাকে নিয়েই আমাদের বাঁচতে হবে। বিশে^ এ নতুন জীবনধারার নাম দেওয়া হয়েছে NEO NORMAL জীবনধারা। এই NEO NORMAL জীবনধারায় শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং এলাকাবাসীদের অভ্যস্থ করতে বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ প্রতিদিন বিদ্যালয়ে অবস্থান করে শিখন-শেখানো কার্যাদির সাথে সাথে নানাবিধ সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করবেন। সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসাররা উপজেলা শিক্ষা অফিসারের নেতৃত্বে বিদ্যালয়সমূহে সশরীরে গমন করে শিক্ষকদের এসব বিষয়ে প্রশিক্ষিত করবেন। তারা সকল শিক্ষার্থীর সুশিক্ষা নিশ্চিত করতে সুযোগ্য সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করবেন। যেন কোনো কারণেই বিদ্যালয়সমূহ পূনরায় বন্ধ করতে না হয়। তাই এই করোনাকালে আমরা আমাদের উন্নততর নৈতিক জীবন-যাপন, দক্ষ জবাবদিহিতা এবং পেশাগত সামাজিকীকরণ তথা সমন্বয়ের মাধ্যমে (কাউকে শাস্তি দিয়ে বা ছোট করে নয়) বিদ্যালয় রি-ওপেনিংকে ফলপ্রসূ ও চলমান করে রাখবো। শুধুমাত্র এটাই হোক আমাদের এখনকার প্রত্যাশা।

[লেখক : উপজেলা শিক্ষা অফিসার,

কামারখন্দ, সিরাজগঞ্জ]