নিয়ন্ত্রণের পথে করোনা সংক্রমণ

দেশে এই মুহূর্তে চিকিৎসাধীন করোনা রোগী রয়েছেন মাত্র ১১ হাজার ৭০ জন। এর মধ্যে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন প্রায় দুই হাজার রোগী। বাকি নয় হাজার রোগীই বাসায় থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। অর্থাৎ এসব রোগীর শারীরিক অবস্থা খুব একটা খারাপ নয়। এই মুহূর্তে বিশে^র ৯০টি দেশে বাংলাদেশের চেয়ে বেশি রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছে।

দেশে সংক্রমণ নিয়মিত কমতে থাকায় ‘কোভিড ডেডিকেটেড’ হাসপাতালগুলোতে রোগী ভর্তির চাপ এখন কার্যত নেই বললেই চলে। হাসপাতালগুলোর অধিকাংশ শয্যাই ফাঁকা রয়েছে। তবে স্বাস্থ্যবিধি ঢালাওভাবে উপেক্ষা করে মানুষের চলাচল বেড়ে যাওয়ায় পুনরায় সংক্রমণ বৃদ্ধির ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা।

এ বিষয়ে সরকার গঠিত কোভিড-১৯ বিষয়ক ‘জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি’র সদস্য ডা. আবু জামিল ফয়সাল সংবাদকে বলেন, ‘এখন বলা যায়, দেশে করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে। তবে এর স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ নির্ভর করছে মানুষের আচরণের ওপর, টিকা কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ওপর। মানুষ স্বাস্থ্যবিধি না মানলে যেকোন সময় পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে। সংক্রমণ হার শূন্যে নামাতে হলে মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতেই হবে।’ চলমান টিকাদান কর্মসূচি আরও জোরালো করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশিষ্ট এই জনস্বাস্থ্যবিদ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গতকালের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এ পর্যন্ত মোট ১৫ লাখ ৬১ হাজার ৮৭৮ জনের দেহে করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে গতকাল পর্যন্ত মোট সুস্থ হয়েছে ১৫ লাখ ২৩ হাজার ১৩৪ জন।

আর শনাক্ত রোগীদের মধ্যে এ পর্যন্ত ২৭ হাজার ৬৭৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ হিসাবে এই মুহূর্তে চিকিৎসাধীন রোগী অর্থাৎ ‘অ্যাক্টিভ কেইস’ রয়েছে ১১ হাজার ৭০ জন। গত জুলাইয়ের শেষের দিকে চিকিৎসাধীন রোগী ছিলেন দেড় লাখের বেশি।

সারাদেশে করোনায় আক্রান্তদের চিকিৎসায় নিয়োজিত হাসপাতালে মোট ১৪ হাজার ৯৪৫টি সাধারণ শয্যার মধ্যে গতকাল পর্যন্ত খালি ছিল ১৩ হাজার ১৭৪টি শয্যা। অর্থাৎ রোগী ভর্তি ছিল এক হাজার ৭৭১টি শয্যায়।

আর গুরুতর অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসায় সারাদেশের মোট এক হাজার ২৫২টি ‘আইসিইউ’ শয্যার মধ্যে গতকাল পর্যন্ত খালি ছিল ৯৪৮টি শয্যা। এ হিসাবে ৩০৪টি আইসিইউ শয্যা ফাঁকা ছিল।

সুস্থতায় ভালো অবস্থানে বাংলাদেশ

বিশে^র করোনা সংক্রমণের তথ্য নিয়মিত পর্যালোচনা ও সংরক্ষণ করছে যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক পরিসংখ্যান সংস্থা ‘ওয়ার্ল্ডোমিটার’। এই সংস্থাটির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিশে^ করোনা রোগী শনাক্তের সংখ্যায় ২৯তম এবং শনাক্ত রোগীদের মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যায় ২৭তম স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।

তবে শনাক্ত রোগীর মধ্যে সুস্থতার নিরিখে বেশ ভালো অবস্থানেই রয়েছে বাংলাদেশ। বিশে^র অন্তত ৯০টি দেশে এই মুহূর্তে বাংলাদেশের চেয়ে বেশি চিকিৎসাধীন রোগী রয়েছে। এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, ফ্রান্সসহ বিশে^র উন্নত দেশগুলোতেও বাংলাদেশের চেয়ে বহুগুণ বেশি চিকিৎসাধীন রয়েছে।

এ বিষয়ে ডা. আবু জামিল ফয়সাল বলেন, ‘শনাক্ত রোগীর চিকিৎসায় আমরা ভালো অবস্থানে রয়েছি, এটি ঠিক। তবে স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনে আমরা পিছিয়ে আছি। কিন্তু বিশে^র উন্নতি দেশগুলো সুস্থতায় পিছিয়ে থাকলেও তারা স্বাস্থ্যবিধি পালনে ভালো অবস্থানে রয়েছে।’

২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনে হুবেই প্রদেশের উহান শহরে প্রথম করোনাভাইরাসের জীবাণু শনাক্ত হয়। এর পর এ পর্যন্ত বিশে^র ২২৩টি দেশ ও অঞ্চলে করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। বাংলাদেশে গত বছরের ৮ মার্চ প্রথম করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হয়।

দেশে শনাক্ত করোনা রোগীর মধ্যে এ পর্যন্ত এক দশমিক ৭৭ শতাংশের মৃত্যু হয়েছে। গত ২১ সেপ্টেম্বর থেকে গতকাল পর্যন্ত টানা ১৮ দিন দেশে নমুনা পরীক্ষা অনুপাতে করোনা সংক্রমণ হার ৫ শতাংশের নিচে রয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে সংক্রমণ তিন শতাংশের নিচে অবস্থান করছে।

বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, কোন দেশে টানা তিন সপ্তাহ নমুনা পরীক্ষা অনুপাতে সংক্রমণ পাঁচ শতাংশের নিচে থাকলে ধরে নেয়া হয়, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, অর্থাৎ সেখানে মহামারী নেই।

করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে : স্বাস্থ্যমন্ত্রী

সরকারের প্রচেষ্টার কারণেই করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক গতকাল মানিকগঞ্জে এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘যথাযথ চিকিৎসা পাওয়ায় দেশে করোনায় মৃত্যুর হার কম। করোনায় আমেরিকায় সাত লাখ এবং ভারতে পাঁচ লাখ মানুষ মারা গেছেন। ঘনবসতিপূর্ণ আমাদের দেশে ২৭ হাজার মানুষ মারা গেছেন। একটি মৃত্যুও আমরা চাই না। কোন জাদুর ছোঁয়ায় মৃত্যু কম হয়নি, এর পেছনে অনেক শ্রম দিতে হয়েছে। সরকার বিনামূল্যে চিকিৎসা দিয়েছে।’

স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে এই মুহূর্তে করোনার ‘অনেক টিকা’ রয়েছে জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘দেশে প্রায় ২৫ ভাগ মানুষকে দুই ডোজ টিকা দেয়া হয়েছে। ১২ ভাগ মানুষকে দ্বিতীয় ডোজ দেয়া হয়েছে। সবমিলিয়ে প্রায় পাঁচ কোটি ডোজ টিকা দেয়া হয়েছে। ৭০ থেকে ৮০ ভাগ মানুষকে টিকা দেয়া গেলে পুরো দেশেই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এসে যাবে। যে পরিমাণ ডোজ অর্ডার দেয়া হয়েছে তাতে ৭০ থেকে ৮০ ভাগ মানুষকে দেয়া যাবে।’

দেশে করোনা সংক্রমণ কমে এসেছে উল্লেখ করে জাহিদ মালেক বলেন, ‘এখন সংক্রমণ হার ২ দশমিক ৭ ভাগ। তবে করোনার সংক্রমণ বাড়তে তো সময় লাগে না। অনেক দেশে করোনার সংক্রমণ আবার বাড়ছে। এ কারণে আমাদের স্বাস্থ্যবিধি মেনেই দৈনন্দিন কাজ এবং আচার-অনুষ্ঠান করতে হবে।’

দৈনিক শনাক্ত নামলো পাঁচশর নিচে

দেশে ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে করোনায় মৃত্যু বাড়লেও প্রায় চারমাসে দৈনিক শনাক্ত পাঁচশর নিচে নেমেছে।

গতকাল সকাল আটটা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ২০ জন, যা আগের দিন (শুক্রবার) ছিল সাতজন। ওইদিন ৬৪৫ জন নতুন রোগী শনাক্ত হলেও গতকাল শনাক্ত হয়েছে ৪১৫ জন। গত ১৬ মে’র পর দৈনিক সংক্রমণ পাঁচশর নিচে নেমেছে। ওই দিন ৩৬১ জনের দেহে করোনার জীবাণু শনাক্তের তথ্য জানিয়েছিল স্বাস্থ্য বিভাগ।

সর্বশেষ একদিনে মৃত্যু হওয়া ২০ জনকে নিয়ে দেশে এ পর্যন্ত করোনায় মোট ২৭ হাজার ৬৭৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। আরও নতুন শনাক্ত হওয়া ৪১৫ জনকে নিয়ে দেশে এ পর্যন্ত শনাক্ত হলেন ১৫ লাখ ৬১ হাজার ৮৭৮ জন। করোনায় আক্রান্তদের মধ্যে ২৪ ঘণ্টায় সুুস্থ হয়েছেন ৫৪৩ জন। এ নিয়ে মোট ১৫ লাখ ২৩ হাজার ১৩৪ জন সুস্থ হয়েছেন।

অধিদপ্তর জানিয়েছে, ২৪ ঘণ্টায় ১৬ হাজার ৯২৫টি নমুনা পরীক্ষা হয়েছে। দেশে এ পর্যন্ত করোনার মোট নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ৯৯ লাখ ৩১ হাজার ৮৪১টি। ২৪ ঘণ্টায় নমুনা পরীক্ষা অনুপাতে শনাক্তের হার দুই দশমিক ৪৫ শতাংশ।

আর এ পর্যন্ত রোগী শনাক্তের হার ১৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। শনাক্ত বিবেচনায় মোট সুস্থতার হার ৯৭ দশমিক ৫২ শতাংশ এবং মৃত্যুর হার এক দশমিক ৭৭ শতাংশ।

একদিনে মারা যাওয়া ২০ জনের মধ্যে পুরুষ ১২ জন ও নারী আট জন। দেশে এ পর্যন্ত করোনায় মৃত্যু হওয়া লোকজনের মধ্যে পুরুষ ১৭ হাজার ৭৪৫ জন এবং নারী ছিলেন নয় হাজার ৯২৯ জন।

বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, একদিনে মৃত্যু হওয়া ২০ জনের মধ্যে একজনের বয়স ছিল ৮১ থেকে ৯০ বছরের মধ্যে। এছাড়া ৭১ থেকে ৮০ বছরের মধ্যে একজন, ৬১ থেকে ৭০ বছরের মধ্যে নয় জন, ৫১ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে তিন জন, ৪১ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে দুই জন, ৩১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে দুই জন এবং দুই জনের বয়স ২১ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে ছিল।

তাদের মধ্যে ঢাকা বিভাগের নয় জন, চট্টগ্রামে চার জন, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের একজন করে, রংপুর বিভাগের তিন জন এবং ময়মনসিংহ বিভাগে দুই জন মারা গেছেন। এর মধ্যে সরকারি হাসপাতালে ১৭ জন এবং বেসরকারি হাসপাতালে তিন জনের মৃত্যু হয়েছে।

রবিবার, ১০ অক্টোবর ২০২১ , ২৫ আশ্বিন ১৪২৮ ০২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

নিয়ন্ত্রণের পথে করোনা সংক্রমণ

দেশে এখন চিকিৎসাধীন রোগী মাত্র ১১ হাজার টানা ১৮ দিন শনাক্তের হার ৫ শতাংশের নিচে

দেশে এই মুহূর্তে চিকিৎসাধীন করোনা রোগী রয়েছেন মাত্র ১১ হাজার ৭০ জন। এর মধ্যে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন প্রায় দুই হাজার রোগী। বাকি নয় হাজার রোগীই বাসায় থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন। অর্থাৎ এসব রোগীর শারীরিক অবস্থা খুব একটা খারাপ নয়। এই মুহূর্তে বিশে^র ৯০টি দেশে বাংলাদেশের চেয়ে বেশি রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছে।

দেশে সংক্রমণ নিয়মিত কমতে থাকায় ‘কোভিড ডেডিকেটেড’ হাসপাতালগুলোতে রোগী ভর্তির চাপ এখন কার্যত নেই বললেই চলে। হাসপাতালগুলোর অধিকাংশ শয্যাই ফাঁকা রয়েছে। তবে স্বাস্থ্যবিধি ঢালাওভাবে উপেক্ষা করে মানুষের চলাচল বেড়ে যাওয়ায় পুনরায় সংক্রমণ বৃদ্ধির ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা।

এ বিষয়ে সরকার গঠিত কোভিড-১৯ বিষয়ক ‘জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটি’র সদস্য ডা. আবু জামিল ফয়সাল সংবাদকে বলেন, ‘এখন বলা যায়, দেশে করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে। তবে এর স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ নির্ভর করছে মানুষের আচরণের ওপর, টিকা কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ওপর। মানুষ স্বাস্থ্যবিধি না মানলে যেকোন সময় পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে। সংক্রমণ হার শূন্যে নামাতে হলে মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতেই হবে।’ চলমান টিকাদান কর্মসূচি আরও জোরালো করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশিষ্ট এই জনস্বাস্থ্যবিদ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গতকালের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এ পর্যন্ত মোট ১৫ লাখ ৬১ হাজার ৮৭৮ জনের দেহে করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে গতকাল পর্যন্ত মোট সুস্থ হয়েছে ১৫ লাখ ২৩ হাজার ১৩৪ জন।

আর শনাক্ত রোগীদের মধ্যে এ পর্যন্ত ২৭ হাজার ৬৭৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ হিসাবে এই মুহূর্তে চিকিৎসাধীন রোগী অর্থাৎ ‘অ্যাক্টিভ কেইস’ রয়েছে ১১ হাজার ৭০ জন। গত জুলাইয়ের শেষের দিকে চিকিৎসাধীন রোগী ছিলেন দেড় লাখের বেশি।

সারাদেশে করোনায় আক্রান্তদের চিকিৎসায় নিয়োজিত হাসপাতালে মোট ১৪ হাজার ৯৪৫টি সাধারণ শয্যার মধ্যে গতকাল পর্যন্ত খালি ছিল ১৩ হাজার ১৭৪টি শয্যা। অর্থাৎ রোগী ভর্তি ছিল এক হাজার ৭৭১টি শয্যায়।

আর গুরুতর অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসায় সারাদেশের মোট এক হাজার ২৫২টি ‘আইসিইউ’ শয্যার মধ্যে গতকাল পর্যন্ত খালি ছিল ৯৪৮টি শয্যা। এ হিসাবে ৩০৪টি আইসিইউ শয্যা ফাঁকা ছিল।

সুস্থতায় ভালো অবস্থানে বাংলাদেশ

বিশে^র করোনা সংক্রমণের তথ্য নিয়মিত পর্যালোচনা ও সংরক্ষণ করছে যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক পরিসংখ্যান সংস্থা ‘ওয়ার্ল্ডোমিটার’। এই সংস্থাটির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিশে^ করোনা রোগী শনাক্তের সংখ্যায় ২৯তম এবং শনাক্ত রোগীদের মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যায় ২৭তম স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।

তবে শনাক্ত রোগীর মধ্যে সুস্থতার নিরিখে বেশ ভালো অবস্থানেই রয়েছে বাংলাদেশ। বিশে^র অন্তত ৯০টি দেশে এই মুহূর্তে বাংলাদেশের চেয়ে বেশি চিকিৎসাধীন রোগী রয়েছে। এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, ফ্রান্সসহ বিশে^র উন্নত দেশগুলোতেও বাংলাদেশের চেয়ে বহুগুণ বেশি চিকিৎসাধীন রয়েছে।

এ বিষয়ে ডা. আবু জামিল ফয়সাল বলেন, ‘শনাক্ত রোগীর চিকিৎসায় আমরা ভালো অবস্থানে রয়েছি, এটি ঠিক। তবে স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনে আমরা পিছিয়ে আছি। কিন্তু বিশে^র উন্নতি দেশগুলো সুস্থতায় পিছিয়ে থাকলেও তারা স্বাস্থ্যবিধি পালনে ভালো অবস্থানে রয়েছে।’

২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনে হুবেই প্রদেশের উহান শহরে প্রথম করোনাভাইরাসের জীবাণু শনাক্ত হয়। এর পর এ পর্যন্ত বিশে^র ২২৩টি দেশ ও অঞ্চলে করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। বাংলাদেশে গত বছরের ৮ মার্চ প্রথম করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হয়।

দেশে শনাক্ত করোনা রোগীর মধ্যে এ পর্যন্ত এক দশমিক ৭৭ শতাংশের মৃত্যু হয়েছে। গত ২১ সেপ্টেম্বর থেকে গতকাল পর্যন্ত টানা ১৮ দিন দেশে নমুনা পরীক্ষা অনুপাতে করোনা সংক্রমণ হার ৫ শতাংশের নিচে রয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে সংক্রমণ তিন শতাংশের নিচে অবস্থান করছে।

বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, কোন দেশে টানা তিন সপ্তাহ নমুনা পরীক্ষা অনুপাতে সংক্রমণ পাঁচ শতাংশের নিচে থাকলে ধরে নেয়া হয়, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, অর্থাৎ সেখানে মহামারী নেই।

করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে : স্বাস্থ্যমন্ত্রী

সরকারের প্রচেষ্টার কারণেই করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক গতকাল মানিকগঞ্জে এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘যথাযথ চিকিৎসা পাওয়ায় দেশে করোনায় মৃত্যুর হার কম। করোনায় আমেরিকায় সাত লাখ এবং ভারতে পাঁচ লাখ মানুষ মারা গেছেন। ঘনবসতিপূর্ণ আমাদের দেশে ২৭ হাজার মানুষ মারা গেছেন। একটি মৃত্যুও আমরা চাই না। কোন জাদুর ছোঁয়ায় মৃত্যু কম হয়নি, এর পেছনে অনেক শ্রম দিতে হয়েছে। সরকার বিনামূল্যে চিকিৎসা দিয়েছে।’

স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে এই মুহূর্তে করোনার ‘অনেক টিকা’ রয়েছে জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘দেশে প্রায় ২৫ ভাগ মানুষকে দুই ডোজ টিকা দেয়া হয়েছে। ১২ ভাগ মানুষকে দ্বিতীয় ডোজ দেয়া হয়েছে। সবমিলিয়ে প্রায় পাঁচ কোটি ডোজ টিকা দেয়া হয়েছে। ৭০ থেকে ৮০ ভাগ মানুষকে টিকা দেয়া গেলে পুরো দেশেই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে এসে যাবে। যে পরিমাণ ডোজ অর্ডার দেয়া হয়েছে তাতে ৭০ থেকে ৮০ ভাগ মানুষকে দেয়া যাবে।’

দেশে করোনা সংক্রমণ কমে এসেছে উল্লেখ করে জাহিদ মালেক বলেন, ‘এখন সংক্রমণ হার ২ দশমিক ৭ ভাগ। তবে করোনার সংক্রমণ বাড়তে তো সময় লাগে না। অনেক দেশে করোনার সংক্রমণ আবার বাড়ছে। এ কারণে আমাদের স্বাস্থ্যবিধি মেনেই দৈনন্দিন কাজ এবং আচার-অনুষ্ঠান করতে হবে।’

দৈনিক শনাক্ত নামলো পাঁচশর নিচে

দেশে ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে করোনায় মৃত্যু বাড়লেও প্রায় চারমাসে দৈনিক শনাক্ত পাঁচশর নিচে নেমেছে।

গতকাল সকাল আটটা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ২০ জন, যা আগের দিন (শুক্রবার) ছিল সাতজন। ওইদিন ৬৪৫ জন নতুন রোগী শনাক্ত হলেও গতকাল শনাক্ত হয়েছে ৪১৫ জন। গত ১৬ মে’র পর দৈনিক সংক্রমণ পাঁচশর নিচে নেমেছে। ওই দিন ৩৬১ জনের দেহে করোনার জীবাণু শনাক্তের তথ্য জানিয়েছিল স্বাস্থ্য বিভাগ।

সর্বশেষ একদিনে মৃত্যু হওয়া ২০ জনকে নিয়ে দেশে এ পর্যন্ত করোনায় মোট ২৭ হাজার ৬৭৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। আরও নতুন শনাক্ত হওয়া ৪১৫ জনকে নিয়ে দেশে এ পর্যন্ত শনাক্ত হলেন ১৫ লাখ ৬১ হাজার ৮৭৮ জন। করোনায় আক্রান্তদের মধ্যে ২৪ ঘণ্টায় সুুস্থ হয়েছেন ৫৪৩ জন। এ নিয়ে মোট ১৫ লাখ ২৩ হাজার ১৩৪ জন সুস্থ হয়েছেন।

অধিদপ্তর জানিয়েছে, ২৪ ঘণ্টায় ১৬ হাজার ৯২৫টি নমুনা পরীক্ষা হয়েছে। দেশে এ পর্যন্ত করোনার মোট নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ৯৯ লাখ ৩১ হাজার ৮৪১টি। ২৪ ঘণ্টায় নমুনা পরীক্ষা অনুপাতে শনাক্তের হার দুই দশমিক ৪৫ শতাংশ।

আর এ পর্যন্ত রোগী শনাক্তের হার ১৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। শনাক্ত বিবেচনায় মোট সুস্থতার হার ৯৭ দশমিক ৫২ শতাংশ এবং মৃত্যুর হার এক দশমিক ৭৭ শতাংশ।

একদিনে মারা যাওয়া ২০ জনের মধ্যে পুরুষ ১২ জন ও নারী আট জন। দেশে এ পর্যন্ত করোনায় মৃত্যু হওয়া লোকজনের মধ্যে পুরুষ ১৭ হাজার ৭৪৫ জন এবং নারী ছিলেন নয় হাজার ৯২৯ জন।

বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, একদিনে মৃত্যু হওয়া ২০ জনের মধ্যে একজনের বয়স ছিল ৮১ থেকে ৯০ বছরের মধ্যে। এছাড়া ৭১ থেকে ৮০ বছরের মধ্যে একজন, ৬১ থেকে ৭০ বছরের মধ্যে নয় জন, ৫১ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে তিন জন, ৪১ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে দুই জন, ৩১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে দুই জন এবং দুই জনের বয়স ২১ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে ছিল।

তাদের মধ্যে ঢাকা বিভাগের নয় জন, চট্টগ্রামে চার জন, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের একজন করে, রংপুর বিভাগের তিন জন এবং ময়মনসিংহ বিভাগে দুই জন মারা গেছেন। এর মধ্যে সরকারি হাসপাতালে ১৭ জন এবং বেসরকারি হাসপাতালে তিন জনের মৃত্যু হয়েছে।