ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের সহায়তা দেবে জাতিসংঘ

এক সময় রোহিঙ্গাদের কক্সবাজার থেকে স্থানান্তরের বিরোধিতা করলেও অবস্থান পরিবর্তন করে ভাসানচরে শরণার্থীদের জন্য কাজ শুরু করতে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করেছে জাতিসংঘ। এখন থেকে কক্সবাজারের পাশপাশি ভাসানচরেও জাতিসংঘের সংস্থাগুলো রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহয়াতা কর্মসূচি পরিচালনা করবে।

গতকাল বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোহসীন এবং জাতিসংঘের পক্ষে শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনারের (ইউএনএইচসিআর) বাংলাদেশস্থ প্রতিনিধি জোহানস ভ্যান ডার ক্ল সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এমওইউ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে দুর্যোগ ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী মো. এনামুর রহমান ও মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি ক্যাপ্টেন এবি তাজুল ইসলাম (অব.) উপস্থিত ছিলেন।

মায়ানমারে দমন-পীড়নের মুখে পালিয়ে আসা চার লাখের বেশি রোহিঙ্গা দীর্ঘদিন ধরে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে রয়েছে। ২০১৭ সালে তার সঙ্গে যোগ হয় আরও ৭ লাখ রোহিঙ্গা। কক্সবাজারে বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী শিবিরে ১১ লাখ রোহিঙ্গার সহাতায় জাতিসংঘ কাজ করে যাচ্ছিল। তবে কক্সবাজারের উপর চাপ কমাতে বাংলাদেশ সরকার যখন রোহিঙ্গাদের একাংশকে নোয়াখালীর জনবিরল দ্বীপ ভাসানচরে নেয়ার উদ্যোগ নেয়, তাতে বিরোধিতা করে বিশ্ব সংস্থাটি। এর মধ্যে গত দেড় বছরে কয়েক হাজার রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে নেয়ার পাশাপাশি জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে মানানোর চেষ্টা চালিয়ে যায়, আর তাতে সফলতাও এল।

সমঝোতা স্মারকে কী রয়েছে- জানতে চাইলে সচিব মো. মোহসীন বলেন, ‘জাতিসংঘের সংস্থাসমূহ কর্তৃক কক্সবাজারের ন্যায় ভাসানচরেও মানবিক সহায়তা পরিচালিত হবে। বেসামরিক প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে এখানে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালিত হবে।’

বাংলাদেশ সরকার ও ইউএনএইচসিআরের যৌথ উদ্যোগে রোহিঙ্গা নাগরিকদের খাদ্য ও পুষ্টি, সুপেয় পানি, পয়ঃনিষ্কাশন, চিকিৎসা, মায়ানমার কারিকুলাম ও ভাষায় এফডিএমএনদের অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা এবং জীবিকায়নের ব্যবস্থা করা হবে ভাসানচরে। এই কাজটি এতদিন সরকার একাই করে আসছিল। বাংলাদেশ সরকার এখানে বসবাসরত এফডিএমএন ও কর্মরত জাতিসংঘ এবং এর সহযোগী সংস্থা ও দেশীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিওকর্মীদের নিরাপত্তার বিষয় দেখাশুনা করবে।

এছাড়া ভাসানচরে এফডিএমএনদের (ফোর্সফুলি ডিসপ্লেড মায়ানমার ন্যাশনালস বা জোরপূর্বক বিতাড়িত মায়ানমারের নাগরিক) বসবাসের কারণে পার্শ্ববর্তী স্থানীয় এলাকা ও জনগণের ওপর যদি প্রভাব পড়ে, তা নিরসনে জাতিসংঘের সংস্থাসমূহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, ‘নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথেষ্ট নেয়া হয়েছে ভাসানচরে। বাড়তি নিরাপত্তা হিসেবে আরও অতিরিক্ত ২০০ আনসার নিয়োগ দেয়া হচ্ছে।’

প্রতিমন্ত্রী মো. এনামুর রাহমান বলেন, ‘জনসংখ্যার অতি ঘনবসতি ও পরিবেশের ঝুঁকি হ্রাসের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে এক লাখ রোহিঙ্গাকে নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার ভাসানচরে বসবাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘ভাসানচরে ১৪৪০টি আশ্রয়গৃহ ও ১২০টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। এ পর্যন্ত ৪ হাজার ৭২৪ পরিবারের ১৮ হাজার ৮৪৬ জনকে সেখানে নেয়া হয়েছে।’

আগামী ৩ মাসের মধ্যে আরও প্রায় ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে স্থানান্তরের পরিকল্পনাও জানান প্রতিমন্ত্রী। রোহিঙ্গাদের মায়ানমারে ফেরত পাঠাতে জাতিসংঘের সক্রিয় ভূমিকা প্রত্যাশা করে তিনি বলেন, ‘ভাসানচর কিংবা কক্সবাজারে বলপূর্বক ব্যস্তচ্যুত মায়ানমার নাগরিকদের থাকার যে ব্যবস্থা করা হয়েছে, তা সাময়িক। আমাদের মূল লক্ষ্য মায়ানমারের এ সকল বাস্তুচ্যুত নাগরিকদের মায়ানমারে দ্রুত প্রত্যাবাসন।’

এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী এনামুর বলেন, ‘ভাসানচরে রোহিঙ্গারা খাবার পাচ্ছে না বলে যে তথ্যের কথা আপনি (সাংবাদিক) বলছেন, তা সত্য নয়। সেখানে এখন বাংলাদেশের ৩৪টি এনজিও কাজ করছে।’

ইউএনএইচসিআর প্রতিনিধি জোহানস ভ্যান ডার ক্ল অনুষ্ঠানে বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের সার্বিক সহযোগিতায় মায়ানমারের বাস্তুচ্যুত নাগরিকদের আশ্রয়, খাদ্য, চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা সহজ হয়েছে।’

রবিবার, ১০ অক্টোবর ২০২১ , ২৫ আশ্বিন ১৪২৮ ০২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের সহায়তা দেবে জাতিসংঘ

চুক্তি সই

এক সময় রোহিঙ্গাদের কক্সবাজার থেকে স্থানান্তরের বিরোধিতা করলেও অবস্থান পরিবর্তন করে ভাসানচরে শরণার্থীদের জন্য কাজ শুরু করতে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করেছে জাতিসংঘ। এখন থেকে কক্সবাজারের পাশপাশি ভাসানচরেও জাতিসংঘের সংস্থাগুলো রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহয়াতা কর্মসূচি পরিচালনা করবে।

গতকাল বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোহসীন এবং জাতিসংঘের পক্ষে শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনারের (ইউএনএইচসিআর) বাংলাদেশস্থ প্রতিনিধি জোহানস ভ্যান ডার ক্ল সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এমওইউ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে দুর্যোগ ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী মো. এনামুর রহমান ও মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি ক্যাপ্টেন এবি তাজুল ইসলাম (অব.) উপস্থিত ছিলেন।

মায়ানমারে দমন-পীড়নের মুখে পালিয়ে আসা চার লাখের বেশি রোহিঙ্গা দীর্ঘদিন ধরে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে রয়েছে। ২০১৭ সালে তার সঙ্গে যোগ হয় আরও ৭ লাখ রোহিঙ্গা। কক্সবাজারে বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী শিবিরে ১১ লাখ রোহিঙ্গার সহাতায় জাতিসংঘ কাজ করে যাচ্ছিল। তবে কক্সবাজারের উপর চাপ কমাতে বাংলাদেশ সরকার যখন রোহিঙ্গাদের একাংশকে নোয়াখালীর জনবিরল দ্বীপ ভাসানচরে নেয়ার উদ্যোগ নেয়, তাতে বিরোধিতা করে বিশ্ব সংস্থাটি। এর মধ্যে গত দেড় বছরে কয়েক হাজার রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে নেয়ার পাশাপাশি জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে মানানোর চেষ্টা চালিয়ে যায়, আর তাতে সফলতাও এল।

সমঝোতা স্মারকে কী রয়েছে- জানতে চাইলে সচিব মো. মোহসীন বলেন, ‘জাতিসংঘের সংস্থাসমূহ কর্তৃক কক্সবাজারের ন্যায় ভাসানচরেও মানবিক সহায়তা পরিচালিত হবে। বেসামরিক প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে এখানে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালিত হবে।’

বাংলাদেশ সরকার ও ইউএনএইচসিআরের যৌথ উদ্যোগে রোহিঙ্গা নাগরিকদের খাদ্য ও পুষ্টি, সুপেয় পানি, পয়ঃনিষ্কাশন, চিকিৎসা, মায়ানমার কারিকুলাম ও ভাষায় এফডিএমএনদের অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা এবং জীবিকায়নের ব্যবস্থা করা হবে ভাসানচরে। এই কাজটি এতদিন সরকার একাই করে আসছিল। বাংলাদেশ সরকার এখানে বসবাসরত এফডিএমএন ও কর্মরত জাতিসংঘ এবং এর সহযোগী সংস্থা ও দেশীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিওকর্মীদের নিরাপত্তার বিষয় দেখাশুনা করবে।

এছাড়া ভাসানচরে এফডিএমএনদের (ফোর্সফুলি ডিসপ্লেড মায়ানমার ন্যাশনালস বা জোরপূর্বক বিতাড়িত মায়ানমারের নাগরিক) বসবাসের কারণে পার্শ্ববর্তী স্থানীয় এলাকা ও জনগণের ওপর যদি প্রভাব পড়ে, তা নিরসনে জাতিসংঘের সংস্থাসমূহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, ‘নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথেষ্ট নেয়া হয়েছে ভাসানচরে। বাড়তি নিরাপত্তা হিসেবে আরও অতিরিক্ত ২০০ আনসার নিয়োগ দেয়া হচ্ছে।’

প্রতিমন্ত্রী মো. এনামুর রাহমান বলেন, ‘জনসংখ্যার অতি ঘনবসতি ও পরিবেশের ঝুঁকি হ্রাসের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে এক লাখ রোহিঙ্গাকে নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার ভাসানচরে বসবাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘ভাসানচরে ১৪৪০টি আশ্রয়গৃহ ও ১২০টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। এ পর্যন্ত ৪ হাজার ৭২৪ পরিবারের ১৮ হাজার ৮৪৬ জনকে সেখানে নেয়া হয়েছে।’

আগামী ৩ মাসের মধ্যে আরও প্রায় ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে স্থানান্তরের পরিকল্পনাও জানান প্রতিমন্ত্রী। রোহিঙ্গাদের মায়ানমারে ফেরত পাঠাতে জাতিসংঘের সক্রিয় ভূমিকা প্রত্যাশা করে তিনি বলেন, ‘ভাসানচর কিংবা কক্সবাজারে বলপূর্বক ব্যস্তচ্যুত মায়ানমার নাগরিকদের থাকার যে ব্যবস্থা করা হয়েছে, তা সাময়িক। আমাদের মূল লক্ষ্য মায়ানমারের এ সকল বাস্তুচ্যুত নাগরিকদের মায়ানমারে দ্রুত প্রত্যাবাসন।’

এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী এনামুর বলেন, ‘ভাসানচরে রোহিঙ্গারা খাবার পাচ্ছে না বলে যে তথ্যের কথা আপনি (সাংবাদিক) বলছেন, তা সত্য নয়। সেখানে এখন বাংলাদেশের ৩৪টি এনজিও কাজ করছে।’

ইউএনএইচসিআর প্রতিনিধি জোহানস ভ্যান ডার ক্ল অনুষ্ঠানে বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের সার্বিক সহযোগিতায় মায়ানমারের বাস্তুচ্যুত নাগরিকদের আশ্রয়, খাদ্য, চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা সহজ হয়েছে।’