মুখথুবরে পড়েছে মা ইলিশ রক্ষার অভিযান

নিষেধাজ্ঞা শুরুর মাত্র ৪ দিনের মাথায় বিস্তীর্ণ মেঘনাসহ বরিশালের বিভিন্ন নদনদীতে মুখথুবরে পড়েছে মা ইলিশ রক্ষার অভিযান। বরিশাল জেলার হিজলা ও মেহেন্দিগঞ্জসংলগ্ন প্রায় দুইশ কিলোমিটার মেঘনায় প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের ছত্রছায়ায় শত শত জেলে মা ইলিশ নিধন করছে। ইলিশের প্রজনন বৃদ্ধিতে গত ৪ অক্টোবর থেকে মা ইলিশ রক্ষায় শুরু হয়েছে ২২ দিনের সরকারের ঘোষিত নিষেধাজ্ঞা। প্রথম দুদিন জেলেরা ভয়ে নদীতে না নামলেও বুধবার থেকে হিজলা ও মেহেন্দিগঞ্জসংলগ্ন মেঘনা, তেঁতুলিয়া, কালাবদর এবং বাবুগঞ্জসংলগ্ন সন্ধ্যা নদী ও আড়িয়াল খাঁ নদের বিভিন্ন পয়েন্টে মা ইলিশ নিধন করা হচ্ছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা অবশ্য দাবি করেছেন, তারা সাধ্যমতো চেষ্টা করছেন মা ইলিশ রক্ষার অভিযান সফল করতে।

জাতীয় মৎস্যজীবী সমিতির হিজলা উপজেলা শাখার সভাপতি জাকির হোসেন সিকদার বৃহস্পতিবার দুপুরে জানান, বুধবার থেকে মেঘনায় অভিযান নেই বললেই চলে। শত শত জেলেরা উত্তরে পুরান হিজলা থেকে দক্ষিণে বালুরচর পর্যন্ত প্রায় ১৫০ কিলোমিটার মেঘনায় দাপটের সঙ্গে মা ইলিশ ধরছে। মেঘনার জানপুর, খালিশপুর ও অন্তরবাম পয়েন্টে বড় বড় ট্রলার নিয়ে মা ইলিশ নিধনের উৎসব চলছে। তিনি আরো জানান, আমরা সমিতির পক্ষ থেকে উপজেলা প্রশাসন এবং মৎস্য বিভাগকে বিষয়টি জানিয়েছি। কিন্তু আমাদের কথা কেউ শোনেন না। তিনি অভিযোগ করেন, মূল মেঘনাসহ হিজলার সবগুলো শাখা নদীতে মা ইলিশ ধরা হচ্ছে। হিজলা থেকে একাধিক সূত্র জানিয়েছে, উত্তরে পুরান হিজলা থেকে দক্ষিণে বালুরচর পর্যন্ত মেঘনা তীরে শতাধিক মাছঘাট রয়েছে। রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা একডজনের বেশি প্রভাবশালী ইলিশ ব্যবসায়ী এসব মাছঘাটের মালিক। নিষেধাজ্ঞা শুরুর প্রথম দুদিন মাছঘাটগুলো বন্ধ ছিল। কিন্তু বুধবার থেকে সরব হয়ে উঠছে এসব মাছঘাট। অসাধু জেলেরা মা ইলিশ ধরে নৌকা-ট্রলার বোঝাই করে মাছঘাটগুলো নিয়ে বিক্রি করছেন।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী জেলে সমিতির হিজলা শাখার সভাপতি ও বড়জালিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এনায়েত হোসেন হাওলাদার বলেন, এ বছর মা ইলিশ রক্ষা করা যাচ্ছে না। মা ইলিশ রক্ষায় কঠোর অভিযান চালানোর কথা বলা হলেও এখন অভিযানে তেমন কোন গতি নেই। হিজলাসংলগ্ন মেঘনা ও বিভিন্ন শাখা নদীতে যা চলছে তাতে ইলিশের সর্বনাশ হবেই হবে।

মেঘনা তীরের লালপুর ও অন্তরবাম এলাকার একাধিক বাসিন্দা জানান, গত দুদিন ধরে সকাল-দুপুর-সন্ধ্যায় কিম্বা রাতে নদীর তীরে গেলেই সস্তায় ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। বড় বড় ডিমভরা ইলিশ বিক্রি হয় ৩০০-৪০০ টাকা কেজি দরে। হিজলা উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. আবদুল হালিম বলেন, জেলে নেতারা ঢালাওভাবে যে অভিযোগ করেছেন তা সত্য নয়। প্রতিদিন চারটি নৌযান নিয়ে মেঘনা ও শাখা নদীগুলোতে অভিযান চালানো হচ্ছে। গত দুদিনে ২২ জন জেলেকে আটক করে কারাদ- দেয়া হয়েছে। কিছু অসাধু জেলে যেখানে টহল শেষ হয় সেখানে গিয়ে ইলিশ ধরে। এদের সংখ্যা অতি সামান্য। নৌপুলিশের হিজলা স্টেশন ইনচার্জ পরিদর্শক সোহেল রানা বলেন, ১২ জন ফোর্স ও দুটি টহল বোট দিয়ে যতটা সম্ভব চেষ্টা করা হচ্ছে মা ইলিশ রক্ষার। এদিকে মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলাসংলগ্ন মেঘনার সাদিকপুর, আলীগঞ্জ ও মহিষা পয়েন্টের ৫০ কিলোমিটার জুড়ে চলছে মা ইলিশ নিধন উৎসব। তেঁতুলিয়ার আমীরগঞ্জ ও জাঙ্গালিয়া এবং কালাবদর নদীর লেঙ্গুটিয়া ও বামনীরচর পয়েন্টে অসাধু জেলেরা সকাল ও রাতে মা ইলিশ নিধন করছেন বলে সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন। অপরদিকে আড়িয়াল খাঁ নদের শাখা নদী সন্ধ্যা নদীতেও প্রতিদিন রাতে বেপরোয়াভাবে মা ইলিশের নিধন চলছে বলে উজিরপুর থেকে খবর পাওয়া গেছে। এদিকে সরকারি কর্মাকর্তারা এখন ইলিশ রক্ষার জন্য দিনের বেলাতেও অভিযান চালিয়ে জেলেদের হামলার শিকার হচ্ছেন। তবে মেহেন্দিগঞ্জের সর্বত্র সফলভাবে মা ইলিশ রক্ষা অভিযান পরিচালিত হচ্ছে বলে দাবি করেছেন উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ভিক্টর বাইন। তিনি বলেন, আমরা মা ইলিশ রক্ষায় সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। বুধবার ৮ জন এবং বৃহস্পতিবার ৫ জন জেলেকে আটক করে বিভিন্ন মেয়াদে দ- দেয়া হয়েছে।

বরিশাল মৎস্য অধিদপ্তরের মৎস্য সম্প্রসারণ কর্মকর্তা (ইলিশ) বিমল চন্দ্র দাস বলেন, জেলার নদ-নদীতে প্রতিদিন ৩৫টি টিম টহল দেয়। অভ্যন্তরীণ নদ-নদীতে এখন প্রচুর মা ইলিশ এসেছে। কোস্টগার্ড ও নৌপুলিশের সমম্বয়ে মা ইলিশ রক্ষায় সর্বশক্তি নিয়ে আমরা অভিযান চালাচ্ছি। তবে কিছু লোভী জেলে অভিযান ফাঁকি দিয়ে মা ইলিশ ধরছে। আমরা তাও বন্ধ করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি।

রবিবার, ১০ অক্টোবর ২০২১ , ২৫ আশ্বিন ১৪২৮ ০২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

মুখথুবরে পড়েছে মা ইলিশ রক্ষার অভিযান

নিষেধাজ্ঞা শুরুর মাত্র ৪ দিনের মাথায় বিস্তীর্ণ মেঘনাসহ বরিশালের বিভিন্ন নদনদীতে মুখথুবরে পড়েছে মা ইলিশ রক্ষার অভিযান। বরিশাল জেলার হিজলা ও মেহেন্দিগঞ্জসংলগ্ন প্রায় দুইশ কিলোমিটার মেঘনায় প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের ছত্রছায়ায় শত শত জেলে মা ইলিশ নিধন করছে। ইলিশের প্রজনন বৃদ্ধিতে গত ৪ অক্টোবর থেকে মা ইলিশ রক্ষায় শুরু হয়েছে ২২ দিনের সরকারের ঘোষিত নিষেধাজ্ঞা। প্রথম দুদিন জেলেরা ভয়ে নদীতে না নামলেও বুধবার থেকে হিজলা ও মেহেন্দিগঞ্জসংলগ্ন মেঘনা, তেঁতুলিয়া, কালাবদর এবং বাবুগঞ্জসংলগ্ন সন্ধ্যা নদী ও আড়িয়াল খাঁ নদের বিভিন্ন পয়েন্টে মা ইলিশ নিধন করা হচ্ছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা অবশ্য দাবি করেছেন, তারা সাধ্যমতো চেষ্টা করছেন মা ইলিশ রক্ষার অভিযান সফল করতে।

জাতীয় মৎস্যজীবী সমিতির হিজলা উপজেলা শাখার সভাপতি জাকির হোসেন সিকদার বৃহস্পতিবার দুপুরে জানান, বুধবার থেকে মেঘনায় অভিযান নেই বললেই চলে। শত শত জেলেরা উত্তরে পুরান হিজলা থেকে দক্ষিণে বালুরচর পর্যন্ত প্রায় ১৫০ কিলোমিটার মেঘনায় দাপটের সঙ্গে মা ইলিশ ধরছে। মেঘনার জানপুর, খালিশপুর ও অন্তরবাম পয়েন্টে বড় বড় ট্রলার নিয়ে মা ইলিশ নিধনের উৎসব চলছে। তিনি আরো জানান, আমরা সমিতির পক্ষ থেকে উপজেলা প্রশাসন এবং মৎস্য বিভাগকে বিষয়টি জানিয়েছি। কিন্তু আমাদের কথা কেউ শোনেন না। তিনি অভিযোগ করেন, মূল মেঘনাসহ হিজলার সবগুলো শাখা নদীতে মা ইলিশ ধরা হচ্ছে। হিজলা থেকে একাধিক সূত্র জানিয়েছে, উত্তরে পুরান হিজলা থেকে দক্ষিণে বালুরচর পর্যন্ত মেঘনা তীরে শতাধিক মাছঘাট রয়েছে। রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা একডজনের বেশি প্রভাবশালী ইলিশ ব্যবসায়ী এসব মাছঘাটের মালিক। নিষেধাজ্ঞা শুরুর প্রথম দুদিন মাছঘাটগুলো বন্ধ ছিল। কিন্তু বুধবার থেকে সরব হয়ে উঠছে এসব মাছঘাট। অসাধু জেলেরা মা ইলিশ ধরে নৌকা-ট্রলার বোঝাই করে মাছঘাটগুলো নিয়ে বিক্রি করছেন।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী জেলে সমিতির হিজলা শাখার সভাপতি ও বড়জালিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এনায়েত হোসেন হাওলাদার বলেন, এ বছর মা ইলিশ রক্ষা করা যাচ্ছে না। মা ইলিশ রক্ষায় কঠোর অভিযান চালানোর কথা বলা হলেও এখন অভিযানে তেমন কোন গতি নেই। হিজলাসংলগ্ন মেঘনা ও বিভিন্ন শাখা নদীতে যা চলছে তাতে ইলিশের সর্বনাশ হবেই হবে।

মেঘনা তীরের লালপুর ও অন্তরবাম এলাকার একাধিক বাসিন্দা জানান, গত দুদিন ধরে সকাল-দুপুর-সন্ধ্যায় কিম্বা রাতে নদীর তীরে গেলেই সস্তায় ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে। বড় বড় ডিমভরা ইলিশ বিক্রি হয় ৩০০-৪০০ টাকা কেজি দরে। হিজলা উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. আবদুল হালিম বলেন, জেলে নেতারা ঢালাওভাবে যে অভিযোগ করেছেন তা সত্য নয়। প্রতিদিন চারটি নৌযান নিয়ে মেঘনা ও শাখা নদীগুলোতে অভিযান চালানো হচ্ছে। গত দুদিনে ২২ জন জেলেকে আটক করে কারাদ- দেয়া হয়েছে। কিছু অসাধু জেলে যেখানে টহল শেষ হয় সেখানে গিয়ে ইলিশ ধরে। এদের সংখ্যা অতি সামান্য। নৌপুলিশের হিজলা স্টেশন ইনচার্জ পরিদর্শক সোহেল রানা বলেন, ১২ জন ফোর্স ও দুটি টহল বোট দিয়ে যতটা সম্ভব চেষ্টা করা হচ্ছে মা ইলিশ রক্ষার। এদিকে মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলাসংলগ্ন মেঘনার সাদিকপুর, আলীগঞ্জ ও মহিষা পয়েন্টের ৫০ কিলোমিটার জুড়ে চলছে মা ইলিশ নিধন উৎসব। তেঁতুলিয়ার আমীরগঞ্জ ও জাঙ্গালিয়া এবং কালাবদর নদীর লেঙ্গুটিয়া ও বামনীরচর পয়েন্টে অসাধু জেলেরা সকাল ও রাতে মা ইলিশ নিধন করছেন বলে সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন। অপরদিকে আড়িয়াল খাঁ নদের শাখা নদী সন্ধ্যা নদীতেও প্রতিদিন রাতে বেপরোয়াভাবে মা ইলিশের নিধন চলছে বলে উজিরপুর থেকে খবর পাওয়া গেছে। এদিকে সরকারি কর্মাকর্তারা এখন ইলিশ রক্ষার জন্য দিনের বেলাতেও অভিযান চালিয়ে জেলেদের হামলার শিকার হচ্ছেন। তবে মেহেন্দিগঞ্জের সর্বত্র সফলভাবে মা ইলিশ রক্ষা অভিযান পরিচালিত হচ্ছে বলে দাবি করেছেন উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ভিক্টর বাইন। তিনি বলেন, আমরা মা ইলিশ রক্ষায় সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। বুধবার ৮ জন এবং বৃহস্পতিবার ৫ জন জেলেকে আটক করে বিভিন্ন মেয়াদে দ- দেয়া হয়েছে।

বরিশাল মৎস্য অধিদপ্তরের মৎস্য সম্প্রসারণ কর্মকর্তা (ইলিশ) বিমল চন্দ্র দাস বলেন, জেলার নদ-নদীতে প্রতিদিন ৩৫টি টিম টহল দেয়। অভ্যন্তরীণ নদ-নদীতে এখন প্রচুর মা ইলিশ এসেছে। কোস্টগার্ড ও নৌপুলিশের সমম্বয়ে মা ইলিশ রক্ষায় সর্বশক্তি নিয়ে আমরা অভিযান চালাচ্ছি। তবে কিছু লোভী জেলে অভিযান ফাঁকি দিয়ে মা ইলিশ ধরছে। আমরা তাও বন্ধ করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি।