নারী জাগরণের পথিকৃৎ নীলিমা ইব্রাহীম

বাংলার নারী জাগরণের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম ড. নীলিমা ইব্রাহিম, যিনি আজন্ম নারীর আত্মোন্নয়নের জন্য কাজ করে গেছেন, সমাজে সমতা প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছেন। তার ৮০ বছরের জীবনে কর্মের ব্যাপ্তি এতটাই বিশাল- তা বলে শেষ করা যাবে না। কি শিক্ষায়, কি সাহিত্যে, সমাজসেবায় বা অর্থনীতি চিন্তায়, রাজনীতির বাস্তবতায় বা নারীর সঠিক পরিচর্যায় প্রতিটি ক্ষেত্রে তার বিচরণ ছিল উজ্জ্বল, দেদিপ্যমান।

বাংলার নারী অগ্রযাত্রায় বা নারীর ক্ষমতায়নে অন্যতম পথিকৃৎ নীলিমা ইব্রাহিম। জাতীয় জীবনে নারীর অগ্রযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তনের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত নারীদের পুনর্বাসন এবং তাদের মর্মস্পর্শী বেদনা ও সংগ্রাম প্রকাশে ছিল তার অনন্য অবদান, যা চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনিই প্রথম বীরাঙ্গনাদের দুঃখ-দুর্দশার কথা তুলে ধরেছিলেন তার লেখার মধ্য দিয়ে। তিনিই প্রথম একজন যিনি বীরাঙ্গনাদের সম্মান দিয়ে লিখেছিলেন। এক কথায় মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত নারীদের পুনর্বাসনে নীলিমা ইব্রাহিম যে অসামান্য অবদান রেখেছে, তা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে এই বাংলায়।

তার কথা বলতে গিয়ে অনেকেই বলেন, আধুনিক বাংলা সমাজে ও জাতীয় জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য নীলিমা ইব্রাহিমের তুলনা নীলিমা ইব্রাহিম নিজেই। এই অতুলনীয় নারী আমাদের জীবনে সব সময অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবেন। পুরুষের পাশাপাশি নারীর স্বাবলম্বী হওয়ার দৃষ্টিভঙ্গির কথাই যেন তার গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধের আলোচ্য বিষয় ছিল। সমাজে অসম বিকাশের জন্য নারীমুক্তির ক্ষেত্রে যে অচলায়তন ভেঙে নারী-পুরুষের সুস্থ-স্বাভাবিক, আত্মসম্মান বোধসম্পন্ন জীবনলাভই তার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য ছিল। বাঙালি ও বাংলাদেশের সামাজিক অগ্রযাত্রায় পুরোটা জীবন ধরে বিশেষ ভূমিকা রেখে গেছেন মহীয়সী এই নারী।

নীলিমা রায় চৌধুরী, ১৯২১ সালের ১১ অক্টোবর খুলনায় জন্মগ্রহণ করেন। বাবা প্রফুল্ল কুমার রায় চৌধুরী আর মা কুসুম কুমার দেবী। তার বাবা ছিলেন খুলনার বিশিষ্ট উকিল। তার পূর্বপুরুষ ছিলেন জমিদার বংশের। নীলিমা রায় চৌধুরীর শিক্ষা জীবন ছিল দারুণ গৌরবোজ্জ্বল। ১৯৩৫ সালে চারটি বিষয়ে লেটার নম্বর নিয়ে ম্যাট্টিক পাস করেন। বিজ্ঞান নিয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে ভর্তি হন। ১৯৪১ সালে প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে প্রথম শ্রেণী লাভ করেন। তিনিই প্রথম বাঙালি নারী, যিনি ১৯৫৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন।

নীলিমা রায় চৌধুরী ১৯৪৫ সালে ইন্ডিয়ান আর্মি মেডিকেল কোরের ক্যাপ্টেন ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিমকে বিয়ে করেন। বিয়ের পরই তিনি নীলিমা রায় চৌধুরী থেকে স্বামীর নামের সঙ্গে মিলিয়ে নীলিমা ইব্রাহিম নামে নিজেকে পরিচিত করেন। পরবর্তীতে নীলিমা ইব্রাহিম নামেই পরিচিত হয়ে ওঠেন। তিনি পাঁচ কন্যা সন্তানের জননী।

নীলিমা ইব্রাহিম বাংলার নারীজাগরণের পথিকৃতদের মধ্যে একজন। নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে আমৃত্যৃ নারীর আত্মোন্নয়নে কাজ করে গেছেন নিরলস। সত্যকে প্রতিষ্ঠা ও নারীর অগ্রযাত্রায় তার অনমনীয় দৃঢ়তা সত্যিই বিস্ময়কর।

ষাটের দশকের শুরু থেকেই তার বেশ কিছু উপন্যাস যেমন ‘বিশ শতকের মেয়ে’, ‘একপথ দুইবাঁক’, ‘কেয়াবন সঞ্চারিণী’ প্রকাশিত হয়। তাছাড়া তার বেশ কিছু প্রবন্ধ এ সময় সাহিত্যিক সমাজে তোলপাড় সৃষ্টি করে। ‘শরৎ প্রতিভা’, ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত’, ‘বাংলার কবি মধুসূদন’ এবং তার গবেষণাধর্মী বই ‘ঊনবিংশ শতাব্দীর বাঙালি সমাজ ও বাংলা নাটক’ সুধীমহলে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়।

সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য নীলিমা ইব্রাহিমের অনমনীয় দৃঢ়তার পুরস্কার হিসেবে দেশের সবচেয়ে বড়ো ও সম্মানজনক পুরস্কার একুশে পদক ২০০০ সালে এবং স্বাধীনতা পুরস্কার পান ২০১২ সালে। স্বাধীনতা পুরস্কার তিনি দেখে যেতে পারেন নাই। কারণ তার আগেই ২০০২ সালের ১৮ জুন মারা যান শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, সমাজকর্মী, লেখিকা ও নারী জাগরণের অগ্রদূত নীলিমা ইব্রাহিম। ২০১২ সালে তাকে মরনোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার দেয়া হয়। এছাড়াও গুণী এই মহীয়সী ১৯৬৯ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ১৯৮৭ সালে মাইকেল মধুসূদন পুরস্কার, ১৯৭৩ সালে জয় বাংলা পুরস্কার, লেখিকা সংঘ পুরস্কার ১৯৮৯ সালে, বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী স্মৃতি পদক ১৯৯০ সালে, অনন্য সাহিত্য পদক ও বেগম রোকেয়া পদক, ১৯৯৬ সালে, বঙ্গবন্ধু পুরস্কার ও শেরে বাংলা পুরস্কার ১৯৯৭ সালে এবং ১৯৯৮ সালে থিয়েটার সম্মাননা পদক পান।

নারী জাগরণের পথিকৃৎ নীলিমা ইব্রাহিম জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বাংলাদেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে গেছেন মহীয়সী এই নারী। ১১ অক্টোবর তার জন্মশতবার্ষিকী। তাকে নিয়ে বছরব্যাপী অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে বাংলাদেশ মহিলা সমিতি। এছাড়া পাঁচ দিনব্যাপী নাট্যোৎসব ও ১১ অক্টোবর তার জন্মদিনে বাংলা ওয়েবসাইট অবমুক্ত করবে বাংলাদেশ মহিলা সমিতি।

সোমবার, ১১ অক্টোবর ২০২১ , ২৬ আশ্বিন ১৪২৮ ০৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

জন্মশত বার্ষিকী

নারী জাগরণের পথিকৃৎ নীলিমা ইব্রাহীম

বাংলার নারী জাগরণের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম ড. নীলিমা ইব্রাহিম, যিনি আজন্ম নারীর আত্মোন্নয়নের জন্য কাজ করে গেছেন, সমাজে সমতা প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছেন। তার ৮০ বছরের জীবনে কর্মের ব্যাপ্তি এতটাই বিশাল- তা বলে শেষ করা যাবে না। কি শিক্ষায়, কি সাহিত্যে, সমাজসেবায় বা অর্থনীতি চিন্তায়, রাজনীতির বাস্তবতায় বা নারীর সঠিক পরিচর্যায় প্রতিটি ক্ষেত্রে তার বিচরণ ছিল উজ্জ্বল, দেদিপ্যমান।

বাংলার নারী অগ্রযাত্রায় বা নারীর ক্ষমতায়নে অন্যতম পথিকৃৎ নীলিমা ইব্রাহিম। জাতীয় জীবনে নারীর অগ্রযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তনের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত নারীদের পুনর্বাসন এবং তাদের মর্মস্পর্শী বেদনা ও সংগ্রাম প্রকাশে ছিল তার অনন্য অবদান, যা চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনিই প্রথম বীরাঙ্গনাদের দুঃখ-দুর্দশার কথা তুলে ধরেছিলেন তার লেখার মধ্য দিয়ে। তিনিই প্রথম একজন যিনি বীরাঙ্গনাদের সম্মান দিয়ে লিখেছিলেন। এক কথায় মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত নারীদের পুনর্বাসনে নীলিমা ইব্রাহিম যে অসামান্য অবদান রেখেছে, তা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে এই বাংলায়।

তার কথা বলতে গিয়ে অনেকেই বলেন, আধুনিক বাংলা সমাজে ও জাতীয় জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য নীলিমা ইব্রাহিমের তুলনা নীলিমা ইব্রাহিম নিজেই। এই অতুলনীয় নারী আমাদের জীবনে সব সময অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবেন। পুরুষের পাশাপাশি নারীর স্বাবলম্বী হওয়ার দৃষ্টিভঙ্গির কথাই যেন তার গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধের আলোচ্য বিষয় ছিল। সমাজে অসম বিকাশের জন্য নারীমুক্তির ক্ষেত্রে যে অচলায়তন ভেঙে নারী-পুরুষের সুস্থ-স্বাভাবিক, আত্মসম্মান বোধসম্পন্ন জীবনলাভই তার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য ছিল। বাঙালি ও বাংলাদেশের সামাজিক অগ্রযাত্রায় পুরোটা জীবন ধরে বিশেষ ভূমিকা রেখে গেছেন মহীয়সী এই নারী।

নীলিমা রায় চৌধুরী, ১৯২১ সালের ১১ অক্টোবর খুলনায় জন্মগ্রহণ করেন। বাবা প্রফুল্ল কুমার রায় চৌধুরী আর মা কুসুম কুমার দেবী। তার বাবা ছিলেন খুলনার বিশিষ্ট উকিল। তার পূর্বপুরুষ ছিলেন জমিদার বংশের। নীলিমা রায় চৌধুরীর শিক্ষা জীবন ছিল দারুণ গৌরবোজ্জ্বল। ১৯৩৫ সালে চারটি বিষয়ে লেটার নম্বর নিয়ে ম্যাট্টিক পাস করেন। বিজ্ঞান নিয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে ভর্তি হন। ১৯৪১ সালে প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে প্রথম শ্রেণী লাভ করেন। তিনিই প্রথম বাঙালি নারী, যিনি ১৯৫৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন।

নীলিমা রায় চৌধুরী ১৯৪৫ সালে ইন্ডিয়ান আর্মি মেডিকেল কোরের ক্যাপ্টেন ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিমকে বিয়ে করেন। বিয়ের পরই তিনি নীলিমা রায় চৌধুরী থেকে স্বামীর নামের সঙ্গে মিলিয়ে নীলিমা ইব্রাহিম নামে নিজেকে পরিচিত করেন। পরবর্তীতে নীলিমা ইব্রাহিম নামেই পরিচিত হয়ে ওঠেন। তিনি পাঁচ কন্যা সন্তানের জননী।

নীলিমা ইব্রাহিম বাংলার নারীজাগরণের পথিকৃতদের মধ্যে একজন। নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে আমৃত্যৃ নারীর আত্মোন্নয়নে কাজ করে গেছেন নিরলস। সত্যকে প্রতিষ্ঠা ও নারীর অগ্রযাত্রায় তার অনমনীয় দৃঢ়তা সত্যিই বিস্ময়কর।

ষাটের দশকের শুরু থেকেই তার বেশ কিছু উপন্যাস যেমন ‘বিশ শতকের মেয়ে’, ‘একপথ দুইবাঁক’, ‘কেয়াবন সঞ্চারিণী’ প্রকাশিত হয়। তাছাড়া তার বেশ কিছু প্রবন্ধ এ সময় সাহিত্যিক সমাজে তোলপাড় সৃষ্টি করে। ‘শরৎ প্রতিভা’, ‘বাংলা সাহিত্যের ইতিবৃত্ত’, ‘বাংলার কবি মধুসূদন’ এবং তার গবেষণাধর্মী বই ‘ঊনবিংশ শতাব্দীর বাঙালি সমাজ ও বাংলা নাটক’ সুধীমহলে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়।

সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য নীলিমা ইব্রাহিমের অনমনীয় দৃঢ়তার পুরস্কার হিসেবে দেশের সবচেয়ে বড়ো ও সম্মানজনক পুরস্কার একুশে পদক ২০০০ সালে এবং স্বাধীনতা পুরস্কার পান ২০১২ সালে। স্বাধীনতা পুরস্কার তিনি দেখে যেতে পারেন নাই। কারণ তার আগেই ২০০২ সালের ১৮ জুন মারা যান শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, সমাজকর্মী, লেখিকা ও নারী জাগরণের অগ্রদূত নীলিমা ইব্রাহিম। ২০১২ সালে তাকে মরনোত্তর স্বাধীনতা পুরস্কার দেয়া হয়। এছাড়াও গুণী এই মহীয়সী ১৯৬৯ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ১৯৮৭ সালে মাইকেল মধুসূদন পুরস্কার, ১৯৭৩ সালে জয় বাংলা পুরস্কার, লেখিকা সংঘ পুরস্কার ১৯৮৯ সালে, বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী স্মৃতি পদক ১৯৯০ সালে, অনন্য সাহিত্য পদক ও বেগম রোকেয়া পদক, ১৯৯৬ সালে, বঙ্গবন্ধু পুরস্কার ও শেরে বাংলা পুরস্কার ১৯৯৭ সালে এবং ১৯৯৮ সালে থিয়েটার সম্মাননা পদক পান।

নারী জাগরণের পথিকৃৎ নীলিমা ইব্রাহিম জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বাংলাদেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে গেছেন মহীয়সী এই নারী। ১১ অক্টোবর তার জন্মশতবার্ষিকী। তাকে নিয়ে বছরব্যাপী অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে বাংলাদেশ মহিলা সমিতি। এছাড়া পাঁচ দিনব্যাপী নাট্যোৎসব ও ১১ অক্টোবর তার জন্মদিনে বাংলা ওয়েবসাইট অবমুক্ত করবে বাংলাদেশ মহিলা সমিতি।