ছড়াকার-সাংবাদিক দাদু ভাইয়ের জীবনাবসান

শিশুসাহিত্যিক, ছড়াকার, শিশু সংগঠক, নাট্যকার ও প্রবীণ সাংবাদিক দৈনিক যুগান্তরের ফিচার এডিটর রফিকুল হক দাদু ভাই জীবনাবসান ঘটেছে। গতকাল বেলা পৌনে ১১টার দিকে রাজধানীর মুগদার নিজ বাসায় মারা যান তিনি। তার বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর।

সত্তরের দশকে গড়া শিশু-কিশোরদের সংগঠন ‘চাঁদের হাটে’র প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন যুগান্তরের ফিচার এডিটর দাদু ভাই। এর আগে তার পরিকল্পনায় এবং তার তত্ত্বাবধানে দৈনিক পূর্বদেশে ‘চাঁদের হাট’ নামে ছোটদের একটি পাতা বের হতো। তখন থেকে তিনি ‘দাদু ভাই’ নামে পরিচিতি পান। পরে ১৯৭৪ সালে ‘চাঁদের হাট’ নামে শিশু সংগঠন গড়ে তোলেন।

১৯৭২ সাল দেশে প্রত্যাবর্তনের পর চিকিৎসার জন্য বঙ্গবন্ধু লন্ডন যান। তার দেশে ফিরে আসা উপলক্ষ্যে সেই সময়ের বহুল প্রচারিত দৈনিক ‘পূর্বদেশ’ একটি বিশেষ সংখ্যা বের করে। ওই পত্রিকার প্রথম পাতায় বঙ্গবন্ধুর ছবির সঙ্গে ‘ঘরে ফিরা আইসো বন্ধু’ শিরোনামে একটি কবিতা ছাপা হয়। রফিকুল হকের লেখা ওই কবিতা খুবই আলোচিত হয়।

বাংলা শিশুসাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য রফিকুল হক দাদু ভাই ২০০৯ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একই বছর বাংলাদেশ শিশু একাডেমি পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার, চন্দ্রাবতী একাডেমি পুরস্কার, নিখিল ভারত শিশুসাহিত্য পুরস্কারসহ দেশে ও দেশের বাইরে বিভিন্ন পুরস্কার লাভ করেন।

তিনি যুগান্তরের ফিচার এডিটর ছাড়াও ওই প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে ছিলেন। নব্বই দশকে প্রতিষ্ঠিত দৈনিক রূপালীর নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন বর্ষীয়ান এ সাংবাদিক। এর আগে দৈনিক জনতার নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন। কাজ করেছেন দৈনিক লাল-সবুজ, আজাদ, বাংলাদেশ অবজারভারে।

সত্তর দশকে শিশুকিশোরদের জনপ্রিয় ‘কিশোর বাংলা’ নামের সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদকও ছিলেন তিনি। আশির দশকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্য ‘নিধুয়া পাথার কান্দে’ নামে একটি নাটক লিখেছিলেন তিনি, যা পরে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। ‘বর্গি এলো দেশে’সহ তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা সাতটি।

সময়কে ধারণ করা রফিকুল হকের অনেক ছড়াই আছে একেবারে কালজয়ী। হৃদয়কে ছুয়ে যাওয়া। ১৯৭০ সালে সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে দেশের দক্ষিণ অঞ্চলে সমুদ্রের উপকূলের লাখ লাখ মানুষ যখন বিপর্যস্ত, তখন তিনি লিখেছিলেন-

ছেলে ঘুমলো বুড়ো ঘুমলো ভোলা দ্বীপের চরে/জেগে থাকা মানুষগুলো মাতম শুধু করে

ঘুমো বাছা ঘুমো রে / সাগর দিলো চুমো রে

খিদে ফুরোলো জ্বালা জুড়লো কান্না কেন ছি / বাংলাদেশের মানুষ বুকে পাষাণ বেঁধেছি।

এই লেখায় রফিকুল হক উজ্জ্বল হয়ে থাকবেন ভবিষ্যতের সব প্রজন্মের কাছে। সময়ের চিত্র এইভাবে বয়ে নেয়া যায় ইতিহাসের পাতায় ছড়ার মাধ্যমে, রফিকুল হক তার একজন সফল কারিগর। তার ছড়ায় আমরা পেয়েছি, স্বাধীনতা সংগ্রাম, অধিকারের কথা, প্রতিবাদের শব্দমালা, ইতিহাসে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা-কোন কিছুই বাদ যায়নি তার স্পর্শ থেকে।

পঞ্চাশের দশক থেকে তিনি অজস্র ছড়া লিখে গেছেন। ১৯৮৩ সালে তার প্রথম ছড়ার বই প্রকাশিত হয় যার নাম ‘বর্গি এলো দেশে’। এই বইটির নামেই রফিকুল হক প্রমাণ করেছেন তার ছড়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে। বাংলা সাহিত্যের ছড়ার পতাকায় রফিকুল হক দাদু ভাই মূর্ত হবেন আজীবন সগৌরবে, সমহিমায়, সদর্পে। এই নামটি স্থান করে নিয়েছে বাংলা ভাষার অসংখ্য ছড়া লেখক, ছড়া অনুরাগী ও ছড়া কর্মীর অন্তরে।

রফিকুল হক দাদু ভাইয়ের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান ও যুগান্তর প্রকাশক অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এমপি এবং যুগান্তর সম্পাদক সাইফুল আলম। এছাড়া রংপুর বিভাগ সাংবাদিক সমিতি উত্তরাঞ্চলের এই কৃতি সন্তানের মৃত্যুতে শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন।

রফিকুল হক বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। গত বছর পর পর দুবার করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন তিনি। সুস্থ হয়ে কর্মস্থল যুগান্তরে যোগ দিলেও বার্ধক্যসহ নানা জটিলতায় প্রায় ছয় মাস আগে মুগদার বাসায় পুরোপুরি শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন তিনি। মৃত্যুর আগে তিনি স্ট্রোক করেন।

রফিকুল হকের জন্ম ১৯৩৭ সালের ৮ জানুয়ারি। তার গ্রামের বাড়ি রংপুরের কামালকাছনায়। তিনি দুই ছেলে এক মেয়ে, স্ত্রীসহ বহু গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

সোমবার, ১১ অক্টোবর ২০২১ , ২৬ আশ্বিন ১৪২৮ ০৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

ছড়াকার-সাংবাদিক দাদু ভাইয়ের জীবনাবসান

শিশুসাহিত্যিক, ছড়াকার, শিশু সংগঠক, নাট্যকার ও প্রবীণ সাংবাদিক দৈনিক যুগান্তরের ফিচার এডিটর রফিকুল হক দাদু ভাই জীবনাবসান ঘটেছে। গতকাল বেলা পৌনে ১১টার দিকে রাজধানীর মুগদার নিজ বাসায় মারা যান তিনি। তার বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর।

সত্তরের দশকে গড়া শিশু-কিশোরদের সংগঠন ‘চাঁদের হাটে’র প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন যুগান্তরের ফিচার এডিটর দাদু ভাই। এর আগে তার পরিকল্পনায় এবং তার তত্ত্বাবধানে দৈনিক পূর্বদেশে ‘চাঁদের হাট’ নামে ছোটদের একটি পাতা বের হতো। তখন থেকে তিনি ‘দাদু ভাই’ নামে পরিচিতি পান। পরে ১৯৭৪ সালে ‘চাঁদের হাট’ নামে শিশু সংগঠন গড়ে তোলেন।

১৯৭২ সাল দেশে প্রত্যাবর্তনের পর চিকিৎসার জন্য বঙ্গবন্ধু লন্ডন যান। তার দেশে ফিরে আসা উপলক্ষ্যে সেই সময়ের বহুল প্রচারিত দৈনিক ‘পূর্বদেশ’ একটি বিশেষ সংখ্যা বের করে। ওই পত্রিকার প্রথম পাতায় বঙ্গবন্ধুর ছবির সঙ্গে ‘ঘরে ফিরা আইসো বন্ধু’ শিরোনামে একটি কবিতা ছাপা হয়। রফিকুল হকের লেখা ওই কবিতা খুবই আলোচিত হয়।

বাংলা শিশুসাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য রফিকুল হক দাদু ভাই ২০০৯ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একই বছর বাংলাদেশ শিশু একাডেমি পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার, চন্দ্রাবতী একাডেমি পুরস্কার, নিখিল ভারত শিশুসাহিত্য পুরস্কারসহ দেশে ও দেশের বাইরে বিভিন্ন পুরস্কার লাভ করেন।

তিনি যুগান্তরের ফিচার এডিটর ছাড়াও ওই প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদে ছিলেন। নব্বই দশকে প্রতিষ্ঠিত দৈনিক রূপালীর নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন বর্ষীয়ান এ সাংবাদিক। এর আগে দৈনিক জনতার নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন। কাজ করেছেন দৈনিক লাল-সবুজ, আজাদ, বাংলাদেশ অবজারভারে।

সত্তর দশকে শিশুকিশোরদের জনপ্রিয় ‘কিশোর বাংলা’ নামের সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদকও ছিলেন তিনি। আশির দশকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্য ‘নিধুয়া পাথার কান্দে’ নামে একটি নাটক লিখেছিলেন তিনি, যা পরে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। ‘বর্গি এলো দেশে’সহ তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা সাতটি।

সময়কে ধারণ করা রফিকুল হকের অনেক ছড়াই আছে একেবারে কালজয়ী। হৃদয়কে ছুয়ে যাওয়া। ১৯৭০ সালে সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে দেশের দক্ষিণ অঞ্চলে সমুদ্রের উপকূলের লাখ লাখ মানুষ যখন বিপর্যস্ত, তখন তিনি লিখেছিলেন-

ছেলে ঘুমলো বুড়ো ঘুমলো ভোলা দ্বীপের চরে/জেগে থাকা মানুষগুলো মাতম শুধু করে

ঘুমো বাছা ঘুমো রে / সাগর দিলো চুমো রে

খিদে ফুরোলো জ্বালা জুড়লো কান্না কেন ছি / বাংলাদেশের মানুষ বুকে পাষাণ বেঁধেছি।

এই লেখায় রফিকুল হক উজ্জ্বল হয়ে থাকবেন ভবিষ্যতের সব প্রজন্মের কাছে। সময়ের চিত্র এইভাবে বয়ে নেয়া যায় ইতিহাসের পাতায় ছড়ার মাধ্যমে, রফিকুল হক তার একজন সফল কারিগর। তার ছড়ায় আমরা পেয়েছি, স্বাধীনতা সংগ্রাম, অধিকারের কথা, প্রতিবাদের শব্দমালা, ইতিহাসে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা-কোন কিছুই বাদ যায়নি তার স্পর্শ থেকে।

পঞ্চাশের দশক থেকে তিনি অজস্র ছড়া লিখে গেছেন। ১৯৮৩ সালে তার প্রথম ছড়ার বই প্রকাশিত হয় যার নাম ‘বর্গি এলো দেশে’। এই বইটির নামেই রফিকুল হক প্রমাণ করেছেন তার ছড়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে। বাংলা সাহিত্যের ছড়ার পতাকায় রফিকুল হক দাদু ভাই মূর্ত হবেন আজীবন সগৌরবে, সমহিমায়, সদর্পে। এই নামটি স্থান করে নিয়েছে বাংলা ভাষার অসংখ্য ছড়া লেখক, ছড়া অনুরাগী ও ছড়া কর্মীর অন্তরে।

রফিকুল হক দাদু ভাইয়ের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান ও যুগান্তর প্রকাশক অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এমপি এবং যুগান্তর সম্পাদক সাইফুল আলম। এছাড়া রংপুর বিভাগ সাংবাদিক সমিতি উত্তরাঞ্চলের এই কৃতি সন্তানের মৃত্যুতে শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন।

রফিকুল হক বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। গত বছর পর পর দুবার করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন তিনি। সুস্থ হয়ে কর্মস্থল যুগান্তরে যোগ দিলেও বার্ধক্যসহ নানা জটিলতায় প্রায় ছয় মাস আগে মুগদার বাসায় পুরোপুরি শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন তিনি। মৃত্যুর আগে তিনি স্ট্রোক করেন।

রফিকুল হকের জন্ম ১৯৩৭ সালের ৮ জানুয়ারি। তার গ্রামের বাড়ি রংপুরের কামালকাছনায়। তিনি দুই ছেলে এক মেয়ে, স্ত্রীসহ বহু গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।