সিলেটে আ’লীগের মনোনয়ন পেলেন শিবিরের সাবেক নেতা

সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের একটি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের সাবেক এক শীর্ষ নেতাকে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম ইকবাল হোসেন ইমাদ। কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা ৬নং দক্ষিণ রণিখাই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন তিনি। ইমাদ ছাত্রশিবিরের উপজেলা শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

গত রোববার রাতে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ড দক্ষিণ রণিখাই ইউপির দলীয় প্রার্থী হিসেবে ইমাদের নাম ঘোষণা করে। এর পরই থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে ব্যাপক সমালোচনা। সাবেক শিবির নেতাকে নৌকা প্রতীকের মনোনয়ন দেয়ায় দলীয় নেতাকর্মীরাই ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।

তবে ইকবাল হোসেন ইমাদ দাবি করছেন, তিনি ১৫ বছর প্রবাসে ছিলেন। কখনও ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তার নামে ওই উপজেলার আরেকজন ছাত্রশিবির করতেন। এখন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দুই নামকে গুলিয়ে তার বিরুদ্ধে অপপ্রচারে নেমেছে বলে দাবি ইমাদের।

যদিও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা নিশ্চিত করেছেন, ইমাদ ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সংগঠনটির পদেও ছিলেন। এমনকি ফেইসবুকে নিজের অ্যাকাউন্ট থেকে যুদ্ধাপরাধীর বিচারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে অনেকগুলো স্ট্যাটাসও দিয়েছেন।

আর জেলা আওয়ামী লীগ নেতাদের দাবি, ইমাদের বিরুদ্ধে ছাত্রশিবির করার অভিযোগ উঠলেও কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তিনি বর্তমানে আওয়ামী লীগের কমিটিতে আছেন। এছাড়া চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে তিনি তৃণমূলের ভোটেও এগিয়ে ছিলেন।

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, ইকবাল হোসেন ইমাদ ২০০৬-২০০৭ সালে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি ছিলেন। তার সময়ে সভাপতি ছিলেন আবদুস শাকুর। ২০১৬ সাল পর্যন্ত জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ২০১৮ সালের দিকে আওয়ামী লীগে যোগ দেন তিনি।

এরপর ২০১৯ সালে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কমিটিতে সদস্যপদ লাভ করেন। আওয়ামী লীগে যোগদানের মাত্র দুই বছরের মধ্যে নৌকার মনোনয়ন পেয়ে গেছেন ইমাদ।

ইমাদ ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন জানিয়ে দক্ষিণ রণিখাই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নজমুল ইসলাম বলেন, ইকবাল হোসেন ইমাদকে যখন আওয়ামী লীগের কমিটিতে সদস্য করা হয় তখনও আমি প্রতিবাদ করেছিলাম। কিন্তু অর্থের প্রভাবে আমার প্রতিবাদ টেকেনি। অর্থের জোরেই এবার তিনি নৌকার প্রার্থী হয়ে গেছেন বলে অভিযোগ নজমুলের।

ফেইসবুকে ইকবাল এইচ ইমাদ নামে একটি অ্যাকাউন্ট থেকে ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দ-প্রাপ্ত যুদ্ধারপরাধী ও জামায়াত-শিবিরের পক্ষে এবং সরকারের বিরুদ্ধে অব্যাহতভাবে পোস্ট দেয়া হয়। ‘ইকবাল এইচ ইমাদ’ নামের অ্যাকাউন্টটি নৌকার মনোনয়ন পাওয়া ইকবাল হোসেন ইমাদের বলে নিশ্চিত করেছে স্থানীয় সূত্র। ওই অ্যাকাউন্টে চেয়ারম্যান প্রার্থী ইমাদের একাধিক ছবিও যুক্ত রয়েছে।

ওই অ্যাকাউন্ট থেকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসি কার্যকর হওয়া জামায়াত নেতা মীর কাসেম আলীর ছবি যুক্ত করে ২০১৬ সালের ৩১ আগস্ট লেখা হয়- ‘ফাঁসির দড়িটা কোথায়? দাও এক্ষুণি গলায় পরিয়ে। সাঙ্গ কর তোমাদের উল্লাস। স্বপ্নচারী নায়ক হেলেদুলে এগিয়ে যাবে সাজানো মঞ্চে। ভিলেন কুল তোমরা খুশি তো? চোখের কোণে চিন্তার রেখা ঢেকে দাও মেকাপের আস্তরে’।

শিবিরের শীর্ষ পদে থাকা ও ফেইসবুকে এসব স্ট্যাটাস প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ইকবাল হোসেন ইমাদ সোমবার বলেন, আমি কখনই শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না। আমার নামে আরেকজন আমাদের উপজেলা শিবিরের কমিটিতে ছিল। তার বাবার নাম আবদুন নুর আর আমার বাবার নাম আবদুস সালাম।

তিনি বলেন, আমি ১৫ বছর প্রবাসে ছিলাম। দেশে এসে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত হই। তখন কেউ কিছু বলেনি। এখন চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন চাওয়ার পরই একটি গোষ্ঠী আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার শুরু করে। আমার ছবি ও নাম দিয়ে ফেইসবুকে একটি অ্যাকাউন্ট খুলে জামায়াত ও শিবিরের পক্ষে লেখালেখি করে। এসবের সঙ্গে আমি যুক্ত নই।

সাবেক শিবির নেতার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন খান বলেন, ইমাদের বিরুদ্ধে শিবির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ শুনেছি। তবে কোন প্রমাণ পাইনি। তার প্রতিদ্বন্দ্বী যে প্রার্থী এমন অভিযোগ তুলছেন তিনিও বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে এসেছেন।

নাসির বলেন, ইমাদ যখন আওয়ামী লীগের কমিটিতে এলেন তখন কোন অভিযোগ ওঠেনি। এখন অভিযোগ তোলা হলেও কেউ কোন প্রমাণ দিচ্ছে না। ফেইসবুকের কয়েকটি স্ক্রিনশট তো কোন প্রমাণ হতে পারে না। তাছাড়া প্রার্থী বাছাই নিয়ে বৈঠকে তিনি তৃণমূলের সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছেন। কেন্দ্রীয় নেতারাও নিশ্চয়ই তার বিরুদ্ধে অভিযোগের কোণ প্রমাণ পাননি, তাই মনোনয়ন দিয়েছেন।

নাসির আরও বলেন, ওই উপজেলায় এক সময় আওয়ামী লীগ খুবই দুর্বল ছিল। বিভিন্ন দল থেকে লোকজন এনেই সংগঠনকে শক্তিশালী করা হয়েছে। তাছাড়া প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে দলের প্রতি নিবেদনের পাশাপাশি তার জনসম্পৃক্ততার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হয়।

মঙ্গলবার, ১২ অক্টোবর ২০২১ , ২৭ আশ্বিন ১৪২৮ ০৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

সিলেটে আ’লীগের মনোনয়ন পেলেন শিবিরের সাবেক নেতা

সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের একটি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের সাবেক এক শীর্ষ নেতাকে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম ইকবাল হোসেন ইমাদ। কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা ৬নং দক্ষিণ রণিখাই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন তিনি। ইমাদ ছাত্রশিবিরের উপজেলা শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

গত রোববার রাতে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ড দক্ষিণ রণিখাই ইউপির দলীয় প্রার্থী হিসেবে ইমাদের নাম ঘোষণা করে। এর পরই থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে ব্যাপক সমালোচনা। সাবেক শিবির নেতাকে নৌকা প্রতীকের মনোনয়ন দেয়ায় দলীয় নেতাকর্মীরাই ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।

তবে ইকবাল হোসেন ইমাদ দাবি করছেন, তিনি ১৫ বছর প্রবাসে ছিলেন। কখনও ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তার নামে ওই উপজেলার আরেকজন ছাত্রশিবির করতেন। এখন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দুই নামকে গুলিয়ে তার বিরুদ্ধে অপপ্রচারে নেমেছে বলে দাবি ইমাদের।

যদিও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা নিশ্চিত করেছেন, ইমাদ ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সংগঠনটির পদেও ছিলেন। এমনকি ফেইসবুকে নিজের অ্যাকাউন্ট থেকে যুদ্ধাপরাধীর বিচারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে অনেকগুলো স্ট্যাটাসও দিয়েছেন।

আর জেলা আওয়ামী লীগ নেতাদের দাবি, ইমাদের বিরুদ্ধে ছাত্রশিবির করার অভিযোগ উঠলেও কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তিনি বর্তমানে আওয়ামী লীগের কমিটিতে আছেন। এছাড়া চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে তিনি তৃণমূলের ভোটেও এগিয়ে ছিলেন।

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, ইকবাল হোসেন ইমাদ ২০০৬-২০০৭ সালে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি ছিলেন। তার সময়ে সভাপতি ছিলেন আবদুস শাকুর। ২০১৬ সাল পর্যন্ত জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ২০১৮ সালের দিকে আওয়ামী লীগে যোগ দেন তিনি।

এরপর ২০১৯ সালে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কমিটিতে সদস্যপদ লাভ করেন। আওয়ামী লীগে যোগদানের মাত্র দুই বছরের মধ্যে নৌকার মনোনয়ন পেয়ে গেছেন ইমাদ।

ইমাদ ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন জানিয়ে দক্ষিণ রণিখাই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নজমুল ইসলাম বলেন, ইকবাল হোসেন ইমাদকে যখন আওয়ামী লীগের কমিটিতে সদস্য করা হয় তখনও আমি প্রতিবাদ করেছিলাম। কিন্তু অর্থের প্রভাবে আমার প্রতিবাদ টেকেনি। অর্থের জোরেই এবার তিনি নৌকার প্রার্থী হয়ে গেছেন বলে অভিযোগ নজমুলের।

ফেইসবুকে ইকবাল এইচ ইমাদ নামে একটি অ্যাকাউন্ট থেকে ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দ-প্রাপ্ত যুদ্ধারপরাধী ও জামায়াত-শিবিরের পক্ষে এবং সরকারের বিরুদ্ধে অব্যাহতভাবে পোস্ট দেয়া হয়। ‘ইকবাল এইচ ইমাদ’ নামের অ্যাকাউন্টটি নৌকার মনোনয়ন পাওয়া ইকবাল হোসেন ইমাদের বলে নিশ্চিত করেছে স্থানীয় সূত্র। ওই অ্যাকাউন্টে চেয়ারম্যান প্রার্থী ইমাদের একাধিক ছবিও যুক্ত রয়েছে।

ওই অ্যাকাউন্ট থেকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসি কার্যকর হওয়া জামায়াত নেতা মীর কাসেম আলীর ছবি যুক্ত করে ২০১৬ সালের ৩১ আগস্ট লেখা হয়- ‘ফাঁসির দড়িটা কোথায়? দাও এক্ষুণি গলায় পরিয়ে। সাঙ্গ কর তোমাদের উল্লাস। স্বপ্নচারী নায়ক হেলেদুলে এগিয়ে যাবে সাজানো মঞ্চে। ভিলেন কুল তোমরা খুশি তো? চোখের কোণে চিন্তার রেখা ঢেকে দাও মেকাপের আস্তরে’।

শিবিরের শীর্ষ পদে থাকা ও ফেইসবুকে এসব স্ট্যাটাস প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ইকবাল হোসেন ইমাদ সোমবার বলেন, আমি কখনই শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না। আমার নামে আরেকজন আমাদের উপজেলা শিবিরের কমিটিতে ছিল। তার বাবার নাম আবদুন নুর আর আমার বাবার নাম আবদুস সালাম।

তিনি বলেন, আমি ১৫ বছর প্রবাসে ছিলাম। দেশে এসে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত হই। তখন কেউ কিছু বলেনি। এখন চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন চাওয়ার পরই একটি গোষ্ঠী আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার শুরু করে। আমার ছবি ও নাম দিয়ে ফেইসবুকে একটি অ্যাকাউন্ট খুলে জামায়াত ও শিবিরের পক্ষে লেখালেখি করে। এসবের সঙ্গে আমি যুক্ত নই।

সাবেক শিবির নেতার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন খান বলেন, ইমাদের বিরুদ্ধে শিবির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ শুনেছি। তবে কোন প্রমাণ পাইনি। তার প্রতিদ্বন্দ্বী যে প্রার্থী এমন অভিযোগ তুলছেন তিনিও বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে এসেছেন।

নাসির বলেন, ইমাদ যখন আওয়ামী লীগের কমিটিতে এলেন তখন কোন অভিযোগ ওঠেনি। এখন অভিযোগ তোলা হলেও কেউ কোন প্রমাণ দিচ্ছে না। ফেইসবুকের কয়েকটি স্ক্রিনশট তো কোন প্রমাণ হতে পারে না। তাছাড়া প্রার্থী বাছাই নিয়ে বৈঠকে তিনি তৃণমূলের সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছেন। কেন্দ্রীয় নেতারাও নিশ্চয়ই তার বিরুদ্ধে অভিযোগের কোণ প্রমাণ পাননি, তাই মনোনয়ন দিয়েছেন।

নাসির আরও বলেন, ওই উপজেলায় এক সময় আওয়ামী লীগ খুবই দুর্বল ছিল। বিভিন্ন দল থেকে লোকজন এনেই সংগঠনকে শক্তিশালী করা হয়েছে। তাছাড়া প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে দলের প্রতি নিবেদনের পাশাপাশি তার জনসম্পৃক্ততার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হয়।