পদ্মায় ‘মা ইলিশ’ শিকারের মহোৎসব

৩৪টি অভিযান, এক লাখ মিটার নিষিদ্ধ জাল ও ইলিশ উদ্ধার, ২৪ জেলে আটক

ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে সরকারিভাবে মা ইলিশ শিকারে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলেও মানিকগঞ্জের শিবালয়ের পদ্মা-যমুনা অংশে ইলিশ নিধন ও বিক্রির ধুম পড়েছে। সৌখিন ও মৌসুমি চোরা শিকারিদের অপতৎপরতায় স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট বিভাগ সোচ্চার হলেও কোনভাবেই মৎস্য শিকার রোধ করা যাচ্ছে না। সৌখিন ও মৌসুমি চোরা শিকারিদের সহযোগিতা করছেন স্থানীয় মৎস্য অফিসের সবচেয়ে পুরাতন এক কর্মকর্তা এমন অভিযোগ উঠেছে সর্বমহলে। এই সুযোগে মৎস্য শিকারি ও ক্রেতা-বিক্রেতারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তারা চোরা শিকারিদের হামলায় খেই হারিয়ে ফেলছেন।

ঘটনার বিবরণে জানা গেছে, গত ৪ অক্টোবর থেকে অভিযান শুরুর পর হতে শিবালয় অঞ্চলে ৩৪টি অভিযানে একলাখ মিটার নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল, প্রায় চার মণ ইলিশ, কয়েকটি ইঞ্জিন চালিত ডিঙ্গি নৌকা এবং ২৪ জন জেলেকে আটক করা হয়েছে। একই সঙ্গে দশটি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ২৪ জন জেলের মধ্যে ১৬ জনকে এক মাসের করে জেল এবং বয়স বিবেচনায় ০৮ জনকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।

প্রশাসনের পক্ষে অধিকাংশ অভিযানে পরিত্যক্ত জাল, নৌকা ও ইলিশ জব্দের কথা বলা হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন বলে অনেকেই বিরূপ মন্তব্য করেছেন। এর মধ্যে শিবালয়ের আরিচা ঘাটে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন একটি বরফ কল খোলা রাখার দায়ে মালিককে ১৫ দিনের কারাদণ্ড প্রদান করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারক উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি এসএম আবু দারদা। এ নিয়েও বিভিন্ন মহলে নানা গুঞ্জনের সৃষ্টি হয়েছে। গত এক সপ্তাহের অভিযানে জব্দকৃত জাল-নৌকা ধ্বংস করাসহ জব্দকৃত ইলিশ স্থানীয় দাতব্য প্রতিষ্ঠান ও দরিদ্রদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, শিবালয়, দৌলতপুর ও হরিরামপুর উপজেলার প্রায় ৬০ কিলোমিটার বিস্তৃত পদ্মা-যমুনা বক্ষে প্রত্যহ বিপুল সংখ্যক ইঞ্জিনচালিত নৌকাযোগে দিনে ও রাতে অবৈধ কারেন্ট জালের মাধ্যমে নির্বিঘেœ ইলিশ শিকারের উৎসব চলছে। এই কাজে প্রকৃত জেলেরা নীরব থাকলেও মৌসুমি জেলেরা তৎপর রয়েছে। ধৃত ইলিশ ক্রয়ে আগ্রহী একশ্রেণীর লোকজন নদীর পাড়ে নিয়মিত ভিড় জমাচ্ছেন।

শিবালয়ের আলোকদিয়া চরে প্রতি কেজি ইলিশ তিনশ থেকে চারশ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। সব মিলিয়ে এই অঞ্চলে ইলিশ শিকারি ও সুবিধাভোগীদের যেন মহোৎসব চলছে। যমুনা নদী সিকস্তি শিবালয়ের তেওতা গ্রামের আবদুর রহিম অভিযোগের সুরে বলেন, ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে নদীতে একদিকে চলছে ইলিশ নিধন জজ্ঞ অপরদিকে চলছে প্রশাসনের কথিত অভিযান।

নামমাত্র এ অভিযানে জাল-নৌকা জব্দ করা হলেও শিকারিরা থাকছে অধরা। এই অবস্থায় অন্যান্যরাও ইলিশ শিকারে আগ্রহ দেখাচ্ছে। আরও একটি সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, গত প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষায় শিবালয় উপজেলার পদ্মা-যমুনার অংশে প্রশাসনের অভিযানে আড়াইশর অধিক জেলেকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- ও লাখ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছিল।

এবার নদীতে একই অবস্থা চললেও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এদের অনেকের ধারণা জেলেদের সঙ্গে প্রশাসনের গোপন আতাত থাকায় লোক দেখানো অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। অবশ্য প্রশাসনের পক্ষ হতে এসব অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।

এসব বিষয়ে শিবালয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেসমিন সুলতানা মা ইলিশ রক্ষা অভিযান সম্পর্কে জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় সংখ্যক লোকবলের অভাবে অভিযান ব্যাহত হচ্ছে। অল্প সংখ্যক আনসার ও পুলিশ নিয়ে গত দুদিন আগে নদীতে অভিযান পরিচালনাকালে আলোকদিয়া চরাঞ্চলের চোরা শিকারিরা দলবদ্ধ হয়ে লাঠিসোটা হাতে অ্যাসিলান্ডের ওপড় চড়াও হয়েছে।

এদের রুখতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক র‌্যাব ও পুলিশ নিয়ে অচিরেই অভিযান পরিচালনা করতে বিশেষ বৈঠকে জরুরি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। তবে এর মধ্যেও নদীতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলেও তিনি জানিয়েছন। শিবালয় উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা রফিকুল আলম জানান, প্রজনন মৌসুমে নদীতে জাল-নৌকা বন্ধ রাখতে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের অধীনে উপজেলার প্রায় তিন হাজার প্রকৃত জেলেদের মাঝে ২০ কেজি হারে চাল বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়াও মা ইলিশ শিকার রোধে নদীতে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে।

বুধবার, ১৩ অক্টোবর ২০২১ , ২৮ আশ্বিন ১৪২৮ ০৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

পদ্মায় ‘মা ইলিশ’ শিকারের মহোৎসব

৩৪টি অভিযান, এক লাখ মিটার নিষিদ্ধ জাল ও ইলিশ উদ্ধার, ২৪ জেলে আটক
image

চুরি করে ইলিশ শিকারে জেলের দল -সংবাদ

ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে সরকারিভাবে মা ইলিশ শিকারে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলেও মানিকগঞ্জের শিবালয়ের পদ্মা-যমুনা অংশে ইলিশ নিধন ও বিক্রির ধুম পড়েছে। সৌখিন ও মৌসুমি চোরা শিকারিদের অপতৎপরতায় স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট বিভাগ সোচ্চার হলেও কোনভাবেই মৎস্য শিকার রোধ করা যাচ্ছে না। সৌখিন ও মৌসুমি চোরা শিকারিদের সহযোগিতা করছেন স্থানীয় মৎস্য অফিসের সবচেয়ে পুরাতন এক কর্মকর্তা এমন অভিযোগ উঠেছে সর্বমহলে। এই সুযোগে মৎস্য শিকারি ও ক্রেতা-বিক্রেতারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তারা চোরা শিকারিদের হামলায় খেই হারিয়ে ফেলছেন।

ঘটনার বিবরণে জানা গেছে, গত ৪ অক্টোবর থেকে অভিযান শুরুর পর হতে শিবালয় অঞ্চলে ৩৪টি অভিযানে একলাখ মিটার নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল, প্রায় চার মণ ইলিশ, কয়েকটি ইঞ্জিন চালিত ডিঙ্গি নৌকা এবং ২৪ জন জেলেকে আটক করা হয়েছে। একই সঙ্গে দশটি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ২৪ জন জেলের মধ্যে ১৬ জনকে এক মাসের করে জেল এবং বয়স বিবেচনায় ০৮ জনকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে।

প্রশাসনের পক্ষে অধিকাংশ অভিযানে পরিত্যক্ত জাল, নৌকা ও ইলিশ জব্দের কথা বলা হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন বলে অনেকেই বিরূপ মন্তব্য করেছেন। এর মধ্যে শিবালয়ের আরিচা ঘাটে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন একটি বরফ কল খোলা রাখার দায়ে মালিককে ১৫ দিনের কারাদণ্ড প্রদান করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারক উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি এসএম আবু দারদা। এ নিয়েও বিভিন্ন মহলে নানা গুঞ্জনের সৃষ্টি হয়েছে। গত এক সপ্তাহের অভিযানে জব্দকৃত জাল-নৌকা ধ্বংস করাসহ জব্দকৃত ইলিশ স্থানীয় দাতব্য প্রতিষ্ঠান ও দরিদ্রদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, শিবালয়, দৌলতপুর ও হরিরামপুর উপজেলার প্রায় ৬০ কিলোমিটার বিস্তৃত পদ্মা-যমুনা বক্ষে প্রত্যহ বিপুল সংখ্যক ইঞ্জিনচালিত নৌকাযোগে দিনে ও রাতে অবৈধ কারেন্ট জালের মাধ্যমে নির্বিঘেœ ইলিশ শিকারের উৎসব চলছে। এই কাজে প্রকৃত জেলেরা নীরব থাকলেও মৌসুমি জেলেরা তৎপর রয়েছে। ধৃত ইলিশ ক্রয়ে আগ্রহী একশ্রেণীর লোকজন নদীর পাড়ে নিয়মিত ভিড় জমাচ্ছেন।

শিবালয়ের আলোকদিয়া চরে প্রতি কেজি ইলিশ তিনশ থেকে চারশ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। সব মিলিয়ে এই অঞ্চলে ইলিশ শিকারি ও সুবিধাভোগীদের যেন মহোৎসব চলছে। যমুনা নদী সিকস্তি শিবালয়ের তেওতা গ্রামের আবদুর রহিম অভিযোগের সুরে বলেন, ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে নদীতে একদিকে চলছে ইলিশ নিধন জজ্ঞ অপরদিকে চলছে প্রশাসনের কথিত অভিযান।

নামমাত্র এ অভিযানে জাল-নৌকা জব্দ করা হলেও শিকারিরা থাকছে অধরা। এই অবস্থায় অন্যান্যরাও ইলিশ শিকারে আগ্রহ দেখাচ্ছে। আরও একটি সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, গত প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষায় শিবালয় উপজেলার পদ্মা-যমুনার অংশে প্রশাসনের অভিযানে আড়াইশর অধিক জেলেকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ- ও লাখ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছিল।

এবার নদীতে একই অবস্থা চললেও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এদের অনেকের ধারণা জেলেদের সঙ্গে প্রশাসনের গোপন আতাত থাকায় লোক দেখানো অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। অবশ্য প্রশাসনের পক্ষ হতে এসব অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।

এসব বিষয়ে শিবালয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেসমিন সুলতানা মা ইলিশ রক্ষা অভিযান সম্পর্কে জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় সংখ্যক লোকবলের অভাবে অভিযান ব্যাহত হচ্ছে। অল্প সংখ্যক আনসার ও পুলিশ নিয়ে গত দুদিন আগে নদীতে অভিযান পরিচালনাকালে আলোকদিয়া চরাঞ্চলের চোরা শিকারিরা দলবদ্ধ হয়ে লাঠিসোটা হাতে অ্যাসিলান্ডের ওপড় চড়াও হয়েছে।

এদের রুখতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক র‌্যাব ও পুলিশ নিয়ে অচিরেই অভিযান পরিচালনা করতে বিশেষ বৈঠকে জরুরি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। তবে এর মধ্যেও নদীতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলেও তিনি জানিয়েছন। শিবালয় উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা রফিকুল আলম জানান, প্রজনন মৌসুমে নদীতে জাল-নৌকা বন্ধ রাখতে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের অধীনে উপজেলার প্রায় তিন হাজার প্রকৃত জেলেদের মাঝে ২০ কেজি হারে চাল বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়াও মা ইলিশ শিকার রোধে নদীতে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে।