আব্দুলরাজাক গুরনাহ

সাযুজ্য : অগ্রজ নোবেল লরিয়েট

উদয় শংকর দুর্জয়

আব্দুলরাজাক গুরনাহ ১৯৪৮ সালে তানজানিয়ার প্রধান দ্বীপ জাঞ্জিবারে জন্মগ্রহণ করেন এবং সেখানকার রাজনৈতিক আক্রমণের হাত থেকে বাঁচার জন্য ১৮ বছরে বয়সে ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান এবং স্থায়ীভাবে সেখানেই বসবাস শুরু করেন। ভি. এস. নাইপলের কথা মনে পড়ে যায় এই প্রসঙ্গে। তিনি যদিও এই ইংল্যান্ডে এসেছিলেন পড়াশোনা করার জন্য। ত্রিনিদাদ সরকারের বৃত্তি নিয়ে ভর্তি হলেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। আর সেখানেই লেখালেখির জন্য দিব্যদৃষ্টি খুলে যায় তাঁর। বহু উপন্যাস আর প্রবন্ধ লিখেছেন, পেয়েছেন নোবেল পুরস্কারসহ বহু স্বীকৃতি; কোনোদিন অন্যায়ের সাথে আপোস করেননি বরং অনুন্নত লেখাগুলোর বিরুদ্ধে শুনিয়েছেন শাণিত মন্তব্য।

আব্দুলরাজাক তাঁর লেখালেখি জীবন বিভিন্ন মাধ্যমে উৎসর্গ করেছেন: মানুষ যখন নির্বাসনে থাকে তখন সে তার অতীত আর বর্তমানকে নতুন করে জানতে শুরু করে, তার ফেলে আসা ঘরদোর, পরিবারপরিজন থেকে দূরে থাকার ফলে পুরনো সেই ঘনিষ্ঠতা আবার নতুন করে উপলব্ধি করায়। সেই উপলব্ধিগত সময়ের সাথে যে প্রেম আর বন্ধুত্ব লুকিয়ে থাকে এবং তাদের সাথে লালিত স্বপ্নের যে ধ্বংসাবশেষ জেগে থাকে সেসব নিয়ে আব্দুলরাজাকের উপন্যাসের কাহিনি গড়ে ওঠে। গুরনাহ প্রায় তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে যারা ইতিহাস থেকে পতিত, নিগৃহীত, নিপীড়িত তাঁদের নিয়ে লিখে চলেছেন।

তাঁর প্রথম উপন্যাস মেমোরি অফ ডিপারচারসহ (১৯৮৭) অনেক আখ্যান বিশ্বাসঘতকতা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকা ক্ষমতাধারী ব্যক্তিদের ভাঙা প্রতিশ্রুতির বিরুদ্ধে লড়াই করারর প্রতিপাদ্য বিষয় আশয় নিয়ে গড়ে ওঠা। অন্যদিকে দেখিয়েছেন যারা একটুকরো ছায়ার নিচে ভালো কিছু খুঁজে নিতে চায়; যারা একফোঁটা শান্তির লোভে ঘর ছেড়ে পাড়ি জমায় দূরের ঠিকানায়, তাদের আশাহত বিহ্বলতা নিয়ে আব্দুলরাজাক সাজিয়েছেন এই উপন্যাসের প্রেক্ষাপট। তবে ‘মেমরি অফ ডিপারচার’ এর ভেতর যে তাঁরও কিছু আত্মজীবনী উঠে এসেছে সেকথা অকপটেই বলা যায়। আত্মজীবনী থেকে উঠে আসা এই উপন্যাসের ভেতর দিয়ে যে বাস্তব এবং অভিজ্ঞতার ব্যাপকতা বিস্তৃত হয়েছে সেক্ষেত্রে হাওয়ার্ড ফাস্টের বক্তব্য একবার ঝালিয়ে নেয়া যেতে পারে- ‘It would be more correct to describe naturalism as a retreat from realism being that literary synthesis which through selection and creation heightens for the reader his understanding of reality’.

অর্থাৎ একজন শিল্পীর উচিৎ বাস্তবকে হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করা এবং তার মধ্য দিয়ে কোনো কিছুকে গ্রহণ এবং বর্জন করা। একজন পাঠকও যেন সেই উপাখ্যান পাঠ করে বুঝতে পারে আসল সত্যিটা কী। এটাই ঠিক ফিকশনের ক্ষেত্রে সব খুঁটিনাটি বাস্তবের সাথে নাও মিলতে পারে। তবে গুরনাহ বাস্তব অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেসব অর্জন তিনি করেছেন ¯পষ্ট করে বলতে তা চেষ্টা করেছেন। নোবেল বিচারকদের মন্তব্য অনুযায়ী-

“for his uncompromising and compassionate penetration of the effects of colonialism and the fate of the refugee in the gulf between cultures and continents”.

তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস ‘প্যারাডাইস’। এটার প্রেক্ষাপট ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালের ঘটনাবহুল টানপোড়নের ইতিহাস। জার্মানদের ঔপনিবেশিকতা এবং রাজনৈতিক আগ্রাসনের যে বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়েছিল সেসবের কথা উঠে এসেছে এই উপন্যাসে। পূর্ব আফ্রিকাতে তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রারম্ভিক ডামাডোলের ক্ষীণ অংশ বিশেষ লক্ষ্য করা যাচ্ছে, ইউসুফ নামের ১২ বছরের কিশোরকে বেঁচে দেয়া হচ্ছে মহাজনের কাছে। রক্ষকদের কাছে দুর্বলের নিবিড় আত্মসমর্পণের খবর সবার অগোচরেই রয়ে যায়। শুধু সেই জানে যার জীবন বদলায় অন্যের হাতে হাতে। এই প্রসঙ্গে ২০১৯ সালের নোবেল বিজয়ী ম্যারিসকন্ডের উপন্যাসের কথা উঠে আসতে পারে। তাঁর লেখার মধ্যে পাওয়া যায় সর্বনাশা ঔপনিবেশিকতা এবং ঔপনিবেশিকতা পরবর্তী নিপীড়ন আর চরম অশান্তির কথা। গুয়াডেলুপে জন্ম নেয়া এই ঔপন্যাসিক ফ্রান্সে বেড়ে ওঠেন এবং সেখানেই শিক্ষা জীবন শুরু করেন।

গুরনাহর ‘অ্যাডমাইরিং সাইলেন্স’ (১৯৯৬) উপন্যাসে রয়েছে আত্মজীবনের নানা দিক, সরাসরি আত্মজীবনী না হলেও পরবাস জীবনের ঘটনা অবলম্বনে লেখা তাঁর এই তৃতীয় উপন্যাস। ১৯৬০ সালে এক যুবক ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান এবং এক ইংরেজ নারীর প্রেমে পড়েন এবং পারিবারিক অধ্যায় শুরু করেন। তিনি চেষ্টা করেন এই অপরিচিত সমাজের সাথে নিজেকে খাপখাইয়ে নিতে। সেখান থেকেই আসল লড়াইটা শুরু হয়। আব্দুলরাজাক দেখিয়েছেন একজন অফ্রিকার অভিবাসীকে সবাই সাদরে গ্রহণ করতে পারে না; এবং কীভাবে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র সোচ্চার হয়ে ওঠে। আরও দেখিয়েছেন দুটি ভিন্ন সাংস্কৃতিক ধারার মধ্যে এবং দুটি আলাদা ভৌগোলিক সীমারেখায় বেড়ে ওঠা যাপনের নিখুঁত চিত্র।

উঠে আসতে পারে জাপানে জন্মগ্রহণ করা কাজুও ইশিগুরোর কথা, যিনি পাঁচ বছর বয়সে বৃটেনে চলে আসেন। সমগ্র সাহিত্যকর্মের জন্য ২০১৭ সালে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। নস্টালজিয়া এবং কল্পনা শক্তি তাঁর সাহিত্য সৃষ্টির মূল রসদ হিসেবে কাজ করেছে। আব্দুলরাজাকের সাহিত্যকর্মের মধ্যেও কাজুও ইশিগুরোর সাদৃশ্যতা খুঁজে পাওয়া যায়। দেখা যায় দুজনেই একটি দীর্ঘ সময় ধরে ইংল্যান্ডে বসবাস করছেন, দু’জনে প্রায় একই সময়ে অর্থাৎ ১৯৬০ সালে বৃটেনে পাড়ি জমান। ইশিগুরো পড়েছেন সারিতে আর আব্দুলরাজাক পড়াশোনা করেছেন কেন্টে। ইংল্যান্ডের সারি এবং কেন্ট পাশাপাশি সীমারেখায় অবস্থিত। অব্দুলরাজাকের উপন্যাসগুলোর মধ্যে দুটো দিকের গল্প উঠে এসেছে- একটি তাঁর শৈশব স্মৃতি বিজড়িত পূর্ব আফ্রিকার সমাজব্যবস্থার কথা অন্যটি তাঁর ইংল্যান্ডে বেড়ে ওঠা এবং এখানকার শিল্প সংস্কৃতির সাথে তাঁর ভেতরকার যে উপলব্ধি রয়েছে সেটার একটা বর্ণনা। ইশিগুরোর উপন্যাস পর্যালোচানা করলে দেখা যায় তিনিও প্রখর কল্পনা শক্তি দিয়ে লিখেছেন। তাঁর প্রথম দুটি উপন্যাস: ‘এ পেইল ভিউ অফ হিল্স’ এবং ‘অ্যান আর্টিস্ট অফ দ্য ফ্লোটিং ওয়ার্ল্ড’, অতীতদিনের গল্প অর্থাৎ ছোটবেলায় ফেলে আসা জাপানের গল্প যাকে বলে ‘এক্সপ্লোরেশন্স অফ জাপানিজ আইডেনটিটি’।

আব্দুলরাজাক প্রায় দশটির মতো উপন্যাস লিখেছেন, লিখেছেন বেশ কিছু ছোট গল্পও। তাঁর সাহিত্যকর্মের ভেতর সবচেয়ে যে বিষয়টির বারবার পাওয়া যায় সেটা হলো, বোহেমিয়ান জীবন অথবা শরণার্থী যাপন। ইংল্যান্ডে আসার আগে সয়াহিলি ছিল প্রথম ভাষা, তারপর শুরু করেন ইংরেজিতে লেখা, তখন তাঁর বয়স একুশ। প্রথম দিককার তাঁর লেখালেখি সাহিত্য হিসেবে গণ্য করা হয় না। শৈশবে আরবি বা ফার্সিতে লেখা কবিতা এবং ফ্যান্টাসি গল্পগুলো তাঁকে বিমোহিত করতো। কেন্টে পড়াশোনা করাকালীন লেখালেখির জন্য তিনি নিজেকে প্রস্তুত করেন যেভাবে প্রস্তুত করেছিলেন ভি. এস. নাইপল।

গুরনাহর গল্পগুলোতে তারাই স্থান পেয়েছে যারা সবসময় উঁচুস্তরের মানুষের দৃটির আড়ালে থেকেছে, যারা সমাজের অবহেলিত আর নিগৃহীতদের তালিকায় আজীবন রয়ে গেছে। তাঁর গল্পের চরিত্রগুলোর মধ্যে স্থান পেয়েছে দোকানদার থেকে শুরু করে কলেজের ছাত্র পর্যন্ত; গৃহকর্তা থেকে স্থানীয় সৈন্য যারা ঔপনিবেশিক শিবিরে কাজ করেছে এমন সৈনিকদের দৈনন্দিন জীবন তুলে ধরেছেন তাঁর লেখায়। তবে শরণার্থী তাঁর কাছে একটি গুরুতপূর্ণ বিষয় এবং এর ভেতরকার চরিত্রগুলোকে তিনি অর্থবহুল এবং আবেগময় করে তুলেছেন। পাঠককে মনে করিয়ে দিয়েছেন প্রত্যকেটি মানুষই মূল্যবান এবং স্মরণযোগ্য।

অ্যাসাইলামের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় শতশত বছর ধরে, উন্নত জীবন লাভের আশায় অথবা মানবিক সংকট কাটিয়ে উঠতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বহুলোক ইউরোপে পাড়ি জমায় এবং নিজেকে টিকিয়ে রাখতে রীতিমত সংগ্রাম করে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করেন। এসবের পেছনে যেসব বেদনামিশ্রিত গল্প লুকিয়ে থাকে; আত্ম্যাগের মধ্যে যেসব ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র উপলব্ধি জমা থাকে সেসব নিয়ে গুরনাহ তাঁর উপন্যাস লেখার তাগিদ অনুভব করেছেন।

***

তথ্যসূত্র: 1. Read More About Abdulrazak Gurnah’s Book by Joumana Khatib, published on nytimes.com

2. Abdulrazak Gurnah: where to start with the Nobel prize winner by Maaza Mengiste, published on theguardian.com

3. Abdulraja Gunrah, winner of the Nobel Prize for literaure by David Pilling, published in The Financial Times

4. The Nobel prize in literature 2021 - Biobibliographical notes, published on nobelprize.org

বৃহস্পতিবার, ১৪ অক্টোবর ২০২১ , ২৯ আশ্বিন ১৪২৮ ০৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

আব্দুলরাজাক গুরনাহ

সাযুজ্য : অগ্রজ নোবেল লরিয়েট

উদয় শংকর দুর্জয়
image

আব্দুলরাজাক গুরনাহ ১৯৪৮ সালে তানজানিয়ার প্রধান দ্বীপ জাঞ্জিবারে জন্মগ্রহণ করেন এবং সেখানকার রাজনৈতিক আক্রমণের হাত থেকে বাঁচার জন্য ১৮ বছরে বয়সে ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান এবং স্থায়ীভাবে সেখানেই বসবাস শুরু করেন। ভি. এস. নাইপলের কথা মনে পড়ে যায় এই প্রসঙ্গে। তিনি যদিও এই ইংল্যান্ডে এসেছিলেন পড়াশোনা করার জন্য। ত্রিনিদাদ সরকারের বৃত্তি নিয়ে ভর্তি হলেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। আর সেখানেই লেখালেখির জন্য দিব্যদৃষ্টি খুলে যায় তাঁর। বহু উপন্যাস আর প্রবন্ধ লিখেছেন, পেয়েছেন নোবেল পুরস্কারসহ বহু স্বীকৃতি; কোনোদিন অন্যায়ের সাথে আপোস করেননি বরং অনুন্নত লেখাগুলোর বিরুদ্ধে শুনিয়েছেন শাণিত মন্তব্য।

আব্দুলরাজাক তাঁর লেখালেখি জীবন বিভিন্ন মাধ্যমে উৎসর্গ করেছেন: মানুষ যখন নির্বাসনে থাকে তখন সে তার অতীত আর বর্তমানকে নতুন করে জানতে শুরু করে, তার ফেলে আসা ঘরদোর, পরিবারপরিজন থেকে দূরে থাকার ফলে পুরনো সেই ঘনিষ্ঠতা আবার নতুন করে উপলব্ধি করায়। সেই উপলব্ধিগত সময়ের সাথে যে প্রেম আর বন্ধুত্ব লুকিয়ে থাকে এবং তাদের সাথে লালিত স্বপ্নের যে ধ্বংসাবশেষ জেগে থাকে সেসব নিয়ে আব্দুলরাজাকের উপন্যাসের কাহিনি গড়ে ওঠে। গুরনাহ প্রায় তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে যারা ইতিহাস থেকে পতিত, নিগৃহীত, নিপীড়িত তাঁদের নিয়ে লিখে চলেছেন।

তাঁর প্রথম উপন্যাস মেমোরি অফ ডিপারচারসহ (১৯৮৭) অনেক আখ্যান বিশ্বাসঘতকতা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকা ক্ষমতাধারী ব্যক্তিদের ভাঙা প্রতিশ্রুতির বিরুদ্ধে লড়াই করারর প্রতিপাদ্য বিষয় আশয় নিয়ে গড়ে ওঠা। অন্যদিকে দেখিয়েছেন যারা একটুকরো ছায়ার নিচে ভালো কিছু খুঁজে নিতে চায়; যারা একফোঁটা শান্তির লোভে ঘর ছেড়ে পাড়ি জমায় দূরের ঠিকানায়, তাদের আশাহত বিহ্বলতা নিয়ে আব্দুলরাজাক সাজিয়েছেন এই উপন্যাসের প্রেক্ষাপট। তবে ‘মেমরি অফ ডিপারচার’ এর ভেতর যে তাঁরও কিছু আত্মজীবনী উঠে এসেছে সেকথা অকপটেই বলা যায়। আত্মজীবনী থেকে উঠে আসা এই উপন্যাসের ভেতর দিয়ে যে বাস্তব এবং অভিজ্ঞতার ব্যাপকতা বিস্তৃত হয়েছে সেক্ষেত্রে হাওয়ার্ড ফাস্টের বক্তব্য একবার ঝালিয়ে নেয়া যেতে পারে- ‘It would be more correct to describe naturalism as a retreat from realism being that literary synthesis which through selection and creation heightens for the reader his understanding of reality’.

অর্থাৎ একজন শিল্পীর উচিৎ বাস্তবকে হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করা এবং তার মধ্য দিয়ে কোনো কিছুকে গ্রহণ এবং বর্জন করা। একজন পাঠকও যেন সেই উপাখ্যান পাঠ করে বুঝতে পারে আসল সত্যিটা কী। এটাই ঠিক ফিকশনের ক্ষেত্রে সব খুঁটিনাটি বাস্তবের সাথে নাও মিলতে পারে। তবে গুরনাহ বাস্তব অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যেসব অর্জন তিনি করেছেন ¯পষ্ট করে বলতে তা চেষ্টা করেছেন। নোবেল বিচারকদের মন্তব্য অনুযায়ী-

“for his uncompromising and compassionate penetration of the effects of colonialism and the fate of the refugee in the gulf between cultures and continents”.

তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস ‘প্যারাডাইস’। এটার প্রেক্ষাপট ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালের ঘটনাবহুল টানপোড়নের ইতিহাস। জার্মানদের ঔপনিবেশিকতা এবং রাজনৈতিক আগ্রাসনের যে বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়েছিল সেসবের কথা উঠে এসেছে এই উপন্যাসে। পূর্ব আফ্রিকাতে তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রারম্ভিক ডামাডোলের ক্ষীণ অংশ বিশেষ লক্ষ্য করা যাচ্ছে, ইউসুফ নামের ১২ বছরের কিশোরকে বেঁচে দেয়া হচ্ছে মহাজনের কাছে। রক্ষকদের কাছে দুর্বলের নিবিড় আত্মসমর্পণের খবর সবার অগোচরেই রয়ে যায়। শুধু সেই জানে যার জীবন বদলায় অন্যের হাতে হাতে। এই প্রসঙ্গে ২০১৯ সালের নোবেল বিজয়ী ম্যারিসকন্ডের উপন্যাসের কথা উঠে আসতে পারে। তাঁর লেখার মধ্যে পাওয়া যায় সর্বনাশা ঔপনিবেশিকতা এবং ঔপনিবেশিকতা পরবর্তী নিপীড়ন আর চরম অশান্তির কথা। গুয়াডেলুপে জন্ম নেয়া এই ঔপন্যাসিক ফ্রান্সে বেড়ে ওঠেন এবং সেখানেই শিক্ষা জীবন শুরু করেন।

গুরনাহর ‘অ্যাডমাইরিং সাইলেন্স’ (১৯৯৬) উপন্যাসে রয়েছে আত্মজীবনের নানা দিক, সরাসরি আত্মজীবনী না হলেও পরবাস জীবনের ঘটনা অবলম্বনে লেখা তাঁর এই তৃতীয় উপন্যাস। ১৯৬০ সালে এক যুবক ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান এবং এক ইংরেজ নারীর প্রেমে পড়েন এবং পারিবারিক অধ্যায় শুরু করেন। তিনি চেষ্টা করেন এই অপরিচিত সমাজের সাথে নিজেকে খাপখাইয়ে নিতে। সেখান থেকেই আসল লড়াইটা শুরু হয়। আব্দুলরাজাক দেখিয়েছেন একজন অফ্রিকার অভিবাসীকে সবাই সাদরে গ্রহণ করতে পারে না; এবং কীভাবে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র সোচ্চার হয়ে ওঠে। আরও দেখিয়েছেন দুটি ভিন্ন সাংস্কৃতিক ধারার মধ্যে এবং দুটি আলাদা ভৌগোলিক সীমারেখায় বেড়ে ওঠা যাপনের নিখুঁত চিত্র।

উঠে আসতে পারে জাপানে জন্মগ্রহণ করা কাজুও ইশিগুরোর কথা, যিনি পাঁচ বছর বয়সে বৃটেনে চলে আসেন। সমগ্র সাহিত্যকর্মের জন্য ২০১৭ সালে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। নস্টালজিয়া এবং কল্পনা শক্তি তাঁর সাহিত্য সৃষ্টির মূল রসদ হিসেবে কাজ করেছে। আব্দুলরাজাকের সাহিত্যকর্মের মধ্যেও কাজুও ইশিগুরোর সাদৃশ্যতা খুঁজে পাওয়া যায়। দেখা যায় দুজনেই একটি দীর্ঘ সময় ধরে ইংল্যান্ডে বসবাস করছেন, দু’জনে প্রায় একই সময়ে অর্থাৎ ১৯৬০ সালে বৃটেনে পাড়ি জমান। ইশিগুরো পড়েছেন সারিতে আর আব্দুলরাজাক পড়াশোনা করেছেন কেন্টে। ইংল্যান্ডের সারি এবং কেন্ট পাশাপাশি সীমারেখায় অবস্থিত। অব্দুলরাজাকের উপন্যাসগুলোর মধ্যে দুটো দিকের গল্প উঠে এসেছে- একটি তাঁর শৈশব স্মৃতি বিজড়িত পূর্ব আফ্রিকার সমাজব্যবস্থার কথা অন্যটি তাঁর ইংল্যান্ডে বেড়ে ওঠা এবং এখানকার শিল্প সংস্কৃতির সাথে তাঁর ভেতরকার যে উপলব্ধি রয়েছে সেটার একটা বর্ণনা। ইশিগুরোর উপন্যাস পর্যালোচানা করলে দেখা যায় তিনিও প্রখর কল্পনা শক্তি দিয়ে লিখেছেন। তাঁর প্রথম দুটি উপন্যাস: ‘এ পেইল ভিউ অফ হিল্স’ এবং ‘অ্যান আর্টিস্ট অফ দ্য ফ্লোটিং ওয়ার্ল্ড’, অতীতদিনের গল্প অর্থাৎ ছোটবেলায় ফেলে আসা জাপানের গল্প যাকে বলে ‘এক্সপ্লোরেশন্স অফ জাপানিজ আইডেনটিটি’।

আব্দুলরাজাক প্রায় দশটির মতো উপন্যাস লিখেছেন, লিখেছেন বেশ কিছু ছোট গল্পও। তাঁর সাহিত্যকর্মের ভেতর সবচেয়ে যে বিষয়টির বারবার পাওয়া যায় সেটা হলো, বোহেমিয়ান জীবন অথবা শরণার্থী যাপন। ইংল্যান্ডে আসার আগে সয়াহিলি ছিল প্রথম ভাষা, তারপর শুরু করেন ইংরেজিতে লেখা, তখন তাঁর বয়স একুশ। প্রথম দিককার তাঁর লেখালেখি সাহিত্য হিসেবে গণ্য করা হয় না। শৈশবে আরবি বা ফার্সিতে লেখা কবিতা এবং ফ্যান্টাসি গল্পগুলো তাঁকে বিমোহিত করতো। কেন্টে পড়াশোনা করাকালীন লেখালেখির জন্য তিনি নিজেকে প্রস্তুত করেন যেভাবে প্রস্তুত করেছিলেন ভি. এস. নাইপল।

গুরনাহর গল্পগুলোতে তারাই স্থান পেয়েছে যারা সবসময় উঁচুস্তরের মানুষের দৃটির আড়ালে থেকেছে, যারা সমাজের অবহেলিত আর নিগৃহীতদের তালিকায় আজীবন রয়ে গেছে। তাঁর গল্পের চরিত্রগুলোর মধ্যে স্থান পেয়েছে দোকানদার থেকে শুরু করে কলেজের ছাত্র পর্যন্ত; গৃহকর্তা থেকে স্থানীয় সৈন্য যারা ঔপনিবেশিক শিবিরে কাজ করেছে এমন সৈনিকদের দৈনন্দিন জীবন তুলে ধরেছেন তাঁর লেখায়। তবে শরণার্থী তাঁর কাছে একটি গুরুতপূর্ণ বিষয় এবং এর ভেতরকার চরিত্রগুলোকে তিনি অর্থবহুল এবং আবেগময় করে তুলেছেন। পাঠককে মনে করিয়ে দিয়েছেন প্রত্যকেটি মানুষই মূল্যবান এবং স্মরণযোগ্য।

অ্যাসাইলামের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় শতশত বছর ধরে, উন্নত জীবন লাভের আশায় অথবা মানবিক সংকট কাটিয়ে উঠতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বহুলোক ইউরোপে পাড়ি জমায় এবং নিজেকে টিকিয়ে রাখতে রীতিমত সংগ্রাম করে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করেন। এসবের পেছনে যেসব বেদনামিশ্রিত গল্প লুকিয়ে থাকে; আত্ম্যাগের মধ্যে যেসব ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র উপলব্ধি জমা থাকে সেসব নিয়ে গুরনাহ তাঁর উপন্যাস লেখার তাগিদ অনুভব করেছেন।

***

তথ্যসূত্র: 1. Read More About Abdulrazak Gurnah’s Book by Joumana Khatib, published on nytimes.com

2. Abdulrazak Gurnah: where to start with the Nobel prize winner by Maaza Mengiste, published on theguardian.com

3. Abdulraja Gunrah, winner of the Nobel Prize for literaure by David Pilling, published in The Financial Times

4. The Nobel prize in literature 2021 - Biobibliographical notes, published on nobelprize.org