বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা

রিসতিয়াক আহমেদ

বিশিষ্ট কবি ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হারিসুল হক বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাভাবনা নিয়ে রচনা করেছেন ‘বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্যভাবনা’ গ্রন্থটি। মুজিব শতবর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তিতে গ্রন্থটি বঙ্গবন্ধুর বিস্তৃত চিন্তাজগতে নতুন আলো ফেলেছে। এভাবে সুসংকলিত করে এর আগে বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্যভাবনাকে কেউ এতটা সাবলীলভাবে উপস্থাপন করতে পারেননি। বঙ্গবন্ধুর জাতীয় ভাবনা ও দূরদর্শী উন্নয়ন চিন্তায় এ জাতীয় গবেষণা-বিশ্লেষণ অসামান্য গুরুত্ব বহন করে। শুধু স্বাধীনতার মহানায়ক ছাড়াও বঙ্গবন্ধু একটি দেশের স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে যে দূরদর্শী পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করেন, সেটা আরো বেশি করে উপলব্ধি করা যাবে আলোচ্য গ্রন্থে।

হাজার বছর ধরে নির্যাতিত নিপিড়ীত হওয়া একটি জাতির নাম বাঙালি। স্বাধীনতার জন্য যাকে লড়তে হয়েছে বারবার। তবে সেই স্বাধীনতা লড়াইয়ের মুক্তির স্বাদ সে কখনোই পায়নি। মধ্যযুগীয় দাসত্ব প্রথার মতো শুধু তার প্রভুই বদলেছে। কখনো আর্য, কখনো মুসলিম, কখনোবা ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ। কিন্তু তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে রয়েছে সংগ্রাম।

মানুষের যে সমাজ তা সংঘবদ্ধতার কারণে খর¯্রােতা নদীর মতো আপনাআপনিই বাঁক খেতে খেতে বয়ে যেতে থাকে। কিন্তু যখন পৃথিবীতে একাধিক স্থানে এই ব্যবস্থা বিদ্যমান তখন তাদের মধ্যকার সুসম্পর্ক গঠন কিংবা অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজন পড়ল আর একটি ব্যবস্থার। অর্থাৎ রাজ্য বা আধুনিককালে রাষ্ট্রযন্ত্র। আর এই রাজ্য বা রাষ্ট্রযন্ত্রকে সঠিকভাবে পরিচালিত করার জন্য যে নেতার প্রয়োজন পড়ে তা সমাজই সৃষ্টি করে নেয়। বা যিনি নেতা হন তাকে সমাজের কোল থেকেই উঠে আসতে হয়। তাঁর সমাজ সম্পর্কে থাকতে হয় স্পষ্ট ধারণা। ভৌগোলিক পরিবেশের সাথে সাথে যে দর্শনটি সমাজের ভেতর পরিবর্তিত হতে থাকে তিনি তা অনুধাবন করতে এবং আরও গতিশীল করতে সক্ষম হন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলেন সেই সমাজের কোল থেকে উঠে আসা নেতা যাকে সমাজ বেছে নিয়েছে। তাঁর স্পষ্ট ধারণা ছিল বাংলার মানুষের হাজার বছর ধরে ঐতিহাসিক বসবাস সম্পর্কে। তিনি অনুধাবন করতে পেরেছেন বাংলার সমাজের সৃষ্টি এবং বেড়ে ওঠা। এবং বাহ্যিক প্রভুদের ক্ষমতার লড়াইয়ের বদৌলতে যে এখানে বারংবার একটি সুস্থ সুন্দর সমাজ ব্যবস্থায় কৃত্রিম সঙ্ঘাতের সৃষ্টি হয়েছে তা তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছেন। এবং প্রতিবার যে শুধুমাত্র নেতার পরিবর্তন, সমাজকে গতিশীল করার কিংবা সমাজকে একটি সুন্দর কাঠামোগত ব্যবস্থা প্রদান করা প্রয়োজন, যা কোনোকালেই সম্ভব হয়নি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেটিই তৈরি করতে চেয়েছেন। এই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা অনেকেই করেছেন কিন্তু তা সম্ভব হয়নি এই কারণে যে, নিজেদের ভৌগোলিক পরিবেশ, সমাজদর্শন এবং সর্বোপরি নিজের মানুষদের সম্পর্কে তাদের স্পষ্ট ধারণা ছিল না। তারা দূরদ্বীপবাসীদের আন্দোলনে আন্দোলিত হয়ে কাতর হয়েছেন, বিপ্লবী হয়েছেন অনুসরণ না করে অনুকরণে এখানে তার প্রতিফলন ঘটাতে চেয়েছেন। পক্ষান্তরে শেখ মুজিবুর রহমান পৃথিবীর অন্যান্য আন্দোলন এবং সমাজদর্শনকে অনুধাবন করে এই সমাজের উপযোগি করে তা প্রবেশ করাতে চেয়েছেন। আর তাই তার সমাজচিন্তায় সমাজতন্ত্র এবং গণতন্ত্র হাত ধরাধরি করে এগিয়েছে।

যেকোনো সমাজের বৃহত্তর শ্রেণির কথা মাথায় রেখে তাদের সহযোগিতায় দেশের আমূল পরিবর্তনের পথে চলতে হয়। বিশেষ করে মৌলিক চাহিদার ক্ষেত্রে। বঙ্গবন্ধু সেই দিকেই নজর দিয়েছেন। যুদ্ধোত্তর সময় এ দেশ ছিল কৃষিনির্ভর দেশ এবং অধিকাংশ জনগণই বসবাস করেন গ্রামে আর তাই তিনি উৎপাদনের ক্ষেত্রে নজর দিয়েছেন এবং অবশ্যই তা দেশীয় উৎপাদন, কৃষি উৎপাদন। তাছাড়া শহরে যারা থাকেন তারাও অধিকাংশই শ্রমিক শ্রেণির। আর তাই যেখানে উৎপাদনক্ষম মানুষ কৃষক এবং শ্রমিক শ্রেণির এবং তাদের হাতে দেশের চালিকাশক্তি তাই তাদের জীবনাচরণে বঙ্গবন্ধু অধিক মনোযোগী হন। স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে তাদের স্বাস্থ্য ভাবনায় ভাবিত হয়ে গ্রহণ করেন বেশ কিছু মৌলিক পদক্ষেপ। অধ্যাপক হারিসুল হক তাঁর ‘বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা’ গ্রন্থে বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে সেই প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পদক্ষেপের বহুল তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে তার সম্ভাবনার দিকগুলো উন্মোচন করেছেন। লেখক গ্রন্থে স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ভৌগোলিক বাস্তবতা, যুদ্ধোত্তর সময়ে

দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং এসব চ্যালেঞ্জ করে বঙ্গবন্ধু সরকার বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়নের যে সব পদক্ষেপ গ্রহণ করছিলেন এবং এর ফলে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে যে আমূল পরিবর্তনের সম্ভাবনা ছিল তার সকল দিক আলোচনা করতে সক্ষম হন।

ঐতিহাসিকভাবে অধ্যাপক হারিসুল হক দেখাচ্ছেন, বৃটিশ সরকারের সময়ে যখন কলকাতায় অ্যালোপ্যাথিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে তখন কলকাতা মেডিক্যালের এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষার্থীই হলো ঢাকা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের বাসিন্দা। ফলত ১৮৭৫ সালের ১৫ জুন ঢাকার সিভিল সার্জনকে সুপারিন্টেন্ডেন্টের দায়িত্ব দিয়ে ঢাকা মেডিক্যাল স্কুলের কার্যক্রম শুরু করার প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে বৃটিশ ষড়যন্ত্রের দরুন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এ অঞ্চলের চিকিৎসা উন্নয়নে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। ১৯৪৭ সালের ভারত পাকিস্তান বিভক্তিতে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকবর্গের চিন্তায়ও ১৪০০ মাইল দূরের এই অঞ্চলের স্বাস্থ্য ভাবনা তাদের তাড়িত করেনি। এছাড়াও অন্যান্য ক্ষেত্রেও মাত্রাতিরিক্ত বৈষম্য থাকার কারণে ১৯৭২ সালে সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের নগর বলতে বোঝাতো কেবল ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও নারায়ণগঞ্জ এ চারটিকে।

পরিকল্পনা যেখানে কাজের অর্ধাংশ সেখানে বঙ্গবন্ধু সরকারের প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো তথ্য সংগ্রহ করা। কেননা, বঙ্গবন্ধু সরকারের কাছে বলতে গেলে তখন কোনো তথ্য উপাত্তই ছিল না যার উপর নির্ভর করে পরবর্তীতে পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব। তাই তিনি বাংলাদেশ পরিসংখ্যানের সাথে সংশ্লিষ্ট চারটি পৃথক সংস্থাকে একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার অধীনে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করেন। সংস্থাগুলো হলো:

১. দ্য বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিক্স

২. দ্য ব্যুরো অব এগ্রিকালচারাল স্ট্যাটিস্টিক্স

৩. দ্য পপুলেশন সেনসাস কমিশন এবং

৪. দ্য এগ্রিকালচারাল সেনসাস কমিশন।

এছাড়া অন্যান্য মন্ত্রণালয় এবং বিভাগ নিজ নিজ প্রয়োজনে গবেষণা সেল গঠনের অনুমতি লাভ করেন।

এ সময়ে দেখা যাচ্ছে নবজাতকের মৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ১৪০ জন এবং পাঁচ বছরের নিচের শিশু মৃত্যু হার ২৬০ জন। এবং ইউনাইটেড ন্যাশনস রিলিফ অপারেশনস বাংলাদেশ (UNROB)-এ এক সমীক্ষায় এ দেশের ১০ বৎসরের নিচের ৩.৮ মিলিয়ন শিশু মাঝারি থেকে তীব্র পুষ্টিহীনতার শিকার। এর মূল কারণ ছিল নানা ধরনের সংক্রমণ। ম্যালেরিয়া, যক্ষা, গুটি বসন্ত, কলেরা, উদরাময়- শিশুদের ডিপথেরিয়া, নবজাতকের ধনুষ্টংকার, হুপিং কফ, হাম প্রভৃতি রোগে প্রতি বছর ১ লাখ মানুষ মারা যাচ্ছে। শিল্প শ্রমিকদের মধ্যে যক্ষার প্রকোপ প্রতি হাজারে ২.৬ থেকে ৪.৫। কিন্তু সে সময় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা থাকা নামসর্বস্ব ১৫০টি রুরাল হেলথ সেন্টারের উপস্থিতি কার্যত সরকারি স্থবির স্থাপনা ভিন্ন কিছুই ছিল না। সে সময় দেশজুড়ে হাসপাতালগুলোতে মোট শয্যা ছিল ১২,৩১১টি। যার মধ্যে ১০,৪৪৯টি সরকারি আর বাকি ১,৮৬২টি শয্যা বেসরকারি পর্যায়ের। এর মধ্যে মাতৃমঙ্গল ও শিশুস্বাস্থ্য সেবাকেন্দ্র মাত্র ৯৩টি এবং তাতে শয্যা সংখ্যা মাত্র ৪০৮টি। উল্লেখ্য, প্রায় সব শয্যাই ছিল শহরের হাসপাতালগুলোতে। চিকিৎসাবিদ্যার সকল শাখা মিলিয়ে মোট ২৫৯ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ছিলেন। তাদের মধ্যে ২৪৭ জনকে সরকারি চাকরিতে স্থানান্তর সম্ভব ছিল। আর দেশে বিদেশে প্রশিক্ষণরত চিকিৎসকের সংখ্যা ছিল সাকল্যে ১৭৮ জন। কিন্তু স্বাস্থ্যসেবায় ত্বরিত প্রাণপ্রবাহ সৃষ্টি করতে স্বাস্থ্যকাঠামোতে আরও ৭১৯ জন চিকিৎসকের প্রয়োজন ছিল। আর নার্সিং সেবায় সারা দেশে সাকল্যে ৭০০ জন নার্স, ২৫০ জন মিডওয়াইভস এবং ২৭৫ জন মহিলা স্বাস্থ্য পরিদর্শিকা কর্মরত ছিলেন। এবং সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে কর্মরত স্যানিটারি ইন্সপেক্টর ছিল ৯৮০ জন, কম্পাউন্ডার হাজারেরও কম, ল্যাবরেটরি টেকনিশিয়ান ১১ আর ফিজিওথেরাপি টেকনিশিয়ান ছিল মাত্র ২০ জন।

বঙ্গবন্ধু সরকার এসব মাথায় রেখে ১৯৭২ সালের আইনে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ধারা ১৫-তে ঘোষণা করেন যে, রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে উৎপাদনশক্তির ক্রমবৃদ্ধিসাধন এবং জনগণের জীবনযাত্রার বস্তুগত ও সংস্কৃতিগত মানের দৃঢ় উন্নতিসাধন, যাহাতে নাগরিকদের জন্য নিম্নলিখিত বিষয়সমূহ অর্জন নিশ্চিত করা যায়:

(ক) অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা;...। একইভাবে জনস্বাস্থ্য ও নৈতিকতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ১৮(১) ধারায় সরকার প্রত্যয় ঘোষণা করে যে, জনগণের পুষ্টির স্তর-উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতিসাধনকে রাষ্ট্র অন্যতম প্রাথমিক কিংবা আইনের দ্বারা নির্দিষ্ট অন্যবিধ প্রয়োজন ব্যতীত মদ্য ও মাদক পানীয় এবং স্বাস্থ্যহানিকর ভেষজের ব্যবহার নিষিদ্ধকরণের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।...

বঙ্গবন্ধু সরকার ১৯৭৩-৭৪ সালের পরিকল্পনার সময় এমইপিসহ স্বাস্থ্য সেবার জন্য বরাদ্দ করেন ২০০০০০০ কোটি টাকা। প্রতি থানায় প্রাথমিক পর্যায়ে একটি করে ২৫ শয্যার হাসপাতাল এবং একটি রুরাল হেলথ কমপ্লেক্স স্থাপনের পরিকল্পনা নেয়। আর ইউনিয়ন পর্যায়ে রুরাল হেলথ সেন্টার স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়- যা রুরাল হেলথ কমপ্লেক্সের আওতায় থাকবে। ১৯৭২-৭৩ সালের তথ্য অনুযায়ী যেখানে জেলা ও মহকুমা পর্যায়ে হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ১১১৮ ও ১০৮৬ সেখানে ১৯৭৭-৭৮ সালের ভেতর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় যথাক্রমে ১৪৬৫ ও ৩৮০০। এবং প্রশিক্ষণ প্রদায়ী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাকে ৩৪৭০ থেকে ৫০০০। আর বিশেষায়িত হাসপাতালের শয্যা সংখ্যাকে ১৬০৬ থেকে ৩০৭০। এছাড়া নগর স্বাস্থ্যসেবা, প্রসূতি ও শিশুস্বাস্থ্য সেবা কার্যক্রম, শিল্পস্বাস্থ্য সেবা কার্যক্রম, জনস্বাস্থ্য ল্যাবরেটরি সার্ভিস, এন্টিসেরা ও টক্সয়েড তৈরি, ইনফিউশন ফ্লুইড উৎপাদন, ইন্সটিটিউট অব নিউট্রিশন, মেডিকেল গবেষণা, দক্ষ জনবল গড়ে তোলার পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। চিকিৎসা জনশক্তিকে ত্বরান্বিত করার জন্য মেডিকেল গ্রাজুয়েট, কিউরেটিভ মেডিসিনে উচ্চতর প্রশিক্ষণ, প্রিভেনটিভ মেডিসিন ও পাবলিক হেলথ বিষয়ে ডাক্তারদের প্রশিক্ষণ, মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ক্যাডার তৈরি, মৌলিক নার্সেস, প্যারামেডিক্স প্রশিক্ষণের পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ঔষধ শিল্প এবং ঔষধের মান নিয়ন্ত্রণে আনেন নীতিমালা। যেখানে বলা হচ্ছে-

১. যারা কেবল প্রয়োজনীয় এবং মৌলিক ঔষধ প্রস্তুত করতে সক্ষম তাদেরই কেবল লাইসেন্স এবং আর্থিক প্রণোদনা দেয়া হবে এবং সে সকল ঔষধ কোম্পানিগুলোকে এসব সুযোগ সুবিধা দেয়া হবে।

২. দেশকে মৌলিক ও প্রয়োজনীয় ঔষধে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার লক্ষ্যে সিদ্ধান্ত নেয়া হলো লাইসেন্স কিংবা প্রণোদনা দেয়ার আগেই সেই কোম্পানির সক্ষমতা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হবে।

৩. প্রাথমিকভাবে পর্যায়ে ঔষধ কোম্পানিগুলোকে দেশের চাহিদা মোতাবেক মৌলিক ও প্রয়োজনীয় ঔষধ প্রস্তুত করতে হবে। দেশে ঔষধের চাহিদা লক্ষ্য পূরণের পরই কেবল রপ্তানির কথা ভাবা হবে।

অধ্যাপক ডা. হারিসুল হকের পরিশ্রমী-অনুসন্ধিৎসু তথ্য উপাত্তের সম্ভার এই ‘বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্যভাবনা’ গ্রন্থটি। দেশের নেতৃস্থানীয়দের বঙ্গবন্ধুর চিকিৎসা ভাবনা এবং পদক্ষেপগুলো জানতে ও ভাবাতে সাহায্য করবে, যাতে করে তারা নিজেদের দায়িত্ব এবং পদক্ষেপ গ্রহণে সচেষ্ট হতে পারবেন।

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্যভাবনা ॥ অধ্যাপক ডা. হারিসুল হক ॥ প্রকাশক : কবিতা সংক্রান্তি ॥ প্রকাশকাল : আগস্ট ২০২১ ॥ প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ ॥ মূল্য : ৩০০ টাকা।

বৃহস্পতিবার, ১৪ অক্টোবর ২০২১ , ২৯ আশ্বিন ১৪২৮ ০৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা

রিসতিয়াক আহমেদ
image

বিশিষ্ট কবি ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হারিসুল হক বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাভাবনা নিয়ে রচনা করেছেন ‘বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্যভাবনা’ গ্রন্থটি। মুজিব শতবর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তিতে গ্রন্থটি বঙ্গবন্ধুর বিস্তৃত চিন্তাজগতে নতুন আলো ফেলেছে। এভাবে সুসংকলিত করে এর আগে বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্যভাবনাকে কেউ এতটা সাবলীলভাবে উপস্থাপন করতে পারেননি। বঙ্গবন্ধুর জাতীয় ভাবনা ও দূরদর্শী উন্নয়ন চিন্তায় এ জাতীয় গবেষণা-বিশ্লেষণ অসামান্য গুরুত্ব বহন করে। শুধু স্বাধীনতার মহানায়ক ছাড়াও বঙ্গবন্ধু একটি দেশের স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে যে দূরদর্শী পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করেন, সেটা আরো বেশি করে উপলব্ধি করা যাবে আলোচ্য গ্রন্থে।

হাজার বছর ধরে নির্যাতিত নিপিড়ীত হওয়া একটি জাতির নাম বাঙালি। স্বাধীনতার জন্য যাকে লড়তে হয়েছে বারবার। তবে সেই স্বাধীনতা লড়াইয়ের মুক্তির স্বাদ সে কখনোই পায়নি। মধ্যযুগীয় দাসত্ব প্রথার মতো শুধু তার প্রভুই বদলেছে। কখনো আর্য, কখনো মুসলিম, কখনোবা ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ। কিন্তু তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে রয়েছে সংগ্রাম।

মানুষের যে সমাজ তা সংঘবদ্ধতার কারণে খর¯্রােতা নদীর মতো আপনাআপনিই বাঁক খেতে খেতে বয়ে যেতে থাকে। কিন্তু যখন পৃথিবীতে একাধিক স্থানে এই ব্যবস্থা বিদ্যমান তখন তাদের মধ্যকার সুসম্পর্ক গঠন কিংবা অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজন পড়ল আর একটি ব্যবস্থার। অর্থাৎ রাজ্য বা আধুনিককালে রাষ্ট্রযন্ত্র। আর এই রাজ্য বা রাষ্ট্রযন্ত্রকে সঠিকভাবে পরিচালিত করার জন্য যে নেতার প্রয়োজন পড়ে তা সমাজই সৃষ্টি করে নেয়। বা যিনি নেতা হন তাকে সমাজের কোল থেকেই উঠে আসতে হয়। তাঁর সমাজ সম্পর্কে থাকতে হয় স্পষ্ট ধারণা। ভৌগোলিক পরিবেশের সাথে সাথে যে দর্শনটি সমাজের ভেতর পরিবর্তিত হতে থাকে তিনি তা অনুধাবন করতে এবং আরও গতিশীল করতে সক্ষম হন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলেন সেই সমাজের কোল থেকে উঠে আসা নেতা যাকে সমাজ বেছে নিয়েছে। তাঁর স্পষ্ট ধারণা ছিল বাংলার মানুষের হাজার বছর ধরে ঐতিহাসিক বসবাস সম্পর্কে। তিনি অনুধাবন করতে পেরেছেন বাংলার সমাজের সৃষ্টি এবং বেড়ে ওঠা। এবং বাহ্যিক প্রভুদের ক্ষমতার লড়াইয়ের বদৌলতে যে এখানে বারংবার একটি সুস্থ সুন্দর সমাজ ব্যবস্থায় কৃত্রিম সঙ্ঘাতের সৃষ্টি হয়েছে তা তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছেন। এবং প্রতিবার যে শুধুমাত্র নেতার পরিবর্তন, সমাজকে গতিশীল করার কিংবা সমাজকে একটি সুন্দর কাঠামোগত ব্যবস্থা প্রদান করা প্রয়োজন, যা কোনোকালেই সম্ভব হয়নি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেটিই তৈরি করতে চেয়েছেন। এই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা অনেকেই করেছেন কিন্তু তা সম্ভব হয়নি এই কারণে যে, নিজেদের ভৌগোলিক পরিবেশ, সমাজদর্শন এবং সর্বোপরি নিজের মানুষদের সম্পর্কে তাদের স্পষ্ট ধারণা ছিল না। তারা দূরদ্বীপবাসীদের আন্দোলনে আন্দোলিত হয়ে কাতর হয়েছেন, বিপ্লবী হয়েছেন অনুসরণ না করে অনুকরণে এখানে তার প্রতিফলন ঘটাতে চেয়েছেন। পক্ষান্তরে শেখ মুজিবুর রহমান পৃথিবীর অন্যান্য আন্দোলন এবং সমাজদর্শনকে অনুধাবন করে এই সমাজের উপযোগি করে তা প্রবেশ করাতে চেয়েছেন। আর তাই তার সমাজচিন্তায় সমাজতন্ত্র এবং গণতন্ত্র হাত ধরাধরি করে এগিয়েছে।

যেকোনো সমাজের বৃহত্তর শ্রেণির কথা মাথায় রেখে তাদের সহযোগিতায় দেশের আমূল পরিবর্তনের পথে চলতে হয়। বিশেষ করে মৌলিক চাহিদার ক্ষেত্রে। বঙ্গবন্ধু সেই দিকেই নজর দিয়েছেন। যুদ্ধোত্তর সময় এ দেশ ছিল কৃষিনির্ভর দেশ এবং অধিকাংশ জনগণই বসবাস করেন গ্রামে আর তাই তিনি উৎপাদনের ক্ষেত্রে নজর দিয়েছেন এবং অবশ্যই তা দেশীয় উৎপাদন, কৃষি উৎপাদন। তাছাড়া শহরে যারা থাকেন তারাও অধিকাংশই শ্রমিক শ্রেণির। আর তাই যেখানে উৎপাদনক্ষম মানুষ কৃষক এবং শ্রমিক শ্রেণির এবং তাদের হাতে দেশের চালিকাশক্তি তাই তাদের জীবনাচরণে বঙ্গবন্ধু অধিক মনোযোগী হন। স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে তাদের স্বাস্থ্য ভাবনায় ভাবিত হয়ে গ্রহণ করেন বেশ কিছু মৌলিক পদক্ষেপ। অধ্যাপক হারিসুল হক তাঁর ‘বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ভাবনা’ গ্রন্থে বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে সেই প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পদক্ষেপের বহুল তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে তার সম্ভাবনার দিকগুলো উন্মোচন করেছেন। লেখক গ্রন্থে স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ভৌগোলিক বাস্তবতা, যুদ্ধোত্তর সময়ে

দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং এসব চ্যালেঞ্জ করে বঙ্গবন্ধু সরকার বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়নের যে সব পদক্ষেপ গ্রহণ করছিলেন এবং এর ফলে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে যে আমূল পরিবর্তনের সম্ভাবনা ছিল তার সকল দিক আলোচনা করতে সক্ষম হন।

ঐতিহাসিকভাবে অধ্যাপক হারিসুল হক দেখাচ্ছেন, বৃটিশ সরকারের সময়ে যখন কলকাতায় অ্যালোপ্যাথিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে তখন কলকাতা মেডিক্যালের এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষার্থীই হলো ঢাকা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের বাসিন্দা। ফলত ১৮৭৫ সালের ১৫ জুন ঢাকার সিভিল সার্জনকে সুপারিন্টেন্ডেন্টের দায়িত্ব দিয়ে ঢাকা মেডিক্যাল স্কুলের কার্যক্রম শুরু করার প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে বৃটিশ ষড়যন্ত্রের দরুন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এ অঞ্চলের চিকিৎসা উন্নয়নে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে। ১৯৪৭ সালের ভারত পাকিস্তান বিভক্তিতে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকবর্গের চিন্তায়ও ১৪০০ মাইল দূরের এই অঞ্চলের স্বাস্থ্য ভাবনা তাদের তাড়িত করেনি। এছাড়াও অন্যান্য ক্ষেত্রেও মাত্রাতিরিক্ত বৈষম্য থাকার কারণে ১৯৭২ সালে সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের নগর বলতে বোঝাতো কেবল ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও নারায়ণগঞ্জ এ চারটিকে।

পরিকল্পনা যেখানে কাজের অর্ধাংশ সেখানে বঙ্গবন্ধু সরকারের প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো তথ্য সংগ্রহ করা। কেননা, বঙ্গবন্ধু সরকারের কাছে বলতে গেলে তখন কোনো তথ্য উপাত্তই ছিল না যার উপর নির্ভর করে পরবর্তীতে পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব। তাই তিনি বাংলাদেশ পরিসংখ্যানের সাথে সংশ্লিষ্ট চারটি পৃথক সংস্থাকে একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার অধীনে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করেন। সংস্থাগুলো হলো:

১. দ্য বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিক্স

২. দ্য ব্যুরো অব এগ্রিকালচারাল স্ট্যাটিস্টিক্স

৩. দ্য পপুলেশন সেনসাস কমিশন এবং

৪. দ্য এগ্রিকালচারাল সেনসাস কমিশন।

এছাড়া অন্যান্য মন্ত্রণালয় এবং বিভাগ নিজ নিজ প্রয়োজনে গবেষণা সেল গঠনের অনুমতি লাভ করেন।

এ সময়ে দেখা যাচ্ছে নবজাতকের মৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ১৪০ জন এবং পাঁচ বছরের নিচের শিশু মৃত্যু হার ২৬০ জন। এবং ইউনাইটেড ন্যাশনস রিলিফ অপারেশনস বাংলাদেশ (UNROB)-এ এক সমীক্ষায় এ দেশের ১০ বৎসরের নিচের ৩.৮ মিলিয়ন শিশু মাঝারি থেকে তীব্র পুষ্টিহীনতার শিকার। এর মূল কারণ ছিল নানা ধরনের সংক্রমণ। ম্যালেরিয়া, যক্ষা, গুটি বসন্ত, কলেরা, উদরাময়- শিশুদের ডিপথেরিয়া, নবজাতকের ধনুষ্টংকার, হুপিং কফ, হাম প্রভৃতি রোগে প্রতি বছর ১ লাখ মানুষ মারা যাচ্ছে। শিল্প শ্রমিকদের মধ্যে যক্ষার প্রকোপ প্রতি হাজারে ২.৬ থেকে ৪.৫। কিন্তু সে সময় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা থাকা নামসর্বস্ব ১৫০টি রুরাল হেলথ সেন্টারের উপস্থিতি কার্যত সরকারি স্থবির স্থাপনা ভিন্ন কিছুই ছিল না। সে সময় দেশজুড়ে হাসপাতালগুলোতে মোট শয্যা ছিল ১২,৩১১টি। যার মধ্যে ১০,৪৪৯টি সরকারি আর বাকি ১,৮৬২টি শয্যা বেসরকারি পর্যায়ের। এর মধ্যে মাতৃমঙ্গল ও শিশুস্বাস্থ্য সেবাকেন্দ্র মাত্র ৯৩টি এবং তাতে শয্যা সংখ্যা মাত্র ৪০৮টি। উল্লেখ্য, প্রায় সব শয্যাই ছিল শহরের হাসপাতালগুলোতে। চিকিৎসাবিদ্যার সকল শাখা মিলিয়ে মোট ২৫৯ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ছিলেন। তাদের মধ্যে ২৪৭ জনকে সরকারি চাকরিতে স্থানান্তর সম্ভব ছিল। আর দেশে বিদেশে প্রশিক্ষণরত চিকিৎসকের সংখ্যা ছিল সাকল্যে ১৭৮ জন। কিন্তু স্বাস্থ্যসেবায় ত্বরিত প্রাণপ্রবাহ সৃষ্টি করতে স্বাস্থ্যকাঠামোতে আরও ৭১৯ জন চিকিৎসকের প্রয়োজন ছিল। আর নার্সিং সেবায় সারা দেশে সাকল্যে ৭০০ জন নার্স, ২৫০ জন মিডওয়াইভস এবং ২৭৫ জন মহিলা স্বাস্থ্য পরিদর্শিকা কর্মরত ছিলেন। এবং সমগ্র বাংলাদেশ জুড়ে কর্মরত স্যানিটারি ইন্সপেক্টর ছিল ৯৮০ জন, কম্পাউন্ডার হাজারেরও কম, ল্যাবরেটরি টেকনিশিয়ান ১১ আর ফিজিওথেরাপি টেকনিশিয়ান ছিল মাত্র ২০ জন।

বঙ্গবন্ধু সরকার এসব মাথায় রেখে ১৯৭২ সালের আইনে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ধারা ১৫-তে ঘোষণা করেন যে, রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে উৎপাদনশক্তির ক্রমবৃদ্ধিসাধন এবং জনগণের জীবনযাত্রার বস্তুগত ও সংস্কৃতিগত মানের দৃঢ় উন্নতিসাধন, যাহাতে নাগরিকদের জন্য নিম্নলিখিত বিষয়সমূহ অর্জন নিশ্চিত করা যায়:

(ক) অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা;...। একইভাবে জনস্বাস্থ্য ও নৈতিকতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ১৮(১) ধারায় সরকার প্রত্যয় ঘোষণা করে যে, জনগণের পুষ্টির স্তর-উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতিসাধনকে রাষ্ট্র অন্যতম প্রাথমিক কিংবা আইনের দ্বারা নির্দিষ্ট অন্যবিধ প্রয়োজন ব্যতীত মদ্য ও মাদক পানীয় এবং স্বাস্থ্যহানিকর ভেষজের ব্যবহার নিষিদ্ধকরণের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।...

বঙ্গবন্ধু সরকার ১৯৭৩-৭৪ সালের পরিকল্পনার সময় এমইপিসহ স্বাস্থ্য সেবার জন্য বরাদ্দ করেন ২০০০০০০ কোটি টাকা। প্রতি থানায় প্রাথমিক পর্যায়ে একটি করে ২৫ শয্যার হাসপাতাল এবং একটি রুরাল হেলথ কমপ্লেক্স স্থাপনের পরিকল্পনা নেয়। আর ইউনিয়ন পর্যায়ে রুরাল হেলথ সেন্টার স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়- যা রুরাল হেলথ কমপ্লেক্সের আওতায় থাকবে। ১৯৭২-৭৩ সালের তথ্য অনুযায়ী যেখানে জেলা ও মহকুমা পর্যায়ে হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ১১১৮ ও ১০৮৬ সেখানে ১৯৭৭-৭৮ সালের ভেতর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় যথাক্রমে ১৪৬৫ ও ৩৮০০। এবং প্রশিক্ষণ প্রদায়ী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাকে ৩৪৭০ থেকে ৫০০০। আর বিশেষায়িত হাসপাতালের শয্যা সংখ্যাকে ১৬০৬ থেকে ৩০৭০। এছাড়া নগর স্বাস্থ্যসেবা, প্রসূতি ও শিশুস্বাস্থ্য সেবা কার্যক্রম, শিল্পস্বাস্থ্য সেবা কার্যক্রম, জনস্বাস্থ্য ল্যাবরেটরি সার্ভিস, এন্টিসেরা ও টক্সয়েড তৈরি, ইনফিউশন ফ্লুইড উৎপাদন, ইন্সটিটিউট অব নিউট্রিশন, মেডিকেল গবেষণা, দক্ষ জনবল গড়ে তোলার পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। চিকিৎসা জনশক্তিকে ত্বরান্বিত করার জন্য মেডিকেল গ্রাজুয়েট, কিউরেটিভ মেডিসিনে উচ্চতর প্রশিক্ষণ, প্রিভেনটিভ মেডিসিন ও পাবলিক হেলথ বিষয়ে ডাক্তারদের প্রশিক্ষণ, মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ক্যাডার তৈরি, মৌলিক নার্সেস, প্যারামেডিক্স প্রশিক্ষণের পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ঔষধ শিল্প এবং ঔষধের মান নিয়ন্ত্রণে আনেন নীতিমালা। যেখানে বলা হচ্ছে-

১. যারা কেবল প্রয়োজনীয় এবং মৌলিক ঔষধ প্রস্তুত করতে সক্ষম তাদেরই কেবল লাইসেন্স এবং আর্থিক প্রণোদনা দেয়া হবে এবং সে সকল ঔষধ কোম্পানিগুলোকে এসব সুযোগ সুবিধা দেয়া হবে।

২. দেশকে মৌলিক ও প্রয়োজনীয় ঔষধে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার লক্ষ্যে সিদ্ধান্ত নেয়া হলো লাইসেন্স কিংবা প্রণোদনা দেয়ার আগেই সেই কোম্পানির সক্ষমতা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হবে।

৩. প্রাথমিকভাবে পর্যায়ে ঔষধ কোম্পানিগুলোকে দেশের চাহিদা মোতাবেক মৌলিক ও প্রয়োজনীয় ঔষধ প্রস্তুত করতে হবে। দেশে ঔষধের চাহিদা লক্ষ্য পূরণের পরই কেবল রপ্তানির কথা ভাবা হবে।

অধ্যাপক ডা. হারিসুল হকের পরিশ্রমী-অনুসন্ধিৎসু তথ্য উপাত্তের সম্ভার এই ‘বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্যভাবনা’ গ্রন্থটি। দেশের নেতৃস্থানীয়দের বঙ্গবন্ধুর চিকিৎসা ভাবনা এবং পদক্ষেপগুলো জানতে ও ভাবাতে সাহায্য করবে, যাতে করে তারা নিজেদের দায়িত্ব এবং পদক্ষেপ গ্রহণে সচেষ্ট হতে পারবেন।

বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্যভাবনা ॥ অধ্যাপক ডা. হারিসুল হক ॥ প্রকাশক : কবিতা সংক্রান্তি ॥ প্রকাশকাল : আগস্ট ২০২১ ॥ প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ ॥ মূল্য : ৩০০ টাকা।