ধারাবাহিক উপন্যাস : বিশ

শিকিবু

আবুল কাসেম

ছত্রিশ.

প্যাগোডা থেকে এসে মুরাসাকি ‘গেঞ্জি’ নিয়ে বসলেন। মনোগাতারিটি তাড়াতাড়ি শেষ করতে চান। গত পর্বগুলো অভূতপূর্ব সাড়া জাগিয়েছে। চারদিক থেকে নতুন পর্বের জন্য অনুরোধ। বড় কাজের প্রধান ঝুঁকি হচ্ছে স্বাস্থ্য। স্বাস্থ্য এবং মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক না থাকলে কাজ আগায় না। সুস্থ থাকতে থাকতে কাজটি শেষ করতে চান।

এরকম ভাবনার মাথায় লিখলেন, রাজধানীতে সম্রাট সুজেকো তার পরলোকগত বাবাকে স্বপ্নে দেখে মর্মান্তিক এক মানসিক বিপর্যয়ের শিকার হলেন। তার হৃদয় ভেঙ্গে গেছে। মা কোকিডেন অসুস্থ। তার আর সে শান্তি নেই যে পুত্রের সিংহাসন ধরে রাখেন। এই বিপর্যস্ত মানসিক অবস্থায় সম্রাটের মধ্যে পরিবর্তন এলো। নিজের সকল অপকর্মের জন্য ক্ষমা চাইলেন এবং গেঞ্জিকেও ক্ষমা করে দিলেন।

গেঞ্জি কিয়োটোতে ফিরে এল। আগের মতো দিন যাচ্ছিল। সম্রাট সুজেকোকে দেখেও নিজেকে সংযত করেনি গেঞ্জি। তার ভোগাকাক্সক্ষা আগের মতোই চরিতার্থ করতে তৎপর সে। সম্রাট সুজেকোর মা একেবারে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েছেন। তার সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা নেই। সম্রাট তার সৎভাই ফুজিতসুবোর পুত্র রেইঝেইকে সংবাদ পাঠালেন। প্রিন্সকে বললেন, আমার পক্ষে সম্ভব নয় সম্রাটের সিংহাসনে তোমাকে বসতে হবে।

মা ফুজিতসুবোর সঙ্গে পরামর্শ করে তার উপদেশ মতো রেইজেই সিংহাসনে আরোহন করলেন।

গেঞ্জি মহাসংকটে পড়ে গেলো। খুব ছোট একটা পদে চাকরি করে সে। সম্রাট পুত্রের অধীনে চাকরি করবে কী করে। সে চাকরিতে ইস্তফা দিল। কাউকে তো নয়ই ফুজিতসুবোকেও বলল না যে সে চাকরি ছেড়ে দিচ্ছে।

ফুজিতসুবো গেঞ্জির বোকামির জন্য চিন্তিত। কখনো সেই গোপন রহস্য ফাঁস হয়ে যায় তা ভেবে অস্থির। ডাকালেন তিনি তার প্রেমিক (সৎপুত্রী) গেঞ্জিকে। নিবুদ্ধিতার জন্য ভৎসনা করলেন। গেঞ্জি বলে দিল যে, তার মর্যাদাবোধ আছে, সে পুত্রের অধীনে চাকরি করতে পারে না (সংক্ষেপিত)।

এদিকে গেঞ্জির পদত্যাগ রহস্য ক্রমে ঘনীভূত হতে থাকলো। ফুজিতসুবো ভেবে পেলেন না কি করবেন বা তার কী করা উচিত। তিনি কি আত্মহত্যা করবেন? কী লজ্জা! সবাই জানে রেইঝেই সম্রাট কিরিতসুবোর সন্তান। এখন সত্য ফাঁস হয়ে গেলে কী অবস্থার সৃষ্টি হবে। মৃত্যু ছাড়া তার আর কোনো গত্যন্তর নেই। তিনি শক্ত হলেন। তার মাধ্যমেই প্রকাশ পেল সম্রাট রেইঝেই সম্রাট কিরিতসুবোর সন্তান নয়, গেঞ্জির সন্তান।

এই লেখার জন্য শোনাগন-শিবিরসহ অনেকেই মুরাসাকির তীব্র সমালোচনায় ফেটে পড়লেন। হয়ত ঈর্ষাপরায়ণ লোকজন এরকম একটি সুযোগেরই অপেক্ষা করছিলেন। এরা বললেন যে, এতে হেইয়ান সামাজ্যের সম্রাট-সম্রাজ্ঞীদের মুখে চুনকালি মেখে দেয়া হয়েছে।

মুরাসাকির মন খুব খারাপ। ইমন বললেন, কেন তুমি তা এভাবে প্রকাশ করতে গেলে? সম্রাট-সম্রাজ্ঞীরা কি তা সহজভাবে নেবেন? এখানে লোকজন মনে করে সম্রাটই ঈশ্বর, তার জন্ম নিয়ে কথা বললে কে সহ্য করবে বল? হোক না তা এক কল্পিত কাহিনী।

মুরাসাকি বললেন, লিখেছি তো লিখেছি, আমাকে আমার এই লেখক সত্তা নিয়েই বাঁচতে হবে, সম্রাটের প্রাসাদ, সম্রাজ্ঞীর দরবার কিছুরই প্রয়োজন নেই আমার। মৃত্যু-নির্বাসন সব কিছুর জন্য প্রস্তুত আছি।

তা ঠিক আছে। আমি তোমার পাশে আছি। তবে একটু সাবধানে থেকো, ওরা ডাকলে কথা বলার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রেখো। প্রয়োজনবোধে আলোচনা করে নিতে পারো, ডাকলেই আমি আসবো।

ইমনের সঙ্গে কথা বলে আরো বেশি চিন্তাগ্রস্ত হলেন মুরাসাকি। এ সময় ডাক এলো বিদগ্ধলেডি খ্যাত সেনশির দরবার থেকে। ভাবলেন, শেষ পর্যন্ত তাকেও হারাতে হল। কম্পিত পায়ে প্রবেশ করলেন সম্রাটের মাতা সেনশির দরবারে। সেনশি দাঁড়িয়ে তাকে অভিবাদন জানালেন। মুরাসাকি ভাবলেন তাকে অপমান করা হচ্ছে, অথবা বিদ্রƒপ করছেন তিনি। এই প্রাসাদে ভয়হীন একটা আস্থার জায়গা ছিল, তাও রইল না।

কিন্তু না তাকে অবাক করে দিয়ে সম্রাটমাতা বললেন, অভিনন্দন তোমাকে তাকাকু। সত্য প্রকাশের যে সাহস তুমি দেখিয়েছ, তাতে আমার বুক গর্বে ফুলে উঠেছে, তোমার ওপর আমার আস্থা আছে। আমার কানে সবই আসে। কে কী বলল, একদম পাত্তা দেবে না। লেখক সাহসী হবে না, হবেটা কে?

সেনশি তার দরবারের ঋদ্ধজনদের নিয়ে বসলেন। মুরাসাকিও বসলেন। আজ সেনশির দাসী এসে তার কিমোনো ঠিকঠাক করে দিল। এটা একটা সম্মান। সবাই বিস্মিত। সেনশি তার দিকে তাকিয়ে স্মিত হাসলেন।

দরবারে চা এলো। চায়ের কাপে ধোঁয়া উড়ছে। সাধারণত আধ্যাত্মিক কবিতার আসরে এভাবে ঋষি প্রতীম বিদগ্ধ ব্যক্তিরা ধ্যান করতে করতে চা পান করেন এবং ভাবনার ঊর্ধ্বলোকে পরিভ্রমণ করেন। একটি গদ্যে লেখা আখ্যানাংশের জন্য এরকম আয়োজন এই প্রথম।

সেনশি তার সংগ্রহে থাকা ‘গেঞ্জি’র সে গুরুত্বপূর্ণ স্ক্রলটি মুরাসাকির কাছে পাঠিয়ে দিয়ে বললেন, আজকে তোমার মুখ থেকেই আমরা শুনবো ‘গেঞ্জি’। মনোগাতারির অমৃত বচন।

মুরাসাকি বাল্যকালেই সঙ্গীত, আর্ট ও লিপিবিদ্যার সঙ্গে পাঠের শৈল্পিক ভঙ্গি আয়ত্ব করেছিলেন। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে কণ্ঠ আরো ভারী হয়েছে। সকলের কাছেই তা শ্রুতিমধুর মনে হলো। মুরাসাকির ভাষা অসাধারণ। নিজস্ব কানা ভাষার মধ্যে চীনা ধ্রুপদীর অভিজাত নির্ঝাস এমন এক মুন্সিয়ানায় ছড়িয়েছেন যে, তাতে দরবারি ঐশ্বর্যের একটা গন্ধ পাওয়া যায়।

হেইয়ান রাজসভার ভাষা বেশ বাঁকানো। ব্যাকরণগত ভাবে জটিল। অপর বৈশিষ্ট কবিত্বপ্রধান। কথোপকথনে ধ্রুপদী ছন্দময় পদ্যের ব্যবহার। সে ভাষা ইঙ্গিতধর্মী, পুরোটা প্রকাশ করে না। সবটা বলে ফেললেন যেন আভিজাত্য থাকে না। চলমান প্রেক্ষাপটে ক্লাসিক কাব্য করা আভিজাত্যের প্রকাশ। সে অহংকার নিয়েই তারা বাঁচেন। মুরাসাকি তা জানেন বলেই সে ভাষাগুণটা চীনা ধ্রুপদী ভাষা থেকে নির্ভয়ে এনে তার ভাষাকে পরিপুষ্টি দিয়েছেন।

রাজকীয় বিষয়বস্তুর সঙ্গে রাজ অলংকরণের ভাষা। ঋদ্ধজন বেশ উপভোগ করলেন। পাঠ শেষে সবাই প্রচুর প্রশংসা করলেন।

রাতে অন্যান্য দিনের মতো ভোজানুষ্ঠানের আগে গালগল্পের মজলিস বসেছে। সম্রাট, সম্রাজ্ঞী, প্রিন্সসহ উচ্চপর্যায়ের সবাই এসেছেন অংশ নিতে। এই মজলিসে আসেনিন মুরাসাকি। বিরোধীদের জন্য সুযোগ খুলে গেল। সমালোচনা শুরু হলো শোনাগনের শিবির থেকে। তবে তিনি লেডি সানুকিকে উস্কে দিয়েছেন। পরিকল্পনা তৈরি করা ছিল আগেই। লেডি সানুকি শুরু করেছিলে। তাকে হামলে পড়লেন লেডি সাইশো। তাকে সব লেডিই ভয় পান। তাই সানুকি থতমত খেয়ে থামলেন।

সম্রাজ্ঞী তেইশি বললেন, গেঞ্জি মনোগাতারি হেইয়ান সম্রাটদের গৌরব বৃদ্ধি করেনি, সম্রাজ্ঞীদের সম্মানের দিকেও লেখিকা তাকাননি। আমি এই মনোগাতারির নিষিদ্ধকরণের আবেদন করছি সম্রাটের কাছে। সম্রাট কিছু বলতে যাবেন, সম্রাটের মাতা তাকে থামালেন। বললেন, তুমি পরে বলো। আমি খুব অবাক হচ্ছি সম্রাজ্ঞী তেইশির কাণ্ডজ্ঞানের কথা ভেবে। আমি তো বিস্মিত এবং অভিনন্দন জানাই তাকাকুকে, তার সাহসী কলম ধারণের জন্য। তোমরা যারা লিখছ, লিখে দেখাও এরকম কিছু। এখানে হেইয়ান সাম্রাজ্যের কথা আসছে কেন? কেউ কি এমন ব্যাপার নিয়ে আতঙ্কিত? ইতিহাস তোমাদের জানানেই, চর্চাও নেই। ইতিহাস চর্চা করে ইমন। ইমন বলো তো একাহিনীর গোড়া কোথায়?

ইমন বললেন, সম্রাট দাইগোর শাসনামলকে ধারণ করে আছে এই মনোগাতারি। তবে আভিজাত্য আর আধুনিকতায় রুচিবোধ ও উজ্জ্বলতায় হেইয়ান কিউ এর আলোকে সঞ্চার করেছে। চরিত্র এবং কাহিনী কাল্পনিক। তবে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ এবং দার্শনিকভাবে জাপানের আত্মগত। সবচেয়ে বড় কথা এটি এখনো শেষ হয়নি, সে পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করা উচিত, ধৈর্য ধরা প্রয়োজন।

মিচিনাগা মুরাসাকিকে শোশির দরবারে এনেছেন। তিনি বললেন, একটি লেখা নিয়ে একি হচ্ছে? আমি এই লেখার নিয়মিত পাঠক। লেখিকাকে লেখারগুণে আমি শ্রদ্ধা করি। আমার বোন বলেছেন, লেখিকা সাহসী, আমি মনে করি তা যথোচিত। তার লেখা নিয়ে নেতিবাচক কোনো কথা উঠতে পারে না। এবার মহামান্য সম্রাট বলতে পারেন।

সম্রাট বললেন, এতজন বলার পর আমার আর বলার কিছু থাকতে পারে না। তাকাকু তার লেখা শেষ করুক। আমি তখনই তার লেখা পড়ে মন্তব্য করব। এখন নৈশভোজে অংশ নেয়া যাক।

সবাই নৈশভোজে অংশ নিলেন। সম্রাজ্ঞী তেইশি এবং তার দরবারের লেডি ও কর্মকর্তাদের গলা দিয়ে যেন স্বাদের উপাদেয় আহার্য প্রবেশ করছে না।

[বিভিন্ন লেখায় দেখা যায় সম্রাজ্ঞী তেইশি ১০০১ খ্রিস্টাব্দে মারা যান। বলা হয়েছে মুরাসাকি শিকিবু ১০০৫ খ্রিস্টাব্দে সম্রাজ্ঞী শোশির দরবারে আসেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়ান লেডি-ইন-ওয়েটিং সেই শোনাগন। এই তথ্য সঠিক হলে তেইশির লেডি শোনাগনের সঙ্গে মুরাসাকির সাক্ষাৎ হওয়ার কথা নয়। প্রতিদ্বন্দ্বিতা তো দূরের কথা-লেখক]। ক্রমশ...

বৃহস্পতিবার, ১৪ অক্টোবর ২০২১ , ২৯ আশ্বিন ১৪২৮ ০৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

ধারাবাহিক উপন্যাস : বিশ

শিকিবু

আবুল কাসেম
image

ছত্রিশ.

প্যাগোডা থেকে এসে মুরাসাকি ‘গেঞ্জি’ নিয়ে বসলেন। মনোগাতারিটি তাড়াতাড়ি শেষ করতে চান। গত পর্বগুলো অভূতপূর্ব সাড়া জাগিয়েছে। চারদিক থেকে নতুন পর্বের জন্য অনুরোধ। বড় কাজের প্রধান ঝুঁকি হচ্ছে স্বাস্থ্য। স্বাস্থ্য এবং মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক না থাকলে কাজ আগায় না। সুস্থ থাকতে থাকতে কাজটি শেষ করতে চান।

এরকম ভাবনার মাথায় লিখলেন, রাজধানীতে সম্রাট সুজেকো তার পরলোকগত বাবাকে স্বপ্নে দেখে মর্মান্তিক এক মানসিক বিপর্যয়ের শিকার হলেন। তার হৃদয় ভেঙ্গে গেছে। মা কোকিডেন অসুস্থ। তার আর সে শান্তি নেই যে পুত্রের সিংহাসন ধরে রাখেন। এই বিপর্যস্ত মানসিক অবস্থায় সম্রাটের মধ্যে পরিবর্তন এলো। নিজের সকল অপকর্মের জন্য ক্ষমা চাইলেন এবং গেঞ্জিকেও ক্ষমা করে দিলেন।

গেঞ্জি কিয়োটোতে ফিরে এল। আগের মতো দিন যাচ্ছিল। সম্রাট সুজেকোকে দেখেও নিজেকে সংযত করেনি গেঞ্জি। তার ভোগাকাক্সক্ষা আগের মতোই চরিতার্থ করতে তৎপর সে। সম্রাট সুজেকোর মা একেবারে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েছেন। তার সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা নেই। সম্রাট তার সৎভাই ফুজিতসুবোর পুত্র রেইঝেইকে সংবাদ পাঠালেন। প্রিন্সকে বললেন, আমার পক্ষে সম্ভব নয় সম্রাটের সিংহাসনে তোমাকে বসতে হবে।

মা ফুজিতসুবোর সঙ্গে পরামর্শ করে তার উপদেশ মতো রেইজেই সিংহাসনে আরোহন করলেন।

গেঞ্জি মহাসংকটে পড়ে গেলো। খুব ছোট একটা পদে চাকরি করে সে। সম্রাট পুত্রের অধীনে চাকরি করবে কী করে। সে চাকরিতে ইস্তফা দিল। কাউকে তো নয়ই ফুজিতসুবোকেও বলল না যে সে চাকরি ছেড়ে দিচ্ছে।

ফুজিতসুবো গেঞ্জির বোকামির জন্য চিন্তিত। কখনো সেই গোপন রহস্য ফাঁস হয়ে যায় তা ভেবে অস্থির। ডাকালেন তিনি তার প্রেমিক (সৎপুত্রী) গেঞ্জিকে। নিবুদ্ধিতার জন্য ভৎসনা করলেন। গেঞ্জি বলে দিল যে, তার মর্যাদাবোধ আছে, সে পুত্রের অধীনে চাকরি করতে পারে না (সংক্ষেপিত)।

এদিকে গেঞ্জির পদত্যাগ রহস্য ক্রমে ঘনীভূত হতে থাকলো। ফুজিতসুবো ভেবে পেলেন না কি করবেন বা তার কী করা উচিত। তিনি কি আত্মহত্যা করবেন? কী লজ্জা! সবাই জানে রেইঝেই সম্রাট কিরিতসুবোর সন্তান। এখন সত্য ফাঁস হয়ে গেলে কী অবস্থার সৃষ্টি হবে। মৃত্যু ছাড়া তার আর কোনো গত্যন্তর নেই। তিনি শক্ত হলেন। তার মাধ্যমেই প্রকাশ পেল সম্রাট রেইঝেই সম্রাট কিরিতসুবোর সন্তান নয়, গেঞ্জির সন্তান।

এই লেখার জন্য শোনাগন-শিবিরসহ অনেকেই মুরাসাকির তীব্র সমালোচনায় ফেটে পড়লেন। হয়ত ঈর্ষাপরায়ণ লোকজন এরকম একটি সুযোগেরই অপেক্ষা করছিলেন। এরা বললেন যে, এতে হেইয়ান সামাজ্যের সম্রাট-সম্রাজ্ঞীদের মুখে চুনকালি মেখে দেয়া হয়েছে।

মুরাসাকির মন খুব খারাপ। ইমন বললেন, কেন তুমি তা এভাবে প্রকাশ করতে গেলে? সম্রাট-সম্রাজ্ঞীরা কি তা সহজভাবে নেবেন? এখানে লোকজন মনে করে সম্রাটই ঈশ্বর, তার জন্ম নিয়ে কথা বললে কে সহ্য করবে বল? হোক না তা এক কল্পিত কাহিনী।

মুরাসাকি বললেন, লিখেছি তো লিখেছি, আমাকে আমার এই লেখক সত্তা নিয়েই বাঁচতে হবে, সম্রাটের প্রাসাদ, সম্রাজ্ঞীর দরবার কিছুরই প্রয়োজন নেই আমার। মৃত্যু-নির্বাসন সব কিছুর জন্য প্রস্তুত আছি।

তা ঠিক আছে। আমি তোমার পাশে আছি। তবে একটু সাবধানে থেকো, ওরা ডাকলে কথা বলার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রেখো। প্রয়োজনবোধে আলোচনা করে নিতে পারো, ডাকলেই আমি আসবো।

ইমনের সঙ্গে কথা বলে আরো বেশি চিন্তাগ্রস্ত হলেন মুরাসাকি। এ সময় ডাক এলো বিদগ্ধলেডি খ্যাত সেনশির দরবার থেকে। ভাবলেন, শেষ পর্যন্ত তাকেও হারাতে হল। কম্পিত পায়ে প্রবেশ করলেন সম্রাটের মাতা সেনশির দরবারে। সেনশি দাঁড়িয়ে তাকে অভিবাদন জানালেন। মুরাসাকি ভাবলেন তাকে অপমান করা হচ্ছে, অথবা বিদ্রƒপ করছেন তিনি। এই প্রাসাদে ভয়হীন একটা আস্থার জায়গা ছিল, তাও রইল না।

কিন্তু না তাকে অবাক করে দিয়ে সম্রাটমাতা বললেন, অভিনন্দন তোমাকে তাকাকু। সত্য প্রকাশের যে সাহস তুমি দেখিয়েছ, তাতে আমার বুক গর্বে ফুলে উঠেছে, তোমার ওপর আমার আস্থা আছে। আমার কানে সবই আসে। কে কী বলল, একদম পাত্তা দেবে না। লেখক সাহসী হবে না, হবেটা কে?

সেনশি তার দরবারের ঋদ্ধজনদের নিয়ে বসলেন। মুরাসাকিও বসলেন। আজ সেনশির দাসী এসে তার কিমোনো ঠিকঠাক করে দিল। এটা একটা সম্মান। সবাই বিস্মিত। সেনশি তার দিকে তাকিয়ে স্মিত হাসলেন।

দরবারে চা এলো। চায়ের কাপে ধোঁয়া উড়ছে। সাধারণত আধ্যাত্মিক কবিতার আসরে এভাবে ঋষি প্রতীম বিদগ্ধ ব্যক্তিরা ধ্যান করতে করতে চা পান করেন এবং ভাবনার ঊর্ধ্বলোকে পরিভ্রমণ করেন। একটি গদ্যে লেখা আখ্যানাংশের জন্য এরকম আয়োজন এই প্রথম।

সেনশি তার সংগ্রহে থাকা ‘গেঞ্জি’র সে গুরুত্বপূর্ণ স্ক্রলটি মুরাসাকির কাছে পাঠিয়ে দিয়ে বললেন, আজকে তোমার মুখ থেকেই আমরা শুনবো ‘গেঞ্জি’। মনোগাতারির অমৃত বচন।

মুরাসাকি বাল্যকালেই সঙ্গীত, আর্ট ও লিপিবিদ্যার সঙ্গে পাঠের শৈল্পিক ভঙ্গি আয়ত্ব করেছিলেন। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে কণ্ঠ আরো ভারী হয়েছে। সকলের কাছেই তা শ্রুতিমধুর মনে হলো। মুরাসাকির ভাষা অসাধারণ। নিজস্ব কানা ভাষার মধ্যে চীনা ধ্রুপদীর অভিজাত নির্ঝাস এমন এক মুন্সিয়ানায় ছড়িয়েছেন যে, তাতে দরবারি ঐশ্বর্যের একটা গন্ধ পাওয়া যায়।

হেইয়ান রাজসভার ভাষা বেশ বাঁকানো। ব্যাকরণগত ভাবে জটিল। অপর বৈশিষ্ট কবিত্বপ্রধান। কথোপকথনে ধ্রুপদী ছন্দময় পদ্যের ব্যবহার। সে ভাষা ইঙ্গিতধর্মী, পুরোটা প্রকাশ করে না। সবটা বলে ফেললেন যেন আভিজাত্য থাকে না। চলমান প্রেক্ষাপটে ক্লাসিক কাব্য করা আভিজাত্যের প্রকাশ। সে অহংকার নিয়েই তারা বাঁচেন। মুরাসাকি তা জানেন বলেই সে ভাষাগুণটা চীনা ধ্রুপদী ভাষা থেকে নির্ভয়ে এনে তার ভাষাকে পরিপুষ্টি দিয়েছেন।

রাজকীয় বিষয়বস্তুর সঙ্গে রাজ অলংকরণের ভাষা। ঋদ্ধজন বেশ উপভোগ করলেন। পাঠ শেষে সবাই প্রচুর প্রশংসা করলেন।

রাতে অন্যান্য দিনের মতো ভোজানুষ্ঠানের আগে গালগল্পের মজলিস বসেছে। সম্রাট, সম্রাজ্ঞী, প্রিন্সসহ উচ্চপর্যায়ের সবাই এসেছেন অংশ নিতে। এই মজলিসে আসেনিন মুরাসাকি। বিরোধীদের জন্য সুযোগ খুলে গেল। সমালোচনা শুরু হলো শোনাগনের শিবির থেকে। তবে তিনি লেডি সানুকিকে উস্কে দিয়েছেন। পরিকল্পনা তৈরি করা ছিল আগেই। লেডি সানুকি শুরু করেছিলে। তাকে হামলে পড়লেন লেডি সাইশো। তাকে সব লেডিই ভয় পান। তাই সানুকি থতমত খেয়ে থামলেন।

সম্রাজ্ঞী তেইশি বললেন, গেঞ্জি মনোগাতারি হেইয়ান সম্রাটদের গৌরব বৃদ্ধি করেনি, সম্রাজ্ঞীদের সম্মানের দিকেও লেখিকা তাকাননি। আমি এই মনোগাতারির নিষিদ্ধকরণের আবেদন করছি সম্রাটের কাছে। সম্রাট কিছু বলতে যাবেন, সম্রাটের মাতা তাকে থামালেন। বললেন, তুমি পরে বলো। আমি খুব অবাক হচ্ছি সম্রাজ্ঞী তেইশির কাণ্ডজ্ঞানের কথা ভেবে। আমি তো বিস্মিত এবং অভিনন্দন জানাই তাকাকুকে, তার সাহসী কলম ধারণের জন্য। তোমরা যারা লিখছ, লিখে দেখাও এরকম কিছু। এখানে হেইয়ান সাম্রাজ্যের কথা আসছে কেন? কেউ কি এমন ব্যাপার নিয়ে আতঙ্কিত? ইতিহাস তোমাদের জানানেই, চর্চাও নেই। ইতিহাস চর্চা করে ইমন। ইমন বলো তো একাহিনীর গোড়া কোথায়?

ইমন বললেন, সম্রাট দাইগোর শাসনামলকে ধারণ করে আছে এই মনোগাতারি। তবে আভিজাত্য আর আধুনিকতায় রুচিবোধ ও উজ্জ্বলতায় হেইয়ান কিউ এর আলোকে সঞ্চার করেছে। চরিত্র এবং কাহিনী কাল্পনিক। তবে বৈশিষ্ট্যপূর্ণ এবং দার্শনিকভাবে জাপানের আত্মগত। সবচেয়ে বড় কথা এটি এখনো শেষ হয়নি, সে পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করা উচিত, ধৈর্য ধরা প্রয়োজন।

মিচিনাগা মুরাসাকিকে শোশির দরবারে এনেছেন। তিনি বললেন, একটি লেখা নিয়ে একি হচ্ছে? আমি এই লেখার নিয়মিত পাঠক। লেখিকাকে লেখারগুণে আমি শ্রদ্ধা করি। আমার বোন বলেছেন, লেখিকা সাহসী, আমি মনে করি তা যথোচিত। তার লেখা নিয়ে নেতিবাচক কোনো কথা উঠতে পারে না। এবার মহামান্য সম্রাট বলতে পারেন।

সম্রাট বললেন, এতজন বলার পর আমার আর বলার কিছু থাকতে পারে না। তাকাকু তার লেখা শেষ করুক। আমি তখনই তার লেখা পড়ে মন্তব্য করব। এখন নৈশভোজে অংশ নেয়া যাক।

সবাই নৈশভোজে অংশ নিলেন। সম্রাজ্ঞী তেইশি এবং তার দরবারের লেডি ও কর্মকর্তাদের গলা দিয়ে যেন স্বাদের উপাদেয় আহার্য প্রবেশ করছে না।

[বিভিন্ন লেখায় দেখা যায় সম্রাজ্ঞী তেইশি ১০০১ খ্রিস্টাব্দে মারা যান। বলা হয়েছে মুরাসাকি শিকিবু ১০০৫ খ্রিস্টাব্দে সম্রাজ্ঞী শোশির দরবারে আসেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়ান লেডি-ইন-ওয়েটিং সেই শোনাগন। এই তথ্য সঠিক হলে তেইশির লেডি শোনাগনের সঙ্গে মুরাসাকির সাক্ষাৎ হওয়ার কথা নয়। প্রতিদ্বন্দ্বিতা তো দূরের কথা-লেখক]। ক্রমশ...