ধারাবাহিক রচনা : দশ

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

আহমেদ ফরিদ

(পূর্ব প্রকাশের পর)

আমার চাচাতো দাদার উঠান পার হওয়ার সময় লাল হোসেন চাচা সৈনিক দুটির সামনে পড়ে যায়। লাল হোসেন চাচা ছিলেন শৌখিন আর ক্লিন শেভ করতেন। লাল হোসেন চাচা সৈনিকটিকে দেখে খুব তাড়াতাড়ি উঠান পার হয়ে চলে যেতে চাইছিলেন। সেটি আর সম্ভব হলো না। এক ধমকে তাকে থামানো হলো। আমাদের বারান্দা থেকে আমরা সবকিছু দেখছি। আমরা আতঙ্কিত। লাল হোসেন চাচাকে কি সৈনিকটি গুলি করে দিবে? ইস, চাচা যে কেনো সৈনিকটির সামনে দিয়ে দ্রুত পার হতে গেল! তাকে মেরে ফেললে এতো সুন্দর ঘুড়ি আর ঢাউস উড়াবে কে? আমি তার জন্য দোয়া পড়তে থাকি। আল্লাহ, সৈনিকটির বন্দুক দিয়ে যেন কোনো গুলি বের না হয়। সৈনিকটি তার বন্দুক লাল হোসেন চাচার দিকে তাক না করে তাকে ডেকে একটা ঘরের আড়ালে নিয়ে যায়। আমার মনে হচ্ছিলÑ আমাদের চোখের সামনে সৈনিকটি লাল হোসেন চাচাকে গুলি করতে লজ্জা পাচ্ছে। আড়ালে নিয়ে নিশ্চয় গুলি করে মেরে ফেলবে। আমি আবার চোখ বন্ধ করে ফেলি। না, কোনো গুলির আওয়াজ পাওয়া যায়নি।

জলদ গম্ভীর স্বরে সৈনিকটি বললো-উতারো।

চাচা ‘উতারো’ শব্দটি কস্মিনকালেও শোনেননি। পিলে চমকানো শব্দে তার আত্মা পাখি খাঁচা ছাড়ার উপক্রম হয়। সৈনিকটি আবারো ‘উতারো’ শব্দটা উচ্চারণ করলে চাচা সংবিৎ ফিরে পেয়ে অসহায়ের মতো এদিক ওদিক তাকাতে থাকে। কী করবে বুঝতে পারেন না। সৈনিকটি তখন নিজের কোমরের কাছে দ্রুত হাত নিয়ে নিজের প্যান্ট দুহাতে ধরে ওঠানোর ভঙ্গি করে। চাচা বুঝতে পারেনÑ সৈনিকটি তাকে সৈনিকটির প্যান্ট উঁচু করে ধরতে বলছেন। তিনি এগিয়ে গেলে সৈনিকটি তাকে প্রচণ্ড এক থাপ্পড় লাগায়। চাচা ঘুরে দশ হাত দূরে গিয়ে পড়ে। থাপ্পড় খেয়ে চাচার বুদ্ধি খুলে যায়। তিনি এবার সৈনিকটির কাছে গিয়ে নিজের লুঙ্গি মেলে ধরে। সৈনিকটির মুখে সন্তুষ্টি ফুটে ওঠে। চাচার পশ্চাদ্দেশে আরো একটি লাথি বসিয়ে চাচাকে সৈনিকটি ছেড়ে দেয়। আমরা আমরা হাফ ছেড়ে বাঁচি। দেশ স্বাধীন হলে আমরা বিষয়টি নিয়ে চাচার সাথে হাসি-তামাশা করতাম। চাচাকে খেপানোর জন্য বলতাম ‘উতারো’। চাচা প্রচণ্ড লজ্জাবোধ নিয়ে ক্ষেপে উঠতেন। আমৃত্যু কি তাকে সেই কুৎসিত দৃশ্যটা তাড়া করে ফিরেছে?

বাবা বারান্দায় একই ভঙ্গিমায় বসে আছেন। এটি রোজার মাস। আমরা সবাই রোজা রেখেছি। রোজা রাখা আমার কাছে খুব আনন্দের একটা বিষয়। ফৈত্তা (সেহেরি) বেলায় বেশ ভালো খাবার দাবার জোটে। সন্ধ্যার সময় ইফতারিটাও মন্দ হয় না। নানা ধরনের পিঠা থাকে আর থাকে সেমাই। আমাকে সব রোজা রাখতে দেয়া হয় না। রোজা রাখার বয়স হয়নি সেজন্য। তবু আমি রোজা রাখি। কারণ পাড়ার সমবয়সী অন্যদের সাথে রোজার রাখার একটা অঘোষিত প্রতিযোগিতা থাকে। আমি সে প্রতিযোগিতায় হারতে চাই না। অধিকাংশ রাতেই ফৈত্তা খাওয়ার জন্য আমাকে ডাকা হয় না। আমি টের পেলে বিছানায় পড়ে উসখুস করতে, থাকি গলা খাকাড়ি দেই। আমি জানান দেয়ার চেষ্টা করি যে আমি জেগে আছি। তোমরা আমাকে ডাক। বাবা মা আমাকে ডাকে না। তারাও হয়তো আমার সাথে একটা খেলা খেলতে চায়। যখন দেখি যে আমাকে আর ডাকবেই না তখন আমি সরাসরি বলি যে আমার খিদে লেগেছে, কারণ রাতে আমার ভালো খাওয়া হয়নি, পেটটা একটু খারাপ ছিল। তখন মা আমাকে খাবার না দিয়ে পারে না। সে খাবার খেয়ে রোজা রেখে দেই। সেদিন ফৈত্তা রাতের খাবারটা বেশ ভালো হয়েছিল। মেদির হাওড়ের ফোডা মাছ ছিল আর শেষে ছিল দৈ-গুড়।

বাবার কাছে বারান্দায় বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকলাম। আমাদের কারো মুখে কোনো কথা নেই। মা ঘরের ভিতরে কুটুর কুটুর করে কিছু একটা করছে। হয়তো ইফতারি বানানোর চেষ্টা চলছে। বেঁচে থাকতে হলে খেতে হবে।

‘চল, তোর দাদার ঘর থেকে একটু ঘুরে আসি’ বাবা বললেন। দাদা মানে আমার বাবার চাচাতো চাচা আব্দুর রউফ ভাই। তার ঘর আমাদের ঘর থেকে মাত্র এক উঠান দূরতে¦। আমাদের বাংলা ঘরটা ওনাদের বসত ঘরের সাথে পিঠাপিঠি দাঁড়িয়ে। মাঝখানে ছোট একটা গলি মতো রাস্ত। বাবা আমাকে সাথে যেতে বলার মানে কী? তিনি কি একাকী উঠান পার হতে ভয় পাচ্ছেন? বড়দের সাথে কথা বলার সময় সাধারণত আমরা দূরেই থাকি। গেলাম বাবার সাথে। দুজনে বসে আবার কী কথা চালাচালি হলো মনে নেই। আমি হয়তো শুনিনি, অন্য মনস্ক ছিলাম। দাদার মুখে ভীতির চিহ্ন, বাবার মুখেও সংক্রমিত হয়েছে। ভীত চকিত দৃষ্টি নিয়ে আমরা আমাদের ঘরের দিকে রওয়ানা দিলাম। আমি ইতিউতি তাকাচ্ছি। এই বুঝি সেই সৈন্যটি যমদূতের মতো আমাদের সামনে এসে উপস্থিত হয়ে গুলি করে আমাদেরকে মেরে ফেলবে নতুবা আমাদেরকেও বলবে ‘উতারো’। ইস্, কী লজ্জাজনক একটা ব্যাপার হবে!

কিছুই ঘটল না।

আমাদের মাঝ উঠানে এসেছি। মনে হলো আমার মাথার পিছনের চুল ঘেঁষে টুস শব্দে কিছু একটা মাটিতে পড়েছে। আমি হাঁটা থামিয়ে পিছনে ফিরে দেখি ছোট্ট একটি গর্ত। বাবা ততক্ষণে বারান্দায় উঠে গিয়েছে। আমি বাবাকে বললামÑ আমার চুল ঘেঁষে কী যেন একটা মাটিতে পড়েছে। আমি বাবাকে গর্তটা দেখালাম।

বাবা আমাকে ঘর থেকে একটা দা নিয়ে আসতে বললেন। আমি একটা ঘাসি দা নিয়ে এসে মাটি খুঁড়ি। মাটির খুব বেশি গভীরে যেতে হয়নি। ইঞ্চি দুয়েক গভীরে জিনিসটি ঢুকে আছে। তামাটে বর্ণের ইঞ্চিখানেক লম্বা জিনিসটি। মাথাটা সরু, পিছনের দিকটা একটু মোটা। বাবা জিনিসটা দেখে শিউরে উঠলেন। ‘এইটা বুলেট’ বাবার মুখ থেকে আর্তনাদ বের হয়ে আসে। একটু পিছনে থাকলেই তুই শেষ হয়ে যাইতিÑ বাবা বললেন। তাড়াতাড়ি ঘরে আয় বলে তিনি হনহনিয়ে ঘরে ঢুকে গেলেন। সাথে আমিও। আমার হাতে সেই জিনিসটি যার নাম বুলেট। একটু পিছনে থাকলে আমি বুলেটবিদ্ধ হয়ে মারা পড়তাম তাতে কোনো সন্দেহ নেই। উঠানের শক্ত মাটিতে যে বুলেটটি দুই ইঞ্চি ঢুকে পড়েছিল সেটির পক্ষে আমার ব্রহ্মতালু ভেদ করে শরীরের ভিতরে ঢুকে পড়া কোনো ব্যাপারই ছিল না। তখন ঘটনাটিকে কিছুই মনে হয়নি। পঞ্চাশ বছর পর আজ যখন পিছনে ফিরে তাকাই তখন মনে হয় কী ভয়াবহ বিপদ থেকে বেঁচে গিয়েছি। জীবন আর মৃত্যুর মধ্যে ফারাক কতই না কম! খোদার অশেষ মেহেরবাণীতে আজও বেঁচে আছিÑ এ এক বিস্ময় তো বটেই। সেদিন বুলেটবিদ্ধ হয়ে মারা পড়লে কী হতো? কেউ কি মনে রাখত আমাকেÑ এক অখ্যাত কিশোরকে? না, রাখতো না, রাখার কোনো কারণও নেই। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে অনেক অজানা আর অচেনা মানুষ শহীদ হয়েছেন। তাঁদের কি আমরা মনে রেখেছি?

বিকেল পর্যন্ত তেমন কিছুই ঘটল না। তবে নানা ধরনের খবর পেতে লাগলাম। আমাদের মক্তব দখল করে সেখানে মিলিটারিরা ক্যাম্প করেছে। মক্তবের পাশেই আমাদের কবরস্থান। কবরস্থানে মিলিটারিরা প্রশ্রাব পায়খানা করে ভরিয়ে ফেলেছে। এগুলির সত্যাসত্য যাচাই করতে যায় কে? আমরা তা বিশ্বাস করি। এদের পক্ষে যে কোনো কিছু করা সম্ভব।

এরা আর একটি ক্যাম্প করেছে সুরার বাড়ির কাছে। সেখানে আর্মিরা কয়েকটি কামান বসিয়েছে। কামানটা বসিয়েছে ঠিক জায়গা মতো। উঁচাপুলের গোড়ায়। পুলটাকে আমরা গুছা পুল বলেও ডাকতাম। গুছা হলো কূঁজের অপভ্রংশ। পুলটার দুই দিক ছিল ভীষণ ঢালু, মাঝটা সমতল। সেই ঢালু বেয়ে ওঠানামা করতে আমাদের মতো ছোটদের ভীষণ কষ্ট হতো। আর সেই পুলটা বেয়েই কিনা আমাকে স্কুলে আর নানা বাড়ি যেতে হতো। বুঝতে পারলাম পুলটাকে পাকিস্তানি সৈন্যরা আড়াল হিসেবে নিয়েছে। সেই কামান দিয়ে ইচ্ছা করলে পুরো গ্রাম উড়িয়ে দিতে পারে। আমাদের উঁচা পুল পার হলেই সুরার বাড়ি। সুরা কে ছিল তা আমাদের জানা নেই। তবে সে বাড়িতে আমার এক চাচাতো বোনের বিয়ে হয়েছিল। তার নাম মেমি। আমরা ডাকতাম তাকে মেমি ‘বু’ নামে। মেমি বু ছিল বেশ লম্বা আর সুন্দরী। মেমি বু আমাকে খুব আদর করতো। সেই মেমি বু’দের বাড়ির সামনেই কি না মিলিটারিদের আস্তানা। মেমি বু বেঁচে আছে তো? মেমি বু’র কথা চিন্তা করে আমার চোখে পানি চলে আসে। আমি মেমি বু’র জন্য আল্লাতালার কাছে প্রার্থনা করি, আল্লাহ তুমি মেমি ‘বু’কে বাঁচিয়ে রাখো। মেমি বু প্রায়ই আমাকে তাদের গাছের ‘বড় কেল্লা’ আম লুকিয়ে লুকিয়ে দিত। এ আমটি সাইজে ছিল অনকে বড় আর এ তল্লাটে তাদের গাছেই আমটি হতো। স্কুলের পথেই ছিল মেমি বু’দের বাড়ি। স্কুল থেকে ফেরার পথে মেমি বু’র সাথে আমার প্রায়ই দেখা হয়ে যেতো। ‘কি রে, ফরিদ মিয়া ক্যামন আছস’ বলে আমার সাথে মিনিট খানেক মেমি বু কথা বলত। প্রায়ই এঘটনাটা ঘটতো। এটি কি কোনো কাকতালীয় ব্যাপার ছিল? মেমি বু কি আমার জন্যই মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে থাকতেন। আমার জন্য তার এতো স্নেহ? আমার ক্ষুদ্র এ জীবনে এতো ভালোবাসা আমি রাখি কীভাবে! মেমি বু মারা গছে অনেক বছর হলো। মেমি বু বয়সের আগেই মারা গিয়েছে। মানুষের মৃত্যুর কোনো বয়স লাগে না।

সারা দিন চলল গুজবে। মিলিটারিদের বিষয়ে কেউ সঠিক তথ্য দিতে পারছে না। তবুও কিছু কিছু সত্য ঘটনা বের হয়ে আসছে। এর মধ্য একটা হলো চান মিয়া চাচাকে হত্যা। চাঁন মিয়া চাচা হলো কাদির চাচার বড় ভাই। কাদির চাচা মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছেন। কাদির চাচার বয়স কতই বা। কাদির চাচা তখন দশম শ্রেণির ছাত্র। আমাদের হিরু। দেখতে শুনতে যেমন পোশাক আশাকেও তেমনি। আমাদের পাড়ায় ক্লাস টেনে পড়ুয়া আর তেমন কেউ নেই। অন্য পাড়ার যাঁরা আছেন তাদের সাথে আমাদের তেমন মেলামশো নেই। সেই কাদির চাচা যুদ্ধে চলে গেলে আমাদের বিশেষ করে জাহির চাচা, মোতালেব চাচার মন খুব খারাপ হয়। কাদির চাচার সাথে তাদেরই বেশি সম্পর্ক ছিল। আমি ছিলাম তাদের একটু ন্যাওটা। কাদির চাচার মা ছেলের জন্য লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদেন। এর ওর কাছে ছেলের সন্ধান চান। কিন্তু ছেলের খুঁজ পাওয়া যায় না। সান্ত্বনা একটাই কাদির চাচা একা যাননি। নূরপুর আর ফুলপুর হতে আরো অনেকেই যুদ্ধে গিয়েছেন। এঁরা হলেন নূরপুরের মিসবাহ উদ্দীন মিনু, সৈয়দ শফিকুল হক খালেদ, সৈয়দ শাহাবুদ্দিন, বকুল মিয়া, আহসানুল হক, আজহারুল হক ফুলপুরের আঃ বাকী স্যার, আলাউদ্দীন আহমেদ, জালাল ভাই, কালন চাচাসহ আরো অনেকেই। দাদি আশায় বুক বেঁধে আছেন, যে কোনো এক রাতে কাদির চাচা বাড়ি ফিরে এসে তার কাছে ভাত চাবে। কাদির চাচার প্রিয় তরকারি শীমের বীচি দিয়ে মুরগির মাংস। কাদির চাচা আর ফিরে আসে না। কোথায় আছে, কী করছে কেউ তা জানে না। কারও কাছে কোনো কিছু জিজ্ঞেস করারও কোনো উপায় নেই। যদি জেনে যায় ছেলে মুক্তিযুদ্ধে চলে গিয়েছে। এতোগুলো তরতাজা তরুণ তো আর হাওয়ায় মিলিয়ে যায়নি। তবু আমরা তাদের ব্যাপারে কোনো কথা উঠলে ফিসফিসিয়ে আলাপ করি। ঘরের বেড়ারও তো কান আছে। যদি কেউ শুনে ফেলে, যদি তাঁদের কথা বলে দেয় পাকিস্তানিদের দোসরদের কাছে। অথচ জানা হয়ে গিয়েছে। যাদের জানার তারা ঠিকই জেনে গিয়েছে। আর এ জানার ফলই হলো যুদ্ধের পড়ন্ত সময়ে পাকিস্তানি সেনাদের আমাদের গ্রামে আগমন।

পাকিস্তানি সৈন্যরা নেমেছে চৈয়ারকুড়ি বাজারের ঘাটে। বাজারের দক্ষিণ পাশ দিয়ে বহমান সিংড়া নদী। এর সংযোগ ঘটেছে তিতাসের সাথে হরিণবেড় নামক একটি ব্যবসা কেন্দ্রের সাথে। ওখান থেকে মাধবপুর কাছেই। পাকিস্তানি সৈন্যরা মাধবপুর থেকেই এসেছে লঞ্চে করে। চৈয়ারকুড়ি বাজার ঘাট থেকে আমাদের গ্রামের দূরত্ব প্রায় দুই কিলোমিটারের মতো। সেখান থেকে আসার একমাত্র পথ হলো ভাঙা মাধবপুর নাসিরনগর সড়কটি। তাদের অস্ত্রশস্ত্র আর গোলা-বারুদ বহন করার জন্য লোক দরকার। তারা সাথে করে কিছু লোক নিয়ে এসেছে। আরো কিছু লোক দরকার। রাস্তাঘাটে যাদেরকে পেয়েছে তাদের অনেককেই মেরে ফেলার পরিবর্তে বোঝা বহন করার কাজে লাগিয়ে দেয়া হয়।

চান মিয়া চাচাদের বাড়িটা রাস্তার ধারে। বাড়ি থেকে তাকে ধরে নিয়ে বোঝা বহনের কাজে লাগিয়ে দেয়া হয়। সাথে গ্রামের আরো বেশ কিছু লোক। আলগা বাড়ির কাছে গিয়ে হঠাৎ করে সৈন্যদলের নেতাটির মনে হয় গোলাবারুদের বাক্সপেটরা বহন করা লোকগুলোর মুসলমানিত্ব পরীক্ষা করা দরকার।

তুম মুসলমান? চান মিয়া চাচাকে লক্ষ করে দলপতিটি প্রশ্ন করে।

চান মিয়া চাচা এদিক ওদিক তাকায়। তাকেই কি প্রশ্ন জিজ্ঞেস করছে ষাঁড়ের মতো খাকী পোশাক পরা বিশাল দেহী লোকটা?

তুম মুসলমান? আবার খাকিওয়ালা চান মিয়া চাচাকে লক্ষ করে আবারো প্রশ্ন করে। চান মিয়া চাচা এবার বুঝতে পারে তাকেই প্রশ্ন করা হচ্ছে।

চান মিয়া চাচা মক্তবে আরবীর সাথে কিছুদিন উর্দুও পড়েছে। প্রশ্নটা বুঝতেও তার কোনো অসুবিধা হয়নি। এর উত্তরে কী বলতে হবে উর্দুতে সেটিও মনে মনে ঠিক করে রেখেছিল। কিন্তু এখন গলা দিয়ে কোনো আওয়াজই যেনো বের হতে চাচ্ছে না। চান মিয়া চাচা মাথা নাড়ে।

কলমা বোল। সৈন্যটি আদেশ করে।

চান মিয়া চাচা গড় গড় করে সবকটি কলমা বলে ফেলে। সৈনিকটি অবাক হয়। সৈনিকটি নিজেও তো মুসলমান। পাকিস্তানের সাচ্চা মুসলমান। কলমা তৈয়ব ছাড়া অন্য কোনো কলমা তারও জানা নেই। এককালে সবকটি কলমা শিখেছিল মুসলমানের বাচ্চা হিসেবে। এখন সব ভুলে বসেছে।

সৈনিকটি ‘সাচ্চা’ মুসলমান বলে চাচার পিঠ চাপড়ে দেয়। চাচা সামনের দিকে পা বাড়াবে এমন সময় আবারো তাকে প্রশ্ন করে সৈনিক নেতাটি। সে জানতে চায় তার পিছনে যে লোকটি আছে সে মুসলমান কি না। প্রশ্নটি চান মিয়া চাচাকে সৈনিকটি কেনো করল বোঝা গেল না। চান মিয়া চাচা কোনো কিছু না ভেবেই জবাবে বলল, হ্যাঁ, মুসলমান। সৈনিকটি দলটিকে চলে যাওয়ার জন্য আদেশ দিয়েও কী মনে করে আবার থামার ইঙ্গিত দিল।

‘ইধার আও’ দলের দ্বিতীয় লোকটিকে ডাকল সৈনিকটি।

লোকটি ভয়ে সামনে এগিয়ে যায়।

‘উতারো’ সৈনিকটি আদেশ করে। ক্রমশ...

বৃহস্পতিবার, ১৪ অক্টোবর ২০২১ , ২৯ আশ্বিন ১৪২৮ ০৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

ধারাবাহিক রচনা : দশ

এক অখ্যাত কিশোরের মুক্তিযুদ্ধ

আহমেদ ফরিদ
image

শিল্পী : সমর মজুমদার

(পূর্ব প্রকাশের পর)

আমার চাচাতো দাদার উঠান পার হওয়ার সময় লাল হোসেন চাচা সৈনিক দুটির সামনে পড়ে যায়। লাল হোসেন চাচা ছিলেন শৌখিন আর ক্লিন শেভ করতেন। লাল হোসেন চাচা সৈনিকটিকে দেখে খুব তাড়াতাড়ি উঠান পার হয়ে চলে যেতে চাইছিলেন। সেটি আর সম্ভব হলো না। এক ধমকে তাকে থামানো হলো। আমাদের বারান্দা থেকে আমরা সবকিছু দেখছি। আমরা আতঙ্কিত। লাল হোসেন চাচাকে কি সৈনিকটি গুলি করে দিবে? ইস, চাচা যে কেনো সৈনিকটির সামনে দিয়ে দ্রুত পার হতে গেল! তাকে মেরে ফেললে এতো সুন্দর ঘুড়ি আর ঢাউস উড়াবে কে? আমি তার জন্য দোয়া পড়তে থাকি। আল্লাহ, সৈনিকটির বন্দুক দিয়ে যেন কোনো গুলি বের না হয়। সৈনিকটি তার বন্দুক লাল হোসেন চাচার দিকে তাক না করে তাকে ডেকে একটা ঘরের আড়ালে নিয়ে যায়। আমার মনে হচ্ছিলÑ আমাদের চোখের সামনে সৈনিকটি লাল হোসেন চাচাকে গুলি করতে লজ্জা পাচ্ছে। আড়ালে নিয়ে নিশ্চয় গুলি করে মেরে ফেলবে। আমি আবার চোখ বন্ধ করে ফেলি। না, কোনো গুলির আওয়াজ পাওয়া যায়নি।

জলদ গম্ভীর স্বরে সৈনিকটি বললো-উতারো।

চাচা ‘উতারো’ শব্দটি কস্মিনকালেও শোনেননি। পিলে চমকানো শব্দে তার আত্মা পাখি খাঁচা ছাড়ার উপক্রম হয়। সৈনিকটি আবারো ‘উতারো’ শব্দটা উচ্চারণ করলে চাচা সংবিৎ ফিরে পেয়ে অসহায়ের মতো এদিক ওদিক তাকাতে থাকে। কী করবে বুঝতে পারেন না। সৈনিকটি তখন নিজের কোমরের কাছে দ্রুত হাত নিয়ে নিজের প্যান্ট দুহাতে ধরে ওঠানোর ভঙ্গি করে। চাচা বুঝতে পারেনÑ সৈনিকটি তাকে সৈনিকটির প্যান্ট উঁচু করে ধরতে বলছেন। তিনি এগিয়ে গেলে সৈনিকটি তাকে প্রচণ্ড এক থাপ্পড় লাগায়। চাচা ঘুরে দশ হাত দূরে গিয়ে পড়ে। থাপ্পড় খেয়ে চাচার বুদ্ধি খুলে যায়। তিনি এবার সৈনিকটির কাছে গিয়ে নিজের লুঙ্গি মেলে ধরে। সৈনিকটির মুখে সন্তুষ্টি ফুটে ওঠে। চাচার পশ্চাদ্দেশে আরো একটি লাথি বসিয়ে চাচাকে সৈনিকটি ছেড়ে দেয়। আমরা আমরা হাফ ছেড়ে বাঁচি। দেশ স্বাধীন হলে আমরা বিষয়টি নিয়ে চাচার সাথে হাসি-তামাশা করতাম। চাচাকে খেপানোর জন্য বলতাম ‘উতারো’। চাচা প্রচণ্ড লজ্জাবোধ নিয়ে ক্ষেপে উঠতেন। আমৃত্যু কি তাকে সেই কুৎসিত দৃশ্যটা তাড়া করে ফিরেছে?

বাবা বারান্দায় একই ভঙ্গিমায় বসে আছেন। এটি রোজার মাস। আমরা সবাই রোজা রেখেছি। রোজা রাখা আমার কাছে খুব আনন্দের একটা বিষয়। ফৈত্তা (সেহেরি) বেলায় বেশ ভালো খাবার দাবার জোটে। সন্ধ্যার সময় ইফতারিটাও মন্দ হয় না। নানা ধরনের পিঠা থাকে আর থাকে সেমাই। আমাকে সব রোজা রাখতে দেয়া হয় না। রোজা রাখার বয়স হয়নি সেজন্য। তবু আমি রোজা রাখি। কারণ পাড়ার সমবয়সী অন্যদের সাথে রোজার রাখার একটা অঘোষিত প্রতিযোগিতা থাকে। আমি সে প্রতিযোগিতায় হারতে চাই না। অধিকাংশ রাতেই ফৈত্তা খাওয়ার জন্য আমাকে ডাকা হয় না। আমি টের পেলে বিছানায় পড়ে উসখুস করতে, থাকি গলা খাকাড়ি দেই। আমি জানান দেয়ার চেষ্টা করি যে আমি জেগে আছি। তোমরা আমাকে ডাক। বাবা মা আমাকে ডাকে না। তারাও হয়তো আমার সাথে একটা খেলা খেলতে চায়। যখন দেখি যে আমাকে আর ডাকবেই না তখন আমি সরাসরি বলি যে আমার খিদে লেগেছে, কারণ রাতে আমার ভালো খাওয়া হয়নি, পেটটা একটু খারাপ ছিল। তখন মা আমাকে খাবার না দিয়ে পারে না। সে খাবার খেয়ে রোজা রেখে দেই। সেদিন ফৈত্তা রাতের খাবারটা বেশ ভালো হয়েছিল। মেদির হাওড়ের ফোডা মাছ ছিল আর শেষে ছিল দৈ-গুড়।

বাবার কাছে বারান্দায় বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকলাম। আমাদের কারো মুখে কোনো কথা নেই। মা ঘরের ভিতরে কুটুর কুটুর করে কিছু একটা করছে। হয়তো ইফতারি বানানোর চেষ্টা চলছে। বেঁচে থাকতে হলে খেতে হবে।

‘চল, তোর দাদার ঘর থেকে একটু ঘুরে আসি’ বাবা বললেন। দাদা মানে আমার বাবার চাচাতো চাচা আব্দুর রউফ ভাই। তার ঘর আমাদের ঘর থেকে মাত্র এক উঠান দূরতে¦। আমাদের বাংলা ঘরটা ওনাদের বসত ঘরের সাথে পিঠাপিঠি দাঁড়িয়ে। মাঝখানে ছোট একটা গলি মতো রাস্ত। বাবা আমাকে সাথে যেতে বলার মানে কী? তিনি কি একাকী উঠান পার হতে ভয় পাচ্ছেন? বড়দের সাথে কথা বলার সময় সাধারণত আমরা দূরেই থাকি। গেলাম বাবার সাথে। দুজনে বসে আবার কী কথা চালাচালি হলো মনে নেই। আমি হয়তো শুনিনি, অন্য মনস্ক ছিলাম। দাদার মুখে ভীতির চিহ্ন, বাবার মুখেও সংক্রমিত হয়েছে। ভীত চকিত দৃষ্টি নিয়ে আমরা আমাদের ঘরের দিকে রওয়ানা দিলাম। আমি ইতিউতি তাকাচ্ছি। এই বুঝি সেই সৈন্যটি যমদূতের মতো আমাদের সামনে এসে উপস্থিত হয়ে গুলি করে আমাদেরকে মেরে ফেলবে নতুবা আমাদেরকেও বলবে ‘উতারো’। ইস্, কী লজ্জাজনক একটা ব্যাপার হবে!

কিছুই ঘটল না।

আমাদের মাঝ উঠানে এসেছি। মনে হলো আমার মাথার পিছনের চুল ঘেঁষে টুস শব্দে কিছু একটা মাটিতে পড়েছে। আমি হাঁটা থামিয়ে পিছনে ফিরে দেখি ছোট্ট একটি গর্ত। বাবা ততক্ষণে বারান্দায় উঠে গিয়েছে। আমি বাবাকে বললামÑ আমার চুল ঘেঁষে কী যেন একটা মাটিতে পড়েছে। আমি বাবাকে গর্তটা দেখালাম।

বাবা আমাকে ঘর থেকে একটা দা নিয়ে আসতে বললেন। আমি একটা ঘাসি দা নিয়ে এসে মাটি খুঁড়ি। মাটির খুব বেশি গভীরে যেতে হয়নি। ইঞ্চি দুয়েক গভীরে জিনিসটি ঢুকে আছে। তামাটে বর্ণের ইঞ্চিখানেক লম্বা জিনিসটি। মাথাটা সরু, পিছনের দিকটা একটু মোটা। বাবা জিনিসটা দেখে শিউরে উঠলেন। ‘এইটা বুলেট’ বাবার মুখ থেকে আর্তনাদ বের হয়ে আসে। একটু পিছনে থাকলেই তুই শেষ হয়ে যাইতিÑ বাবা বললেন। তাড়াতাড়ি ঘরে আয় বলে তিনি হনহনিয়ে ঘরে ঢুকে গেলেন। সাথে আমিও। আমার হাতে সেই জিনিসটি যার নাম বুলেট। একটু পিছনে থাকলে আমি বুলেটবিদ্ধ হয়ে মারা পড়তাম তাতে কোনো সন্দেহ নেই। উঠানের শক্ত মাটিতে যে বুলেটটি দুই ইঞ্চি ঢুকে পড়েছিল সেটির পক্ষে আমার ব্রহ্মতালু ভেদ করে শরীরের ভিতরে ঢুকে পড়া কোনো ব্যাপারই ছিল না। তখন ঘটনাটিকে কিছুই মনে হয়নি। পঞ্চাশ বছর পর আজ যখন পিছনে ফিরে তাকাই তখন মনে হয় কী ভয়াবহ বিপদ থেকে বেঁচে গিয়েছি। জীবন আর মৃত্যুর মধ্যে ফারাক কতই না কম! খোদার অশেষ মেহেরবাণীতে আজও বেঁচে আছিÑ এ এক বিস্ময় তো বটেই। সেদিন বুলেটবিদ্ধ হয়ে মারা পড়লে কী হতো? কেউ কি মনে রাখত আমাকেÑ এক অখ্যাত কিশোরকে? না, রাখতো না, রাখার কোনো কারণও নেই। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে অনেক অজানা আর অচেনা মানুষ শহীদ হয়েছেন। তাঁদের কি আমরা মনে রেখেছি?

বিকেল পর্যন্ত তেমন কিছুই ঘটল না। তবে নানা ধরনের খবর পেতে লাগলাম। আমাদের মক্তব দখল করে সেখানে মিলিটারিরা ক্যাম্প করেছে। মক্তবের পাশেই আমাদের কবরস্থান। কবরস্থানে মিলিটারিরা প্রশ্রাব পায়খানা করে ভরিয়ে ফেলেছে। এগুলির সত্যাসত্য যাচাই করতে যায় কে? আমরা তা বিশ্বাস করি। এদের পক্ষে যে কোনো কিছু করা সম্ভব।

এরা আর একটি ক্যাম্প করেছে সুরার বাড়ির কাছে। সেখানে আর্মিরা কয়েকটি কামান বসিয়েছে। কামানটা বসিয়েছে ঠিক জায়গা মতো। উঁচাপুলের গোড়ায়। পুলটাকে আমরা গুছা পুল বলেও ডাকতাম। গুছা হলো কূঁজের অপভ্রংশ। পুলটার দুই দিক ছিল ভীষণ ঢালু, মাঝটা সমতল। সেই ঢালু বেয়ে ওঠানামা করতে আমাদের মতো ছোটদের ভীষণ কষ্ট হতো। আর সেই পুলটা বেয়েই কিনা আমাকে স্কুলে আর নানা বাড়ি যেতে হতো। বুঝতে পারলাম পুলটাকে পাকিস্তানি সৈন্যরা আড়াল হিসেবে নিয়েছে। সেই কামান দিয়ে ইচ্ছা করলে পুরো গ্রাম উড়িয়ে দিতে পারে। আমাদের উঁচা পুল পার হলেই সুরার বাড়ি। সুরা কে ছিল তা আমাদের জানা নেই। তবে সে বাড়িতে আমার এক চাচাতো বোনের বিয়ে হয়েছিল। তার নাম মেমি। আমরা ডাকতাম তাকে মেমি ‘বু’ নামে। মেমি বু ছিল বেশ লম্বা আর সুন্দরী। মেমি বু আমাকে খুব আদর করতো। সেই মেমি বু’দের বাড়ির সামনেই কি না মিলিটারিদের আস্তানা। মেমি বু বেঁচে আছে তো? মেমি বু’র কথা চিন্তা করে আমার চোখে পানি চলে আসে। আমি মেমি বু’র জন্য আল্লাতালার কাছে প্রার্থনা করি, আল্লাহ তুমি মেমি ‘বু’কে বাঁচিয়ে রাখো। মেমি বু প্রায়ই আমাকে তাদের গাছের ‘বড় কেল্লা’ আম লুকিয়ে লুকিয়ে দিত। এ আমটি সাইজে ছিল অনকে বড় আর এ তল্লাটে তাদের গাছেই আমটি হতো। স্কুলের পথেই ছিল মেমি বু’দের বাড়ি। স্কুল থেকে ফেরার পথে মেমি বু’র সাথে আমার প্রায়ই দেখা হয়ে যেতো। ‘কি রে, ফরিদ মিয়া ক্যামন আছস’ বলে আমার সাথে মিনিট খানেক মেমি বু কথা বলত। প্রায়ই এঘটনাটা ঘটতো। এটি কি কোনো কাকতালীয় ব্যাপার ছিল? মেমি বু কি আমার জন্যই মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে থাকতেন। আমার জন্য তার এতো স্নেহ? আমার ক্ষুদ্র এ জীবনে এতো ভালোবাসা আমি রাখি কীভাবে! মেমি বু মারা গছে অনেক বছর হলো। মেমি বু বয়সের আগেই মারা গিয়েছে। মানুষের মৃত্যুর কোনো বয়স লাগে না।

সারা দিন চলল গুজবে। মিলিটারিদের বিষয়ে কেউ সঠিক তথ্য দিতে পারছে না। তবুও কিছু কিছু সত্য ঘটনা বের হয়ে আসছে। এর মধ্য একটা হলো চান মিয়া চাচাকে হত্যা। চাঁন মিয়া চাচা হলো কাদির চাচার বড় ভাই। কাদির চাচা মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছেন। কাদির চাচার বয়স কতই বা। কাদির চাচা তখন দশম শ্রেণির ছাত্র। আমাদের হিরু। দেখতে শুনতে যেমন পোশাক আশাকেও তেমনি। আমাদের পাড়ায় ক্লাস টেনে পড়ুয়া আর তেমন কেউ নেই। অন্য পাড়ার যাঁরা আছেন তাদের সাথে আমাদের তেমন মেলামশো নেই। সেই কাদির চাচা যুদ্ধে চলে গেলে আমাদের বিশেষ করে জাহির চাচা, মোতালেব চাচার মন খুব খারাপ হয়। কাদির চাচার সাথে তাদেরই বেশি সম্পর্ক ছিল। আমি ছিলাম তাদের একটু ন্যাওটা। কাদির চাচার মা ছেলের জন্য লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদেন। এর ওর কাছে ছেলের সন্ধান চান। কিন্তু ছেলের খুঁজ পাওয়া যায় না। সান্ত্বনা একটাই কাদির চাচা একা যাননি। নূরপুর আর ফুলপুর হতে আরো অনেকেই যুদ্ধে গিয়েছেন। এঁরা হলেন নূরপুরের মিসবাহ উদ্দীন মিনু, সৈয়দ শফিকুল হক খালেদ, সৈয়দ শাহাবুদ্দিন, বকুল মিয়া, আহসানুল হক, আজহারুল হক ফুলপুরের আঃ বাকী স্যার, আলাউদ্দীন আহমেদ, জালাল ভাই, কালন চাচাসহ আরো অনেকেই। দাদি আশায় বুক বেঁধে আছেন, যে কোনো এক রাতে কাদির চাচা বাড়ি ফিরে এসে তার কাছে ভাত চাবে। কাদির চাচার প্রিয় তরকারি শীমের বীচি দিয়ে মুরগির মাংস। কাদির চাচা আর ফিরে আসে না। কোথায় আছে, কী করছে কেউ তা জানে না। কারও কাছে কোনো কিছু জিজ্ঞেস করারও কোনো উপায় নেই। যদি জেনে যায় ছেলে মুক্তিযুদ্ধে চলে গিয়েছে। এতোগুলো তরতাজা তরুণ তো আর হাওয়ায় মিলিয়ে যায়নি। তবু আমরা তাদের ব্যাপারে কোনো কথা উঠলে ফিসফিসিয়ে আলাপ করি। ঘরের বেড়ারও তো কান আছে। যদি কেউ শুনে ফেলে, যদি তাঁদের কথা বলে দেয় পাকিস্তানিদের দোসরদের কাছে। অথচ জানা হয়ে গিয়েছে। যাদের জানার তারা ঠিকই জেনে গিয়েছে। আর এ জানার ফলই হলো যুদ্ধের পড়ন্ত সময়ে পাকিস্তানি সেনাদের আমাদের গ্রামে আগমন।

পাকিস্তানি সৈন্যরা নেমেছে চৈয়ারকুড়ি বাজারের ঘাটে। বাজারের দক্ষিণ পাশ দিয়ে বহমান সিংড়া নদী। এর সংযোগ ঘটেছে তিতাসের সাথে হরিণবেড় নামক একটি ব্যবসা কেন্দ্রের সাথে। ওখান থেকে মাধবপুর কাছেই। পাকিস্তানি সৈন্যরা মাধবপুর থেকেই এসেছে লঞ্চে করে। চৈয়ারকুড়ি বাজার ঘাট থেকে আমাদের গ্রামের দূরত্ব প্রায় দুই কিলোমিটারের মতো। সেখান থেকে আসার একমাত্র পথ হলো ভাঙা মাধবপুর নাসিরনগর সড়কটি। তাদের অস্ত্রশস্ত্র আর গোলা-বারুদ বহন করার জন্য লোক দরকার। তারা সাথে করে কিছু লোক নিয়ে এসেছে। আরো কিছু লোক দরকার। রাস্তাঘাটে যাদেরকে পেয়েছে তাদের অনেককেই মেরে ফেলার পরিবর্তে বোঝা বহন করার কাজে লাগিয়ে দেয়া হয়।

চান মিয়া চাচাদের বাড়িটা রাস্তার ধারে। বাড়ি থেকে তাকে ধরে নিয়ে বোঝা বহনের কাজে লাগিয়ে দেয়া হয়। সাথে গ্রামের আরো বেশ কিছু লোক। আলগা বাড়ির কাছে গিয়ে হঠাৎ করে সৈন্যদলের নেতাটির মনে হয় গোলাবারুদের বাক্সপেটরা বহন করা লোকগুলোর মুসলমানিত্ব পরীক্ষা করা দরকার।

তুম মুসলমান? চান মিয়া চাচাকে লক্ষ করে দলপতিটি প্রশ্ন করে।

চান মিয়া চাচা এদিক ওদিক তাকায়। তাকেই কি প্রশ্ন জিজ্ঞেস করছে ষাঁড়ের মতো খাকী পোশাক পরা বিশাল দেহী লোকটা?

তুম মুসলমান? আবার খাকিওয়ালা চান মিয়া চাচাকে লক্ষ করে আবারো প্রশ্ন করে। চান মিয়া চাচা এবার বুঝতে পারে তাকেই প্রশ্ন করা হচ্ছে।

চান মিয়া চাচা মক্তবে আরবীর সাথে কিছুদিন উর্দুও পড়েছে। প্রশ্নটা বুঝতেও তার কোনো অসুবিধা হয়নি। এর উত্তরে কী বলতে হবে উর্দুতে সেটিও মনে মনে ঠিক করে রেখেছিল। কিন্তু এখন গলা দিয়ে কোনো আওয়াজই যেনো বের হতে চাচ্ছে না। চান মিয়া চাচা মাথা নাড়ে।

কলমা বোল। সৈন্যটি আদেশ করে।

চান মিয়া চাচা গড় গড় করে সবকটি কলমা বলে ফেলে। সৈনিকটি অবাক হয়। সৈনিকটি নিজেও তো মুসলমান। পাকিস্তানের সাচ্চা মুসলমান। কলমা তৈয়ব ছাড়া অন্য কোনো কলমা তারও জানা নেই। এককালে সবকটি কলমা শিখেছিল মুসলমানের বাচ্চা হিসেবে। এখন সব ভুলে বসেছে।

সৈনিকটি ‘সাচ্চা’ মুসলমান বলে চাচার পিঠ চাপড়ে দেয়। চাচা সামনের দিকে পা বাড়াবে এমন সময় আবারো তাকে প্রশ্ন করে সৈনিক নেতাটি। সে জানতে চায় তার পিছনে যে লোকটি আছে সে মুসলমান কি না। প্রশ্নটি চান মিয়া চাচাকে সৈনিকটি কেনো করল বোঝা গেল না। চান মিয়া চাচা কোনো কিছু না ভেবেই জবাবে বলল, হ্যাঁ, মুসলমান। সৈনিকটি দলটিকে চলে যাওয়ার জন্য আদেশ দিয়েও কী মনে করে আবার থামার ইঙ্গিত দিল।

‘ইধার আও’ দলের দ্বিতীয় লোকটিকে ডাকল সৈনিকটি।

লোকটি ভয়ে সামনে এগিয়ে যায়।

‘উতারো’ সৈনিকটি আদেশ করে। ক্রমশ...