রাজনীতির আবরণে ধান্ধাবাজির সামাজিক বিস্তার এবং বামপন্থা

নৈহাটিতে একটি চায়ের দোকানে প্রথিতযশা দুই অধ্যাপকের আলাপচারিতা চলছে। তাদের ভেতরেই একজন, স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেত্রীর তুলনা করলেন ‘শিখন্ডি’র সঙ্গে। যাকে মন্তব্যটি করলেন, আর পাশে সেই চায়ের টেবিলে বসে যারা সেই তুলনাটা শুনলেন, বেশ রেলিশ করেই উপভোগ করলেন তুলনাটা। একটি সন্তানতুল্য ‘মেয়ে’ কে শুধু তার হাস্কি কণ্ঠস্বরের জন্যে তাকে ‘হিজড়ে’ দের সঙ্গে তুলনা করছে তার ই বাবার বয়সী লোকেরা, আর মেয়েটি যে রাজনৈতিক বৃত্তে আছে, সেই বৃত্তকে ব্যবহার করে আজীবন করেকম্মে খেয়েছে এই ‘প-িতপ্রবরদের’ দল। তাই আর থাকতে না পেরে, সঙ্গে সঙ্গেই বক্তার রুচি ঘিরে প্রতিবাদ করলাম। অধ্যাপকদ্বয় নিশ্চুপ। ভাবখানা এরকমÑ কই, আমরা তো কিছু বলি নিকো।

উইংসের পিছনে বসে খেলা দেখতেই যে তারা অভ্যস্থ। মাঠে নেমে কখনো যে তারা খেলেনইনি, তা বেশ বোঝাই যাচ্ছে। এদের মতো মানুষ নয়, লোকেদের কাছে, এই সময়ের রাজনীতির অতি পরিচিত শব্দ, ‘খেলা হবে’র উৎপত্তি পশ্চিমবঙ্গে, না বাংলাদেশে- তা নিয়েও এদের মাথাব্যথা নেই। কারণ, খেলা খেলতেই তো এরা কখনো অভ্যস্থ ছিলেন না। খেলার বাইরে থেকেই তো এরা চিরকাল উইনির্স ট্রফি বাগিয়েছেন! এইসব অধ্যাপকদের সম্পর্কে সোমনাথ লাহিড়ির ভাষা ধার করে বলতে হয়; এরা জননীর গর্ভের কলঙ্ক।

যে রাজনৈতিক দলটির স্থানীয় এক নেত্রী কে মহাভারতের ‘শিখন্ডি’র সঙ্গে তুলনা করে এই সমাজের গণ্যমান্য মানুষেরা বেশে রেলিস করছেন, সেই রাজনৈতিক দলটির দৌলতেই কিন্তু এই লোকগুলোর সমাজে স্বীকৃতি পাওয়া। আর যাঁর সম্পর্কে বলছে, সেই মহিলাটি এঁদের ভেতরে একজনের প্রত্যক্ষ ছাত্রী না হলেও, উনি যখন কর্মরত ছিলেন, তখন তাঁর কলেজের ই মহিলা বিভাগে সেই নেত্রী পড়তেন।

যে প্রবীণ মানুষেরা তাঁদের মেয়ের বয়সী এক রাজনৈতিক নেত্রীর কণ্ঠস্বরের বৈশিষ্ট্যহেতু তাঁকে ‘শিখন্ডী’, অর্থাৎ, অর্ধনারীশ্বর বলে বিকৃত তৃপ্তি অনুভব করছিলেন, সেই প্রবীণ মানুষদের ভেতরে একজন কিন্তু ওই নেত্রীর দল যখন রাজ্যপাটে ছিল, তার দৌলতেই বেশ উঁচু পদে আসীন হয়েছিলেন। সেই সুবাদেই তাঁর স্ত্রী নাকি ‘সাধারণ নারী’ থেকে ‘বিদূষী’ হয়েছিলেন। এখনো নাকি, অনেককালের অবসরের পরেও অতীতের জাবরকেটে সমাজে বেশ কেউকেটাই হয়ে আছেন। আজকের শাসকদের পাশে মাঝে মধ্যেই গুডিগুডি ইমেজ নিয়ে, গুটিগুটি পায়ে তাঁদের দেখা যায়।

সেই ব্যক্তিটির মান্যবর শ্বশুর নাকি এককালে ঘি দিয়ে ভাত খেয়েছিলেন। তাই সেই ঘিয়ের গন্ধ শুকেই পরবর্তী দীর্ঘজীবন কাটিয়ে যেতে হঠাৎ ই একরাতে কয়েক হাজার প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক নিয়োগ করে বসেছিলেন। তিনি যে তখন অবিভক্ত একটা বিরাট জেলার প্রাইমারি স্কুল বোর্ডের হত্তাকত্তা। তাই তার এক কলমের খোঁচায় কয়েক হাজার বেকার চাকরি পেয়েছিল প্রাইমারি স্কুলে। এইসব বেকাররা যে সেই স্কুল বোর্ডের করিতকম্মা চেয়ারম্যানের দলের লোক ছিল- তেমনটা ভাববার আদৌ কোনো কারণ নেই। যোগ্যতা, বয়সের নিরিখে তিনি ওইসব বেকারদের চাকরি দিয়েছিলেন, তেমনটিও ভাববার কোনো কারণ নেই। কারণ, যোগ্যতার সব রকম মাপমাঠিতে উত্তীর্ণ এমন খুব কম লোককেই সেই একরাতে তিনি বাদশা বানিয়েছিলেন।

তাহলে কাদের তিনি চাকরি দিয়েছিলেন? চাঁদির ঝনঝনানি শুনিয়ে চেয়ারম্যানের শ্রবণেন্দ্রিয়কে তৃপ্ত করতে পেরেছিল যারা, কেবলমাত্র তাদেরই তিনি চাকরি দিয়েছিলেন? নাকি প্রপার চ্যানেলে চেয়ারম্যানের যেসব লোক পড়তেন, তাদের কেউ কেউ ইন্দ্রিয় সুখ পেয়েছিলেন যাদের দ্বারা, তাদেরই চাকরি দিয়েছিলেন চেয়ারম্যান? কারণ, সেই চেয়ারম্যানের কোটারির এক হত্তাকত্তার ইন্দ্রিয় সুখের গপ্পোগাছা ঘিরে একটা সময়ে কলকাতার খবরের কাগজগুলো বেশ মুখরই ছিল।

ড. অশোক মিত্রের নেতৃত্বে এক সদস্যের কমিশনের বিজ্ঞানসম্মত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রাথমিক শিক্ষা কেবলমাত্র মাতৃভাষার মাধ্যমেই দেয়ার সিদ্ধান্ত হলো, ঠিক হলো ; বিদেশি ভাষা শেখানো হবে শিশুর মস্তিষ্ক একটু পরিণত হওয়ার পর, ক্লাস ফাইভ থেকে। তখন কেমন হবে সেই একটু পরিণত বয়সের শিশুদের বিদেশি ভাষা, অর্থাৎ; ইংরেজি শেখাবার পদ্ধতি তার একটা ঐতিহাসিক রূপরেখা তৈরি করলেন ড. মিত্র। সেই লার্নিং ইংলিশ কোর্সের কার্যত প্রশিক্ষণের ধারপাশ দিয়ে গেল এই চেয়ারম্যান এবং তার মতো চেয়ারম্যানেরা কোনো কিছুর বিনিময়ে একরাতে যেসব হাজার হাজার পেটোয়াকে হঠাৎ করে, ‘মাস্টারমশাই’ বানিয়ে দিয়েছিল, তারা।

শিশুদের মাতৃভাষায় একটা ভিত তৈরির পর আধুনিক ভাষা বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে প্রাথমিকস্তরে কি ভাবে বিদেশি ভাষা, আমাদের রাজ্যের প্রেক্ষিতে ইংরেজি, বাচ্চাদের শেখানো যায় তার কোরআন-পুরাণ- বাইবেল-ত্রিপিটক রচনা করেছিলেন লার্নিং ইংলিশ কোর্সের ভেতর দিয়ে ড. অশোক মিত্র।অথচ ওই চেয়ারম্যান বা চেয়ারম্যানের মতো আরো কিছু লোকের একরাতের খেল এ যারা প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক হয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গে সাতের দশকের শেষে, আটের দশকে, তারা সেই লার্নিং ইংলিশ কোর্সের প্রশিক্ষণটুকুই ভালোকরে নেয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি। প্রশিক্ষণ কি কথা? তারা ইস্কুল চলাকালীন কতটুকু সময় ইস্কুলে থাকতো? তাহলে কি পাঠক মনে করছেন, সেই সময়ের শাসকদলের কাজ করতো? বোকা পাঠক! ওইসব এক রাতের খেল এ শিক্ষক হওয়া চেয়ারম্যানদের খাস লোকেরা যদি সেই সময়ের শাসক দলের জন্যে এতোটুকু সময় খরচ করত, তাহলেও হয়তো এই পশ্চিমবঙ্গে আজ বামপন্থিদের এই করুণ অবস্থা হতো না।

চেয়ারম্যানের একরাতের খেল এ যারা প্রাইমারি টিচার হয়েছিলেন, সাট্টার পেনসিলার না হয়ে , প্রাইমারি টিচার হওয়া সেই লোকগুলো একদিকে যেমন সত্যিকারের যাঁরা শিক্ষক, তাঁদের মুখে চুনকালি মাখিয়েছিল আর অপরদিকে প্রাথমিক শিক্ষা ঘিরে বামফ্রন্ট সরকারের যে অনবদ্য আধুনিক, বিজ্ঞানসম্মত ভাবনা ছিল, সেই ভাবনার গঙ্গাযাত্রার পথ সুগম করেছিল। এইসব চেয়ারম্যানের একরাতের খেল এর শিক্ষকদের অপদার্থতার কারণেই প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে শিশুর ভাষা শিক্ষা ঘিরে বামফ্রন্ট সরকারের নীতি ব্যর্থ হয়েছে। সেই ব্যর্থতা কখনোই আদর্শগত কারণে ঘটেনি। আদর্শগত দিক থেকে বিচার করলে বলতে হয়, একাংশের শিক্ষা নয়, সর্বাংশের শিক্ষার লক্ষ্যে প্রাথমিকে ভাষা শিক্ষা ঘিরে বামফ্রন্ট সরকার প্রথম দিকে যে নীতি এবং পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল, তার বিকল্প কেবল পশ্চিমবঙ্গ বা ভারত কেন, গোটা দক্ষিণ এশিয়াতেই আজ পর্যন্ত হয়নি। বাংলাদেশ শিশুর ভাষা শিক্ষা ঘিরে মুক্তিযুদ্ধ উত্তর পর্বে অনেকখানি অগ্রগতি অর্জন করলেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সপরিবারে শাহাদত বরণের পর মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী শক্তি সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখেনি। শেখ হাসিনা ক্ষমতাসীন হওয়ার পর শিশুর ভাষাশিক্ষার ক্ষেত্রে মাতৃভাষায় দখল আসবার পর আন্তর্জাতিক দুনিয়ার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় কিভাবে একটি গরিব বাঙালি ঘরের ছেলেমেয়ে এঁটে উঠবে- সেই ক্ষেত্রে রূপরেখা নির্মাণকালে ড. অশোক মিত্রের প্রাথমিক স্তরে শিশুর ভাষাশিক্ষা ঘিরে ভাবনাকে খুব গভীর ভাবে অনুশীলন করেছিলেন। কবীর চৌধুরী, আনিসুজ্জামানের মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ভাষা বিজ্ঞানীরা এই বিষয়ে শেখ হাসিনার দৃষ্টি আকর্ষণ করার পর তিনি নিজে প্রবল উৎসাহ নিয়ে নিয়ে ড. মিত্রের প্রতিবেদন অনুশীলন করেছিলেন। অথচ পশ্চিমবঙ্গের দুর্ভাগ্য এই যে, ওই চেয়ারম্যানদের এক রাতের খেল এর প্রডাক্ট প্রাইমারি টিচারদের ব্যক্তিস্বার্থের কারণে ড. মিত্রের সেই ঐতিহাসিক শিক্ষা ভাবনার প্রয়োগই সেখানে ঘটানো যায়নি। বিরোধীদের এ আক্রমণের শিকার বামপন্থিদের হতে হয়েছে যে, শিশুদের ইংরেজি শিখতে না দিয়ে নাকি বামফ্রন্ট সরকার ইচ্ছাকৃত ভাবে তাদের আন্তর্জাতিক মানের প্রতিযোগিতা থেকে সরিয়ে দিয়েছে। এই চেয়ারম্যানদের এক রাতের খেল এর মাশুল ও ভোট রাজনীতিতে বামপন্থিদের কম চোকাতে হয়নি। আজ ও সেই চোকাবার বিষয়টি বোধহয় পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি!

নৈহাটির নয়াপট্টির মহাদেবের চায়ের দোকানে বসে যে সুবিধাভোগী অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপকটি তাঁর কন্যাসমা এক স্থানীয় বামপন্থি নেত্রীকে ‘হিজরে’ বলায় বেশ আমোদ পেয়েই শাঁওলী মিত্রের ‘নাথবতী অনাথবৎ’ নাটকে শকুনি চরিত্রটির মতো হাসছিল, তার সেই গুণধর শ্বশুরটি কিন্তু অবিভক্ত জেলার প্রাইমারি স্কুল বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে একরাতের খেল সাঙ্গ করে যখন একটি শতাব্দী প্রাচীন ইংরেজি দৈনিকে নিজের কীর্তি জানতে পারলেন, তখন আর দলীয় সদস্যপদটি ই নবীকরণ করলেন না। শোনা যায়, দল তাকে বহিষ্কার করবে- এই ‘খপর’টি নাকি তার ই সাঙাত, যিনি কিনা তখন সেই দলের জেলা সভাপতি, তিনি আগাম সতর্ক করে রেখেছিলেন। তাই অন্তহীন দ্রাঘিমায় তখন সেই চেয়ারম্যান সঙ্গীত বিশেষ অজ্ঞ হয়ে উঠে এক রাতের খেল বাবদ মেলা ইনামের নিরাপত্তা বজায় রাখাকেই বেশি উপাদেয় মনে করেছিলেন। আর সেটা করাটা কে তিনি আর তখন অন্যায় বলে মনেই বা করবেন কেন? ধর্মপতœীকে তো তখন চানক থেকে তুলে ঘরের দোরে, কান কা ফুসফুসে জুতে দেয়া হয়েই গিয়েছে। অতএব, চল পানসি বেলঘরিয়া!

সেই প্রাক্তন চেয়ারম্যানের জামাই কিন্তু বাম শাসনে শাসকের প্রসাদ থেকে একটি দিনের জন্যেও বঞ্চিত হন নি।আবার সেই সৌভাগ্যবান শাসকেই আমরা দেখতে পাই পশ্চিমবঙ্গে পালা বদলের পর নতুন শাসকের পাশে দাঁত কেলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে। পাঠক বলতেই পারেন, দাঁত তো ক্যালানোর জন্যেই। আপনার ডেনচার করা দাঁত। তাই ক্যালাতে পারেন না। তা বলে অন্যের দাঁত ক্যালানো দেখলে এতো জ্বলে যান কেন?

না, না। জ্বলবার কিছু নেই। জামাইয়ের নতুন শাসকের পাশে দাঁড়িয়ে দাঁত ক্যালানো দেখলে মনে পড়ে যায়, মুক্তাগাছার আচার্যকুমার দোদোবাবু, আমাদের স্নেহাংশুকান্ত আচার্যের নামে একটা আইন কলেজ আছে চাঁদমারি তে। থুড়ি, আজকের নদীয়া জেলার কল্যাণীতে। সমরেশ বসু তাঁর ‘যুগ যুগ জীয়ে’তে যুদ্ধকালীন চাঁদমারির হাটকে অমরত্ব দিয়ে গিয়েছেন। জিগ্ জিগ্ শব্দের ভেতর দিয়ে আমেরিকান সৈন্যদের যে জৈবিক প্রবৃত্তির ডাক দিত এই দেশেরই একটা অংশের লোক, আশপাশের হা অন্ন ঘরের মা, বোনের তুলে দিত সেই যুদ্ধরত আমেরিকান পশুদের হাতে- সমরেশের সোনার কলমের সেই হৃদয় নিংড়ানো নিঃসরণের মতোই দোদোবাবুর নামাঙ্কিত কলেজে চেয়ারম্যানের সেই জামাইয়ের সামনে দুঃখ দহন জ্বালা কেউ একবার উচ্চারণ করেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন লোকায়ুক্ত বিচারপতি সমরেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতিতে। জামাই ভেবেছিলেন হয়তো সমরেশীয় ভঙ্গিমায় ‘জিগ্ জিগ্’ এবার তিনি শুনতে পাবেন। তাই ছই ছাপ্পা ছৈ করে তিনি পগার পার হয়েছিলেন।

এমন মানুষেরাই একটা সময়ে সমাজে বেশি পাত্তা পেয়েছে। আজ ও পাচ্ছে। হয়তো আগামী দিনেও পাবে। নয়াপট্টি তে মহাদেবের চায়ের দোকানে বসে নিজের কন্যাকে ‘হিজড়ে’ বললে হয়তো এখন বলবে, ছিঃ, হিজড়ে বলতে নেই। বলো বৃহন্নলা। যেমন সংসদে ‘মিথ্যে’ শব্দটা অসংসদীয়। ‘মিথ্যে’ শব্দটা কোনো আইনসভার সভ্য উচ্চারণ করলেই ঘ্যাচাত করে অধ্যক্ষ মহোদয় কার্যবিবরণী থেকে শব্দটির গিলোটিন দেন। কিন্তু যদি কেউ ‘মিথ্যে’ না বলে, বলেন, ‘অসত্য’ , তবে জাত-কুল-মান কিছুই হারায় না।

ধান্ধাবাজদের অতিক্রম করতে কখনোই শাসক পারে না। শাসকের শাসনকে যাকে কিনা রাজনীতির চলতি কথায় বলে, ক্যান্টার করে দেওয়া, সেই কাজটি একদম ঠিকঠাক ভাবে করতে গেলে কানু বিনা গীত নাই- এর মতোই, ধান্ধাবাজ বিনা গতি নাই। নাই অন্ত যার- তেমন অলোকের রঞ্জনে কখনো শোনা যাবে না কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের সেই কবিতার লাইন, ‘দেবীকে স্নানের ঘরে নগ্ন দেখে’র মৌতাত। কারণ, এইসব জামাইদের অপত্যেরা এখন শাসকের খোঁচর হয়ে উঠেছে যে। অমৃক সিং আরোরার গান; ধুতি শাড়ি পড়িলে মনে পইড়্যা যায়, একদিন বাঙালি ছিলাম রে’র মতোই জামাইদের অপত্যেরা এখন প্রতিবেশির হাঁড়ির খবর জোগারে গোয়েন্দা সেজে বাইরে বামপন্থি সুগার কোটিংটা দিতে একটি বারের জন্যেও ভোলে না। কারণ, চেয়ারম্যান-জামাই-অপত্য সকলেই জানে বামপন্থিদের শেষ করতে, নিকেশ করতে পৈতে পড়া বামুনের মতো ‘বামপন্থি’ সাজার কোনো বিকল্প নেই। বামপন্থি সাজতে পারলেই প্রগতিশীল হওয়া যায়। কোমরের গুনসীতে তামার চিড়ে চ্যাপটা মাদুলি আছে কিনা, ‘বামপন্থি’ খোলসের জন্যে কেউ খোঁজই করে না। কারণ, প্রগতির বেরাদরি তেও রজোগুণী ভক্তের, গরদ-মটকা-তেলক- রুদ্রাক্ষ-ফেজ টুপি-নূর দাড়ির সেই কদর বিশ শতকের শুরু থেকে যে পেতে শুরু করেছিল, এই একুশ শতকের প্রায় মাঝামাঝি এসেও তাতে ভাটা পড়েনি। সকালেই কথাশিল্পী জয়া মিত্র বলছিলেন; ইতিহাস নির্ভর সাহিত্য সৃষ্টি প্রসঙ্গে মহাশ্বেতা দেবী বলতেন, তেমন লিখতে গেলে প্রচুর ইতিহাসের বই পড়তে হয়। আর লেখার সময়ে সেইসব পড়া ইতিহাস বইয়ের বিষয়বস্তুগুলোকে সব ভুলে যেতে হয়।

রবীন্দ্রনাথই তো বলেছিলেন; ভোলার সময় বড়। তাই যাবার বেলায় আর নাই বা শুকনো বকুল নাই ই বা জড়ো করলাম!

শনিবার, ২০ নভেম্বর ২০২১ , ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৮ ১৪ রবিউস সানি ১৪৪৩

রাজনীতির আবরণে ধান্ধাবাজির সামাজিক বিস্তার এবং বামপন্থা

গৌতম রায়

নৈহাটিতে একটি চায়ের দোকানে প্রথিতযশা দুই অধ্যাপকের আলাপচারিতা চলছে। তাদের ভেতরেই একজন, স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেত্রীর তুলনা করলেন ‘শিখন্ডি’র সঙ্গে। যাকে মন্তব্যটি করলেন, আর পাশে সেই চায়ের টেবিলে বসে যারা সেই তুলনাটা শুনলেন, বেশ রেলিশ করেই উপভোগ করলেন তুলনাটা। একটি সন্তানতুল্য ‘মেয়ে’ কে শুধু তার হাস্কি কণ্ঠস্বরের জন্যে তাকে ‘হিজড়ে’ দের সঙ্গে তুলনা করছে তার ই বাবার বয়সী লোকেরা, আর মেয়েটি যে রাজনৈতিক বৃত্তে আছে, সেই বৃত্তকে ব্যবহার করে আজীবন করেকম্মে খেয়েছে এই ‘প-িতপ্রবরদের’ দল। তাই আর থাকতে না পেরে, সঙ্গে সঙ্গেই বক্তার রুচি ঘিরে প্রতিবাদ করলাম। অধ্যাপকদ্বয় নিশ্চুপ। ভাবখানা এরকমÑ কই, আমরা তো কিছু বলি নিকো।

উইংসের পিছনে বসে খেলা দেখতেই যে তারা অভ্যস্থ। মাঠে নেমে কখনো যে তারা খেলেনইনি, তা বেশ বোঝাই যাচ্ছে। এদের মতো মানুষ নয়, লোকেদের কাছে, এই সময়ের রাজনীতির অতি পরিচিত শব্দ, ‘খেলা হবে’র উৎপত্তি পশ্চিমবঙ্গে, না বাংলাদেশে- তা নিয়েও এদের মাথাব্যথা নেই। কারণ, খেলা খেলতেই তো এরা কখনো অভ্যস্থ ছিলেন না। খেলার বাইরে থেকেই তো এরা চিরকাল উইনির্স ট্রফি বাগিয়েছেন! এইসব অধ্যাপকদের সম্পর্কে সোমনাথ লাহিড়ির ভাষা ধার করে বলতে হয়; এরা জননীর গর্ভের কলঙ্ক।

যে রাজনৈতিক দলটির স্থানীয় এক নেত্রী কে মহাভারতের ‘শিখন্ডি’র সঙ্গে তুলনা করে এই সমাজের গণ্যমান্য মানুষেরা বেশে রেলিস করছেন, সেই রাজনৈতিক দলটির দৌলতেই কিন্তু এই লোকগুলোর সমাজে স্বীকৃতি পাওয়া। আর যাঁর সম্পর্কে বলছে, সেই মহিলাটি এঁদের ভেতরে একজনের প্রত্যক্ষ ছাত্রী না হলেও, উনি যখন কর্মরত ছিলেন, তখন তাঁর কলেজের ই মহিলা বিভাগে সেই নেত্রী পড়তেন।

যে প্রবীণ মানুষেরা তাঁদের মেয়ের বয়সী এক রাজনৈতিক নেত্রীর কণ্ঠস্বরের বৈশিষ্ট্যহেতু তাঁকে ‘শিখন্ডী’, অর্থাৎ, অর্ধনারীশ্বর বলে বিকৃত তৃপ্তি অনুভব করছিলেন, সেই প্রবীণ মানুষদের ভেতরে একজন কিন্তু ওই নেত্রীর দল যখন রাজ্যপাটে ছিল, তার দৌলতেই বেশ উঁচু পদে আসীন হয়েছিলেন। সেই সুবাদেই তাঁর স্ত্রী নাকি ‘সাধারণ নারী’ থেকে ‘বিদূষী’ হয়েছিলেন। এখনো নাকি, অনেককালের অবসরের পরেও অতীতের জাবরকেটে সমাজে বেশ কেউকেটাই হয়ে আছেন। আজকের শাসকদের পাশে মাঝে মধ্যেই গুডিগুডি ইমেজ নিয়ে, গুটিগুটি পায়ে তাঁদের দেখা যায়।

সেই ব্যক্তিটির মান্যবর শ্বশুর নাকি এককালে ঘি দিয়ে ভাত খেয়েছিলেন। তাই সেই ঘিয়ের গন্ধ শুকেই পরবর্তী দীর্ঘজীবন কাটিয়ে যেতে হঠাৎ ই একরাতে কয়েক হাজার প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক নিয়োগ করে বসেছিলেন। তিনি যে তখন অবিভক্ত একটা বিরাট জেলার প্রাইমারি স্কুল বোর্ডের হত্তাকত্তা। তাই তার এক কলমের খোঁচায় কয়েক হাজার বেকার চাকরি পেয়েছিল প্রাইমারি স্কুলে। এইসব বেকাররা যে সেই স্কুল বোর্ডের করিতকম্মা চেয়ারম্যানের দলের লোক ছিল- তেমনটা ভাববার আদৌ কোনো কারণ নেই। যোগ্যতা, বয়সের নিরিখে তিনি ওইসব বেকারদের চাকরি দিয়েছিলেন, তেমনটিও ভাববার কোনো কারণ নেই। কারণ, যোগ্যতার সব রকম মাপমাঠিতে উত্তীর্ণ এমন খুব কম লোককেই সেই একরাতে তিনি বাদশা বানিয়েছিলেন।

তাহলে কাদের তিনি চাকরি দিয়েছিলেন? চাঁদির ঝনঝনানি শুনিয়ে চেয়ারম্যানের শ্রবণেন্দ্রিয়কে তৃপ্ত করতে পেরেছিল যারা, কেবলমাত্র তাদেরই তিনি চাকরি দিয়েছিলেন? নাকি প্রপার চ্যানেলে চেয়ারম্যানের যেসব লোক পড়তেন, তাদের কেউ কেউ ইন্দ্রিয় সুখ পেয়েছিলেন যাদের দ্বারা, তাদেরই চাকরি দিয়েছিলেন চেয়ারম্যান? কারণ, সেই চেয়ারম্যানের কোটারির এক হত্তাকত্তার ইন্দ্রিয় সুখের গপ্পোগাছা ঘিরে একটা সময়ে কলকাতার খবরের কাগজগুলো বেশ মুখরই ছিল।

ড. অশোক মিত্রের নেতৃত্বে এক সদস্যের কমিশনের বিজ্ঞানসম্মত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রাথমিক শিক্ষা কেবলমাত্র মাতৃভাষার মাধ্যমেই দেয়ার সিদ্ধান্ত হলো, ঠিক হলো ; বিদেশি ভাষা শেখানো হবে শিশুর মস্তিষ্ক একটু পরিণত হওয়ার পর, ক্লাস ফাইভ থেকে। তখন কেমন হবে সেই একটু পরিণত বয়সের শিশুদের বিদেশি ভাষা, অর্থাৎ; ইংরেজি শেখাবার পদ্ধতি তার একটা ঐতিহাসিক রূপরেখা তৈরি করলেন ড. মিত্র। সেই লার্নিং ইংলিশ কোর্সের কার্যত প্রশিক্ষণের ধারপাশ দিয়ে গেল এই চেয়ারম্যান এবং তার মতো চেয়ারম্যানেরা কোনো কিছুর বিনিময়ে একরাতে যেসব হাজার হাজার পেটোয়াকে হঠাৎ করে, ‘মাস্টারমশাই’ বানিয়ে দিয়েছিল, তারা।

শিশুদের মাতৃভাষায় একটা ভিত তৈরির পর আধুনিক ভাষা বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে প্রাথমিকস্তরে কি ভাবে বিদেশি ভাষা, আমাদের রাজ্যের প্রেক্ষিতে ইংরেজি, বাচ্চাদের শেখানো যায় তার কোরআন-পুরাণ- বাইবেল-ত্রিপিটক রচনা করেছিলেন লার্নিং ইংলিশ কোর্সের ভেতর দিয়ে ড. অশোক মিত্র।অথচ ওই চেয়ারম্যান বা চেয়ারম্যানের মতো আরো কিছু লোকের একরাতের খেল এ যারা প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক হয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গে সাতের দশকের শেষে, আটের দশকে, তারা সেই লার্নিং ইংলিশ কোর্সের প্রশিক্ষণটুকুই ভালোকরে নেয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি। প্রশিক্ষণ কি কথা? তারা ইস্কুল চলাকালীন কতটুকু সময় ইস্কুলে থাকতো? তাহলে কি পাঠক মনে করছেন, সেই সময়ের শাসকদলের কাজ করতো? বোকা পাঠক! ওইসব এক রাতের খেল এ শিক্ষক হওয়া চেয়ারম্যানদের খাস লোকেরা যদি সেই সময়ের শাসক দলের জন্যে এতোটুকু সময় খরচ করত, তাহলেও হয়তো এই পশ্চিমবঙ্গে আজ বামপন্থিদের এই করুণ অবস্থা হতো না।

চেয়ারম্যানের একরাতের খেল এ যারা প্রাইমারি টিচার হয়েছিলেন, সাট্টার পেনসিলার না হয়ে , প্রাইমারি টিচার হওয়া সেই লোকগুলো একদিকে যেমন সত্যিকারের যাঁরা শিক্ষক, তাঁদের মুখে চুনকালি মাখিয়েছিল আর অপরদিকে প্রাথমিক শিক্ষা ঘিরে বামফ্রন্ট সরকারের যে অনবদ্য আধুনিক, বিজ্ঞানসম্মত ভাবনা ছিল, সেই ভাবনার গঙ্গাযাত্রার পথ সুগম করেছিল। এইসব চেয়ারম্যানের একরাতের খেল এর শিক্ষকদের অপদার্থতার কারণেই প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে শিশুর ভাষা শিক্ষা ঘিরে বামফ্রন্ট সরকারের নীতি ব্যর্থ হয়েছে। সেই ব্যর্থতা কখনোই আদর্শগত কারণে ঘটেনি। আদর্শগত দিক থেকে বিচার করলে বলতে হয়, একাংশের শিক্ষা নয়, সর্বাংশের শিক্ষার লক্ষ্যে প্রাথমিকে ভাষা শিক্ষা ঘিরে বামফ্রন্ট সরকার প্রথম দিকে যে নীতি এবং পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল, তার বিকল্প কেবল পশ্চিমবঙ্গ বা ভারত কেন, গোটা দক্ষিণ এশিয়াতেই আজ পর্যন্ত হয়নি। বাংলাদেশ শিশুর ভাষা শিক্ষা ঘিরে মুক্তিযুদ্ধ উত্তর পর্বে অনেকখানি অগ্রগতি অর্জন করলেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সপরিবারে শাহাদত বরণের পর মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী শক্তি সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখেনি। শেখ হাসিনা ক্ষমতাসীন হওয়ার পর শিশুর ভাষাশিক্ষার ক্ষেত্রে মাতৃভাষায় দখল আসবার পর আন্তর্জাতিক দুনিয়ার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় কিভাবে একটি গরিব বাঙালি ঘরের ছেলেমেয়ে এঁটে উঠবে- সেই ক্ষেত্রে রূপরেখা নির্মাণকালে ড. অশোক মিত্রের প্রাথমিক স্তরে শিশুর ভাষাশিক্ষা ঘিরে ভাবনাকে খুব গভীর ভাবে অনুশীলন করেছিলেন। কবীর চৌধুরী, আনিসুজ্জামানের মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ভাষা বিজ্ঞানীরা এই বিষয়ে শেখ হাসিনার দৃষ্টি আকর্ষণ করার পর তিনি নিজে প্রবল উৎসাহ নিয়ে নিয়ে ড. মিত্রের প্রতিবেদন অনুশীলন করেছিলেন। অথচ পশ্চিমবঙ্গের দুর্ভাগ্য এই যে, ওই চেয়ারম্যানদের এক রাতের খেল এর প্রডাক্ট প্রাইমারি টিচারদের ব্যক্তিস্বার্থের কারণে ড. মিত্রের সেই ঐতিহাসিক শিক্ষা ভাবনার প্রয়োগই সেখানে ঘটানো যায়নি। বিরোধীদের এ আক্রমণের শিকার বামপন্থিদের হতে হয়েছে যে, শিশুদের ইংরেজি শিখতে না দিয়ে নাকি বামফ্রন্ট সরকার ইচ্ছাকৃত ভাবে তাদের আন্তর্জাতিক মানের প্রতিযোগিতা থেকে সরিয়ে দিয়েছে। এই চেয়ারম্যানদের এক রাতের খেল এর মাশুল ও ভোট রাজনীতিতে বামপন্থিদের কম চোকাতে হয়নি। আজ ও সেই চোকাবার বিষয়টি বোধহয় পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি!

নৈহাটির নয়াপট্টির মহাদেবের চায়ের দোকানে বসে যে সুবিধাভোগী অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপকটি তাঁর কন্যাসমা এক স্থানীয় বামপন্থি নেত্রীকে ‘হিজরে’ বলায় বেশ আমোদ পেয়েই শাঁওলী মিত্রের ‘নাথবতী অনাথবৎ’ নাটকে শকুনি চরিত্রটির মতো হাসছিল, তার সেই গুণধর শ্বশুরটি কিন্তু অবিভক্ত জেলার প্রাইমারি স্কুল বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে একরাতের খেল সাঙ্গ করে যখন একটি শতাব্দী প্রাচীন ইংরেজি দৈনিকে নিজের কীর্তি জানতে পারলেন, তখন আর দলীয় সদস্যপদটি ই নবীকরণ করলেন না। শোনা যায়, দল তাকে বহিষ্কার করবে- এই ‘খপর’টি নাকি তার ই সাঙাত, যিনি কিনা তখন সেই দলের জেলা সভাপতি, তিনি আগাম সতর্ক করে রেখেছিলেন। তাই অন্তহীন দ্রাঘিমায় তখন সেই চেয়ারম্যান সঙ্গীত বিশেষ অজ্ঞ হয়ে উঠে এক রাতের খেল বাবদ মেলা ইনামের নিরাপত্তা বজায় রাখাকেই বেশি উপাদেয় মনে করেছিলেন। আর সেটা করাটা কে তিনি আর তখন অন্যায় বলে মনেই বা করবেন কেন? ধর্মপতœীকে তো তখন চানক থেকে তুলে ঘরের দোরে, কান কা ফুসফুসে জুতে দেয়া হয়েই গিয়েছে। অতএব, চল পানসি বেলঘরিয়া!

সেই প্রাক্তন চেয়ারম্যানের জামাই কিন্তু বাম শাসনে শাসকের প্রসাদ থেকে একটি দিনের জন্যেও বঞ্চিত হন নি।আবার সেই সৌভাগ্যবান শাসকেই আমরা দেখতে পাই পশ্চিমবঙ্গে পালা বদলের পর নতুন শাসকের পাশে দাঁত কেলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে। পাঠক বলতেই পারেন, দাঁত তো ক্যালানোর জন্যেই। আপনার ডেনচার করা দাঁত। তাই ক্যালাতে পারেন না। তা বলে অন্যের দাঁত ক্যালানো দেখলে এতো জ্বলে যান কেন?

না, না। জ্বলবার কিছু নেই। জামাইয়ের নতুন শাসকের পাশে দাঁড়িয়ে দাঁত ক্যালানো দেখলে মনে পড়ে যায়, মুক্তাগাছার আচার্যকুমার দোদোবাবু, আমাদের স্নেহাংশুকান্ত আচার্যের নামে একটা আইন কলেজ আছে চাঁদমারি তে। থুড়ি, আজকের নদীয়া জেলার কল্যাণীতে। সমরেশ বসু তাঁর ‘যুগ যুগ জীয়ে’তে যুদ্ধকালীন চাঁদমারির হাটকে অমরত্ব দিয়ে গিয়েছেন। জিগ্ জিগ্ শব্দের ভেতর দিয়ে আমেরিকান সৈন্যদের যে জৈবিক প্রবৃত্তির ডাক দিত এই দেশেরই একটা অংশের লোক, আশপাশের হা অন্ন ঘরের মা, বোনের তুলে দিত সেই যুদ্ধরত আমেরিকান পশুদের হাতে- সমরেশের সোনার কলমের সেই হৃদয় নিংড়ানো নিঃসরণের মতোই দোদোবাবুর নামাঙ্কিত কলেজে চেয়ারম্যানের সেই জামাইয়ের সামনে দুঃখ দহন জ্বালা কেউ একবার উচ্চারণ করেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন লোকায়ুক্ত বিচারপতি সমরেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতিতে। জামাই ভেবেছিলেন হয়তো সমরেশীয় ভঙ্গিমায় ‘জিগ্ জিগ্’ এবার তিনি শুনতে পাবেন। তাই ছই ছাপ্পা ছৈ করে তিনি পগার পার হয়েছিলেন।

এমন মানুষেরাই একটা সময়ে সমাজে বেশি পাত্তা পেয়েছে। আজ ও পাচ্ছে। হয়তো আগামী দিনেও পাবে। নয়াপট্টি তে মহাদেবের চায়ের দোকানে বসে নিজের কন্যাকে ‘হিজড়ে’ বললে হয়তো এখন বলবে, ছিঃ, হিজড়ে বলতে নেই। বলো বৃহন্নলা। যেমন সংসদে ‘মিথ্যে’ শব্দটা অসংসদীয়। ‘মিথ্যে’ শব্দটা কোনো আইনসভার সভ্য উচ্চারণ করলেই ঘ্যাচাত করে অধ্যক্ষ মহোদয় কার্যবিবরণী থেকে শব্দটির গিলোটিন দেন। কিন্তু যদি কেউ ‘মিথ্যে’ না বলে, বলেন, ‘অসত্য’ , তবে জাত-কুল-মান কিছুই হারায় না।

ধান্ধাবাজদের অতিক্রম করতে কখনোই শাসক পারে না। শাসকের শাসনকে যাকে কিনা রাজনীতির চলতি কথায় বলে, ক্যান্টার করে দেওয়া, সেই কাজটি একদম ঠিকঠাক ভাবে করতে গেলে কানু বিনা গীত নাই- এর মতোই, ধান্ধাবাজ বিনা গতি নাই। নাই অন্ত যার- তেমন অলোকের রঞ্জনে কখনো শোনা যাবে না কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের সেই কবিতার লাইন, ‘দেবীকে স্নানের ঘরে নগ্ন দেখে’র মৌতাত। কারণ, এইসব জামাইদের অপত্যেরা এখন শাসকের খোঁচর হয়ে উঠেছে যে। অমৃক সিং আরোরার গান; ধুতি শাড়ি পড়িলে মনে পইড়্যা যায়, একদিন বাঙালি ছিলাম রে’র মতোই জামাইদের অপত্যেরা এখন প্রতিবেশির হাঁড়ির খবর জোগারে গোয়েন্দা সেজে বাইরে বামপন্থি সুগার কোটিংটা দিতে একটি বারের জন্যেও ভোলে না। কারণ, চেয়ারম্যান-জামাই-অপত্য সকলেই জানে বামপন্থিদের শেষ করতে, নিকেশ করতে পৈতে পড়া বামুনের মতো ‘বামপন্থি’ সাজার কোনো বিকল্প নেই। বামপন্থি সাজতে পারলেই প্রগতিশীল হওয়া যায়। কোমরের গুনসীতে তামার চিড়ে চ্যাপটা মাদুলি আছে কিনা, ‘বামপন্থি’ খোলসের জন্যে কেউ খোঁজই করে না। কারণ, প্রগতির বেরাদরি তেও রজোগুণী ভক্তের, গরদ-মটকা-তেলক- রুদ্রাক্ষ-ফেজ টুপি-নূর দাড়ির সেই কদর বিশ শতকের শুরু থেকে যে পেতে শুরু করেছিল, এই একুশ শতকের প্রায় মাঝামাঝি এসেও তাতে ভাটা পড়েনি। সকালেই কথাশিল্পী জয়া মিত্র বলছিলেন; ইতিহাস নির্ভর সাহিত্য সৃষ্টি প্রসঙ্গে মহাশ্বেতা দেবী বলতেন, তেমন লিখতে গেলে প্রচুর ইতিহাসের বই পড়তে হয়। আর লেখার সময়ে সেইসব পড়া ইতিহাস বইয়ের বিষয়বস্তুগুলোকে সব ভুলে যেতে হয়।

রবীন্দ্রনাথই তো বলেছিলেন; ভোলার সময় বড়। তাই যাবার বেলায় আর নাই বা শুকনো বকুল নাই ই বা জড়ো করলাম!