কিশোরগঞ্জের কিশোরী হত্যারহস্য উন্মোচন

মেলায় ঘুরতে নেয়ার কথা বলে কিশোরগঞ্জের কুলিয়ার চর এলাকায় ১৪ বছর বয়সী কিশোরীকে ধর্ষণ ও হত্যা করে চাচাতো বোনের জামাই। মেয়ের বয়সী শ্যালিকাকে বিকৃত যৌনচারের খায়েশ মেটাতে গিয়েই হত্যার পর লাশ একটি পুকুরে ফেলে দেয়া হয়। প্রথমে অপমৃত্যু মামলা হলেও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে ধর্ষণ করে শ্বাসরোধে হত্যার প্রতিবেদন আসলে রুজু হয় হত্যা মামলা। এরপর তথ্য প্রযুক্তির সহযোগিতায় শনাক্ত হয় মূল ঘাতক। কিশোরগঞ্জের কুলিয়ার চর থানায় এলাকায় মামলার তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এমন তথ্য পেয়েছে।

ইতোমধ্যে মূল ঘাতক মো. হাছানকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। শ্যালিকাকে ধর্ষণ করে হত্যার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দিও দিয়েছে হাছান। এর আগেও তার বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের ঘটনায় মামলা হয়েছে। ওই মামলায় ১০ বছরের সাজা হলেও আদালতে আপিল করে জামিনে মুক্তি পায় সে। মুক্তি পাওয়ার পর পরই নিজের শ্যালিকাকে ধর্ষণ ও হত্যা করলো ৪৮ বছর বয়সী হাছান। গ্রেপ্তার হাছান ইতোমধ্যে আদালতে হত্যার দ্বায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে।

পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার মো. শাহাদত হোসেন জানান, গত ১৮ মার্চ কিশোরগঞ্জের কুলিয়ার চর এলাকায় ১৪ বছর বয়সী কিশোরীর লাশ উদ্ধার হয় স্থানীয় একটি পুকুর থেকে। ঘটনার পর ওই কিশোরীর বাবা বাদী হয়ে কুলিয়ার চর থানায় অপমৃত্যু মামলা করে। মামলাটি স্থানীয় থানা পুলিশ তদন্ত করে। তদন্তকারী কর্মকর্তা কুলিয়ার চর থানার এসআই এমদাদুল হোসাইন ওই কিশোরীর মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য জেলা সদর হাসপপাতালে পাঠায়। পরে হাসপাতাল থেকে প্রতিবেদন দেয়া হয় কিশোরীকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। এরপর অপমৃত্যু মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তর করা হয়। তখন অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করা হয়। মামলার তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে মূল আসামিকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করে।

যেভাবে হত্যা রহস্য উদ্ঘাটন :

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ইন্সপেক্টর মোহাম্মদ সাকরুল হক খান জানান, সম্পূর্ন নতুন পোশাক পরিহিত অবস্থায় ভিকটিমের মরদেহ উদ্ধার হওয়ার পর পিবিআইয়ের মনে হয়েছিল ভিকটিম কোথাও বেড়াতে যাচ্ছিল। কার সঙ্গে কোথায় যেতে পারে এ নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে পিবিআই। আশপাশে দুশ্চরিত্রের কারা আছে, ধর্ষণ সংক্রান্ত অপরাধে কারও সাজা বা কারও বিরুদ্ধে মামলা আছে কি না সে বিষয়েও তদন্ত শুরু করে পিবিআই। ভিকটিমের আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভিকটিমদের দু’বোনের মধ্যে বড় বোন প্রেম করে বিয়ে করে। সেই বিয়েতে ভিকটেমের চাচাতো বোন জামাই ভ্যানচালাক হাছান সহযোগিতা করেছিল। এছাড়া হাছান যৌন নির্যাতনের মামলায় ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত ছিল। পরে সে জামিনে বেরিয়ে এসেছে। হাছানের অতীত কর্মকা- পর্যালোচনার পাশাপাশি ভিকটিম ঘর থেকে বের হওয়ার আগে ও পরে হাছান কোথায় ছিল সে বিষয়েও অনুসন্ধান করা হয়। পিবিআই জানতে পারে আগ থেকে ভিকটিমের প্রতি বোন জামাই হাছানের কুনজর ছিল। হাছান প্রায়ই ভিকটিমের বাড়িতে যাওয়া-আসা করতো।

পিবিআই জানতে পারে হাছানের ৫ ছেলে মেয়ের মধ্যে দ্বিতীয় মেয়ে ভিকটিমের বয়সী। ভিকটিম তার বোনের মেয়ের বয়সী হওয়ায় প্রায়ই আসামি হাছানের বাড়িতে যাতায়াত করতো। এছাড়া ভিকটিমের বড় দুই ভাই ঢাকা ও নারায়নগঞ্জ থাকতো। ভিকটিম তার ৯ বছর বয়সী ছোট বোনের সঙ্গে বাড়িতে থাকতো। ভিকটিমের বাবা অটোচালক হলেও মা অপ্রকৃতিস্থ ছিল। ভিকটেমের মৃত্যুর পর মায়ের মুত্যু হয়। ঘটনার দিন স্থানীয় এক নারী আসামি হাছানের সঙ্গে ভিকটিমকে নতুন পোশাকে দেখেছে। ওই সন্দেহ থেকে হাছানকে গ্রেপ্তার করার পর জিজ্ঞাসাবাদে সে সবকিছু স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেয়।

যেভাবে হত্যা করা হয় :

তদন্ত করতে গিয়ে পিবিআই জানতে পারে ভিকটিম ১৭ মার্চ বিকেলে বাড়ির পাশে চাচাতো বোন জামাতা আসামি হাছানের বাড়িতে যায় লাউ গাছের পাতা আনতে। তখন ভিকটিম তার বোন জামাতা হাছানকে বলে, দুলাভাই আমাকে একটু বাড়িতে এগিয়ে দেন। ওই সময় আসামি হাছান ভিকটিমকে মেলায় ঘুরতে যাওয়ার প্রস্তাব দেয়। ভিকটিম মেলায় যেতে রাজি হলে তাকে পোশাক পরে তৈরি থাকতে বলে হাছান। এর মধ্যে হাছান বাজারে গিয়ে যৌন উত্তেজক ওষুধ কিনে আসে। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী হাছান ভিকটিমকে বাসা থেকে নিয়ে বের হয়। ভিকটিম আগেই নতুন পোশাক পরে মেলায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে থাকলেও বাবা ও মাকে কিছুই জানায়নি। কাউকে কিছু না জানিয়ে নিরাপদ ভেবেই দুলাভাই হাছানের সঙ্গে বের হয়ে যায়। মেলায় না নিয়ে ভিকটিমকে তার ভগ্নিপতি হাছান একটি ক্ষেতের মধ্যে নিয়ে যায়। সেখানে ভিকটিমের হাত বেঁধে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে। এরপর ভিকটিম আসামি হাছানের কাছে আকুতি জানায় তাকে ছেড়ে দেয়ার জন্য। কিন্তু বিকৃত যৌনচার চর্চা করতে আসামি হাছান ভিকটিমকে পুনরায় ধর্ষণ করে। ধর্ষণের এক পর্যায়ে দেখে ভিকটিমের কোন নড়াচড়া নেই। তখন ভিকটিমকে স্থানীয় একটি পুকুরে ফেলে দিয়ে আসামি হাছান নিজ বাড়িতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।

রবিবার, ২১ নভেম্বর ২০২১ , ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮ ১৫ রবিউস সানি ১৪৪৩

কিশোরগঞ্জের কিশোরী হত্যারহস্য উন্মোচন

মেলায় ঘুরতে যাওয়ার কথা বলে ধর্ষণের পর হত্যা করে শ্যালিকাকে দুলাভাই

মেলায় ঘুরতে নেয়ার কথা বলে কিশোরগঞ্জের কুলিয়ার চর এলাকায় ১৪ বছর বয়সী কিশোরীকে ধর্ষণ ও হত্যা করে চাচাতো বোনের জামাই। মেয়ের বয়সী শ্যালিকাকে বিকৃত যৌনচারের খায়েশ মেটাতে গিয়েই হত্যার পর লাশ একটি পুকুরে ফেলে দেয়া হয়। প্রথমে অপমৃত্যু মামলা হলেও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে ধর্ষণ করে শ্বাসরোধে হত্যার প্রতিবেদন আসলে রুজু হয় হত্যা মামলা। এরপর তথ্য প্রযুক্তির সহযোগিতায় শনাক্ত হয় মূল ঘাতক। কিশোরগঞ্জের কুলিয়ার চর থানায় এলাকায় মামলার তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এমন তথ্য পেয়েছে।

ইতোমধ্যে মূল ঘাতক মো. হাছানকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। শ্যালিকাকে ধর্ষণ করে হত্যার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দিও দিয়েছে হাছান। এর আগেও তার বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের ঘটনায় মামলা হয়েছে। ওই মামলায় ১০ বছরের সাজা হলেও আদালতে আপিল করে জামিনে মুক্তি পায় সে। মুক্তি পাওয়ার পর পরই নিজের শ্যালিকাকে ধর্ষণ ও হত্যা করলো ৪৮ বছর বয়সী হাছান। গ্রেপ্তার হাছান ইতোমধ্যে আদালতে হত্যার দ্বায় স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে।

পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার মো. শাহাদত হোসেন জানান, গত ১৮ মার্চ কিশোরগঞ্জের কুলিয়ার চর এলাকায় ১৪ বছর বয়সী কিশোরীর লাশ উদ্ধার হয় স্থানীয় একটি পুকুর থেকে। ঘটনার পর ওই কিশোরীর বাবা বাদী হয়ে কুলিয়ার চর থানায় অপমৃত্যু মামলা করে। মামলাটি স্থানীয় থানা পুলিশ তদন্ত করে। তদন্তকারী কর্মকর্তা কুলিয়ার চর থানার এসআই এমদাদুল হোসাইন ওই কিশোরীর মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য জেলা সদর হাসপপাতালে পাঠায়। পরে হাসপাতাল থেকে প্রতিবেদন দেয়া হয় কিশোরীকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। এরপর অপমৃত্যু মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তর করা হয়। তখন অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করা হয়। মামলার তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে মূল আসামিকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করে।

যেভাবে হত্যা রহস্য উদ্ঘাটন :

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ইন্সপেক্টর মোহাম্মদ সাকরুল হক খান জানান, সম্পূর্ন নতুন পোশাক পরিহিত অবস্থায় ভিকটিমের মরদেহ উদ্ধার হওয়ার পর পিবিআইয়ের মনে হয়েছিল ভিকটিম কোথাও বেড়াতে যাচ্ছিল। কার সঙ্গে কোথায় যেতে পারে এ নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে পিবিআই। আশপাশে দুশ্চরিত্রের কারা আছে, ধর্ষণ সংক্রান্ত অপরাধে কারও সাজা বা কারও বিরুদ্ধে মামলা আছে কি না সে বিষয়েও তদন্ত শুরু করে পিবিআই। ভিকটিমের আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভিকটিমদের দু’বোনের মধ্যে বড় বোন প্রেম করে বিয়ে করে। সেই বিয়েতে ভিকটেমের চাচাতো বোন জামাই ভ্যানচালাক হাছান সহযোগিতা করেছিল। এছাড়া হাছান যৌন নির্যাতনের মামলায় ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত ছিল। পরে সে জামিনে বেরিয়ে এসেছে। হাছানের অতীত কর্মকা- পর্যালোচনার পাশাপাশি ভিকটিম ঘর থেকে বের হওয়ার আগে ও পরে হাছান কোথায় ছিল সে বিষয়েও অনুসন্ধান করা হয়। পিবিআই জানতে পারে আগ থেকে ভিকটিমের প্রতি বোন জামাই হাছানের কুনজর ছিল। হাছান প্রায়ই ভিকটিমের বাড়িতে যাওয়া-আসা করতো।

পিবিআই জানতে পারে হাছানের ৫ ছেলে মেয়ের মধ্যে দ্বিতীয় মেয়ে ভিকটিমের বয়সী। ভিকটিম তার বোনের মেয়ের বয়সী হওয়ায় প্রায়ই আসামি হাছানের বাড়িতে যাতায়াত করতো। এছাড়া ভিকটিমের বড় দুই ভাই ঢাকা ও নারায়নগঞ্জ থাকতো। ভিকটিম তার ৯ বছর বয়সী ছোট বোনের সঙ্গে বাড়িতে থাকতো। ভিকটিমের বাবা অটোচালক হলেও মা অপ্রকৃতিস্থ ছিল। ভিকটেমের মৃত্যুর পর মায়ের মুত্যু হয়। ঘটনার দিন স্থানীয় এক নারী আসামি হাছানের সঙ্গে ভিকটিমকে নতুন পোশাকে দেখেছে। ওই সন্দেহ থেকে হাছানকে গ্রেপ্তার করার পর জিজ্ঞাসাবাদে সে সবকিছু স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেয়।

যেভাবে হত্যা করা হয় :

তদন্ত করতে গিয়ে পিবিআই জানতে পারে ভিকটিম ১৭ মার্চ বিকেলে বাড়ির পাশে চাচাতো বোন জামাতা আসামি হাছানের বাড়িতে যায় লাউ গাছের পাতা আনতে। তখন ভিকটিম তার বোন জামাতা হাছানকে বলে, দুলাভাই আমাকে একটু বাড়িতে এগিয়ে দেন। ওই সময় আসামি হাছান ভিকটিমকে মেলায় ঘুরতে যাওয়ার প্রস্তাব দেয়। ভিকটিম মেলায় যেতে রাজি হলে তাকে পোশাক পরে তৈরি থাকতে বলে হাছান। এর মধ্যে হাছান বাজারে গিয়ে যৌন উত্তেজক ওষুধ কিনে আসে। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী হাছান ভিকটিমকে বাসা থেকে নিয়ে বের হয়। ভিকটিম আগেই নতুন পোশাক পরে মেলায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে থাকলেও বাবা ও মাকে কিছুই জানায়নি। কাউকে কিছু না জানিয়ে নিরাপদ ভেবেই দুলাভাই হাছানের সঙ্গে বের হয়ে যায়। মেলায় না নিয়ে ভিকটিমকে তার ভগ্নিপতি হাছান একটি ক্ষেতের মধ্যে নিয়ে যায়। সেখানে ভিকটিমের হাত বেঁধে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে। এরপর ভিকটিম আসামি হাছানের কাছে আকুতি জানায় তাকে ছেড়ে দেয়ার জন্য। কিন্তু বিকৃত যৌনচার চর্চা করতে আসামি হাছান ভিকটিমকে পুনরায় ধর্ষণ করে। ধর্ষণের এক পর্যায়ে দেখে ভিকটিমের কোন নড়াচড়া নেই। তখন ভিকটিমকে স্থানীয় একটি পুকুরে ফেলে দিয়ে আসামি হাছান নিজ বাড়িতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।