ধর্ষণ মামলায় বিচারকের পর্যবেক্ষণ

ঢাকার বনানীর রেইনট্রি হোটেলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ সংশ্লিষ্ট মামলার রায় প্রদানকালে ধর্ষণের ৭২ ঘণ্টা পর পুলিশকে ধর্ষণ মামলা না নেয়ার জন্য নির্দেশ দিয়ে বিচারক মোসাম্মত কামরুন্নাহার ব্যাপক সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছেন। তার এমন পর্যবেক্ষণে আইন ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রীসহ বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলে বিব্রত বোধ করতে থাকেন। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, ৭২ ঘণ্টা পর ধর্ষণ মামলা নেয়া যাবে না, এমন পর্যবেক্ষণ সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক ও বেআইনি। ওই বিচারকের বিচারিক ক্ষমতা কেড়ে নেয়ার অনুরোধ জানিয়ে প্রধান বিচারপতিকে চিঠি দেয়া হবে মর্মে আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের একদিন পরই সুপ্রিম কোর্ট বিচারক কামরুন্নাহারের বিচারিক ক্ষমতা সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করে নেয় এবং তাকে এজলাসে না বসার নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু পরবর্তীতে জানা গেল, রায়ের সময় মৌখিকভাবে বললেও মামলার লিখিত রায়ে এমন কোন পর্যবেক্ষণ দেননি তিনি।

উপযুক্ত তথ্য প্রমাণ না থাকায় বহুল আলোচিত ওই ধর্ষণ মামলায় আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার হোসেনের ছেলে শাফাত আহমেদসহ পাঁচ আসামিকেই খালাস দেয়া হয়েছে। খালাস দেয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিচারক যে সব অপূর্ণতার উল্লেখ করেন সেগুলো হচ্ছে, তদন্ত কর্মকর্তা প্রভাবিত হয়ে এ মামলায় অভিযোগপত্র দিয়েছেন, ভিকটিমদের ডাক্তারি রিপোর্টে সেক্সুয়াল ভায়োলেশনের কোনো বিবরণ নেই, ভিকটিমের পরিধেয়তে পাওয়া ডিএনএ নমুনা আসামিদের সঙ্গে মিলেনি ইত্যাদি ইত্যাদি। বিবেচ্য ক্ষেত্রে ধর্ষণের ৩৮ দিন পর ধর্ষণের অভিযোগ করা হয়েছে বিধায় ফরেনসিক এবং ডিএনএ টেস্টে ধর্ষণের আলামত পাওয়া যায়নি। ২০১৭ সনে সংঘটিত রেইনট্রি হোটেলের ঘটনাটি মিডিয়া বেশ গুরুত্ব সহকারে প্রচার করায় জনগণের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল, কিন্তু রায়ে ধর্ষণ মামলার কোন আসামি দোষী সাব্যস্ত না হওয়ায় অনেকে হতাশা ব্যক্ত করেছেন। তবে আমাদের মুখ্য বিবেচ্য বিষয় মামলার রায় নয়, আমাদের বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে রায়ে দেয়া পর্যবেক্ষণ।

আমাদের শরিয়াহ্্ আইনে ডাক্তারি পরীক্ষার কথা নেই। শরিয়াহ্ আইন মোতাবেক ব্যভিচার প্রমাণে চারজন ইমানদার পুরুষ সাক্ষী প্রয়োজন; কিন্তু চারজন পুরুষের সম্মুখে কারো নিশ্চয়ই ব্যভিচার করার কথা নয়। শুধু সাক্ষীর অভাবে পাকিস্তানে ব্যভিচার সংশ্লিষ্ট কোন মামলার নিষ্পত্তি করা যাচ্ছে না, আসামিরা বেকসুর খালাস পেয়ে যাচ্ছে। মানুষ সৃষ্ট আইনেও যে কোন মামলার সত্যতা প্রমাণ করা জটিলতর। আমলযোগ্য তথ্য-প্রমাণ না থাকলে বিচারকের পক্ষে শুধু আবেগের বশে কাউকে দ- দেয়া সম্ভব হয় না। দুর্বল এবং পক্ষপাতপূর্ণ তদন্ত প্রতিবেদনের কারণেও অনেক সময় আসামি খালাস পেয়ে যেতে পারেন, সরকার পক্ষের উকিলের ভূমিকা যথাযথ না হলেও অনেক সময় আসামিরা বেনিফিট পেয়ে যায়। সাক্ষীর দৃঢ়তার অভাব এবং উপস্থাপিত আলামতের সংশ্লেষে শিথিলতা থাকলেও মামলার সবলতা কমে যেতে পারে।

যে বিষয়টি বিচারের ক্ষেত্রে গুরুত্ব সহকারে বিবেচিত হয় তা হচ্ছে আসামির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়া, যাতে কোন নিরপরাধ ব্যক্তি শাস্তি না পায়। তদন্ত কর্মকর্তা বিলম্বে অভিযোগ দায়েরের বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়ে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করায় তদন্ত কর্মকর্তার প্রভাবিত হওয়ার সম্ভাবনার কথা বিচারক উল্লেখ করেছেন; তাই তদন্ত কর্মকর্তাকে আদালতের ‘পাবলিক টাইম নষ্ট’ করার জন্য পর্যবেক্ষণে কিছুটা দায়ী করা হয়েছে। রায় পড়ার সময় বিচারক একটি চমৎকার কথা বলেছেন, আলোচিত মামলা, আলোড়ন তোলা মামলাসহ সব মামলাই তার কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের চাকরি জীবনে কিছু নথিতে ‘জরুরি’ পতাকা লাগিয়ে উপস্থাপন করতাম; এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে এই জাতীয় পতাকার কোন গুরুত্ব ছিল না, তিনি বলতেন, সব নথিই তার কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই মিডিয়ায় আলোড়ন তোলা হলেই শুধু কোন মামলা গুরুত্ব পাবে- বিচার প্রক্রিয়ায় এমন প্রবণতা না থাকাই সমীচীন। জনগণ ও মিডিয়াকে তুষ্ট করার ক্ষেত্রে বিচারকের কোন দায় নেই, আবেগ মুক্ত হয়ে তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে রায় দেয়াই শ্রেয়।

রক্ষণশীল সমাজের অনেকেই আলোচ্য ধর্ষণ ঘটনার জন্য ধর্ষিত মেয়ে দুজনকে দায়ী করে যাচ্ছেন; কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন ছাত্রী রাতে একটি হোটেলে গিয়ে ছেলে বন্ধুর জন্মোৎসব করতে পারে এমন কর্ম তাদের কাছে অপকর্ম হিসেবে বিবেচিত। বন্ধুত্বের টানে স্বেচ্ছায় গেলেও দুই শিক্ষার্থীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক যৌনকর্ম করা হয়েছে কী না তা মামলায় বিবেচনা করা হয়েছে। ধর্ম এবং আমাদের সমাজ ব্যবস্থা না মানলেও বর্তমান সভ্য জগতে স্ত্রীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে যৌনকর্ম করাও ধর্ষণ। এভাবে স্বামীর জোরপূর্বক যৌনকর্ম করার মধ্যে নারীদের পণ্য হিসেবে গণ্য করার মানসিকতা পরিস্ফূট হয়ে উঠে। ধর্মমতে ইচ্ছা-অনিচ্ছা নির্বিশেষে বিবাহ বহির্ভূত সব যৌনকর্মই ব্যভিচার। অন্যদিকে মানুষের তৈরি আইনে প্রাপ্ত বয়স্ক অবিবাহিতদের পারস্পরিক ইচ্ছা ও সম্মতির ভিত্তিতে যৌনকর্ম হলে তা ধর্ষণ হিসেবে গণ্য হয় না। বিচারক বিবেচ্য মামলায় মেয়েদের স্বেচ্ছায় যৌনকর্মে লিপ্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন।

অপরাপর মামলার তুলনায় ধর্ষণ মামলার স্পর্শকাতরতা একটু বেশি। ধর্ষণের কথা জানাজানি হয়ে গেলে ধর্ষিতা ও তার পরিবারের সদস্যদের সামাজিক হয়রানির সম্মুখীন হতে হয়; ধর্ষিতা মেয়ের কদাচিৎ বিয়ে হয়, সারা জীবন তাকে সমাজ এবং পরিবারের সদস্যদের তরফ থেকে গঞ্জনা সহ্য করতে হয়। ধর্ষণের পর ধর্ষিতা মেয়েটিকে আইনি প্রক্রিয়ায়ও নানাভাবে হেনস্তার শিকার হতে হয়। বিবস্ত্র হয়ে দেহের গোপনাঙ্গ প্রদর্শন করে তাকে ডাক্তারের কাছে ধর্ষণের প্রমাণ দিতে হয়, এক্ষেত্রে ধর্ষণ প্রমাণের সম্পূর্ণ দায় ধর্ষিতার। বিজ্ঞান সম্মত না হওয়ায় কিছুদিন আগে আদালত কর্তৃক ধর্ষিতার দেহ পরীক্ষার জন্য ব্যবহৃত ‘টু ফিঙ্গার টেস্ট’ নিষিদ্ধ করায় একটা অপমানজনক হেনস্তা থেকে ধর্ষিতা মেয়েরা নিষ্কৃতি পেয়েছে। থানায় ধর্ষণের অভিযোগ লিপিবদ্ধ করার সময়ও তদন্তকারীর প্রশ্নগুলো ধর্ষিতার জন্য কখনও শ্রুতিমধুর হয় না। আদালতে আসামিপক্ষের উকিলের জেরায় ধর্ষিতা যেভাবে হেনস্তার শিকার হন তাতে মনে হয় মেয়েটি প্রথম ধর্ষণের চেয়ে আরও পীড়াদায়ক ও অপমানজনকভাবে জনসম্মুখে দ্বিতীয়বার ধর্ষিত হচ্ছেন। ধর্ষিতার লাঞ্ছনার শেষ থাকে না তখন, যখন কোন বিচারক ধর্ষিতাকে দুশ্চরিত্রা বলে অভিহিত করেন। রেইনট্রি হোটেলে ধর্ষণ সম্পর্কিত মামলার রায় দিতে গিয়ে বিচারক মোসাম্মত কামরুন্নাহার ভুক্তভোগী মেয়ে দুজনকে ‘সেক্সুয়ালি হ্যাবিচুয়েটেড’ বলে অভিহিত করেছেন। কিন্ত যৌনকর্মে অভ্যস্ত থাকা কোন অপরাধ নয়; কারণ ‘সেক্সুয়ালি হ্যাবিচুয়েটেড’ বিবাহিত নারীরাও ধর্ষণের শিকার হতে পারেন, পারস্পরিক সম্মতিতে ‘সেক্সুয়ালি হ্যাবিচুয়েটেড’ বহু নিরপরাধ নারী ধর্ষণের শিকার হয়ে থাকেন। সেক্সুয়ালি হ্যাবিচুয়েটেড নারীকে দুশ্চরিত্র মনে করা হলে তো সতী নারী পাওয়াই কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। বিচারের কোন প্রক্রিয়ায় এভাবে ক্যারেক্টার সার্টিফিকেট দেয়া নারীদের জন্য মর্যাদা হানিকর।

পরিবার এবং সমাজের সহানুভূতিশীল আচরণ ধর্ষিতাদের সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য অপরিহার্য। ধর্ষণ প্রমাণের জন্য অপরিহার্য নয় এমন প্রক্রিয়া-পদ্ধতি রহিত করা হলে ধর্ষিতারা আইনি প্রতিকারের প্রতি আরও বেশি আগ্রহী হবে। মেডিকেল টেস্ট ধর্ষণ শনাক্তের জন্য অপরিহার্য, থানার তদন্ত কর্মকর্তার পীড়াদায়ক প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ারও কোন উপায় নেই; তাই এই দুটি ক্ষেত্রে মেয়ে চিকিৎসক এবং মেয়ে-পুলিশ কর্মকর্তা নিয়োজিত করার ওপর গুরুত্ব দেয়া জরুরি। আদালতে জেরা করার সময় উকিলের লাগামহীন হেনস্তা থেকে রক্ষা করার ব্যবস্থা থাকাও জরুরি। উক্ত তিনটি পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট সবার জেন্ডার সংবেদনশীল হওয়া দরকার। শারীরিক এবং মানসিক ধকল সামাল দিতে দিতে ধর্ষিতাদের বিচার প্রক্রিয়ায় এগুতে হয়; তাই বিচার প্রক্রিয়া যত দ্রুত নিষ্পন্ন হবে হেনস্তা থেকে ধর্ষিতা তত আগে মুক্তি পাবে। মেডিকেল টেস্ট ছাড়াও পারিপার্শ্বিক অবস্থা, আসামির স্বীকারোক্তি, ভিকটিমের মৌখিক সাক্ষ্য, সাক্ষীর সাক্ষ্য ইত্যাদির মাধ্যমে ধর্ষণ প্রমাণ করা সম্ভব হয়; তাই ধর্ষণের ৭২ ঘণ্টা পরও মামলা করতে ধর্ষিতাকে উৎসাহ দেয়া সমীচীন হবে। সুখবর হচ্ছে, সাক্ষ্য প্রমাণ আইনে ধর্ষণের অভিযোগ বিচারের ক্ষেত্রে নারীর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলার যে ধারা রয়েছে ইতোমধ্যে তা বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এই অবস্থায় এখতিয়ার বহির্ভূত এবং নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোন পর্যবেক্ষণ না থাকা সবার জন্য শ্রেয় ও মঙ্গলকর।

[লেখক : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক]

ahmedzeauddin0@gmail.com

রবিবার, ২১ নভেম্বর ২০২১ , ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮ ১৫ রবিউস সানি ১৪৪৩

ধর্ষণ মামলায় বিচারকের পর্যবেক্ষণ

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

ঢাকার বনানীর রেইনট্রি হোটেলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ সংশ্লিষ্ট মামলার রায় প্রদানকালে ধর্ষণের ৭২ ঘণ্টা পর পুলিশকে ধর্ষণ মামলা না নেয়ার জন্য নির্দেশ দিয়ে বিচারক মোসাম্মত কামরুন্নাহার ব্যাপক সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছেন। তার এমন পর্যবেক্ষণে আইন ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রীসহ বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলে বিব্রত বোধ করতে থাকেন। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সঙ্গে সঙ্গে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, ৭২ ঘণ্টা পর ধর্ষণ মামলা নেয়া যাবে না, এমন পর্যবেক্ষণ সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক ও বেআইনি। ওই বিচারকের বিচারিক ক্ষমতা কেড়ে নেয়ার অনুরোধ জানিয়ে প্রধান বিচারপতিকে চিঠি দেয়া হবে মর্মে আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের একদিন পরই সুপ্রিম কোর্ট বিচারক কামরুন্নাহারের বিচারিক ক্ষমতা সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করে নেয় এবং তাকে এজলাসে না বসার নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু পরবর্তীতে জানা গেল, রায়ের সময় মৌখিকভাবে বললেও মামলার লিখিত রায়ে এমন কোন পর্যবেক্ষণ দেননি তিনি।

উপযুক্ত তথ্য প্রমাণ না থাকায় বহুল আলোচিত ওই ধর্ষণ মামলায় আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার হোসেনের ছেলে শাফাত আহমেদসহ পাঁচ আসামিকেই খালাস দেয়া হয়েছে। খালাস দেয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিচারক যে সব অপূর্ণতার উল্লেখ করেন সেগুলো হচ্ছে, তদন্ত কর্মকর্তা প্রভাবিত হয়ে এ মামলায় অভিযোগপত্র দিয়েছেন, ভিকটিমদের ডাক্তারি রিপোর্টে সেক্সুয়াল ভায়োলেশনের কোনো বিবরণ নেই, ভিকটিমের পরিধেয়তে পাওয়া ডিএনএ নমুনা আসামিদের সঙ্গে মিলেনি ইত্যাদি ইত্যাদি। বিবেচ্য ক্ষেত্রে ধর্ষণের ৩৮ দিন পর ধর্ষণের অভিযোগ করা হয়েছে বিধায় ফরেনসিক এবং ডিএনএ টেস্টে ধর্ষণের আলামত পাওয়া যায়নি। ২০১৭ সনে সংঘটিত রেইনট্রি হোটেলের ঘটনাটি মিডিয়া বেশ গুরুত্ব সহকারে প্রচার করায় জনগণের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল, কিন্তু রায়ে ধর্ষণ মামলার কোন আসামি দোষী সাব্যস্ত না হওয়ায় অনেকে হতাশা ব্যক্ত করেছেন। তবে আমাদের মুখ্য বিবেচ্য বিষয় মামলার রায় নয়, আমাদের বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে রায়ে দেয়া পর্যবেক্ষণ।

আমাদের শরিয়াহ্্ আইনে ডাক্তারি পরীক্ষার কথা নেই। শরিয়াহ্ আইন মোতাবেক ব্যভিচার প্রমাণে চারজন ইমানদার পুরুষ সাক্ষী প্রয়োজন; কিন্তু চারজন পুরুষের সম্মুখে কারো নিশ্চয়ই ব্যভিচার করার কথা নয়। শুধু সাক্ষীর অভাবে পাকিস্তানে ব্যভিচার সংশ্লিষ্ট কোন মামলার নিষ্পত্তি করা যাচ্ছে না, আসামিরা বেকসুর খালাস পেয়ে যাচ্ছে। মানুষ সৃষ্ট আইনেও যে কোন মামলার সত্যতা প্রমাণ করা জটিলতর। আমলযোগ্য তথ্য-প্রমাণ না থাকলে বিচারকের পক্ষে শুধু আবেগের বশে কাউকে দ- দেয়া সম্ভব হয় না। দুর্বল এবং পক্ষপাতপূর্ণ তদন্ত প্রতিবেদনের কারণেও অনেক সময় আসামি খালাস পেয়ে যেতে পারেন, সরকার পক্ষের উকিলের ভূমিকা যথাযথ না হলেও অনেক সময় আসামিরা বেনিফিট পেয়ে যায়। সাক্ষীর দৃঢ়তার অভাব এবং উপস্থাপিত আলামতের সংশ্লেষে শিথিলতা থাকলেও মামলার সবলতা কমে যেতে পারে।

যে বিষয়টি বিচারের ক্ষেত্রে গুরুত্ব সহকারে বিবেচিত হয় তা হচ্ছে আসামির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়া, যাতে কোন নিরপরাধ ব্যক্তি শাস্তি না পায়। তদন্ত কর্মকর্তা বিলম্বে অভিযোগ দায়েরের বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়ে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করায় তদন্ত কর্মকর্তার প্রভাবিত হওয়ার সম্ভাবনার কথা বিচারক উল্লেখ করেছেন; তাই তদন্ত কর্মকর্তাকে আদালতের ‘পাবলিক টাইম নষ্ট’ করার জন্য পর্যবেক্ষণে কিছুটা দায়ী করা হয়েছে। রায় পড়ার সময় বিচারক একটি চমৎকার কথা বলেছেন, আলোচিত মামলা, আলোড়ন তোলা মামলাসহ সব মামলাই তার কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের চাকরি জীবনে কিছু নথিতে ‘জরুরি’ পতাকা লাগিয়ে উপস্থাপন করতাম; এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে এই জাতীয় পতাকার কোন গুরুত্ব ছিল না, তিনি বলতেন, সব নথিই তার কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই মিডিয়ায় আলোড়ন তোলা হলেই শুধু কোন মামলা গুরুত্ব পাবে- বিচার প্রক্রিয়ায় এমন প্রবণতা না থাকাই সমীচীন। জনগণ ও মিডিয়াকে তুষ্ট করার ক্ষেত্রে বিচারকের কোন দায় নেই, আবেগ মুক্ত হয়ে তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে রায় দেয়াই শ্রেয়।

রক্ষণশীল সমাজের অনেকেই আলোচ্য ধর্ষণ ঘটনার জন্য ধর্ষিত মেয়ে দুজনকে দায়ী করে যাচ্ছেন; কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন ছাত্রী রাতে একটি হোটেলে গিয়ে ছেলে বন্ধুর জন্মোৎসব করতে পারে এমন কর্ম তাদের কাছে অপকর্ম হিসেবে বিবেচিত। বন্ধুত্বের টানে স্বেচ্ছায় গেলেও দুই শিক্ষার্থীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক যৌনকর্ম করা হয়েছে কী না তা মামলায় বিবেচনা করা হয়েছে। ধর্ম এবং আমাদের সমাজ ব্যবস্থা না মানলেও বর্তমান সভ্য জগতে স্ত্রীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে যৌনকর্ম করাও ধর্ষণ। এভাবে স্বামীর জোরপূর্বক যৌনকর্ম করার মধ্যে নারীদের পণ্য হিসেবে গণ্য করার মানসিকতা পরিস্ফূট হয়ে উঠে। ধর্মমতে ইচ্ছা-অনিচ্ছা নির্বিশেষে বিবাহ বহির্ভূত সব যৌনকর্মই ব্যভিচার। অন্যদিকে মানুষের তৈরি আইনে প্রাপ্ত বয়স্ক অবিবাহিতদের পারস্পরিক ইচ্ছা ও সম্মতির ভিত্তিতে যৌনকর্ম হলে তা ধর্ষণ হিসেবে গণ্য হয় না। বিচারক বিবেচ্য মামলায় মেয়েদের স্বেচ্ছায় যৌনকর্মে লিপ্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন।

অপরাপর মামলার তুলনায় ধর্ষণ মামলার স্পর্শকাতরতা একটু বেশি। ধর্ষণের কথা জানাজানি হয়ে গেলে ধর্ষিতা ও তার পরিবারের সদস্যদের সামাজিক হয়রানির সম্মুখীন হতে হয়; ধর্ষিতা মেয়ের কদাচিৎ বিয়ে হয়, সারা জীবন তাকে সমাজ এবং পরিবারের সদস্যদের তরফ থেকে গঞ্জনা সহ্য করতে হয়। ধর্ষণের পর ধর্ষিতা মেয়েটিকে আইনি প্রক্রিয়ায়ও নানাভাবে হেনস্তার শিকার হতে হয়। বিবস্ত্র হয়ে দেহের গোপনাঙ্গ প্রদর্শন করে তাকে ডাক্তারের কাছে ধর্ষণের প্রমাণ দিতে হয়, এক্ষেত্রে ধর্ষণ প্রমাণের সম্পূর্ণ দায় ধর্ষিতার। বিজ্ঞান সম্মত না হওয়ায় কিছুদিন আগে আদালত কর্তৃক ধর্ষিতার দেহ পরীক্ষার জন্য ব্যবহৃত ‘টু ফিঙ্গার টেস্ট’ নিষিদ্ধ করায় একটা অপমানজনক হেনস্তা থেকে ধর্ষিতা মেয়েরা নিষ্কৃতি পেয়েছে। থানায় ধর্ষণের অভিযোগ লিপিবদ্ধ করার সময়ও তদন্তকারীর প্রশ্নগুলো ধর্ষিতার জন্য কখনও শ্রুতিমধুর হয় না। আদালতে আসামিপক্ষের উকিলের জেরায় ধর্ষিতা যেভাবে হেনস্তার শিকার হন তাতে মনে হয় মেয়েটি প্রথম ধর্ষণের চেয়ে আরও পীড়াদায়ক ও অপমানজনকভাবে জনসম্মুখে দ্বিতীয়বার ধর্ষিত হচ্ছেন। ধর্ষিতার লাঞ্ছনার শেষ থাকে না তখন, যখন কোন বিচারক ধর্ষিতাকে দুশ্চরিত্রা বলে অভিহিত করেন। রেইনট্রি হোটেলে ধর্ষণ সম্পর্কিত মামলার রায় দিতে গিয়ে বিচারক মোসাম্মত কামরুন্নাহার ভুক্তভোগী মেয়ে দুজনকে ‘সেক্সুয়ালি হ্যাবিচুয়েটেড’ বলে অভিহিত করেছেন। কিন্ত যৌনকর্মে অভ্যস্ত থাকা কোন অপরাধ নয়; কারণ ‘সেক্সুয়ালি হ্যাবিচুয়েটেড’ বিবাহিত নারীরাও ধর্ষণের শিকার হতে পারেন, পারস্পরিক সম্মতিতে ‘সেক্সুয়ালি হ্যাবিচুয়েটেড’ বহু নিরপরাধ নারী ধর্ষণের শিকার হয়ে থাকেন। সেক্সুয়ালি হ্যাবিচুয়েটেড নারীকে দুশ্চরিত্র মনে করা হলে তো সতী নারী পাওয়াই কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। বিচারের কোন প্রক্রিয়ায় এভাবে ক্যারেক্টার সার্টিফিকেট দেয়া নারীদের জন্য মর্যাদা হানিকর।

পরিবার এবং সমাজের সহানুভূতিশীল আচরণ ধর্ষিতাদের সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য অপরিহার্য। ধর্ষণ প্রমাণের জন্য অপরিহার্য নয় এমন প্রক্রিয়া-পদ্ধতি রহিত করা হলে ধর্ষিতারা আইনি প্রতিকারের প্রতি আরও বেশি আগ্রহী হবে। মেডিকেল টেস্ট ধর্ষণ শনাক্তের জন্য অপরিহার্য, থানার তদন্ত কর্মকর্তার পীড়াদায়ক প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ারও কোন উপায় নেই; তাই এই দুটি ক্ষেত্রে মেয়ে চিকিৎসক এবং মেয়ে-পুলিশ কর্মকর্তা নিয়োজিত করার ওপর গুরুত্ব দেয়া জরুরি। আদালতে জেরা করার সময় উকিলের লাগামহীন হেনস্তা থেকে রক্ষা করার ব্যবস্থা থাকাও জরুরি। উক্ত তিনটি পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট সবার জেন্ডার সংবেদনশীল হওয়া দরকার। শারীরিক এবং মানসিক ধকল সামাল দিতে দিতে ধর্ষিতাদের বিচার প্রক্রিয়ায় এগুতে হয়; তাই বিচার প্রক্রিয়া যত দ্রুত নিষ্পন্ন হবে হেনস্তা থেকে ধর্ষিতা তত আগে মুক্তি পাবে। মেডিকেল টেস্ট ছাড়াও পারিপার্শ্বিক অবস্থা, আসামির স্বীকারোক্তি, ভিকটিমের মৌখিক সাক্ষ্য, সাক্ষীর সাক্ষ্য ইত্যাদির মাধ্যমে ধর্ষণ প্রমাণ করা সম্ভব হয়; তাই ধর্ষণের ৭২ ঘণ্টা পরও মামলা করতে ধর্ষিতাকে উৎসাহ দেয়া সমীচীন হবে। সুখবর হচ্ছে, সাক্ষ্য প্রমাণ আইনে ধর্ষণের অভিযোগ বিচারের ক্ষেত্রে নারীর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলার যে ধারা রয়েছে ইতোমধ্যে তা বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এই অবস্থায় এখতিয়ার বহির্ভূত এবং নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোন পর্যবেক্ষণ না থাকা সবার জন্য শ্রেয় ও মঙ্গলকর।

[লেখক : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক]

ahmedzeauddin0@gmail.com