এন্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স : বিপর্যয় রোধে করণীয়

এন্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সকে (এএমআর) বিশ্বের জন্য মহাবিপর্যয় হিসেবে আখ্যায়িত করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সবাইকে এ বিপর্যয় রোধে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বছরে প্রায় ৭ লাখ বা তারও বেশি লোক এ পরিস্থিতির জন্য মৃত্যুবরণ করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছেÑ এ অবস্থা চলতে থাকলে ২০৫০ সালে এন্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সজনিত সমস্যায় মারা যাবে প্রতি বছরে ১ কোটি ভুক্তভোগী। তাই এ প্রতিরোধ যুদ্ধে অন্যান্য বছরের মতো এ বছর ১৮-২৪ নভেম্বর পর্যন্ত এন্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স সচেতনতা সপ্তাহ পালনের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এর কার্যকরী প্রতিরোধে এ বছরের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়- Spread awareness, Stop Resistance.

ধারণা করা হয় পৃথিবীতে ক্ষুদ্র অনুজীব ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসের অস্তিত্ব ছিল প্রায় ৩-৪ বিলিয়ন বছর পূর্বে। তবে ১৬৭৬ সালে বিজ্ঞানী লিওয়েন হুক এ অনুজীবের অস্তিত্ব খুঁজে পান। ১৮২৮ সালে একে ব্যাকটেরিয়াম নামে আখ্যা দেন বিজ্ঞানী এরেনবার্গ। বিশ্বখ্যাত লুইপাস্তুর ১৮৭০ সালে এবং ১৯০৫ সালে রবার্ট কচ  এদের প্রকৃতি নিয়ে সুস্পষ্ট  ধারণা প্রদান করেন।

এ অনুজীবসমূহ যেমন- খাদ্য উৎপাদন,  পানি শোধন, জৈব জ্বালানি এবং বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্যাদি তৈরিতে ব্যবহার হয়, তেমনি  মানবদেহে রোগ-ব্যাধি সৃষ্টিতেও পটু। এসব রোগ-ব্যাধি প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় বিভিন্ন আঙ্গিকে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার প্রাচীনকাল থেকেই। তবে ১৯২৮ সালে আলেকজান্ডার ফ্লেমিংয়ের পেনিসিলিন আবিষ্কার অ্যান্টিবায়োটিক জগতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনয়ন করে। ক্রমান্বয়ে বিভিন্ন অ্যান্টিবায়োটিকের আবিষ্কার ও ব্যবহার যেমন রোগ-ব্যাধি নিরাময়ে অভূতপূর্ব ফল লাভে সক্ষম হয়; পাশাপাশি এর অতিরিক্ত ও অপব্যবহার এন্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের মতো বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়। জাতিসংঘের মতে, অ্যান্টিবায়োটিকসমূহের বিরুদ্ধে অনুজীবসমূহের প্রতিরোধ গড়ে তুলে এর কার্যকারিতা বিনষ্ট করার প্রক্রিয়া ও অবস্থাকে এন্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) বলা হয়। ২০১৮ সালের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সম্মেলনে এএমআরকে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা ও উন্নয়নের পথে বাধা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর ২৮ লাখ অ্যান্টিবায়োটিক  রেজিস্ট্যান্সজনিত রোগী শনাক্ত হয়, মারা যায় ৩৫ হাজার। ২০১৩ সালে ৩৯টি দেশের এক জরিপে দেখা গেছে যে, নিম্নমানের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে ৫ বছরের কমবয়সী শিশুর মৃত্যু ঘটেছে দেড় লাখ। একই কারণে এন্টিম্যালেরিয়াল ড্রাগে মৃত্যু হয়েছে ১২ হাজার শিশুর। আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৮৯০ মিলিয়ন ডলার। খোদ যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশেও ব্যবহৃত ৩০ শতাংশ অ্যান্টিবায়োটিকই ছিল অপ্রয়োজনীয়।

২০২০-২১ সালে কোভিড-১৯ রোগীদের ক্ষেত্রে ৭২ শতাংশ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের কোন প্রয়োজন ছিল না। ১৫০০ কোভিড-১৯ রোগীর মধ্যে মাত্র ৬% এর দেহে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ ছিল অথচ সব ক্ষেত্রে জন্য অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়েছিল। বৈশ্বিক কোভিড-১৯ অতিমারি বিভিন্নভাবে এন্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে যথা- অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছা ব্যবহার, পিপিইসমূহের পুনর্ব্যবহার, আইসোলেশন সুবিধার অপর্যাপ্ততা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ঘটতি, টেলিমেডিসিনে নির্ভরতা, প্যাথলজি ল্যাবরেটরিসমূহের ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপ ইত্যাদি।

মূলত চারটি প্রক্রিয়ায় জীবাণুসমূহ এ রেজিস্ট্যান্স ক্ষমতা লাভ করে। প্রাকৃতিকভাবে ক্রমাগত  অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে অভিযোজন প্রক্রিয়ায় এসব অনুজীব পরবর্তীতে বংশ বৃদ্ধি করে রেজিস্ট্যান্স ক্ষমতা প্রাপ্তদের দল ভারি করতে সক্ষম হয়। এ প্রক্রিয়ায় অনেক জীবাণু জীনগত পরিবর্তন করে অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে আরো শক্তিশালী হয়ে উঠে। এ পরিস্থিতিতে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে। দ্বিতীয়ত, রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ব্যতীত অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহারও এএমআরের অন্যতম কারণ। ভারতের পাঞ্জাবের এক সমীক্ষায় দেখা যায়, সাধারণের প্রায় ৭৩% ছোটখাটো অসুখ-বিসুখে পূর্বের কিছু অভিজ্ঞতা, আত্মীয়স্বজনের পরামর্শ কিংবা সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্যোগে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করে থাকে। চিকিৎসকরা কর্তৃক অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহারে কারণেও এন্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স হয়ে থাকে।

সিডিসির মতে, প্রায় অর্ধেক রোগীর ক্ষেত্রেই অ্যান্টিবায়োটিকের নির্বাচন, ডোজ ও মাত্রা সঠিক থাকে না। ফ্রান্সে ৩০-৬০% অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার অপ্রয়োজনীয় হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তৃতীয়ত, ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি, হাসপাতাল, ক্লিনিকসমূহের দুর্বল সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা প্রকৃতিতে অবস্থান করা জীবাণুসমূহকে রেজিস্ট্যান্স লাভে ভূমিকা পালন করে। চতুর্থত,  প্রাণিসম্পদ ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার, ফসলে কীটনাশকের অতিরিক্ত প্রয়োগ, রোগ নির্ণয় না করে বা একই রোগে একাধিক অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার  ইত্যাদি এএমআরের নানাবিধ কারণ।

প্রাকৃতিকভাবে জীবাণুসমূহ প্রতিরোধ ক্ষমতা লাভের পর নিজস্ব গতিতে বংশ বিস্তার করে ও এদের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা লোপ পায় এবং এসব জীবাণু অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া জীবনচক্রের বিভিন্ন পর্যায়ে অন্যান্য প্রাণী ও উদ্ভিদেও এদের  বিস্তার ঘটে। ফলে মানুষসহ  পরিবেশের অন্যান্য প্রাণীদেরও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পায়। অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত কিংবা অপব্যবহারের ফলেও জীবাণুসমূহ ক্রমাগত প্রতিরোধ বলয় সৃষ্টি করতে সক্ষম হয় এবং একপর্যায়ে অ্যান্টিবায়োটিকসমূহ ওই জীবাণুর বিরুদ্ধে অকার্যকর হয়ে পড়ে। অনেক সময় আমরা রোগের উপসর্গে উন্নতি হওয়া মাত্রই অ্যান্টিবায়োটিক  সেবন বন্ধ করে দেই, ফলে জীবাণুসমূহ সম্পূর্ণ ধ্বংসের পরিবর্তে রেজিস্ট্যান্স ক্ষমতা প্রাপ্ত হয় এবং ভবিষ্যতে একই অ্যান্টিবায়োটিক এসব জীবাণুর বিরুদ্ধে কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।

বাংলাদেশে এএমআর পরিস্থিতি ভয়াবহ। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ৬০-৭০ ভাগ প্রথম জেনারেশন অ্যান্টিবায়োটিক প্রায়ই অকার্যকর হয়ে পড়েছে। শিশু ও বৃদ্ধদের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ও অপপ্রয়োগ লক্ষ্যণীয়। সেফট্রিয়েক্সন, সিপ্রোফ্লক্সাসিন কিংবা এজিথ্রোমাইসিনের মতো অ্যান্টিবায়োটিকসমূহের ব্যবহার যত্রতত্র এবং অহরহ। অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময়ই পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয় না; এক রোগীর জন্য একই সময় একাধিক অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার এবং সাধারণ জ্বর, সর্দি-কাশি, ডায়রিয়া ইত্যাদিতে প্রায় ১০০ ভাগ ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োগ হয়ে থাকে। ৫০ শতাংশ রোগীই অ্যান্টিবায়োটিকের ডোজ সম্পূর্ণ শেষ করে না; ৩০-৪০ শতাংশ রোগী নিজস্ব উদ্যোগেই বিভিন্ন কারণে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করে থাকেন।  এছাড়া অধিকাংশ পোল্ট্রি ও গবাদিপশু খামারে প্রচুর পরিমাণ অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার হয়ে থাকে, ফলে রেজিস্ট্যান্স ক্ষমতাপ্রাপ্ত জীবাণুসমূহ খাবারের সাথে এবং পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে।

এন্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্বকে ভয়াবহ দিকে ধাবিত করছে। এ বিষয়ে সচেতন না হলে এবং নতুন ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক উদ্ভাবন না হলে বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে পড়বে। আমাদের অবশ্যই চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগে উদ্যোগী হতে হবে। ব্যাক্তিগতভাবে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সব স্বাস্থ্যবিধি যথা- হাত ধোয়া, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার ও পানীয় গ্রহণ, রোগ প্রতিরোধে টিকা গ্রহণ ইত্যাদি মেনে চলতে হবে। চিকিৎসা পেশার সাথে জড়িত সবাইকে যথাযথ পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে কিংবা রোগীর প্রয়োজনীয়তা নিরিখেই অ্যান্টিবায়োটিকের যথাযথ ব্যবহার, সংক্রমণ প্রতিরোধ ও এএমআরের ভয়াবহতা সম্পর্কে সাধারণদের সচেতন করে তুলতে হবে। ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও চিকিৎসা সংস্থাসমূহকে অ্যান্টিবায়োটিক লেখা ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রভাব খাটানো বন্ধ করতে হবে। নতুন জেনারেশনের অ্যান্টিবায়োটিক উদ্ভাবন ও উৎপাদনে বিনিয়োগ এবং গবেষণা কাজে উৎসাহ প্রদান করতে হবে। হাসপাতালসমূহকে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার, রেজিস্ট্যান্সের অপকারিতা বিষয়ে সবাইকে সচেতন করে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। কৃষি, পোল্ট্রি ও মৎস্য উৎপাদন ইত্যাদি ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে নীতিমালা মেনে চলতে হবে এবং সংশ্লিষ্টদের নজরদারি বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে গাইড লাইন সম্বলিত জাতীয় নীতিমালা রয়েছে। সম্প্রতি এন্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স প্রতিরোধে বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক পরিম-লে ৫ দফা প্রস্তাবনা পেশ করা হয়েছে। এর মধ্যে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক ভিত্তিতে এএমআর প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ এবং নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশসমূহে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান; নতুন জেনারেশন অ্যান্টিবায়োটিক উৎপাদনে প্রযুক্তির শেয়ার এবং দরিদ্র দেশসমূহে সহজলভ্য করা; ওষুধ উৎপাদন, ল্যাবরেটরি কার্যক্রমে উন্নয়ন ও জরিপ কর্মকা-ে নজরদারি জোরদারকরণ এবং সর্বোপরি এএমআর প্রতিরোধে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে সব দেশ ও অঞ্চলে সচেতনতা গড়ে তোলা উল্লেখ্য।

এন্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স একটি বৈশ্বিক সমস্যা। উন্নত দেশ থেকে শুরু করে নিম্নআয়ের দেশসমূহে এ বিপর্যয় প্রকট আকার ধারণ করেছে। বৈশ্বিক, আঞ্চলিক, জাতীয়, প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং অ্যান্টিবায়োটিকের যথাযথ ব্যবহার ও নতুন অ্যান্টিবায়োটিক উদ্ভাবনের প্রচেষ্টার মাধ্যমেই এ বিপর্যয় রোধ করা সম্ভব। 

[লেখক : সহকারী পরিচালক,

কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল]

সোমবার, ২২ নভেম্বর ২০২১ , ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৮ ১৬ রবিউস সানি ১৪৪৩

এন্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স : বিপর্যয় রোধে করণীয়

নাজমুল হুদা খান

এন্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সকে (এএমআর) বিশ্বের জন্য মহাবিপর্যয় হিসেবে আখ্যায়িত করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সবাইকে এ বিপর্যয় রোধে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বছরে প্রায় ৭ লাখ বা তারও বেশি লোক এ পরিস্থিতির জন্য মৃত্যুবরণ করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছেÑ এ অবস্থা চলতে থাকলে ২০৫০ সালে এন্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সজনিত সমস্যায় মারা যাবে প্রতি বছরে ১ কোটি ভুক্তভোগী। তাই এ প্রতিরোধ যুদ্ধে অন্যান্য বছরের মতো এ বছর ১৮-২৪ নভেম্বর পর্যন্ত এন্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স সচেতনতা সপ্তাহ পালনের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এর কার্যকরী প্রতিরোধে এ বছরের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়- Spread awareness, Stop Resistance.

ধারণা করা হয় পৃথিবীতে ক্ষুদ্র অনুজীব ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসের অস্তিত্ব ছিল প্রায় ৩-৪ বিলিয়ন বছর পূর্বে। তবে ১৬৭৬ সালে বিজ্ঞানী লিওয়েন হুক এ অনুজীবের অস্তিত্ব খুঁজে পান। ১৮২৮ সালে একে ব্যাকটেরিয়াম নামে আখ্যা দেন বিজ্ঞানী এরেনবার্গ। বিশ্বখ্যাত লুইপাস্তুর ১৮৭০ সালে এবং ১৯০৫ সালে রবার্ট কচ  এদের প্রকৃতি নিয়ে সুস্পষ্ট  ধারণা প্রদান করেন।

এ অনুজীবসমূহ যেমন- খাদ্য উৎপাদন,  পানি শোধন, জৈব জ্বালানি এবং বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্যাদি তৈরিতে ব্যবহার হয়, তেমনি  মানবদেহে রোগ-ব্যাধি সৃষ্টিতেও পটু। এসব রোগ-ব্যাধি প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় বিভিন্ন আঙ্গিকে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার প্রাচীনকাল থেকেই। তবে ১৯২৮ সালে আলেকজান্ডার ফ্লেমিংয়ের পেনিসিলিন আবিষ্কার অ্যান্টিবায়োটিক জগতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনয়ন করে। ক্রমান্বয়ে বিভিন্ন অ্যান্টিবায়োটিকের আবিষ্কার ও ব্যবহার যেমন রোগ-ব্যাধি নিরাময়ে অভূতপূর্ব ফল লাভে সক্ষম হয়; পাশাপাশি এর অতিরিক্ত ও অপব্যবহার এন্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের মতো বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়। জাতিসংঘের মতে, অ্যান্টিবায়োটিকসমূহের বিরুদ্ধে অনুজীবসমূহের প্রতিরোধ গড়ে তুলে এর কার্যকারিতা বিনষ্ট করার প্রক্রিয়া ও অবস্থাকে এন্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) বলা হয়। ২০১৮ সালের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সম্মেলনে এএমআরকে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা ও উন্নয়নের পথে বাধা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর ২৮ লাখ অ্যান্টিবায়োটিক  রেজিস্ট্যান্সজনিত রোগী শনাক্ত হয়, মারা যায় ৩৫ হাজার। ২০১৩ সালে ৩৯টি দেশের এক জরিপে দেখা গেছে যে, নিম্নমানের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে ৫ বছরের কমবয়সী শিশুর মৃত্যু ঘটেছে দেড় লাখ। একই কারণে এন্টিম্যালেরিয়াল ড্রাগে মৃত্যু হয়েছে ১২ হাজার শিশুর। আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৮৯০ মিলিয়ন ডলার। খোদ যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশেও ব্যবহৃত ৩০ শতাংশ অ্যান্টিবায়োটিকই ছিল অপ্রয়োজনীয়।

২০২০-২১ সালে কোভিড-১৯ রোগীদের ক্ষেত্রে ৭২ শতাংশ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের কোন প্রয়োজন ছিল না। ১৫০০ কোভিড-১৯ রোগীর মধ্যে মাত্র ৬% এর দেহে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ ছিল অথচ সব ক্ষেত্রে জন্য অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়েছিল। বৈশ্বিক কোভিড-১৯ অতিমারি বিভিন্নভাবে এন্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে যথা- অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছা ব্যবহার, পিপিইসমূহের পুনর্ব্যবহার, আইসোলেশন সুবিধার অপর্যাপ্ততা, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ঘটতি, টেলিমেডিসিনে নির্ভরতা, প্যাথলজি ল্যাবরেটরিসমূহের ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপ ইত্যাদি।

মূলত চারটি প্রক্রিয়ায় জীবাণুসমূহ এ রেজিস্ট্যান্স ক্ষমতা লাভ করে। প্রাকৃতিকভাবে ক্রমাগত  অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে অভিযোজন প্রক্রিয়ায় এসব অনুজীব পরবর্তীতে বংশ বৃদ্ধি করে রেজিস্ট্যান্স ক্ষমতা প্রাপ্তদের দল ভারি করতে সক্ষম হয়। এ প্রক্রিয়ায় অনেক জীবাণু জীনগত পরিবর্তন করে অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে আরো শক্তিশালী হয়ে উঠে। এ পরিস্থিতিতে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ে। দ্বিতীয়ত, রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ব্যতীত অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহারও এএমআরের অন্যতম কারণ। ভারতের পাঞ্জাবের এক সমীক্ষায় দেখা যায়, সাধারণের প্রায় ৭৩% ছোটখাটো অসুখ-বিসুখে পূর্বের কিছু অভিজ্ঞতা, আত্মীয়স্বজনের পরামর্শ কিংবা সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্যোগে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করে থাকে। চিকিৎসকরা কর্তৃক অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহারে কারণেও এন্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স হয়ে থাকে।

সিডিসির মতে, প্রায় অর্ধেক রোগীর ক্ষেত্রেই অ্যান্টিবায়োটিকের নির্বাচন, ডোজ ও মাত্রা সঠিক থাকে না। ফ্রান্সে ৩০-৬০% অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার অপ্রয়োজনীয় হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তৃতীয়ত, ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি, হাসপাতাল, ক্লিনিকসমূহের দুর্বল সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাপনা প্রকৃতিতে অবস্থান করা জীবাণুসমূহকে রেজিস্ট্যান্স লাভে ভূমিকা পালন করে। চতুর্থত,  প্রাণিসম্পদ ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার, ফসলে কীটনাশকের অতিরিক্ত প্রয়োগ, রোগ নির্ণয় না করে বা একই রোগে একাধিক অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার  ইত্যাদি এএমআরের নানাবিধ কারণ।

প্রাকৃতিকভাবে জীবাণুসমূহ প্রতিরোধ ক্ষমতা লাভের পর নিজস্ব গতিতে বংশ বিস্তার করে ও এদের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা লোপ পায় এবং এসব জীবাণু অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া জীবনচক্রের বিভিন্ন পর্যায়ে অন্যান্য প্রাণী ও উদ্ভিদেও এদের  বিস্তার ঘটে। ফলে মানুষসহ  পরিবেশের অন্যান্য প্রাণীদেরও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পায়। অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত কিংবা অপব্যবহারের ফলেও জীবাণুসমূহ ক্রমাগত প্রতিরোধ বলয় সৃষ্টি করতে সক্ষম হয় এবং একপর্যায়ে অ্যান্টিবায়োটিকসমূহ ওই জীবাণুর বিরুদ্ধে অকার্যকর হয়ে পড়ে। অনেক সময় আমরা রোগের উপসর্গে উন্নতি হওয়া মাত্রই অ্যান্টিবায়োটিক  সেবন বন্ধ করে দেই, ফলে জীবাণুসমূহ সম্পূর্ণ ধ্বংসের পরিবর্তে রেজিস্ট্যান্স ক্ষমতা প্রাপ্ত হয় এবং ভবিষ্যতে একই অ্যান্টিবায়োটিক এসব জীবাণুর বিরুদ্ধে কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।

বাংলাদেশে এএমআর পরিস্থিতি ভয়াবহ। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ৬০-৭০ ভাগ প্রথম জেনারেশন অ্যান্টিবায়োটিক প্রায়ই অকার্যকর হয়ে পড়েছে। শিশু ও বৃদ্ধদের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ও অপপ্রয়োগ লক্ষ্যণীয়। সেফট্রিয়েক্সন, সিপ্রোফ্লক্সাসিন কিংবা এজিথ্রোমাইসিনের মতো অ্যান্টিবায়োটিকসমূহের ব্যবহার যত্রতত্র এবং অহরহ। অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময়ই পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয় না; এক রোগীর জন্য একই সময় একাধিক অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার এবং সাধারণ জ্বর, সর্দি-কাশি, ডায়রিয়া ইত্যাদিতে প্রায় ১০০ ভাগ ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োগ হয়ে থাকে। ৫০ শতাংশ রোগীই অ্যান্টিবায়োটিকের ডোজ সম্পূর্ণ শেষ করে না; ৩০-৪০ শতাংশ রোগী নিজস্ব উদ্যোগেই বিভিন্ন কারণে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করে থাকেন।  এছাড়া অধিকাংশ পোল্ট্রি ও গবাদিপশু খামারে প্রচুর পরিমাণ অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার হয়ে থাকে, ফলে রেজিস্ট্যান্স ক্ষমতাপ্রাপ্ত জীবাণুসমূহ খাবারের সাথে এবং পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে।

এন্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্বকে ভয়াবহ দিকে ধাবিত করছে। এ বিষয়ে সচেতন না হলে এবং নতুন ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক উদ্ভাবন না হলে বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে পড়বে। আমাদের অবশ্যই চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগে উদ্যোগী হতে হবে। ব্যাক্তিগতভাবে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সব স্বাস্থ্যবিধি যথা- হাত ধোয়া, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার ও পানীয় গ্রহণ, রোগ প্রতিরোধে টিকা গ্রহণ ইত্যাদি মেনে চলতে হবে। চিকিৎসা পেশার সাথে জড়িত সবাইকে যথাযথ পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে কিংবা রোগীর প্রয়োজনীয়তা নিরিখেই অ্যান্টিবায়োটিকের যথাযথ ব্যবহার, সংক্রমণ প্রতিরোধ ও এএমআরের ভয়াবহতা সম্পর্কে সাধারণদের সচেতন করে তুলতে হবে। ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও চিকিৎসা সংস্থাসমূহকে অ্যান্টিবায়োটিক লেখা ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রভাব খাটানো বন্ধ করতে হবে। নতুন জেনারেশনের অ্যান্টিবায়োটিক উদ্ভাবন ও উৎপাদনে বিনিয়োগ এবং গবেষণা কাজে উৎসাহ প্রদান করতে হবে। হাসপাতালসমূহকে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার, রেজিস্ট্যান্সের অপকারিতা বিষয়ে সবাইকে সচেতন করে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। কৃষি, পোল্ট্রি ও মৎস্য উৎপাদন ইত্যাদি ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে নীতিমালা মেনে চলতে হবে এবং সংশ্লিষ্টদের নজরদারি বাড়াতে হবে।

বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে গাইড লাইন সম্বলিত জাতীয় নীতিমালা রয়েছে। সম্প্রতি এন্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স প্রতিরোধে বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক পরিম-লে ৫ দফা প্রস্তাবনা পেশ করা হয়েছে। এর মধ্যে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক ভিত্তিতে এএমআর প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ এবং নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশসমূহে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান; নতুন জেনারেশন অ্যান্টিবায়োটিক উৎপাদনে প্রযুক্তির শেয়ার এবং দরিদ্র দেশসমূহে সহজলভ্য করা; ওষুধ উৎপাদন, ল্যাবরেটরি কার্যক্রমে উন্নয়ন ও জরিপ কর্মকা-ে নজরদারি জোরদারকরণ এবং সর্বোপরি এএমআর প্রতিরোধে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে সব দেশ ও অঞ্চলে সচেতনতা গড়ে তোলা উল্লেখ্য।

এন্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স একটি বৈশ্বিক সমস্যা। উন্নত দেশ থেকে শুরু করে নিম্নআয়ের দেশসমূহে এ বিপর্যয় প্রকট আকার ধারণ করেছে। বৈশ্বিক, আঞ্চলিক, জাতীয়, প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত উদ্যোগ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং অ্যান্টিবায়োটিকের যথাযথ ব্যবহার ও নতুন অ্যান্টিবায়োটিক উদ্ভাবনের প্রচেষ্টার মাধ্যমেই এ বিপর্যয় রোধ করা সম্ভব। 

[লেখক : সহকারী পরিচালক,

কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল]