জীবনানন্দের মতো

অরুণাংশু ভট্টাচার্য

কোনও এক বা একাধিক নারীর প্রতি জীবনানন্দের প্রেম ছিল কিনা, এই নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে যে বহুবার আলোচনা হয়েছে, এ কথা যেমন মিথ্যে নয়, তেমনিই এই বিষয়ে আমরা যে আদৌ কোনও সিদ্ধান্তে আসতে পারিনি, সেটাও সত্যি। তবুও আমাদের কথা এখনও শেষ হয়নি, আশা করি আরও বহুদিন চলবে এবং এই ব্যোমকেশগিরির সত্যানুসন্ধান যে আমাদের কোনও বাস্তব সত্যের সন্ধান দেবে না, এ কথা আমাদের চেয়ে ভাল করে আর কে-ই-বা জানে? তার মানে এই সম্পর্কে যা কিছু জানা-না জানার হক যে শুধু আমাদেরই- এমন মিথ্যে কথাওবা আবার বলি কী করে? আবার দেখুন, ‘আমাদের’ শব্দটি এই কারণে উল্লেখ করলাম যে, এই লেখাটি আমার নামে প্রকাশিত হলেও সমস্তের দাবিদার আমি নই। এর কিছুটা বন্ধুরা, কিছুটা আমার আর বেশি অংশটার দাবি করতে পারে কয়েকটি অপরূপ হরিণী। তারা না হলে বা আমাদের আলোচনার সময় এবং অসময়ে কোনও অতিবাস্তব তথ্য কেউ দিতে পারত না।

আমাদের চেয়ে কিছুটা দূরে একটি মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন। তাকে আমাদের মনে হচ্ছে জীবনানন্দ দাশের মতো। যিনি দাঁড়িয়ে আছেন, তিনি কুয়াশার ওপারে, আর এপারে আমরা। আমরা জীবনানন্দ বললাম বটে, কিন্তু তিনি যে জীবনানন্দই- এ কথা জোর দিয়েও বলতে পারছি না। কেননা, তাকে খুব যে ভাল চিনি, তা নয়। সেই জন্যই তো বলতে চাইলাম, জীবনানন্দের মতো। একবার বিশিষ্ট পণ্ডিত নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ির সঙ্গে এক আলোচনায় বলে ফেলেছিলাম ‘রাধাকৃষ্ণের প্রেম যেমন পরকীয়া-’ তিনি বাধা দিয়ে বলেছিলেন, ‘তোমাকে কে বলল রাধাকৃষ্ণের প্রেম পরকীয়া?’ -সর্বনাশ কী উত্তর দিই তখন? আমতা আমতা করে বলি,- সেরকমই তো পড়ে এসেছি ছোটবেলা থেকে। তিনি বললেন, ‘শোনো, রাধাকৃষ্ণের প্রেম মোটেও পরকীয়া ছিল না, ওটা ‘পরকীয়ার মতো’। তারপর তিনি বৈষ্ণবতত্ত্বের যে ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, তা শুনে বৈষ্ণবতত্ত্ব-সম্পর্কিত যাবতীয় পাঠ আমার কাছে এক ‘অর্থহীন আবেগ’ মনে হয়েছিল। তার কাছ থেকে ওঠার সময় তিনি একটা কথাই শুধু আমাকে বলেছিলেন, অনেক কিছুই আমরা আলোচনা করলাম, কিন্তু ওই ‘পরকীয়ার মতো’ ব্যাপারে কিছু বলা যাবে না। ওটা তোমাকে অনুভব করতে হবে। তা তুমি সারাজীবনে পারতে পারো, আবার না-ও পারো। তার অনেক বছর পরে আজ, এখন, কেন জানি না আমাদের মনে হয় জীবনানন্দ ঠিক জীবনানন্দ নন, ‘জীবনানন্দের মতো’। এটা আমাদের বর্তমান অনুভবে (কিছুকাল আগেও অন্যরকম মনে হতো) এই ‘পরকীয়ার মতো’র মতোই ব্যাখ্যার জিনিস নয় বলে বোধ হতে থাকে।

তিনি নাকি এখনও নির্জনতম কবি। একথা এখনও, এই মুহূর্তেও বলা হতে থাকে নির্দ্বিধায়। কেসটা কেমন রে ভাই? সত্যি বলতে কী, শুধু নির্জন নয়, নির্জনতম কবি বলতে যে কী বোঝায়, তা কলেজ ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময়ও বুঝতে পারিনি, আজও আমাদের পক্ষে তা বোঝা সম্ভব হয়নি। জীবনানন্দ তাঁর সময়ের চেয়ে অনেক-অনেকখানি এগিয়ে ছিলেন বলে তাঁকে তাঁর সমকাল যে বুঝতে পারেনি, সেটা বহুদিন আগেই জলের মতো পরিষ্কার এবং তাঁর মৃত্যুর পরও বহুদিন যে তাঁকে বোঝার চেষ্টাও তেমন হয়নি, এ কথাটাইবা কে না জানে? তো, ওইখানেই আটকে থেকে যদি আজও তাঁকে ওই ‘নির্জনতম কবি’-র চেয়ে বেশি কিছু ভেবে উঠতে না পারি, তবে সেই অর্বাচীনতার দায় আমাদের।

সেদিক দিয়ে সত্যি কথা বলতে কী জীবনানন্দকে আমরা এখনও বুঝে উঠতে পারিনি। এর জন্য তাঁকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। জীবনানন্দের মতো একজন কবিকে বুঝে উঠতে গেলে বাংলার শিকড়কে যতখানি অনুভব করা এবং এক দূরদর্শী প্রজ্ঞার দরকার, তা আমাদের এখনও নেই। এটা অনেকে বুঝতে পেরেছেন, কিন্তু জীবনানন্দকে বুঝতে গেলে যেখানে কোয়ান্টাম মেকানিক্স-এর প্রয়োজন, তা এই তত্ত্ব আবিষ্কারের আগে জানা সম্ভব ছিল না। বিশ শতকের শুরুতে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ওল্ড কোয়ান্টাম থিওরির ধারণা এনেছিলেন। পরবর্তীকালে আরউইন শ্রোয়েডিংগার, নীলস বোর, ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ, পল ডিরাক, ভন নিউমান প্রমুখ এই তত্ত্বের নানা ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। এর সময় ছিল মোটামুটি বিশ শতকের শুরু থেকে প্রায় মাঝামাঝি পর্যন্ত। এ সমসময়েই বা তার কিছু পরে অর্থাৎ চল্লিশের দশকে জীবনানন্দ লেখেন ‘মহাপৃথিবী’ বা ‘সাতটি তারার তিমির’ পর্যায়ের কবিতা। জীবনানন্দের মৃত্যুর অনেক পরে আমরা জেনেছি, তিনি বিদেশ থেকে অনেক বই আনিয়ে পড়তেন। তার মধ্যে সেই সময়কার সদ্য প্রকাশিত ইংরাজি বই যেমন থাকত, তেমনই থাকত বিজ্ঞানসহ নানা বিষয়ের বই। তার মধ্যে কোয়ান্টাম থিওরি বিষয়ক বইও ছিল। তখনও এটি বিতর্কিত বিষয় যেমন ছিল, এখনও তেমন। থিওরি বলছে, কোয়ান্টাম মেকনিক এমনই এই দুরূহ ব্যাপার যে, একে বিশ্বাস করতে গেলে কার্যকারণরহিত সমস্ত ক্রিয়াকেই বিশ্বাস করতে হয়। যেমন- কোয়ান্টাম মেকানিকস আদতে একটা অবিশ্বাস থিওরি- যা আগে ব্যাখ্যা করা যায়নি। তা এমন সব জিনিসকেই ব্যাখ্যা। করতে পারে, ‘অ্যাটমের স্থিরতা থেকে শুরু করে সবই। কিন্তু আপনি যদি কোয়ান্টাম মেকানিকসের আশ্চর্যকে বিশ্বাস করেন (ম্যাঙ্গো বিশ্বের প্রেক্ষিতে) আপনাকে আইনস্টাইন কথিত দেশকালের ধারণাটাই পরিত্যাগ করতে হবে। সবচেয়ে অদ্ভুত হচ্ছে সেক্ষেত্রে এর কোন অর্থই হয় না। যদি নিয়মকানুন মেনে চলেন, তাহলে দেখবেন এমন একটা জায়গায় এসে পড়েছেন, যেটা মোটেও ঠিক নয়। কোয়ান্টাম মেকানিকসে কোনও একটি বস্তু একই সঙ্গে নানা অবস্থায় অবস্থান করতে পারে। এটা শুনতে একদম পাগলামো মনে হয়। পৃথিবীর কোয়ান্টাম বিবরণ আমাদের অনুভবেদ্য পৃথিবীর

একেবারে বিপরীত। কারণটা খুব সহজ। কোয়ান্টাম মেকানিকসের অংকের দুটো অংশ আছে। একটা হচ্ছে কোয়ান্টাম প্রথার উদ্ভাবন (evolution), যেটা শ্রোয়েডিংগারের সমীকরণ দিয়ে একেবারে নিখুঁত ও সুচারুভাবে বর্ণিত। কোয়ান্টাম প্রথা জানাচ্ছে যে, যদি বস্তুটির এখনকার চরিত্র আপনি জানতে পারেন তাহলে দশ মিনিট পরে সেটা কেমন থাকবে, সেটা আপনি হিসাব করে বলতে পারবেন। কিন্তু কোয়ান্টাম মেকানিকসের একটা দ্বিতীয় অংশ আছে, সেটা কোনও কিছুকে পরিমাপের সময় ঘটে। তখন আপনি একটা উত্তর পাবেন না এবং একটা উত্তর না পেয়ে, আপনি সমীকরণের কাছ থেকে অনেকগুলো অবস্থার সম্ভাবনার কথা জানতে পারবেন। ফলাফল আপনাকে কখনওই বলবে না যে, বিশ্বের নিয়ম এটাই, বিশ্ব এটাই বলছে। বরং এই ফলাফল কোনও একটি অবস্থার সম্ভাবনার কথা বর্ণনা করবে। সমীকরণের কাজ হচ্ছে একেবারে সম্পূর্ণ (deterministric), ভাবে বর্ণনা করা, কিন্তু এটা তা করে না। অন্যদের মতোই শ্রোয়েডিংগারও এ বিষয়ে অবহিত ছিলেন। তিনি তার সেই অস্তিত্বহীন (hypothetical) বেড়ালের কথা বলতেন। তার কথায়, ‘যদি আপনি আমার সমীকরণ যা বলে, তা বিশ্বাস করেন তাহলে বিড়ালটি একই সঙ্গে জীবিত ও মৃত অবস্থায় অবস্থান করছে, এটাও বিশ্বাস করতে হবে।’ তার মানে ক্রমে এমন একটা জায়গায় এসে দাঁড়াতে হচ্ছে যেটা আসলে পাড়ানোর জায়গাই নয়। (এ প্রসঙ্গে ওয়ার্নার হাইজেনবার্গের Physics and Philosophy : The Revolution in Modern science গ্রন্থটি পড়লে আরও ভাল বোঝা যাবে)। জীবনানন্দের ক্ষেত্রে এইখানেই কিন্তু ওই অবিশ্বাস্য (এখানে ভারতে হবে সত্যতর) ব্যাপারটাই প্রধান হয়ে উঠছে, যা আসলে অনিবার্য বিশ্বাস। এই অনুভূতির কথাই জীবনানন্দ তার কবিতায়, উপন্যাসে, গল্পে একদিক দিয়ে বোঝাতে চেয়েছেন। যার পরাবাস্তবিক আবহ বুঝতে গেলে অনেক কিছুর মতো কোয়ান্টাম মেকানিসও অন্যতম উপায়। ধান ভানতে এই শিবের গীতটি জে গাওয়া হলো, আশা করি এখনও বোঝা যায়নি।

কোথায়ইবা জীবনানন্দের নারীরা বা কোথায়ইবা তাদের প্রেম- জীবনানন্দ তাঁর কবিতার নারীদের, অর্থাৎ বনলতা থেকে শুরু করে মৃণালিনী, শেফালিকা, সুরঞ্জনা, সুদর্শনা, শ্যামলী, সুচেতনা, শঙ্খমালা কিংবা সবিতা, অথবা গদ্যের নারীরা যেমন রমা, বনচ্ছায়া, সুলেখা, জুলেখা, শচী কল্যাণী, সুশীলা, সুস্মিতা- নামগুলি আমাদের কারও অচেনা নয়। এরা সকলেই এককথায় জীবনানন্দের চরিত্র। বাস্তব ভাবলে ভাবা যেতেই পারে। আর যদি না ভাবেন, তাহলে বাস্তবের মতো ভাবতে হয়। বনলতা বলে সত্যিই বাস্তবে তার কোনও প্রেমিকা ছিল কি না, এটা জীবনানন্দের মতো কাউকে বোঝার কোনও সূত্র নয়। কিংবা তার স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক কতটা খারাপ ছিল- এসব ভেবে বরং তাকে অনুভব করতে চাওয়ার পরিবহ আরও অস্পষ্ট হয়ে যায়। কবিতা বা গদ্যের নায়িকা বা চরিত্র হতে গেলে যে সমস্ত সহজগ্রাহ্য কারণ থাকা দরকার, তা জীবনানন্দের চেতনায় একটা বিপ্রতীপ সমাচারের মতো ছিল। হয়তো এই ব্যাখ্যাও তেমন প্রযুক্ত নয়, কিন্তু বাংলা উপন্যাস-গল্পের চিরাচরিত ফ্ল্যাট ক্যারেকটারের ডাইমেনশন দিয়ে জীবনানন্দকে বোঝার চেষ্টা যে করা উচিত নয়, তা অল্পবিস্তর সকলেই জানেন বলে মনে হয়। এই প্রসঙ্গে বনলতা সেন সম্পর্কে জীবনানন্দের অনুভবটি কেমন ছিল, একটু জেনে নিই- “কিশোরবেলায় যে কালো মেয়েটিকে ভালোবেসেছিলাম কোনো এক বসন্তের ভোরে, বিশ বছর আগে যে আমাদেরই নিকটবর্তিনী ছিল, বহুদিন যাকে হারিয়েছি- ... নক্ষত্রমাখা রাত্রির কালদিঘির জলে চিতল হরিণীর প্রতিবিম্বের মতো রূপ তার প্রিয় পরিত্যক্ত মৌনমুখী মেরীর মতো অপরূপ রূপ। মিষ্টি, ক্লান্ত অশ্রুমাখা চোখ, নগ্নশীতল নিরাবরণ দুখানা হাত ম্লান ঠোঁট। পৃথিবীর নবীন জীবন ও নরলোকের হাতে প্রেম বিচ্ছেদ ও বেদনার সেই পুরনো পল্লীর দিনগুলো সমর্পণ করে কোন দূর নিঃস্বাদ নিঃসূর্য অভিমানহীন মৃত্যুর উদ্দেশে তার যাত্রা। সেই বনলতা- আমাদের পাশের বাড়িতে থাকত সে। ...কত শীতের ভোরের কুয়াশা ও রোদের সঙ্গে জড়িত সেই খড়ের ঘরখানাও নেই তাদের আজ; বছর পনেরো আগে দেখেছি মানুষজন নেই, থমথমে দৃশ্য, লেবুফুল ফোটে, ঝরে যায়, হোগলার বেড়াগুলো উঁইয়ে খেয়ে ফেলেছে। চালের উপর হেমন্তের বিকেলে শালিক আর দাঁড়কাক এসে উদ্দেশ্যহীন কলরব করে। গভীর রাতে জ্যোৎস্নার লক্ষ্মীপেঁচা ঝুপ করে উড়ে আসে। খানিকটা খড় আর ধুলো ছড়িয়ে যায়। উঠানের ধূসর মুখ জ্যোৎস্নার ভিতর দু-তিন মুহূর্ত ছটফট করে। তারপরেই বনধুঁধুল, মাকাল, বৈচি ও হাতিশুঁড়ার অবগুণ্ঠনের ভিতর নিজেকে হারিয়ে ফেলে। বছর আষ্টেক আগে বনলতা একবার এসেছিল। দক্ষিণের ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে চালের বাতায় হাত দিয়ে মা ও পিসিমার সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বললে সে। তারপর আঁচলে ঠোঁট ঢেকে আমার ঘরের দিকেই আসছিল। কিন্তু কেন যেন অন্যমনস্ক নতমুখে মাঝপথে থেমে গেল। তারপর খিড়কির পুকুরের কিনারা দিয়ে, শামুক গুগলি পায়ে মাড়িয়ে, বাঁশের জঙ্গলের ছায়ার ভিতর দিয়ে চলে গেল সে। নিবিড় জামরুল গাছটার নিচে একবার দাঁড়াল, তারপর পৌষের অন্ধকারের ভিতর অদৃশ্য হয়ে গেল।’

এর সঙ্গে আমরা জীবনানন্দের এই পঙ্ক্তি ক’টিও লক্ষ্য করতে পারি- ‘কত পূর্বজাতকের পিতামহ পিতা/ সর্বনাশ-ব্যসন-ব্যসনা / কত মৃত গোখুরার ফণা / কত তিথি, কত যে অতিথি / কত শত যৌনচক্র স্মৃতি / করেছিল উতলা আমারে’

একজন কবি, মানে জীবনানন্দের একজন প্রেমিকা ছিল- তার সঙ্গে শেষপর্যন্ত মিল হয়নি, বা সাদা কথায় তাকে তিনি নিজের করে জীবনে পাননি- উপরের এই বক্তব্যে এটা একেবারেই পরিষ্কার। বিশ্বের বেশ কয়েক কোটি মানুষের ক্ষেত্রে এটা হয়েছে। অতএব জীবনানন্দের প্রেম নিয়ে এতদিন পরে নতুন করে বলার আছেটা কী? কোনও দিনই কি কিছু ছিল? কেননা, জীবনানন্দের এই কথাকে মূল ভিত্তি করে অনেক আলোচকই বনলতা সেন যে কবির প্রেমিকা ছিল- এ নিয়ে আর দ্বিতীয়বার ভাবতে চাননি। মজার কথা হলো জীবনানন্দের এই স্বীকারোক্তিতেই যদি সমস্যাটা মিটে যেত, অর্থাৎ, এ-নিয়ে আর রহস্য থাকত না, তাহলে প্রেমের ইতিহাস তো দূরের কথা, তাঁর কবিতা কোনও দিন পাঠযোগ্যও হতো কিনা সন্দেহ। বিশ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া প্রেমিকের স্মৃতি রোমন্থন করছেন কবি- এটা দিয়ে জীবনানন্দের নারীকে বা কবিতাকে আস্বাদ করা যায়? অনুভব করা যায় তাঁর কবিতাকে? এই সাধারণ ঘটনাটির ঐতিহাসিকতার থেকেও বনলতা সেন নামে ওই ‘অপরূপ হরিণী’-র দ্যোতনা যে অনেক বেশি, এটুকুও যদি এখনও আমরা না-বুঝতে পারি, তাহলে জীবনানন্দ পড়া ব্যর্থ হয়েছে বলতে হবে। পাঠকের কী মনে হয়, ‘কারুবাসনা’ আদৌ কোনও বাংলা উপন্যাস? অন্তত সেই সময়ের প্রেক্ষিতে? বনলতা সেন শুধুই একটি মেয়ে, যাকে জীবনানন্দ বিয়ে করতে পারেননি? ব্যস। হয়ে গেল জীবনানন্দের প্রেমের রহস্যভেদ। আমাদের কখনও মনে হচ্ছে না বনলতা সেন কি বনলতা সেন, না বনলতা সেনের মতো। একে মনে করুন না ওই কোয়ান্টাম মেকানিকস-এর মতো অনুভবেদ্য পৃথিবীর বিপরীত অবস্থানের মতো। জীবনানন্দের ক্ষেত্রে যা কেবল শুধু কোনও তন্ত্রের ধারণা নয়, রক্তমাংসের জীবনও যেখানে সমানে ক্রিয়াশীল।

শুধু বনলতা সেনই নয়, সাধারণভাবে জীবনানন্দের যদি চরিত্রগুলিকে লক্ষ করেন, তাহলে প্রথমত, দেখতে পাবেন বা মনে হবে, এই তো আমাদের আশপাশের লোকজনই এরা। নতুনত্ব যে বিশেষ কিছু আছে, তা তো মনে হচ্ছে না। এদের পরিণতি কী তা বুঝতেও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। শরৎচন্দ্রের নারীরা যেমন ছিল। ঘটনা বা চরিত্রের প্রয়োজনে নায়ক-নায়িকার দূরত্ব হঠাৎই কমে আসত নায়কের কোনও দুর্ঘটনাকে ভিত্তি করে। জীবনানন্দের ক্ষেত্রে সে-রকম যে হতেই হবে, এমন তো নয়। আবার যেন তারা সেরকম হয়েও অন্য কিছু। এই ‘অন্যকিছু’-টা আর ব্যাখ্যা করার গভীর দায় বাংলা ভাষার সমালোচকরা তেমনভাবে নেননি। তা জীবনানন্দের মৃত্যুর অনেককাল পরেও নয়। আসলে বাংলা সাহিত্যের সমালোচনা চিরকালই হয়ে এসেছে একটা নির্দিষ্ট ফরমুলাকে ভিত্তি করে। তার বাইরে গিয়ে যে অন্য কিছু ভাবা যায়, তা তখনকার কেন, তারও অনেক পরের আলোচকরাও ভাবেননি, ভাবতে পারেননি। গোটা পৃথিবীর বিজ্ঞান যেভাবে এগিয়েছে, যেভাবে একটা আবিষ্কারকে নস্যাৎ করে দিচ্ছে আর-একটা আবিষ্কার, বিশ্বযুদ্ধ ও রাজনীতি যেভাবে পাল্টে দিয়েছে বিশ্বের সমগ্র পরিবেশ, চিত্রকলায় বিভিন্ন ইজম যে রকম করে আমূল পরিবর্তন এনেছে বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতির, গদ্যে মরিস ব্লাঙ্কো কিংবা ক্লদ সিমো নয়, ব্যাখ্যা দিচ্ছেন নুভো রোমো আন্দোলনে মধ্য দিয়ে, আর কবিতার ক্ষেত্রে জীবনানন্দেরও বহু আগে যার সূচনা করে গিয়েছে স্তেফান মালার্মে। তৎকালীন বাঙালি লেখকরা এঁদের পড়লেও সেসব অনুভব করতে তাদের চেতনার আরোহিণী শক্তি ছিল না। জীবনানন্দের মধ্যেও তা ছিল, ফলত তার লেখা ভিন্ন, ভিন্নতর এক এবং একাধিক মাত্রা নিয়ে উদ্ভাসিত হতে অনেক সময় লেগেছে এবং এখনও লাগছে। এবার একটু উদাহরণ সহকারে দেখুন। জীবনানন্দের চরিত্রদের চরিত্র একদিক দিয়ে জানতে বা বুঝতে কোনও অসুবিধা হচ্ছে না। যেমন তাঁর কবিতা বা গদ্য থেকে দু-একটি পঙ্ক্তি লিপিবদ্ধ করলে হয়তো বিষয়টা একটু স্পষ্ট হবে।

১) সুরঞ্জনা, অইখানে যেয়োনাকো তুমি

২) থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন

৩) মনে পড়ে পাড়াগাঁর কবেকার অরুণিমা সান্যালের মুখ

৪) কলকাতা একদিন কল্লোলিনী তিলোত্তমা হবে

এই নারীদের মনে হবে সবসময়েই পাঠকদের চেনা। বাংলা বা যে কোনও কবিতার মধ্যেই এ জাতীয় নারীদের খুঁজে পাওয়া যাবে। এর পাশাপাশি এই পঙ্ক্তিগুলো লক্ষ্য করি-

১) করুণ শঙ্খের মতো- দুধে আর্দ্র-কবেকার শঙ্খিনীমালার

২) বিলুপ্ত ধূসর কোন পৃথিবীর শেফালিকা

৩) প্রথম গার্গীর মতো- জানকীর মতো হয়ে ক্রমে অবশেষে বনলতা সেন হয়ে আসে।

৪) তুমি সেই অপরূপ সিন্ধু, রাত্রি- মৃতদের রোল

এই পঙ্ক্তিগুলো কি খুব চেনা বা স্পষ্ট মনে হচ্ছে আমাদের? কিংবা এই নারীরা কি একেবারে আমাদের চারপাশে আছে, এমন মনে হয়?

পাশাপাশি জীবনানন্দের গদ্য লক্ষ্য করুন-

১) সুস্মিতা হাসতে হাসতে অন্ধ হয়ে পড়ছিল যেন- না, সন্ধ্যার অন্ধকার হয়ে গেল।

২) অনেক দিন পরে আজ সে আবার এলো, মনোপবনের নৌকোয় চড়ে, নীলাম্বরী শাড়ি পরে, চিকন চুল ঝাড়তে ঝাড়তে আবার সে এসে দাঁড়িয়েছে, মিষ্টি অশ্রুমাখা চোখ, ঠাণ্ডা, নির্জন, দু’খানা হাত, ম্লান ঠোঁট, শাড়ির ম্লানিমা। সময় থেকে সময়ান্তর, নিরবচ্ছিন্ন, হায় প্রকৃতি, অন্ধকারে তার যাত্রা-

৩) ...চৌকাঠের সঙ্গে দড়ি ঝুলিয়ে কিংবা বিষ খেয়ে যে মরণ, সে রকম মৃত্যু নয়, আউটরাম ঘাটে বেড়াতে গিয়ে সন্ধ্যার সোনালি মেঘের ভিতর অদৃশ্য হয়ে যেতে ইচ্ছে করে, মনে হয় আর যেন পৃথিবীতে ফিরে না-আসি

এই রকম গদ্য কি তখনকার আর-পাঁচজন বাঙালি লেখক হামেশাই লিখতেন? এই জাতীয় গদ্যভাষা জীবনানন্দ ঠিক কীভাবে আয়ত্ত করেছিলেন। তার কনটেন্ট বা অনুভবের কথা তো ছেড়েই দিলাম। একটু অন্যভাবে এর উত্তর খুঁজতে চেষ্টা করি। একসময় মনো (monod) মতো জীবনবিজ্ঞানীদের কেউ কেউ জানিয়েছিলেন যে, বিশ্বে মানুষের সৃষ্টি একটা দুর্ঘটনা ছাড়া কিছু নয়। আর, মহাবিশ্বও এ সম্পর্কে যথেষ্ট উদাসীন। পরবর্তীকালে ইলিয়া প্রিগোজিন-এর মতো রসায়নবিদ সেই ধারণাকে নস্যাৎ করে দিয়ে বলতে চেয়েছিলেন বস্তুর নিজের মধ্যে একটি সেলফ অরগ্যানাইজিং ক্যাপাসিটি আছে। যাকে আত্মসংগঠনের শক্তি বলা যায়। মানে, তার মধ্যে একটা যোগাযোগ করার ক্ষমতা অবশ্যই বর্তমান। অথচ আবার দেখুন, কোয়ান্টাম মেথড সাধারণভাবে কোনও স্থিত নিয়ন্ত্রণের কথা বলে না। একে সমর্থন করেছিলেন ভন নয়মান। আবার ডেভিড বম ব্যাপারটিকে তেমন মানতে চাননি। এর মধ্যে কোনটা মান্য আর কোনটা ত্যাজ্য, তা নিয়ে তর্ক চলতেই পারে কিন্তু সৃষ্টি রহস্যের যেমন তল নেই তেমনই লেখকের সৃষ্টিও অতল এক ইঙ্গিতের কথা বলে। যার সঙ্গে কোয়ান্টাম মেথড না মিললেও কোয়ান্টাম অবশ্যই প্রয়োজন। আমাদের ধারণা, কোয়ান্টাম থিওরির সঙ্গে পরিচিত ছিলেন জীবনানন্দ। সুররিয়াল-এর অনুভব আর ওই অপরূপ হরিণীর ধারণা এরকমই কোনও উৎস থেকে জাত বলে ক্রমেই আমাদের মধ্যে বিশ্বাসের বিন্দু জমতে থাকে। আমরা জীবনানন্দকে আরও পাঠ করতে থাকি, আর, আমাদের জিন, ব্লাডগ্রুপ পাল্টে যেতে থাকে ক্রমশই।

শুধু তার নারী চরিত্রগুলিই নয়, সমস্ত চরিত্রই একটা সময় যে অবস্থায় থাকে, পরবর্তী মুহূর্তেই তাদের অবস্থান বদল হয়। সেই অবস্থান কেমন, তার অনেকগুলো সম্ভাবনা থাকে বা থেকে যায়। মানে কোয়ান্টাম মেকানিকসের দ্বিতীয় সম্ভাবনার মতো। একটা ছোট্ট উদাহরণ লক্ষ্য করুন-

জীবনানন্দের একটি কবিতার পঙ্ক্তি- ‘মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য’। এটি পড়লে প্রত্যেকেরই নিশ্চিতভাবে মনে পড়ে যাবে ঐতিহাসিক শ্রাবস্তী নগরীর নানা ভাস্কর্যের কথা। অর্থাৎ, কোনও নারীর মুখে সেই ভাস্কর্যের ছায়া যেন। কিন্তু শ্রাবস্তর অর্থ যখন ‘ব্রণ’ হয়? চিত্রকল্প কী আমূল পালটে যাচ্ছে, লক্ষ্য করুন। ব্রণ-কণ্টকিত একটি মুখ- সেটিকে ভাবা হচ্ছে কারুকার্যের মতো। এই অবস্থান বদলকে কবিতার চলতি ফরমুলা নিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব? যেখানে আসল শ্রাবস্ত কোনটা? নগরী না ব্রণ? কিংবা একসঙ্গে দুটোই? পাঠকের হয়তো মনে পড়বে শ্রোয়েডিংগারের বেড়ালের কনসেপ্ট। যে-বেড়ালটি একই সঙ্গে জীবিত ও মৃত।

রসায়ন, গোত্রপরিচয়

এই হিমে

সে সমস্ত নীল প্যারাডাইম যেন পুরনো পিপাসার মতো

গূঢ়

কেউ কি জানে শ্রাবস্তী অর্থে মুখমণ্ডলব্যাপী ব্রণ

যার কারুকাজ এই জিমন্যাসিয়ামে

তবুও প্রশ্ন রেখে যাওয়া উচিত। জীবনানন্দ কি জীবনানন্দের মতো? ঠিক জীবনানন্দ নয়? তার প্রেম বা প্রেমিকারা? তারাও কি প্রেমের মতো বা প্রেমিকার মতো। সত্যি বলতে কি, আমাদের কাছে এখনও এর উত্তর নেই ঠিকমতো। তার বদলে জীবনানন্দের এই পঙ্ক্তি ক’টি আমরা অনুধাবনের চেষ্টা করি-

‘অনেক কমলা রঙের রোদ ছিলো,

অনেক কাকাতুয়া পায়রা ছিলো,

মেহগনির ছায়াঘন পল্লব ছিলো অনেক

অনেক কমলা রঙের রোদ ছিলো,

অনেক কমলা রঙের রোদ;

আর তুমি ছিলে;

তোমার মুখের রূপ কতো শত শতাব্দী আমি দেখি না,

খুঁজি না।’

বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২০ , ৬ কার্তিক ১৪২৭, ৪ রবিউল ‍আউয়াল ১৪৪২

জীবনানন্দের মতো

অরুণাংশু ভট্টাচার্য

image

জীবনানন্দ দাশ / জন্ম : ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৮৯৯; মৃত্যু : ২২ অক্টোবর ১৯৫৪

কোনও এক বা একাধিক নারীর প্রতি জীবনানন্দের প্রেম ছিল কিনা, এই নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে যে বহুবার আলোচনা হয়েছে, এ কথা যেমন মিথ্যে নয়, তেমনিই এই বিষয়ে আমরা যে আদৌ কোনও সিদ্ধান্তে আসতে পারিনি, সেটাও সত্যি। তবুও আমাদের কথা এখনও শেষ হয়নি, আশা করি আরও বহুদিন চলবে এবং এই ব্যোমকেশগিরির সত্যানুসন্ধান যে আমাদের কোনও বাস্তব সত্যের সন্ধান দেবে না, এ কথা আমাদের চেয়ে ভাল করে আর কে-ই-বা জানে? তার মানে এই সম্পর্কে যা কিছু জানা-না জানার হক যে শুধু আমাদেরই- এমন মিথ্যে কথাওবা আবার বলি কী করে? আবার দেখুন, ‘আমাদের’ শব্দটি এই কারণে উল্লেখ করলাম যে, এই লেখাটি আমার নামে প্রকাশিত হলেও সমস্তের দাবিদার আমি নই। এর কিছুটা বন্ধুরা, কিছুটা আমার আর বেশি অংশটার দাবি করতে পারে কয়েকটি অপরূপ হরিণী। তারা না হলে বা আমাদের আলোচনার সময় এবং অসময়ে কোনও অতিবাস্তব তথ্য কেউ দিতে পারত না।

আমাদের চেয়ে কিছুটা দূরে একটি মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন। তাকে আমাদের মনে হচ্ছে জীবনানন্দ দাশের মতো। যিনি দাঁড়িয়ে আছেন, তিনি কুয়াশার ওপারে, আর এপারে আমরা। আমরা জীবনানন্দ বললাম বটে, কিন্তু তিনি যে জীবনানন্দই- এ কথা জোর দিয়েও বলতে পারছি না। কেননা, তাকে খুব যে ভাল চিনি, তা নয়। সেই জন্যই তো বলতে চাইলাম, জীবনানন্দের মতো। একবার বিশিষ্ট পণ্ডিত নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ির সঙ্গে এক আলোচনায় বলে ফেলেছিলাম ‘রাধাকৃষ্ণের প্রেম যেমন পরকীয়া-’ তিনি বাধা দিয়ে বলেছিলেন, ‘তোমাকে কে বলল রাধাকৃষ্ণের প্রেম পরকীয়া?’ -সর্বনাশ কী উত্তর দিই তখন? আমতা আমতা করে বলি,- সেরকমই তো পড়ে এসেছি ছোটবেলা থেকে। তিনি বললেন, ‘শোনো, রাধাকৃষ্ণের প্রেম মোটেও পরকীয়া ছিল না, ওটা ‘পরকীয়ার মতো’। তারপর তিনি বৈষ্ণবতত্ত্বের যে ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, তা শুনে বৈষ্ণবতত্ত্ব-সম্পর্কিত যাবতীয় পাঠ আমার কাছে এক ‘অর্থহীন আবেগ’ মনে হয়েছিল। তার কাছ থেকে ওঠার সময় তিনি একটা কথাই শুধু আমাকে বলেছিলেন, অনেক কিছুই আমরা আলোচনা করলাম, কিন্তু ওই ‘পরকীয়ার মতো’ ব্যাপারে কিছু বলা যাবে না। ওটা তোমাকে অনুভব করতে হবে। তা তুমি সারাজীবনে পারতে পারো, আবার না-ও পারো। তার অনেক বছর পরে আজ, এখন, কেন জানি না আমাদের মনে হয় জীবনানন্দ ঠিক জীবনানন্দ নন, ‘জীবনানন্দের মতো’। এটা আমাদের বর্তমান অনুভবে (কিছুকাল আগেও অন্যরকম মনে হতো) এই ‘পরকীয়ার মতো’র মতোই ব্যাখ্যার জিনিস নয় বলে বোধ হতে থাকে।

তিনি নাকি এখনও নির্জনতম কবি। একথা এখনও, এই মুহূর্তেও বলা হতে থাকে নির্দ্বিধায়। কেসটা কেমন রে ভাই? সত্যি বলতে কী, শুধু নির্জন নয়, নির্জনতম কবি বলতে যে কী বোঝায়, তা কলেজ ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময়ও বুঝতে পারিনি, আজও আমাদের পক্ষে তা বোঝা সম্ভব হয়নি। জীবনানন্দ তাঁর সময়ের চেয়ে অনেক-অনেকখানি এগিয়ে ছিলেন বলে তাঁকে তাঁর সমকাল যে বুঝতে পারেনি, সেটা বহুদিন আগেই জলের মতো পরিষ্কার এবং তাঁর মৃত্যুর পরও বহুদিন যে তাঁকে বোঝার চেষ্টাও তেমন হয়নি, এ কথাটাইবা কে না জানে? তো, ওইখানেই আটকে থেকে যদি আজও তাঁকে ওই ‘নির্জনতম কবি’-র চেয়ে বেশি কিছু ভেবে উঠতে না পারি, তবে সেই অর্বাচীনতার দায় আমাদের।

সেদিক দিয়ে সত্যি কথা বলতে কী জীবনানন্দকে আমরা এখনও বুঝে উঠতে পারিনি। এর জন্য তাঁকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। জীবনানন্দের মতো একজন কবিকে বুঝে উঠতে গেলে বাংলার শিকড়কে যতখানি অনুভব করা এবং এক দূরদর্শী প্রজ্ঞার দরকার, তা আমাদের এখনও নেই। এটা অনেকে বুঝতে পেরেছেন, কিন্তু জীবনানন্দকে বুঝতে গেলে যেখানে কোয়ান্টাম মেকানিক্স-এর প্রয়োজন, তা এই তত্ত্ব আবিষ্কারের আগে জানা সম্ভব ছিল না। বিশ শতকের শুরুতে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ওল্ড কোয়ান্টাম থিওরির ধারণা এনেছিলেন। পরবর্তীকালে আরউইন শ্রোয়েডিংগার, নীলস বোর, ওয়ার্নার হাইজেনবার্গ, পল ডিরাক, ভন নিউমান প্রমুখ এই তত্ত্বের নানা ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। এর সময় ছিল মোটামুটি বিশ শতকের শুরু থেকে প্রায় মাঝামাঝি পর্যন্ত। এ সমসময়েই বা তার কিছু পরে অর্থাৎ চল্লিশের দশকে জীবনানন্দ লেখেন ‘মহাপৃথিবী’ বা ‘সাতটি তারার তিমির’ পর্যায়ের কবিতা। জীবনানন্দের মৃত্যুর অনেক পরে আমরা জেনেছি, তিনি বিদেশ থেকে অনেক বই আনিয়ে পড়তেন। তার মধ্যে সেই সময়কার সদ্য প্রকাশিত ইংরাজি বই যেমন থাকত, তেমনই থাকত বিজ্ঞানসহ নানা বিষয়ের বই। তার মধ্যে কোয়ান্টাম থিওরি বিষয়ক বইও ছিল। তখনও এটি বিতর্কিত বিষয় যেমন ছিল, এখনও তেমন। থিওরি বলছে, কোয়ান্টাম মেকনিক এমনই এই দুরূহ ব্যাপার যে, একে বিশ্বাস করতে গেলে কার্যকারণরহিত সমস্ত ক্রিয়াকেই বিশ্বাস করতে হয়। যেমন- কোয়ান্টাম মেকানিকস আদতে একটা অবিশ্বাস থিওরি- যা আগে ব্যাখ্যা করা যায়নি। তা এমন সব জিনিসকেই ব্যাখ্যা। করতে পারে, ‘অ্যাটমের স্থিরতা থেকে শুরু করে সবই। কিন্তু আপনি যদি কোয়ান্টাম মেকানিকসের আশ্চর্যকে বিশ্বাস করেন (ম্যাঙ্গো বিশ্বের প্রেক্ষিতে) আপনাকে আইনস্টাইন কথিত দেশকালের ধারণাটাই পরিত্যাগ করতে হবে। সবচেয়ে অদ্ভুত হচ্ছে সেক্ষেত্রে এর কোন অর্থই হয় না। যদি নিয়মকানুন মেনে চলেন, তাহলে দেখবেন এমন একটা জায়গায় এসে পড়েছেন, যেটা মোটেও ঠিক নয়। কোয়ান্টাম মেকানিকসে কোনও একটি বস্তু একই সঙ্গে নানা অবস্থায় অবস্থান করতে পারে। এটা শুনতে একদম পাগলামো মনে হয়। পৃথিবীর কোয়ান্টাম বিবরণ আমাদের অনুভবেদ্য পৃথিবীর

একেবারে বিপরীত। কারণটা খুব সহজ। কোয়ান্টাম মেকানিকসের অংকের দুটো অংশ আছে। একটা হচ্ছে কোয়ান্টাম প্রথার উদ্ভাবন (evolution), যেটা শ্রোয়েডিংগারের সমীকরণ দিয়ে একেবারে নিখুঁত ও সুচারুভাবে বর্ণিত। কোয়ান্টাম প্রথা জানাচ্ছে যে, যদি বস্তুটির এখনকার চরিত্র আপনি জানতে পারেন তাহলে দশ মিনিট পরে সেটা কেমন থাকবে, সেটা আপনি হিসাব করে বলতে পারবেন। কিন্তু কোয়ান্টাম মেকানিকসের একটা দ্বিতীয় অংশ আছে, সেটা কোনও কিছুকে পরিমাপের সময় ঘটে। তখন আপনি একটা উত্তর পাবেন না এবং একটা উত্তর না পেয়ে, আপনি সমীকরণের কাছ থেকে অনেকগুলো অবস্থার সম্ভাবনার কথা জানতে পারবেন। ফলাফল আপনাকে কখনওই বলবে না যে, বিশ্বের নিয়ম এটাই, বিশ্ব এটাই বলছে। বরং এই ফলাফল কোনও একটি অবস্থার সম্ভাবনার কথা বর্ণনা করবে। সমীকরণের কাজ হচ্ছে একেবারে সম্পূর্ণ (deterministric), ভাবে বর্ণনা করা, কিন্তু এটা তা করে না। অন্যদের মতোই শ্রোয়েডিংগারও এ বিষয়ে অবহিত ছিলেন। তিনি তার সেই অস্তিত্বহীন (hypothetical) বেড়ালের কথা বলতেন। তার কথায়, ‘যদি আপনি আমার সমীকরণ যা বলে, তা বিশ্বাস করেন তাহলে বিড়ালটি একই সঙ্গে জীবিত ও মৃত অবস্থায় অবস্থান করছে, এটাও বিশ্বাস করতে হবে।’ তার মানে ক্রমে এমন একটা জায়গায় এসে দাঁড়াতে হচ্ছে যেটা আসলে পাড়ানোর জায়গাই নয়। (এ প্রসঙ্গে ওয়ার্নার হাইজেনবার্গের Physics and Philosophy : The Revolution in Modern science গ্রন্থটি পড়লে আরও ভাল বোঝা যাবে)। জীবনানন্দের ক্ষেত্রে এইখানেই কিন্তু ওই অবিশ্বাস্য (এখানে ভারতে হবে সত্যতর) ব্যাপারটাই প্রধান হয়ে উঠছে, যা আসলে অনিবার্য বিশ্বাস। এই অনুভূতির কথাই জীবনানন্দ তার কবিতায়, উপন্যাসে, গল্পে একদিক দিয়ে বোঝাতে চেয়েছেন। যার পরাবাস্তবিক আবহ বুঝতে গেলে অনেক কিছুর মতো কোয়ান্টাম মেকানিসও অন্যতম উপায়। ধান ভানতে এই শিবের গীতটি জে গাওয়া হলো, আশা করি এখনও বোঝা যায়নি।

কোথায়ইবা জীবনানন্দের নারীরা বা কোথায়ইবা তাদের প্রেম- জীবনানন্দ তাঁর কবিতার নারীদের, অর্থাৎ বনলতা থেকে শুরু করে মৃণালিনী, শেফালিকা, সুরঞ্জনা, সুদর্শনা, শ্যামলী, সুচেতনা, শঙ্খমালা কিংবা সবিতা, অথবা গদ্যের নারীরা যেমন রমা, বনচ্ছায়া, সুলেখা, জুলেখা, শচী কল্যাণী, সুশীলা, সুস্মিতা- নামগুলি আমাদের কারও অচেনা নয়। এরা সকলেই এককথায় জীবনানন্দের চরিত্র। বাস্তব ভাবলে ভাবা যেতেই পারে। আর যদি না ভাবেন, তাহলে বাস্তবের মতো ভাবতে হয়। বনলতা বলে সত্যিই বাস্তবে তার কোনও প্রেমিকা ছিল কি না, এটা জীবনানন্দের মতো কাউকে বোঝার কোনও সূত্র নয়। কিংবা তার স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক কতটা খারাপ ছিল- এসব ভেবে বরং তাকে অনুভব করতে চাওয়ার পরিবহ আরও অস্পষ্ট হয়ে যায়। কবিতা বা গদ্যের নায়িকা বা চরিত্র হতে গেলে যে সমস্ত সহজগ্রাহ্য কারণ থাকা দরকার, তা জীবনানন্দের চেতনায় একটা বিপ্রতীপ সমাচারের মতো ছিল। হয়তো এই ব্যাখ্যাও তেমন প্রযুক্ত নয়, কিন্তু বাংলা উপন্যাস-গল্পের চিরাচরিত ফ্ল্যাট ক্যারেকটারের ডাইমেনশন দিয়ে জীবনানন্দকে বোঝার চেষ্টা যে করা উচিত নয়, তা অল্পবিস্তর সকলেই জানেন বলে মনে হয়। এই প্রসঙ্গে বনলতা সেন সম্পর্কে জীবনানন্দের অনুভবটি কেমন ছিল, একটু জেনে নিই- “কিশোরবেলায় যে কালো মেয়েটিকে ভালোবেসেছিলাম কোনো এক বসন্তের ভোরে, বিশ বছর আগে যে আমাদেরই নিকটবর্তিনী ছিল, বহুদিন যাকে হারিয়েছি- ... নক্ষত্রমাখা রাত্রির কালদিঘির জলে চিতল হরিণীর প্রতিবিম্বের মতো রূপ তার প্রিয় পরিত্যক্ত মৌনমুখী মেরীর মতো অপরূপ রূপ। মিষ্টি, ক্লান্ত অশ্রুমাখা চোখ, নগ্নশীতল নিরাবরণ দুখানা হাত ম্লান ঠোঁট। পৃথিবীর নবীন জীবন ও নরলোকের হাতে প্রেম বিচ্ছেদ ও বেদনার সেই পুরনো পল্লীর দিনগুলো সমর্পণ করে কোন দূর নিঃস্বাদ নিঃসূর্য অভিমানহীন মৃত্যুর উদ্দেশে তার যাত্রা। সেই বনলতা- আমাদের পাশের বাড়িতে থাকত সে। ...কত শীতের ভোরের কুয়াশা ও রোদের সঙ্গে জড়িত সেই খড়ের ঘরখানাও নেই তাদের আজ; বছর পনেরো আগে দেখেছি মানুষজন নেই, থমথমে দৃশ্য, লেবুফুল ফোটে, ঝরে যায়, হোগলার বেড়াগুলো উঁইয়ে খেয়ে ফেলেছে। চালের উপর হেমন্তের বিকেলে শালিক আর দাঁড়কাক এসে উদ্দেশ্যহীন কলরব করে। গভীর রাতে জ্যোৎস্নার লক্ষ্মীপেঁচা ঝুপ করে উড়ে আসে। খানিকটা খড় আর ধুলো ছড়িয়ে যায়। উঠানের ধূসর মুখ জ্যোৎস্নার ভিতর দু-তিন মুহূর্ত ছটফট করে। তারপরেই বনধুঁধুল, মাকাল, বৈচি ও হাতিশুঁড়ার অবগুণ্ঠনের ভিতর নিজেকে হারিয়ে ফেলে। বছর আষ্টেক আগে বনলতা একবার এসেছিল। দক্ষিণের ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে চালের বাতায় হাত দিয়ে মা ও পিসিমার সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বললে সে। তারপর আঁচলে ঠোঁট ঢেকে আমার ঘরের দিকেই আসছিল। কিন্তু কেন যেন অন্যমনস্ক নতমুখে মাঝপথে থেমে গেল। তারপর খিড়কির পুকুরের কিনারা দিয়ে, শামুক গুগলি পায়ে মাড়িয়ে, বাঁশের জঙ্গলের ছায়ার ভিতর দিয়ে চলে গেল সে। নিবিড় জামরুল গাছটার নিচে একবার দাঁড়াল, তারপর পৌষের অন্ধকারের ভিতর অদৃশ্য হয়ে গেল।’

এর সঙ্গে আমরা জীবনানন্দের এই পঙ্ক্তি ক’টিও লক্ষ্য করতে পারি- ‘কত পূর্বজাতকের পিতামহ পিতা/ সর্বনাশ-ব্যসন-ব্যসনা / কত মৃত গোখুরার ফণা / কত তিথি, কত যে অতিথি / কত শত যৌনচক্র স্মৃতি / করেছিল উতলা আমারে’

একজন কবি, মানে জীবনানন্দের একজন প্রেমিকা ছিল- তার সঙ্গে শেষপর্যন্ত মিল হয়নি, বা সাদা কথায় তাকে তিনি নিজের করে জীবনে পাননি- উপরের এই বক্তব্যে এটা একেবারেই পরিষ্কার। বিশ্বের বেশ কয়েক কোটি মানুষের ক্ষেত্রে এটা হয়েছে। অতএব জীবনানন্দের প্রেম নিয়ে এতদিন পরে নতুন করে বলার আছেটা কী? কোনও দিনই কি কিছু ছিল? কেননা, জীবনানন্দের এই কথাকে মূল ভিত্তি করে অনেক আলোচকই বনলতা সেন যে কবির প্রেমিকা ছিল- এ নিয়ে আর দ্বিতীয়বার ভাবতে চাননি। মজার কথা হলো জীবনানন্দের এই স্বীকারোক্তিতেই যদি সমস্যাটা মিটে যেত, অর্থাৎ, এ-নিয়ে আর রহস্য থাকত না, তাহলে প্রেমের ইতিহাস তো দূরের কথা, তাঁর কবিতা কোনও দিন পাঠযোগ্যও হতো কিনা সন্দেহ। বিশ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া প্রেমিকের স্মৃতি রোমন্থন করছেন কবি- এটা দিয়ে জীবনানন্দের নারীকে বা কবিতাকে আস্বাদ করা যায়? অনুভব করা যায় তাঁর কবিতাকে? এই সাধারণ ঘটনাটির ঐতিহাসিকতার থেকেও বনলতা সেন নামে ওই ‘অপরূপ হরিণী’-র দ্যোতনা যে অনেক বেশি, এটুকুও যদি এখনও আমরা না-বুঝতে পারি, তাহলে জীবনানন্দ পড়া ব্যর্থ হয়েছে বলতে হবে। পাঠকের কী মনে হয়, ‘কারুবাসনা’ আদৌ কোনও বাংলা উপন্যাস? অন্তত সেই সময়ের প্রেক্ষিতে? বনলতা সেন শুধুই একটি মেয়ে, যাকে জীবনানন্দ বিয়ে করতে পারেননি? ব্যস। হয়ে গেল জীবনানন্দের প্রেমের রহস্যভেদ। আমাদের কখনও মনে হচ্ছে না বনলতা সেন কি বনলতা সেন, না বনলতা সেনের মতো। একে মনে করুন না ওই কোয়ান্টাম মেকানিকস-এর মতো অনুভবেদ্য পৃথিবীর বিপরীত অবস্থানের মতো। জীবনানন্দের ক্ষেত্রে যা কেবল শুধু কোনও তন্ত্রের ধারণা নয়, রক্তমাংসের জীবনও যেখানে সমানে ক্রিয়াশীল।

শুধু বনলতা সেনই নয়, সাধারণভাবে জীবনানন্দের যদি চরিত্রগুলিকে লক্ষ করেন, তাহলে প্রথমত, দেখতে পাবেন বা মনে হবে, এই তো আমাদের আশপাশের লোকজনই এরা। নতুনত্ব যে বিশেষ কিছু আছে, তা তো মনে হচ্ছে না। এদের পরিণতি কী তা বুঝতেও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। শরৎচন্দ্রের নারীরা যেমন ছিল। ঘটনা বা চরিত্রের প্রয়োজনে নায়ক-নায়িকার দূরত্ব হঠাৎই কমে আসত নায়কের কোনও দুর্ঘটনাকে ভিত্তি করে। জীবনানন্দের ক্ষেত্রে সে-রকম যে হতেই হবে, এমন তো নয়। আবার যেন তারা সেরকম হয়েও অন্য কিছু। এই ‘অন্যকিছু’-টা আর ব্যাখ্যা করার গভীর দায় বাংলা ভাষার সমালোচকরা তেমনভাবে নেননি। তা জীবনানন্দের মৃত্যুর অনেককাল পরেও নয়। আসলে বাংলা সাহিত্যের সমালোচনা চিরকালই হয়ে এসেছে একটা নির্দিষ্ট ফরমুলাকে ভিত্তি করে। তার বাইরে গিয়ে যে অন্য কিছু ভাবা যায়, তা তখনকার কেন, তারও অনেক পরের আলোচকরাও ভাবেননি, ভাবতে পারেননি। গোটা পৃথিবীর বিজ্ঞান যেভাবে এগিয়েছে, যেভাবে একটা আবিষ্কারকে নস্যাৎ করে দিচ্ছে আর-একটা আবিষ্কার, বিশ্বযুদ্ধ ও রাজনীতি যেভাবে পাল্টে দিয়েছে বিশ্বের সমগ্র পরিবেশ, চিত্রকলায় বিভিন্ন ইজম যে রকম করে আমূল পরিবর্তন এনেছে বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতির, গদ্যে মরিস ব্লাঙ্কো কিংবা ক্লদ সিমো নয়, ব্যাখ্যা দিচ্ছেন নুভো রোমো আন্দোলনে মধ্য দিয়ে, আর কবিতার ক্ষেত্রে জীবনানন্দেরও বহু আগে যার সূচনা করে গিয়েছে স্তেফান মালার্মে। তৎকালীন বাঙালি লেখকরা এঁদের পড়লেও সেসব অনুভব করতে তাদের চেতনার আরোহিণী শক্তি ছিল না। জীবনানন্দের মধ্যেও তা ছিল, ফলত তার লেখা ভিন্ন, ভিন্নতর এক এবং একাধিক মাত্রা নিয়ে উদ্ভাসিত হতে অনেক সময় লেগেছে এবং এখনও লাগছে। এবার একটু উদাহরণ সহকারে দেখুন। জীবনানন্দের চরিত্রদের চরিত্র একদিক দিয়ে জানতে বা বুঝতে কোনও অসুবিধা হচ্ছে না। যেমন তাঁর কবিতা বা গদ্য থেকে দু-একটি পঙ্ক্তি লিপিবদ্ধ করলে হয়তো বিষয়টা একটু স্পষ্ট হবে।

১) সুরঞ্জনা, অইখানে যেয়োনাকো তুমি

২) থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন

৩) মনে পড়ে পাড়াগাঁর কবেকার অরুণিমা সান্যালের মুখ

৪) কলকাতা একদিন কল্লোলিনী তিলোত্তমা হবে

এই নারীদের মনে হবে সবসময়েই পাঠকদের চেনা। বাংলা বা যে কোনও কবিতার মধ্যেই এ জাতীয় নারীদের খুঁজে পাওয়া যাবে। এর পাশাপাশি এই পঙ্ক্তিগুলো লক্ষ্য করি-

১) করুণ শঙ্খের মতো- দুধে আর্দ্র-কবেকার শঙ্খিনীমালার

২) বিলুপ্ত ধূসর কোন পৃথিবীর শেফালিকা

৩) প্রথম গার্গীর মতো- জানকীর মতো হয়ে ক্রমে অবশেষে বনলতা সেন হয়ে আসে।

৪) তুমি সেই অপরূপ সিন্ধু, রাত্রি- মৃতদের রোল

এই পঙ্ক্তিগুলো কি খুব চেনা বা স্পষ্ট মনে হচ্ছে আমাদের? কিংবা এই নারীরা কি একেবারে আমাদের চারপাশে আছে, এমন মনে হয়?

পাশাপাশি জীবনানন্দের গদ্য লক্ষ্য করুন-

১) সুস্মিতা হাসতে হাসতে অন্ধ হয়ে পড়ছিল যেন- না, সন্ধ্যার অন্ধকার হয়ে গেল।

২) অনেক দিন পরে আজ সে আবার এলো, মনোপবনের নৌকোয় চড়ে, নীলাম্বরী শাড়ি পরে, চিকন চুল ঝাড়তে ঝাড়তে আবার সে এসে দাঁড়িয়েছে, মিষ্টি অশ্রুমাখা চোখ, ঠাণ্ডা, নির্জন, দু’খানা হাত, ম্লান ঠোঁট, শাড়ির ম্লানিমা। সময় থেকে সময়ান্তর, নিরবচ্ছিন্ন, হায় প্রকৃতি, অন্ধকারে তার যাত্রা-

৩) ...চৌকাঠের সঙ্গে দড়ি ঝুলিয়ে কিংবা বিষ খেয়ে যে মরণ, সে রকম মৃত্যু নয়, আউটরাম ঘাটে বেড়াতে গিয়ে সন্ধ্যার সোনালি মেঘের ভিতর অদৃশ্য হয়ে যেতে ইচ্ছে করে, মনে হয় আর যেন পৃথিবীতে ফিরে না-আসি

এই রকম গদ্য কি তখনকার আর-পাঁচজন বাঙালি লেখক হামেশাই লিখতেন? এই জাতীয় গদ্যভাষা জীবনানন্দ ঠিক কীভাবে আয়ত্ত করেছিলেন। তার কনটেন্ট বা অনুভবের কথা তো ছেড়েই দিলাম। একটু অন্যভাবে এর উত্তর খুঁজতে চেষ্টা করি। একসময় মনো (monod) মতো জীবনবিজ্ঞানীদের কেউ কেউ জানিয়েছিলেন যে, বিশ্বে মানুষের সৃষ্টি একটা দুর্ঘটনা ছাড়া কিছু নয়। আর, মহাবিশ্বও এ সম্পর্কে যথেষ্ট উদাসীন। পরবর্তীকালে ইলিয়া প্রিগোজিন-এর মতো রসায়নবিদ সেই ধারণাকে নস্যাৎ করে দিয়ে বলতে চেয়েছিলেন বস্তুর নিজের মধ্যে একটি সেলফ অরগ্যানাইজিং ক্যাপাসিটি আছে। যাকে আত্মসংগঠনের শক্তি বলা যায়। মানে, তার মধ্যে একটা যোগাযোগ করার ক্ষমতা অবশ্যই বর্তমান। অথচ আবার দেখুন, কোয়ান্টাম মেথড সাধারণভাবে কোনও স্থিত নিয়ন্ত্রণের কথা বলে না। একে সমর্থন করেছিলেন ভন নয়মান। আবার ডেভিড বম ব্যাপারটিকে তেমন মানতে চাননি। এর মধ্যে কোনটা মান্য আর কোনটা ত্যাজ্য, তা নিয়ে তর্ক চলতেই পারে কিন্তু সৃষ্টি রহস্যের যেমন তল নেই তেমনই লেখকের সৃষ্টিও অতল এক ইঙ্গিতের কথা বলে। যার সঙ্গে কোয়ান্টাম মেথড না মিললেও কোয়ান্টাম অবশ্যই প্রয়োজন। আমাদের ধারণা, কোয়ান্টাম থিওরির সঙ্গে পরিচিত ছিলেন জীবনানন্দ। সুররিয়াল-এর অনুভব আর ওই অপরূপ হরিণীর ধারণা এরকমই কোনও উৎস থেকে জাত বলে ক্রমেই আমাদের মধ্যে বিশ্বাসের বিন্দু জমতে থাকে। আমরা জীবনানন্দকে আরও পাঠ করতে থাকি, আর, আমাদের জিন, ব্লাডগ্রুপ পাল্টে যেতে থাকে ক্রমশই।

শুধু তার নারী চরিত্রগুলিই নয়, সমস্ত চরিত্রই একটা সময় যে অবস্থায় থাকে, পরবর্তী মুহূর্তেই তাদের অবস্থান বদল হয়। সেই অবস্থান কেমন, তার অনেকগুলো সম্ভাবনা থাকে বা থেকে যায়। মানে কোয়ান্টাম মেকানিকসের দ্বিতীয় সম্ভাবনার মতো। একটা ছোট্ট উদাহরণ লক্ষ্য করুন-

জীবনানন্দের একটি কবিতার পঙ্ক্তি- ‘মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য’। এটি পড়লে প্রত্যেকেরই নিশ্চিতভাবে মনে পড়ে যাবে ঐতিহাসিক শ্রাবস্তী নগরীর নানা ভাস্কর্যের কথা। অর্থাৎ, কোনও নারীর মুখে সেই ভাস্কর্যের ছায়া যেন। কিন্তু শ্রাবস্তর অর্থ যখন ‘ব্রণ’ হয়? চিত্রকল্প কী আমূল পালটে যাচ্ছে, লক্ষ্য করুন। ব্রণ-কণ্টকিত একটি মুখ- সেটিকে ভাবা হচ্ছে কারুকার্যের মতো। এই অবস্থান বদলকে কবিতার চলতি ফরমুলা নিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব? যেখানে আসল শ্রাবস্ত কোনটা? নগরী না ব্রণ? কিংবা একসঙ্গে দুটোই? পাঠকের হয়তো মনে পড়বে শ্রোয়েডিংগারের বেড়ালের কনসেপ্ট। যে-বেড়ালটি একই সঙ্গে জীবিত ও মৃত।

রসায়ন, গোত্রপরিচয়

এই হিমে

সে সমস্ত নীল প্যারাডাইম যেন পুরনো পিপাসার মতো

গূঢ়

কেউ কি জানে শ্রাবস্তী অর্থে মুখমণ্ডলব্যাপী ব্রণ

যার কারুকাজ এই জিমন্যাসিয়ামে

তবুও প্রশ্ন রেখে যাওয়া উচিত। জীবনানন্দ কি জীবনানন্দের মতো? ঠিক জীবনানন্দ নয়? তার প্রেম বা প্রেমিকারা? তারাও কি প্রেমের মতো বা প্রেমিকার মতো। সত্যি বলতে কি, আমাদের কাছে এখনও এর উত্তর নেই ঠিকমতো। তার বদলে জীবনানন্দের এই পঙ্ক্তি ক’টি আমরা অনুধাবনের চেষ্টা করি-

‘অনেক কমলা রঙের রোদ ছিলো,

অনেক কাকাতুয়া পায়রা ছিলো,

মেহগনির ছায়াঘন পল্লব ছিলো অনেক

অনেক কমলা রঙের রোদ ছিলো,

অনেক কমলা রঙের রোদ;

আর তুমি ছিলে;

তোমার মুখের রূপ কতো শত শতাব্দী আমি দেখি না,

খুঁজি না।’