‘অধুনাবাদ’-এর আলোকে জীবনানন্দের কবিতা ‘আমাদের বুদ্ধি আজ’-এর পুনর্পাঠ

মাহফুজ আল-হোসেন

জীবনানন্দ দাশ বাংলা আধুনিক কবিতার এক অত্যুজ্জ্বল নক্ষত্র। রাবীন্দ্রিক সৃজন-সৌরমণ্ডলীর দুর্দমনীয় প্রভাব- বলয় ছিন্নকারী ত্রিশের কবিদের গোত্রভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও তাঁর প্রাতিস্বিকতা সময়কালের ব্যাপ্তিকে অতিক্রম করে গেছে। তাঁর নির্ভেজাল নিসর্গপ্রীতি, হাজার বছরের ইতিহাস ঐতিহ্যের সরোবরে নিত্য-অবগাহন এবং আধুনিক বাকপ্রতিমার একান্ত নিজস্ব নির্মাণশৈলি বাংলা কবিতার পাঠককে নতুনতর শিল্পবোধের সন্ধান দিয়েছে। এমনকি পুনর্পাঠে সংবেদনা ও সৌন্দর্যের নতুন নতুন অনুষঙ্গ নানা বর্ণবিভায় স্পষ্ট হচ্ছে অদ্যাবধি।

সাহিত্য ও চিন্তাশিল্পের লিটল্ ম্যাগাজিন ‘শালুক’-এর পক্ষ থেকে ‘অধুনাবাদ’ শীর্ষক একটি চিন্তন-চর্চামণ্ডলীর রূপরেখা উপস্থাপিত হয়েছে সম্প্রতি। এটি পাশ্চাত্য কিংবা প্রাচ্যের কোন ইজমনির্ভর কোনো সাহিত্যতত্ত্ব নয়। নির্দিষ্ট কোনো সময়কালের ব্যাপ্তিতেও সীমাবদ্ধ নয় এটি। আবহমান বাংলার জলহাওয়া আর মৃত্তিকা-নিঃসৃত নির্মোহ ও উদারনৈতিক অভিজ্ঞানের আলোকে সার্বজনীন চিন্তন-সংস্কৃতিকে ‘শালুক’ কর্তৃক পরিচালিত দুদশকের লিটল্ ম্যাগাজিন আন্দোলনের পরিক্রমায় ‘শালুক’-এর লেখক-পাঠক শুভানুধ্যায়ীর ব্যাপকভিত্তিক অংশগ্রহণ ও অনুশীলনের মধ্য দিয়ে তত্ত্বায়নের জন্য পর্যবেক্ষণাধীন রয়েছে ‘অধুনাবাদ’।

ধানসিড়ি নদীবিধৌত বরিশাল তথা পূর্ববঙ্গের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য জীবনানন্দের কবিতাকে করেছে ‘চিত্ররূপময়’ কিংবা ‘দৃশ্যগন্ধময়’ আর প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর মানবিক বিপর্যয়, ইংরেজ ঔপনিবেশিক দুঃশাসনের ফলস্বরূপ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও দুর্ভিক্ষের করাল গ্রাসে অযৌক্তিক জীবনক্ষয়, নাগরিক জীবনযন্ত্রণার নানামুখী নৈরাশ্য যেমন পুঁজিবাদী বাজারব্যবস্থার শোষণ ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, মার্ক্সীয় সাম্যবাদের আবাহন, ফ্রয়েডীয় মনোসমীক্ষণজাত নারী-পুরুষের সম্পর্কের চেতন-অবেচতন-অচেতনতার জটিলাবর্ত তাঁকে ভাববাদী আদর্শবাদিতা তথা রাবীন্দ্রিক রোমান্টিকতার অলঙ্ঘ্য গীতিময়তাকে পায়ে ঠেলে অনিবার্যভাবে পৌঁছে দিয়েছে পরাবাস্তবতার প্রতীকময় শৈল্পিক আশ্রয়ে। ইংরেজিতে উচ্চশিক্ষা ও শিক্ষকতা, পাশ্চাত্য ভাবাদর্শের চর্চা ও অধ্যয়ন তাঁর কবিতায় নিয়ে এসেছে সরাসরি ইয়েটস্-এর প্রভাব এবং অপ্রত্যক্ষভাবে এলিয়টের পোড়োজমিনের বিক্ষত? ও দূরান্বয়ী মগ্ন চৈতন্যপ্রবাহ।

স্ববিনাশী সভ্যতার বুদ্ধিবৃত্তিক সঙ্কটাপন্ন সময়ে দাঁড়িয়ে বিষয়বাসনার নৈমিত্তিক দহনে শান্তি যখন হুমকির মুখে জীবনানন্দের অগ্রন্থিত কবিতা “আমাদের বুদ্ধি আজ” ‘শালুক’ প্রবর্তিত অধুনাবাদের আলোকে অনুধাবনের এই ক্ষুদ্রায়তনিক প্রচেষ্টা, তখন শূন্যতার আর্কিটাইপ ক্রমশ অস্তিত্বমান হচ্ছে কবিতার প্রারম্ভে চিরপ্রাসঙ্গিক পঙ্ক্তিমালায়-

“আমাদের বুদ্ধি আজ অন্তহীন মরুচর, তাই

প্রাণে শুধু বিষাদের নিত্য দাহ আছে।

তার শান্তি সময়ের সাগরের কাছে

হয়তোবা পাওয়া যেতে পারে;

কিন্তু কোন সময়ের দিকে যেতে হবে?

শূন্যের ভিতরে ফল যেখানে রয়েছে মনে হয়?

অথবা যেদিকে গিয়ে হৃদয় ক্রমেই

শান্ত হয়ে টের পাবে শূন্য ছাড়া আর কিছু নেই?”

শূন্যতার বোধ যতই ঘিরে ধরুক আমাদেরকে প্রকৃতি-বসতি-প্রতিবেশ জলাঞ্জলি দিয়ে অগ্রসর হতে হয় সবকিছু অর্থমূল্যে নিরূপণের শতাব্দিপ্রাচীন ভাঙা বাটখারার চিহ্ন আর বাজারমুখী উন্নয়ন, লাভালাভ আর পণ্যায়নের পথ ধরেই:

“তবুও সূচনা থেকে যাত্রা ক’রে কোনো প্রান্তে যাওয়া

ভালো, কোথাও চিহ্নের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে

বৃক্ষ নদী কুজ্ঝটিকা রক্তের আকাশ শতাব্দীর ভা?ঙা বাটখারা;

মূল্য নির্ণয়ের কাজে উঠছে পড?ছে-

ঘর বাড়ি সাঁকো নীড় ঘাস

ক্রেন এরিয়েল ট্রেন- গুণচট চালানির মাল...।

এই যে তথাকথিত সভ্যতার সম্মুখ পানে চলা, পূর্বধারণাকে সত্যি মনে করে অগ্রগতির সুস্পষ্ট রূপকল্প হাতে নেয়া- সেসবের ভবিতব্য যখন ত্রিকালদর্শী দার্শনিক কবির ভাবনাভাষ্যে উঠে আসে তখন তিনি তাঁর সৃষ্টিসম্ভারের রচনাকালে সীমাবদ্ধ থাকেন না এবং

অধুনাবাদের কালনিরপেক্ষ (অর্থাৎ এটি আধুনিকতা কিংবা উত্তরাধুনিকতার মতো কোনো বিশেষ কালখণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়) দর্শন অনিবার্যভাবেই আমাদের চিন্তনচর্চামণ্ডলীতে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে :

“চেতনার সে-রকম চলা হলো ঢের।

দূর কাঁটা কম্পাসের দিকচিহ্ন আজ

ক্রমায়ত শূন্যে বিলীন?

একদিন যা কিছু স্পষ্ট মনে হয়েছিল

সে-সব এখন আর স্থির

নির্ধারিত সত্য নয়;”

পরিবেশ ও প্রতিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে প্রিয় ধরিত্রীর সকল প্রজাতির টিকে থাকার অধিকার পুনর্ব্যক্ত করতে চায় অধুনাবাদ। এটি মজ্জাগত সংস্কার কিংবা কাঠামোগত ধারণার প্রতি অনুগত না হয়ে চিন্তার নবায়ন ও বাঁকবদলকে প্রণালীবদ্ধ ও বিশ্লেষণাত্মকভাবে অধ্যয়ন করে তার স্বরূপকে জনসমক্ষে নিয়ে আসতে চায়। আন্তঃপ্রজন্ম সংলাপের সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করে অধুনাবাদ। ভাবনার সংবৃত্তায়ন কিংবা কেন্দ্রীকরণ নয় বরং কেলাসিত ভাবনার বিচূর্ণায়নের মধ্য দিয়ে নিত্য-নতুন চিন্তাভাষ্য ও পাঠকৃতি তৈরি করাই হলো এ চিন্তনচর্চামণ্ডলীর মৌল দর্শন। এরই প্রতিধ্বনি পাই কবিতাটির শেষাংশে জীবনানন্দের অমোঘ উচ্চারণে :

“জেনে মন চলেছে নতুন সূর্যে; দিকনির্ণয়ে

কিছু সূর্য- ঢের বেশি ছায়া দিয়ে হৃদয়কে ভ’রে

মধ্যবয়সী প্রৌঢ় স্থবির আত্মার বর্ণে

বারবার সূর্য ভেঙে গড়ে।”

অধুনাবাদের আলোকে জীবনানন্দের টেক্সটের যে ব্যাখ্যান এখানে উপস্থিত হলো এটা মোটেও চূড়ান্ত কিছু নয়। এখানে নিবন্ধকারের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। উপস্থাপিত পাঠকৃতিকে ভেঙেচুরে নতুন আঙ্গিকে চিন্তাভাষ্য পুনর্নির্মাণ করার অধিকার পাঠকের রয়েছে নিরঙ্কুশভাবেই। যেহেতু, অধুনাবাদকে উপেক্ষা করার ভাষাও এই তত্ত্বে প্রবল শক্তিধর।

জয় হোক অধুনাবাদের। জয় হোক শালুকের।

বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২০ , ৬ কার্তিক ১৪২৭, ৪ রবিউল ‍আউয়াল ১৪৪২

‘অধুনাবাদ’-এর আলোকে জীবনানন্দের কবিতা ‘আমাদের বুদ্ধি আজ’-এর পুনর্পাঠ

মাহফুজ আল-হোসেন

image

জীবনানন্দ দাশ বাংলা আধুনিক কবিতার এক অত্যুজ্জ্বল নক্ষত্র। রাবীন্দ্রিক সৃজন-সৌরমণ্ডলীর দুর্দমনীয় প্রভাব- বলয় ছিন্নকারী ত্রিশের কবিদের গোত্রভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও তাঁর প্রাতিস্বিকতা সময়কালের ব্যাপ্তিকে অতিক্রম করে গেছে। তাঁর নির্ভেজাল নিসর্গপ্রীতি, হাজার বছরের ইতিহাস ঐতিহ্যের সরোবরে নিত্য-অবগাহন এবং আধুনিক বাকপ্রতিমার একান্ত নিজস্ব নির্মাণশৈলি বাংলা কবিতার পাঠককে নতুনতর শিল্পবোধের সন্ধান দিয়েছে। এমনকি পুনর্পাঠে সংবেদনা ও সৌন্দর্যের নতুন নতুন অনুষঙ্গ নানা বর্ণবিভায় স্পষ্ট হচ্ছে অদ্যাবধি।

সাহিত্য ও চিন্তাশিল্পের লিটল্ ম্যাগাজিন ‘শালুক’-এর পক্ষ থেকে ‘অধুনাবাদ’ শীর্ষক একটি চিন্তন-চর্চামণ্ডলীর রূপরেখা উপস্থাপিত হয়েছে সম্প্রতি। এটি পাশ্চাত্য কিংবা প্রাচ্যের কোন ইজমনির্ভর কোনো সাহিত্যতত্ত্ব নয়। নির্দিষ্ট কোনো সময়কালের ব্যাপ্তিতেও সীমাবদ্ধ নয় এটি। আবহমান বাংলার জলহাওয়া আর মৃত্তিকা-নিঃসৃত নির্মোহ ও উদারনৈতিক অভিজ্ঞানের আলোকে সার্বজনীন চিন্তন-সংস্কৃতিকে ‘শালুক’ কর্তৃক পরিচালিত দুদশকের লিটল্ ম্যাগাজিন আন্দোলনের পরিক্রমায় ‘শালুক’-এর লেখক-পাঠক শুভানুধ্যায়ীর ব্যাপকভিত্তিক অংশগ্রহণ ও অনুশীলনের মধ্য দিয়ে তত্ত্বায়নের জন্য পর্যবেক্ষণাধীন রয়েছে ‘অধুনাবাদ’।

ধানসিড়ি নদীবিধৌত বরিশাল তথা পূর্ববঙ্গের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য জীবনানন্দের কবিতাকে করেছে ‘চিত্ররূপময়’ কিংবা ‘দৃশ্যগন্ধময়’ আর প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর মানবিক বিপর্যয়, ইংরেজ ঔপনিবেশিক দুঃশাসনের ফলস্বরূপ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও দুর্ভিক্ষের করাল গ্রাসে অযৌক্তিক জীবনক্ষয়, নাগরিক জীবনযন্ত্রণার নানামুখী নৈরাশ্য যেমন পুঁজিবাদী বাজারব্যবস্থার শোষণ ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, মার্ক্সীয় সাম্যবাদের আবাহন, ফ্রয়েডীয় মনোসমীক্ষণজাত নারী-পুরুষের সম্পর্কের চেতন-অবেচতন-অচেতনতার জটিলাবর্ত তাঁকে ভাববাদী আদর্শবাদিতা তথা রাবীন্দ্রিক রোমান্টিকতার অলঙ্ঘ্য গীতিময়তাকে পায়ে ঠেলে অনিবার্যভাবে পৌঁছে দিয়েছে পরাবাস্তবতার প্রতীকময় শৈল্পিক আশ্রয়ে। ইংরেজিতে উচ্চশিক্ষা ও শিক্ষকতা, পাশ্চাত্য ভাবাদর্শের চর্চা ও অধ্যয়ন তাঁর কবিতায় নিয়ে এসেছে সরাসরি ইয়েটস্-এর প্রভাব এবং অপ্রত্যক্ষভাবে এলিয়টের পোড়োজমিনের বিক্ষত? ও দূরান্বয়ী মগ্ন চৈতন্যপ্রবাহ।

স্ববিনাশী সভ্যতার বুদ্ধিবৃত্তিক সঙ্কটাপন্ন সময়ে দাঁড়িয়ে বিষয়বাসনার নৈমিত্তিক দহনে শান্তি যখন হুমকির মুখে জীবনানন্দের অগ্রন্থিত কবিতা “আমাদের বুদ্ধি আজ” ‘শালুক’ প্রবর্তিত অধুনাবাদের আলোকে অনুধাবনের এই ক্ষুদ্রায়তনিক প্রচেষ্টা, তখন শূন্যতার আর্কিটাইপ ক্রমশ অস্তিত্বমান হচ্ছে কবিতার প্রারম্ভে চিরপ্রাসঙ্গিক পঙ্ক্তিমালায়-

“আমাদের বুদ্ধি আজ অন্তহীন মরুচর, তাই

প্রাণে শুধু বিষাদের নিত্য দাহ আছে।

তার শান্তি সময়ের সাগরের কাছে

হয়তোবা পাওয়া যেতে পারে;

কিন্তু কোন সময়ের দিকে যেতে হবে?

শূন্যের ভিতরে ফল যেখানে রয়েছে মনে হয়?

অথবা যেদিকে গিয়ে হৃদয় ক্রমেই

শান্ত হয়ে টের পাবে শূন্য ছাড়া আর কিছু নেই?”

শূন্যতার বোধ যতই ঘিরে ধরুক আমাদেরকে প্রকৃতি-বসতি-প্রতিবেশ জলাঞ্জলি দিয়ে অগ্রসর হতে হয় সবকিছু অর্থমূল্যে নিরূপণের শতাব্দিপ্রাচীন ভাঙা বাটখারার চিহ্ন আর বাজারমুখী উন্নয়ন, লাভালাভ আর পণ্যায়নের পথ ধরেই:

“তবুও সূচনা থেকে যাত্রা ক’রে কোনো প্রান্তে যাওয়া

ভালো, কোথাও চিহ্নের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে

বৃক্ষ নদী কুজ্ঝটিকা রক্তের আকাশ শতাব্দীর ভা?ঙা বাটখারা;

মূল্য নির্ণয়ের কাজে উঠছে পড?ছে-

ঘর বাড়ি সাঁকো নীড় ঘাস

ক্রেন এরিয়েল ট্রেন- গুণচট চালানির মাল...।

এই যে তথাকথিত সভ্যতার সম্মুখ পানে চলা, পূর্বধারণাকে সত্যি মনে করে অগ্রগতির সুস্পষ্ট রূপকল্প হাতে নেয়া- সেসবের ভবিতব্য যখন ত্রিকালদর্শী দার্শনিক কবির ভাবনাভাষ্যে উঠে আসে তখন তিনি তাঁর সৃষ্টিসম্ভারের রচনাকালে সীমাবদ্ধ থাকেন না এবং

অধুনাবাদের কালনিরপেক্ষ (অর্থাৎ এটি আধুনিকতা কিংবা উত্তরাধুনিকতার মতো কোনো বিশেষ কালখণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়) দর্শন অনিবার্যভাবেই আমাদের চিন্তনচর্চামণ্ডলীতে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে :

“চেতনার সে-রকম চলা হলো ঢের।

দূর কাঁটা কম্পাসের দিকচিহ্ন আজ

ক্রমায়ত শূন্যে বিলীন?

একদিন যা কিছু স্পষ্ট মনে হয়েছিল

সে-সব এখন আর স্থির

নির্ধারিত সত্য নয়;”

পরিবেশ ও প্রতিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখে প্রিয় ধরিত্রীর সকল প্রজাতির টিকে থাকার অধিকার পুনর্ব্যক্ত করতে চায় অধুনাবাদ। এটি মজ্জাগত সংস্কার কিংবা কাঠামোগত ধারণার প্রতি অনুগত না হয়ে চিন্তার নবায়ন ও বাঁকবদলকে প্রণালীবদ্ধ ও বিশ্লেষণাত্মকভাবে অধ্যয়ন করে তার স্বরূপকে জনসমক্ষে নিয়ে আসতে চায়। আন্তঃপ্রজন্ম সংলাপের সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করে অধুনাবাদ। ভাবনার সংবৃত্তায়ন কিংবা কেন্দ্রীকরণ নয় বরং কেলাসিত ভাবনার বিচূর্ণায়নের মধ্য দিয়ে নিত্য-নতুন চিন্তাভাষ্য ও পাঠকৃতি তৈরি করাই হলো এ চিন্তনচর্চামণ্ডলীর মৌল দর্শন। এরই প্রতিধ্বনি পাই কবিতাটির শেষাংশে জীবনানন্দের অমোঘ উচ্চারণে :

“জেনে মন চলেছে নতুন সূর্যে; দিকনির্ণয়ে

কিছু সূর্য- ঢের বেশি ছায়া দিয়ে হৃদয়কে ভ’রে

মধ্যবয়সী প্রৌঢ় স্থবির আত্মার বর্ণে

বারবার সূর্য ভেঙে গড়ে।”

অধুনাবাদের আলোকে জীবনানন্দের টেক্সটের যে ব্যাখ্যান এখানে উপস্থিত হলো এটা মোটেও চূড়ান্ত কিছু নয়। এখানে নিবন্ধকারের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয়েছে। উপস্থাপিত পাঠকৃতিকে ভেঙেচুরে নতুন আঙ্গিকে চিন্তাভাষ্য পুনর্নির্মাণ করার অধিকার পাঠকের রয়েছে নিরঙ্কুশভাবেই। যেহেতু, অধুনাবাদকে উপেক্ষা করার ভাষাও এই তত্ত্বে প্রবল শক্তিধর।

জয় হোক অধুনাবাদের। জয় হোক শালুকের।