পূর্ব ও পশ্চিমের বাঙালিদের খাদ্যবিচার

আবদুল লতিফ

খোলাজালি পিঠা নিরামিষ তেইশ রাঁধিলা অনায়াসে

আরম্ভিলা বিবিধ রন্ধন মৎস্য মাসে।

কাতলা ভেটুক কই কাল ভাজা কে

শিক-পোডা ঝুরি কাঁঠালের বীজে ঝোল।

ঝাল ঝোল ভাজা রান্ধে চিতল ফলুই

কই মাগুরের ঝোল ভিন্ন ভাজে কই।

অন্নদা মঙ্গল (ভারতচন্দ্র)

কলকাতা থেকে আমার এক বন্ধু আমাকে অনুরোধ করেছিলেন যে আমি যেন বাঙালি মুসলমানদের খাদ্য সংস্কৃতি নিয়ে কিছু লিখি, তার ফলে বাঙালি মুসলমানদের খাদ্যরীতি সম্পর্কে ওপার বাংলার মানুষ একটা স্পষ্ট ধারণালাভ করতে পারে। প্রথমটায় আমি একটু অবাক হয়েছিলাম। কারণ মাছেভাতে বাঙালি কথাটা তো সব বাঙালির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, সেখানে হিন্দু মুসলমানকে আলাদা করে দেখার সুযোগ কোথায়? পরক্ষণেই মনে হলো সামান্য হলেও আমাদের খাদ্যাভ্যাসের মধ্যে কিছু পার্থক্য তো আছেই। যেমন, বিশেষ চতুষ্পদ জন্তুর কথা ছেড়ে দিলেও মুসলিম উৎসবগুলোর সময় আমাদের মধ্যে যে সেমাই, ফিরনি, লাচ্ছাসেমাই, জর্দা বা মোগলাই খাবারের প্রচলন আছে সেটা তো বাঙালি হিন্দুদের থেকে আলাদা। আবার মিষ্টির ক্ষেত্রে বালুসাই বা বালুশাহী মিষ্টি, মনসুর মিঠাই, আন্দেশা, বরফি, হালুয়া, লাড্ডু ইত্যাদি কিছু কিছু খাবার মুসলিমদের নিজস্ব। ছোটবেলায় আমাদের বাড়ির সামনে প্রায় পাশাপাশি দুটো মিষ্টির দোকান ছিল। একটার মালিক ছিল লক্ষে্ণৗ নিবাসী জামাল খান আর তার কাছে কলকাতা নিবাসী সমীর ঘোষের। দুটো দোকানের মিষ্টির মধ্যে এটা স্পষ্ট পার্থক্য চোখে পড়তো। মুসলিম মিষ্টির দোকানটাতে যে সব মিষ্টি পাওয়া যেত তার অধিকাংশই শুকনো মিষ্টি, ছানার ব্যবহার নেই বললেই চলে, আর অন্যদিকে ঘোষবাবুর দোকানের রসগোল্লা, পান্তুয়া, সন্দেশ, চমচম, ছানার জিলিপি, রাবড়ি সবকিছুই খাঁটি ছানা দিয়ে তৈরি নানারকম মিষ্টি। আবার দুই দোকানের সিঙাড়া আর কচুরির মধ্যেও স্বাদের পার্থক্য লক্ষণীয় ছিল।

যে বিষয়টির ওপর বন্ধু গৌতমদা জোর দিয়েছিলেন সেটা হলো যে আমরা দু’টি ভিন্ন ধর্মালম্বী বাঙালি যুগ যুগ ধরে সহাবস্থান করছি, কিন্তু আমাদের যে সব আচার-আচরণ বা রীতিনীতির ক্ষেত্রে যৎসামান্য হলেও যে তফাৎটুকু আছে তা এখনো একে অপরের কাছে অজানা রয়ে গেছে। সে দিকটার ওপর আমাকে আলোকপাত করতে হবে। নিঃসন্দেহে কঠিন কাজ! কারণ, সব বাঙালির কাছে এখন দেশি বিদেশি খাদ্য জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। একদিকে মোগল সংস্কৃতি এবং সাহিত্যের পাশাপাশি যেমন রন্ধনপ্রণালি এবং খাদ্যাভ্যাসের প্রভাব সকল বাঙালিদের ওপর পড়েছে অন্যদিকে ইউরোপীয় কালচার তথা খাদ্যাভ্যাসের সুস্পষ্ট প্রভাব আমাদের সবার রন্ধনশালায় ঢুকে পড়েছে। প্রথমদিকে মোগলাই খাবার, যেমন বিরিয়ানি, কাবাব, মোগলাই পরোটা, হালুয়া, বাকরখানি মুসলিম খাদ্যতালিকাভুক্ত হলেও এখন এর প্রভাব ও চাহিদা জাতিধর্মনির্বিশেষে সকল খাদ্যরসিক বাঙালিদের কাছে সমান। ওদিকে আবার দুই বাংলাতেই চাইনিজ খাবার রেস্টুরেন্ট থেকে সবার রান্নাঘর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।

কলকাতাবাসী সাংবাদিক মিলন দত্তের বিশেষ অভিনিবেশ এবং চর্চার ক্ষেত্র বাঙালি মুসলমান এবং হিন্দু মুসলমান সম্পর্ক। তাঁর লেখা বাঙালির খাদ্যকোষ বইতে তিনি উভয়ধর্মের খাদ্যবৈচিত্র্যের প্রতি আলোকপাত করেছেন। তাঁর লেখায় দেখতে পাই-

“বাঙালির দৈনন্দিন রান্না মধ্যযুগ থেকে বিশেষ বদলায়নি। ভাজা, পোড়া, সিদ্ধ, শুক্তো, ঘণ্ট, ছ্যাঁচড়া, ছেঁচকি, চচ্চড়ি, ছক্কা, ছোকা, ঘ্যাঁট, লাফড়া বা লাবড়া, ঝাল, ঝোল, ডালনা এবং অম্বলের উল্লেখ আমরা মধ্যযুগের সাহিত্যে বিস্তর পাই। তবে দম, দোরমা, কালিয়া-কোপ্তা রান্না করতে শিখেছি এদেশে মুসলমানেরা আসার পরে। বিশেষত ফারসি এবং তুর্কিরা বাঙালির খাদ্যাভ্যাসকে বিপুলভাবে প্রভাবিত করেছে।”

বাঙালি হিন্দুরা যেন বাঙালি মুসলমানদের আচার ব্যবহারের সাথে পরিচিত হয় এই ছিল মিলন দত্তের প্রয়াস। উৎসব আনন্দ, খাবারদাবার ও সংস্কৃতির সাথে পরিচয়ের মাধ্যমে দুই বাঙালির সম্প্রীতির বন্ধন যেন দৃঢ় হয় এই হলো তাঁর বাসনা। খুসকা যে ঘি দিয়ে রান্না করা ভাত, ক’জন বাঙালি হিন্দু একথা জানেন? এলোঝেলো পূর্ববঙ্গের উৎসবে ময়দা দিয়ে বানানো ভাজা মিষ্টি এও বোধ করি পশ্চিম বাংলার বাঙালিদের অজানা।

ধর্মীয় কারণে দুই জাতির খাদ্যাভ্যাসের যে পার্থক্য আছে তা হলো মুসলিম ধর্মে কোনো কোনো খাবারের ওপর নিষেধাজ্ঞা। ধর্মীয় বিধিনিষেধের কারণে এগুলো খাওয়া নিষিদ্ধ বা হারাম। স্বভাবতই ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা এ-ধরনের খাদ্য গ্রহণ করেন না। এর মধ্যে আছে শূকরের মাংস, যা সুস্পষ্টরূপে ধর্মগ্রন্থে নিষেধ করা আছে। অন্য যে সব খাদ্যের প্রতি বিধিনিষেধ আরোপ করা আছে তা হলো, দাঁতবিশিষ্ট হিংস্র জন্তু যেমন, বাঘ, চিতা বাঘ, সিংহ, কুকুর ইত্যাদি। থাবা বা পাঞ্জা বিশিষ্ট হিংস্র পাখি যেমন, ঈগল, বাজ, পেঁচা ইত্যাদি। ধর্মীয় বিধান অনুসারে মুসলিমরা কচ্ছপের মাংসও পরিহার করে থাকে। কাঁকড়া ও চিংড়ির ক্ষেত্রে মুসলমানদের নিজেদের মধ্যে মতভেদ আছে। এ ধরনের খাদ্যকে বলা হয় মাকরুহ, যা নিষিদ্ধ নয় তবে পরিহার করা উত্তম। আকাশপথে ভ্রমণ করার সময় প্রায় সব এয়ারলাইন্সে যেমন আমিষ ও নিরামিষভোজিদের জন্যে আলাদা খাদ্যতালিকা থাকে তেমনি মুসলিম ফুড বলেও একটা পৃথক মেনু রাখা থাকে। যেসব প্রাণির মাংস মুসলিমদের জন্যে বৈধ, সেগুলোকে জবাই করার সময় একটা ধর্মীয় বিধান মেনে চলতে হয়। তা না করলে বৈধ বা হালাল পশুর মাংসও মুসলিমদের জন্যে বৈধ থাকে না। যাঁরা কঠোরভাবে ধর্মের অনুসারী, তারা এ বিষয়টিও মেনে চলেন।

সম্ভবত, মুসলমানদের খাদ্য তালিকার ক্ষেত্রে ওপরে যে সব ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞার কথা উল্লেখ করেছি, এর বাইরে খুব বেশি কিছু বলার নেই। সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় হলো গোমাংস ভক্ষণ। এ নিয়ে ভারতের মাটিতে বিরাট বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে, এমনকি এ নিয়ে দ্ইু সম্প্রদায়ের মানুষকে বহুবার দাঙ্গা হাঙ্গামার মুখোমুখি হতে হয়েছে। আমার স্বল্পজ্ঞানে যতটুকু জেনেছি তাতে মনে হয় পুরাকালে কোনো একসময় হিন্দুসমাজে গোমাংস ভক্ষন সিদ্ধ ছিল। চন্দন নন্দী লিখিত ‘Rammohan Roy Would Have Demolished the Sacred Cow Myth’ (২২ মে ২০১৫) প্রবন্ধে জানিয়েছেন যে বাঙালি সমাজের রেনেসাঁর অগ্রদূত রাজা রামমোহন রায় তাঁর

লেখা Hindu Authorities in Favour of Slaying the Cow and Eating its Flesh. প্রবন্ধে হিন্দুসমাজের গোমাংস ভক্ষনের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেছেন। এই প্রবন্ধে রাজা রামমোহন ঋকবেদের উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছেন আদি হিন্দু সমাজে গোমেধ এবং অশ্বমেধ ধর্মীয় আচরণসিদ্ধ ছিল। বর্তমানে অবশ্য কোন ধর্মের লোকই অশ্বমাংস খায় না। বুদ্ধদেব বসু বাঙালি ও ভোজনবিলাস নামক প্রবন্ধে বলেছেন, “সাহিত্যিক সাক্ষ্য থেকে এ পর্যন্ত বলা যায় যে, মৌলিক আর্যরা ছিলেন দুর্ধর্ষভাবে মাংসাশী ও মদ্যপ, আসক্ত ছিলেন সুগন্ধ গোদুগ্ধে ও গোমাংসে- তাঁদের গোমাংসপ্রিয়তার অনেক প্রমাণ অতি পবিত্র ঋগে¦দেই ছড়িয়ে আছে।... কবে এবং কেমন করে, গোমাংস ও শূকরমাংস দুটোই নিষিদ্ধ হয়ে গেল, এবং আমিষ-নিরামিষের ভেদচিহ্নে দ্বিখণ্ডিত হলো ভারতভূমি- সেই ইতিহাস আজ পর্যন্ত অস্পষ্ট থেকে গেছে, এমনকি আমরা এও জানি না এই সব নিষেধাজ্ঞা ধর্মের কারণে স্থাপিত হয়েছিলো, না কি প্রয়োজনের চাপে।”

তৃণভোজী জাবরকাটা এবং খুর দ্বিবিভক্ত এই জাতীয় স্তন্যপায়ী প্রাণির মাংস মুসলমানদের খাদ্যতালিকায় আছে। যেমন, গরু, ছাগল, হরিণ, মহিষ ইত্যাদি প্রাণির মাংস মুসলমানদের জন্যে বৈধ বা হালাল।

খাদ্যাভ্যাস বিষয়টি শৈশবে প্রত্যেকের নিজস্ব পরিবারের খাদ্যগ্রহণ রীতি অনুসারে গড়ে ওঠে। ছেলেবেলায় আমরা যা কিছু খাই, সেসব খাদ্য পরবর্তী জীবনে স্বাভাবিক খাদ্য হিসাবে বিবেচিত হয়। কিছুদিন আগে সস্ত্রীক পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলাম। সেখানে পথচলার সময় রাস্তার ওপর দিয়ে একটা সাপ দ্রুতগতিতে রাস্তা পার হচ্ছিল দেখতে পাই। দেখে আমরা ভয় পেয়ে পিছিয়ে আসি। গল্পটা শুনে ওখানকার স্থানীয় একটা ছেলে বলেছিল, ‘সাপ দেখে ভয় পাবার কী আছে? সাপ তো আমরা ধরে ধরে খাই’। জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোরা আর কি খাস?’ ও বললে, ‘আমরা সাপ, ব্যাঙ, ইঁদুর, বিড়াল সবকিছুই খাই’। ‘কুকুর?’ ‘না কুকুর আমরা খাই না’। ওরা না খেলেও পৃথিবীর অন্য দেশ ফিলিপাইনের অনেক লোক কুকুর খেতে অভ্যস্ত। চাইনীজরা তো সাপ, ব্যাঙ, বাদুড়, ইঁদুর, বিড়াল এমনকি বানরের মগজ পর্যন্ত খেতে ছাড়ে না। তাই বলছিলাম, খাওয়া ব্যাপারটা অভ্যাসের ওপর নির্ভর করে।

অফিসের কাজে আমি নিজে একবার বেলজিয়ামে আমাদের এক ব্যবসা সহযোগির ওখানে গিয়েছিলাম। তারা আমার সম্মানে একটা সান্ধ্যভোজের আয়োজন করেছিল। টেবিলভর্তি খাবার আসার পরেও তারা আমাকে আমার নিজস্ব পছন্দমতো একটা খাদ্য পছন্দ করতে বললো। আমি বিনীত কণ্ঠে বললাম এখানে তো অনেক খাবার আছে, আমি স্বল্পাহারী মানুষ, আমার জন্যে এই যথেষ্ট। ওরা সে কথা মানতে রাজি না। বিশেষ কোনো দামী খাবার আমাকে পছন্দ করতেই হবে। বাধ্য হয়ে বলতে হলো, বেশ তাহলে তোমরা একটা কিছু ঠিক করো। ওরা যতগুলো আমিষ খাদ্যের উল্লেখ করলো তার কোনটাই আমার পছন্দ হচ্ছে না। শেষপর্যন্ত যখন আমাকে উটপাখির মাংসের অফার করা হলো আমি বললাম, ওটাও চলবে না। তখন ওরা যুক্তি দেখাতে শুরু করলো। বললো, তুমি মুরগির মাংস খাও? উত্তরে বলতে হলো, তা অবশ্য খাই। তবে? ওদের যুক্তি, এটাও তো মুরগিসদৃশ একটা পাখি, শুধু আকারে একটু বড়, এখানে আর কোন আপত্তি চলবে না। আমি বোঝাতে পারতাম, আমাদের জন্যে পাঞ্জা বা থাবাবিশিষ্ট পাখির মাংস বৈধ নয়। কিন্তু সেদিন ওদের উৎসাহের আতিশয্যে আর কোনো তর্ক করতে ইচ্ছে হয়নি। উটপাখির মাংস ভক্ষন করেছিলাম। খেতে অবশ্য মন্দ লাগেনি। সত্যিই তো উটের গোশত যদি হালাল হয় উটপাখির মাংস খেতে বাধা কোথায়? একটা পশু আর একটা পাখি এই তো সামান্য ফারাক।

সম্প্রদায় ছেড়ে এবার একটু আঞ্চলিকতার দিকে আসি। পূর্ববাংলার বিশেষ বিশেষ অঞ্চলে কিছু খাদ্যে স্বকীয়তা আছে। যেমন শুটকিমাছ। চট্টগ্রাম এলাকা শুটকিমাছের জন্যে বিখ্যাত। চট্টগ্রাম বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী একটা জেলা। সামুদ্রিক মাছ রোদে শুকিয়ে শুটকি তৈরি করা হয়। আর এই শুটকি সারাবছর এলাকার লোকেদের খাদ্যতালিকায় স্থান করে নেয়। সেখানকার অনেক মানুষকে শুটকিমাছের গুঁড়ো ভাতের ওপর ছড়িয়ে দিয়ে খেতে দেখেছি। সমুদ্রের মাছ লইট্যা, লাক্ষা, ছুরি, চাঁদা মাছ প্রধানত শুটকির তালিকায় স্থান পেলেও মিঠা জলের পুঁটি মাছের শুটকি অনেক জনপ্রিয়। এই শুটকিকে বলা হয় চ্যাপাশুটকি। বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলে এই শুটকির কদর লক্ষ্য করা যায়। পুঁটিমাছ ধরার পর নাড়িভুঁড়ি ফেলে দিয়ে মাছের তেল দিয়ে মাছ মেখে একটু রোদে শুকিয়ে মটকায় ভরে বায়ুরোধী করে মাটিতে পুঁতে রেখে ৪/৫ মাস পর মাটির নিচে থেকে উঠিয়ে ঢাকনা খুলে থরে থরে সাজানো পুঁটিমাছ বের করে বাজারে বিক্রি করা হয়। ঝাল কাঁচা লঙ্কা বেশি দিয়ে রসুন-পেঁয়াজসহ ভালোভাবে হাত দিয়ে মিহি করে মেখে গরম ও আঠালো ভাত দিয়ে খাওয়া হয়। চ্যাপা শুটকির রান্না তীব্র গন্ধযুক্ত।

সিদল ভর্তা বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের বিশেষ করে দিনাজপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, নীলফামারি, লালমনিরহাট ও রংপুর অঞ্চলের বিশেষ পছন্দনীয় খাবার। বর্ষাকালে টাকিমাছের শুটকি সামগাইনে (বড় আকারের কাঠের হামানদিস্তা) গুঁড়ো করে রসুন, কাঁচালঙ্কা, আদা, হলুদ, মানকচুর ডাঁটা দিয়ে মিহি করে ছেঁচে গোলাকৃতি করে মণ্ড তৈরি করা হয়। তারপর তা শুকিয়ে তাওয়ায় ভেজে খাওয়া হয়।

বৃহত্তর রংপুর দিনাজপুরে বিশেষত নিলফামারি জেলায় একটি শাক পাওয়া যায়, যা লাফা শাক বা নাপা শাক (ইংরেজি নাম Malva Parviflora) নামে পরিচিত। ওখানে শাকটাকে অল্প ঝোল রেখে আঠা আঠা করে রান্না করে চুলার ওপর কাপড় দিয়ে ঢেকে রেখে পরে পরিবেশন করা হয়। এই শাকের ঔষধগুণ আছে।

বরিশাল এলাকায় প্রচুর নারিকেল পাওয়া যায়। ফলে সেখানকার খাদ্যে নারকেলের প্রভাব বেশি। ওখানকার মানুষ মোলিতা নামের একটি শরবত জাতীয় একট খাদ্য তৈরি করে। যার মধ্যে থাকে চালের গুঁড়ো, খই আর আখের গুড়। পরিবেশনকালে এর সাথে আদার কুচি মিশিয়ে দেয়া হয়।

কেউ বলে আমাবরি, কেউ বলে আমবলী। এটি বরিশালের একটি বিশেষ ধরনের ভাপা পিঠা। তবে সাধারণ পদ্ধতিতে এটি ভাপ দেয়া হয় না। উপকরণের মধ্যে থাকে কোরানো নারকেল, গুড়, চালের গুঁড়ো। কলাপাতা দিয়ে মুড়িয়ে ভাপ দেয়া ধানের মধ্যে একটুখানি গর্ত করে পিঠাটাকে ধান দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়। ধানের ভাপে পিঠাটা সেদ্ধ হয়।

ফেনী এবং নোয়াখালি অঞ্চলের জনপ্রিয় পিঠা খোলাজা/খোলাজালি পিঠা। মাটির খোলায় বানানো এবং জালির মতো দেখতে হয় বলে এর নাম খোলাজালি পিঠা। একই সাথে চিতই পিঠা এবং দোসার মতো দেখতে। মাঝখানে থাকে ডিম।

নোয়াখালি অঞ্চলে বিন্নি চাল দিয়ে চমৎকার একটি খাদ্য তৈরি হয়। এটিকে ভাপা পিঠার মত বাষ্পে সিদ্ধ করা হয়। সাথে যোগ করা হয় নারকেল, গুড় এবং ডিমপোচ। আঠালো বিন্নিভাতের সমন্বয়ে হয়ে ওঠে চমৎকার কোরমা জাতীয় একটি খাদ্য।

যতই ধর্ম আর আঞ্চলিকতা দিয়ে বাঙালির খাদ্যাভ্যাসকে বিভাজন করতে যাই না কেন, সেই যে শুরুতে বলেছিলাম, মাছে ভাতে বাঙালি, শেষ কথা কিন্তু সেটাই। এখন ইলিশের মরসুম, বাজারে বিশালাকার ইলিশ মাছের ছড়াছড়ি। বলুন তো এপার ওপার বাংলার কোন বাঙালি এমন সময় সর্ষে ইলিশ, ভাজা ইলিশ দিয়ে রসনা পরিতৃপ্ত করতে আগ্রহী হবেন না? ছুটির দিন বাইরে ইলশে গুঁড়ি বৃষ্টি আর ঘরে খিচুড়ি আর ভাজা ইলিশের স্বাদ পেলে মন আপনা থেকেই বলে উঠবে: ‘ইল্শে গুঁড়ি, ইল্শে গুঁড়ি! / ইলিশ মাছের ডিম।/ ইল্শে গুঁড়ি, ইল্শে গুঁড়ি­/ দিনের বেলার হিম।’

মাছের রাজা ইলিশ মাছকে কতভাবেই না উপস্থাপন করা যায়। বাঙালি গৃহিণীরা এ বিষয়ে সিদ্ধহস্ত। সর্ষে ইলিশ, ভাজা ইলিশ আর ভাপা ইলিশের বাইরে গৃহিণীরা নানা রকমভাবে ইলিশ মাছ রান্নার প্রক্রিয়া আবিষ্কার করেছেন যেমন, লাউয়ের পাতায় ইলিশ মোড়া, পুর ভরা লঙ্কা ইলিশ, ইলিশের দইপোস্ত, মোচা ইলিশের পাতুরি, ইলিশ কোপ্তা কারি, নোনা ইলিশ, স্মোকড্ হিলশা এ রকম কত কী!

লেখা শুরু করেছিলাম সপ্তদশ শতাব্দীর মঙ্গলকাব্যের কবি রায়গুণাকর ভারতচন্দ্রের উদ্ধৃতি দিয়ে। সেখানে কাতলা, কই, ভেটকি, চিতল, ফলুই, মাগুর এসব বিবিধ মাছের উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায়। মঙ্গলকাব্যের ধারায় যে মাছের উল্লেখ আছে আজকের দিনে বাঙালি গৃহিণীদের হাতের পরিচর্যায় সেই মাছ নানারূপ ধারন করে ঘরে ঘরে সকলের রসনার তৃপ্তিসাধন করছে। এই রান্না অনেক সময় বিদেশী স্পর্শ পেয়ে নতুন নাম ধারণ করেছে। যেমন ধরুন ক্রীমি পার্সলে ভেটকি মাছ। পার্সলে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের একটি উদ্ভিদের পাতা। সেখান থেকে ইউরোপ পাড়ি দিয়ে এখন এই ভিটামিসসমৃদ্ধ পাতার স্বাদ বাঙালির খাদ্যসম্ভারে স্থান করে নিয়েছে। গৃহকত্রীর হাতে যখন কাতলা মৌরি, ট্যাংরা মাছের তেলঝাল, ফুলকপি অথবা নটেশাক রুই, পাবদা মাছের ঝোল, চাঁদা বা পমফ্রেট মাছের সর্ষে ঝাল খাবার টেবিল আলো করে হাজির হয় তখন রমণীর সেবামাধুর্যে ছোঁওয়া মাছ হয়ে ওঠে অনির্বচনীয়। আবার চিরায়ত এই মাছের ঝোল শুধু তো ঝোল নয়, স্বাদের প্রকারভেদে কোনোটা ঝোল, কোনোটা ঝাল আবার কোনোটা কালিয়া।

খাবারের কথা আসলে কবিগুরুর সেই বিখ্যাত কবিতা নিমন্ত্রণের কথা মনে পড়ে যায় যেখানে তিনি একটু ঠাট্টার সুরে গদ্যজাতীয় ভোজ্যকে তাঁর ছন্দের ছোঁয়ায় রাঙিয়ে দিয়েছেন।

বেতের ডালায় রেশমি রুমাল টানা

অরুণবরণ আম এনো গোটাকত।

গদ্যজাতীয় ভোজ্যও কিছু দিও

পদ্যে তাদের মিল খুঁজে পাওয়া দায়।

তাহোক, তবুও লেখকের তারা প্রিয়,

জেনো, বাসনার সেরা বাসা রসনায়।

শোভন হাতের সন্দেশ পানতোয়া

মাছ মাংসের পোলাও ইত্যাদিও

যবে দেখা যায় সেবামাধুর্যে ছোঁওয়া

তখন সে হয় কী অনির্বচনীয়।

এবার একটু যুগ পরিবর্তন করা যাক। চলে যাই ত্রেতাযুগে। রামায়ণের পাত্রপাত্রীদের বাঙালি বলছি না। তবু বাল্মীকির রামায়ণে রাম-লক্ষণের খাবার পথ ধরে আধুনিক যুগের বাঙালির খাদ্যসম্ভারের মধ্যে একটা সূক্ষ্ম মিল খুঁজে পাওয়া যাবে। বনবাসী রাম-লক্ষণকে দেখা যায় মৃগয়া করে ফিরছেন সাথে নিয়ে নানা জাতের শুয়োর, হরিল আর তৈরি হচ্ছে শল্যপক্ব মাংস যাকে আজকালকার যুগে বলা হয় শিক কাবাব। অথবা মনে করুন অযোধ্যাকাণ্ডের সেই দৃশ্যটি যেখানে ভরদ্বাজমুনি ভরতকে আপ্যায়ন করছেন। এই প্রাচীন সাহিত্যে একটি পুরোমাত্রার খাদ্যতালিকা রয়েছে। অনেক রকম ফলের রস, সুগন্ধি স্যুপ, ময়ূর, হরিণ ছাগল আর বনমোরগের মাংস সেই সাথে ডেজার্ট হিসাবে দই, ঘোল, ছানা, পণির, পায়েস, মধু, গুড়, মিশ্রি সেইসাথে শুভ্রবর্ণ অন্ন তো আছেই। আবার ওদিকে কৃত্তিবাসী রামায়ণে রয়েছে ঘৃত দধি দুগ্ধ মধূ মধুর পায়েস, শুধু মিষ্টান্ন। এবার মঙ্গলকাব্যের দিকে চোখ ফেরাই। কবিকঙ্কনের কালকেতুতে কাঁঠাল বিচি দিয়ে রাঁধা অনবদ্য মটর ডাল, বাটা সর্ষের মখমল মসৃন কচুসেদ্ধ আধুনিক যুগের বাঙালিদেরও রসনায় বিশেষ মাত্রা এনে দেবে।

‘পা পিছলে আলুর দম’ সেই আলুর দমও তো একটা উপাদেয় খাদ্য কিন্তু সে যখন কুমড়োর সঙ্গে যুক্ত হয় তখন দমত্ব হারিয়ে এই তরকারি ছক্কায় রূপান্তরিত হয়। ওদিকে পটল আর ফুলকপির সংযোগে সে হয়ে যায় ডালনা। আর দোলমা, সে তো একমাত্র পটল দিয়েই সম্ভব। ওদিকে শস্য রচিত হয়েও যে ব্যঞ্জন ধোঁকা দেয় ঠিক যেন মাংস, সে আর কিছু নয় ডালের মসলাশ্রিত ব্যঞ্জন, তারই নাম ধোকা।

বাঙালির বিচিত্র এই খাদ্যসম্ভারের মধ্যে যতই এপার ওপার আর ধর্ম দিয়ে বিভাজন করতে যাই না কেন সব শেষ কথা, চিরন্তন সত্য “মাছে ভাতে বাঙালি”।

বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২০ , ৬ কার্তিক ১৪২৭, ৪ রবিউল ‍আউয়াল ১৪৪২

পূর্ব ও পশ্চিমের বাঙালিদের খাদ্যবিচার

আবদুল লতিফ

image

খোলাজালি পিঠা নিরামিষ তেইশ রাঁধিলা অনায়াসে

আরম্ভিলা বিবিধ রন্ধন মৎস্য মাসে।

কাতলা ভেটুক কই কাল ভাজা কে

শিক-পোডা ঝুরি কাঁঠালের বীজে ঝোল।

ঝাল ঝোল ভাজা রান্ধে চিতল ফলুই

কই মাগুরের ঝোল ভিন্ন ভাজে কই।

অন্নদা মঙ্গল (ভারতচন্দ্র)

কলকাতা থেকে আমার এক বন্ধু আমাকে অনুরোধ করেছিলেন যে আমি যেন বাঙালি মুসলমানদের খাদ্য সংস্কৃতি নিয়ে কিছু লিখি, তার ফলে বাঙালি মুসলমানদের খাদ্যরীতি সম্পর্কে ওপার বাংলার মানুষ একটা স্পষ্ট ধারণালাভ করতে পারে। প্রথমটায় আমি একটু অবাক হয়েছিলাম। কারণ মাছেভাতে বাঙালি কথাটা তো সব বাঙালির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, সেখানে হিন্দু মুসলমানকে আলাদা করে দেখার সুযোগ কোথায়? পরক্ষণেই মনে হলো সামান্য হলেও আমাদের খাদ্যাভ্যাসের মধ্যে কিছু পার্থক্য তো আছেই। যেমন, বিশেষ চতুষ্পদ জন্তুর কথা ছেড়ে দিলেও মুসলিম উৎসবগুলোর সময় আমাদের মধ্যে যে সেমাই, ফিরনি, লাচ্ছাসেমাই, জর্দা বা মোগলাই খাবারের প্রচলন আছে সেটা তো বাঙালি হিন্দুদের থেকে আলাদা। আবার মিষ্টির ক্ষেত্রে বালুসাই বা বালুশাহী মিষ্টি, মনসুর মিঠাই, আন্দেশা, বরফি, হালুয়া, লাড্ডু ইত্যাদি কিছু কিছু খাবার মুসলিমদের নিজস্ব। ছোটবেলায় আমাদের বাড়ির সামনে প্রায় পাশাপাশি দুটো মিষ্টির দোকান ছিল। একটার মালিক ছিল লক্ষে্ণৗ নিবাসী জামাল খান আর তার কাছে কলকাতা নিবাসী সমীর ঘোষের। দুটো দোকানের মিষ্টির মধ্যে এটা স্পষ্ট পার্থক্য চোখে পড়তো। মুসলিম মিষ্টির দোকানটাতে যে সব মিষ্টি পাওয়া যেত তার অধিকাংশই শুকনো মিষ্টি, ছানার ব্যবহার নেই বললেই চলে, আর অন্যদিকে ঘোষবাবুর দোকানের রসগোল্লা, পান্তুয়া, সন্দেশ, চমচম, ছানার জিলিপি, রাবড়ি সবকিছুই খাঁটি ছানা দিয়ে তৈরি নানারকম মিষ্টি। আবার দুই দোকানের সিঙাড়া আর কচুরির মধ্যেও স্বাদের পার্থক্য লক্ষণীয় ছিল।

যে বিষয়টির ওপর বন্ধু গৌতমদা জোর দিয়েছিলেন সেটা হলো যে আমরা দু’টি ভিন্ন ধর্মালম্বী বাঙালি যুগ যুগ ধরে সহাবস্থান করছি, কিন্তু আমাদের যে সব আচার-আচরণ বা রীতিনীতির ক্ষেত্রে যৎসামান্য হলেও যে তফাৎটুকু আছে তা এখনো একে অপরের কাছে অজানা রয়ে গেছে। সে দিকটার ওপর আমাকে আলোকপাত করতে হবে। নিঃসন্দেহে কঠিন কাজ! কারণ, সব বাঙালির কাছে এখন দেশি বিদেশি খাদ্য জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। একদিকে মোগল সংস্কৃতি এবং সাহিত্যের পাশাপাশি যেমন রন্ধনপ্রণালি এবং খাদ্যাভ্যাসের প্রভাব সকল বাঙালিদের ওপর পড়েছে অন্যদিকে ইউরোপীয় কালচার তথা খাদ্যাভ্যাসের সুস্পষ্ট প্রভাব আমাদের সবার রন্ধনশালায় ঢুকে পড়েছে। প্রথমদিকে মোগলাই খাবার, যেমন বিরিয়ানি, কাবাব, মোগলাই পরোটা, হালুয়া, বাকরখানি মুসলিম খাদ্যতালিকাভুক্ত হলেও এখন এর প্রভাব ও চাহিদা জাতিধর্মনির্বিশেষে সকল খাদ্যরসিক বাঙালিদের কাছে সমান। ওদিকে আবার দুই বাংলাতেই চাইনিজ খাবার রেস্টুরেন্ট থেকে সবার রান্নাঘর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।

কলকাতাবাসী সাংবাদিক মিলন দত্তের বিশেষ অভিনিবেশ এবং চর্চার ক্ষেত্র বাঙালি মুসলমান এবং হিন্দু মুসলমান সম্পর্ক। তাঁর লেখা বাঙালির খাদ্যকোষ বইতে তিনি উভয়ধর্মের খাদ্যবৈচিত্র্যের প্রতি আলোকপাত করেছেন। তাঁর লেখায় দেখতে পাই-

“বাঙালির দৈনন্দিন রান্না মধ্যযুগ থেকে বিশেষ বদলায়নি। ভাজা, পোড়া, সিদ্ধ, শুক্তো, ঘণ্ট, ছ্যাঁচড়া, ছেঁচকি, চচ্চড়ি, ছক্কা, ছোকা, ঘ্যাঁট, লাফড়া বা লাবড়া, ঝাল, ঝোল, ডালনা এবং অম্বলের উল্লেখ আমরা মধ্যযুগের সাহিত্যে বিস্তর পাই। তবে দম, দোরমা, কালিয়া-কোপ্তা রান্না করতে শিখেছি এদেশে মুসলমানেরা আসার পরে। বিশেষত ফারসি এবং তুর্কিরা বাঙালির খাদ্যাভ্যাসকে বিপুলভাবে প্রভাবিত করেছে।”

বাঙালি হিন্দুরা যেন বাঙালি মুসলমানদের আচার ব্যবহারের সাথে পরিচিত হয় এই ছিল মিলন দত্তের প্রয়াস। উৎসব আনন্দ, খাবারদাবার ও সংস্কৃতির সাথে পরিচয়ের মাধ্যমে দুই বাঙালির সম্প্রীতির বন্ধন যেন দৃঢ় হয় এই হলো তাঁর বাসনা। খুসকা যে ঘি দিয়ে রান্না করা ভাত, ক’জন বাঙালি হিন্দু একথা জানেন? এলোঝেলো পূর্ববঙ্গের উৎসবে ময়দা দিয়ে বানানো ভাজা মিষ্টি এও বোধ করি পশ্চিম বাংলার বাঙালিদের অজানা।

ধর্মীয় কারণে দুই জাতির খাদ্যাভ্যাসের যে পার্থক্য আছে তা হলো মুসলিম ধর্মে কোনো কোনো খাবারের ওপর নিষেধাজ্ঞা। ধর্মীয় বিধিনিষেধের কারণে এগুলো খাওয়া নিষিদ্ধ বা হারাম। স্বভাবতই ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা এ-ধরনের খাদ্য গ্রহণ করেন না। এর মধ্যে আছে শূকরের মাংস, যা সুস্পষ্টরূপে ধর্মগ্রন্থে নিষেধ করা আছে। অন্য যে সব খাদ্যের প্রতি বিধিনিষেধ আরোপ করা আছে তা হলো, দাঁতবিশিষ্ট হিংস্র জন্তু যেমন, বাঘ, চিতা বাঘ, সিংহ, কুকুর ইত্যাদি। থাবা বা পাঞ্জা বিশিষ্ট হিংস্র পাখি যেমন, ঈগল, বাজ, পেঁচা ইত্যাদি। ধর্মীয় বিধান অনুসারে মুসলিমরা কচ্ছপের মাংসও পরিহার করে থাকে। কাঁকড়া ও চিংড়ির ক্ষেত্রে মুসলমানদের নিজেদের মধ্যে মতভেদ আছে। এ ধরনের খাদ্যকে বলা হয় মাকরুহ, যা নিষিদ্ধ নয় তবে পরিহার করা উত্তম। আকাশপথে ভ্রমণ করার সময় প্রায় সব এয়ারলাইন্সে যেমন আমিষ ও নিরামিষভোজিদের জন্যে আলাদা খাদ্যতালিকা থাকে তেমনি মুসলিম ফুড বলেও একটা পৃথক মেনু রাখা থাকে। যেসব প্রাণির মাংস মুসলিমদের জন্যে বৈধ, সেগুলোকে জবাই করার সময় একটা ধর্মীয় বিধান মেনে চলতে হয়। তা না করলে বৈধ বা হালাল পশুর মাংসও মুসলিমদের জন্যে বৈধ থাকে না। যাঁরা কঠোরভাবে ধর্মের অনুসারী, তারা এ বিষয়টিও মেনে চলেন।

সম্ভবত, মুসলমানদের খাদ্য তালিকার ক্ষেত্রে ওপরে যে সব ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞার কথা উল্লেখ করেছি, এর বাইরে খুব বেশি কিছু বলার নেই। সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় হলো গোমাংস ভক্ষণ। এ নিয়ে ভারতের মাটিতে বিরাট বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে, এমনকি এ নিয়ে দ্ইু সম্প্রদায়ের মানুষকে বহুবার দাঙ্গা হাঙ্গামার মুখোমুখি হতে হয়েছে। আমার স্বল্পজ্ঞানে যতটুকু জেনেছি তাতে মনে হয় পুরাকালে কোনো একসময় হিন্দুসমাজে গোমাংস ভক্ষন সিদ্ধ ছিল। চন্দন নন্দী লিখিত ‘Rammohan Roy Would Have Demolished the Sacred Cow Myth’ (২২ মে ২০১৫) প্রবন্ধে জানিয়েছেন যে বাঙালি সমাজের রেনেসাঁর অগ্রদূত রাজা রামমোহন রায় তাঁর

লেখা Hindu Authorities in Favour of Slaying the Cow and Eating its Flesh. প্রবন্ধে হিন্দুসমাজের গোমাংস ভক্ষনের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেছেন। এই প্রবন্ধে রাজা রামমোহন ঋকবেদের উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছেন আদি হিন্দু সমাজে গোমেধ এবং অশ্বমেধ ধর্মীয় আচরণসিদ্ধ ছিল। বর্তমানে অবশ্য কোন ধর্মের লোকই অশ্বমাংস খায় না। বুদ্ধদেব বসু বাঙালি ও ভোজনবিলাস নামক প্রবন্ধে বলেছেন, “সাহিত্যিক সাক্ষ্য থেকে এ পর্যন্ত বলা যায় যে, মৌলিক আর্যরা ছিলেন দুর্ধর্ষভাবে মাংসাশী ও মদ্যপ, আসক্ত ছিলেন সুগন্ধ গোদুগ্ধে ও গোমাংসে- তাঁদের গোমাংসপ্রিয়তার অনেক প্রমাণ অতি পবিত্র ঋগে¦দেই ছড়িয়ে আছে।... কবে এবং কেমন করে, গোমাংস ও শূকরমাংস দুটোই নিষিদ্ধ হয়ে গেল, এবং আমিষ-নিরামিষের ভেদচিহ্নে দ্বিখণ্ডিত হলো ভারতভূমি- সেই ইতিহাস আজ পর্যন্ত অস্পষ্ট থেকে গেছে, এমনকি আমরা এও জানি না এই সব নিষেধাজ্ঞা ধর্মের কারণে স্থাপিত হয়েছিলো, না কি প্রয়োজনের চাপে।”

তৃণভোজী জাবরকাটা এবং খুর দ্বিবিভক্ত এই জাতীয় স্তন্যপায়ী প্রাণির মাংস মুসলমানদের খাদ্যতালিকায় আছে। যেমন, গরু, ছাগল, হরিণ, মহিষ ইত্যাদি প্রাণির মাংস মুসলমানদের জন্যে বৈধ বা হালাল।

খাদ্যাভ্যাস বিষয়টি শৈশবে প্রত্যেকের নিজস্ব পরিবারের খাদ্যগ্রহণ রীতি অনুসারে গড়ে ওঠে। ছেলেবেলায় আমরা যা কিছু খাই, সেসব খাদ্য পরবর্তী জীবনে স্বাভাবিক খাদ্য হিসাবে বিবেচিত হয়। কিছুদিন আগে সস্ত্রীক পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলাম। সেখানে পথচলার সময় রাস্তার ওপর দিয়ে একটা সাপ দ্রুতগতিতে রাস্তা পার হচ্ছিল দেখতে পাই। দেখে আমরা ভয় পেয়ে পিছিয়ে আসি। গল্পটা শুনে ওখানকার স্থানীয় একটা ছেলে বলেছিল, ‘সাপ দেখে ভয় পাবার কী আছে? সাপ তো আমরা ধরে ধরে খাই’। জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোরা আর কি খাস?’ ও বললে, ‘আমরা সাপ, ব্যাঙ, ইঁদুর, বিড়াল সবকিছুই খাই’। ‘কুকুর?’ ‘না কুকুর আমরা খাই না’। ওরা না খেলেও পৃথিবীর অন্য দেশ ফিলিপাইনের অনেক লোক কুকুর খেতে অভ্যস্ত। চাইনীজরা তো সাপ, ব্যাঙ, বাদুড়, ইঁদুর, বিড়াল এমনকি বানরের মগজ পর্যন্ত খেতে ছাড়ে না। তাই বলছিলাম, খাওয়া ব্যাপারটা অভ্যাসের ওপর নির্ভর করে।

অফিসের কাজে আমি নিজে একবার বেলজিয়ামে আমাদের এক ব্যবসা সহযোগির ওখানে গিয়েছিলাম। তারা আমার সম্মানে একটা সান্ধ্যভোজের আয়োজন করেছিল। টেবিলভর্তি খাবার আসার পরেও তারা আমাকে আমার নিজস্ব পছন্দমতো একটা খাদ্য পছন্দ করতে বললো। আমি বিনীত কণ্ঠে বললাম এখানে তো অনেক খাবার আছে, আমি স্বল্পাহারী মানুষ, আমার জন্যে এই যথেষ্ট। ওরা সে কথা মানতে রাজি না। বিশেষ কোনো দামী খাবার আমাকে পছন্দ করতেই হবে। বাধ্য হয়ে বলতে হলো, বেশ তাহলে তোমরা একটা কিছু ঠিক করো। ওরা যতগুলো আমিষ খাদ্যের উল্লেখ করলো তার কোনটাই আমার পছন্দ হচ্ছে না। শেষপর্যন্ত যখন আমাকে উটপাখির মাংসের অফার করা হলো আমি বললাম, ওটাও চলবে না। তখন ওরা যুক্তি দেখাতে শুরু করলো। বললো, তুমি মুরগির মাংস খাও? উত্তরে বলতে হলো, তা অবশ্য খাই। তবে? ওদের যুক্তি, এটাও তো মুরগিসদৃশ একটা পাখি, শুধু আকারে একটু বড়, এখানে আর কোন আপত্তি চলবে না। আমি বোঝাতে পারতাম, আমাদের জন্যে পাঞ্জা বা থাবাবিশিষ্ট পাখির মাংস বৈধ নয়। কিন্তু সেদিন ওদের উৎসাহের আতিশয্যে আর কোনো তর্ক করতে ইচ্ছে হয়নি। উটপাখির মাংস ভক্ষন করেছিলাম। খেতে অবশ্য মন্দ লাগেনি। সত্যিই তো উটের গোশত যদি হালাল হয় উটপাখির মাংস খেতে বাধা কোথায়? একটা পশু আর একটা পাখি এই তো সামান্য ফারাক।

সম্প্রদায় ছেড়ে এবার একটু আঞ্চলিকতার দিকে আসি। পূর্ববাংলার বিশেষ বিশেষ অঞ্চলে কিছু খাদ্যে স্বকীয়তা আছে। যেমন শুটকিমাছ। চট্টগ্রাম এলাকা শুটকিমাছের জন্যে বিখ্যাত। চট্টগ্রাম বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী একটা জেলা। সামুদ্রিক মাছ রোদে শুকিয়ে শুটকি তৈরি করা হয়। আর এই শুটকি সারাবছর এলাকার লোকেদের খাদ্যতালিকায় স্থান করে নেয়। সেখানকার অনেক মানুষকে শুটকিমাছের গুঁড়ো ভাতের ওপর ছড়িয়ে দিয়ে খেতে দেখেছি। সমুদ্রের মাছ লইট্যা, লাক্ষা, ছুরি, চাঁদা মাছ প্রধানত শুটকির তালিকায় স্থান পেলেও মিঠা জলের পুঁটি মাছের শুটকি অনেক জনপ্রিয়। এই শুটকিকে বলা হয় চ্যাপাশুটকি। বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলে এই শুটকির কদর লক্ষ্য করা যায়। পুঁটিমাছ ধরার পর নাড়িভুঁড়ি ফেলে দিয়ে মাছের তেল দিয়ে মাছ মেখে একটু রোদে শুকিয়ে মটকায় ভরে বায়ুরোধী করে মাটিতে পুঁতে রেখে ৪/৫ মাস পর মাটির নিচে থেকে উঠিয়ে ঢাকনা খুলে থরে থরে সাজানো পুঁটিমাছ বের করে বাজারে বিক্রি করা হয়। ঝাল কাঁচা লঙ্কা বেশি দিয়ে রসুন-পেঁয়াজসহ ভালোভাবে হাত দিয়ে মিহি করে মেখে গরম ও আঠালো ভাত দিয়ে খাওয়া হয়। চ্যাপা শুটকির রান্না তীব্র গন্ধযুক্ত।

সিদল ভর্তা বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের বিশেষ করে দিনাজপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, নীলফামারি, লালমনিরহাট ও রংপুর অঞ্চলের বিশেষ পছন্দনীয় খাবার। বর্ষাকালে টাকিমাছের শুটকি সামগাইনে (বড় আকারের কাঠের হামানদিস্তা) গুঁড়ো করে রসুন, কাঁচালঙ্কা, আদা, হলুদ, মানকচুর ডাঁটা দিয়ে মিহি করে ছেঁচে গোলাকৃতি করে মণ্ড তৈরি করা হয়। তারপর তা শুকিয়ে তাওয়ায় ভেজে খাওয়া হয়।

বৃহত্তর রংপুর দিনাজপুরে বিশেষত নিলফামারি জেলায় একটি শাক পাওয়া যায়, যা লাফা শাক বা নাপা শাক (ইংরেজি নাম Malva Parviflora) নামে পরিচিত। ওখানে শাকটাকে অল্প ঝোল রেখে আঠা আঠা করে রান্না করে চুলার ওপর কাপড় দিয়ে ঢেকে রেখে পরে পরিবেশন করা হয়। এই শাকের ঔষধগুণ আছে।

বরিশাল এলাকায় প্রচুর নারিকেল পাওয়া যায়। ফলে সেখানকার খাদ্যে নারকেলের প্রভাব বেশি। ওখানকার মানুষ মোলিতা নামের একটি শরবত জাতীয় একট খাদ্য তৈরি করে। যার মধ্যে থাকে চালের গুঁড়ো, খই আর আখের গুড়। পরিবেশনকালে এর সাথে আদার কুচি মিশিয়ে দেয়া হয়।

কেউ বলে আমাবরি, কেউ বলে আমবলী। এটি বরিশালের একটি বিশেষ ধরনের ভাপা পিঠা। তবে সাধারণ পদ্ধতিতে এটি ভাপ দেয়া হয় না। উপকরণের মধ্যে থাকে কোরানো নারকেল, গুড়, চালের গুঁড়ো। কলাপাতা দিয়ে মুড়িয়ে ভাপ দেয়া ধানের মধ্যে একটুখানি গর্ত করে পিঠাটাকে ধান দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়। ধানের ভাপে পিঠাটা সেদ্ধ হয়।

ফেনী এবং নোয়াখালি অঞ্চলের জনপ্রিয় পিঠা খোলাজা/খোলাজালি পিঠা। মাটির খোলায় বানানো এবং জালির মতো দেখতে হয় বলে এর নাম খোলাজালি পিঠা। একই সাথে চিতই পিঠা এবং দোসার মতো দেখতে। মাঝখানে থাকে ডিম।

নোয়াখালি অঞ্চলে বিন্নি চাল দিয়ে চমৎকার একটি খাদ্য তৈরি হয়। এটিকে ভাপা পিঠার মত বাষ্পে সিদ্ধ করা হয়। সাথে যোগ করা হয় নারকেল, গুড় এবং ডিমপোচ। আঠালো বিন্নিভাতের সমন্বয়ে হয়ে ওঠে চমৎকার কোরমা জাতীয় একটি খাদ্য।

যতই ধর্ম আর আঞ্চলিকতা দিয়ে বাঙালির খাদ্যাভ্যাসকে বিভাজন করতে যাই না কেন, সেই যে শুরুতে বলেছিলাম, মাছে ভাতে বাঙালি, শেষ কথা কিন্তু সেটাই। এখন ইলিশের মরসুম, বাজারে বিশালাকার ইলিশ মাছের ছড়াছড়ি। বলুন তো এপার ওপার বাংলার কোন বাঙালি এমন সময় সর্ষে ইলিশ, ভাজা ইলিশ দিয়ে রসনা পরিতৃপ্ত করতে আগ্রহী হবেন না? ছুটির দিন বাইরে ইলশে গুঁড়ি বৃষ্টি আর ঘরে খিচুড়ি আর ভাজা ইলিশের স্বাদ পেলে মন আপনা থেকেই বলে উঠবে: ‘ইল্শে গুঁড়ি, ইল্শে গুঁড়ি! / ইলিশ মাছের ডিম।/ ইল্শে গুঁড়ি, ইল্শে গুঁড়ি­/ দিনের বেলার হিম।’

মাছের রাজা ইলিশ মাছকে কতভাবেই না উপস্থাপন করা যায়। বাঙালি গৃহিণীরা এ বিষয়ে সিদ্ধহস্ত। সর্ষে ইলিশ, ভাজা ইলিশ আর ভাপা ইলিশের বাইরে গৃহিণীরা নানা রকমভাবে ইলিশ মাছ রান্নার প্রক্রিয়া আবিষ্কার করেছেন যেমন, লাউয়ের পাতায় ইলিশ মোড়া, পুর ভরা লঙ্কা ইলিশ, ইলিশের দইপোস্ত, মোচা ইলিশের পাতুরি, ইলিশ কোপ্তা কারি, নোনা ইলিশ, স্মোকড্ হিলশা এ রকম কত কী!

লেখা শুরু করেছিলাম সপ্তদশ শতাব্দীর মঙ্গলকাব্যের কবি রায়গুণাকর ভারতচন্দ্রের উদ্ধৃতি দিয়ে। সেখানে কাতলা, কই, ভেটকি, চিতল, ফলুই, মাগুর এসব বিবিধ মাছের উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায়। মঙ্গলকাব্যের ধারায় যে মাছের উল্লেখ আছে আজকের দিনে বাঙালি গৃহিণীদের হাতের পরিচর্যায় সেই মাছ নানারূপ ধারন করে ঘরে ঘরে সকলের রসনার তৃপ্তিসাধন করছে। এই রান্না অনেক সময় বিদেশী স্পর্শ পেয়ে নতুন নাম ধারণ করেছে। যেমন ধরুন ক্রীমি পার্সলে ভেটকি মাছ। পার্সলে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের একটি উদ্ভিদের পাতা। সেখান থেকে ইউরোপ পাড়ি দিয়ে এখন এই ভিটামিসসমৃদ্ধ পাতার স্বাদ বাঙালির খাদ্যসম্ভারে স্থান করে নিয়েছে। গৃহকত্রীর হাতে যখন কাতলা মৌরি, ট্যাংরা মাছের তেলঝাল, ফুলকপি অথবা নটেশাক রুই, পাবদা মাছের ঝোল, চাঁদা বা পমফ্রেট মাছের সর্ষে ঝাল খাবার টেবিল আলো করে হাজির হয় তখন রমণীর সেবামাধুর্যে ছোঁওয়া মাছ হয়ে ওঠে অনির্বচনীয়। আবার চিরায়ত এই মাছের ঝোল শুধু তো ঝোল নয়, স্বাদের প্রকারভেদে কোনোটা ঝোল, কোনোটা ঝাল আবার কোনোটা কালিয়া।

খাবারের কথা আসলে কবিগুরুর সেই বিখ্যাত কবিতা নিমন্ত্রণের কথা মনে পড়ে যায় যেখানে তিনি একটু ঠাট্টার সুরে গদ্যজাতীয় ভোজ্যকে তাঁর ছন্দের ছোঁয়ায় রাঙিয়ে দিয়েছেন।

বেতের ডালায় রেশমি রুমাল টানা

অরুণবরণ আম এনো গোটাকত।

গদ্যজাতীয় ভোজ্যও কিছু দিও

পদ্যে তাদের মিল খুঁজে পাওয়া দায়।

তাহোক, তবুও লেখকের তারা প্রিয়,

জেনো, বাসনার সেরা বাসা রসনায়।

শোভন হাতের সন্দেশ পানতোয়া

মাছ মাংসের পোলাও ইত্যাদিও

যবে দেখা যায় সেবামাধুর্যে ছোঁওয়া

তখন সে হয় কী অনির্বচনীয়।

এবার একটু যুগ পরিবর্তন করা যাক। চলে যাই ত্রেতাযুগে। রামায়ণের পাত্রপাত্রীদের বাঙালি বলছি না। তবু বাল্মীকির রামায়ণে রাম-লক্ষণের খাবার পথ ধরে আধুনিক যুগের বাঙালির খাদ্যসম্ভারের মধ্যে একটা সূক্ষ্ম মিল খুঁজে পাওয়া যাবে। বনবাসী রাম-লক্ষণকে দেখা যায় মৃগয়া করে ফিরছেন সাথে নিয়ে নানা জাতের শুয়োর, হরিল আর তৈরি হচ্ছে শল্যপক্ব মাংস যাকে আজকালকার যুগে বলা হয় শিক কাবাব। অথবা মনে করুন অযোধ্যাকাণ্ডের সেই দৃশ্যটি যেখানে ভরদ্বাজমুনি ভরতকে আপ্যায়ন করছেন। এই প্রাচীন সাহিত্যে একটি পুরোমাত্রার খাদ্যতালিকা রয়েছে। অনেক রকম ফলের রস, সুগন্ধি স্যুপ, ময়ূর, হরিণ ছাগল আর বনমোরগের মাংস সেই সাথে ডেজার্ট হিসাবে দই, ঘোল, ছানা, পণির, পায়েস, মধু, গুড়, মিশ্রি সেইসাথে শুভ্রবর্ণ অন্ন তো আছেই। আবার ওদিকে কৃত্তিবাসী রামায়ণে রয়েছে ঘৃত দধি দুগ্ধ মধূ মধুর পায়েস, শুধু মিষ্টান্ন। এবার মঙ্গলকাব্যের দিকে চোখ ফেরাই। কবিকঙ্কনের কালকেতুতে কাঁঠাল বিচি দিয়ে রাঁধা অনবদ্য মটর ডাল, বাটা সর্ষের মখমল মসৃন কচুসেদ্ধ আধুনিক যুগের বাঙালিদেরও রসনায় বিশেষ মাত্রা এনে দেবে।

‘পা পিছলে আলুর দম’ সেই আলুর দমও তো একটা উপাদেয় খাদ্য কিন্তু সে যখন কুমড়োর সঙ্গে যুক্ত হয় তখন দমত্ব হারিয়ে এই তরকারি ছক্কায় রূপান্তরিত হয়। ওদিকে পটল আর ফুলকপির সংযোগে সে হয়ে যায় ডালনা। আর দোলমা, সে তো একমাত্র পটল দিয়েই সম্ভব। ওদিকে শস্য রচিত হয়েও যে ব্যঞ্জন ধোঁকা দেয় ঠিক যেন মাংস, সে আর কিছু নয় ডালের মসলাশ্রিত ব্যঞ্জন, তারই নাম ধোকা।

বাঙালির বিচিত্র এই খাদ্যসম্ভারের মধ্যে যতই এপার ওপার আর ধর্ম দিয়ে বিভাজন করতে যাই না কেন সব শেষ কথা, চিরন্তন সত্য “মাছে ভাতে বাঙালি”।