সাময়িকী কবিতা

ভাস্কর ১৯৭১

মঈনউদ্দিন মুনশী

নিশ্চিন্ত তোরণ খুলে যেতে যেতে মনে রেখো

তুমুল জন্মক্ষণ

দাবি ফিরে আসে চেতনার ডালপালায়

স্মৃতির ডানা ধূসরতা, প্রদীপে জন্ম আলো

ফোয়ারা হয়ে উঠে আসে সুন্দর আনন্দ জল

সেই পিঙ্গল সময় দুরূহ আঁধার থেকে তুলেছিল আলো

তুলে নিতে হয়েছিলো তাকে

এলোমেলো সময়ের নৌকোয় পূর্বপুরুষের দিকে চেয়ে

স্পর্শ রেখে গেলে মজ্জায় পতাকা ওড়ে কেন্দ্রে আমাদের রক্ত

তবু তুমি পরিপূর্ণ নও

অগণ্য থাবা লাফিয়ে সেই ক্ষণ ভাঙে

পাবার আশায় ছেড়ে দিতে হবে

কপালে স্পর্শ রেখে দায়িত্ব বাড়িয়ে দেয় হাত

সেই থেকে আমাদের আবরণ হয়ে আছে আলো

শিরায় পতাকা টেনে আনে কোমলাভা স্রোতে

শিউলি ভোরের হাতে বেঁচে থাকবার ছন্দ

সমস্ত সত্তা চোখের যমুনা হয় সূর্যের ধরিত্রী

ভালবাসা

ইকরাম কবীর

এইতো ছিল

প্রসূনে শিশিরের মতো

সূর্যালোকে মিলনেচ্ছু

ধাঁধিয়ে আমার হৃদয়।

যখন তুমি সাথে থাকো

শাহিন চাষী

প্রশস্ত প্রশান্তি হঠাৎ

আলতো ছুঁয়ে গেলো বেদনা ঢাকা জড়সড় ঠোঁট

মুহুর্তেই পৃথিবী আশ্চর্য অরূপ, উপল...

আমি দেখলাম-

আমার দিকে অবারিত আকাশ নিমগ্ন কৌতূহলী,

পাখিদের ধ্যানে হেমন্ত, মান্না, সন্ধ্যা, লতা...

ঝর্না পুলকে উদয়, পদ্মিনী, চন্দ্রকলা...

পাহাড় নিভৃতে ঘুমহীন এক প্রেমকাতর কবি।

ফুলেদের কাছে যেতেই- ফুলেরা মনমরা,

নদীর পাশে যেতেই- নদী যেন এক মৃত সাপ,

মুহূর্তেই আবীর শাখাহীন, সিঁদুরহীন...

দুরন্ত, বাচাল প্রজাপতি বাকহীন- চুপচাপ।

আমি দেখলাম-

প্রশান্ত হিংসায় চাঁদের মুখ জুড়ে ধোঁয়াটে উচ্ছ্বাস;

বিধিহীন ব্যাকরণে তারারা ডানপিটে,

নীরবে উদাস, উল্কা, নীহারিকা...

জোনাকির পাখায় পথ হারানোর স্বরলিপি।

তখন বিস্মিত মন,

হৃদয়ের গহন ভেতর অবিরল আলোর ঝলকানি,

অরূপ মায়ায় জাগ্রত শুধু তোমার মুখখানি

দুটি কবিতা

শাকিল রিয়াজ

শীতকে নিয়ে

শাদা কাপড়ের শীত এসে থেকে যায়

ধরণীর ঋতু থেমে গেল এই দেশে!

তুষার মাথায় ঘরগুলো যেন

হুজুরের মত টুপি পড়ে আছে

আর শোনা যায় মিলাদের ধ্বনি কুলখানি কুলখানি।

এ শহর খুব মরে গেল হৃদরোগে

সিঁড়ির গোড়ায় কাফনের মত স্নো

বসে থাকে ঠিক গোরের আশায় চুপ

কাফনের পাশে আমরা একেক আগরবাতির মত

নিঃশ্বাস ঠিক ধোঁয়ার আকারে বাতাসে লুটিয়ে মরে

গাড়ির বনেটে হার্ট এঁকে তুই

লিখেছিলি প্রিয় নাম

নতুন তুষারে চাপা পড়ে গেল তাও।

তোমাদের দেশে পৃথিবীটা কত লাল

তোমাদের রঙবালাদের দেশে ঋতুগুলো বদলায়

তোমাদের দেহে কার্তিক আসে ফাগুনের রস জাগে

তোমাদের ঋতু চির বহমান তোমাদেরই ভঙ্গিতে

ধরণী এখানে বৃদ্ধা হয়েছে ভঙ্গিটা জবুথবু

এইখানে শীত আলঝেইমারে ভোগে

এইখানে শীত এসেছে কিন্তু পথ হারিয়েছে যেতে

এই শহরেই ধরণী তোমার ঋতু থেমে গেল, হায়!

সহজ ঘুম

রাত চলেছে রূঢ় ট্রেনের ছাদে

স্পর্শহীন নিঝুম এক দ্বীপে

আঁধার থেকে ডেকেছে রাণী, এসো

কল্পনার নরম কোনো পথে।

চিরদিনের অন্ধকার ঘেঁটে

অযুত দানা নিয়েছিলাম দেহে

চোখের পানি শিখেছে গুঞ্জন

বিরান হুইসেলের সুর থেকে।

মুখভর্তি উষ্ণতার লালা

বরফ বেঁধে নিজেই গলে যাই

ঝরনা থেকে অবহেলার নদী

ফিরে যাচ্ছে হিমালয়ের দিকে।

নিবিড় বোধে ছোট বিবাদ এক

বাঁধিয়ে দিয়ে কোথায় যাও ট্রেন?

আলো পড়েছে নক্ষত্র থেকে

একটি অনাবিষ্কৃতের চাঁদে।

শরীর থেকে ভাঁজের রেখা নিয়ে

অবলীলায় আঁকি অন্ধকার

কালো দেহের সেদ্ধ দানা লুটে

বসে আছেন যে অপরূপ শাদা,

তারই কাছে হাত পেতেছি, দাও

রূপোর ঘুমে সোনার কাঠি নেড়ে

অদেখা সেই সহজ ঘুম আজ

নদীর মতো চলুক অন্তিমে।

[গত শতকের নব্বইয়ের দশকের কবি শাকিল রিয়াজ। এখন প্রবাসে বসবাস করছেন। দীর্ঘ বিরতির পর আবার লিখতে শুরু করেছেন। গত ১৭ অক্টোবর ছিল তার জন্মদিন। তাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা।]

আপনার শরীর জাগিয়ে রাখুন

জয়নাল আবেদীন শিবু

আপনাকেই বলছি, শুনুন

যদি মুখ বুঁজে থাকেন

নির্ঘাৎ বোবাদের কাতারে চলে যাবেন...

আপনি না জানার কথা নয়-

এ দেশ যে আউল-বাউল, পীর-ফকির

সাধক-সন্ন্যাসী নানা মত-পথের মানুষের;

যারা মৃত্তিকার সন্তান

মানবিক শিরস্ত্রাণ পরা

সহজ মানুষ, সুন্দরের সাধক।

এঁদের টুঁটি চেপে ধরতে দেখলে বুঝবেন

আপনারই কণ্ঠরোধে কেউ উদগ্র বাসনা নিয়ে

ছুটে আসছে-

আপনার শরীর জাগিয়ে রাখুন

শিরদাঁড়া সোজা করে, শক্ত করে;

নয়তো দেখবেন হাজার বছরের সাম্যের ধারায়

উৎসারিত লোকবাংলার অপমৃত্যু ঘটছে

ধর্মান্ধের হাতে।

ধর্মান্ধরা চোখে দেখে না

এরা উন্মাদ

দিনকানা, রাতকানা

বর্বর, হন্তারক।

ধার্মিকেরা ধর্ম বুঝে

ধর্মান্ধে নয়;

ধর্মান্ধরা বুঝে আগুন-অস্ত্র, চাকু-চাপাতি।

অতএব, সোজা ও সহজিয়া প্রস্তাব-

সংবদ্ধ হোন-

আষাঢ়ের জল দিয়ে

ধুয়ে দেই স্বদেশ।

চাঁদের নাভিপদ্ম

হাশিম কিয়াম

ইটভাটার গাঢ় ধোঁয়ায় গোসল করে একঝাঁক বক

তারাদের চোখের তারায় ঝুলছে একহেঁশেল ঝুল

চাঁদের নাভিপদ্মে চুমু খায় নিকোটিনমাখা ঠোঁট

গাঁজার কলকেতে কষে দম দেয়

রাঙা সূর্যের ফুসফুস হেমন্তের দীঘির জলে

কেঁপে কেঁপে ওঠে কিশোরীর লাজুক মুখ

কাশফুলের সাদা গন্ধ মেখে নেয় হায়েনার দাঁত

শরতের শিউলির রঙে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ

বাবুই পাখির বাসায় কালপেঁচার মচ্ছপ

হৃৎপণ্ড ফুটো করে উড়ে গেছে অধরা পাখি

তোমার গলায় শোভা পায় সাতটি তারার মালা

হৃদয়ে বাস করে গিরগিটির ছানা

অমাবস্যা উঁকি মারে ধবধবে সাদা দাবনায়

ঘুমের সময় জেগে আছি

আদ্যনাথ ঘোষ

রোদ আছে, আলোর সজীবতা নেই কোনোখানে

তবু তার তীক্ষ্ণ আভা পড়ে আছে-

কতোকাল আঁধার-চোখের জলে

প্রাণপনে ডুব দিয়ে উঠে আসি

সোনালি ফসলের আশায় ঝুরঝুরে মাটির আঁচল তলে।

কতো আশা জেগে থাকে কুমারী মাঠের চেয়ে থাকা বুকে

কতোদিন বয়ে যায় মাঠ ঘাট স্বপ্নের তীরে

কোনকালে ফোটবার ইচ্ছায় রূপের পাপড়ি খুলে

থই থই আঁধার জলে

আলোময় দরজাতে মাথা ঠুকে

দূরে- আরো দূরে- বাতাসের অমলিন পাখনায়

ইপ্সিত আলোর আশায়

ঘুমের সময় জেগে আছি তোমারই উদাত্ত আহ্বানে।

সেদিন বিকেলের রোদ

তরুন ইউসুফ

সেদিন বিকেলের রোদ

পড়তে গিয়ে দেখি

তার কয়েকটি পাতা ছেঁড়া

রয়ে গেছে মোহিনীর কাছে

সুতরাং,

আমার আর রোদ পড়া হলো না,

পড়তে হলে

পেতে হবে মোহিনীকে

কিন্তু,

সেতো দীর্ঘস্থায়ী ধূমকেতু,

আমাদের ক্ষণস্থায়ী জীবন

ক্ষীয়মান

পায় না তেমন, হারায়ে যায়

যেমন:

রোদ কিংবা মোহিনী

কয়েকটি জীবন চাই

তাদের পেতে।

শূন্যতা

মিলু শামস

এই স্মৃতিটা

তুমি হয়ে বাজে

একলা থাকার ঘোর সময়ে

বুকের কোনও খাঁজে;

শেষ দেখাটা হলনা শেষ

দেয়াল দিল তুলে

সন্ধ্যা এসে লুটিয়ে পড়ে

রাত্রি স্রোতের জলে;

আসছে বারে ভীষণ না হয় ঝড়ই হব

উড়িয়ে দিয়ে সকল কাঁটা শক্ত হয়ে রব

তুমি আমি অনিমিখে মিশে রব

ভীষণ না হয় ঝড়ই হব, ঝড়ই হব।

পৌরুষ

জান্নাতুল বাকেয়া কেকা

পৌরুষ, শিশ্নের উত্থানেই তোমার স্বর্গসুখ?

তোমার উন্নত শিশ্ন যখন যোদিপ্রদেশে ভ্রমণ করে

আহলাদে আটখানা তুমি বিশ্বব্রহ্মা- জয় করো!

তোমার শিশ্নের উল্লাসে ভাসাও চারপাশ

তখন অট্টহাসির তোড়ে হাঁসো

বলো দেখো আমি বীর পুরুষ সব পারি!

গড়তে পারি, বপন করতে পারি বীজ

সেই বীজ থেকে মহীরুহের মতো

এক-একটি ভ্রুণ হয়ে উঠে মানুষ

তখন তোমার আহ্লাদ দেখে কে!

কিন্তু যখন তোমার শিশ্নের অতি উল্লাস

মধ্যরাতের নীরবতা খানখান করে

চারপাশ যন্ত্রণার তীক্ষèতায় ছন্দপতন ঘটায়

তুমি আরোপিত যন্ত্রণা হয়ে ভেঙ্গে পড়

সেই যন্ত্রণায় বিদীর্ণ হয় তোমার প্রিয়জন

তখন আমি বলি কি থামাও তোমার শিশ্নের অতি উল্লাস

প্রকৃতি নিস্তার চাই, তুমি থামাও তোমার উদ্ধত্য যৌবন।

হেমনকুয়াশা দ্রুতগামী

ট্রেনের মতো

উদয় শংকর দুর্জয়

এখন হেমনকুয়াশা দ্রুতগামী ট্রেনের মতো, পলকে উড়িয়ে নেয়

অন্য কাঁচের জংশনে। সেই জংসনের ঝুল বারান্দায় সিনথেটিক-শিশির

তুলে রাখে হেমন্তলোহিত চিঠি, বহু আগেকার। পাল্টে গ্যাছে

বালিহাঁসের একদীঘি কোলাহল; লক্ষীবিলাসের মাঠে জমেছে

সিলিকনের জম জমাট বিনিময়, কখন শরত কখন হেমন্ত

কখন যে বসন্ত চৌকাঠে ঢালে মধুরবিষ! ওই যে দ্রুতগামী

ভীষণ এক ডানাওয়ালা ট্রেন! সব উড়িয়ে নিয়ে যায়।

ধূম্রজালিক-গোধূলি ছেড়ে গেছে সবুজ বলাকার দল।

গাছের পাতার বদলে বিল্ডিং ধ্বসে চুরচুর, শিশিরের বদলে মিছিল

কোথা থেকে কোন দাপুটে ঝড় এসে

বসিয়েছে কনক্রিটের আদলে হেমবীথি বসন্ত।

শৈবাল ঘেরা ডাকবক্স শুধুই ছবিঘর, পত্রচ্যুত শব্দ

মিলিয়ে গেছে আর্টিফিশিয়াল-শারদ আগমনে। গোল্লাছুটের উঠোনে

উড়ো হাওয়া, পশ্চিমা-অটাম, গিরিতট ফিরিয়ে নিয়েছে

গন্তব্যের ফ্লাইটসূচি। ধীরলয়ে ভেঙে যাচ্ছে রোজ

জল ও বায়ুর অবিচ্ছেদ্য সংগম।

চিবুকের ভাঁজ

মাহাবুবা লাকি

পায়ের পাতা থেকে চুল, বুক ও চিবুকের ভাঁজ,

আমার রক্ষিত যতো ভাষা

তোমার পায়ের নিচেই তবে থাক।

শিহরিত হয়ে দেখি দু’চোখের মোহিনী আড়াল,

ফাল্গুনের রঙে আসে স্বপ্নবাজ পাখি।

পেয়েও হয়নি তাকে পাওয়া,

তাজমহলের উচ্চতায় নয়, প্রেমের আবিরে ডুবে যাই।

আশাহত ইচ্ছেরা তাই আজ দুঃখভরা গল্প শুধু এক;

সব সুখ দিয়েছি আমি তাকে!

বন্ধু, যদি তুমি নাও

জোবায়ের মিলন

সুলতানপুরে যাব

সময় পেলে, অন্তত একবার- তোমার হাত ধরে

ডোবা নালা নর্দমা ঘেরা শহরের বাঁক ফেলে

চলে যাব একেবারে, যদি ঠাঁই দেয় এমন গাঁও।

পথে ও জমিনে বেড়াব

আকাশের হাত ধরে চলে যাব আকাশের পাড়ে

রৌদ্রক্লান্ত উঠান ছাড়িয়ে মেঘছায়ে দেব ডুব

পল্লি মায়ের কোলে শুয়ে ছোঁব জীবনের নিশ্চিত গান

পোড়া চোখ পুরে দেখব সবুজ পাতার বাহার, নাচ

ঝিলের শিশুতোষ ঢেউ, পুকুরের বিভঙ্গ, হাঁসের ঝাঁক

পোকামাকড়ের ঘরবসতি।

টিনের চালে আছড়ে পড়া বৃষ্টি মেয়ের

অরূপ রূপে তাকিয়ে কাটাব আনন্দ বেলা

ডাঙ্গির ধারে মাছের চাঁই পেতে বসে ভাববো- জন্মের

লাল নীল বেগুনী মলাট কথা

মাটিতে মেলে খালি পা, মাড়াব এপার-ওপার, শীতল

অনুভবে জড়াব বুকের বাঁমে সুলতানপুর।

যদি তুমি নাও

ফিরব না এই মোষড়ানো-কাগজের পীতাভ নগরে;

নিবন্ধিত হয়ে থেকে যাব তোমার সুঠৌল-গ্রামে।

গ্রামহীন আমায় নেবে বন্ধু, তোমার কৃপার ছলে হলেও?

বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২০ , ৬ কার্তিক ১৪২৭, ৪ রবিউল ‍আউয়াল ১৪৪২

সাময়িকী কবিতা

image

ভাস্কর ১৯৭১

মঈনউদ্দিন মুনশী

নিশ্চিন্ত তোরণ খুলে যেতে যেতে মনে রেখো

তুমুল জন্মক্ষণ

দাবি ফিরে আসে চেতনার ডালপালায়

স্মৃতির ডানা ধূসরতা, প্রদীপে জন্ম আলো

ফোয়ারা হয়ে উঠে আসে সুন্দর আনন্দ জল

সেই পিঙ্গল সময় দুরূহ আঁধার থেকে তুলেছিল আলো

তুলে নিতে হয়েছিলো তাকে

এলোমেলো সময়ের নৌকোয় পূর্বপুরুষের দিকে চেয়ে

স্পর্শ রেখে গেলে মজ্জায় পতাকা ওড়ে কেন্দ্রে আমাদের রক্ত

তবু তুমি পরিপূর্ণ নও

অগণ্য থাবা লাফিয়ে সেই ক্ষণ ভাঙে

পাবার আশায় ছেড়ে দিতে হবে

কপালে স্পর্শ রেখে দায়িত্ব বাড়িয়ে দেয় হাত

সেই থেকে আমাদের আবরণ হয়ে আছে আলো

শিরায় পতাকা টেনে আনে কোমলাভা স্রোতে

শিউলি ভোরের হাতে বেঁচে থাকবার ছন্দ

সমস্ত সত্তা চোখের যমুনা হয় সূর্যের ধরিত্রী

ভালবাসা

ইকরাম কবীর

এইতো ছিল

প্রসূনে শিশিরের মতো

সূর্যালোকে মিলনেচ্ছু

ধাঁধিয়ে আমার হৃদয়।

যখন তুমি সাথে থাকো

শাহিন চাষী

প্রশস্ত প্রশান্তি হঠাৎ

আলতো ছুঁয়ে গেলো বেদনা ঢাকা জড়সড় ঠোঁট

মুহুর্তেই পৃথিবী আশ্চর্য অরূপ, উপল...

আমি দেখলাম-

আমার দিকে অবারিত আকাশ নিমগ্ন কৌতূহলী,

পাখিদের ধ্যানে হেমন্ত, মান্না, সন্ধ্যা, লতা...

ঝর্না পুলকে উদয়, পদ্মিনী, চন্দ্রকলা...

পাহাড় নিভৃতে ঘুমহীন এক প্রেমকাতর কবি।

ফুলেদের কাছে যেতেই- ফুলেরা মনমরা,

নদীর পাশে যেতেই- নদী যেন এক মৃত সাপ,

মুহূর্তেই আবীর শাখাহীন, সিঁদুরহীন...

দুরন্ত, বাচাল প্রজাপতি বাকহীন- চুপচাপ।

আমি দেখলাম-

প্রশান্ত হিংসায় চাঁদের মুখ জুড়ে ধোঁয়াটে উচ্ছ্বাস;

বিধিহীন ব্যাকরণে তারারা ডানপিটে,

নীরবে উদাস, উল্কা, নীহারিকা...

জোনাকির পাখায় পথ হারানোর স্বরলিপি।

তখন বিস্মিত মন,

হৃদয়ের গহন ভেতর অবিরল আলোর ঝলকানি,

অরূপ মায়ায় জাগ্রত শুধু তোমার মুখখানি

দুটি কবিতা

শাকিল রিয়াজ

শীতকে নিয়ে

শাদা কাপড়ের শীত এসে থেকে যায়

ধরণীর ঋতু থেমে গেল এই দেশে!

তুষার মাথায় ঘরগুলো যেন

হুজুরের মত টুপি পড়ে আছে

আর শোনা যায় মিলাদের ধ্বনি কুলখানি কুলখানি।

এ শহর খুব মরে গেল হৃদরোগে

সিঁড়ির গোড়ায় কাফনের মত স্নো

বসে থাকে ঠিক গোরের আশায় চুপ

কাফনের পাশে আমরা একেক আগরবাতির মত

নিঃশ্বাস ঠিক ধোঁয়ার আকারে বাতাসে লুটিয়ে মরে

গাড়ির বনেটে হার্ট এঁকে তুই

লিখেছিলি প্রিয় নাম

নতুন তুষারে চাপা পড়ে গেল তাও।

তোমাদের দেশে পৃথিবীটা কত লাল

তোমাদের রঙবালাদের দেশে ঋতুগুলো বদলায়

তোমাদের দেহে কার্তিক আসে ফাগুনের রস জাগে

তোমাদের ঋতু চির বহমান তোমাদেরই ভঙ্গিতে

ধরণী এখানে বৃদ্ধা হয়েছে ভঙ্গিটা জবুথবু

এইখানে শীত আলঝেইমারে ভোগে

এইখানে শীত এসেছে কিন্তু পথ হারিয়েছে যেতে

এই শহরেই ধরণী তোমার ঋতু থেমে গেল, হায়!

সহজ ঘুম

রাত চলেছে রূঢ় ট্রেনের ছাদে

স্পর্শহীন নিঝুম এক দ্বীপে

আঁধার থেকে ডেকেছে রাণী, এসো

কল্পনার নরম কোনো পথে।

চিরদিনের অন্ধকার ঘেঁটে

অযুত দানা নিয়েছিলাম দেহে

চোখের পানি শিখেছে গুঞ্জন

বিরান হুইসেলের সুর থেকে।

মুখভর্তি উষ্ণতার লালা

বরফ বেঁধে নিজেই গলে যাই

ঝরনা থেকে অবহেলার নদী

ফিরে যাচ্ছে হিমালয়ের দিকে।

নিবিড় বোধে ছোট বিবাদ এক

বাঁধিয়ে দিয়ে কোথায় যাও ট্রেন?

আলো পড়েছে নক্ষত্র থেকে

একটি অনাবিষ্কৃতের চাঁদে।

শরীর থেকে ভাঁজের রেখা নিয়ে

অবলীলায় আঁকি অন্ধকার

কালো দেহের সেদ্ধ দানা লুটে

বসে আছেন যে অপরূপ শাদা,

তারই কাছে হাত পেতেছি, দাও

রূপোর ঘুমে সোনার কাঠি নেড়ে

অদেখা সেই সহজ ঘুম আজ

নদীর মতো চলুক অন্তিমে।

[গত শতকের নব্বইয়ের দশকের কবি শাকিল রিয়াজ। এখন প্রবাসে বসবাস করছেন। দীর্ঘ বিরতির পর আবার লিখতে শুরু করেছেন। গত ১৭ অক্টোবর ছিল তার জন্মদিন। তাকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা।]

আপনার শরীর জাগিয়ে রাখুন

জয়নাল আবেদীন শিবু

আপনাকেই বলছি, শুনুন

যদি মুখ বুঁজে থাকেন

নির্ঘাৎ বোবাদের কাতারে চলে যাবেন...

আপনি না জানার কথা নয়-

এ দেশ যে আউল-বাউল, পীর-ফকির

সাধক-সন্ন্যাসী নানা মত-পথের মানুষের;

যারা মৃত্তিকার সন্তান

মানবিক শিরস্ত্রাণ পরা

সহজ মানুষ, সুন্দরের সাধক।

এঁদের টুঁটি চেপে ধরতে দেখলে বুঝবেন

আপনারই কণ্ঠরোধে কেউ উদগ্র বাসনা নিয়ে

ছুটে আসছে-

আপনার শরীর জাগিয়ে রাখুন

শিরদাঁড়া সোজা করে, শক্ত করে;

নয়তো দেখবেন হাজার বছরের সাম্যের ধারায়

উৎসারিত লোকবাংলার অপমৃত্যু ঘটছে

ধর্মান্ধের হাতে।

ধর্মান্ধরা চোখে দেখে না

এরা উন্মাদ

দিনকানা, রাতকানা

বর্বর, হন্তারক।

ধার্মিকেরা ধর্ম বুঝে

ধর্মান্ধে নয়;

ধর্মান্ধরা বুঝে আগুন-অস্ত্র, চাকু-চাপাতি।

অতএব, সোজা ও সহজিয়া প্রস্তাব-

সংবদ্ধ হোন-

আষাঢ়ের জল দিয়ে

ধুয়ে দেই স্বদেশ।

চাঁদের নাভিপদ্ম

হাশিম কিয়াম

ইটভাটার গাঢ় ধোঁয়ায় গোসল করে একঝাঁক বক

তারাদের চোখের তারায় ঝুলছে একহেঁশেল ঝুল

চাঁদের নাভিপদ্মে চুমু খায় নিকোটিনমাখা ঠোঁট

গাঁজার কলকেতে কষে দম দেয়

রাঙা সূর্যের ফুসফুস হেমন্তের দীঘির জলে

কেঁপে কেঁপে ওঠে কিশোরীর লাজুক মুখ

কাশফুলের সাদা গন্ধ মেখে নেয় হায়েনার দাঁত

শরতের শিউলির রঙে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ

বাবুই পাখির বাসায় কালপেঁচার মচ্ছপ

হৃৎপণ্ড ফুটো করে উড়ে গেছে অধরা পাখি

তোমার গলায় শোভা পায় সাতটি তারার মালা

হৃদয়ে বাস করে গিরগিটির ছানা

অমাবস্যা উঁকি মারে ধবধবে সাদা দাবনায়

ঘুমের সময় জেগে আছি

আদ্যনাথ ঘোষ

রোদ আছে, আলোর সজীবতা নেই কোনোখানে

তবু তার তীক্ষ্ণ আভা পড়ে আছে-

কতোকাল আঁধার-চোখের জলে

প্রাণপনে ডুব দিয়ে উঠে আসি

সোনালি ফসলের আশায় ঝুরঝুরে মাটির আঁচল তলে।

কতো আশা জেগে থাকে কুমারী মাঠের চেয়ে থাকা বুকে

কতোদিন বয়ে যায় মাঠ ঘাট স্বপ্নের তীরে

কোনকালে ফোটবার ইচ্ছায় রূপের পাপড়ি খুলে

থই থই আঁধার জলে

আলোময় দরজাতে মাথা ঠুকে

দূরে- আরো দূরে- বাতাসের অমলিন পাখনায়

ইপ্সিত আলোর আশায়

ঘুমের সময় জেগে আছি তোমারই উদাত্ত আহ্বানে।

সেদিন বিকেলের রোদ

তরুন ইউসুফ

সেদিন বিকেলের রোদ

পড়তে গিয়ে দেখি

তার কয়েকটি পাতা ছেঁড়া

রয়ে গেছে মোহিনীর কাছে

সুতরাং,

আমার আর রোদ পড়া হলো না,

পড়তে হলে

পেতে হবে মোহিনীকে

কিন্তু,

সেতো দীর্ঘস্থায়ী ধূমকেতু,

আমাদের ক্ষণস্থায়ী জীবন

ক্ষীয়মান

পায় না তেমন, হারায়ে যায়

যেমন:

রোদ কিংবা মোহিনী

কয়েকটি জীবন চাই

তাদের পেতে।

শূন্যতা

মিলু শামস

এই স্মৃতিটা

তুমি হয়ে বাজে

একলা থাকার ঘোর সময়ে

বুকের কোনও খাঁজে;

শেষ দেখাটা হলনা শেষ

দেয়াল দিল তুলে

সন্ধ্যা এসে লুটিয়ে পড়ে

রাত্রি স্রোতের জলে;

আসছে বারে ভীষণ না হয় ঝড়ই হব

উড়িয়ে দিয়ে সকল কাঁটা শক্ত হয়ে রব

তুমি আমি অনিমিখে মিশে রব

ভীষণ না হয় ঝড়ই হব, ঝড়ই হব।

পৌরুষ

জান্নাতুল বাকেয়া কেকা

পৌরুষ, শিশ্নের উত্থানেই তোমার স্বর্গসুখ?

তোমার উন্নত শিশ্ন যখন যোদিপ্রদেশে ভ্রমণ করে

আহলাদে আটখানা তুমি বিশ্বব্রহ্মা- জয় করো!

তোমার শিশ্নের উল্লাসে ভাসাও চারপাশ

তখন অট্টহাসির তোড়ে হাঁসো

বলো দেখো আমি বীর পুরুষ সব পারি!

গড়তে পারি, বপন করতে পারি বীজ

সেই বীজ থেকে মহীরুহের মতো

এক-একটি ভ্রুণ হয়ে উঠে মানুষ

তখন তোমার আহ্লাদ দেখে কে!

কিন্তু যখন তোমার শিশ্নের অতি উল্লাস

মধ্যরাতের নীরবতা খানখান করে

চারপাশ যন্ত্রণার তীক্ষèতায় ছন্দপতন ঘটায়

তুমি আরোপিত যন্ত্রণা হয়ে ভেঙ্গে পড়

সেই যন্ত্রণায় বিদীর্ণ হয় তোমার প্রিয়জন

তখন আমি বলি কি থামাও তোমার শিশ্নের অতি উল্লাস

প্রকৃতি নিস্তার চাই, তুমি থামাও তোমার উদ্ধত্য যৌবন।

হেমনকুয়াশা দ্রুতগামী

ট্রেনের মতো

উদয় শংকর দুর্জয়

এখন হেমনকুয়াশা দ্রুতগামী ট্রেনের মতো, পলকে উড়িয়ে নেয়

অন্য কাঁচের জংশনে। সেই জংসনের ঝুল বারান্দায় সিনথেটিক-শিশির

তুলে রাখে হেমন্তলোহিত চিঠি, বহু আগেকার। পাল্টে গ্যাছে

বালিহাঁসের একদীঘি কোলাহল; লক্ষীবিলাসের মাঠে জমেছে

সিলিকনের জম জমাট বিনিময়, কখন শরত কখন হেমন্ত

কখন যে বসন্ত চৌকাঠে ঢালে মধুরবিষ! ওই যে দ্রুতগামী

ভীষণ এক ডানাওয়ালা ট্রেন! সব উড়িয়ে নিয়ে যায়।

ধূম্রজালিক-গোধূলি ছেড়ে গেছে সবুজ বলাকার দল।

গাছের পাতার বদলে বিল্ডিং ধ্বসে চুরচুর, শিশিরের বদলে মিছিল

কোথা থেকে কোন দাপুটে ঝড় এসে

বসিয়েছে কনক্রিটের আদলে হেমবীথি বসন্ত।

শৈবাল ঘেরা ডাকবক্স শুধুই ছবিঘর, পত্রচ্যুত শব্দ

মিলিয়ে গেছে আর্টিফিশিয়াল-শারদ আগমনে। গোল্লাছুটের উঠোনে

উড়ো হাওয়া, পশ্চিমা-অটাম, গিরিতট ফিরিয়ে নিয়েছে

গন্তব্যের ফ্লাইটসূচি। ধীরলয়ে ভেঙে যাচ্ছে রোজ

জল ও বায়ুর অবিচ্ছেদ্য সংগম।

চিবুকের ভাঁজ

মাহাবুবা লাকি

পায়ের পাতা থেকে চুল, বুক ও চিবুকের ভাঁজ,

আমার রক্ষিত যতো ভাষা

তোমার পায়ের নিচেই তবে থাক।

শিহরিত হয়ে দেখি দু’চোখের মোহিনী আড়াল,

ফাল্গুনের রঙে আসে স্বপ্নবাজ পাখি।

পেয়েও হয়নি তাকে পাওয়া,

তাজমহলের উচ্চতায় নয়, প্রেমের আবিরে ডুবে যাই।

আশাহত ইচ্ছেরা তাই আজ দুঃখভরা গল্প শুধু এক;

সব সুখ দিয়েছি আমি তাকে!

বন্ধু, যদি তুমি নাও

জোবায়ের মিলন

সুলতানপুরে যাব

সময় পেলে, অন্তত একবার- তোমার হাত ধরে

ডোবা নালা নর্দমা ঘেরা শহরের বাঁক ফেলে

চলে যাব একেবারে, যদি ঠাঁই দেয় এমন গাঁও।

পথে ও জমিনে বেড়াব

আকাশের হাত ধরে চলে যাব আকাশের পাড়ে

রৌদ্রক্লান্ত উঠান ছাড়িয়ে মেঘছায়ে দেব ডুব

পল্লি মায়ের কোলে শুয়ে ছোঁব জীবনের নিশ্চিত গান

পোড়া চোখ পুরে দেখব সবুজ পাতার বাহার, নাচ

ঝিলের শিশুতোষ ঢেউ, পুকুরের বিভঙ্গ, হাঁসের ঝাঁক

পোকামাকড়ের ঘরবসতি।

টিনের চালে আছড়ে পড়া বৃষ্টি মেয়ের

অরূপ রূপে তাকিয়ে কাটাব আনন্দ বেলা

ডাঙ্গির ধারে মাছের চাঁই পেতে বসে ভাববো- জন্মের

লাল নীল বেগুনী মলাট কথা

মাটিতে মেলে খালি পা, মাড়াব এপার-ওপার, শীতল

অনুভবে জড়াব বুকের বাঁমে সুলতানপুর।

যদি তুমি নাও

ফিরব না এই মোষড়ানো-কাগজের পীতাভ নগরে;

নিবন্ধিত হয়ে থেকে যাব তোমার সুঠৌল-গ্রামে।

গ্রামহীন আমায় নেবে বন্ধু, তোমার কৃপার ছলে হলেও?