ভ্রমণ : দশ

রাজকীয় শহর কায়রোয় চার দিন

ফজল হাসান

ঐতিহাসিকদের ধারণা যে, রাজা জোসের নিজের সমাধিস্থলের জন্য স্টেপ পিরামিড নির্মাণ করেছিলেন। এছাড়া তিনি পিরামিড সংলগ্ন একটা সাংকৃতিক কেন্দ্রও গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। যদিও স্টেপ পিরামিড নির্মাণ পদ্ধতিতে কিছু ভুল-ত্রুটি ছিল, তবুও স্টেপ পিরামিড তৈরির মধ্য দিয়ে সূচিত হয় মিশরে, তথা বিশ্বে, পিরামিড তৈরির ইতিহাস।

রাজা জোসেরের স্টেপ পিরামিড এবং টেম্পল অব দ্য ফেস্টিভ্যাল কমপ্লেক্সের ধ্বংসাবশেষ যদিও গিজার পিরামিড, বিশেষ করে গ্রেট প্রপিরামিড বা খুফুর পিরামিড, জগৎ বিখ্যাত এবং এখনো বিশ্ববাসীর কাছে অপার বিস্ময়, কিন্তু পৃথিবীর বুকে সর্বপ্রথম পিরামিড নির্মাণ করা হয়েছিল গিজার অদূরে সাক্কারায়, যা স্টেপ পিরামিড বা জোসের পিরামিড নামে পরিচিত। স্টেপ পিরামিডের উচ্চতা একশ’ তেষট্টি মিটার। ধারণা করা হয় যে, স্টেপ পিরামিড নির্মাণের সময় প্রথমে চতুষ্কোণ ও সমতল কাঠামো তৈরি করা হয়। তারপর সেই কাঠামোর ওপরে আরেকটি, অতঃপর আরো একটি এবং এভাবেই মোট ছয়টি কাঠামোর ধাপে পিরামিডের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছিল। তবে প্রতœতত্ত্ববিদদের মতামত অনুযায়ী স্টেপ পিরামিডের কিছু ভুল-ত্রুটি রয়েছে। যেমন সবচেয়ে নিচের ধাপ আসলে পুরোপুরি চতুষ্কোণ নয়। কেননা দৈর্ঘ্যৈ এক শ’ একুশ মিটার এবং প্রস্থে এক শ’ নয় মিটার। দুর্ভাগ্যবশত, ১৯৯২ সালে ভূমিকম্পে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে পরবর্তীতে মজবুতভাবে সংস্কার করা হয়েছে। উল্লেখ্য, আদিতে স্টেপ পিরামিড তৈরি করা হয়েছিল সাধারণ পাথর দিয়ে। সেখানে কোনো মার্বেল পাথর ব্যবহার করা হয়নি, যেমন হয়েছিল গিজার পিরামিড নির্মাণের সময়। স্টেপ পিরামিড এবং গিজার পিরামিডের অন্যতম মূল পার্থক্য হচ্ছে যে, মৃত রাজাকে সমাহিত করার জন্য স্টেপ পিরামিডের ভূগর্ভস্থে গ্রানাইট পাথর দিয়ে বিশেষ প্রকোষ্ঠ তৈরি করা হয়েছিল। তবে দস্যু এবং কবর লুটেরারদের কবল থেকে রাজা জোসেরের মৃতদেহ রক্ষা করার জন্য সেই গোপন প্রকোষ্ঠের প্রবেশ পথ ছিল গোলক ধাঁধার। সেই পথে ছিল আঁকাবাঁকা টানেল এবং পাশে ফলস্ রুম। অন্যদিকে গিজার পিরামিডগুলোর সমাধিস্থল নির্মাণ করা হয়েছিল ভেতরে এবং মাটির ওপরে, অনেকটা ঝুলন্ত আকারের। ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, পরবর্তীতে সব পিরামিড, এমনকি গিজার গ্রেট পিরামিডও, নিঁখুতভাবে নির্মাণের সময় স্টেপ পিরামিড এবং তার গাণিতিক গণনা ব্যবহার করা হয়েছিল।

গিজার পিরামিড এলাকার মতো স্টেপ পিরামিড এলাকায় ঘোড়ার গাড়ি নেই, কিন্তু সেখানে রঙিন কাপড়ে আচ্ছাদিত বেশ কয়েকটা উট এবং খচ্চর রয়েছে। উটগুলো হাঁটু গেড়ে বসে খদ্দেরের অপেক্ষায় থাকে। ক্লান্ত, উৎসাহী বা অ্যাডভেঞ্চার পর্যটকরা ইচ্ছে করলে ভাড়া নিয়ে ওসব প্রাণীদের ওপর আরোহণ করে আশেপাশে ঘুরতে পারে। তাতে পর্যটকদের একদিকে যেমন সুবিধা হয়, অন্যদিকে উট কিংবা খচ্চর চালকদের রুটিরুজির একটা বিহিত হয়। তবে অভ্যস্ত নাহলে উটে চড়ায় বিপত্তি ঘটার সমূহ সম্ভাবনা আছে। আমি অবশ্য সাহসের অভাবে সেদিকে যাইনি।

স্টেপ পিরামিড চত্বর থেকে বেরিয়ে আসার আগে সালাহর অনুমতি নিয়ে মেহেরুন পেছনের দিকে টিলার মতো খানিকটা উঁচু জায়গায় যায়। অগত্যা আমি তাকে অনুসরণ করি। আমাদের দেখাদেখি সালাহও ওপরে ওঠে। তার মুখে জানতে পারি সাক্কারার আশেপাশে এবং অদূরে আরো ষোলটি পিরামিডের সন্ধান পাওয়া গেছে। এগুলোর মধ্যে স্টেপ পিরামিডের কয়েক কিলোমিটার দূরে ডাসুরের বেন্ট বা বাঁকা পিরামিড উল্লেখযোগ্য। অন্যসব পিরামিড, যেমন প্রথম টেটির পিরামিড, উনাসের পিরামিড এবং প্রথম ও দ্বিতীয় পেপির পিরামিড, আয়তনে ছোট এবং কালের আবর্তে অভ্যন্তরের অঙ্কন ও চিত্রকর্ম নষ্ট হয়ে গেছে।

অবশেষে টাইম আউট, অর্থাৎ আমাদের ফিরে যাবার পালা। আমরা প্রধান ফটক দিয়ে বেরিয়ে আসি। আসার সময় কেন জানি মনের অজান্তেই বারেক ফিরে তাকাই। সেই সময় আপন মনে শুধু এটুকুই বলেছি, যদিও স্টেপ পিরামিড দৃষ্টিনন্দন এবং জীবন বদলে দেওয়ার মতো কোন স্থাপনা নয়, তবুও কাছে থেকে দেখাটা বিফলে যাবে না। বরং মনকে আমি প্রবোধ দিয়েছি যে, ইতিহাসের দিক থেকে বিবেচনা করলে মিশরের, তথা সমগ্র বিশ্বের, প্রথম পিরামিড দেখার সৌভাগ্য তো হয়েছে।

সেটুকুই বা কম কিসে?

প্রাচীনকালে ‘লাইফ অব দ্য টু ল্যান্ডস্’ খ্যাত মিশরের পুরানো সা¤্রাজ্যের রাজধানী ছিল মেমফিস। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অগণিত পর্যটক এবং ভ্রমণকারী দ্বিতীয় র‌্যামেসেসের মূর্তি এবং অ্যালাবাস্টার পাথরের স্ফিংক্স দেখার জন্যই সেখানে যায়। তবে র‌্যামেসেসের দু’টি ঢাউস সাইজের মূর্তি এবং অ্যালাবাস্টার পাথরের স্ফিংক্স ছাড়াও আশেপাশে ছড়িয়েছিটিয়ে আছে প্রাচীন শহরের ধ্বংসাবশেষ। ট্যুর প্যাকেজের অংশ হিসেবে আমরাও গিয়েছি আসলে একই কারণে। বলাবাহুল্য, মেমফিসে রয়েছে মিশরের খোলা আকাশের নিচে অন্যতম বৃহত্তর ঐতিহাসিক জাদুঘর, অর্থাৎ ওপেন এয়ার মিউজিয়াম।

মেমফিসের আদি নাম ছিল ‘ইনেব হেজ’ (Ineb Hedj) (ইংরেজিতে ‘হোয়াইট ওয়াল’ বা বাংলায় ‘সাদা দেওয়াল’)। কারণ হিসেবে বলা হয় যে, দূর অতীতে মেমফিসে রাজপ্রাসাদের রঙ ছিল সাদা। হয়তো সে জন্যই শহরের নাম হয়েছিল ‘ইনেব হেজ’। এছাড়া মেমফিসের আরেকটি নাম ছিল ‘আংখ তাউই’ (Ankh Tawy) (ইংরেজিতে ‘দ্যাট হুইচ বাইন্ডস দ্য টু ল্যান্ডস্’ বা বাংলায় ‘দুই ভূখণ্ডকে যে বেঁধে রাখে’)। তবে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য এবং গ্রহণীয় সূত্র থেকে জানা যায় যে, ২৯২৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে রাজা মেনেস (Menes) আপার এবং লোয়ার ঈজিপ্টকে, অর্থাৎ দক্ষিণ এবং উত্তর মিশরকে, একত্রিত করে নতুন রাষ্ট্র গঠন করেন। উল্লেখ্য, একত্রিকরণের আগে দু’টি অঞ্চলের জনসাধারণের, এমনকি রাজাদের বা ফারাওদের, মধ্যেও কোন মিলমিশ বা সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক ছিল না। রাজাদের বেশভূষার মধ্যে ছিল ব্যবধান। যেমন দক্ষিণ মিশরের রাজাদের মুকুটের রঙ ছিল সাদা এবং তাতে শকুনের প্রতীক থাকতো। অন্যদিকে উত্তর মিশরের রাজাদের মুকুটের রঙ ছিল লাল এবং তাতে ছিল গোখরো সাপের প্রতীক। যাহোক, রাজা মেনেস (Menes) এ দুটি অঞ্চলের মাঝামাঝি জায়গায় অবস্থিত মেমফিসে রাজধানী নির্মাণ করেন। তখন থেকে ২১৮০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত মেমফিস মিশরর প্রশাসনিক রাজধানী ছিল। যাহোক, আধুনিক নাম মেমফিস এসেছে গ্রিক শব্দ ‘মেন-নেফের’ (Men-nefer) থেকে, যা পরবর্তীতে রূপান্তরিত হয়েছে ‘মেমফি’ (Memfi)। বাইবেলে মেমফিসের নাম ‘মফ’ (Moph) বা ‘নফ’ (Noph)।

গেটের কাছাকাছি নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে গাড়ি থামে। সালাহ্ গাড়ি থেকে নেমে কাউন্টারে যায়। এখানেও ঢোকার জন্য টিকেট কিনতে হয়। বিদেশি প্রত্যেকের জন্য ঈজিপশিয়ান এক শ’ আশি পাউন্ড। আমরা গেটের কাছে অপেক্ষা করি। সালাহ ফিরে এলে আমরা ভেতরে প্রবেশ করি।

ভেতরে ঢোকার পরই সামনের দিকে তাকিয়ে দেখি ভগ্ন মন্দিরের দক্ষিণ দিকে বিশাল দেহী দ্বিতীয় র‌্যামসেস সাহেব সগর্বে দাঁড়িয়ে আছেন। হয়তো আমাদের মতো দর্শনার্থীদের স্বাগত জানানোর জন্য তিনি আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছেন।

একসময় আমরা মূর্তির সামনে যাই। মাথা তুলে বিশালতা মাপার চেষ্টা করি। কিছুক্ষণ পাথরের মূর্তির সামনে পাথরের মতো স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। দ্বিতীয় র‌্যামেসেসের মূর্তিটি চৌদ্দ মিটার উঁচু এবং বিশাল পাথর থেকে তৈরি করা হয়েছে।

একসময় সালাহ জিজ্ঞেস করে, ‘দেখেছ, দ্বিতীয় র‌্যামেসেসের ডান পা থেকে বাম পা সামনে।’

আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, দেখেছি।’

‘বলতে পারো কেন?’

না জানার ভঙ্গিতে আমি ঠোঁট উল্টাই।

পরে সালাহর কথায় বুঝলাম, অনেক ফারাও এধরনের রাজকীয় ভঙ্গিতে দাঁড়াতেন, যাতে তাঁর শৌর্য্য-বীর্য এবং ক্ষমতা প্রকাশ পায়। আরেকটা কারণ হলো র‌্যামেসেসের জীবিত কালে মূর্তিটি তৈরি করা হয়েছিল।

সালাহকে অনুসরণ করে আমরা পাশেই কাঁচঘেরা একটা আবদ্ধ কক্ষে (মিউজিয়াম) প্রবেশ করি। সিঁড়ি বেয়ে উপরের ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াই। নিচের দিকে তাকাতেই চোখে পড়ে চুনাপাথর কেটে তৈরি করা দ্বিতীয় র‌্যামেসেসের শায়িত বিশাল মূর্তি। আসলে ফারাওদের কাজ-কারবার ছিল রাজকীয় এবং অবিশ্বাস্য, বিশেষ করে মূর্তি বা পিরামিড নির্মাণের বেলায়। তাঁরা বিশাল আকৃতির অসংখ্য মূর্তি বানিয়েছে, ওগুলো কাছে থেকে দেখলে রীতিমতো খাবি খেতে হয়। যেমন দ্বিতীয় র‌্যামেসেসের ঢাউস আকৃতির মূর্তি দেখে আমি খেয়েছিলাম।

যাহোক, মূর্তি সম্পর্কে বয়ান দেওয়ার সময় সালাহ বলেছে, র‌্যামেসেসের মূর্তিটি একসময় মেমফিসের পিটাহ মন্দিরে (Temple of Ptah) ছিল। প্রায় দশ মিটার দীর্ঘ এই মূর্তিটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো যে, র‌্যামেসেসের পা নেই। তৎকালীন আপার ঈজিপ্টের রাজকীয় পোশাকের রঙ ছিল সাদা এবং মূর্তির রঙও তাই। এত দীর্ঘ সময় পরেও এখনো আগের গায়ের রঙ অনেকটা দেখা যায়। মূর্তির গায়ে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দ্বিতীয় র‌্যামেসেসের সমস্ত তথ্য খোদাই করা আছে, বিশেষ করে কোমরের বেল্টে এবং কাঁধে। র‌্যামেসেসের মূর্তিটি ১৮২০ সালে পিটাহ মন্দিরের দক্ষিণ দিকের গেইটের কাছে ইতালিয়ান প্রত্নতত্ত্ববিদ জিওভানি ক্যাভেলিয়া (১৭৭০-১৮৪৫) আবিষ্কার করেন। মূল মূর্তিটির ছয় খণ্ড পাওয়া গিয়েছিল এবং পরে তা জোড়া লাগানো হয়। বর্তমানে মূর্তিটির ওজন তিরাশি টন। কথিত আছে, জিওভানি মূর্তিটি তাসক্যানির ডিউককে উপহার দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মূর্তিটি এত বিশাল যে, আস্ত পাঠানো যায়নি এবং অত্যন্ত ব্যয়বহুল ছিল। তাই ডিউক সাহেব সাদরে গ্রহণ করার অক্ষমতা জানিয়ে দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে মিশর ও সুদানের শাসক মোহাম্মদ আলী পাশা বৃটিশ জাদুঘরে দান করতে চেয়েছিলেন। জাদুঘর কর্তৃপক্ষও তাঁর সেই প্রস্তাবে রাজি হয়নি। কেননা নৌপথে লন্ডনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। যাহোক, কায়রো ও গিজার বিভিন্ন জায়গায় অস্থায়ীভাবে থেকে অবশেষে থিতু হয়েছে মেমফিসেই। তবে সালাহর তথ্য অনুযায়ী, শীঘ্রই গিজার পিরামিডের কাছাকাছি গ্রান্ড ঈজিপশিয়ান মিউজিয়াম নির্মাণ কাজ শেষ হবে এবং সেই মিউজিয়ামের প্রবেশ পথে মূর্তিটি স্থায়ীভাবে স্থাপন করা হবে।

মিশরের ইতিহাসে যত ফেরাউন ছিল, তাদের মধ্যে দ্বিতীয় র‌্যামেসেস ছিল সবচেয়ে ক্ষমতাশীল। তাকে বলা হয় ‘র‌্যামেসেস দ্য গ্রেট’। তিনি দীর্ঘ ছেষট্টি বছর (১২৭৯-১২১৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) রাজ্য শাসন করেন। সেই দীর্ঘ শাসনামলে তিনি মিশরের ভৌগোলিক পরিসীমা বিস্তৃত করেছিলেন এবং বিভিন্ন জায়গায় শহর ও মন্দির গড়ে তোলেন, যেমন নীল নদ বিধৌত এলাকায় প্রশাসনিক রাজধানী, নুবিয়ার আবু সিম্বল এলাকায় অবস্থিত গ্রেট টেম্পল এবং মেমফিসের পিটাহ মন্দির। এছাড়া তিনি নিজের প্রতিকৃতির ছোট-বড় অসংখ্য মূর্তি নির্মাণ করেন। সেসব বিশাল মূর্তির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো মেমফিসের দু’টি, লুক্সর মন্দিরের প্রবেশ পথে একটি এবং আবু সিম্বল মন্দিরের প্রবেশ পথে আরো একটি। একজন সাহসী যোদ্ধা হিসেবে তার সুনাম ছিল। বৃদ্ধ বয়সে তিনি একাধিক রোগে আক্রান্ত ছিলেন। নব্বই বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। প্রথমে তাঁকে লুক্সরের অদূরে ‘ভ্যালী অব দ্য কিংক্স’-এর গুহার ভেতর দাফন করা হয়। কিন্তু চোর-ডাকাত এবং লুটেরারদের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য একাধিক জায়গায় স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে তাঁর মমি প্রদর্শনের জন্য কায়রো জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। পরবর্তীতে তাঁর সম্মানার্থে নয়জন ফেরাউন তাদের নাম রেখেছিলেন র‌্যামেসেস।

র‌্যামেসেস মিউজিয়াম থেকে বেরিয়ে এসে আমরা খোলা জায়গায় নামহীন স্ফিংক্সের কাছে যাই। স্ফিংক্সের মূর্তিটির দেহ সিংহের এবং মুখমণ্ডল একজন ফারাওয়ের। স্ফিংক্স দৈর্ঘ্যে আট মিটার এবং এর ওজন আট টন। বিশেষজ্ঞদের ধারণা যে, ১৭০০ থেকে ১৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে কোন এক সময়ে দ্বিতীয় অ্যামেনহোটেপ অথবা চতুর্থ টুটমোসের শাসনামলে অ্যালাবাস্টার পাথর দিয়ে পিটাহ্ মন্দিরের পাহারাদার এবং ক্ষমতা ও মর্যাদার স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে স্ফিংক্সের মূর্তিটি তৈরি করেছিলেন।

যদিও আয়তনের দিক থেকে গিজার স্ফিংক্সের তুলনায় মেমফিসের স্ফিংক্সের মূর্তি অনেক ছোট, তবে মূর্তিটির অবয়ব এখনো অক্ষত আছে। স্ফিংক্সের কাছে গিয়ে স্পর্শ করা খুবই সহজ। যদিও আমাদের সেরকম কোন ইচ্ছে ছিল না, কিন্তু সালাহ নিষেধ করেছে। সে মনে করে, দীর্ঘ সময় ধরে মানুষের স্পর্শে হয়তো স্ফিংক্সের শ্রী ক্রমশ নষ্ট হয়ে যাবে। কেননা সে চায় অ্যালাবাস্টার পাথরের তৈরি স্ফিংক্সের মূর্তিটি আগামী প্রজন্মের জন্য হাজার হাজার বছর অক্ষত এবং সুরক্ষিত থাকুক। বলা হয়, আজ অবধি যতগুলো স্ফিংক্সের মূর্তিটি আবিষ্কার করা হয়েছে, তার মধ্যে মেমফিসের মূর্তিটি একমাত্র অ্যালাবাস্টার পাথরের তৈরি। যাহোক, র‌্যামেসেসের শায়িত বিশাল মূর্তির তুলনায় খোলা আকাশের নিচে নামহীন স্ফিংক্স বেশি গূরুত্বপূর্ণ বা অবাক করার মতো পুরাকীর্তি নয়, তবে মূল্যবান সম্পদ হিসাবে গণনা করা হয়। স্ফিংক্সের মূর্তিটি উনিশ শতকে আবিষ্কৃত হয়েছে।

খোলা জায়গার দু’পাশে ছাপড়ার তৈরি দোকানপাট। সেসব জীর্ণ-শীর্ণ দোকানে বিভিন্ন ধরনের সস্তা দামের স্যুভেনির পাওয়া যায়। আমরা সেদিকে যাইনি। শুধু দূর থেকে খানিকটা দেখেছি। এছাড়া বাইরে লাল গ্রানাইট পাথরের অন্যান্য মূর্তি এবং বিভিন্ন পুরাকীর্তি এলোমেলোভাবে পড়ে রয়েছে। মেমফিস মন্দির এলাকা থেকে উদ্ধার করা অনেক ঐতিহাসিক মূল্যবান মূর্তি বর্তমানে শোভা পাচ্ছে পশ্চিমা জগতের বিভিন্ন জাদুঘরে।

একসময় সালাহ্ মন-খারাপের এক টুকরো ধূসর মেঘ টেনে এনে চোখেমুখে ছড়িয়ে দিয়ে বললো, ‘জানো, প্রাচীন কালে প্রচণ্ড ক্ষমতাশীল এবং শৌর্য-বীর্যের শিখরে থাকা মেমফিস অষ্টাদশ রাজতন্ত্রের পরে চূড়া থেকে পতনের অতলে গড়িয়ে পড়তে শুরু করে। সেই সময় নিউ কিংডমের উত্থান ঘটে এবং থেবেস শহরের গোড়াপত্তন হয়। তবে পার্শিয়ানদের শাসনামলে পুনরুদ্ধার হয়েছিল বটে, কিন্তু আলেকজান্দ্রিয়া শহর নির্মাণ করার পরে পুনরায় মেমফিস শীর্ষস্থান হারায়।’

আমি না-সূচক ভঙ্গিতে আলতো করে মাথা নেড়ে বললাম, ‘না, জানতাম না। তোমার কাছে অনেক কিছু শিখছি। ধন্যবাদ।’

সালাহ আরো বলতে থাকে, ‘পরবর্তীতে মেমফিস আরো কয়েক শতাব্দী দ্বিতীর স্থানে ছিল। সপ্তম শতাব্দীর শুরুর দিকে ফুসতাত শহর নির্মাণ করা হলে মেমফিসের প্রতি রাজাদের আগ্রহ কমে যায়। তারপর থেকে আশেপাশের বসতি স্থাপনের জন্য পাথর সরবরাহের উৎস হিসেবে পরিগণিত হয়।’

হঠাৎ সে আমাদের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘তোমরা কি আলেকজান্দ্রিয়া যাচ্ছো?’

আমি বললাম, ‘এই তো, আগামী পরশুদিন যাবো।’

‘আলেকজান্দ্রিয়ায় তোমরা অনেক কিছুই দেখতে পাবে, তবে এত প্রাচীন নয়’, সালাহ বললো।

আমি আনমনে ঘড়ির দিকে তাকাই। ঘড়ির দিকে তাকানো দেখেই সালাহ বললো, ‘লেটস্ গো। সময় আছে। আমরা ফিরতে পথে থেমে কার্পেট স্কুল দেখে যাবো।’

ইউনেস্কো ঘোষিত ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট’ মেমফিস থেকে বিদায় নিয়ে আমরা গাড়িতে চড়ে বসি।

গাড়ি চলতে শুরু করে কার্পেট স্কুলের দিকে। আমি সিটের পেছনে হেলান দিয়ে তাকিয়ে থাকি আর ভাবি ফারাওদের সব অদ্ভুত কাণ্ডকারখানা। ক্রমশ...

বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২০ , ৬ কার্তিক ১৪২৭, ৪ রবিউল ‍আউয়াল ১৪৪২

ভ্রমণ : দশ

রাজকীয় শহর কায়রোয় চার দিন

ফজল হাসান

image

ঐতিহাসিকদের ধারণা যে, রাজা জোসের নিজের সমাধিস্থলের জন্য স্টেপ পিরামিড নির্মাণ করেছিলেন। এছাড়া তিনি পিরামিড সংলগ্ন একটা সাংকৃতিক কেন্দ্রও গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। যদিও স্টেপ পিরামিড নির্মাণ পদ্ধতিতে কিছু ভুল-ত্রুটি ছিল, তবুও স্টেপ পিরামিড তৈরির মধ্য দিয়ে সূচিত হয় মিশরে, তথা বিশ্বে, পিরামিড তৈরির ইতিহাস।

রাজা জোসেরের স্টেপ পিরামিড এবং টেম্পল অব দ্য ফেস্টিভ্যাল কমপ্লেক্সের ধ্বংসাবশেষ যদিও গিজার পিরামিড, বিশেষ করে গ্রেট প্রপিরামিড বা খুফুর পিরামিড, জগৎ বিখ্যাত এবং এখনো বিশ্ববাসীর কাছে অপার বিস্ময়, কিন্তু পৃথিবীর বুকে সর্বপ্রথম পিরামিড নির্মাণ করা হয়েছিল গিজার অদূরে সাক্কারায়, যা স্টেপ পিরামিড বা জোসের পিরামিড নামে পরিচিত। স্টেপ পিরামিডের উচ্চতা একশ’ তেষট্টি মিটার। ধারণা করা হয় যে, স্টেপ পিরামিড নির্মাণের সময় প্রথমে চতুষ্কোণ ও সমতল কাঠামো তৈরি করা হয়। তারপর সেই কাঠামোর ওপরে আরেকটি, অতঃপর আরো একটি এবং এভাবেই মোট ছয়টি কাঠামোর ধাপে পিরামিডের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছিল। তবে প্রতœতত্ত্ববিদদের মতামত অনুযায়ী স্টেপ পিরামিডের কিছু ভুল-ত্রুটি রয়েছে। যেমন সবচেয়ে নিচের ধাপ আসলে পুরোপুরি চতুষ্কোণ নয়। কেননা দৈর্ঘ্যৈ এক শ’ একুশ মিটার এবং প্রস্থে এক শ’ নয় মিটার। দুর্ভাগ্যবশত, ১৯৯২ সালে ভূমিকম্পে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে পরবর্তীতে মজবুতভাবে সংস্কার করা হয়েছে। উল্লেখ্য, আদিতে স্টেপ পিরামিড তৈরি করা হয়েছিল সাধারণ পাথর দিয়ে। সেখানে কোনো মার্বেল পাথর ব্যবহার করা হয়নি, যেমন হয়েছিল গিজার পিরামিড নির্মাণের সময়। স্টেপ পিরামিড এবং গিজার পিরামিডের অন্যতম মূল পার্থক্য হচ্ছে যে, মৃত রাজাকে সমাহিত করার জন্য স্টেপ পিরামিডের ভূগর্ভস্থে গ্রানাইট পাথর দিয়ে বিশেষ প্রকোষ্ঠ তৈরি করা হয়েছিল। তবে দস্যু এবং কবর লুটেরারদের কবল থেকে রাজা জোসেরের মৃতদেহ রক্ষা করার জন্য সেই গোপন প্রকোষ্ঠের প্রবেশ পথ ছিল গোলক ধাঁধার। সেই পথে ছিল আঁকাবাঁকা টানেল এবং পাশে ফলস্ রুম। অন্যদিকে গিজার পিরামিডগুলোর সমাধিস্থল নির্মাণ করা হয়েছিল ভেতরে এবং মাটির ওপরে, অনেকটা ঝুলন্ত আকারের। ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, পরবর্তীতে সব পিরামিড, এমনকি গিজার গ্রেট পিরামিডও, নিঁখুতভাবে নির্মাণের সময় স্টেপ পিরামিড এবং তার গাণিতিক গণনা ব্যবহার করা হয়েছিল।

গিজার পিরামিড এলাকার মতো স্টেপ পিরামিড এলাকায় ঘোড়ার গাড়ি নেই, কিন্তু সেখানে রঙিন কাপড়ে আচ্ছাদিত বেশ কয়েকটা উট এবং খচ্চর রয়েছে। উটগুলো হাঁটু গেড়ে বসে খদ্দেরের অপেক্ষায় থাকে। ক্লান্ত, উৎসাহী বা অ্যাডভেঞ্চার পর্যটকরা ইচ্ছে করলে ভাড়া নিয়ে ওসব প্রাণীদের ওপর আরোহণ করে আশেপাশে ঘুরতে পারে। তাতে পর্যটকদের একদিকে যেমন সুবিধা হয়, অন্যদিকে উট কিংবা খচ্চর চালকদের রুটিরুজির একটা বিহিত হয়। তবে অভ্যস্ত নাহলে উটে চড়ায় বিপত্তি ঘটার সমূহ সম্ভাবনা আছে। আমি অবশ্য সাহসের অভাবে সেদিকে যাইনি।

স্টেপ পিরামিড চত্বর থেকে বেরিয়ে আসার আগে সালাহর অনুমতি নিয়ে মেহেরুন পেছনের দিকে টিলার মতো খানিকটা উঁচু জায়গায় যায়। অগত্যা আমি তাকে অনুসরণ করি। আমাদের দেখাদেখি সালাহও ওপরে ওঠে। তার মুখে জানতে পারি সাক্কারার আশেপাশে এবং অদূরে আরো ষোলটি পিরামিডের সন্ধান পাওয়া গেছে। এগুলোর মধ্যে স্টেপ পিরামিডের কয়েক কিলোমিটার দূরে ডাসুরের বেন্ট বা বাঁকা পিরামিড উল্লেখযোগ্য। অন্যসব পিরামিড, যেমন প্রথম টেটির পিরামিড, উনাসের পিরামিড এবং প্রথম ও দ্বিতীয় পেপির পিরামিড, আয়তনে ছোট এবং কালের আবর্তে অভ্যন্তরের অঙ্কন ও চিত্রকর্ম নষ্ট হয়ে গেছে।

অবশেষে টাইম আউট, অর্থাৎ আমাদের ফিরে যাবার পালা। আমরা প্রধান ফটক দিয়ে বেরিয়ে আসি। আসার সময় কেন জানি মনের অজান্তেই বারেক ফিরে তাকাই। সেই সময় আপন মনে শুধু এটুকুই বলেছি, যদিও স্টেপ পিরামিড দৃষ্টিনন্দন এবং জীবন বদলে দেওয়ার মতো কোন স্থাপনা নয়, তবুও কাছে থেকে দেখাটা বিফলে যাবে না। বরং মনকে আমি প্রবোধ দিয়েছি যে, ইতিহাসের দিক থেকে বিবেচনা করলে মিশরের, তথা সমগ্র বিশ্বের, প্রথম পিরামিড দেখার সৌভাগ্য তো হয়েছে।

সেটুকুই বা কম কিসে?

প্রাচীনকালে ‘লাইফ অব দ্য টু ল্যান্ডস্’ খ্যাত মিশরের পুরানো সা¤্রাজ্যের রাজধানী ছিল মেমফিস। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অগণিত পর্যটক এবং ভ্রমণকারী দ্বিতীয় র‌্যামেসেসের মূর্তি এবং অ্যালাবাস্টার পাথরের স্ফিংক্স দেখার জন্যই সেখানে যায়। তবে র‌্যামেসেসের দু’টি ঢাউস সাইজের মূর্তি এবং অ্যালাবাস্টার পাথরের স্ফিংক্স ছাড়াও আশেপাশে ছড়িয়েছিটিয়ে আছে প্রাচীন শহরের ধ্বংসাবশেষ। ট্যুর প্যাকেজের অংশ হিসেবে আমরাও গিয়েছি আসলে একই কারণে। বলাবাহুল্য, মেমফিসে রয়েছে মিশরের খোলা আকাশের নিচে অন্যতম বৃহত্তর ঐতিহাসিক জাদুঘর, অর্থাৎ ওপেন এয়ার মিউজিয়াম।

মেমফিসের আদি নাম ছিল ‘ইনেব হেজ’ (Ineb Hedj) (ইংরেজিতে ‘হোয়াইট ওয়াল’ বা বাংলায় ‘সাদা দেওয়াল’)। কারণ হিসেবে বলা হয় যে, দূর অতীতে মেমফিসে রাজপ্রাসাদের রঙ ছিল সাদা। হয়তো সে জন্যই শহরের নাম হয়েছিল ‘ইনেব হেজ’। এছাড়া মেমফিসের আরেকটি নাম ছিল ‘আংখ তাউই’ (Ankh Tawy) (ইংরেজিতে ‘দ্যাট হুইচ বাইন্ডস দ্য টু ল্যান্ডস্’ বা বাংলায় ‘দুই ভূখণ্ডকে যে বেঁধে রাখে’)। তবে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য এবং গ্রহণীয় সূত্র থেকে জানা যায় যে, ২৯২৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে রাজা মেনেস (Menes) আপার এবং লোয়ার ঈজিপ্টকে, অর্থাৎ দক্ষিণ এবং উত্তর মিশরকে, একত্রিত করে নতুন রাষ্ট্র গঠন করেন। উল্লেখ্য, একত্রিকরণের আগে দু’টি অঞ্চলের জনসাধারণের, এমনকি রাজাদের বা ফারাওদের, মধ্যেও কোন মিলমিশ বা সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক ছিল না। রাজাদের বেশভূষার মধ্যে ছিল ব্যবধান। যেমন দক্ষিণ মিশরের রাজাদের মুকুটের রঙ ছিল সাদা এবং তাতে শকুনের প্রতীক থাকতো। অন্যদিকে উত্তর মিশরের রাজাদের মুকুটের রঙ ছিল লাল এবং তাতে ছিল গোখরো সাপের প্রতীক। যাহোক, রাজা মেনেস (Menes) এ দুটি অঞ্চলের মাঝামাঝি জায়গায় অবস্থিত মেমফিসে রাজধানী নির্মাণ করেন। তখন থেকে ২১৮০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত মেমফিস মিশরর প্রশাসনিক রাজধানী ছিল। যাহোক, আধুনিক নাম মেমফিস এসেছে গ্রিক শব্দ ‘মেন-নেফের’ (Men-nefer) থেকে, যা পরবর্তীতে রূপান্তরিত হয়েছে ‘মেমফি’ (Memfi)। বাইবেলে মেমফিসের নাম ‘মফ’ (Moph) বা ‘নফ’ (Noph)।

গেটের কাছাকাছি নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে গাড়ি থামে। সালাহ্ গাড়ি থেকে নেমে কাউন্টারে যায়। এখানেও ঢোকার জন্য টিকেট কিনতে হয়। বিদেশি প্রত্যেকের জন্য ঈজিপশিয়ান এক শ’ আশি পাউন্ড। আমরা গেটের কাছে অপেক্ষা করি। সালাহ ফিরে এলে আমরা ভেতরে প্রবেশ করি।

ভেতরে ঢোকার পরই সামনের দিকে তাকিয়ে দেখি ভগ্ন মন্দিরের দক্ষিণ দিকে বিশাল দেহী দ্বিতীয় র‌্যামসেস সাহেব সগর্বে দাঁড়িয়ে আছেন। হয়তো আমাদের মতো দর্শনার্থীদের স্বাগত জানানোর জন্য তিনি আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছেন।

একসময় আমরা মূর্তির সামনে যাই। মাথা তুলে বিশালতা মাপার চেষ্টা করি। কিছুক্ষণ পাথরের মূর্তির সামনে পাথরের মতো স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। দ্বিতীয় র‌্যামেসেসের মূর্তিটি চৌদ্দ মিটার উঁচু এবং বিশাল পাথর থেকে তৈরি করা হয়েছে।

একসময় সালাহ জিজ্ঞেস করে, ‘দেখেছ, দ্বিতীয় র‌্যামেসেসের ডান পা থেকে বাম পা সামনে।’

আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, দেখেছি।’

‘বলতে পারো কেন?’

না জানার ভঙ্গিতে আমি ঠোঁট উল্টাই।

পরে সালাহর কথায় বুঝলাম, অনেক ফারাও এধরনের রাজকীয় ভঙ্গিতে দাঁড়াতেন, যাতে তাঁর শৌর্য্য-বীর্য এবং ক্ষমতা প্রকাশ পায়। আরেকটা কারণ হলো র‌্যামেসেসের জীবিত কালে মূর্তিটি তৈরি করা হয়েছিল।

সালাহকে অনুসরণ করে আমরা পাশেই কাঁচঘেরা একটা আবদ্ধ কক্ষে (মিউজিয়াম) প্রবেশ করি। সিঁড়ি বেয়ে উপরের ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াই। নিচের দিকে তাকাতেই চোখে পড়ে চুনাপাথর কেটে তৈরি করা দ্বিতীয় র‌্যামেসেসের শায়িত বিশাল মূর্তি। আসলে ফারাওদের কাজ-কারবার ছিল রাজকীয় এবং অবিশ্বাস্য, বিশেষ করে মূর্তি বা পিরামিড নির্মাণের বেলায়। তাঁরা বিশাল আকৃতির অসংখ্য মূর্তি বানিয়েছে, ওগুলো কাছে থেকে দেখলে রীতিমতো খাবি খেতে হয়। যেমন দ্বিতীয় র‌্যামেসেসের ঢাউস আকৃতির মূর্তি দেখে আমি খেয়েছিলাম।

যাহোক, মূর্তি সম্পর্কে বয়ান দেওয়ার সময় সালাহ বলেছে, র‌্যামেসেসের মূর্তিটি একসময় মেমফিসের পিটাহ মন্দিরে (Temple of Ptah) ছিল। প্রায় দশ মিটার দীর্ঘ এই মূর্তিটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো যে, র‌্যামেসেসের পা নেই। তৎকালীন আপার ঈজিপ্টের রাজকীয় পোশাকের রঙ ছিল সাদা এবং মূর্তির রঙও তাই। এত দীর্ঘ সময় পরেও এখনো আগের গায়ের রঙ অনেকটা দেখা যায়। মূর্তির গায়ে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দ্বিতীয় র‌্যামেসেসের সমস্ত তথ্য খোদাই করা আছে, বিশেষ করে কোমরের বেল্টে এবং কাঁধে। র‌্যামেসেসের মূর্তিটি ১৮২০ সালে পিটাহ মন্দিরের দক্ষিণ দিকের গেইটের কাছে ইতালিয়ান প্রত্নতত্ত্ববিদ জিওভানি ক্যাভেলিয়া (১৭৭০-১৮৪৫) আবিষ্কার করেন। মূল মূর্তিটির ছয় খণ্ড পাওয়া গিয়েছিল এবং পরে তা জোড়া লাগানো হয়। বর্তমানে মূর্তিটির ওজন তিরাশি টন। কথিত আছে, জিওভানি মূর্তিটি তাসক্যানির ডিউককে উপহার দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মূর্তিটি এত বিশাল যে, আস্ত পাঠানো যায়নি এবং অত্যন্ত ব্যয়বহুল ছিল। তাই ডিউক সাহেব সাদরে গ্রহণ করার অক্ষমতা জানিয়ে দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে মিশর ও সুদানের শাসক মোহাম্মদ আলী পাশা বৃটিশ জাদুঘরে দান করতে চেয়েছিলেন। জাদুঘর কর্তৃপক্ষও তাঁর সেই প্রস্তাবে রাজি হয়নি। কেননা নৌপথে লন্ডনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। যাহোক, কায়রো ও গিজার বিভিন্ন জায়গায় অস্থায়ীভাবে থেকে অবশেষে থিতু হয়েছে মেমফিসেই। তবে সালাহর তথ্য অনুযায়ী, শীঘ্রই গিজার পিরামিডের কাছাকাছি গ্রান্ড ঈজিপশিয়ান মিউজিয়াম নির্মাণ কাজ শেষ হবে এবং সেই মিউজিয়ামের প্রবেশ পথে মূর্তিটি স্থায়ীভাবে স্থাপন করা হবে।

মিশরের ইতিহাসে যত ফেরাউন ছিল, তাদের মধ্যে দ্বিতীয় র‌্যামেসেস ছিল সবচেয়ে ক্ষমতাশীল। তাকে বলা হয় ‘র‌্যামেসেস দ্য গ্রেট’। তিনি দীর্ঘ ছেষট্টি বছর (১২৭৯-১২১৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) রাজ্য শাসন করেন। সেই দীর্ঘ শাসনামলে তিনি মিশরের ভৌগোলিক পরিসীমা বিস্তৃত করেছিলেন এবং বিভিন্ন জায়গায় শহর ও মন্দির গড়ে তোলেন, যেমন নীল নদ বিধৌত এলাকায় প্রশাসনিক রাজধানী, নুবিয়ার আবু সিম্বল এলাকায় অবস্থিত গ্রেট টেম্পল এবং মেমফিসের পিটাহ মন্দির। এছাড়া তিনি নিজের প্রতিকৃতির ছোট-বড় অসংখ্য মূর্তি নির্মাণ করেন। সেসব বিশাল মূর্তির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো মেমফিসের দু’টি, লুক্সর মন্দিরের প্রবেশ পথে একটি এবং আবু সিম্বল মন্দিরের প্রবেশ পথে আরো একটি। একজন সাহসী যোদ্ধা হিসেবে তার সুনাম ছিল। বৃদ্ধ বয়সে তিনি একাধিক রোগে আক্রান্ত ছিলেন। নব্বই বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। প্রথমে তাঁকে লুক্সরের অদূরে ‘ভ্যালী অব দ্য কিংক্স’-এর গুহার ভেতর দাফন করা হয়। কিন্তু চোর-ডাকাত এবং লুটেরারদের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য একাধিক জায়গায় স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে তাঁর মমি প্রদর্শনের জন্য কায়রো জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। পরবর্তীতে তাঁর সম্মানার্থে নয়জন ফেরাউন তাদের নাম রেখেছিলেন র‌্যামেসেস।

র‌্যামেসেস মিউজিয়াম থেকে বেরিয়ে এসে আমরা খোলা জায়গায় নামহীন স্ফিংক্সের কাছে যাই। স্ফিংক্সের মূর্তিটির দেহ সিংহের এবং মুখমণ্ডল একজন ফারাওয়ের। স্ফিংক্স দৈর্ঘ্যে আট মিটার এবং এর ওজন আট টন। বিশেষজ্ঞদের ধারণা যে, ১৭০০ থেকে ১৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে কোন এক সময়ে দ্বিতীয় অ্যামেনহোটেপ অথবা চতুর্থ টুটমোসের শাসনামলে অ্যালাবাস্টার পাথর দিয়ে পিটাহ্ মন্দিরের পাহারাদার এবং ক্ষমতা ও মর্যাদার স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে স্ফিংক্সের মূর্তিটি তৈরি করেছিলেন।

যদিও আয়তনের দিক থেকে গিজার স্ফিংক্সের তুলনায় মেমফিসের স্ফিংক্সের মূর্তি অনেক ছোট, তবে মূর্তিটির অবয়ব এখনো অক্ষত আছে। স্ফিংক্সের কাছে গিয়ে স্পর্শ করা খুবই সহজ। যদিও আমাদের সেরকম কোন ইচ্ছে ছিল না, কিন্তু সালাহ নিষেধ করেছে। সে মনে করে, দীর্ঘ সময় ধরে মানুষের স্পর্শে হয়তো স্ফিংক্সের শ্রী ক্রমশ নষ্ট হয়ে যাবে। কেননা সে চায় অ্যালাবাস্টার পাথরের তৈরি স্ফিংক্সের মূর্তিটি আগামী প্রজন্মের জন্য হাজার হাজার বছর অক্ষত এবং সুরক্ষিত থাকুক। বলা হয়, আজ অবধি যতগুলো স্ফিংক্সের মূর্তিটি আবিষ্কার করা হয়েছে, তার মধ্যে মেমফিসের মূর্তিটি একমাত্র অ্যালাবাস্টার পাথরের তৈরি। যাহোক, র‌্যামেসেসের শায়িত বিশাল মূর্তির তুলনায় খোলা আকাশের নিচে নামহীন স্ফিংক্স বেশি গূরুত্বপূর্ণ বা অবাক করার মতো পুরাকীর্তি নয়, তবে মূল্যবান সম্পদ হিসাবে গণনা করা হয়। স্ফিংক্সের মূর্তিটি উনিশ শতকে আবিষ্কৃত হয়েছে।

খোলা জায়গার দু’পাশে ছাপড়ার তৈরি দোকানপাট। সেসব জীর্ণ-শীর্ণ দোকানে বিভিন্ন ধরনের সস্তা দামের স্যুভেনির পাওয়া যায়। আমরা সেদিকে যাইনি। শুধু দূর থেকে খানিকটা দেখেছি। এছাড়া বাইরে লাল গ্রানাইট পাথরের অন্যান্য মূর্তি এবং বিভিন্ন পুরাকীর্তি এলোমেলোভাবে পড়ে রয়েছে। মেমফিস মন্দির এলাকা থেকে উদ্ধার করা অনেক ঐতিহাসিক মূল্যবান মূর্তি বর্তমানে শোভা পাচ্ছে পশ্চিমা জগতের বিভিন্ন জাদুঘরে।

একসময় সালাহ্ মন-খারাপের এক টুকরো ধূসর মেঘ টেনে এনে চোখেমুখে ছড়িয়ে দিয়ে বললো, ‘জানো, প্রাচীন কালে প্রচণ্ড ক্ষমতাশীল এবং শৌর্য-বীর্যের শিখরে থাকা মেমফিস অষ্টাদশ রাজতন্ত্রের পরে চূড়া থেকে পতনের অতলে গড়িয়ে পড়তে শুরু করে। সেই সময় নিউ কিংডমের উত্থান ঘটে এবং থেবেস শহরের গোড়াপত্তন হয়। তবে পার্শিয়ানদের শাসনামলে পুনরুদ্ধার হয়েছিল বটে, কিন্তু আলেকজান্দ্রিয়া শহর নির্মাণ করার পরে পুনরায় মেমফিস শীর্ষস্থান হারায়।’

আমি না-সূচক ভঙ্গিতে আলতো করে মাথা নেড়ে বললাম, ‘না, জানতাম না। তোমার কাছে অনেক কিছু শিখছি। ধন্যবাদ।’

সালাহ আরো বলতে থাকে, ‘পরবর্তীতে মেমফিস আরো কয়েক শতাব্দী দ্বিতীর স্থানে ছিল। সপ্তম শতাব্দীর শুরুর দিকে ফুসতাত শহর নির্মাণ করা হলে মেমফিসের প্রতি রাজাদের আগ্রহ কমে যায়। তারপর থেকে আশেপাশের বসতি স্থাপনের জন্য পাথর সরবরাহের উৎস হিসেবে পরিগণিত হয়।’

হঠাৎ সে আমাদের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘তোমরা কি আলেকজান্দ্রিয়া যাচ্ছো?’

আমি বললাম, ‘এই তো, আগামী পরশুদিন যাবো।’

‘আলেকজান্দ্রিয়ায় তোমরা অনেক কিছুই দেখতে পাবে, তবে এত প্রাচীন নয়’, সালাহ বললো।

আমি আনমনে ঘড়ির দিকে তাকাই। ঘড়ির দিকে তাকানো দেখেই সালাহ বললো, ‘লেটস্ গো। সময় আছে। আমরা ফিরতে পথে থেমে কার্পেট স্কুল দেখে যাবো।’

ইউনেস্কো ঘোষিত ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট’ মেমফিস থেকে বিদায় নিয়ে আমরা গাড়িতে চড়ে বসি।

গাড়ি চলতে শুরু করে কার্পেট স্কুলের দিকে। আমি সিটের পেছনে হেলান দিয়ে তাকিয়ে থাকি আর ভাবি ফারাওদের সব অদ্ভুত কাণ্ডকারখানা। ক্রমশ...