বিদায় কমরেড, বিদায়

আয়শা আপা চলে গেলেন। মেনে নিতে পারছি না। শনিবার ভোর সোয়া ৬টায় ঘুম থেকে উঠেছি। সময় দেখতে টেলিফোনটা হাতে নিলাম। ফেসবুকটাও কেন জানি দেখলাম। খুলতেই দুঃসংবাদ। আয়শা আপা আর নেই। বিশ্বাস হয় না। এত সকালে কাউকে যে ফোন করে আবার জানাবো, তারও উপায় নেই।

বিশ্বাসও করতেই হবে; ফেসবুকে লিখেছেন মনিরা আপাÑ মনিরা আক্তার খাতুন। আয়শা আপার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়।

ছুটলাম আয়শা আপার বাসায়।

আয়শা খানম নারী নেত্রী, মানবাধিকার কর্মী, মুক্তিযোদ্ধা এবং মহিলা পরিষদের সভানেত্রী আর নেই। আমার বহু বছরের বন্ধু, সহকর্মী আয়শা আপা গত এক বছর ধরে ফুসফুসের ক্যানসারে ভুগছিলেন। আজ সবশেষ হয়ে গেল।

আয়শা আপার সঙ্গে আমার পরিচয় ও বন্ধুত্ব পাঁচ দশকের। ১৯৬৫ সালে একদিন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র হোস্টেলের সি-ফাইভ নম্বর রুমে গিয়েছি মানিক ভাইয়ের (সাইফউদ্দিন আহমেদ মানিক) সঙ্গে দেখা করতে। শুনলাম আয়শা-মনিরা ঢাকা এসেছে নেত্রকোনা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে।

আমি তখন ইন্টারমিডিয়েট পড়ছি বর্তমান বদরুন্নেছা কলেজে। ছাত্র ইউনিয়ন করি। সি-ফাইভ ছাত্র ইউনিয়নের আন্দোলন সংগ্রামের ঘাঁটি। মানিক ভাই সেখানে থাকার কারণে। মানিক ভাইয়ের নামে তখন গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকায় তিনি সেখানে আত্মগোপন করে থাকছিলেন।

সেই প্রথম নাম শুনলাম, পরে দেখা হয়েছে। কিন্তু কবে তা আজ আর মনে নেই। আয়শা খানম ও মনিরা আক্তার খাতুন দুই ঘনিষ্ঠ বান্ধবী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন সমাজবিজ্ঞান বিভাগে। আমরা কলেজে। ছাত্র ইউনিয়নের প্রতিদিন মিটিং-মিছিলে আমাদের অগণিত বার দেখা হয়েছে।

তখন আইয়ূবের সামরিক শাসন ও স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য ছাত্রদের তুমুল ও তীব্র লড়াই চলছে। সরকারের দমনপীড়ন উপেক্ষা করে প্রতিদিনই সভা-সমাবেশ, আন্দোলন, সংগ্রাম চলছে।

ইতোমধ্যে আমরা ইন্টারমিডিয়েট পাস করে ঢাকা বিশ্বাবিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হলাম। পড়াশোনার নাম নেই। শুধু ক্লাসগুলো করি। বাকি সময় কাটে বটতলায় মধুর ক্যান্টিনে বা ছাত্র ইউনিয়ন অফিসে, সভা-সমাবেশে। মিটিংয়ে-মিছিলে। কখনওবা শহীদ মিনারে আমাদের সভা বা সমাবেশ থাকে। আয়শা আপা রোকেয়া হলের আবাসিক ছাত্রী। আমি অনাবাসিক তবে রোকেয়া হলে এটাচ্ড। আসল কথা আমরা সবাই ছাত্র ইউনিয়ন করি। ছাত্র আন্দোলনের লড়াকু সৈনিক এক একজন।

কলেজে পড়ার সময়েই (১৯৬৫-৬৬ সালে) আমি ছাত্র ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। আয়শা আপা ১৯৬৮ সালে এই কমিটির সহ-সভানেত্রী হন। তখন থেকে আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি। পরে কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটিরও সদস্য ছিলেন।

ছাত্র ইউনিয়নে আমরা ছাত্রনেত্রী হিসেবে দেখেছি মতিয়া আপাকে (মতিয়া চৌধুরী)। মতিয়া আপা ছাত্রজীবন শেষ করে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। পরে নেতৃত্বে এসেছেন মালেকা আপা (মালেকা বেগম)। মালেকা আপার পরে নেতৃত্বে আসেন আয়শা খানম। পরে তিনি রোকেয়া হল ছাত্রী সংসদের সাধারণ সম্পাদক হন। সহ-সভাপতি ছিলেন মালেকা বেগম। পরে আয়শা খানম ভিপি এবং রাশেদা খানম (রিনা খান) জিএস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আয়শা আপা ছিলেন তুখোড় ভক্ত। অনর্গল বলে যেতে পারতেন।

আইয়ূবের স্বৈরশাসনবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ক্রমে ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ’৬৯-এর গণ-আন্দোলনের উত্তাল সংগ্রামের দিনগুলোতে আমরা সবাই একসঙ্গে মিছিলে ছিলাম।

’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানে যে বিপুল গণজাগরণ ঘটেছিল তা থেকে নারী সমাজও পিছিয়ে ছিল না। ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে সবাই সরব ও সোচ্চার হয়ে উঠেছিল। মায়েরা ও বোনেরা সবাই প্রতিবাদে সেদিন নেমে এসেছিল রাজপথে।

’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের পর এই নারী সমাজকে সংগঠিত করতে পাড়ায় পাড়ায় গঠন করা হয়েছিল মহিলা গণসংগ্রাম কমিটি। পরে এই নারীদের সংগঠিত করে নারীদের দাবি আদায়ের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গঠন করা হয় পূর্ব পাকিস্তান মহিলা পরিষদ (বর্তমানে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ)।

সুফিয়া কামালকে সভানেত্রী ও মালেকা বেগমকে আহ্বায়ক করে গঠিত হয় মহিলা পরিষদের আহ্বায়ক কমিটি, পরে পূর্ণাঙ্গ কমিটি। সভানেত্রী সুফিয়া কামাল এবং মালেকা বেগম সাধারণ সম্পাদিকা।

নারীদের জন্য এই সংগঠন গঠনের পেছনে নির্দেশনা ও পরামর্শদাতা হিসেবে ছিল কমিউনিস্ট পার্টি। কমিউনিস্ট পার্টির ভাবনা ছিল ছাত্র আন্দোলনে যে একঝাঁক বিপ্লবী তরুণী যুক্ত হয়েছে, তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ও ছাত্রজীবন শেষ করে তারা যেন নারী আন্দোলনে গড়ে তুলতে একটি কর্মক্ষেত্র পায় সেজন্য এমন একটি সংগঠন প্রয়োজন। ছাত্রত্ব শেষ হতে মালেকা আপা মহিলা পরিষদের নেতৃত্বের হাল ধরলেন। সংগঠনটি গড়ে তোলার দায়িত্ব নিলেন। তার সঙ্গে ছিলাম আমরা একঝাঁক স্বপ্নদেখা তরুণী। আমরা তখনও ছাত্র। তবু আমরা সবাই মহিলা পরিষদ করি। শুরু থেকেই আমরা এর সঙ্গে যুক্ত। ডা. মাখদুমা নার্গিস রতœা, কাজী মমতা হেনা, আয়শা খানম, মনিরা আক্তার খাতুন, ডা. ফওজিয়া মোসলেম, ফরিদা আখতার জাহান, নাসিমুন আরা হক ও কাজী রোকেয়া সুলতানা এমনি কত নাম।

ছাত্রত্ব শেষ করে একে একে সবাই মহিলা পরিষদে যোগ দিলেন। মালেকা আপা বহু বছর মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদিকা ছিলেন। আয়শা আপা সাংগঠনিক সম্পাদিকা হিসেবে বহু বছর দায়িত্ব পালন করেছেন। পরে আয়শা আপা একপর্যায়ে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদিকার দায়িত্ব পেয়েছেন। দীর্ঘদিন তিনি এই দায়িত্ব পালন করেছেন। পরে ২০০৮ সালে তিনি এই সংগঠনের সভানেত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

মহিলা পরিষদের নেত্রী হলেও তিনি আসলে এ দেশের নারী আন্দোলনেরই নেতৃত্ব দিয়েছেন। বহু সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করেছেন।

৬৮টি সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির আহ্বায়কের দায়িত্ব তিনি বহু বছর পালন করেছেন। সে হিসাবে তিনি সামাজিক প্রতিরোধ কমিটিরও নেতা ছিলেন।

সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির কাজ ছিল সমাজে সর্বস্তরে নারীর সম-অধিকার প্রতিষ্ঠা ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। একই লক্ষ্য নিয়ে মহিলা পরিষদ জন্মলগ্ন থেকে কাজ করেছে। আয়শা খানমও জীবনভর কাজ করেছেন নারীর সম-অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। নারীর প্রতি সব নির্যাতন-বৈষম্য অবসানের জন্য। সাংগঠনিক সম্পাদিকা হিসেবে তিনি সারাদেশে বহু জেলা সফর করেছেন। এছাড়া তিনি পৃথিবীর নানা দেশে বহু সম্মেলনে যোগদান করেছেন। বহু দেশ সফর করেছেন। ২০০০ সালে আমরা একসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বেজিং+৫ সম্মেলনে যোগ দিয়েছি। বহু স্মৃতি আজ মনে পড়ছে।

নেত্রকোনার গাবড়াগাতি গ্রামে ১৯৪৭ সালের ১৮ অক্টোবর আয়শা খানমের জন্ম। তার মা জামাতুন্নেসা খানম। বাবা গোলাম আলী খান।

নেত্রকোনার মামনুন্নেছা কলেজ থেকে তিনি ইন্টারমিডিয়েট পাস করে ১৯৬৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। পরে তিনি নারী আন্দোলনে যুক্ত হন।

আয়শা আপার স্বামী আমাদের মর্তুজা ভাই- মর্তুজা খান একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। কয়েক বছর আগে এক সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি মর্মান্তিক মৃত্যুবরণ করেন।

আয়শা আপার একমাত্র মেয়ে উর্মি খান যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় নিযুক্ত। সান্ত্বনা এতটুকুই যে, ২ জানুয়ারি, শনিবার ভোরে আয়শা আপার যখন মৃত্যু হয় তখন উর্মি তার পাশে ছিল।

মুক্তিযোদ্ধা, মানবাধিকার কর্মী, নারী নেত্রী আয়শা খানম বেঁচে থাকবেন তার কাজে। নারী আন্দোলনের কর্মীদের স্মৃতিতে। আমার ৫ দশকের সহকর্মী ও বন্ধুকে বিদায় জানানো বা কিছু লেখা খুবই কঠিন। তবু বিদায় বলতে হয়। বিদায় কমরেড। বিদায়।

[লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক

সভাপতি, নারী সাংবাদিক কেন্দ্র]

বৃহস্পতিবার, ০৭ জানুয়ারী ২০২১ , ২৩ পৌষ ১৪২৭, ২২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪২

বিদায় কমরেড, বিদায়

নাসিমুন আরা হক

আয়শা আপা চলে গেলেন। মেনে নিতে পারছি না। শনিবার ভোর সোয়া ৬টায় ঘুম থেকে উঠেছি। সময় দেখতে টেলিফোনটা হাতে নিলাম। ফেসবুকটাও কেন জানি দেখলাম। খুলতেই দুঃসংবাদ। আয়শা আপা আর নেই। বিশ্বাস হয় না। এত সকালে কাউকে যে ফোন করে আবার জানাবো, তারও উপায় নেই।

বিশ্বাসও করতেই হবে; ফেসবুকে লিখেছেন মনিরা আপাÑ মনিরা আক্তার খাতুন। আয়শা আপার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়।

ছুটলাম আয়শা আপার বাসায়।

আয়শা খানম নারী নেত্রী, মানবাধিকার কর্মী, মুক্তিযোদ্ধা এবং মহিলা পরিষদের সভানেত্রী আর নেই। আমার বহু বছরের বন্ধু, সহকর্মী আয়শা আপা গত এক বছর ধরে ফুসফুসের ক্যানসারে ভুগছিলেন। আজ সবশেষ হয়ে গেল।

আয়শা আপার সঙ্গে আমার পরিচয় ও বন্ধুত্ব পাঁচ দশকের। ১৯৬৫ সালে একদিন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র হোস্টেলের সি-ফাইভ নম্বর রুমে গিয়েছি মানিক ভাইয়ের (সাইফউদ্দিন আহমেদ মানিক) সঙ্গে দেখা করতে। শুনলাম আয়শা-মনিরা ঢাকা এসেছে নেত্রকোনা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে।

আমি তখন ইন্টারমিডিয়েট পড়ছি বর্তমান বদরুন্নেছা কলেজে। ছাত্র ইউনিয়ন করি। সি-ফাইভ ছাত্র ইউনিয়নের আন্দোলন সংগ্রামের ঘাঁটি। মানিক ভাই সেখানে থাকার কারণে। মানিক ভাইয়ের নামে তখন গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকায় তিনি সেখানে আত্মগোপন করে থাকছিলেন।

সেই প্রথম নাম শুনলাম, পরে দেখা হয়েছে। কিন্তু কবে তা আজ আর মনে নেই। আয়শা খানম ও মনিরা আক্তার খাতুন দুই ঘনিষ্ঠ বান্ধবী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন সমাজবিজ্ঞান বিভাগে। আমরা কলেজে। ছাত্র ইউনিয়নের প্রতিদিন মিটিং-মিছিলে আমাদের অগণিত বার দেখা হয়েছে।

তখন আইয়ূবের সামরিক শাসন ও স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য ছাত্রদের তুমুল ও তীব্র লড়াই চলছে। সরকারের দমনপীড়ন উপেক্ষা করে প্রতিদিনই সভা-সমাবেশ, আন্দোলন, সংগ্রাম চলছে।

ইতোমধ্যে আমরা ইন্টারমিডিয়েট পাস করে ঢাকা বিশ্বাবিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হলাম। পড়াশোনার নাম নেই। শুধু ক্লাসগুলো করি। বাকি সময় কাটে বটতলায় মধুর ক্যান্টিনে বা ছাত্র ইউনিয়ন অফিসে, সভা-সমাবেশে। মিটিংয়ে-মিছিলে। কখনওবা শহীদ মিনারে আমাদের সভা বা সমাবেশ থাকে। আয়শা আপা রোকেয়া হলের আবাসিক ছাত্রী। আমি অনাবাসিক তবে রোকেয়া হলে এটাচ্ড। আসল কথা আমরা সবাই ছাত্র ইউনিয়ন করি। ছাত্র আন্দোলনের লড়াকু সৈনিক এক একজন।

কলেজে পড়ার সময়েই (১৯৬৫-৬৬ সালে) আমি ছাত্র ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। আয়শা আপা ১৯৬৮ সালে এই কমিটির সহ-সভানেত্রী হন। তখন থেকে আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি। পরে কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটিরও সদস্য ছিলেন।

ছাত্র ইউনিয়নে আমরা ছাত্রনেত্রী হিসেবে দেখেছি মতিয়া আপাকে (মতিয়া চৌধুরী)। মতিয়া আপা ছাত্রজীবন শেষ করে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। পরে নেতৃত্বে এসেছেন মালেকা আপা (মালেকা বেগম)। মালেকা আপার পরে নেতৃত্বে আসেন আয়শা খানম। পরে তিনি রোকেয়া হল ছাত্রী সংসদের সাধারণ সম্পাদক হন। সহ-সভাপতি ছিলেন মালেকা বেগম। পরে আয়শা খানম ভিপি এবং রাশেদা খানম (রিনা খান) জিএস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আয়শা আপা ছিলেন তুখোড় ভক্ত। অনর্গল বলে যেতে পারতেন।

আইয়ূবের স্বৈরশাসনবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ক্রমে ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ’৬৯-এর গণ-আন্দোলনের উত্তাল সংগ্রামের দিনগুলোতে আমরা সবাই একসঙ্গে মিছিলে ছিলাম।

’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানে যে বিপুল গণজাগরণ ঘটেছিল তা থেকে নারী সমাজও পিছিয়ে ছিল না। ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে সবাই সরব ও সোচ্চার হয়ে উঠেছিল। মায়েরা ও বোনেরা সবাই প্রতিবাদে সেদিন নেমে এসেছিল রাজপথে।

’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানের পর এই নারী সমাজকে সংগঠিত করতে পাড়ায় পাড়ায় গঠন করা হয়েছিল মহিলা গণসংগ্রাম কমিটি। পরে এই নারীদের সংগঠিত করে নারীদের দাবি আদায়ের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গঠন করা হয় পূর্ব পাকিস্তান মহিলা পরিষদ (বর্তমানে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ)।

সুফিয়া কামালকে সভানেত্রী ও মালেকা বেগমকে আহ্বায়ক করে গঠিত হয় মহিলা পরিষদের আহ্বায়ক কমিটি, পরে পূর্ণাঙ্গ কমিটি। সভানেত্রী সুফিয়া কামাল এবং মালেকা বেগম সাধারণ সম্পাদিকা।

নারীদের জন্য এই সংগঠন গঠনের পেছনে নির্দেশনা ও পরামর্শদাতা হিসেবে ছিল কমিউনিস্ট পার্টি। কমিউনিস্ট পার্টির ভাবনা ছিল ছাত্র আন্দোলনে যে একঝাঁক বিপ্লবী তরুণী যুক্ত হয়েছে, তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ও ছাত্রজীবন শেষ করে তারা যেন নারী আন্দোলনে গড়ে তুলতে একটি কর্মক্ষেত্র পায় সেজন্য এমন একটি সংগঠন প্রয়োজন। ছাত্রত্ব শেষ হতে মালেকা আপা মহিলা পরিষদের নেতৃত্বের হাল ধরলেন। সংগঠনটি গড়ে তোলার দায়িত্ব নিলেন। তার সঙ্গে ছিলাম আমরা একঝাঁক স্বপ্নদেখা তরুণী। আমরা তখনও ছাত্র। তবু আমরা সবাই মহিলা পরিষদ করি। শুরু থেকেই আমরা এর সঙ্গে যুক্ত। ডা. মাখদুমা নার্গিস রতœা, কাজী মমতা হেনা, আয়শা খানম, মনিরা আক্তার খাতুন, ডা. ফওজিয়া মোসলেম, ফরিদা আখতার জাহান, নাসিমুন আরা হক ও কাজী রোকেয়া সুলতানা এমনি কত নাম।

ছাত্রত্ব শেষ করে একে একে সবাই মহিলা পরিষদে যোগ দিলেন। মালেকা আপা বহু বছর মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদিকা ছিলেন। আয়শা আপা সাংগঠনিক সম্পাদিকা হিসেবে বহু বছর দায়িত্ব পালন করেছেন। পরে আয়শা আপা একপর্যায়ে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদিকার দায়িত্ব পেয়েছেন। দীর্ঘদিন তিনি এই দায়িত্ব পালন করেছেন। পরে ২০০৮ সালে তিনি এই সংগঠনের সভানেত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

মহিলা পরিষদের নেত্রী হলেও তিনি আসলে এ দেশের নারী আন্দোলনেরই নেতৃত্ব দিয়েছেন। বহু সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করেছেন।

৬৮টি সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির আহ্বায়কের দায়িত্ব তিনি বহু বছর পালন করেছেন। সে হিসাবে তিনি সামাজিক প্রতিরোধ কমিটিরও নেতা ছিলেন।

সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির কাজ ছিল সমাজে সর্বস্তরে নারীর সম-অধিকার প্রতিষ্ঠা ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। একই লক্ষ্য নিয়ে মহিলা পরিষদ জন্মলগ্ন থেকে কাজ করেছে। আয়শা খানমও জীবনভর কাজ করেছেন নারীর সম-অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। নারীর প্রতি সব নির্যাতন-বৈষম্য অবসানের জন্য। সাংগঠনিক সম্পাদিকা হিসেবে তিনি সারাদেশে বহু জেলা সফর করেছেন। এছাড়া তিনি পৃথিবীর নানা দেশে বহু সম্মেলনে যোগদান করেছেন। বহু দেশ সফর করেছেন। ২০০০ সালে আমরা একসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বেজিং+৫ সম্মেলনে যোগ দিয়েছি। বহু স্মৃতি আজ মনে পড়ছে।

নেত্রকোনার গাবড়াগাতি গ্রামে ১৯৪৭ সালের ১৮ অক্টোবর আয়শা খানমের জন্ম। তার মা জামাতুন্নেসা খানম। বাবা গোলাম আলী খান।

নেত্রকোনার মামনুন্নেছা কলেজ থেকে তিনি ইন্টারমিডিয়েট পাস করে ১৯৬৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। পরে তিনি নারী আন্দোলনে যুক্ত হন।

আয়শা আপার স্বামী আমাদের মর্তুজা ভাই- মর্তুজা খান একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। কয়েক বছর আগে এক সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি মর্মান্তিক মৃত্যুবরণ করেন।

আয়শা আপার একমাত্র মেয়ে উর্মি খান যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় নিযুক্ত। সান্ত্বনা এতটুকুই যে, ২ জানুয়ারি, শনিবার ভোরে আয়শা আপার যখন মৃত্যু হয় তখন উর্মি তার পাশে ছিল।

মুক্তিযোদ্ধা, মানবাধিকার কর্মী, নারী নেত্রী আয়শা খানম বেঁচে থাকবেন তার কাজে। নারী আন্দোলনের কর্মীদের স্মৃতিতে। আমার ৫ দশকের সহকর্মী ও বন্ধুকে বিদায় জানানো বা কিছু লেখা খুবই কঠিন। তবু বিদায় বলতে হয়। বিদায় কমরেড। বিদায়।

[লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক

সভাপতি, নারী সাংবাদিক কেন্দ্র]