বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে স্বাধীনতা পূর্ণতা পায়

অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান

১৯৭১-এর ডিসেম্বরের ২য় সপ্তাহ থেকে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী পিছু হটতে থাকে- একের পর এক মুক্ত হতে থাকে বাংলার ভূখণ্ড। ঐতিহাসিক রেসকোর্সে ১৬ ডিসেম্বর বিকেল ৪টা ৩১ মিনিটে বিশাল হর্ষোৎফুল্ল জনতার উপস্থিতিতে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ বাহিনীর কাছে পাকিস্তান বাহিনীর সমর নায়ক লে. জেনারেল একে নিয়াজি ৯৩ হাজার সৈন্য ও অফিসারসহ আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণ করেন।

সর্বত্র আনন্দের প্লাবন বইতে শুরু করেছে। উপচে পড়া উচ্ছলতার মাঝেও বঙ্গবন্ধুর শূন্যতা গভীরভাবে অনুভূত হয় সবার মাঝে। বঙ্গবন্ধুবিহীন বাংলাদেশ অসম্পূর্ণ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অপূর্ণ। দেশের সর্বস্তরের মানুষ জীবিত বঙ্গবন্ধুকে ফিরে যাওয়ার জন্য উদগ্রীব। সবাই নানাভাবে নামাজ-রোজা-দোয়া করতে থাকলেন। মুক্তিযোদ্ধারা এতটাই আবেগাপ্লুত ছিলেন যে, তারা ঘোষণা দিয়েছিলেন প্রয়োজনে পাকিস্তানের সীমান্তে গিয়ে যুদ্ধ করে বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করে আনবেন।

ইতিহাসের সেই আকাক্সিক্ষত মাহেন্দ্রক্ষণে নিয়াজি যখন ঢাকার রেসকোর্সে আত্মসমর্পণ করছেন, ঠিক সেই সময়টিতেই দূরে বহুদূরে পাকিস্তানের মৃত্যু কুঠরিতে এ সংগ্রামের মহানায়ক শেখ মুজিবুর রহমান অপেক্ষা করছেন ইতিহাসের পরবর্তী ঘটনার জন্যে। তাকে অভিযুক্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল। সব ব্যাপারটি তখন ছিল প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার হাতের ওপর। তাকে কখন মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে, কোন পদ্ধতিতেই বা তা কার্যকর করা হবে, সব কিছুই নির্ভর করছিল তার ওপর।

বিচারের সিদ্ধান্ত আসার আগেই বঙ্গবন্ধু ধরে নিয়েছিলেন যে মৃত্যু তার অবধারিত বিচারের পর তিনি প্রতিদিনই ভাবতেন আজ নিশ্চয়ই আমার শেষ দিন। তার পক্ষে আপিল করার মতো কেউ ছিলেন না, মামলাটি পুনর্বিবেচনা করবার কথাও কেউ বলতে পারেনি। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তার প্রত্যয় হারাননি। ক্ষমতাতো তিনি চানইনি, প্রত্যাশাও করেননি।

বন্দীত্বের সময়গুলোতে তিনি পুরো পৃথিবীর মানুষের হৃৎপিন্ডে স্থান করে নিতে পেরেছিলেন। জীবিত অবস্থায় এরকম কিংবদন্তির নায়ক হয়ে যেতে পারে খুব কম মানুষই।

ইতোমধ্যে পাকিস্তানে ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। ইয়াহিয়ার কাছ থেকে দায়িত্ব পান ভুট্টো। পৃথিবীর প্রায় সব জায়গা থেকেই শেখ মুজিবের মুক্তির জন্য আবেদন আসছিল। জাতিসংঘের মহাসচিব, ইউরোপের প্রায় অর্ধেক দেশের রাষ্ট্র প্রধানরা, এমনকি আন্তর্জাতিক আইনজীবী সমিতিও ইসলামাবাদের কাছ শেখ মুজিবের মুক্তির জন্য আবেদন জানালেন। অনেকগুলো মুসলিম দেশের সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নও শেখ মুজিবের মুক্তির জন্য পাকিস্তান সরকারের কাছ অনুরোধ জানালেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন বলেছিল যে, শেখ মুজিবের যদি কিছু ঘটে যায় তাহলে তার সব দায়ভাগই পাকিস্তানকে গ্রহণ করতে হবে। এবং তার ফলাফল কখনও ভালো হবে না।

রেসকোর্সে আত্মসমর্পণ করার ২১ দিন পেরিয়ে গেলে অবশেষে ভুট্টো শেখ মুজিবকে ছেড়ে দেয়ার অনুমতি দিলেন। শেষ মুহূর্তেও ইরান বা তুরস্কে অন্য একটি বৈঠকের প্রস্তাব দিলেন ভুট্টো। একের পর এক কৌশলের চাল দিতে লাগলেন ভুট্টো। কিন্তু শেখ মুজিবের ঋজুতাকে কোনক্রমেই ভাঙতে পারেনি।

অবশেষে ৭ জানুয়ারি ১৯৭২-এর সন্ধ্যায় শেখ মুজিবকে জানানো হলো যে তার জন্যে ইসলামাবাদ এয়ারপোর্টে চার্টার করা বিমান অপেক্ষা করে রয়েছে। ৮ জানুয়ারি অন্ধকারের পেট চিরে বেরিয়ে আসছে সোনা রঙের ভোরÑ এ রকম একটা সময়ে বঙ্গবন্ধুকে বয়ে আনা চার্টার করা বিমানটি হিথরো এয়ারপোর্টের মাটি ছুঁলো। ভোর তখন ৬টা ৩৬ মিনিট স্থানীয় সময়।

তার মুক্তির খবর শুনে বাংলাদেশে খুশির বন্যা বয়ে যায় । পুরো জাতি তখন তার ফিরে আসার অপেক্ষায়। দিল্লিতে বঙ্গবন্ধুর সংক্ষিপ্ত যাত্রা-বিরতিতে রাষ্ট্রীয় সংবর্ধনা এবং রাষ্ট্রপতি ভবনে সৌজন্য কথাবার্তার পর ব্রিটিশ রাজকীয় বিমানেই তিনি যাত্রা করেছিলেন ঢাকার উদ্দেশে। ব্রিটিশ কমেট বিমানটি তেজগাঁ বিমানবন্দর স্পর্শ করে বেলা ৩টায়। তেজগাঁ বিমানবন্দর থেকে ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে লাখ লাখ বাঙালির ভালোবাসা আর স্নেহের পরশ ভেদ করে পৌঁছাতে তার সময় লেগেছিল আড়াই ঘণ্টা। রেসকোর্সে লাখো জনতার মাঝ থেকে বঙ্গবন্ধুর পরিবারবর্গের সঙ্গে সন্ধ্যে পৌনে ৬টায় পৌঁছেন।

এত দীর্ঘ পথযাত্রা, দীর্ঘ আনুষ্ঠানিকতা, জনসভা, আবেগ-উচ্ছ্বাস-কান্নার বিনিময়ের পর ১১ জানুয়ারি থেকে বঙ্গবন্ধু সব ক্লান্তি-ভাবাবেগ উপেক্ষা করে এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে দেশ পরিচালনা শুরু করেন। সেদিনই মন্ত্রিসভার সঙ্গে দু’দফা বৈঠক করেন এবং বৈঠকে সংবিধান প্রণয়নসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১২ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু অস্থায়ী সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং নতুন মন্ত্রিপরিষদ গঠন করেন।

বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে হাজার বছরের বাঙালির আকাক্সক্ষার স্বাধীনতা পূর্ণতা পেল। মৃত্যুদণ্ডাদেশ পেয়ে শত্রু পরিবেষ্টিত হয়ে শত্রুর ঘরে নির্ভয়, দৃঢ়তা, আপসহীনতা এবং সাহসের উদাহরণ বিশ্বের ইতিহাসে একমাত্র দৃষ্টান্ত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১০ জানুয়ারি ২০২০, বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে ‘মুজিববর্ষ’ এর ক্ষণগণনার উদ্বোধন করেছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা। ১৭ মার্চ ২০২০ থেকে ১৭ মার্চ ২০২১ পর্যন্ত ‘মুজিববর্ষ’ উদযাপন উপলক্ষে দেশে-বিদেশে সরকার, রাজনৈতিক দল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন নানামুখী কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছিল। মূল লক্ষ্য-১. নতুন প্রজন্মের মাঝে বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্ম তুলে ধরা ২. ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা গড়ে তুলতে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও ৩. সেবা ত্বরান্বিত করা ও নতুন মাত্রা সংযোজন। করোনার আক্রমণের কারণে অনেক কিছুই পরিকল্পনা অনুযায়ী করা যায়নি। পরিস্থিতি বিবেচনা করে ডিসেম্বর ২০২১ পর্যন্ত মুজিববর্ষ বর্ধিত করা হয়েছে। সঙ্গে যুক্ত আছে স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পূর্তি। দেশের সাধারণ মানুষের আকাক্সক্ষার মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালনের মধ্য দিয়ে মুজিব আদর্শ ও মুজিবের স্বপ্ন বাস্তবায়নের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। জাতির পিতার স্বপ্ন ছিল এদেশকে সোনার বাংলা গড়ার। তিনি বারবার বলেছেন সোনার বাংলা গড়তে হলে সোনার মানুষ চাই। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ নিজের মধ্যে ধারণ ও চর্চা না করলে সোনার মানুষতো পাওয়া যাবে না। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ মানে সর্বোচ্চ ত্যাগ, নির্লোভ, সততা, গভীর দেশপ্রেম, মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধ, মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর দৃঢ়তা, আত্মমর্যাদা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধ। প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বলেছেন- ‘নতুন জীবনীশক্তি সঞ্চার করবে মুজিববর্ষ।’ মুজিব শতবার্ষিকী, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং শেখ হাসিনার উন্নয়নের বাংলাদেশ- তিনে মিলে বাঙালি জাতি উদ্দীপ্ত হবে নতুন করে এবং বাংলাদেশ পৌঁছে যাবে উন্নত সোনার বাংলাদেশে।

[লেখক : সাবেক ভিসি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়]

রবিবার, ১০ জানুয়ারী ২০২১ , ২৬ পৌষ ১৪২৭, ২৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪২

বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে স্বাধীনতা পূর্ণতা পায়

অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান
image

১৯৭১-এর ডিসেম্বরের ২য় সপ্তাহ থেকে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী পিছু হটতে থাকে- একের পর এক মুক্ত হতে থাকে বাংলার ভূখণ্ড। ঐতিহাসিক রেসকোর্সে ১৬ ডিসেম্বর বিকেল ৪টা ৩১ মিনিটে বিশাল হর্ষোৎফুল্ল জনতার উপস্থিতিতে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ বাহিনীর কাছে পাকিস্তান বাহিনীর সমর নায়ক লে. জেনারেল একে নিয়াজি ৯৩ হাজার সৈন্য ও অফিসারসহ আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণ করেন।

সর্বত্র আনন্দের প্লাবন বইতে শুরু করেছে। উপচে পড়া উচ্ছলতার মাঝেও বঙ্গবন্ধুর শূন্যতা গভীরভাবে অনুভূত হয় সবার মাঝে। বঙ্গবন্ধুবিহীন বাংলাদেশ অসম্পূর্ণ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অপূর্ণ। দেশের সর্বস্তরের মানুষ জীবিত বঙ্গবন্ধুকে ফিরে যাওয়ার জন্য উদগ্রীব। সবাই নানাভাবে নামাজ-রোজা-দোয়া করতে থাকলেন। মুক্তিযোদ্ধারা এতটাই আবেগাপ্লুত ছিলেন যে, তারা ঘোষণা দিয়েছিলেন প্রয়োজনে পাকিস্তানের সীমান্তে গিয়ে যুদ্ধ করে বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করে আনবেন।

ইতিহাসের সেই আকাক্সিক্ষত মাহেন্দ্রক্ষণে নিয়াজি যখন ঢাকার রেসকোর্সে আত্মসমর্পণ করছেন, ঠিক সেই সময়টিতেই দূরে বহুদূরে পাকিস্তানের মৃত্যু কুঠরিতে এ সংগ্রামের মহানায়ক শেখ মুজিবুর রহমান অপেক্ষা করছেন ইতিহাসের পরবর্তী ঘটনার জন্যে। তাকে অভিযুক্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল। সব ব্যাপারটি তখন ছিল প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার হাতের ওপর। তাকে কখন মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে, কোন পদ্ধতিতেই বা তা কার্যকর করা হবে, সব কিছুই নির্ভর করছিল তার ওপর।

বিচারের সিদ্ধান্ত আসার আগেই বঙ্গবন্ধু ধরে নিয়েছিলেন যে মৃত্যু তার অবধারিত বিচারের পর তিনি প্রতিদিনই ভাবতেন আজ নিশ্চয়ই আমার শেষ দিন। তার পক্ষে আপিল করার মতো কেউ ছিলেন না, মামলাটি পুনর্বিবেচনা করবার কথাও কেউ বলতে পারেনি। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তার প্রত্যয় হারাননি। ক্ষমতাতো তিনি চানইনি, প্রত্যাশাও করেননি।

বন্দীত্বের সময়গুলোতে তিনি পুরো পৃথিবীর মানুষের হৃৎপিন্ডে স্থান করে নিতে পেরেছিলেন। জীবিত অবস্থায় এরকম কিংবদন্তির নায়ক হয়ে যেতে পারে খুব কম মানুষই।

ইতোমধ্যে পাকিস্তানে ক্ষমতার পালাবদল ঘটে। ইয়াহিয়ার কাছ থেকে দায়িত্ব পান ভুট্টো। পৃথিবীর প্রায় সব জায়গা থেকেই শেখ মুজিবের মুক্তির জন্য আবেদন আসছিল। জাতিসংঘের মহাসচিব, ইউরোপের প্রায় অর্ধেক দেশের রাষ্ট্র প্রধানরা, এমনকি আন্তর্জাতিক আইনজীবী সমিতিও ইসলামাবাদের কাছ শেখ মুজিবের মুক্তির জন্য আবেদন জানালেন। অনেকগুলো মুসলিম দেশের সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নও শেখ মুজিবের মুক্তির জন্য পাকিস্তান সরকারের কাছ অনুরোধ জানালেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন বলেছিল যে, শেখ মুজিবের যদি কিছু ঘটে যায় তাহলে তার সব দায়ভাগই পাকিস্তানকে গ্রহণ করতে হবে। এবং তার ফলাফল কখনও ভালো হবে না।

রেসকোর্সে আত্মসমর্পণ করার ২১ দিন পেরিয়ে গেলে অবশেষে ভুট্টো শেখ মুজিবকে ছেড়ে দেয়ার অনুমতি দিলেন। শেষ মুহূর্তেও ইরান বা তুরস্কে অন্য একটি বৈঠকের প্রস্তাব দিলেন ভুট্টো। একের পর এক কৌশলের চাল দিতে লাগলেন ভুট্টো। কিন্তু শেখ মুজিবের ঋজুতাকে কোনক্রমেই ভাঙতে পারেনি।

অবশেষে ৭ জানুয়ারি ১৯৭২-এর সন্ধ্যায় শেখ মুজিবকে জানানো হলো যে তার জন্যে ইসলামাবাদ এয়ারপোর্টে চার্টার করা বিমান অপেক্ষা করে রয়েছে। ৮ জানুয়ারি অন্ধকারের পেট চিরে বেরিয়ে আসছে সোনা রঙের ভোরÑ এ রকম একটা সময়ে বঙ্গবন্ধুকে বয়ে আনা চার্টার করা বিমানটি হিথরো এয়ারপোর্টের মাটি ছুঁলো। ভোর তখন ৬টা ৩৬ মিনিট স্থানীয় সময়।

তার মুক্তির খবর শুনে বাংলাদেশে খুশির বন্যা বয়ে যায় । পুরো জাতি তখন তার ফিরে আসার অপেক্ষায়। দিল্লিতে বঙ্গবন্ধুর সংক্ষিপ্ত যাত্রা-বিরতিতে রাষ্ট্রীয় সংবর্ধনা এবং রাষ্ট্রপতি ভবনে সৌজন্য কথাবার্তার পর ব্রিটিশ রাজকীয় বিমানেই তিনি যাত্রা করেছিলেন ঢাকার উদ্দেশে। ব্রিটিশ কমেট বিমানটি তেজগাঁ বিমানবন্দর স্পর্শ করে বেলা ৩টায়। তেজগাঁ বিমানবন্দর থেকে ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে লাখ লাখ বাঙালির ভালোবাসা আর স্নেহের পরশ ভেদ করে পৌঁছাতে তার সময় লেগেছিল আড়াই ঘণ্টা। রেসকোর্সে লাখো জনতার মাঝ থেকে বঙ্গবন্ধুর পরিবারবর্গের সঙ্গে সন্ধ্যে পৌনে ৬টায় পৌঁছেন।

এত দীর্ঘ পথযাত্রা, দীর্ঘ আনুষ্ঠানিকতা, জনসভা, আবেগ-উচ্ছ্বাস-কান্নার বিনিময়ের পর ১১ জানুয়ারি থেকে বঙ্গবন্ধু সব ক্লান্তি-ভাবাবেগ উপেক্ষা করে এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে দেশ পরিচালনা শুরু করেন। সেদিনই মন্ত্রিসভার সঙ্গে দু’দফা বৈঠক করেন এবং বৈঠকে সংবিধান প্রণয়নসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ১২ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু অস্থায়ী সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং নতুন মন্ত্রিপরিষদ গঠন করেন।

বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে হাজার বছরের বাঙালির আকাক্সক্ষার স্বাধীনতা পূর্ণতা পেল। মৃত্যুদণ্ডাদেশ পেয়ে শত্রু পরিবেষ্টিত হয়ে শত্রুর ঘরে নির্ভয়, দৃঢ়তা, আপসহীনতা এবং সাহসের উদাহরণ বিশ্বের ইতিহাসে একমাত্র দৃষ্টান্ত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১০ জানুয়ারি ২০২০, বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে ‘মুজিববর্ষ’ এর ক্ষণগণনার উদ্বোধন করেছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা। ১৭ মার্চ ২০২০ থেকে ১৭ মার্চ ২০২১ পর্যন্ত ‘মুজিববর্ষ’ উদযাপন উপলক্ষে দেশে-বিদেশে সরকার, রাজনৈতিক দল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন নানামুখী কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছিল। মূল লক্ষ্য-১. নতুন প্রজন্মের মাঝে বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্ম তুলে ধরা ২. ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা গড়ে তুলতে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও ৩. সেবা ত্বরান্বিত করা ও নতুন মাত্রা সংযোজন। করোনার আক্রমণের কারণে অনেক কিছুই পরিকল্পনা অনুযায়ী করা যায়নি। পরিস্থিতি বিবেচনা করে ডিসেম্বর ২০২১ পর্যন্ত মুজিববর্ষ বর্ধিত করা হয়েছে। সঙ্গে যুক্ত আছে স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পূর্তি। দেশের সাধারণ মানুষের আকাক্সক্ষার মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালনের মধ্য দিয়ে মুজিব আদর্শ ও মুজিবের স্বপ্ন বাস্তবায়নের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। জাতির পিতার স্বপ্ন ছিল এদেশকে সোনার বাংলা গড়ার। তিনি বারবার বলেছেন সোনার বাংলা গড়তে হলে সোনার মানুষ চাই। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ নিজের মধ্যে ধারণ ও চর্চা না করলে সোনার মানুষতো পাওয়া যাবে না। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ মানে সর্বোচ্চ ত্যাগ, নির্লোভ, সততা, গভীর দেশপ্রেম, মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধ, মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর দৃঢ়তা, আত্মমর্যাদা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধ। প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বলেছেন- ‘নতুন জীবনীশক্তি সঞ্চার করবে মুজিববর্ষ।’ মুজিব শতবার্ষিকী, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং শেখ হাসিনার উন্নয়নের বাংলাদেশ- তিনে মিলে বাঙালি জাতি উদ্দীপ্ত হবে নতুন করে এবং বাংলাদেশ পৌঁছে যাবে উন্নত সোনার বাংলাদেশে।

[লেখক : সাবেক ভিসি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়]