ঝুঁকির মুখে পরিবেশ

ভরাট হচ্ছে জলাশয়, কমছে চাষাবাদের জমি

ড. এসএম জাহাঙ্গীর আলম

ভরাট হচ্ছে নদী-নালা হাওর খাল-বিল। বিপন্ন হচ্ছে পরিবেশ। কমছে চাষাবাদের জমি। ভবিষ্যতে আসছে মারাত্মক বিপর্যয়। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে মোট নদীর সংখ্যা ৪০৫টি। অভিন্ন নদীর সংখ্যা ৫৪টি। এসব নদী ভরাট হয়ে যাচ্ছে। বিপন্নের মুখে জীববৈচিত্র্য আর সার্বিক পরিবেশ। হারিয়ে যাচ্ছে নৌপথ। গঙ্গা-পদ্মা-ব্রহ্মপুত্র-যমুনা, সুরমা-মেঘনা এবং এদের অসংখ্য উপনদী ও শাখানদী বাংলাদেশে নিষ্কাশন প্রণালির ধমনীর মতো কাজ করেছে। কর্ণফুলী, সাঙ্গু, মাতামুহুরী, ফেনী নদীসমূহ চট্টগ্রাম জেলা ও পার্বত্য অঞ্চলের জলধারাকে বঙ্গোপসাগরে পতিত করেছে।

বাংলাদেশে বর্তমানে ৭০০ এর মতো নদী, উপনদী ও শাখা নদী আছে। এ নদীগুলো সারাদেশে রক্তের শিরা-উপশিরার মতো বহমান। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা এবং মেঘনা এই নদ-নদীর মিলিত নিষ্কাশন অববাহিকার আয়তন প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ বর্গকিলোমিটার। নদ-নদীগুলো বঙ্গোসাগরে বয়ে নিয়ে আসে প্রচুর পরিমাণ পলি। ব্রহ্মপুত্র-যমুনাই শুধু প্রতিদিন ১২ লাখ টন পলি বহন করে আনে। প্রতি বছর গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদ-নদী প্রণালির মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে বয়ে আনা পলির পরিমাণ প্রায় ২.৪ বিলিয়ন টন। তিস্তার বুকে ধু-ধু বালুচর। একই অবস্থা পদ্মার। নদ-নদী ভরাট হওয়ায় কমছে নৌপথ। ইতোমধ্যে হারিয়ে গেছে ১৯ হাজার কিলোমিটার নৌপথ। দেশে একসময় ২৪ হাজার কিলোমিটার নদীপথ ছিল। দখল, দূষণ ও ভরাটে হারিয়ে গেছে ১৯ হাজার কিলোমিটার নৌপথ। বর্তমানে ৫ হাজার কিলোমিটারেরও কম নদীপথে চলছে নৌযান। সারাদেশে রয়েছে ৫৩টি নৌরুট। কমে যাচ্ছে নদীর নাব্যতা। দেশের প্রায় ১৪০টি নদ-নদী এখন মৃতপ্রায়। দেশের প্রায় ১৩টি নদীর অস্তিত্ব এখন বিলীনের পথে। এভাবে চলতে থাকলে দেশের মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে এসব নদী। জনসংখ্যা বাড়ছে, কমছে কৃষিজমি। কৃষিজমি কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মধ্যে পড়বে।

প্রতি বছর ৬৮৭৬০ হেক্টর চাষাবাদযোগ্য জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। দেশে বর্তমানে ৮.৫২ মিলিয়ন হেক্টর কৃষিজমি রয়েছে। ১৯৭৬ সালে আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ৯.৭৬২ মিলিয়ন হেক্টর। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঋতুর বৈশিষ্ট্য হারিয়ে যাচ্ছে। এ কারণে বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রার আমূল পরিবর্তন ঘটছে। জমির অতিকর্ষণে ভূমি ক্ষয় হচ্ছে। টপসয়েলের আস্তরণ কমে যাচ্ছে। একই জমি বারবার চাষ করার ফলে অধিকমাত্রায় রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে। দেশীয় ধানের জাত ১৯৮২ সালে ১২ হাজার ৪৮৭টি, ২০১৪ সালে ৭ হাজারটি (বিএআরআই) রয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে ইরি চাষের জন্য প্রচুর সেচের প্রয়োজন হয়। এতে ১২০০ থেকে ১৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজর হয়। সেচের পানি ভূ-গর্ভ ও ভূ-পৃষ্ঠ দুই উৎস থেকেই আসে এবং খাল-বিল, নদ-নদী শুকিয়ে যায়। দেশের অনেক জায়গায় বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে সেচ কাজে ভূ-গর্ভস্থ পানির অতিমাত্রায় উত্তোলনে এবং সেই ভূ-গর্ভস্থ পানির অপর্যাপ্ত পরিপূরণে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর আহরণ ক্ষমতার নিচে নেমে যাচ্ছে। দেশের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে বিগত ৩০ বছর (১৯৮১-২০১০) বার্ষিক গড় ১ দশমিক ৪ হারে গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর সবচেয়ে বেশি নেমেছে রাজশাহীতে।

বনজসম্পদে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী বৈচিত্র্যেও সমৃদ্ধ। বাংলাদেশে প্রায় ৯৮২ প্রজাতির বন্যপ্রাণী বিচরণ করে। এর মধ্যে ৫৩ প্রজাতির উভচর, ১৫৮ প্রজাতির সরীসৃপ, ৬৫০ প্রজাতির পাখি এবং ১২১ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী। উভচর প্রাণীর অধিকাংশই ব্যাঙ। গত শতাব্দীর আশির দশকে বাংলাদেশ ব্যাঙের পা রপ্তানি করে কৃষিক্ষেত্রে রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহারকে উৎসাহিত করে। ব্যাঙ ক্ষতিকর ৪৫ ধরনের পোকামাকড় খেয়ে থাকে। সরীসৃপ প্রাণীর ৩০ প্রজাতির কাছিমের প্রায় সবই বিপন্নের তালিকায়। বাংলাদেশে ২ প্রজাতির কুমির দেখা যায়। একটি লোনা পানির কুমির, অন্যটি ঘড়িয়াল। মিঠাপানির কুমির প্রায় সব নদীতে ছিল, যা বর্তমানে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বাংলাদেশে ১২ প্রজাতির বন্যপ্রাণী হারিয়ে গেছে এবং ৪০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৪১ প্রজাতির পাখি, ৫৮ প্রজাতির সরীসৃপ ও ৪ প্রজাতির উভচর প্রাণী হুমকির সম্মুখীন। গত ৪০ বছরে মধুপুর শালবনের ৮৫ শতাংশ ধ্বংস করা হয়েছে। চিংড়ি চাষের নামে চকরিয়া ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করা হয়েছে।

বিশ্বের একক সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট বাংলাদেশের সুন্দরবন। বিশ্বখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগারের বসবাস সুন্দরবনে। রয়েল বেঙ্গল টাইগার আমাদের জাতীয় পশু এবং সুন্দরবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রায় ১২ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন, সাইক্লোন, লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ, বনজ সম্পদের নির্বিচার আহরণ, বন্যপ্রাণী শিকার ইত্যাদি কারণে সুন্দরবনের অস্তিত্ব আজ হুমকির মুখে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং জীববৈচিত্র্যের এক অনন্য নিদর্শন সুন্দরবন। সুন্দরবনকে রক্ষা করে বাঘ (২০০৪ সালে ৪৪০টি, ২০০৬ সালে ২০০টি, ২০১৫ সালে ১০৬টি)। আর ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করে সুন্দরবন।

হাওর এলাকা প্রায় ২০ হাজার বর্গকিলোমিটার। সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় ৩৭৩টি হাওর-জলাভূমি রয়েছে। এসব হাওরের জৈব-বৈশিষ্ট্যসমূহ দৃশ্যত অনন্য ও আকর্ষণীয়। অতীতে হাওর অববাহিকার প্রাণবৈচিত্র্য ছিল অতি সমৃদ্ধ। কিন্তু পরিবেশগত অবক্ষয়ের কারণে প্রাণবৈচিত্র্যের এই প্রাচুর্য বর্তমানে ক্রমক্ষয়িষ্ণু। ঢাকা মহানগরীতে অধিক হারে ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণেই ভূ-গর্ভে পানির শূন্যতা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। মহানগরীতে যেখানে ১৯৭০ সালে ৪৯টি গভীর নলকূপ ছিল, বর্তমানে তা প্রায় ৭০০টি। গত কয়েক বছর ধরে প্রতি বছর পানির স্তর ১০ ফুট করে নিচে নামছে। ভূ-গর্ভে লবণ পানির অনুপ্রবেশ চলতে থাকলে ২০ থেকে ৩০ বছর পর মিঠাপানির অভাবে ঢাকায় জনশূন্যের পাশপাশি ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয় ঘটতে পারে।

ঢাকায় জলাশয় ও নিম্নাঞ্চলের পরিমাণ ছিল ১৯৬০ সালে যথাক্রমে ২৯৫২ ও ১৩৫২৮ হেক্টর, ১৯৮৮ সালে যথাক্রমে ২১০৪ ও ১২৭১৮ হেক্টর এবং ২০০৮ সালে যথাক্রমে ১৯৯১ ও ৬৪১৫ হেক্টর। ১৯৬০ সাল হতে ২০০৮ সাল পর্যন্ত জলাশয় ও নিম্নাঞ্চল যথাক্রমে ৩২ দশমিক ৫০ ও ৫২ দশমিক ৫০ হ্রাস পেয়েছে। জলাশয় ও নিম্নাঞ্চল ভরাট ও দখলের ফলে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং নগরবাসী প্রতিনিয়ত জলাবদ্ধতার শিকার হচ্ছে। জানা গেছে, দেশের ১০ হাজার কিলোমিটার নৌপথের নাব্য বাড়ানোর খসড়া মহাপরিকল্পনা তৈরি করেছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। এর আওতায় ১৭৮টি নদী খনন (ড্রেজিং) করা হবে। ২০২৫ সালের মধ্যে এ কর্মযজ্ঞ শেষ করতে চায় সংস্থাটি। খসড়া পরিকল্পনায় প্রাধান্য পেয়েছে হাওর, পার্বত্য ও দক্ষিণাঞ্চলের ৮০টি নদ-নদী। এর মধ্যে বরিশাল ও খুলনা বিভাগে রয়েছে অর্ধশত নদী খনন। এ কর্মযজ্ঞে মোট ব্যয় হবে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি। যদিও এত বিশাল নৌপথ খনন করার মতো সক্ষমতা ও জনবল এ মুহূর্তে সংস্থাটির নেই। এদিকে ড্রেজিং কার্যক্রম বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে তদারকিও বাড়িয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়।

সম্প্রতি নদী খননের আগে ও পরে হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ করে রেকর্ড রাখা বাধ্যতামূলক করে একটি পরিপত্র জারি করা হয়েছে। এই পরিপত্রে নদী খননে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে ১৬ দফা নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। বিআইডব্লিউটিএ আশা করছে, এ বিশাল কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের নৌ যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি হবে। বেড়ে যাবে পর্যটন শিল্পের বিকাশ। সংস্থাটির ড্রেজিং বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে সংস্থাটির তিনটি প্রকল্প চলমান আছে। এগুলোর আওতায় তিন হাজার ৩১৫ কিলোমিটার নদী খনন কাজ চলছে। আরও দুটি মেগা প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। শিগগিরই এ দুটি প্রকল্পের আওতায় এক হাজার ৩৯৩ কিলোমিটার খনন শুরু হবে। বাকি নদীগুলো খননে নতুন প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। নতুন-পুরাতন সব প্রকল্পের আওতায় ১০ হাজার ৫০০ কিলোমিটার নৌপথ খনন করা হবে। তবে এ প্রকল্প যত তাড়াতাড়ি সম্পন্ন হয় ততই মঙ্গল।

[লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক কর কমিশনার]

শুক্রবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২১ , ১৫ মাঘ ১৪২৭, ১৫ জমাদিউস সানি ১৪৪২

ঝুঁকির মুখে পরিবেশ

ভরাট হচ্ছে জলাশয়, কমছে চাষাবাদের জমি

ড. এসএম জাহাঙ্গীর আলম
image

ভরাট হচ্ছে নদী-নালা হাওর খাল-বিল। বিপন্ন হচ্ছে পরিবেশ। কমছে চাষাবাদের জমি। ভবিষ্যতে আসছে মারাত্মক বিপর্যয়। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশে মোট নদীর সংখ্যা ৪০৫টি। অভিন্ন নদীর সংখ্যা ৫৪টি। এসব নদী ভরাট হয়ে যাচ্ছে। বিপন্নের মুখে জীববৈচিত্র্য আর সার্বিক পরিবেশ। হারিয়ে যাচ্ছে নৌপথ। গঙ্গা-পদ্মা-ব্রহ্মপুত্র-যমুনা, সুরমা-মেঘনা এবং এদের অসংখ্য উপনদী ও শাখানদী বাংলাদেশে নিষ্কাশন প্রণালির ধমনীর মতো কাজ করেছে। কর্ণফুলী, সাঙ্গু, মাতামুহুরী, ফেনী নদীসমূহ চট্টগ্রাম জেলা ও পার্বত্য অঞ্চলের জলধারাকে বঙ্গোপসাগরে পতিত করেছে।

বাংলাদেশে বর্তমানে ৭০০ এর মতো নদী, উপনদী ও শাখা নদী আছে। এ নদীগুলো সারাদেশে রক্তের শিরা-উপশিরার মতো বহমান। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা এবং মেঘনা এই নদ-নদীর মিলিত নিষ্কাশন অববাহিকার আয়তন প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ বর্গকিলোমিটার। নদ-নদীগুলো বঙ্গোসাগরে বয়ে নিয়ে আসে প্রচুর পরিমাণ পলি। ব্রহ্মপুত্র-যমুনাই শুধু প্রতিদিন ১২ লাখ টন পলি বহন করে আনে। প্রতি বছর গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদ-নদী প্রণালির মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে বয়ে আনা পলির পরিমাণ প্রায় ২.৪ বিলিয়ন টন। তিস্তার বুকে ধু-ধু বালুচর। একই অবস্থা পদ্মার। নদ-নদী ভরাট হওয়ায় কমছে নৌপথ। ইতোমধ্যে হারিয়ে গেছে ১৯ হাজার কিলোমিটার নৌপথ। দেশে একসময় ২৪ হাজার কিলোমিটার নদীপথ ছিল। দখল, দূষণ ও ভরাটে হারিয়ে গেছে ১৯ হাজার কিলোমিটার নৌপথ। বর্তমানে ৫ হাজার কিলোমিটারেরও কম নদীপথে চলছে নৌযান। সারাদেশে রয়েছে ৫৩টি নৌরুট। কমে যাচ্ছে নদীর নাব্যতা। দেশের প্রায় ১৪০টি নদ-নদী এখন মৃতপ্রায়। দেশের প্রায় ১৩টি নদীর অস্তিত্ব এখন বিলীনের পথে। এভাবে চলতে থাকলে দেশের মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে এসব নদী। জনসংখ্যা বাড়ছে, কমছে কৃষিজমি। কৃষিজমি কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মধ্যে পড়বে।

প্রতি বছর ৬৮৭৬০ হেক্টর চাষাবাদযোগ্য জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। দেশে বর্তমানে ৮.৫২ মিলিয়ন হেক্টর কৃষিজমি রয়েছে। ১৯৭৬ সালে আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ৯.৭৬২ মিলিয়ন হেক্টর। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঋতুর বৈশিষ্ট্য হারিয়ে যাচ্ছে। এ কারণে বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রার আমূল পরিবর্তন ঘটছে। জমির অতিকর্ষণে ভূমি ক্ষয় হচ্ছে। টপসয়েলের আস্তরণ কমে যাচ্ছে। একই জমি বারবার চাষ করার ফলে অধিকমাত্রায় রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে। দেশীয় ধানের জাত ১৯৮২ সালে ১২ হাজার ৪৮৭টি, ২০১৪ সালে ৭ হাজারটি (বিএআরআই) রয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে ইরি চাষের জন্য প্রচুর সেচের প্রয়োজন হয়। এতে ১২০০ থেকে ১৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজর হয়। সেচের পানি ভূ-গর্ভ ও ভূ-পৃষ্ঠ দুই উৎস থেকেই আসে এবং খাল-বিল, নদ-নদী শুকিয়ে যায়। দেশের অনেক জায়গায় বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে সেচ কাজে ভূ-গর্ভস্থ পানির অতিমাত্রায় উত্তোলনে এবং সেই ভূ-গর্ভস্থ পানির অপর্যাপ্ত পরিপূরণে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর আহরণ ক্ষমতার নিচে নেমে যাচ্ছে। দেশের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে বিগত ৩০ বছর (১৯৮১-২০১০) বার্ষিক গড় ১ দশমিক ৪ হারে গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর সবচেয়ে বেশি নেমেছে রাজশাহীতে।

বনজসম্পদে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী বৈচিত্র্যেও সমৃদ্ধ। বাংলাদেশে প্রায় ৯৮২ প্রজাতির বন্যপ্রাণী বিচরণ করে। এর মধ্যে ৫৩ প্রজাতির উভচর, ১৫৮ প্রজাতির সরীসৃপ, ৬৫০ প্রজাতির পাখি এবং ১২১ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী। উভচর প্রাণীর অধিকাংশই ব্যাঙ। গত শতাব্দীর আশির দশকে বাংলাদেশ ব্যাঙের পা রপ্তানি করে কৃষিক্ষেত্রে রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহারকে উৎসাহিত করে। ব্যাঙ ক্ষতিকর ৪৫ ধরনের পোকামাকড় খেয়ে থাকে। সরীসৃপ প্রাণীর ৩০ প্রজাতির কাছিমের প্রায় সবই বিপন্নের তালিকায়। বাংলাদেশে ২ প্রজাতির কুমির দেখা যায়। একটি লোনা পানির কুমির, অন্যটি ঘড়িয়াল। মিঠাপানির কুমির প্রায় সব নদীতে ছিল, যা বর্তমানে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বাংলাদেশে ১২ প্রজাতির বন্যপ্রাণী হারিয়ে গেছে এবং ৪০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৪১ প্রজাতির পাখি, ৫৮ প্রজাতির সরীসৃপ ও ৪ প্রজাতির উভচর প্রাণী হুমকির সম্মুখীন। গত ৪০ বছরে মধুপুর শালবনের ৮৫ শতাংশ ধ্বংস করা হয়েছে। চিংড়ি চাষের নামে চকরিয়া ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করা হয়েছে।

বিশ্বের একক সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট বাংলাদেশের সুন্দরবন। বিশ্বখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগারের বসবাস সুন্দরবনে। রয়েল বেঙ্গল টাইগার আমাদের জাতীয় পশু এবং সুন্দরবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রায় ১২ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন, সাইক্লোন, লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ, বনজ সম্পদের নির্বিচার আহরণ, বন্যপ্রাণী শিকার ইত্যাদি কারণে সুন্দরবনের অস্তিত্ব আজ হুমকির মুখে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং জীববৈচিত্র্যের এক অনন্য নিদর্শন সুন্দরবন। সুন্দরবনকে রক্ষা করে বাঘ (২০০৪ সালে ৪৪০টি, ২০০৬ সালে ২০০টি, ২০১৫ সালে ১০৬টি)। আর ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করে সুন্দরবন।

হাওর এলাকা প্রায় ২০ হাজার বর্গকিলোমিটার। সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় ৩৭৩টি হাওর-জলাভূমি রয়েছে। এসব হাওরের জৈব-বৈশিষ্ট্যসমূহ দৃশ্যত অনন্য ও আকর্ষণীয়। অতীতে হাওর অববাহিকার প্রাণবৈচিত্র্য ছিল অতি সমৃদ্ধ। কিন্তু পরিবেশগত অবক্ষয়ের কারণে প্রাণবৈচিত্র্যের এই প্রাচুর্য বর্তমানে ক্রমক্ষয়িষ্ণু। ঢাকা মহানগরীতে অধিক হারে ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণেই ভূ-গর্ভে পানির শূন্যতা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। মহানগরীতে যেখানে ১৯৭০ সালে ৪৯টি গভীর নলকূপ ছিল, বর্তমানে তা প্রায় ৭০০টি। গত কয়েক বছর ধরে প্রতি বছর পানির স্তর ১০ ফুট করে নিচে নামছে। ভূ-গর্ভে লবণ পানির অনুপ্রবেশ চলতে থাকলে ২০ থেকে ৩০ বছর পর মিঠাপানির অভাবে ঢাকায় জনশূন্যের পাশপাশি ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয় ঘটতে পারে।

ঢাকায় জলাশয় ও নিম্নাঞ্চলের পরিমাণ ছিল ১৯৬০ সালে যথাক্রমে ২৯৫২ ও ১৩৫২৮ হেক্টর, ১৯৮৮ সালে যথাক্রমে ২১০৪ ও ১২৭১৮ হেক্টর এবং ২০০৮ সালে যথাক্রমে ১৯৯১ ও ৬৪১৫ হেক্টর। ১৯৬০ সাল হতে ২০০৮ সাল পর্যন্ত জলাশয় ও নিম্নাঞ্চল যথাক্রমে ৩২ দশমিক ৫০ ও ৫২ দশমিক ৫০ হ্রাস পেয়েছে। জলাশয় ও নিম্নাঞ্চল ভরাট ও দখলের ফলে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং নগরবাসী প্রতিনিয়ত জলাবদ্ধতার শিকার হচ্ছে। জানা গেছে, দেশের ১০ হাজার কিলোমিটার নৌপথের নাব্য বাড়ানোর খসড়া মহাপরিকল্পনা তৈরি করেছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। এর আওতায় ১৭৮টি নদী খনন (ড্রেজিং) করা হবে। ২০২৫ সালের মধ্যে এ কর্মযজ্ঞ শেষ করতে চায় সংস্থাটি। খসড়া পরিকল্পনায় প্রাধান্য পেয়েছে হাওর, পার্বত্য ও দক্ষিণাঞ্চলের ৮০টি নদ-নদী। এর মধ্যে বরিশাল ও খুলনা বিভাগে রয়েছে অর্ধশত নদী খনন। এ কর্মযজ্ঞে মোট ব্যয় হবে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি। যদিও এত বিশাল নৌপথ খনন করার মতো সক্ষমতা ও জনবল এ মুহূর্তে সংস্থাটির নেই। এদিকে ড্রেজিং কার্যক্রম বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে তদারকিও বাড়িয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়।

সম্প্রতি নদী খননের আগে ও পরে হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ করে রেকর্ড রাখা বাধ্যতামূলক করে একটি পরিপত্র জারি করা হয়েছে। এই পরিপত্রে নদী খননে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে ১৬ দফা নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। বিআইডব্লিউটিএ আশা করছে, এ বিশাল কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের নৌ যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি হবে। বেড়ে যাবে পর্যটন শিল্পের বিকাশ। সংস্থাটির ড্রেজিং বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে সংস্থাটির তিনটি প্রকল্প চলমান আছে। এগুলোর আওতায় তিন হাজার ৩১৫ কিলোমিটার নদী খনন কাজ চলছে। আরও দুটি মেগা প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। শিগগিরই এ দুটি প্রকল্পের আওতায় এক হাজার ৩৯৩ কিলোমিটার খনন শুরু হবে। বাকি নদীগুলো খননে নতুন প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। নতুন-পুরাতন সব প্রকল্পের আওতায় ১০ হাজার ৫০০ কিলোমিটার নৌপথ খনন করা হবে। তবে এ প্রকল্প যত তাড়াতাড়ি সম্পন্ন হয় ততই মঙ্গল।

[লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক কর কমিশনার]