দেশে একদিনে মৃত্যুর রেকর্ড সর্বোচ্চ ৭৪, অর্ধেকের বেশির বয়স ষাটোর্ধ্ব

১০ দিনে মৃত্যু ৫৭২

করোনায় গত দশদিনে দেশে ৫৭২ জনের মৃত্যু হয়েছে। সংক্রমণ পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা করছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। অথচ গত বছর সংক্রমণ চূড়ায় (পিকে) উঠার পরও এতবেশি প্রাণহানি হয়নি। গত বছরের ৩০ জুন একদিনে সর্বোচ্চ ৬৪ জনের মৃত্যু হয়। এর আগে ও পরে দশদিনে করোনায় মৃত্যু হয়েছিল ৪৩১ জনের। এ হিসাবে ৭৫ শতাংশ মৃত্যু বেড়েছে।

করোনায় ফের মৃত্যুর রেকর্ড হয়েছে দেশে। গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৭৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ৪৬ জনের বয়স ছিল ৬০ বছরের বেশি। আগের দিনের তুলনায় নমুনা পরীক্ষা কম হওয়ায় গতকাল শনাক্তের সংখ্যাও কমেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে ছয় হাজার ৮৫৪ জনের করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে বলে গতকাল বিকালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।

এদিকে দেশে বর্তমানে করোনার ‘দক্ষিণ আফ্রিকার ধরন’টি সংক্রমণ ছড়াচ্ছে বলে আইসিডিডিআর’বির এক গবেষণায় দাবি করা হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) উপাচার্য অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহমেদ গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, বর্তমানে দেশে সংক্রমণ ছড়াচ্ছে করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট- ‘আফ্রিকান ভ্যারিয়েন্ট, এটিতে মানুষ বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। এই ভ্যারিয়েন্ট ৮১ শতাংশ মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। এতে রোগীদের মৃত্যু হার কম হলেও দীর্ঘমেয়াদী বিভিন্ন সমস্যায় ভোগেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মীরজাদি সেব্রিনা ফ্লোরা স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, গত একদিনে মৃত্যু হওয়া ৭৪ জনকে নিয়ে দেশে করোনা আক্রান্ত হয়ে মোট ৯ হাজার ৫২১ জনের মৃত্যু হলো। ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু হওয়া লোকজনের মধ্যে ৪৮ জন পুরুষ ও ২৬ জন নারী। তাদের মধ্যে হাসপাতালে ৭০ জন ও বাড়িতে চারজনের মৃত্যু হয়।

তবে টানা চারদিন দৈনিক সাত হাজারের বেশি মানুষের করোনা শনাক্তের পর গতকাল তা সাত হাজারের নিচে নেমেছে। নমুনা পরীক্ষা বিবেচনায় শনাক্তের হারও সামান্য কমেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে ছয় হাজার ৪৫৮ জনের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। তাদের নিয়ে এ পর্যন্ত মোট শনাক্তের সংখ্যা দাঁড়ালো ছয় লাখ ৬৬ হাজার ১৩২ জন।

গত ২৪ ঘণ্টায় বাসাবাড়ি ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তিন হাজার ৩৯১ জন কোভিড-১৯ রোগী সুস্থ হয়েছেন। তাদের নিয়ে এ পর্যন্ত মোট পাঁচ লাখ ৬৫ হাজার ৩০ জন সুস্থ হয়েছেন। এ পর্যন্ত সুস্থতার হার ৮৪ দশমিক ৮২ শতাংশ এবং মৃত্যুর হার ১ দশমিক ৪৩ শতাংশ।

২৪ ঘণ্টায় ২৪৩টি ল্যাবে (পরীক্ষাগার) ৩৩ হাজার ১৯৩টি নমুনা পরীক্ষায় ছয় হাজার ৮৫৪ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। এই একদিনে নমুনা পরীক্ষা বিবেচনায় শনাক্তের হার ২০ দশমিক ৬৫ শতাংশ। মোট নমুনা পরীক্ষা বিবেচনায় শনাক্তের হার ১৩ দশমিক ৫৫ শতাংশ।

এর আগের দিন ৩৪ হাজার ৬৩০টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছিল। ওইদিন শনাক্তের হার ছিল ২২ দশমিক ০২ শতাংশ। এ পর্যন্ত দেশে নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ৪৯ লাখ ১৫ হাজার ৭৫৮টি।

সর্বশেষ ১০ দিন ও গতবছরের ১০ দিনে মৃত্যু

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ মার্চ থেকে গতকাল পর্যন্ত ১০ দিনে ৫৭২ জনের মৃত্যু হয়েছে করোনায়। এরমধ্যে ৩০ মার্চ ৪৫ জন, ৩১ মার্চ ৫২ জন, ১ এপ্রিল ৫৯ জন, ২ এপ্রিল ৫০ জন, ৩ এপ্রিল ৫৮ জন, ৪ এপ্রিল ৫৩ জন, ৫ এপ্রিল ৫২ জন, ৬ এপ্রিল ৬৬ জন, ৭ এপ্রিল ৬৩ জন এবং গতকাল ৭৪ জনের মৃত্যু হয় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে।

গত বছরের জুন-জুলাইয়ে পিকে ছিল করোনা সংক্রমণ। এরমধ্যে ৩০ জুন একদিনে সর্বোচ্চ ৬৪ জনের প্রাণহানি হয়েছিল। এর আগে ২৯ জুন ৪৫ জন, ২৮ জুন ৪৩ জন, ২৭ জুন ৩৪ জন, ২৬ জুন ৪০ জন এবং ১ জুলাই ৪১ জন, ২ জুলাই ৩৮ জন, ৩ জুলাই ৪২ জন, ৪ জুলাই ২৯ জন ও ৫ জুলাই ৫৫ জনের মৃত্যু হয়।

মৃত্যু বেশি প্রবীণদের

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় মৃত্যু হওয়া ৭৪ জনের মধ্যে ৪৬ জনেরই বয়স ছিল ৬০ বছরের বেশি। অন্যদের মধ্যে ২১ থেকে ৩০ বছর বয়সী একজন, ৩১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে পাঁচজন, ৪১ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে ছয়জন এবং ৫১ থেকে ৬০ বছর বয়সী ছিলেন ১৬ জন। এ পর্যন্ত করোনায় মৃত্যু হওয়া ৯ হাজার ৫২১ জনের মধ্যে পাঁচ হাজার ৩৪৯ জনেরই বয়স ছিল ৬০ বছরের বেশি। এ হিসাবে মোট মৃত্যু হওয়া লোকজনের মধ্যে ৫৬ দশমিক ১৮ শতাংশ ষাটোর্ধ্ব। এ পর্যন্ত মৃত্যু হওয়া লোকজনের মধ্যে সাত হাজার ১৩০ জন পুরুষ ও দুই হাজার ৩৯১ জন নারী।

বিভাগভিত্তিক হিসাবে দেখা গেছে, ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ৭৪ জনের মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৪৩ জন, চট্টগ্রামে ১৫ জন, রাজশাহীতে তিনজন, খুলনায় সাতজন, বরিশালে চারজন এবং সিলেট বিভাগে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে।

করোনায় মৃত্যু হওয়া মোট লোকজনের মধ্যে পাঁচ হাজার ৪৮২ জন ঢাকা বিভাগের, এক হাজার ৭০৯ জন চট্টগ্রাম বিভাগের, ৫২০ জন রাজশাহী বিভাগের, ৬০৪ জন খুলনা বিভাগের, ২৮৪ জন বরিশাল বিভাগের, ৩৩২ জন সিলেট বিভাগের, ৩৮১ জন রংপুর বিভাগের এবং ২০৭ জন ময়মনসিংহ বিভাগের বাসিন্দা ছিলেন।

দেশে করোনায় দক্ষিণ আফ্রিকার নতুন ধরনের সংক্রমণ

৭ এপ্রিল আইসিডিডিআর’বির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে দেখা গেছে, গত মার্চের শেষ সপ্তাহে দেশে করোনার যে ধরনগুলো সক্রিয় ছিল, তার ৮১ শতাংশই দক্ষিণ আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্ট।

গত বছরের শেষদিকে দক্ষিণ আফ্রিকায় করোনাভাইরাসের নতুন একটি ধরন শনাক্ত হয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং আইইডিসিআরের সঙ্গে মিলে গত ডিসেম্বর থেকে করোনার নতুন ধরন শনাক্তের গবেষণা শুরু করে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘আইসিডিডিআর’বি।

ওই সময় করোনার নতুন ধরনগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্যের ভ্যারিয়েন্ট (ই.১.১.৭), দক্ষিণ আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্ট (ই.১.৩৫১) এবং ব্রাজিলের ভ্যারিয়েন্ট (চ১/চ২) বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

আইসিডিডিআর’বি দাবি করছে, করোনার এই তিনটি ধরনেরই সংক্রমণ ছড়ানোর সক্ষমতা বেশি, জিনগত পরিবর্তনও ঘটেছে বেশি, যা রোগীর চিকিৎসা পদ্ধতি এবং টিকার কার্যকারিতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

আইসিডিডিআর’বির গবেষকরা গত ১ জানুয়ারি থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত মোট ১৬ হাজার ২৬৫ জনের নমুনা পরীক্ষা করে দুই হাজার ৭৫১টি নমুনা ‘পজেটিভ’ হিসেবে শনাক্ত করে, যা ১৭ শতাংশ। ‘পজেটিভ’ নমুনাগুলোর মধ্যে ৪৪৩টি নমুনার স্পাইক জিন সিকোয়েন্সিং করা হয়। এই সিকোয়েন্সিংয়ে ৬ জানুয়ারি প্রথমবার যুক্তরাজ্যের নতুন একটি ধরন শনাক্ত হয়। যদিও করোনার এ ভ্যারিয়্যান্টটি গত বছরের ডিসেম্বর থেকেই বাংলাদেশে আছে বলে সার্স-সিওভি-২ সিকোয়েন্স ডেটাবেজে তথ্য রয়েছে।

আইসিডিডিআর’বির গবেষণায় বলা হয়েছে, মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত দেশে করোনার যুক্তরাজ্যের ধরনটির সক্রিয়তা বাড়ছিল। ওই সময় সক্রিয় সবগুলো ধরনের মধ্যে ৫২ শতাংশ ছিল ইউকে ভ্যারিয়েন্ট।

তবে মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে দক্ষিণ আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্টটি সংক্রমণ ঘটালে বেশ পরিবর্তন দেখা যায়। এই ধরনটি অতিমাত্রায় সক্রিয় হয়ে উঠে। মার্চের শেষ সপ্তাহে সক্রিয় সবগুলো ধরনের মধ্যে ৮১ শতাংশ ছিল আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্ট।

গবেষকরা বলছেন, দেশে করোনাভাইরাসের বিভিন্ন ধরন নিয়ে এখন নিয়মিত নজরদারি দরকার, কারণ রোগী ব্যবস্থাপনা ও টিকার কার্যকারিতার জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

করোনার ব্যাপক বিস্তার রোধে সবাইকে প্রচলিত প্রতিরোধ ব্যবস্থায় জোর দেয়ার তাগিদ দিয়ে আইসিডিডিআর’বি এক বিবৃতিতে বলেছে, মাস্ক পরা, সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা চালিয়ে যেতে হবে। যেকোন ধরনের জনসমাগম এড়িয়ে চলতে হবে।

সংস্থটি আরও বলেছে, ‘আপনি টিকা নিয়ে থাকলেও বা এর আগে আক্রান্ত হয়ে থাকলেও প্রচলিত প্রতিরোধ ব্যবস্থা মানতে হবে। সর্বোপরি সরকার নির্ধারিত বিধিনিষেধ মেনে চলতে হবে।’

গত বছরের ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হয়। এর দশদিন পর ১৮ মার্চ দেশে করোনায় প্রথম একজনের মৃত্যুর কথা জানায় স্বাস্থ্য বিভাগ।

শুক্রবার, ০৯ এপ্রিল ২০২১ , ২৫ চৈত্র ১৪২৭ ২৪ শাবান ১৪৪২

দেশে একদিনে মৃত্যুর রেকর্ড সর্বোচ্চ ৭৪, অর্ধেকের বেশির বয়স ষাটোর্ধ্ব

১০ দিনে মৃত্যু ৫৭২

নিজস্ব বার্তা পরিবেশক

image

করোনায় গত দশদিনে দেশে ৫৭২ জনের মৃত্যু হয়েছে। সংক্রমণ পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা করছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। অথচ গত বছর সংক্রমণ চূড়ায় (পিকে) উঠার পরও এতবেশি প্রাণহানি হয়নি। গত বছরের ৩০ জুন একদিনে সর্বোচ্চ ৬৪ জনের মৃত্যু হয়। এর আগে ও পরে দশদিনে করোনায় মৃত্যু হয়েছিল ৪৩১ জনের। এ হিসাবে ৭৫ শতাংশ মৃত্যু বেড়েছে।

করোনায় ফের মৃত্যুর রেকর্ড হয়েছে দেশে। গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৭৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ৪৬ জনের বয়স ছিল ৬০ বছরের বেশি। আগের দিনের তুলনায় নমুনা পরীক্ষা কম হওয়ায় গতকাল শনাক্তের সংখ্যাও কমেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে ছয় হাজার ৮৫৪ জনের করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে বলে গতকাল বিকালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।

এদিকে দেশে বর্তমানে করোনার ‘দক্ষিণ আফ্রিকার ধরন’টি সংক্রমণ ছড়াচ্ছে বলে আইসিডিডিআর’বির এক গবেষণায় দাবি করা হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) উপাচার্য অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহমেদ গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, বর্তমানে দেশে সংক্রমণ ছড়াচ্ছে করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট- ‘আফ্রিকান ভ্যারিয়েন্ট, এটিতে মানুষ বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। এই ভ্যারিয়েন্ট ৮১ শতাংশ মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। এতে রোগীদের মৃত্যু হার কম হলেও দীর্ঘমেয়াদী বিভিন্ন সমস্যায় ভোগেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মীরজাদি সেব্রিনা ফ্লোরা স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, গত একদিনে মৃত্যু হওয়া ৭৪ জনকে নিয়ে দেশে করোনা আক্রান্ত হয়ে মোট ৯ হাজার ৫২১ জনের মৃত্যু হলো। ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু হওয়া লোকজনের মধ্যে ৪৮ জন পুরুষ ও ২৬ জন নারী। তাদের মধ্যে হাসপাতালে ৭০ জন ও বাড়িতে চারজনের মৃত্যু হয়।

তবে টানা চারদিন দৈনিক সাত হাজারের বেশি মানুষের করোনা শনাক্তের পর গতকাল তা সাত হাজারের নিচে নেমেছে। নমুনা পরীক্ষা বিবেচনায় শনাক্তের হারও সামান্য কমেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে ছয় হাজার ৪৫৮ জনের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। তাদের নিয়ে এ পর্যন্ত মোট শনাক্তের সংখ্যা দাঁড়ালো ছয় লাখ ৬৬ হাজার ১৩২ জন।

গত ২৪ ঘণ্টায় বাসাবাড়ি ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তিন হাজার ৩৯১ জন কোভিড-১৯ রোগী সুস্থ হয়েছেন। তাদের নিয়ে এ পর্যন্ত মোট পাঁচ লাখ ৬৫ হাজার ৩০ জন সুস্থ হয়েছেন। এ পর্যন্ত সুস্থতার হার ৮৪ দশমিক ৮২ শতাংশ এবং মৃত্যুর হার ১ দশমিক ৪৩ শতাংশ।

২৪ ঘণ্টায় ২৪৩টি ল্যাবে (পরীক্ষাগার) ৩৩ হাজার ১৯৩টি নমুনা পরীক্ষায় ছয় হাজার ৮৫৪ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে। এই একদিনে নমুনা পরীক্ষা বিবেচনায় শনাক্তের হার ২০ দশমিক ৬৫ শতাংশ। মোট নমুনা পরীক্ষা বিবেচনায় শনাক্তের হার ১৩ দশমিক ৫৫ শতাংশ।

এর আগের দিন ৩৪ হাজার ৬৩০টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছিল। ওইদিন শনাক্তের হার ছিল ২২ দশমিক ০২ শতাংশ। এ পর্যন্ত দেশে নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ৪৯ লাখ ১৫ হাজার ৭৫৮টি।

সর্বশেষ ১০ দিন ও গতবছরের ১০ দিনে মৃত্যু

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ মার্চ থেকে গতকাল পর্যন্ত ১০ দিনে ৫৭২ জনের মৃত্যু হয়েছে করোনায়। এরমধ্যে ৩০ মার্চ ৪৫ জন, ৩১ মার্চ ৫২ জন, ১ এপ্রিল ৫৯ জন, ২ এপ্রিল ৫০ জন, ৩ এপ্রিল ৫৮ জন, ৪ এপ্রিল ৫৩ জন, ৫ এপ্রিল ৫২ জন, ৬ এপ্রিল ৬৬ জন, ৭ এপ্রিল ৬৩ জন এবং গতকাল ৭৪ জনের মৃত্যু হয় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে।

গত বছরের জুন-জুলাইয়ে পিকে ছিল করোনা সংক্রমণ। এরমধ্যে ৩০ জুন একদিনে সর্বোচ্চ ৬৪ জনের প্রাণহানি হয়েছিল। এর আগে ২৯ জুন ৪৫ জন, ২৮ জুন ৪৩ জন, ২৭ জুন ৩৪ জন, ২৬ জুন ৪০ জন এবং ১ জুলাই ৪১ জন, ২ জুলাই ৩৮ জন, ৩ জুলাই ৪২ জন, ৪ জুলাই ২৯ জন ও ৫ জুলাই ৫৫ জনের মৃত্যু হয়।

মৃত্যু বেশি প্রবীণদের

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় মৃত্যু হওয়া ৭৪ জনের মধ্যে ৪৬ জনেরই বয়স ছিল ৬০ বছরের বেশি। অন্যদের মধ্যে ২১ থেকে ৩০ বছর বয়সী একজন, ৩১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে পাঁচজন, ৪১ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে ছয়জন এবং ৫১ থেকে ৬০ বছর বয়সী ছিলেন ১৬ জন। এ পর্যন্ত করোনায় মৃত্যু হওয়া ৯ হাজার ৫২১ জনের মধ্যে পাঁচ হাজার ৩৪৯ জনেরই বয়স ছিল ৬০ বছরের বেশি। এ হিসাবে মোট মৃত্যু হওয়া লোকজনের মধ্যে ৫৬ দশমিক ১৮ শতাংশ ষাটোর্ধ্ব। এ পর্যন্ত মৃত্যু হওয়া লোকজনের মধ্যে সাত হাজার ১৩০ জন পুরুষ ও দুই হাজার ৩৯১ জন নারী।

বিভাগভিত্তিক হিসাবে দেখা গেছে, ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ৭৪ জনের মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৪৩ জন, চট্টগ্রামে ১৫ জন, রাজশাহীতে তিনজন, খুলনায় সাতজন, বরিশালে চারজন এবং সিলেট বিভাগে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে।

করোনায় মৃত্যু হওয়া মোট লোকজনের মধ্যে পাঁচ হাজার ৪৮২ জন ঢাকা বিভাগের, এক হাজার ৭০৯ জন চট্টগ্রাম বিভাগের, ৫২০ জন রাজশাহী বিভাগের, ৬০৪ জন খুলনা বিভাগের, ২৮৪ জন বরিশাল বিভাগের, ৩৩২ জন সিলেট বিভাগের, ৩৮১ জন রংপুর বিভাগের এবং ২০৭ জন ময়মনসিংহ বিভাগের বাসিন্দা ছিলেন।

দেশে করোনায় দক্ষিণ আফ্রিকার নতুন ধরনের সংক্রমণ

৭ এপ্রিল আইসিডিডিআর’বির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে দেখা গেছে, গত মার্চের শেষ সপ্তাহে দেশে করোনার যে ধরনগুলো সক্রিয় ছিল, তার ৮১ শতাংশই দক্ষিণ আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্ট।

গত বছরের শেষদিকে দক্ষিণ আফ্রিকায় করোনাভাইরাসের নতুন একটি ধরন শনাক্ত হয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং আইইডিসিআরের সঙ্গে মিলে গত ডিসেম্বর থেকে করোনার নতুন ধরন শনাক্তের গবেষণা শুরু করে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘আইসিডিডিআর’বি।

ওই সময় করোনার নতুন ধরনগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্যের ভ্যারিয়েন্ট (ই.১.১.৭), দক্ষিণ আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্ট (ই.১.৩৫১) এবং ব্রাজিলের ভ্যারিয়েন্ট (চ১/চ২) বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।

আইসিডিডিআর’বি দাবি করছে, করোনার এই তিনটি ধরনেরই সংক্রমণ ছড়ানোর সক্ষমতা বেশি, জিনগত পরিবর্তনও ঘটেছে বেশি, যা রোগীর চিকিৎসা পদ্ধতি এবং টিকার কার্যকারিতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

আইসিডিডিআর’বির গবেষকরা গত ১ জানুয়ারি থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত মোট ১৬ হাজার ২৬৫ জনের নমুনা পরীক্ষা করে দুই হাজার ৭৫১টি নমুনা ‘পজেটিভ’ হিসেবে শনাক্ত করে, যা ১৭ শতাংশ। ‘পজেটিভ’ নমুনাগুলোর মধ্যে ৪৪৩টি নমুনার স্পাইক জিন সিকোয়েন্সিং করা হয়। এই সিকোয়েন্সিংয়ে ৬ জানুয়ারি প্রথমবার যুক্তরাজ্যের নতুন একটি ধরন শনাক্ত হয়। যদিও করোনার এ ভ্যারিয়্যান্টটি গত বছরের ডিসেম্বর থেকেই বাংলাদেশে আছে বলে সার্স-সিওভি-২ সিকোয়েন্স ডেটাবেজে তথ্য রয়েছে।

আইসিডিডিআর’বির গবেষণায় বলা হয়েছে, মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত দেশে করোনার যুক্তরাজ্যের ধরনটির সক্রিয়তা বাড়ছিল। ওই সময় সক্রিয় সবগুলো ধরনের মধ্যে ৫২ শতাংশ ছিল ইউকে ভ্যারিয়েন্ট।

তবে মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে দক্ষিণ আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্টটি সংক্রমণ ঘটালে বেশ পরিবর্তন দেখা যায়। এই ধরনটি অতিমাত্রায় সক্রিয় হয়ে উঠে। মার্চের শেষ সপ্তাহে সক্রিয় সবগুলো ধরনের মধ্যে ৮১ শতাংশ ছিল আফ্রিকার ভ্যারিয়েন্ট।

গবেষকরা বলছেন, দেশে করোনাভাইরাসের বিভিন্ন ধরন নিয়ে এখন নিয়মিত নজরদারি দরকার, কারণ রোগী ব্যবস্থাপনা ও টিকার কার্যকারিতার জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

করোনার ব্যাপক বিস্তার রোধে সবাইকে প্রচলিত প্রতিরোধ ব্যবস্থায় জোর দেয়ার তাগিদ দিয়ে আইসিডিডিআর’বি এক বিবৃতিতে বলেছে, মাস্ক পরা, সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা চালিয়ে যেতে হবে। যেকোন ধরনের জনসমাগম এড়িয়ে চলতে হবে।

সংস্থটি আরও বলেছে, ‘আপনি টিকা নিয়ে থাকলেও বা এর আগে আক্রান্ত হয়ে থাকলেও প্রচলিত প্রতিরোধ ব্যবস্থা মানতে হবে। সর্বোপরি সরকার নির্ধারিত বিধিনিষেধ মেনে চলতে হবে।’

গত বছরের ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হয়। এর দশদিন পর ১৮ মার্চ দেশে করোনায় প্রথম একজনের মৃত্যুর কথা জানায় স্বাস্থ্য বিভাগ।