শীতলক্ষ্যায় লঞ্চডুবি

রং পরিবর্তন করে পালানোর চেষ্টা করে ঘাতক জাহাজ

মাস্টার সুকানিসহ ১৪ স্টাফ আটক

মুন্সীগঞ্জ গজারিয়া কোস্টগার্ড স্টেশনের ৫শ’ মিটার দূরেই নোঙর করা ছিল নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যায় লঞ্চডুবিতে ৩৪ জনের প্রাণহানির ঘটনায় দায়ী কার্গোজাহাজ এমভি এসকেএল-৩। গতকাল দুপুর বারোটার দিকে জাহাজটিকে আটক করার পর এমন তথ্যই জানান কোস্টগার্ডের কর্মকর্তারা। এ সময় ঘাতক জাহাজের মাস্টার, সুকানি, গ্রিজারসহ ১৪ স্টাফকেও আটক করা হয়েছে।

তবে ভিন্ন একটি সূত্র জানায় অন্য তথ্য। সূত্রটি বলছে, নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যায় যাত্রীবাহী লঞ্চকে ধাক্কা দিয়ে ডুবিয়ে দেয়ার পর পর পালানোর চেষ্টায় ছিল কার্গোজাহাজটি। ঘটনার পরপরই ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ার ত্রি-এঙ্গেল ডকইয়ার্ড থেকে কিছু শ্রমিক ভাড়া করে চাঁদপুরের দিকে চলে যায়। সেখানে গিয়ে ঘটনার রাতেই রং পরিবর্তন করা হয় জাহাজটির। এরপর বিভিন্ন রুট দিয়ে পালানোর চেষ্টা করে। সর্বশেষ গত বুধবার বরিশালের চাঁদমারী এলাকায় কীর্তনখোলা নদীতে ছিল। জাহাজটি বাগেরহাট-২ আসনে আওয়ামী লীগের এমপি শেখ সারহান নাসের তন্ময়ের মালিকানাধীন এসকে লজিস্টিকস নামক প্রতিষ্ঠানের।

পালানোর চেষ্টা করেও ঘাতক জাহাজটি ধরা পড়ে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী শীতলক্ষ্যা নদীর উপর নির্মাণাধীন তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতুর ১৬ নম্বর পিলারের নিরাপত্তাকর্মীর তাৎক্ষণিক বুদ্ধিমত্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায়। ঘটনার পরপরই ঐ নিরাপত্তাকর্মী জাহাজটির নাম ও নম্বর লিখে রাখেন। সহকর্মীকে দিয়ে ছবিও তুলে রাখেন জাহাজটির। সেই ছবি থেকে দেখা যায়, জাহাজটির উপরের অংশে ছিল সাদা, মাঝখানে নীল ও নিচের অংশে লাল রং। তবে গতকাল আটক জাহাজটির (রং পরিবর্তনের পরে) উপরের অংশে ছিল নীল (স্কাই ফল) এবং নিচের অংশে লাল রং।

জাহাজ আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. মোস্তাইন বিল্লাহ সংবাদকে বলেন, মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া থেকে পাগলা কোস্টগার্ডের মাধ্যমে কার্গোজাহাজটিকে আটক করা হয়েছে। আটক জাহাজ ও স্টাফদের পরবর্তীতে নারায়ণগঞ্জ নৌ থানার কাছে হস্তান্তর করা হয়। আটক স্টাফরা হলো, ওয়াহিদুজ্জামান (৫০) মাস্টার, বাড়ি নড়াইল, মো. মজনু মোল্লা (৩৮) ইনচার্জ ড্রাইভার, গোপালগঞ্জ, মো. আনোয়ার মল্লিক (৪০) সুকানি, ফরিদপুর, মো. ফাহান মোল্লা (২৭) গ্রিজার, নড়াইল, মো. হৃদয় হাওলাদার (২০) গ্রিজার পটুয়াখালী, মো. আব্দুল্লাহ (৩০) ডেক চেইডেইল, নড়াইল, মো. রাজিবুল ইসলাম (২৭) লস্কর, নড়াইল, মো. আনিস শেখ (১৮) লস্কর, নড়াইল, মো. নুর ইসলাম (৩৫) লস্কর, গোপালগঞ্জ, মো. নাজমুল মোল্লা (৩০) সুকানি, নড়াইল, মো. সাগর (১৯) লস্কর, নড়াইল, মো. সাকিব সর্দার (১৮) লস্কর, খুলনা, মো. আফসার (১৮) লস্কর, শরীয়তপুর, মো. আবুল বাশার শেখ (৩৮) বাবুর্চি, নড়াইল।

কোস্টগার্ড পাগলা স্টেশনের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট আশমাদুল ইসলাম বলেন, দুর্ঘটনার কিছুক্ষণ পর ঝড় শুরু হলেও তা উপেক্ষা করে দ্রুত গতিতে পালাতে থাকে কার্গোজাহাজটি। আটক ঠেকাতে রং বদলে ফেলা হয় জাহাজটির। বদলে ফেলা কার্গোটি গজারিয়ার কোস্টগার্ড স্টেশনের কাছাকাছি নোঙর করে রাখা ছিল। খবর পেয়ে সেখান থেকে এসকেএল-৩ নামক কার্গোজাহাজটি আটক করা হয়।

প্রসঙ্গত, গত ৪ এপ্রিল সন্ধ্যা পাঁচটা ছাপ্পান্ন মিনিটে মুন্সীগঞ্জের উদ্দেশে নারায়ণগঞ্জ লঞ্চ টার্মিনাল ছেড়ে যায় এম এল সাবিত আল হাসান নামে যাত্রীবাহী লঞ্চটি। আনুমানিক সোয়া ছয়টার দিকে মদনগঞ্জ-সৈয়দপুর এলাকায় শীতলক্ষ্যায় নির্মাণাধীন সেতুর অদূরে এম ভি এসকেএল-৩ (রেজিস্ট্রেশন নং: এম ০১-২৬৪৩) নামে একটি কার্গোজাহাজ পেছন থেকে ধাক্কা দেয় যাত্রীবাহী লঞ্চটিকে। সে সময় প্রত্যক্ষদর্শীদের ধারণ করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, লঞ্চটিকে ঠেলে অন্তত ২০০ মিটার দূরে নিয়ে গিয়ে ডুবিয়ে দেয় কার্গোজাহাজটি। এর মধ্যেই নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েন কয়েকজন। প্রত্যক্ষদর্শী ও জেলা প্রশাসনের দেয়া তথ্যমতে, রাতেই অন্তত ৩০ যাত্রী সাঁতরে জীবিত অবস্থায় নদী পার হতে সক্ষম হন। প্রাণ হারান ৩৪ জন যাত্রী। নিহতদের মধ্যে ৭ শিশু, ১৩ পুরুষ ও ১৪ নারী।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী শীতলক্ষ্যা নদীর উপর নির্মাণাধীন তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতুর ১৬ নম্বর পিলারের নিরাপত্তাকর্মী মোহাম্মদ হালিম ঘটনার পরপরই জাহাজটির নাম ও নম্বর লিখে রাখেন। সহকর্মীকে দিয়ে ছবিও তুলে রাখেন জাহাজটির। সেই ছবি থেকে দেখা যায়, জাহাজটির উপরের অংশে ছিল সাদা, মাঝখানে নীল ও নিচের অংশে লাল রং করা। এদিকে আটক জাহাজটির উপরের অংশে ছিল নীল (স্কাই ফল) এবং নিচের অংশে লাল রং। তবে ওই জাহাজে স্পষ্টভাবেই এম ভি এসকেএল-৩ লেখাটি দেখা যায়। জাহাজের রেজিস্ট্রেশন নং: এম ০১-২৬৪৩ উল্লেখ ছিল।

গজারিয়া কোস্টগার্ড স্টেশনের কন্টিনজেন্ট কমান্ডার বজলুর রহমান সংবাদকে বলেন, গজারিয়া এলাকারই একটি ডকইয়ার্ড থেকে জাহাজটির রং পরিবর্তন করা হয়। ঘটনার রাতেই রং পরিবর্তন করে আবারও নদীতে নামানো হয়। কোন ডকইয়ার্ড থেকে রং পরিবর্তন করা হয়েছে এবং রং পরিবর্তনের পর কোথায় ছিল জাহাজটি সে বিষয়ে কিছু জানাতে রাজি হননি কোস্টগার্ডের এই কর্মকর্তা। তবে জাহাজটি উদ্ধারের স্থান কোস্টগার্ড গজারিয়া স্টেশনের আধা কিলোমিটারের মধ্যে বলে জানান তিনি।

তবে ঘটনার পরপরই ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে পালিয়ে যাওয়ার পর ডাকইয়ার্ড থেকে রং পরিবর্তন করে আবারও ঠিক কোস্টগার্ড স্টেশনের সামনে এসেই জাহাজটি নোঙর করার কারণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই প্রশ্নের উত্তর দেননি কোস্টগার্ড বা নারায়ণগঞ্জ নৌ থানা পুলিশের কোন কর্মকর্তা।

এদিকে লঞ্চডুবির ঘটনায় বিআইডব্লিউটিএ’র নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দর কর্তৃপক্ষের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক বাবু লাল বৈদ্য বাদী হয়ে নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানায় একটি মামলা করেন। মামলায় হত্যার উদ্দেশ্যে বেপরোয়া গতিতে পণ্যবাহী জাহাজ চালিয়ে যাত্রীবাহী লঞ্চটি ডুবিয়ে ৩৪ জনের প্রাণহানি ঘটানো হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে আসামির তালিকায় কারও নাম উল্লেখ করা হয়নি। এমনকি জাহাজের নাম ও নম্বরও উল্লেখ ছিল না মামলায়। মামলাটি তদন্ত করছে নারায়ণগঞ্জ নৌ থানা পুলিশ।

নারায়ণগঞ্জ নৌ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহিদুল আলম গতকাল সন্ধ্যায় সংবাদকে বলেন, ‘মামলায় জাহাজ বা আসামির নাম না থাকলেও কোস্টগার্ড জাহাজটিকে চিহ্নিত করে যেহেতু আটক করেছে সুতরাং জাহাজটিকে জব্দ ও আটক স্টাফদের গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। আজ (শুক্রবার) তাদের আদালতে প্রেরণ করা হবে।’ জাহাজটির অবস্থান পূর্ব থেকে জানতেন কিনা জানতে চাইলে নৌ থানার ওসি বলেন, কোস্টগার্ড অভিযান চালিয়ে জাহাজটিকে আটক করেছে। নৌ পুলিশের কাছে জাহাজটির অবস্থান সম্পর্কে কোন খবর ছিল না।

তিন তদন্ত কমিটির গণশুনানি, ৫৩ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ

লঞ্চডুবির এই ঘটনায় গঠিত নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন ও বিআইডব্লিউটিএ’র পৃথক তিনটি কমিটি গতকাল প্রত্যক্ষদর্শী, নিহতের স্বজন, স্থানীয় এলাকাবাসীসহ সংশ্লিষ্ট অন্যদের সাক্ষ্যগ্রহণ করেছেন। তদন্ত কমিটির সদস্যদের মাধ্যমে জানা যায়, সকাল ১১টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত সদর উপজেলার সৈয়দপুর পাথরঘাট এলাকার শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিম পাশে তারা মোট ৫৩ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করেছেন।

নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় গঠিত সাত সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রধান যুগ্ম সচিব আব্দুল ছাত্তার শেখ বলেন, ‘ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যক্তিদের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়েছে। সামগ্রিক দিকগুলো বিবেচনা করে আমরা আমাদের তদন্ত চালিয়ে যাবো। তদন্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমেই দোষী এবং এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না হয় সে ধরনের সুপারিশ করা হবে।’

গণশুনানিতে আরও উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসনের সাত সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট খাদিজা তাহেরা ববি, নৌ পুলিশের নারায়ণগঞ্জ জোনের সুপার মীনা মাহামুদ, বিআইডব্লিটিএ’র উপপরিচালক মোবারক হোসেন, নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্সের উপ-সহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল আরেফিনসহ অন্য কর্মকর্তারা।

শুক্রবার, ০৯ এপ্রিল ২০২১ , ২৫ চৈত্র ১৪২৭ ২৪ শাবান ১৪৪২

শীতলক্ষ্যায় লঞ্চডুবি

রং পরিবর্তন করে পালানোর চেষ্টা করে ঘাতক জাহাজ

মাস্টার সুকানিসহ ১৪ স্টাফ আটক

সৌরভ হোসেন সিয়াম, নারায়ণগঞ্জ

image

মুন্সীগঞ্জ গজারিয়া কোস্টগার্ড স্টেশনের ৫শ’ মিটার দূরেই নোঙর করা ছিল নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যায় লঞ্চডুবিতে ৩৪ জনের প্রাণহানির ঘটনায় দায়ী কার্গোজাহাজ এমভি এসকেএল-৩। গতকাল দুপুর বারোটার দিকে জাহাজটিকে আটক করার পর এমন তথ্যই জানান কোস্টগার্ডের কর্মকর্তারা। এ সময় ঘাতক জাহাজের মাস্টার, সুকানি, গ্রিজারসহ ১৪ স্টাফকেও আটক করা হয়েছে।

তবে ভিন্ন একটি সূত্র জানায় অন্য তথ্য। সূত্রটি বলছে, নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যায় যাত্রীবাহী লঞ্চকে ধাক্কা দিয়ে ডুবিয়ে দেয়ার পর পর পালানোর চেষ্টায় ছিল কার্গোজাহাজটি। ঘটনার পরপরই ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ার ত্রি-এঙ্গেল ডকইয়ার্ড থেকে কিছু শ্রমিক ভাড়া করে চাঁদপুরের দিকে চলে যায়। সেখানে গিয়ে ঘটনার রাতেই রং পরিবর্তন করা হয় জাহাজটির। এরপর বিভিন্ন রুট দিয়ে পালানোর চেষ্টা করে। সর্বশেষ গত বুধবার বরিশালের চাঁদমারী এলাকায় কীর্তনখোলা নদীতে ছিল। জাহাজটি বাগেরহাট-২ আসনে আওয়ামী লীগের এমপি শেখ সারহান নাসের তন্ময়ের মালিকানাধীন এসকে লজিস্টিকস নামক প্রতিষ্ঠানের।

পালানোর চেষ্টা করেও ঘাতক জাহাজটি ধরা পড়ে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী শীতলক্ষ্যা নদীর উপর নির্মাণাধীন তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতুর ১৬ নম্বর পিলারের নিরাপত্তাকর্মীর তাৎক্ষণিক বুদ্ধিমত্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায়। ঘটনার পরপরই ঐ নিরাপত্তাকর্মী জাহাজটির নাম ও নম্বর লিখে রাখেন। সহকর্মীকে দিয়ে ছবিও তুলে রাখেন জাহাজটির। সেই ছবি থেকে দেখা যায়, জাহাজটির উপরের অংশে ছিল সাদা, মাঝখানে নীল ও নিচের অংশে লাল রং। তবে গতকাল আটক জাহাজটির (রং পরিবর্তনের পরে) উপরের অংশে ছিল নীল (স্কাই ফল) এবং নিচের অংশে লাল রং।

জাহাজ আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. মোস্তাইন বিল্লাহ সংবাদকে বলেন, মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া থেকে পাগলা কোস্টগার্ডের মাধ্যমে কার্গোজাহাজটিকে আটক করা হয়েছে। আটক জাহাজ ও স্টাফদের পরবর্তীতে নারায়ণগঞ্জ নৌ থানার কাছে হস্তান্তর করা হয়। আটক স্টাফরা হলো, ওয়াহিদুজ্জামান (৫০) মাস্টার, বাড়ি নড়াইল, মো. মজনু মোল্লা (৩৮) ইনচার্জ ড্রাইভার, গোপালগঞ্জ, মো. আনোয়ার মল্লিক (৪০) সুকানি, ফরিদপুর, মো. ফাহান মোল্লা (২৭) গ্রিজার, নড়াইল, মো. হৃদয় হাওলাদার (২০) গ্রিজার পটুয়াখালী, মো. আব্দুল্লাহ (৩০) ডেক চেইডেইল, নড়াইল, মো. রাজিবুল ইসলাম (২৭) লস্কর, নড়াইল, মো. আনিস শেখ (১৮) লস্কর, নড়াইল, মো. নুর ইসলাম (৩৫) লস্কর, গোপালগঞ্জ, মো. নাজমুল মোল্লা (৩০) সুকানি, নড়াইল, মো. সাগর (১৯) লস্কর, নড়াইল, মো. সাকিব সর্দার (১৮) লস্কর, খুলনা, মো. আফসার (১৮) লস্কর, শরীয়তপুর, মো. আবুল বাশার শেখ (৩৮) বাবুর্চি, নড়াইল।

কোস্টগার্ড পাগলা স্টেশনের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট আশমাদুল ইসলাম বলেন, দুর্ঘটনার কিছুক্ষণ পর ঝড় শুরু হলেও তা উপেক্ষা করে দ্রুত গতিতে পালাতে থাকে কার্গোজাহাজটি। আটক ঠেকাতে রং বদলে ফেলা হয় জাহাজটির। বদলে ফেলা কার্গোটি গজারিয়ার কোস্টগার্ড স্টেশনের কাছাকাছি নোঙর করে রাখা ছিল। খবর পেয়ে সেখান থেকে এসকেএল-৩ নামক কার্গোজাহাজটি আটক করা হয়।

প্রসঙ্গত, গত ৪ এপ্রিল সন্ধ্যা পাঁচটা ছাপ্পান্ন মিনিটে মুন্সীগঞ্জের উদ্দেশে নারায়ণগঞ্জ লঞ্চ টার্মিনাল ছেড়ে যায় এম এল সাবিত আল হাসান নামে যাত্রীবাহী লঞ্চটি। আনুমানিক সোয়া ছয়টার দিকে মদনগঞ্জ-সৈয়দপুর এলাকায় শীতলক্ষ্যায় নির্মাণাধীন সেতুর অদূরে এম ভি এসকেএল-৩ (রেজিস্ট্রেশন নং: এম ০১-২৬৪৩) নামে একটি কার্গোজাহাজ পেছন থেকে ধাক্কা দেয় যাত্রীবাহী লঞ্চটিকে। সে সময় প্রত্যক্ষদর্শীদের ধারণ করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, লঞ্চটিকে ঠেলে অন্তত ২০০ মিটার দূরে নিয়ে গিয়ে ডুবিয়ে দেয় কার্গোজাহাজটি। এর মধ্যেই নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়েন কয়েকজন। প্রত্যক্ষদর্শী ও জেলা প্রশাসনের দেয়া তথ্যমতে, রাতেই অন্তত ৩০ যাত্রী সাঁতরে জীবিত অবস্থায় নদী পার হতে সক্ষম হন। প্রাণ হারান ৩৪ জন যাত্রী। নিহতদের মধ্যে ৭ শিশু, ১৩ পুরুষ ও ১৪ নারী।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী শীতলক্ষ্যা নদীর উপর নির্মাণাধীন তৃতীয় শীতলক্ষ্যা সেতুর ১৬ নম্বর পিলারের নিরাপত্তাকর্মী মোহাম্মদ হালিম ঘটনার পরপরই জাহাজটির নাম ও নম্বর লিখে রাখেন। সহকর্মীকে দিয়ে ছবিও তুলে রাখেন জাহাজটির। সেই ছবি থেকে দেখা যায়, জাহাজটির উপরের অংশে ছিল সাদা, মাঝখানে নীল ও নিচের অংশে লাল রং করা। এদিকে আটক জাহাজটির উপরের অংশে ছিল নীল (স্কাই ফল) এবং নিচের অংশে লাল রং। তবে ওই জাহাজে স্পষ্টভাবেই এম ভি এসকেএল-৩ লেখাটি দেখা যায়। জাহাজের রেজিস্ট্রেশন নং: এম ০১-২৬৪৩ উল্লেখ ছিল।

গজারিয়া কোস্টগার্ড স্টেশনের কন্টিনজেন্ট কমান্ডার বজলুর রহমান সংবাদকে বলেন, গজারিয়া এলাকারই একটি ডকইয়ার্ড থেকে জাহাজটির রং পরিবর্তন করা হয়। ঘটনার রাতেই রং পরিবর্তন করে আবারও নদীতে নামানো হয়। কোন ডকইয়ার্ড থেকে রং পরিবর্তন করা হয়েছে এবং রং পরিবর্তনের পর কোথায় ছিল জাহাজটি সে বিষয়ে কিছু জানাতে রাজি হননি কোস্টগার্ডের এই কর্মকর্তা। তবে জাহাজটি উদ্ধারের স্থান কোস্টগার্ড গজারিয়া স্টেশনের আধা কিলোমিটারের মধ্যে বলে জানান তিনি।

তবে ঘটনার পরপরই ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে পালিয়ে যাওয়ার পর ডাকইয়ার্ড থেকে রং পরিবর্তন করে আবারও ঠিক কোস্টগার্ড স্টেশনের সামনে এসেই জাহাজটি নোঙর করার কারণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই প্রশ্নের উত্তর দেননি কোস্টগার্ড বা নারায়ণগঞ্জ নৌ থানা পুলিশের কোন কর্মকর্তা।

এদিকে লঞ্চডুবির ঘটনায় বিআইডব্লিউটিএ’র নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দর কর্তৃপক্ষের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক বাবু লাল বৈদ্য বাদী হয়ে নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানায় একটি মামলা করেন। মামলায় হত্যার উদ্দেশ্যে বেপরোয়া গতিতে পণ্যবাহী জাহাজ চালিয়ে যাত্রীবাহী লঞ্চটি ডুবিয়ে ৩৪ জনের প্রাণহানি ঘটানো হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে আসামির তালিকায় কারও নাম উল্লেখ করা হয়নি। এমনকি জাহাজের নাম ও নম্বরও উল্লেখ ছিল না মামলায়। মামলাটি তদন্ত করছে নারায়ণগঞ্জ নৌ থানা পুলিশ।

নারায়ণগঞ্জ নৌ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহিদুল আলম গতকাল সন্ধ্যায় সংবাদকে বলেন, ‘মামলায় জাহাজ বা আসামির নাম না থাকলেও কোস্টগার্ড জাহাজটিকে চিহ্নিত করে যেহেতু আটক করেছে সুতরাং জাহাজটিকে জব্দ ও আটক স্টাফদের গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। আজ (শুক্রবার) তাদের আদালতে প্রেরণ করা হবে।’ জাহাজটির অবস্থান পূর্ব থেকে জানতেন কিনা জানতে চাইলে নৌ থানার ওসি বলেন, কোস্টগার্ড অভিযান চালিয়ে জাহাজটিকে আটক করেছে। নৌ পুলিশের কাছে জাহাজটির অবস্থান সম্পর্কে কোন খবর ছিল না।

তিন তদন্ত কমিটির গণশুনানি, ৫৩ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ

লঞ্চডুবির এই ঘটনায় গঠিত নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন ও বিআইডব্লিউটিএ’র পৃথক তিনটি কমিটি গতকাল প্রত্যক্ষদর্শী, নিহতের স্বজন, স্থানীয় এলাকাবাসীসহ সংশ্লিষ্ট অন্যদের সাক্ষ্যগ্রহণ করেছেন। তদন্ত কমিটির সদস্যদের মাধ্যমে জানা যায়, সকাল ১১টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত সদর উপজেলার সৈয়দপুর পাথরঘাট এলাকার শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিম পাশে তারা মোট ৫৩ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করেছেন।

নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় গঠিত সাত সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রধান যুগ্ম সচিব আব্দুল ছাত্তার শেখ বলেন, ‘ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যক্তিদের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়েছে। সামগ্রিক দিকগুলো বিবেচনা করে আমরা আমাদের তদন্ত চালিয়ে যাবো। তদন্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমেই দোষী এবং এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না হয় সে ধরনের সুপারিশ করা হবে।’

গণশুনানিতে আরও উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসনের সাত সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট খাদিজা তাহেরা ববি, নৌ পুলিশের নারায়ণগঞ্জ জোনের সুপার মীনা মাহামুদ, বিআইডব্লিটিএ’র উপপরিচালক মোবারক হোসেন, নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্সের উপ-সহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল আরেফিনসহ অন্য কর্মকর্তারা।